Friday, March 27, 2026

মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় প্রথম দুই সপ্তাহেই ৮০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি

প্রকাশ ২১ মার্চ ২০২৬ঃ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোয় ইরানের হামলায় যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৮০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) ও বিবিসির করা যৌথ একটি বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

নতুন এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পরের সপ্তাহে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা যে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়, তাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরানের হামলায় ২২ দিনে মোট ক্ষয়ক্ষতি কতটা হয়েছে, তার পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রাথমিকভাবে ৮০ কোটির যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা আগের হিসাবের চেয়ে বেশি। এতে স্পষ্ট যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে।

বিশ্লেষণী প্রতিবেদনটির সহলেখক ও সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানিয়ান বলেন, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি কম করে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে। আরও তথ্য পাওয়া না পর্যন্ত পুরো পরিমাণটা জানা যাবে না।

মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জানতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি। তবে পররাষ্ট্র দপ্তর বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। পরে এ বিষয়ে সেন্টকমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

কোথায় কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পর থেকে জর্ডান, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমরিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। তেহরানের হামলার নিশানা ছিল মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) যোগাযোগব্যবস্থা।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার একটি অংশ পুরো অচল হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের নথির বরাত দিয়ে সিএসআইএস একটি বিশ্লেষণ করেছে। তাতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এএন/টিপিওয়াই–২ রাডার ব্যবস্থার অন্তত ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কাজে এটি ব্যবহৃত হয়।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের অবস্থান নিশানা করে ইরানের হামলায় যেসব ভবন, সামরিক ও অন্যান্য অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে, তাতে আরও অতিরিক্ত ৩১ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ওই বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত তিনটা বিমানঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা হয়েছে। এই তিনটি ঘাঁটি হলো কুয়েতে থাকা আলী আল–সালেম, কাতারে থাকা আল–উদেইদ ও সৌদি আরবে থাকা প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি।

চলমান যুদ্ধে অন্তত ১৩ আমেরিকান সেনা নিহত হয়েছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন নারী, শিশুসহ ১ হাজার ৪০০ বেসামরিক নাগরিক।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-21%2Flrne39ur%2FUntitled-2.jpg?rect=1%2C0%2C830%2C553&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি আল সাদের ও আল রুওয়াইস। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

চীনের পরিকল্পনায় কাজ হলে মার্কিন এফ–৩৫ গুলি ছাড়াই থামিয়ে দিতে পারবে বেইজিং

প্রকাশ ১২ মার্চ ২০২৬ঃ ইরানে হামলা এমন এক যুদ্ধের পরিকল্পনা, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র মোটেও প্রস্তুত নয়। কারণ, তারা ভুল একটি যুদ্ধ নিয়ে বড্ড বেশি ব্যস্ত।

ওয়াশিংটন যখন ইরানের বিরুদ্ধে লড়তে শত শত কোটি ডলার ঢালছে এবং বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো তেলের দাম আর ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথের ওপর নজর রাখছে, তখন বেইজিং নিঃশব্দে এমন একটি নথি প্রকাশ করেছে, যা আগামী কয়েক দশকের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

গত ৫ মার্চ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে উন্মোচিত চীনের ১৪১ পৃষ্ঠার ‘১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে’ এমন এক উচ্চাভিলাষী কৌশলের কথা বলা হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো আগামী প্রজন্মের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি নির্ধারণকারী প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও শিল্প খাতগুলোকে নিজেদের দখলে নেওয়া।

ইনভেস্টমেন্ট অ্যানালিস্ট ও লেখক শানাকা আনসেলাম পেরেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘কেউ এদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। আর এটাই হলো আসল পয়েন্ট।’

চীনের এই ব্লুপ্রিন্ট বা খসড়াটি কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক নীতিমালা নয়, বরং একে একটি জাতীয় প্রযুক্তিগত সংহতি বা প্রস্তুতির মতো মনে হচ্ছে। পুরো নথিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কথা বারবার এসেছে।

বেইজিং ইঙ্গিত দিয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে তারা তাদের অর্থনীতির সিংহভাগজুড়ে এআইকে গেঁথে দিতে চায়।

মানুষের মতো দেখতে রোবটকে (হিউম্যানয়েড রোবোটিকস) প্রধান একটি শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এর উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ ছাড়া এই পরিকল্পনায় চীন মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি, নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণায় গতি আনা এবং ‘ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যও বেশ চমকপ্রদ। এই পরিকল্পনা চলাকালে শুধু এআই–সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর মূল্য ১০ লাখ কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি ডলার।

চীনের এই উদ্যোগের মাত্রা দেখে বোঝা যায়, এটি একটি সুসংগঠিত জাতীয় শিল্প প্রচেষ্টা। স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের ময়দানে জেতার চেয়ে তারা বরং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে উৎপাদনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নীতিকে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে চায়।

আনসেলাম পেরেরা যুক্তি দেখিয়েছেন, চীনের এই কৌশলের ব্যাপকতাই একে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি লিখেছেন, ‘এটি কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; এটি এমন এক যুদ্ধের পরিকল্পনা, যা যুক্তরাষ্ট্র লড়ছেই না।’

চীনের এই প্রযুক্তিগত উত্থানের মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের প্রধান পদক্ষেপ ছিল ২০২২ সালে পাস হওয়া ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’ (চিপস অ্যাক্ট)। এই আইনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শক্তিশালী করতে ৫ হাজার ২৭০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার সরাসরি অনুদান এবং ট্যাক্স সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই উদ্যোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১৪০টির বেশি প্রকল্পে শত শত কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে। প্রচুর উচ্চ-দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু এটি শুধু চিপসের বিষয় নয়

যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টা মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর সীমাবদ্ধ। আর তা হলো চিপস।

অন্যদিকে চীনের কৌশল অনেক বেশি বিস্তৃত। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভারী শিল্প থেকে শুরু করে সেবা খাত—সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে চায়। শিল্প উৎপাদনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে রোবোটিকসকে ব্যবহার করতে চায়।

চীনের এই পরিকল্পনা একই সঙ্গে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ অবকাঠামো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিকসের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্রসেসিং ক্ষমতার (বিশেষ করে বিরল খনিজ) ওপর বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দেয়।

পেরেরা এই পার্থক্যকে সহজ কথায় এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—‘চিপস অ্যাক্ট হলো একটি রাইফেল, আর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো একটি অস্ত্রাগার।’

সেই অস্ত্রাগারের কেন্দ্রে রয়েছে বিরল খনিজ উপাদান। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ চীনের নিয়ন্ত্রণে। এই উপাদানগুলো ইলেকট্রিক গাড়ি থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক রাডার তৈরির জন্য অপরিহার্য।

প্রতিটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন, সেন্সর এবং অস্ত্রব্যবস্থা তৈরির জন্য শত শত পাউন্ড বিরল খনিজ প্রয়োজন হয়। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার ব্যাটারি এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী গোলাবারুদও এই বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং এই খাতের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তপোক্ত করেছে। তারা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে আরও কঠোর করেছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে এই খনিজ সরবরাহের ওপর তাদের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা কেনাকাটার নিয়মগুলো উল্টো পথে হাঁটছে। আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পেন্টাগনের চুক্তিতে চীনা খনিজ উপাদান ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সরবরাহকারীদের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে বা তৈরি করতে হচ্ছে। তবে সেটা এখনো বড় আকারে নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে আগামী কয়েক বছর বা অন্তত দশকের জন্য ‘দুর্বলতার সুযোগ’ তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আগ্রাসন বা গাজায় নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞে ইসরায়েলকে সহায়তা করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে বিরল খনিজ সমৃদ্ধ গোলাবারুদ খরচ করে ফেলছে।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন খনি বা প্রক্রিয়াজাত প্ল্যান্ট নেই, যা বড় পরিসরে এই চাহিদা পূরণ করতে পারে।

পেরেরা লিখেছেন, ‘ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর (প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র) ধ্বংস হচ্ছে। আর চীন সেই ইন্টারসেপ্টর তৈরির সরবরাহব্যবস্থা আটকে দিচ্ছে।’ আর এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাই হলো সেই কৌশলগত নথি, যা এই চাপকে জাতীয় কৌশলে রূপান্তর করেছে।

সি চিন পিংয়ের ১৪১ পৃষ্ঠার এই পথনকশার লক্ষ্য হলো—আগামী ১৫ বছর এই ধ্বংসাত্মক সমরকৌশলের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো যেন চীনের নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন যদি কাঁচামাল, রোবোটিকস এবং এআইকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে আনতে সফল হয়, তবে পরবর্তী বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার লড়াই পারস্য উপসাগরের আকাশে যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং এফ–৩৫ আকাশে ওড়ার অনেক আগেই সরবরাহ চেইন এবং কারখানার ভেতরেই তার ফয়সালা হয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, পুয়ের্তো রিকো
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, পুয়ের্তো রিকো। ছবি: রয়টার্স

জুলাই হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী এমপি: কাঠগড়ায় কি ভুল মানুষ? by ডেভিড বার্গম্যান

ডেভিড বার্গম্যানের বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশে সবাই রংপুরে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি জানেন। ছাত্র আন্দোলনের সময় এটি ছিল প্রথম দিকের প্রাণঘাতী ঘটনা; এরপর একে একে শত শত মানুষ মারা যান। ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল এবং হাত প্রসারিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ ছাত্রকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত, তিন সপ্তাহের মাথায় শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।

তবে ১৬ জুলাই শুধু আবু সাঈদই নিহত হননি। ওই দিনই চট্টগ্রাম শহরে আরও তিনজন নিহত হন। তাঁরা হলেন—ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মো. ফারুক। রংপুরের ঘটনার মতো এখানে পুলিশের ভূমিকা মুখ্য ছিল না। চট্টগ্রামে গুলির ঘটনায় জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্মী ও তাঁদের রাজনৈতিক নেতারা।

ঘটনার ছয় দিন পর, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ চট্টগ্রামের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং একই সময়ের মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। অনুসন্ধানে যাঁদের গুলি করতে দেখা যায়, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মী বলে শনাক্ত হন।

নেত্র নিউজ জানায়, এই শুটাররা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনির পরিচিত ও প্রমানিত অনুসারী। অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বাবর নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, গুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বাবরের এক সহযোগীর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল।

এই লেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে বলা হয়, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি ছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তৃণমূল সহযোগীদের’ মধ্যে দুজন। সে সময় নওফেল ছিলেন দেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং যে আসনে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, তিনি ছিলেন সেই এলাকার সংসদ সদস্য।

নেত্র নিউজ জানায়, তারা নওফেল ও বাবরের একসঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রায় এক শটি ছবি সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি, নওফেল যে বহুবার বাবরের বাড়িতে গিয়েছেন—এমন ছবিও তাদের কাছে আছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রনিকে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় নওফেলপন্থী ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতা হিসেবে ধরা হতো।

নেত্র নিউজের এই অনুসন্ধান অবশ্যই চট্টগ্রামের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার জন্য কারও অপরাধ শত ভাগ প্রমাণ করে না। কিন্তু এটি তদন্তের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ পুলিশ হোক বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা—এই প্রতিবেদন থেকে তাঁরা জানতে পারেন কারা গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ, অস্ত্রের উৎস কোথা থেকে এসেছে, বাবর ও রনি কীভাবে শুটারদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্যও এতে উঠে এসেছে।

ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তার

এসব তথ্য থাকার পরও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কৌঁসুলিরা চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রথমে নেত্র নিউজ যাঁদের চিহ্নিত করেছিল, তাঁদের কাউকে নিয়েই তদন্ত করেননি। বরং তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে অভিযুক্ত করেন। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান আসনের সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে আইসিটির বিচারকদের সামনে হাজির করা হয়। কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমানের আবেদনের পর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক রাখা হয়।

সেই সময় স্পষ্ট ছিল না, ঠিক কোন অপরাধের জন্য ফজলে করিমকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের আটকাদেশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ ছিল না। সেখানে শুধু খুব সাধারণভাবে বলা হয়—সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, সহায়তা, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে কৌঁসুলি অভিযোগ করেছেন।

এরপর আইসিটির কৌঁসুলিরা ফজলে করিমের আইনজীবীদের একটি এক পৃষ্ঠার নোট দেন, যেখানে তাঁর আটকের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ওই নোটে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ওই দিন ফজলে করিম অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলে দলীয় কর্মীদের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ’ চালান এবং তারই ফলস্রুতিতে তিনজন নিহত হন।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে ওই নোটে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সে সময় পর্যন্ত এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একমাত্র ফজলে করিম চৌধুরীকেই আটক বা গ্রেপ্তারের আবেদন করেছিল আইসিটি।

অনেকের কাছেই এই আটক অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। কারণ, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য যে প্রমাণ পাওয়া গেছে; বিশেষ করে নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে যেগুলো উঠে এসেছে—সেগুলোতে চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা ছাড়া ফজলে করিমের নিজ নির্বাচনী এলাকা রাউজানে (যা চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে) জুলাইয়ের অস্থিরতার সময় কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি, কেউ গুরুতর আহত হননি, এমনকি কোনো আন্দোলনকারী নিহতও হয়নি।

পুরোনো শত্রুতার নিষ্পত্তি?

এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে গেলে দুজন ব্যক্তির পরিচয়ের দিকে নজর দিতে হয়। ফজলে করিম চৌধুরীর আটকাদেশ দেওয়ার কয়েক মিনিট পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাইরে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের ‘অভিযোগের’ ভিত্তিতেই আইসিটি ফজলে করিমকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দুজন ব্যক্তি বলেন যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের লোক না। তাদের দাবী হলো বাবর ও রনি আসলে ফজলে করিম চৌধুরীর লোক। উল্লেখ্য, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় এই বাবর ও রনিকেই মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল নেত্র নিউজের অনুসন্ধানি প্রতিবেদন।

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলা এই দুই ব্যক্তি হলো আবদুল্লাহ আল মামুন ও জুবায়ের আহমেদ। তারা ফজলে করিমের সাবেক নির্বাচনী এলাকা রাউজানকেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী মুনিরিয়া যুব তাবলিগ-এর সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ এই সংগঠনটিকে একটি স্বাভাবিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দেখেন। আবার অনেকের মতে এটি চরমপন্থী এবং ভূমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মুনিরিয়ার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কতটা সত্য, তা আলাদা বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে রাউজানের সংসদ সদস্য থাকাকালে ফজলে করিম ও মুনিরিয়া যুব তাবলিগের মধ্যে প্রায়ই পরষ্পর বিরোধিতা হয়েছে। ফজলে করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা দমনে চেষ্টা করেছিলেন।

ফজলে করিমের পরিবার মনে করে, এই দ্বন্দ্বই তাঁর দীর্ঘ আটক থাকার মূল কারণ। তাদের দাবি—এখন প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা চাপ সৃষ্টি করছে, আর সেই চাপের ফলেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

এটা নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং নতুন কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা বারবার ফজলে করিমের আটক, বিচার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ফজলে করিম গ্রেফতার হবার আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে, মুনিরিয়ার এক সদস্য সম্রাট রোবায়েত (যিনি পরবর্তীতে আইসিটিতে দেওয়া মূল অভিযোগটি লেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন) চট্টগ্রামের একটি আদালতের সামনে এক সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। সেখানে একটি ব্যানারে ফজলে করিমের গলায় ফাঁসের ছবি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই তাঁর ‘ফাঁসি’ দাবি করা হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একদল ছাত্র (যাদের মধ্যে অন্তত একজন মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত) অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাৎ নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে বলা হয়, এটি ছিল—‘বিচার ব্যাবস্থা ও আওমী সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ ও রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজলে করিমের সর্বোচ্চ শাস্তি সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রাফাত আহমেদ এর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ।’ ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ বলতে সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডকেই বোঝানো হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ফজলে করিমের গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে পরিবার তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার আবেদন করলে রোবায়েতসহ অন্যান্য লোকজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল—ফজলে করিম যেন কোনোভাবেই, তাদের ভাষায়, ‘জামিন’ না পান। ওই কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে রোবায়েত বলেন, ‘চট্টগ্রামের অন্যতম গণহত্যাকারী এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, তাঁকে জামিন দেয়ার নাকি…চক্রান্ত চালাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট চক্র…আমরা চাই এইসব হত্যাকারি যাতে কোনভাবেই জামিন না পায়।’

এমনকি এর কয়েক সপ্তাহ আগেই রাউজানে এক সভায় আরেকজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়—যদি ‘তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে তাঁকে মুক্ত দেয়ার যে পাঁয়তারা যে গল্প আপনারা সাজাচ্ছেন তা আমাদের জানা…যদি সত্য হয়’, চট্টগ্রামের মানুষ তথা রাউজানের মানুষ প্রত্যেকটা মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আপনাদের ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেব।

আইসিটির জবাব

এই মামলার দায়িত্বে থাকা আইসিটির কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমান স্বীকার করেছেন, ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার জন্য ট্রাইব্যুনালের ওপর বাইরের কিছু গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৌঁসুলিরা এমন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন না।

নোমান বলেন, ‘এটা ঠিক যে মুনিরিয়া কোনোভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে এবং ফজলে করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিশ্চিত করতে জনতার চাপ তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আমরা আইসিটির কৌঁসুলি হিসেবে; এবং এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌঁসুলি হিসেবে যতক্ষণ না পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রাথমিকভাবে (প্রাইমা ফেসি) অভিযোগের ভিত্তি পাই, ততক্ষণ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছি না। সে কারণেই মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।’

নোমান আরও স্বীকার করেন, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘যে আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেই এলাকায় কোনো নৃশংস ঘটনা ঘটেনি বা সংঘটিত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরে, অর্থাৎ যেখানে ওই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, সেখানে ফজলে করিমের কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল না; তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন না।

তবে নোমান উল্লেখ করেন, মুনিরিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া মূল অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ফজলে করিম ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগটি আমরা এখনো তদন্ত করে দেখছি।’

এর ফলে আটক হওয়ার এক বছর পরও ফজলে করিম ও তাঁর পরিবারকে তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে—তা জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ বা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিকে এখন গ্রেফতার করা হয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে এই হত্যাগুলোর মামলায়। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও।

এই পরিস্থিতির আলোকে ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেফতার নিয়ে উদ্বেগ হলো তাঁকে যে এখনো অন্তরীন রাখা হয়ছে তা কি আদৌ কোন প্রমানের ভিত্তিতে হচ্ছে কিনা। বরং বাস্তবতা হলো—মুনিরিয়া যুব তাবলিগ ও তাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সংগঠিত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আইসিটির কৌঁসুলিরা কার্যত একজন সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছেন না, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

* ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david.bergman.77377
- ইংরেজি থেকে অনূদিত। মতামত লেখকের নিজস্ব।

গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা
গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা। ছবি: জুয়েল শীল

ভিন গ্রহে কার্বন ডাই–অক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরির উপায় খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা

বেশির ভাগ গ্রহে অক্সিজেনের বদলে কার্বন ডাই–অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্যাসের আধিক্য থাকায় সেখানে প্রাণের সন্ধান পাওয়া বেশ কঠিন। শুধু তা–ই নয়, অক্সিজেন না থাকার কারণে মানুষের পক্ষে সেসব গ্রহে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবে এবার বিভিন্ন গ্রহের বায়ুমণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড কাজে লাগিয়ে অক্সিজেন তৈরির নতুন কৌশল খুঁজে পেয়েছেন চীনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির একদল বিজ্ঞানী। এই কৌশল বহির্জাগতিক জীবনের সন্ধানপদ্ধতিকে পরিবর্তন করবে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, আণবিক অক্সিজেন উত্পাদনের জন্য অনেক গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কোনো জৈবিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। এর ফলে বিভিন্ন গ্রহে হিলিয়াম আয়ন ও কার্বন ডাই–অক্সাইডের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ফলে আণবিক অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে গবেষণাগারে হিলিয়াম আয়ন ও কার্বন ডাই–অক্সাইডের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন ডাই–অক্সাইড ও সৌরবায়ুর কারণে সৃষ্ঠ হিলিয়াম আয়ন ব্যবহার করে অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের হল বিশ্ববিদ্যালয়ের আণবিক পদার্থবিদ ডেভিড বেনোইট বলেন, নতুন এই কৌশল বিভিন্ন গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের গঠন শনাক্তের ক্ষেত্রে নতুন পথ দেখাচ্ছে। দূরবর্তী গ্রহে আণবিক অক্সিজেনের কার্যকর উত্স হিসেবে এই পদ্ধতি নতুন করে ভাবনা তৈরি করছে। এই গবেষণার প্রেক্ষিতে বলা যায়, অক্সিজেন স্বাধীনভাবে গঠিত হতে পারে।

সূত্র: গ্যাজেটস৩৬০

বৃহস্পতি গ্রহ
বৃহস্পতি গ্রহ। নাসা

২০০ বছরের পুরোনো কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী by রুমিন ফারহানা

রুমিন ফারহানার প্রকাশিতব্য বই থেকেঃ বইমেলায় প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে এ আয়োজন। আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রুমিন ফারহানার সংসদের দিনগুলি: একাদশ সংসদে সাড়ে তিন বছর বইটি আনছে প্রথমা প্রকাশন। বইটির প্রথম অধ্যায় এখানে মুদ্রিত হলো। যেখানে উঠে এসেছে কারাগারের কোর্টরুমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎ আর নিজের শৈশবে বাবার কারাগার-স্মৃতি।

২০১৯ সাল। একাদশ সংসদ নির্বাচন মাত্র শেষ হয়েছে। রাজনীতিতে হতবিহ্বল ভাব। কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী হলো এটা। জয়ী-বিজিত কোনো পক্ষই স্বস্তিতে নেই। সে সময় প্রতি সপ্তাহে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতাম আমি। যেতাম দেশনেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলায়, যেতাম ওনাকে কাছ থেকে দেখতে। উনি তখন ২০০ বছরের পুরোনো সেই বিশাল কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পড়ত মামলার তারিখ। মামলার দিনগুলোতে নিচতলায় বসা কোর্টে আনা হতো ওনাকে। হুইলচেয়ারে আসতেন তিনি। যে মানুষটিকে জেলে যাওয়ার আগের দিনও স্বাভাবিকভাবে হেঁটে গাড়িতে উঠতে দেখেছি আমি, সেই মানুষটি নিজের পায়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। এটা যে কত বড় ধাক্কা ছিল আমাদের জন্য, সেটি বলে বোঝানো কঠিন।

ছোট্ট ওই কোর্টরুমে পুলিশ, আইনজীবী আর সাংবাদিক গিজগিজ করত, সঙ্গে তো গোয়েন্দা সংস্থার লোক আছেই। উনি এলে আমি গিয়ে দাঁড়াতাম ঠিক ওনার হুইলচেয়ারটার পাশে। খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে যতটুকু সম্ভব খবর দেওয়ার চেষ্টা করতাম তাঁকে। উনি বলতেন খুবই কম, শুনতেন বেশি। কিছু বলতে চাইলে হুইলচেয়ারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তাম আমি, যাতে পুলিশের কান বাঁচিয়ে কথাগুলো শুনতে পারি। পুরোটা সময়ই তাঁকে ঘিরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকত মহিলা পুলিশ। তাদের কান বাঁচিয়ে কথা বলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এর মধ্যেই কথা চালিয়ে যেতাম যতটুকু পারি। তিনি কিছু নির্দেশ আমাকে দিতেন সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে বলার জন্য, সেগুলো আমি তাঁদের জানাতাম। মামলার শুনানি শেষ হলে ওই দিনের মতো কারাগারের ভেতর নিয়ে যাওয়া হতো তাঁকে। এ সময়টা আমি তাঁর পাশ থেকে সরে যেতাম। দাঁড়াতাম ভেতরের মূল ফটকের পাশে, যেখান দিয়ে যাবেন তিনি। শেষবারের মতো একবার তাকাতেন। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। হাসতেন কখনো কখনো একটু, যেন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যে মানুষটিকে আমি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে কোর্টে যেতে দেখেছি, কী করে এক মাসের ব্যবধানে তিনি চলনশক্তি হারালেন, তা আজও আমার কাছে এক বিস্ময়। একদিন হয়তো এই সত্য প্রকাশ পাবে। অনাগত কালের কোনো প্রজন্ম হয়তো উদ্‌ঘাটন করবে এই সত্যগুলো। জানবে কেমন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি।

যা-ই হোক, ফিরে আসি আগের কথায়। তাঁকে সেখানে একা রেখে ঘরে ফেরার যে তীব্র কষ্ট, সেটি কি বুঝতে পারতেন তিনি? না হলে কেন মৃদু হাসি দিয়ে আশ্বস্ত করার এই চেষ্টা ছিল তাঁর? প্রতিশোধ আর জিঘাংসার রাজনীতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত কত ঘৃণ্য হতে পারে, তার উদাহরণ হয়ে থাকবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আওয়ামী সরকারের নির্মম আচরণ। সেই সঙ্গে অন্যায়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করে ৭৬ বছর বয়সে সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কারাগারকে বেছে নেওয়ার যে দৃষ্টান্ত বেগম জিয়া তৈরি করলেন, সেটিও লেখা থাকবে ইতিহাসে। তিনি চাইলেই পারতেন আপস করতে, কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে, পারতেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা হতে, ২০১৮ সালে বিদেশ থেকে না ফিরতে। কিন্তু ১/১১ সরকারের সময়ই বেগম জিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই দেশ ছাড়া তাঁর কোথাও আর কিছু নেই, এই দেশের মানুষই তাঁর সব।

বেগম খালেদা জিয়ার মামলার সুবাদে বহু বছর পর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে মনে হয়েছিল কিছুই ভুলিনি আমি। এরশাদ সরকারের সময় যখন আমি নিতান্তই একজন শিশু, তখন বাবাকে দেখতে বহুবার যেতে হয়েছে কারাগারে। পুরোনো সেই স্মৃতি মিলিয়ে দেখি বদলায়নি কিছুই। এমনকি বিল্ডিংয়ের ভেতরের সেই হলুদ রংটাও না। নোনাধরা দেয়ালগুলোও আছে ঠিক আগের মতোই। লোহার গরাদ বসানো সেই জানালাগুলোও পাল্টায়নি কেউ। যেন ২০০ বছরের কালের সাক্ষীকে একইভাবে রাখতে হবে যত দিন রাখা যায়। লোহার দরজা দিয়ে ঢুকেই হাতের ডানে প্রথমে জেলারের রুম। এরপর মোটামুটি বড় একটা ঘর (যেখানে আদালত বসত), তারপরই আরেকটা লম্বা টানা ঘর, যার এক পাশে সারি সারি জানালা, যেখান দিয়ে বাইরে তাকালে জেলের ভেতরটা অনেকখানি দেখা যায়। ভেতরটা যত দূর দেখা যায় সবুজ, সুন্দর। ছোট-বড় মিলিয়ে গাছের কমতি নেই। আসলে এতবার গেছি এই কেন্দ্রীয় কারাগারে যে ভোলা অসম্ভব। বাবাকে রেখে আসার সময় প্রতিবার একটা শূন্যতা, একটা তীব্র কষ্ট, হাহাকার কাজ করত। মনে হতো, আবার কবে দেখব? বাবাকে ছাড়া বাড়িটা কেমন সব সময় খালি খালি মনে হতো। ছোট আমি হয়তো বুঝিয়ে সবটা বলতে পারতাম না, কিন্তু বাবা জেলে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়তাম। হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই ভীষণ জ্বর, নয়তো পড়ে গিয়ে ব্যথা পাওয়া। মা বলতেন, বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে নাকি আমাকে নিয়ে ভয়ে থাকতেন বেশি—এই বুঝি কিছু একটা হয়। প্রতিবার হতোও তা-ই। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তখনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজবন্দীদের সঙ্গে অসদাচরণ আজকের মতো এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই বাবা গ্রেপ্তার হলে কখনো আর না-ও ফিরতে পারেন—এমন ভয় মা কিংবা আমি কখনো পাইনি। স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদের পর আর কোনো সরকার জেলে নেয়নি বাবাকে। আর এ কারণেই আমার জীবনে ’৯০-এ এরশাদের পতন অতি আনন্দময় ঘটনাগুলোর একটি।

বাবা যখন জেলে থাকতেন, তখন বাসায় কেবল ছোট্ট আমি, মা আর কর্মচারীরা। সকালে মা চলে যেতেন অফিসে। সারা দিন আমি একা। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। কবির ভাই (রান্না করতেন), জয়নাল ভাই (বাসা দেখাশোনা), বাবুল ভাই (ড্রাইভার) কিংবা রওশনের মা যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পরিবারের সদস্যের চেয়ে বেশি বৈ কম ছিলেন না। ছোট্ট আমাকে যেভাবে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখে বড় করেছেন তাঁরা, আজকের দিনে এমনটা চিন্তাও করা যায় না। জয়নাল ভাইয়ের বড় মেয়ে ছিল আমার বয়সী। অজপাড়াগাঁয়ে রেখে আসা শিশুকন্যাটির প্রতি জমিয়ে রাখা সব স্নেহ ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনির মতোই ঢেলে দিয়েছিলেন আমার প্রতি। আমার মা ছিলেন খুব কড়া মেজাজের আর শক্ত ধাঁচের মানুষ। তার ওপর সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক পরিবার থেকে এসে স্বামীর রাজনীতি, জেলজীবন—সবকিছু মানিয়ে নিয়ে একা সংগ্রামের ধকল তো ছিলই। মায়ের শাসন আর বকুনি থেকে আমাকে বাঁচাতে কত চেষ্টা যে ছিল জয়নাল ভাইয়ের। মাকে আমরা সবাই ভীষণ ভয় পেতাম। কেউ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। তার ওপর অতি দুষ্টু বাচ্চা বলতে যা বোঝায়, আমি ছিলাম তা-ই। বাবা জেলের বাইরে থাকলে বাবা আর না থাকলে এই চারজন কতবার যে আমার হয়ে মিথ্যা দোষ কবুল করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। মাকে নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা মজার কথা প্রচলিত ছিল। আমরা বলতাম, মা বাসায় থাকলে ভুলেও বাড়িতে কাক-চিল বসে না। তবে মজার বিষয় হলো, ঘরের বাইরে মা ছিলেন অতি মার্জিত, ভদ্র, কঠোর কিন্তু শান্ত মেজাজের মানুষ।

বাবা ছিলেন গৌরবর্ণের ঋষি পুরুষ। জেলের ভেতর দেখা করার সময় পার হলে সোজা হেঁটে যেতেন ভেতরে, যেন পেছনে কেউ নেই, কিছু নেই। আজ মনে হয়, হয়তো কষ্ট হতো তাঁর পেছনে ফিরে দেখতে, যেখানে চিন্তিত-বিষণ্ন স্ত্রী, শিশুকন্যা দাঁড়িয়ে আছে। রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে সব দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানোর খেলাও পুরোনো। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ আর তাঁর পরিবারই শুধু জানে ঠিক কিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। রাজনীতিবিদদের দোষত্রুটি আছে, ভুলভ্রান্তি আছে, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও রাজনীতিবিদের বিকল্প কেবল রাজনীতিবিদই, অন্য কেউ নয়। অবশ্য আমি যে সময়ের রাজনীতিবিদের কথা বলছি, তখনো রাজনীতিবিদেরা আজকের মতো লুম্পেন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেননি। রাস্তার লোক রাজনীতি করে কোটিপতি—এটা হালের সংস্কৃতি। ঋণখেলাপি, কালোবাজারি, ব্যবসায়ী আর আয়ের কোনো বৈধ উৎস ছাড়াই কোটিপতি—এরাই সংসদের মেজরিটি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-07%2Fbb40yjxz%2FWhatsApp-Image-2026-03-07-at-15.32.20.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

গালওয়ান নিয়েই কি ভয়, কেন সাবেক সেনাপ্রধানের বই প্রকাশের অনুমতি দিচ্ছে না মোদি সরকার by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরবনের লেখা অপ্রকাশিত বই কী করে বিরোধীদের হাতে এল, তা নিয়ে দিল্লি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। গত সোমবার ওই বই নিয়ে দিল্লি পুলিশ এফআইআর রুজু করেছে।

পুলিশ খতিয়ে দেখছে, যে বই এখনো প্রকাশিতই হয়নি, সেই বইয়ের কপি কী করে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর হাতে এল। কীভাবে তিনি সেই বইয়ের অংশ লোকসভায় পড়তে চাইলেন।

ওই বই নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীকে বিষয়টি নিয়ে বলতে বারবার বাধা দেওয়া হয়েছে। বিরোধী সদস্যদের বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে বিরোধী সদস্যরা অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। প্রস্তাবে সই করেছেন ১১৮ জন বিরোধী সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার প্রস্তাবটি পেশের নোটিশ জমা দেন কংগ্রেসের সদস্য গৌরব গগৈ ও কে সুরেশ।

দিল্লি পুলিশ এফআইআর রুজু করার দিনেই ওই বইয়ের প্রকাশক পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক সেনাপ্রধানের লেখা ওই আত্মজীবনী, যার নাম ‘ফোর স্টারস অব ডেস্টিনি’, এখনো পর্যন্ত পুস্তক আকারে অথবা ডিজিটালি প্রকাশিত হয়নি। ছাপার আকারে অথবা ডিজিটালি ওই বই বিক্রি বা বিতরণও করা হয়নি।

৪৪৮ পৃষ্ঠার ওই বইয়ের একটি পিডিএফ ফরম্যাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রকাশক জানিয়েছে, তারা কিছু প্রকাশ করেনি।

অথচ মঙ্গলবার সংসদ ভবন চত্বরে রাহুল গান্ধী সাবেক সেনাপ্রধানের এক পুরোনো টুইট দেখিয়ে বলেন, ২০২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর নরবনে নিজেই জানান, তাঁর বইটি বেরিয়ে গেছে। বইটি অ্যামাজনে পাওয়া যাচ্ছে। সেই লিংক দিয়ে নরবনে লিখেছেন, ‘আনন্দের সঙ্গে পড়ুন। জয় হিন্দ।’

রাহুল বলেন, বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস যা বলছে, তার সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুলের টুইটের মিল নেই। দুজনের একজন সত্য বলছেন। আমি নরবনেকে বিশ্বাস করছি।

প্রকাশকের বিবৃতির পর এখন মনে করা হচ্ছে, দিল্লি পুলিশের তদন্তকারী কর্তারা এবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর দরজায় কড়া নাড়বেন। তাঁরা জানতে চাইবেন, যে বই প্রকাশিতই হয়নি, তার কপি রাহুল কী করে পেলেন। কী করেই–বা তার পিডিএফ ফরম্যাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে এল।

পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে ২০২০ সালের জুনে যখন ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, জেনারেল নরবনে তখন ছিলেন সেনাপ্রধান। ২০২২ সালে তিনি অবসর নেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি ওই বই লেখেন, যা প্রকাশের অনুমতি ভারত সরকার এখনো পর্যন্ত দেয়নি।

দেড় বছর ধরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কেন বইটিকে ছাড়পত্র দেয়নি, কী কী কারণে, তা নিয়ে সরকার কোনো মন্তব্যও করেনি।

ওই বইয়ের কিছু অংশবিশেষ সম্প্রতি ভারত থেকে প্রকাশিত ইংরেজি ‘ক্যারাভান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে লেখা, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে মজুত চীনা সেনারা যখন ট্যাংক নিয়ে কৈলাস রেঞ্জের দিকে এগোচ্ছিলেন, সেনাপ্রধান তখন তা জানতে পেরে রাজনৈতিক নেতাদের জানান ও তাঁর কী করণীয় জানতে চান।

মনোজ মুকুল ফোন করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকেও। কিন্তু কেউই তাঁকে কী করতে হবে জানাননি। অনেক পর রাজনাথ সিং বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।

রাজনাথ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, সেনাপ্রধান যা উপযুক্ত মনে করবেন, সেটাই করুন। বইটির যে অংশ ওই সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, তাতে লেখা হয়েছে, ওই নির্দেশ শুনে সেনাপ্রধান অসহায় বোধ করেছিলেন।

    जैसा मैंने कहा, पीएम मोदी संसद में नहीं आएंगे क्योंकि वो डरे हुए हैं और सच्चाई का सामना नहीं करना चाहते। pic.twitter.com/1d2UmvR9mz
    — Rahul Gandhi (@RahulGandhi) February 4, 2026

ক্যারাভানে প্রকাশিত অংশে মনোজ মুকুলের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানালেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা সামরিক সিদ্ধান্ত, যা উচিত মনে হয়, তাই করুন। আমার ঘাড়ে কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ল। পুরো দায়ভার বর্তাল আমারই ওপর। আমি গভীর শ্বাস নিলাম। চুপচাপ বসে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। দেয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ ছাড়া সব শান্ত ছিল।’

লোকসভায় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বিতর্কে অংশ নিয়ে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ওই সাময়িকীতে প্রকাশিত তথ্য থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বলেছিলেন, যে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নেওয়ার কথা, তা তিনি সেনাপ্রধানের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।

রাহুলের অভিযোগ, এটাই বিজেপির দেশপ্রেমের নমুনা। দেশের নিরাপত্তা এই সরকার নিশ্চিত করতে পারে না।

রাহুলকে ওই বিষয়ে কিছুই বলার অনুমতিই দেওয়া হয়নি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুরা সম্মিলিতভাবে তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের দাবি, যে বই প্রকাশিতই হয়নি, তা থেকে কেউ কীভাবে উদ্ধৃতি দিতে পারেন?

স্পিকার ওম বিড়লা সেই যুক্তি গ্রহণ করে বলেন, শুধু অপ্রকাশিত বই নয়, প্রকাশিত গ্রন্থ থেকেও সব উদ্ধৃতি সব সময় দেওয়া যায় না। বিশেষ করে তা যখন দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

    Hello friends. My book is available now. Just follow the link. Happy reading. Jai Hind pic.twitter.com/VCiLiZOWIi
    — Manoj Naravane (@ManojNaravane) December 15, 2023

রাহুলের যুক্তি ছিল, তিনি মনগড়া কিছু বলছেন না, যা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন, তা একটি সাময়িকী, যা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। মঙ্গলবার তিনি প্রমাণের চেষ্টা করলেন, সরকার দাবি জানালেও বইটি বাজারে ছিল। মনোজ মুকুল নিজেই তা স্বীকার করেছেন।

বিতর্কের অবসান আজও হয়নি। বরং জটিলতর হয়েছে। লোকসভার বিরোধী নেতাকে বলতে না দেওয়ায় দিনের পর দিন মুলতবি হয়ে যাচ্ছে অধিবেশন। স্পিকার ইতিমধ্যেই আটজন বিরোধী সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জ্ঞাপন প্রস্তাব পাস করা হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জবাবি ভাষণ ছাড়াই। সংসদীয় ভারতের ইতিহাসে যা কোনো দিন ঘটেনি। জবাবি ভাষণ দিতে প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় হাজিরও হননি।

    Here is a tweet from Mr Naravane which says, “Just follow the link to my book.” The point I am making is this: either Mr Naravane is lying, or Penguin is lying. I do not think the former Army Chief would lie. Penguin says the book has not been published, but the book is available… pic.twitter.com/Xtn7gygC2K
    — Congress (@INCIndia) February 10, 2026

কেন মোদি উপস্থিত হননি, সেই ব্যাখ্যায় স্পিকার ওম বিড়লা জানিয়েছেন, তাঁর কাছে খবর ছিল, প্রধানমন্ত্রী আক্রান্ত হতে পারেন। কেননা, প্রধানমন্ত্রীর আসনের সামনে দাঁড়িয়ে বিরোধী নারী সদস্যরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। ফলে তিনিই (স্পিকার) প্রধানমন্ত্রীকে সভাকক্ষে আসতে বারণ করেছিলেন।

এবার বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব সরকার পক্ষ ও বিরোধীদের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলল। প্রস্তাব গৃহীত হলে তা খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা এক শ শতাংশ। কারণ, লোকসভায় বিরোধীদের সেই শক্তি নেই। দিল্লি পুলিশ তদন্তের নামে কী করে, সেই দিকেই এখন সবার নজর।

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরবন
ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরবন। ছবি: মনোজের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

সিসিলি থেকে ইন্দোনেশিয়া: একই দিনে মুসলিম বিশ্বের নতুন মানচিত্র by মনযূরুল হক

ইতিহাসের পাতায় ৯ রমজান দিনটি বিভিন্ন মহাদেশে মুসলিম সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার এক সন্ধিক্ষণ।

এই দিনে একদিকে যেমন সিসিলির উপকূলে মুসলিম নৌবাহিনীর নোঙর ফেলার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, অন্যদিকে আধুনিক যুগে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া অর্জন করেছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা।

সিসিলি জয়ে এক ফকিহ্‌র নেতৃত্ব

২১২ হিজরির ৯ রমজান (৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি সামরিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। এই দিনে উত্তর আফ্রিকার আগলাবি শাসনামলে সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাতের নেতৃত্বে মুসলিম নৌবাহিনী সিসিলি দ্বীপের ‘মাজারা’ উপকূলে অবতরণ করে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৫/২০২, ১৯৮৭)

সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাত একই সঙ্গে ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফকিহ্ ও বিচারক। ১০ হাজার পদাতিক এবং ৭০০ অশ্বারোহী নিয়ে পরিচালিত তার এই অভিযান প্রমাণ করে যে মুসলিম সভ্যতায় একজন আলেমও রণক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন।

এই বিজয়ের মাধ্যমে সিসিলিতে পরবর্তী আড়াইশ বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/২৬৫, ১৯৮৮)

মিসরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আইয়ুবিদের উত্থান

৫৫৯ হিজরির ৯ রমজান (১১৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় পরিবর্তন ঘটে। ফাতেমি উজির শাওয়ার ও দিরগামের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই দিনে কায়রো শহর অবরোধ মুক্ত হয়। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২০/৫২০, ১৯৮৫)

নুরুদ্দিন জেনকির নির্দেশে সেনাপতি শিরকুহ এই সংকটে হস্তক্ষেপ করেন। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ঘটনাটিই মূলত মিসরে ফাতেমি শাসনের অবসান এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল, যা পরবর্তীকালে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে (সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ৪২০, ২০০৪)

সুলতানি আজান ও কায়রোর স্থিতিশীলতা

৮২৫ হিজরির ৯ রমজান (১৪২২ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর সুলতান হাসান মাদরাসায় এক দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আজান ধ্বনিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১১০, ১৯৮৮)

মামলুক সুলতান ‘জহির তাতার’-এর শাসনামলে এই পদক্ষেপটি কেবল একটি ধর্মীয় ঘোষণা ছিল না, বরং এটি ছিল মামলুকদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার পর মিশরের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার একটি প্রতীকী ঘোষণা।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা

আধুনিক ইতিহাসের ৯ রমজান ১৩৬৪ হিজরি (১৭ আগস্ট ১৯৪৫) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক নতুন ভোরের সূচনা হয়। এই দিনে নেতা সুকর্ন ও মোহাম্মদ হাতা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

সাড়ে তিনশ বছরের ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের সুযোগে ইন্দোনেশীয় নেতারা এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। রমজানের এক পবিত্র জুমাবারে এই স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশটিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দেয়।

ফিলিস্তিন ও আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা

১৩৬৭ হিজরির ৯ রমজান (১৫ জুলাই ১৯৪৮) ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে এক বেদনাবিধুর স্মৃতির উদ্রেক করে। এই দিনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতির জন্য ৫৪ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে।

প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হলেও এটি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও দখলদারিত্ব বন্ধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী নাকবা বা বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে দেয়।

সিসিলি থেকে ইন্দোনেশিয়া: একই দিনে মুসলিম বিশ্বের নতুন মানচিত্র

বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের মাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, কারণ কী

২০২৪ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের মাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও)। জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কার্বন ডাই–অক্সাইডের বৈশ্বিক গড় ঘনত্ব ৩.৫ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৫৭ সাল থেকে গণনা শুরু করার পর থেকে ২০২৪ সালেই সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের নানা ধরনের কার্যকলাপের কারণে কার্বন ডাই–অক্সাইডের ক্রমাগত নির্গমন ঘটছে। দাবানলের মতো ঘটনা এই রেকর্ড বৃদ্ধির জন্য দায়ী। পৃথিবীর মহাসাগর ও ভূখণ্ডও এখন কম কার্বন–ডাই অক্সাইড শোষণ করেছে। কার্বন ডাই–অক্সাইডের বৃদ্ধি খারাপ জলবায়ুচক্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মহাসাগর ও ভূখণ্ডে গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ ও সঞ্চয় করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্য দুটি প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডও ২০২৪ সালে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে কার্বন ডাই–অক্সাইডের মাত্রা ৪২৩ পিপিএমে পৌঁছেছে। এই মাত্রা প্রাক্‌-শিল্প স্তরের ২৭৮ পিপিএমের চেয়ে ৫২ শতাংশ বেশি। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ দ্রুত হারে বাড়ছে। এই মাত্রা ১৯৬০ দশকের বার্ষিক গড় শূন্য দশমিক ৮ পিপিএম থেকে বেড়েছে। ২০১১-২০ দশকে বছরে ২ দশমিক ৪ পিপিএম মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, প্রতিবছর নির্গত কার্বন ডাই–অক্সাইডের প্রায় অর্ধেক বন ও অন্যান্য স্থলজ বাস্তুতন্ত্র ও মহাসাগর শোষণ করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মহাসাগর কার্বন ডাই–অক্সাইড কম শোষণ করছে। শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়ার ধরন ও রেকর্ড উষ্ণতম বছর হওয়ার কারণে ২০২৪ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের রেকর্ড বৃদ্ধি হয়েছে বেশি। স্থলভাগ ও সমুদ্র সে বছর কার্বন ডাই–অক্সাইড কম শোষণ করেছে। এল নিনোর বছরে শুষ্ক গাছপালা ও বন্যায় কার্বন সঞ্চয় হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালে অ্যামাজন ও দক্ষিণ আফ্রিকায় খরা ও আগুনের প্রভাব ছিল বেশ।

ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের ডেপুটি সেক্রেটারি-জেনারেল কো ব্যারেট জানান, কার্বন ডাই–অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস আবদ্ধ তাপ আমাদের জলবায়ুকে টার্বো চার্জ করছে। আরও চরম আবহাওয়ার দিকে চলে যাচ্ছে পৃথিবী। নির্গমন হার হ্রাস করতে না পারলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মানুষের ঝুঁকি বাড়বে।

সূত্র: ডেইলি মেইল

বিশ্বে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বেড়েছে
বিশ্বে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বেড়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স