Friday, May 23, 2025

গাজা এখন ইসরায়েলের ভিয়েতনাম by মেহমেত রাকিপওগ্লু

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের ১৯ মাস পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তার মূল কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন, বিশেষ করে হামাসকে নির্মূল করে দেওয়া। শুরু থেকেই পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসরায়েলের এই আক্রমণকে প্রায় নিঃশর্তভাবে সমর্থন দিয়ে গেছে। তারা বলেছে, এটা ইসরায়েলের ‘আত্মরক্ষার জন্য’ বৈধ পদক্ষেপ।

কিন্তু পশ্চিমাদের এই সমর্থন এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে গাজাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার পরও ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভাঙতে পারেনি ইসরায়েল। গাজা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো তাদের কর্মকাণ্ড সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। তারা অব্যাহতভাবে রকেট ছুড়ছে। সামরিক বিবেচনায় জটিল অভিযানও তারা পরিচালনা করছে।

যেমন গত মাসে গাজার বেইত হানুনের কাছে তারা হামলা চালিয়েছে। হামাস যোদ্ধারা একটি সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে ইসরায়েলি সামরিক যান লক্ষ্য করে আক্রমণ করে। এতে তিনজন ইসরায়েলি সেনা আহত হয়। উদ্ধারকারী বাহিনী সেখানে পৌঁছালে হামাস যোদ্ধারা বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে একজন ওয়ারেন্ট অফিসার নিহত হন।

ইসরায়েল বারবার দাবি করে আসছে, বেইত হানুনের মতো এলাকাগুলো ‘নিরপেক্ষ’ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক আক্রমণ একটা কৌশলগত বার্তা দিল। সেটা হলো, বিরামহীন বোমা হামলা ও সীমাহীন দখলদারির মধ্যেও হামাস গোয়েন্দা তথ্য জোগাড় করতে ও লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে হামলা করতে সক্ষম। এভাবেই তারা বিশ্বের সবচেয়ে প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা একটা সেনাবাহিনীকে কৌশলে ঘায়েল করে চলেছে।

এখানেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে গাজা যুদ্ধের তুলনাটা প্রাসঙ্গিক। সেই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ছিল—উন্নত অস্ত্রশক্তি ও বাইরের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও মতাদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত প্রতিরোধী শক্তিকে পরাজিত করা যায় না। গাজা যুদ্ধ ক্রমাগত ইসরায়েলের ভিয়েতনাম যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে।

গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের ব্যর্থতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির রাজনীতি ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার গভীরে সেটা বিস্তৃত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে পড়ছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ এবং একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানো চলছে। গাজায় বিপর্যয়ের কারণে সমালোচনার যে ঝড় উঠছে, সেটা সামাল দিতে নেতানিয়াহু এখন দোষ চাপাচ্ছেন অন্যদের ঘাড়ে। যেমন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের ওপর তিনি দোষ চাপিয়েছেন। সবচেয়ে নাটকীয় বিরোধটা দেখা গেছে গোয়েন্দা খাতে।

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট হারেৎসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইসরায়েল এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গৃহযুদ্ধের কাছাকাছি।’ এই প্রেক্ষাপটে হামাসের সাম্প্রতিক আক্রমণ সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও বেশি কিছু। এটা ভেতর থেকে ইসরায়েলে যে ফাটল ধরেছে, সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এই ভাঙন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরেও পৌঁছে গেছে। দ্য নিউ আরব–এর খবর জানাচ্ছে, সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ বেড়ে চলেছে।

ইসরায়েলের জন্য আরেকটি নাজুক জায়গা হলো গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ। যুদ্ধ পরিচালনার খরচ, অবরোধ বজায় রাখা ও আঞ্চলিক হুমকির জবাব দিতে গিয়ে ইসরায়েলি অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে।

যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৬০ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। ইসরায়েলের মূল খাতগুলোর ওপর এই অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। পর্যটন খাতে ধস নেমেছে। এই খাত ইসরায়েলের রাজস্ব আয়ের বড় উৎস। সীমান্তের ওপার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির কারণে ইসরায়েল এখন ব্যবসা বা ভ্রমণের জন্য নিরাপদ গন্তব্য নয়।

এটা পরিষ্কার যে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির প্রধান মিত্রদের বিভাজনটা ক্রমবর্ধমান হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি আমদানির ওপর শুল্ক কমানোর আহ্বানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বছরে চার বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করে। ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ট্রাম্প হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি এই সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানিয়েছেন।

সবকিছুর বিচারে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এই যুদ্ধের সঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাদৃশ্য দিনে দিনে স্পষ্ট হচ্ছে। বিশ্ব এটা মেনে নিক বা না নিক, গাজা এখন ইসরায়েলের ভিয়েতনাম হয়ে উঠেছে।

মেহমেত রাকিপওগ্লু তুরস্কের মারদিন আরতুকলু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

- মিডলইস্ট আই ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলে বিভাজন বাড়ছে
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলে বিভাজন বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স

ঘড়ির চাপে কি আমাদের ইবাদতের ক্ষতি হচ্ছে by মনযূরুল হক

আপনার কবজির ঘড়ি বা কম্পিউটারের কোণে ঝলকানো সংখ্যাগুলোর দিকে তাকান। যদি বলা হয়, এই নিরীহ চেহারার সময়-নির্দেশক সংখ্যাগুলো আপনার জীবনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, যা আপনি কখনো কল্পনাও করেননি? হয়তো অবাক হবেন, কিন্তু এই যান্ত্রিক ঘড়ি আমাদের আধ্যাত্মিকতা, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য ও কাজের ধরনকে বদলে দিয়েছে। এটি কেবল সময় মাপার যন্ত্র নয়, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অদৃশ্য শাসক।

সময়ের প্রাকৃতিক ছন্দে যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ

কল্পনা করুন, আপনি উপনিবেশকালের আগে মুসলিম বিশ্বের কোনো গ্রামে জন্মেছেন। তখন সময় মাপা হতো মসজিদের প্রাঙ্গণে সূর্যঘড়ির মাধ্যমে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের তাল রাখত সময়। সময় ছন্দ মিলাত প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত সূর্য, চাঁদ আর নামাজের আজানের সুরে। ড. বারবারা ফ্রেয়ার স্টোয়াসার তাঁর বই টাইম স্টিকস: হাউ ইসলাম অ্যান্ড আদার কালচারস হ্যাভ মেজার্ড টাইম-এ বর্ণনা করেছেন, তখন মানুষ নামাজের সময় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের আলোকে সময় নির্ধারণ করত। কোনো যান্ত্রিক যন্ত্র তাদের তাড়া করত না।

কিন্তু ১৩ শতকে ইউরোপের মঠগুলোতে যান্ত্রিক ঘড়ির আবির্ভাব ঘটে। ঐতিহাসিক ডেভিড ল্যান্ডেস তাঁর রেভোল্যুশন ইন টাইম বইতে বলেছেন, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা যখন আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি নিয়ে এসেছিল, তখন তারা ঘড়িটাওয়ার ও হাতঘড়ি প্রবর্তন করে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ছিল না, মনন দর্শনেও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এর ফলে সময়ের ধারণা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান্ত্রিক নির্ভুলতার দাসে পরিণত হয়।

আধ্যাত্মিকতার ওপর ঘড়ির প্রভাব

আপনি কি কখনো নামাজে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আনন্দ অনুভব করেছেন? এটা তখনই সম্ভব, যখন আপনার ওপর সময়ের চাপ নেই। আজ মসজিদে ঢুকলেই দেয়ালে ঘড়ি আর নামাজের কাউন্টডাউন। এটি আমাদের নামাজকে তাড়াহুড়া করিয়ে দেয়। ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর আল-ওয়াবিল আস-সায়্যিব-এ লিখেছেন, প্রাচীন মুসলিমরা ইবাদতে এত মগ্ন থাকতেন যে সময়ের অস্তিত্বই ভুলে যেতেন।

জুমার খুতবা, যা একসময় সম্প্রদায়ের জন্য প্রাণবন্ত আলোচনার মঞ্চ ছিল, এখন ১৫-২০ মিনিটের একটি সময় বাঁধা অনুষ্ঠান। রমজানের তারাবিহ নামাজও এক পারা থেকে কয়েক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে সময়ের চাপে। এই যান্ত্রিক সময় আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে সংকুচিত করছে।

সম্পর্কের ওপর সময়ের চাপ

‘চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে!’—এই কথাগুলো আমাদের পরিবারে অহরহ শোনা যায়। সমাজবিজ্ঞানী জুডি ওয়াজম্যান তাঁর প্রেসড ফর টাইম-এ বলেন, সময়ের এই চাপ পরিবারে উদ্বেগ ছড়ায়। ড. উইলিয়াম ডোহার্টির গবেষণা দেখায়, সময়ের তাড়ায় পিতা–মাতা-সন্তানের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা তাড়াহুড়ায় সন্তানের সঙ্গে মূল্যবান মুহূর্ত হারাই।

নৃতত্ত্ববিদ থমাস হিল্যান্ড এরিকসেন তাঁর টাইর‍্যানি অব দ্য মোমেন্ট-এ বলেন, পারিবারিক সমাবেশ এখন কঠোর সময়সূচির অধীন। আমাদের স্মৃতিগুলো তখনই গভীর হয়, যখন আমরা সময়ের তাড়না ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে থাকি।

স্বাস্থ্য ও কাজের ওপর প্রভাব

যান্ত্রিক ঘড়ির চাপ আমাদের কাজের প্রবাহ নষ্ট করে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা বলছে, সময়ের চাপ শারীরিক বিপদের মতো স্ট্রেস সৃষ্টি করে। ড. রবার্ট লেভিন তাঁর আ জিওগ্রাফি অব টাইম-এ ‘ক্লক-টাইম সিকনেস’ নামে একটি আধুনিক সমস্যার কথা বলেন, যা দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

মিহালি সিকসেন্টমিহালির গবেষণা দেখায়, সময়ের তাড়না আমাদের কাজের প্রবাহ ভেঙে ফেলে, যা আমাদের কর্মক্ষমতা ও আনন্দ নষ্ট করে। জাপানে ‘কারোশি’ বা অতিরিক্ত কাজে মৃত্যুর ঘটনা এই যান্ত্রিক সময়ের চাপেরই ফল।

সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন

যান্ত্রিক ঘড়ি একটি সরঞ্জাম, আমাদের প্রভু নয়। দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান বলেন, ‘আমরা আমাদের সরঞ্জাম গঠন করি, তারপর সেগুলো আমাদের গঠন করে।’ ঘড়ি আমাদের সময়ের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে। সাইয়্যেদ হোসেন নাসর তাঁর ট্র্যাডিশনাল ইসলাম ইন দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড-এ বলেন, যান্ত্রিক সময় গ্রহণ আমাদের ঐশ্বরিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

ব্যবহারিক পদক্ষেপ

১. সময়ের চাপ সম্পর্কে সচেতনতা: সময়ের চাপ কখন অনুভব করেন, তা লক্ষ করুন। এটি কি প্রয়োজনীয়? নাকি অভ্যাসগত? অপ্রয়োজনীয় চাপের সময় জিকির বা কোরআন পড়ুন। ২. ঘড়িমুক্ত সময়: সপ্তাহান্তে ঘড়ি না পরে কোরআন পড়ুন বা প্রকৃতিতে হাঁটুন। দেখুন, আপনার স্ট্রেস কমে কি না। ৩. সম্পর্কের নিরাময়: দেরির জন্য বিরক্ত হলে থামুন। এটি কি সত্যিই চাপ, ভাবুন তো? পরিবারের সঙ্গে সময়ের চাপ নিয়ে আলোচনা করুন। ৪. আল্লাহর সময়ের সঙ্গে সংযোগ: সূর্যের অবস্থান দেখে নামাজের সময় নির্ধারণ করুন। হিজরি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করুন। ৫. সীমানা নির্ধারণ: প্রয়োজনীয় কাজে ঘড়ি ব্যবহার করুন, তবে অপ্রয়োজনীয় চাপ এড়ান।

শেষ কথা

কল্পনা করুন, একটি মসজিদে কোনো ঘড়ি নেই। প্রথমে হয়তো অস্বস্তি হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে আপনি নামাজে মগ্ন হবেন। ঘড়ির চাপ ছাড়া নামাজ হবে শান্ত, মনোযোগী। বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হবে অতুলনীয়। সময়ের চাপ এলেও ই-মেইল ঠিকানা দিয়ে তা মোকাবিলা করুন। আমাদের লক্ষ্য ঘড়িকে প্রভু নয়, সেবক হিসেবে ব্যবহার করা। এভাবে আমরা সময়ের সঙ্গে সুস্থ ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

* প্রোডাক্টিভ মুসলিম ডটকম অবলম্বনে

ইসরায়েলকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও কানাডার হুঁশিয়ারি; গাজায় কি পরিবর্তন আসছে

ইংল্যান্ড বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইউরোপীয় নেতারা ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন গাজায় তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতারা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ‘দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা’ করেছেন। হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যদি ইসরায়েল তাদের আক্রমণ বন্ধ না করে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সাহায্য সরবরাহের ওপর বিধিনিষেধ না তুলে নেয়, তাহলে তাঁরা ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেবেন।

গত সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন যে তাঁরা অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেন। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। ইসরায়েলি অভিযানে প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই বিবৃতি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নেতানিয়াহুর সরকার গাজায় ধ্বংসাত্মক অভিযান শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলো তখন ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল। সেই অভিযানে ৫৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কায়া কাল্লাস বলেছেন যে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে, কিন্তু তাদের বর্তমান কার্যক্রম আত্মরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

তাহলে পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিতে পারে। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক গাজা আক্রমণ কি তাদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করেছে?

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা কী বলেছে

এই তিন দেশের নেতারা ইসরায়েলের নতুন করে গাজা অভিযানের সমালোচনা করেছেন। ফিলিস্তিনিদের ‘মানবিক দুর্ভোগ’কে ‘অসহনীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা আরও বলেছেন যে ‘যদি ইসরায়েল এই নতুন সামরিক অভিযান বন্ধ না করে এবং মানবিক সাহায্যের ওপর তাদের বিধিনিষেধ না তুলে নেয়, তবে আমরা প্রতিক্রিয়ায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেব।’ তাঁরা ইসরায়েলি সরকারের সম্প্রতি ব্যবহৃত জঘন্য ভাষার নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন যে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন।

এই তিন পশ্চিমা নেতা বলেছেন যে তাঁরা ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের সমর্থন করলেও, ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া সীমা ছাড়িয়ে গেছে, ‘নেতানিয়াহুর সরকার এই গুরুতর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকব না।’

মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এটি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সমর্থনকারী বসতি স্থাপনকারীদের এবং সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ ও অবৈধ বসতিগুলোর প্রতি সরকারের সমর্থন ‘আপনার (ইসরায়েল) সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করছে’, বলেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি।

তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে সোমবার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় ৯টি সাহায্য ট্রাক (ত্রাণের ট্রাক) প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। ইসরায়েল সেখানে খাদ্য বা ওষুধ—কিছুই ঢুকতে দিচ্ছে না। তবে জাতিসংঘের ত্রাণপ্রধান টম ফ্লেচার সামান্য কয়েকটি ত্রাণের ট্রাক ঢুকতে দেওয়াকে ‘সমুদ্রের তুলনায় একটি ফোঁটা’ বলে অভিহিত করেছেন।

মঙ্গলবার ফ্লেচার সতর্ক করেছেন যে যদি সাহায্য না পৌঁছায়, তাহলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ১৪ হাজার ফিলিস্তিনি শিশু মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ; অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন ইসরায়েলি অবরোধের কারণে অনাহারের মুখোমুখি। ক্ষুধার জ্বালায় অনাহারে থাকা ফিলিস্তিনিরা পশুর খাদ্য এবং বালু মেশানো ময়দা খেতে বাধ্য হচ্ছেন।

ইউরোপের এসব প্রতিক্রিয়ার পর ইসরায়েল গাজায় প্রবেশের জন্য প্রায় ১০০টি অতিরিক্ত ট্রাক অনুমোদন করেছে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতারা বলেছেন যে তাঁরা ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সব চেষ্টার বিরোধিতা করেন। কারণ, এ রকম চেষ্টা ‘অবৈধ ও একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের উভয়ের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে’। ‘আমরা আরও পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করব না। তার মধ্যে নিষেধাজ্ঞাও থাকতে পারে’, তাঁরা বলেছেন।

কিন্তু এ কথাও সত্য যে ইসরায়েলকে ধমক দেওয়া এই দেশগুলো কেউই ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করেনি। গত ১৯ মাসে যুক্তরাজ্য থেকে ইসরায়েলে কত অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রতিদিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনারগার্ড মঙ্গলবার বলেছেন যে গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে তাঁর দেশ ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার জন্য চাপ দেবে। এ কথা বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে।

এদিকে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেছেন যে ইসরায়েলের ‘অন্ধ সহিংসতা’ এবং মানবিক সহায়তার অবরোধ শেষ হওয়া উচিত।

সোমবার ২৪টি দেশ, যেগুলোর বেশির ভাগই ইউরোপীয়, একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে গাজায় বাধাহীন মানবিক সহায়তা পুনরায় শুরু হওয়া উচিত। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সঙ্গে ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা আল–জাজিরাকে বলেছে যে নেদারল্যান্ডস এই মাসের শুরুতে অ্যাসোসিয়েশন চুক্তির পর্যালোচনা চেয়েছিল। বিশেষ করে চুক্তির উভয় পক্ষকে মানবাধিকার সম্মান রক্ষার অংশটি। এই পদক্ষেপ বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পর্তুগাল, সুইডেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্র সমর্থন করেছে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া ইংরেজির সংক্ষেপিত অনুবাদ