Monday, September 1, 2014

রাজনৈতিক নিরাপত্তার সর্বোত্তম নিশ্চয়তা হলো গণতন্ত্র by আফসান চৌধুরী

গণতন্ত্র কোন একক কিছু নয়। এর অনেক পর্যায় ও স্তর আছে। মাঝে মাঝে, অনেক জায়গায় এর কিছু অংশ, যেমন অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও সামাজিক গণতন্ত্র ব্যর্থ হয় বা খুব দ্রুত পতিত হয়, সেখানে এটা রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়। আমরা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশে এটা দেখেছি। সেখানে অর্থনৈতিক সমতার একটি মাত্রা ছিল। কিন্তু তা রাজনৈতিক গণতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত ছিল না। ফলে গোটা প্রক্রিয়াটাই ভেঙে পড়ে। এই সময়ের মাঝে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জীবনহানি ঘটে। সেখানে থাকা অবস্থায়, গোটা সরকার ব্যবস্থা ভেঙে যাবার পর মারাত্মক অর্থনৈতিক অবস্থার ভয়াবহতা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। এর অসহায় শিকার, যেমন, অধ্যাপকের স্ত্রীরা রাস্তায় ভিক্ষা করছিলেন, তরুণীরা পতিতাবৃত্তি বেছে নিচ্ছিলেন, অপরদিকে তাদের মায়েরা হয়তো কারো কাছে বাসায় খাবারের জন্য কড়া নাড়ছিলেন। এটা সম্ভবত চরম অসহায় কারো পরিস্থিতির উদাহরণ। কিন্তু সাধারণ ভেঙে পড়াটা সবার ক্ষেত্রেই হয়েছিল। পাশাপাশি চরম ও নির্মমভাবে টাকা বানানোয় লিপ্ত ছিল অনেকে। মার্ক্সিস্ট রাষ্ট্রে প্রোথিত লেনিনবাদের দ্বিধান্বিত স্বপ্নের দ্বারা নির্মম মৃত্যু ঘটেছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের। দুই বা ততধিক গণতন্ত্রের মাঝে ভারসাম্য আনয়ন, যা সরকার ব্যবস্থার জন্য অতিপ্রয়োজনীয়, তা বুঝতে পারেনি সেই রাষ্ট্র। তাই যখন রাজনৈতিক গণতন্ত্র থাকবে না, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক গণতন্ত্রের প্রয়োজনও থাকবে না, অবধারিতভাবে মৃত্যু ঘটবে মুক্তচিন্তার। যা ঘটে, যখন ঘটে, তা সবার জন্য দৃশ্যমান হয়। তা কেবলমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার মধ্যেই নয় বরং বর্তমান রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশসমূহেও দেখা যায়। গণতন্ত্রের অভাব, দুর্নীতি ও সামরিকায়নের উত্থানের ফলে সেখানে স্বৈরতন্ত্রই সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। যেই ভোদকা পার্লামেন্টের বিকল্প নয়, যা শক্তিসমূহের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তা কেবলমাত্র পরবর্তী অশান্তির জন্য জায়গা খালি করে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অভাবের সঙ্গে এই পূর্বাভাসের মূল লুকিয়ে আছে। প্রচলিত সমাজতন্ত্রবাহী চীনের ইতিমধ্যেই মৃত্যু ঘটেছে। সেখানেও বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে সংঘর্ষ বাধছে। কারণ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিচালিত হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে, যেটি নিজেই একটি মুক্ত প্রতিষ্ঠান নয়। এর ফলে সেখানে দুর্নীতির বিস্ফোরণ ঘটছে। বিভিন্ন নেতা, এমনকি পলিটব্যুরোর সদস্যরা পর্যন্ত দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছেন। গ্রেপ্তারও হচ্ছেন। কমিউনিস্ট পার্টির গোপন, জবাবদিহিতাহীন ও স্বেচ্ছাচারী সরকারের সঙ্গে পুঁজিবাদী মুক্তবাজার একসঙ্গে থাকতে পারে না। এই ধরনের প্রতিটি পরিস্থিতি সংঘর্ষের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এটি রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রক্রিয়া বা চেষ্টাকে ব্যাহত করে ও শেষ পর্যন্ত পরাজিত করে। সরকারের উদ্দেশ্যের মধ্যে অনেক বাস্তবতা আছে। কিন্তু একটি উন্নত সামাজিক-অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধন থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত কোন সমাজই অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ব্যতীত তা অর্জন করতে পারেনি। যেই রোগে সমাজতান্ত্রিক সমাজগুলো অতীতে ভুগেছে, সেই একই জীবাণু তারা এখনও গ্রহণ করছে। তারা বহুত্ববাদ মেনে নিচ্ছে। বিভিন্ন ধারণা, এমনকি সাংঘর্ষিকগুলোও, একসঙ্গে থাকার কথা তাদের পুস্তকেও নেই। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই বিন্যাসই হয়ে আসছে। নাৎসিবাদী জার্মানি- একক জাতি, সোভিয়েত ইউনিয়ন- রাজনীতিতে এক, এসব হচ্ছে এই ধরনের মনোভাবের ভাল উদাহরণ। ভিন্ন মতাবলম্বীদের মানসিক রোগী বলে সার্টিফিকেট দেয়ার সঙ্গে এক সময় জড়িত ছিলেন এমন একজন চিকিৎসকের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তার কাছে জানতে চেয়েছিলামÑ কেন তিনি এমনটা করেছেন। তিনি বললেন, আমরা মনে করি এটা একটা চমৎকার ব্যবস্থা। সুতরাং যে-ই এর বিরোধিতা করবে তা হবে মানসিক দিক থেকে অসুস্থতা। তিনি এখন কি মনে করেন আমি জানতে চাইলাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন এবং বললেন, আপনাকে বুঝতে হবে যে- আর কি সব ব্যবস্থা আছে আমরা তা জানি না। সোভিয়েত ব্যবস্থা বাদে অন্য কোন ব্যবস্থা যে থাকতে পারে এ বিষয়ে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। তিনিই বুঝতে পেরেছেন যে, আদর্শ ও চিকিৎসা বিজ্ঞান কখনও একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা উচিত নয়।
আমাদের সমাজের প্রায় সব স্তরে অসহিষ্ণুতার একই রকম বিদ্যমান। বিনিময়ে আমরা আমাদের লোকজনকে কিছুই দিইনি। এর সমস্যার মূলে রয়েছে উন্নত প্রতিষ্ঠান, যা বহুমাত্রিক গণতন্ত্রকে সমর্থন করে। এসব সমস্যার মধ্যে সবার আগে যে বিষয়টি আসে তা হলো নির্বাচনী গণতন্ত্র। এটা এজন্য যে, রাজনীতিতে সামান্য গণতন্ত্র থাকলেও একটি চমৎকার নির্বাচন করা সম্ভব। ১৯৯০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়টিই চলছে বাংলাদেশে। নির্ধারিত নির্বাচনের সামান্য আগে ২০০৭ সালে আমি একটি গবেষণা করি। তাতে দেখা যায় যে, ১৯৯০-এর পরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে জনগণ অত্যন্ত খুশি। তবে তারা মনে করেন, তেমন নির্বাচন কমই হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে নির্বাচন সম্পর্কযুক্ত হতে পারে না। এর সঙ্গে পার্লামেন্টের কর্মকা-েরও কোন কিছু করার নেই। ১৫তম সংশোধনীর ফলে নির্বাচনকেন্দ্রীক রাজনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আসল কথা হলো- সব সরকারের আমলেই পার্লামেন্ট বসলেও তা থেকেছে অকেজো। বিনিময়ে পাওয়া গেছে উদ্দেশ্যহীন কিছু। এর ফলে বিগত ও বর্তমান পার্লামেন্ট তা থেকে আলাদা কিছু নয়। যে কোনভাবেই হোক বিরোধীরা অনুপস্থিত। তাহলে বাংলাদেশের কোথায় আমরা গণতন্ত্র খুঁজবো? রাজনৈতিক গণতন্ত্র বেশি বা কম অনুপস্থিত। বিরোধী দলবিহীন একটি রাজনৈতিক জীবনে আটকে আছে বর্তমান সরকার। এটা শুনতে কঠিন লাগে, ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব সব দলকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। তারা তা করেনি। ফলে এতে সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির মতো রাজনীতিতে অপরিপক্ব একটি দলের। তারা ফাঁদে পা দিয়েছে এবং দূরে সরে গেছে। আওয়ামী লীগ যথার্থই ধারণা করতে পেরেছে যে, রাজনীতি নিয়ে জনগণ অতো মাথা ঘামায় না। তারা নির্বাচনের ইস্যুতে রাজপথে নামবে না। এমনকি তারা নির্বাচনের পরেও রাজপথে নামবে না। আওয়ামী লীগের ওই ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এমন বিজয় নিয়ে বিপদ আছে তারা। এখন যেসব অসন্তোষ, অভিযোগ, সমস্যার কথা পার্লামেন্ট থেকে প্রচার করা হয় না, তা প্রচার হচ্ছে মিডিয়ায়। একটি রাষ্ট্রের অব্যাহত চলার পথে সেটা হচ্ছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকল্প। দৃশ্যত, উচ্চপর্যায়ের ক্ষোভের মুখে পড়েছে মিডিয়া। তাই মিডিয়া যাতে অনুমোদিত সীমার বেশি সমালোচনা করতে না পারে সে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এটা অপরিহার্য যে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাউন্টার থেকে কাউন্টেস্ট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। রাজনৈতিক উল্লেখ করার মতো বিরোধী দলের অনুপস্থিতির অর্থ হলো তার স্থান দখল করে মিডিয়া। এতে যা ঘটতে পারে তা আগেই বলা হয়েছে। এতে আন্ডারগ্রাউন্ড ও অন্যান্য স্থানে প্রতিবাদ বিক্ষোভ গড়ে উঠবে। সেই প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিকার অর্থেই অনেকটা কঠিন। তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। সর্বস্তরে গণতন্ত্র হলো প্রত্যেকের জন্য রাজনৈতিক নিরাপত্তার সর্বোত্তম নিশ্চয়তা। বহুমাত্রিক গণতন্ত্র ছাড়া কোন রাষ্ট্রই টিকে থাকেনি। গণতন্ত্র না থাকার কারণে পুরো সমাজতন্ত্রের বিলোপ ঘটেছে। কার্যকর একটি গণতন্ত্রের লেবাস না পরলে বাংলাদেশ কতদূর যেতে পারবে- এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে ভবিষ্যত।

আফসান চৌধুরী, সাংবাদিক ও গবেষক
নিউ এজ পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার অনুবাদ

স্ত্রীর অদম্য যৌন চাহিদায় বিবাহ-বিচ্ছেদ!!

স্ত্রীর আক্রমণাত্মক, একগুঁয়ে মনোভাব ও অদম্য যৌন আকাঙ্খার কারণে স্বামীর বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করল আদালত। মুম্বইয়ের একটি পারিবারিক আদালতে স্ত্রীর জেদি, একগুঁয়ে, আক্রমণাত্মক মনোভাব ও অদম্য যৌন চাহিদার কারণ দেখিয়ে গত জানুয়ারিতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কারণে-অকারণে ঝগড়া বাধিয়ে তার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছেন স্ত্রী। তার পিটিশনকে চ্যালেঞ্জ করেননি তার স্ত্রী। আদালত বলেছে, যেহেতু স্ত্রী আদালতে হাজিরা দেননি সেহেতু স্বামীর সাক্ষ্যকেই মেনে নিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করছে। ২০১২ সালের এপ্রিলে বিয়ে হয়েছিল ওই দম্পতির। আদালতে ওই ব্যক্তি আবেদনে বলেন, অদম্য যৌন চাহিদার কারণে তার স্ত্রী প্রথম থেকেই তাকে হেনস্থা করছেন। তার আরও অভিযোগ, যৌন চাহিদা চরিতার্থ করতে স্ত্রী তাকে বিশেষ ঔষধ সেবন ও মদ্যপান করতে বাধ্য করিয়েছেন। স্বামীর আরও অভিযোগ, অস্বাভাবিক যৌনক্রিয়ার ব্যাপারেও তার স্ত্রী জোর খাটিয়েছেন। আর এসব করতে অস্বীকার করলেই স্ত্রী তাকে গালাগালি করতেন। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই স্ত্রীর চাপে নতিস্বীকার করেছিলেন। আদালতে ওই ব্যক্তি আরও জানিয়েছেন, তিনি দিনে তিনটি শিফটে কাজ করার পর খুবই ক্লান্ত হয়ে যেতেন। কিন্তু তার পরোয়া না করেই যৌন আকাঙ্খা পূরণে স্ত্রী তাকে বাধ্য করতেন। কোনও কারনে অস্বীকার করলে তার স্ত্রী অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ারও হুমকি দিতেন। কিন্তু পরিস্থিতি একেবারে সহ্যের বাইরে চলে যায় ২০১২-র ডিসেম্বরের পর থেকে। ওই ব্যক্তির অভিযোগ, পেটে ব্যাথা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেও তখন স্ত্রী নিজের বোনের বাড়ি চলে যায়। স্বামীর বাড়িতে ফেরে দুই সপ্তাহ পর। চিকিৎসকরা স্বামীকে কিছুদিনের জন্য যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে তাকে বাধ্য করেন। পর্যাপ্ত পরিশ্রমের অভাবে তার শরীর আরও খারাপ হলেও স্ত্রীর অস্বাভাবিক চাহিদা থেকে নিষ্কৃতি মেলেনি। অ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর ছাড়া পেতেই স্ত্রী দাবি করেন, তার বোনের বাড়িতে থাকতে হবে। কিন্তু সেখানেও ছাড় মেলেনি স্বামীর। প্রতিদিনই তাকে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে স্ত্রী বাধ্য করতেন বলে স্বামীর অভিযোগ। স্বামী আরও জানিয়েছেন, স্ত্রীকে তিনি মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এতে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে স্ত্রী তাকে অন্য কাউকে কিছু না বলার ব্যাপারে সতর্ক করে হুমকি দেন। শেষপর্যন্ত প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই তিনি বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা করেছেন বলে পিটিশনে দাবি করেছেন ওই ব্যক্তি। সূত্র: এবিপি আনন্দ

প্রতিকি ছবি

কেন পড়ব কাজীর কবিতা? by সোহেল হাসান গালিব

এ কথা আজ স্পষ্টভাবেই বলা যায়, বাংলা কবিতার মূলধারা নজরুলের কাব্যপ্রয়াস থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমুখে সরে এসেছে। আজকের তরুণ কবির অভিনিবেশের প্রান্তিক বিন্দুতেও আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় তাঁকে। কবিদের এই অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত কবিতার নতুন সম্ভাবনা কোথায়, কীভাবে জাগিয়ে তুলছে, সেই প্রশ্ন এখানে তুলছি না। আমরা শুধু দেখতে পাচ্ছি, জনপ্রিয়তার বিপরীতে এল জনবিচ্ছিন্নতা, অধিগম্যতার পাল্টা পথে গহন নির্জনতা। সহজ কথায়, এটা বাংলা কবিতার একটি দশামাত্র, বৈশিষ্ট্যসূচক কোনো নির্দেশনা নয়। তবু যদি একে সংকট হিসেবে মেনে নিতে পারি, তবে অনুসন্ধানী মন নিয়ে আমাদের একবার পেছন ফিরে তাকাতেই হবে। অর্থাৎ, যা ফেলে এসেছি, তাকে আবার যাচাই করে দেখা।

নজরুলপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন অগ্নিবীণা হাতে নিয়ে আমরা বরং একটা চিহ্নসূত্র খুঁজে বের করতে পারি, যা থেকে হয়তো আজকের কবিতার বিচ্যুতি নিয়ে খানিকটা আলোচনার দিকে এগোনো যাবে। এ কাব্যের কিছুদূর মাত্র অগ্রসর হলেই আমরা বুঝতে পারি, আগুন ও বীণা উভয়ই আমাদের সামনে উপস্থিত। সহসা মর্মে জাগে উদ্দীপনা, শ্রবণে ঝংকার। বাংলা কবিতায় এটা কি সত্যিই অভিনব ছিল?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মেঘনাদবধ মহাকাব্যের প্রথম সর্গে ভণিতায় বলেছিলেন: ‘গাইব, মা, বীররসে ভাসি,/ মহাগীত।’ কিন্তু তিনি তাঁর এই প্রতিশ্রুতি ঠিক পর মহূর্তেই বিস্মৃত হয়েছেন। একরকম শোকগাথার রূপ লাভ করেছে কাব্যটি। এতে মহাকাব্যের শর্তভঙ্গ হয়েছে কি হয়নি, তা আমাদের আলোচ্য নয়। আমরা বলতে চাইছি, বাঙালির নিজস্ব কাব্যে, আখ্যানে, গীতিকা-পালায় বীরগাথার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বীরত্বব্যঞ্জক চরিত্রও প্রায় অনুপস্থিত। মধুসূদন শেষ পর্যন্ত এরই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। যে কারণে তিনি রাবণের পক্ষাবলম্বন করেন, সেই একই কারণে রবীন্দ্রনাথও গিয়ে দাঁড়ান কর্ণের পাশে; বলেন: ‘যে পক্ষের পরাজয়/ সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে করো না আহ্বান।/ রাজা হোক, জয়ী হোক পাণ্ডবসন্তান।/ আমি রব নিষ্ফলের হতাশের দলে।’
এই যে মানবিক কাতরতা নিয়ে পরাজিতের পক্ষে দাঁড়ানো, তার কারণ কি জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক পরাজয়? বারবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া? ঔপনিবেশিক বাস্তবতা? নিগূঢ় হিন্দু-মনস্তত্ত্ব? সে যা-ই হোক, বাংলা সাহিত্যে নজরুলই প্রথম ব্যতিক্রম, আদিম উন্মাদ, যিনি এসেছিলেন বীরগাথা রচনার জন্য। শিল্প সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্বচ্ছ: ‘আজ আর এই পোড়া দেশে মড়ার শ্মশানভূমিতে “শুধু হাসি খেলা, প্রমোদের মেলা” কাব্যকুঞ্জের মধু গুঞ্জন শোভা পায় না, সে নির্লজ্জ অভিনয় নিদারুণ উপহাসের মতো প্রাণে এসে বেঁধে। আজ চাই মহারুদ্রের ভৈরব গর্জন, প্রলয় ঝঞ্ঝার দুর্বার তর্জন, দুর্দম দুর্মদ উচ্চৈঃশ্রবা ঐরাবতের প্রমত্ত বিপুল রণ-উন্মাদ আর তাদের হ্রেষা বৃংহণের গগনবিদারী প্রচণ্ড নাদ। আজ অলক-তিলকের সুচারু বিন্যাস মুছে ফেলে ধক্ ধক্ জ্বলন্ত বহ্নিশিখার মতো ললাটে ভস্ম ত্রিপুণ্ড্রক পরতে হবে।’ (আজ চাই কি)
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মহারুদ্রের ভৈরব গর্জনে শুধু নয়, নজরুল নিজেও যখন কবিতায় হাসি-খেলা, প্রমোদের মেলা বসিয়েছেন, তখনো একটা বড় সম্বল ছিল ঝংকার—ধ্বনিব্যঞ্জনা তৈরির নিজস্ব এক শব্দগাণ্ডিব। স্মরণ করুন: ‘কুহেলীর দোলায় চড়ে/ এল ওই কে এল রে...।’ অর্থাৎ, ধ্বনি ও স্বরাঘাত তাঁর কবিতায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো জড়িয়ে আছে। কেবল এই শক্তিতে ভর করে দুটি ভিন্ন ভাষার বাগ্ভঙ্গিকে একসঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছেন কত অনায়াসে, তার একটি উদাহরণ: ‘কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝিমাল্লা/ দাঁড়ি–মুখে সারিগান লা শরীক আল্লা।’
প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলা কবিতায় যে ধ্বনির উল্লাস জেগে উঠেছিল, আজ তা প্রায় অবসিত। আধুনিকতাবাদ একে অনিবার্য করে তুলেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধ্বনিবিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা কবিতার বিশেষ কোনো সম্ভাবনাকে ত্যাগ করে এসেছি কি?
২.
শব্দ কেবল তার অর্থ দিয়েই যদি আমাদের সংবেদনকে নাড়া দিত, তবে ‘টকটকে লাল’ কথাটা লাল রঙের বাইরে বিশেষ কোনো অভিঘাতই ফেলতে পারত না। কারণ, ‘টকটকে’ শব্দটার সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। অতিপরিচিত এই উদাহরণ থেকে শুধু এ কথাই বলতে চাইছি, অর্থের বাইরেও ধ্বনি একটি বিশেষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী মাধ্যম। গদ্যে বিন্যস্ত শব্দগুলো বাক্যে যে অর্থ উৎপন্ন করে, কবিতায় তা বিশেষ স্বর-অভিক্ষেপে তার অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা নিয়ে আসতে পারে।
কিন্তু ধ্বনিকে কেবলই উপরিতলের বিষয় আর বহুজনের মিলিত উদ্যাপনের প্রসাদ ভাবার ফলে আধুনিকতাবাদী মন এক ঝটকায় কবিতাকে সেখান থেকে সরিয়ে এনেছে। কবিতা হইচই বা কোলাহলের বিষয় নয়, তা একাকী নির্জনে নিঃশব্দে অনুভবের চকিত উদ্ভাসমাত্র—এমন আড়ম্বরপূর্ণ উচ্চারণ আমরা অনেক শুনেছি। ফলে, আজকের কবিতার দুর্বোধ্যতা আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়, বরং এ-ই চেয়েছিলাম আমরা। এখন আফসোস হচ্ছে, যখন দেখছি, কবিতা তার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির সব ক্ষমতাই হারাতে বসেছে।
আমাদের আলোচনার প্রতিপাদ্য এটা নয় যে, সব বন্ধ দরজা খোলার একমাত্র চাবি ‘ধ্বনি’। কেবল এটুকু স্বীকার করা, আমরা একটি সম্ভাবনাকে হত্যা করেছি। পাশাপাশি পুনরায় তদন্ত করে দেখা, কোলাহলকে চাপা দিতে গিয়ে আমরা কি প্রকারান্তরে বহুজনের স্বরকে থামিয়ে দিইনি শ্বাসরোধী কবিতার মন্ত্রে?
বহুজনের বহু স্বর কীভাবে একটি কণ্ঠে সংহত হয়ে ম্যাস-ন্যারেটিভ তৈরি করে, তার উদাহরণ আমরা পাব মুখ্যত পুঁথিসাহিত্যে। নজরুলকে তার বিশ শতকী উত্তরাধিকার সরাসরি হয়তো বলা যাবে না, তবে কয়েকটি লক্ষণ টুকে রাখা যেতে পারে।
পুঁথিসাহিত্যের ভাষা প্রধানত গণমুখী। গণমুখিতার দায় অনুভব করেছেন কবি নজরুলও, একটু ভিন্নভাবে। তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানে আমরা জানতে পারছি, কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার কিংবা দেবদেবীর নাম উচ্চারণ করেছেন তিনি মূলত হিন্দু-মুসলমানের ভেদমূলক অভ্যাসের নিগড় ভাঙতে, অর্থাৎ ভাষার ভেতর গুম মেরে থাকা সাম্প্রদায়িকতাকে আঘাত করতে। এতে যে কাব্যের সৌন্দর্য কিছুটা আহত হয়, সে সম্পর্কেও নজরুল ওয়াকিবহাল ছিলেন।
এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য, সাহিত্যের ভাষার একটা স্থাপত্য সৌন্দর্য আছে। এই সৌন্দর্যের সঙ্গে সাবলীলতাকে যদি শর্ত হিসেবে জুড়ে দিই, তবে বলতে হয়, সাবলীলতাও একটা সংস্কার, অভ্যাসের ব্যাপার। আর যেকোনো সংস্কার রাজনৈতিক তৎপরতার মনস্তাত্ত্বিক ফলাফল। কিন্তু সাহিত্য যখন সংস্কার ভাঙতে চায়, তখন সে সাবলীলতাকেও কিছু মাত্রায় আঘাত করে। তাই আপাত সৌন্দর্যহানিও ঘটে। আর এককালের সৌন্দর্যহানি কালান্তরে সম্মানীও পায়। সে বিবেচনায় নজরুল যে ঝুঁকিটি নিয়েছিলেন, তার সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। নইলে আজকের নন্দনতাত্ত্বিক সংকটের মূল আঙিনায় আমরা প্রবেশ করতে পারব না।
৩.
বাংলা কবিতার উদ্ভব ঐতিহাসিক দিক থেকে বিচার করলে আমরা দেখতে পাব, বিভাষী ধর্মতত্ত্বকে পর্যালোচনা করেই এর বুনিয়াদ রচিত হয়েছে। অর্থাৎ, মূলধারার সব মহাপুরাণকে সেদিন লৌকিক পুরাণে রূপান্তর করার কাজই ছিল তার প্রধান দায়। ফলে, কাব্যের অভিমুখ ছিল জনচিত্ত। জনচিত্ত বলে একটি অখণ্ড রূপের ধারণায় উপনীত হওয়া আজকের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। হয়তো তেমন অখণ্ড ছিলও না। ঔপনিবেশিক কালপর্বে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এই জনচিত্ত বহুখণ্ডিত, বহু ধারায় বিভক্ত হয়েছে এবং ঔপনিবেশিকতারই হাত ধরে ব্যক্তি-আমি উঠে দাঁড়িয়েছে জনচিত্তের বিপরীত মেরুতে।
নজরুল এই দুই মেরুতে একটা সংযোগ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, অন্তর্বাস্তবতা-বহির্বাস্তবতা, ব্যক্তি-সমষ্টি, আধুনিক-রোমান্টিক, হিন্দু-মুসলিম, স্বদেশি-বিলাতি, প্রাচ্য-প্রতীচ্য, ধর্ম-প্রগতি, সম্ভ্রান্ত-সর্বহারা—এমনতর বিচিত্র বাইনারি বিচারের এজলাসে বসে তাঁকে দুকূল রক্ষায় প্রাণান্ত হতে হয়েছে। টাল খেয়ে পড়েছেন কখনো-বা। কিন্তু ত্রিশের দশকের কবিদের মতো চৈতন্যে প্রবাসী হতে পারেননি পুরোপুরি। আর তাই তাঁর কবিতায় এলিয়েনেশন কম, জাতীয়তাবাদী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে, শেষাবধি গণসংযোগ একভাবে রক্ষিত হয়েছে বলে।
ভিড়ের মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু অস্তিত্বকে লীন করে দেওয়া যায় না। হয়তো সবাই তা পারে না। শুধু যে কোলাহল জাগে, সে ধ্বনিতরঙ্গে ডুবিয়ে দেওয়া যায় আপন কণ্ঠস্বর। এই উত্তাল ধ্বনিরাশির সন্ধানই আমরা পেয়েছি কাজীর কবিতায়। আর তাকে একদিন অবজ্ঞায় ফেলে এসেছি সন্ধ্যানদীর পারে। এই ভাদ্রে সেই নদী ফের ডাক পাঠাল বুঝি।

জন্মদিনের উপহার এক কোটি পাউন্ড!

প্রিন্স হ্যারি
আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ৩০তম জন্মদিন। আর এবারের জন্মদিনে সম্ভবত সেরা উপহারটাই পেতে যাচ্ছেন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারের সারিতে চতুর্থ প্রিন্স হ্যারি। প্রয়াত মা প্রিন্সেস ডায়ানার রেখে যাওয়া এক কোটি পাউন্ড উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে যাচ্ছেন তিনি। খবর বিবিসির। ১৯৯৭ সালে প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রিন্সেস ডায়ানা। এরপর সিদ্ধান্ত হয়, তাঁর দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি ২৫ বছর পূর্ণ হলে মায়ের সম্পদের একটা অংশ পাবেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়।
আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর ধরে মায়ের সম্পদের লভ্যাংশ ভোগ করছেন প্রিন্স হ্যারি। কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি সম্পূর্ণভাবে ওই সম্পদের অধিকারী হবেন। প্রিন্স হ্যারির এখনকার আয়-রোজগার বলতে সেনাবাহিনী থেকে বছরে পাওয়া ৪০ হাজার পাউন্ড। এ ছাড়া প্রপিতামহী রানি এলিজাবেথের রেখে যাওয়া ২০ লাখ পাউন্ডেরও অধিকারী তিনি। সম্পদের মালিক হতে না পারলেও প্রিন্স হ্যারি ইতিমধ্যে তাঁর মায়ের অলংকারের ভাগ পেয়েছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে ইতিমধ্যে ডায়ানার সব অলংকার ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

বারানসিকে ‘স্মার্ট সিটি’ করতে চুক্তি

নরেন্দ্র মোদি
মন্দিরে প্রার্থনা, নিজ আসন বারানসিকে কিয়োটো শহরের আদলে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর আর ভারতকে ‘সিকেল সেল অ্যানিমিয়া’ মুক্ত করতে জাপানের সহায়তা কামনা—এসব নিয়ে জাপান সফরের দ্বিতীয় দিন কাটালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। খবর এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার। মোদির পাঁচ দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনটি শুরু হয় প্রাচীন কিয়োটো শহরের তোজি মন্দির পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে। বৌদ্ধ মন্দিরটি দর্শনের সময় মোদির সঙ্গে ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। মোদির কিয়োটো সফরের ভিন্ন গুরুত্ব আছে। তিনি লোকসভায় তাঁর নির্বাচনী আসন পবিত্র নগর বারানসিকে কিয়োটোর মতো ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। বারানসি আর কিয়োটোর কিছু মিলও আছে। প্রাচীন শহর বারানসি ‘মন্দিরের শহর’ হিসেবে পরিচিত, কিয়োটোতেও শত শত মন্দির। প্রাচীন কিয়োটো তার ঐতিহ্যকে রক্ষা করেই আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে উঠেছে। পরে কিয়োটোর মেয়র কাদোকাওয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নরেন্দ্র মোদি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন টুইটার বার্তায় জানান, জাপানের সাংস্কৃতিক রাজধানী কিয়োটোকে আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলার সময় কীভাবে এর ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়েছে, তা মেয়র মোদির কাছে তুলে ধরেন। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সম্মিলন ঘটাতে ভারত ও জাপান ‘কিয়োটো-বারানসি’ অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মোদি কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে নোবেল বিজয়ী জাপানি বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। তিনি ভারতে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগ প্রতিরোধে স্টেম সেল গবেষক ইয়ামানাকার সহযোগিতা চান। ভারতের আদিবাসী-অধ্যুষিত যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ আছে, সেখানে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগ বেশি হয়।

কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তানের গণতন্ত্র

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রধান
ইমরান খান গতকাল ইসলামাবাদে কর্মী-সমর্থকদের
উদ্দেশে ভাষণ দেন। শনিবার রাতে পিটিআই ও
পিএটির সমর্থকেরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে
ঢুকে পড়ার চেষ্টা চালায়। ছবি: রয়টার্স
শেষ পর্যন্ত রক্তপাতই ঘটল। ইসলামাবাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকা ‘রেড জোন’ থেকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দিতে শক্তি প্রয়োগ করল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দফায় দফায় আলোচনা সত্ত্বেও চলমান সংকট সমাধানে তেমন কোনো অগ্রগতি না হওয়া এবং সেনাপ্রধানের মধ্যস্থতা নিয়ে ধূম্রজালের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিল সরকার। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে কয়েক দিন ধরেই চলা গুঞ্জনের আগুনে ঘি ঢালল শনিবারের সংঘাত। এই প্রেক্ষাপটে সবার দৃষ্টি এখন সেনাপ্রধান রাহিল শরিফের দিকে। সরকারের পদত্যাগের দাবিতে দুই সপ্তাহ ধরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছিল ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ও আধ্যাত্মিক নেতা তাহির উল-কাদরির দল পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিকের (পিএটি) নেতা-কর্মীরা। দুই নেতা শনিবার রাতে কর্মী-সমর্থকদের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানালে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। এর জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোটা দেশ। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, কোন দিকে যাচ্ছে পাকিস্তান? টানা প্রায় ছয় বছর ধরে চলা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে? নাকি আবারও মুখ থুবড়ে পড়বে জনগণের প্রত্যাশা? ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশটির ক্ষমতায় ছিল সেনাবাহিনী। ৬৭ বছরের ইতিহাসে শুধু গত বছরই নির্বাচিত কোনো সরকার মেয়াদ শেষে নির্বাচিত আরেক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। পিটিআই ও পিএটির অভিযোগ, গত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে।
ইমরান খান ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। কিন্তু ‘নয়া পাকিস্তান’ কী, কীভাবে সেই পাকিস্তান গড়া হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেননি তিনি। আর কাদরি সরকারের ‘পদ্ধতিগত পরিবর্তনের’ দাবি তুলেছেন। কিন্তু তিনিও এর ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তাই তাঁদের আন্দোলন দৃশ্যত মূলত নওয়াজের পদত্যাগের দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অনেকের মতে, এ কারণেই মাত্র এক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নওয়াজের বিরুদ্ধে জনগণ সেভাবে রাস্তায় নামেনি। পাকিস্তানের অনেক সরকারি কর্মকর্তার মতে, সামরিক বাহিনীর ইঙ্গিত পেয়েই সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমেছেন ইমরান ও কাদরি। এ কারণেই পিটিআইয়ের দেওয়া ছয়টি দাবির মধ্যে সরকার পাঁচটি মেনে নিলেও ইমরান আন্দোলন থেকে সরে আসছেন না। পর্যবেক্ষকদের কারও কারও মতে, সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফকে বিচারের মুখোমুখি করা, চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা ও তালেবানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ওপর নাখোশ সেনাবাহিনী। তবে ইমরান ও কাদরি উভয়েই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আঁতাতের কথা অস্বীকার করেছেন। পাকিস্তানে এই ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নতুন নয়। জাতীয় ঐকমত্যের অভাবে দেশটিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসন এবং দুর্বল বেসামরিক সরকার চক্রাকারে ক্ষমতাসীন হচ্ছে। তবে এবার পরিস্থিতি বোধ হয় কিছুটা ভিন্ন। প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, এর পরও তা মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। সামরিক বাহিনীর ‘দ্বারস্থ’ হতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

বিরক্ত করবেন না, ‘রাজনীতি’ চলছে by ফারুক ওয়াসিফ

রিকশার চেয়ে বড় মানবতাবাদী যন্ত্র আর কী আছে? উত্তরবঙ্গ থেকে মধ্যবঙ্গ পর্যন্ত বন্যা যতই ছড়াচ্ছে, ততই ঢাকায় আনাড়ি রিকশাচালকদের দেখা পাচ্ছি বেশি। এভাবেই ঢাকার মোহাম্মদপুরে পেলাম নদীভাঙা গ্রামের কৃষক রেজাউলকে।

যার কেউ নেই, তাঁর রিকশা আছে। ভূমিহীন কৃষক, কর্মহীন শ্রমিক, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ‘ভদ্রলোক’দের আর কেউ না বাঁচালেও রিকশা তাঁদের পেট বাঁচাবে। রিকশার প্যাড্‌ল ঠেলা-ই ক্ষুধার বিরুদ্ধে তাঁর জীবনবিমা। বগুড়ার সারিয়াকান্দির কৃষক কাম মুদি দোকানি রেজাউল গত সপ্তাহে ছিলেন গেরস্ত কৃষক। এ সপ্তাহে তিনি হলেন রিকশাচালক। ছিলেন এলাকার তাগড়া যুবক, এখন হলেন নামহীন ‘মফিজ’। দুর্যোগে পড়া মানুষের এটা কমন গল্প।

ঢাকাসহ বড় বড় শহরের বেশির ভাগ রিকশাচালকের পেছনেই পাবেন বাস্তুহীন, কর্মহীন, ভূমিহীন হওয়ার বাস্তব কাহিনি। সারিয়াকান্দির যুবক রেজাউলের মতো মানুষেরা খুলনার বন্ধ পাটকল থেকে, উপকূলের জলবায়ুদুর্গত এলাকা থেকে, খুলনার নোনাজলের গ্রামগুলো থেকে এবং এখন কুড়িগ্রাম-রংপুর-গাইবান্ধা-বগুড়া-সিরাজগঞ্জের নদীকূল থেকে এক ধাক্কায় রাজধানীতে এসে পড়ছে। কেউ জানল না, সরকার দেখল না, কত সহস্র মানুষের জীবন সহসা নিচে পড়ে গেল।

উদ্বাস্তুদের আগমন দুর্যোগের লক্ষণ। আর্মেনিয়ার লোককাহিনিতে ঘাসফড়িংয়ের হিজরত মানে বিপদ আসছে। চীনে পলায়মান ব্যাঙের পিছু পিছু অমঙ্গল আসে বলে বিশ্বাস করা হয়। পিঁপড়াদের পালানো দেখলে সনাতন বাংলাদেশিরা বন্যার জন্য প্রস্তুত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের আছে বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাসব্যবস্থা। বন্যা যে আসছে, তার কোনোই পূর্বাভাস কেন তারা দিতে পারল না? সরকারের নৌ, আবহাওয়া ও জলবায়ু দপ্তর কী করেছিল গত দুই মাস? সরকার ব্যস্ত মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দমন আর ক্ষমতার কলকবজা সামলানোয়। জনমানুষের কথা দরবারি চিন্তায় অফ টপিক, অপ্রাসঙ্গিক। জবাবদিহির চিন্তাটাও তেমনই অফ টপিক!

কয়েক বিঘা জমি, ছোট্ট একটা মুদি দোকান আর সাংসারিক কাজকর্ম করে বউ-বেটা নিয়ে জীবন চলত রেজাউলের। কিন্তু এক রাতে বিনা নোটিশে বাঁধ ভেঙে গেল যমুনার। যমুনার কালো পানি কোনো সুযোগ না দিয়েই ঘরবাড়ি-আসবাব ডুবিয়ে দিল। রেজাউল সে রাতে ঘুম ভেঙে পা নামিয়ে দেখেন পানি; হু হু করে বাড়ছে। কিচ্ছু বাঁচানো যায়নি। তিন বিঘা জমি, মুদি দোকান—সব যমুনার পেটে।

প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সারিয়াকান্দি দেশের সবচেয়ে বন্যাপ্রবণ এলাকা। কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেখানে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বছর বছর এর সংস্কারে খরচ হয় বিপুল টাকা। প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ঠিকাদার-মাস্তান পর্যন্ত সেই টাকার ফজিলত ভোগ করে। গত ২৯ জুলাই সেই বাঁধের মাটি কেটে পাউবো বানায় রিং বাঁধ। এ যেন রক্তক্ষরণে দুর্বলের দেহ থেকে রক্ত নিয়ে তারই দেহে দেওয়ার ব্যবস্থা! ঠিক এক মাস পরে বাঁধের সেই জায়গাটি পানির চাপে ভেঙে যায়। ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম। এ রকম অতর্কিত বাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হওয়ার খবর আসছে বিভিন্ন জেলা থেকে। এসব বাঁধের নির্মাতা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার এবং দেখভালের দায়িত্বে থাকা পাউবোর কারও শাস্তি হওয়ার খবর তো আসছে না। নাকি, সেটাও অফ টপিক!

নদীই বা কেন এত খল হয়ে উঠল? ভুল নদীশাসনে আর ভারতের পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীর স্বভাব নষ্ট হয়েছে। নদীর বুক বালুতে ভরে যাওয়ায় অল্পেই কূল উপচানো বন্যা হয়। দেশময় প্লাবনভূমি আর খাল-বিল-জলাশয় দখল করায় বানের পানি সমুদ্রের দিকে নেমে যাওয়ার পথ পায় না। ক্ষমতাবানদের দোষে ক্ষমতাবঞ্চিত ব্যক্তিরা ভোগে; তারও বিচার হয় না। এর দায় প্রকৃতির নয়, রাজনীতির, সরকারের, প্রশাসনিক দুর্নীতি আর ভুল নীতির। কিন্তু সেই আলোচনা তো অফ টপিক!

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার তিন দিকে তিন নদী: ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা আর ধরলা। সেখানে জায়গায় জায়গায় স্লুইসগেট আছে বটে, কিন্তু সেগুলোর কী কাজ, তা জানা যায় না। চিলমারীর গণকমিটির নেতা শিক্ষক নাহিদ হাসানের মতে, স্লুইসগেট খোলা থাকায় বন্যা হয়েছে, কিন্তু বন্ধ থাকলে কী হতো, তা-ও তো বলা যায় না। অর্থাৎ নদীশাসনের জন্য তৈরি এসব স্থাপনার অনেকগুলোই আসলে কোনো কাজে আসে না। হয় সেগুলো ভুল জায়গায় ভুল প্রযুক্তিতে নির্মিত, অথবা অবহেলা আর অব্যবহারে কার্যত অচল।

এ সময়টায় কৃষকেরা আমন ধানের চাষ করেন। যখন জমি ও বসতি দুটোই পানির তলায়, যখন আমনের বীজতলা ধ্বংস, তখন ফসল রক্ষায় কী করেছিল সরকারের কৃষি বিভাগ? আবহাওয়া, কৃষি ও সেচ এবং নদীশাসনের সঙ্গে সরকার প্রশাসনের নিবিড় সমন্বয় ছাড়া কৃষির মানুষজনদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা কল্পনা করা যায় না। আমাদের বাস্তববাদী বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রযন্ত্র সুদিনের কল্পনার ধার ধারে না। তাই মানুষের সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়াই তারা নিরাপদ তন্দ্রায় থাকতে পারে। এদিকে রেজাউলের, ‘ঢাকাত মন থাকে না’।

চরগুলো ডোবা। মাস দুয়েকের মধ্যে আমন ওঠার কথা। বাঁধ না ভাঙলে এ সপ্তাহেই আমন লাগানো হতো কৃষির চরাচরে। এক মাস পরে যখন ধানে দুধ আসার কথা, তখন রেজাউলদের ঘাম ঝরবে ঢাকা শহরে। চরগুলোও ডোবা, সেখানে ধান বা বাদাম বা সবজি ফলানো কঠিন হবে। অর্থনীতির জন্যও বন্যার চেয়ে বড় বিপদ সেটাই। বন্যাটা যেকোনোভাবে পার হবে, কিন্তু নতুন মৌসুমের ফসল ঘরে না এলে মঙ্গা অবধারিত। পুরুষরা তখন রিকশা চালাতে নামবে। বউ-বেটিরা ঠিকা কাজ নেবেন, পোশাকশিল্পের লাঞ্ছিত শ্রমিক হবেন; পতিত হবেন এমন সব পেশায়, যেখানে একবার ঢুকলে আর বেরোনো যায় না।

এমন সময় রেজাউলদের দরকার ছিল ত্রাণ, কাজ, ক্ষতিপূরণ ও আশ্রয়। কিন্তু তিনি পেলেন অগতির গতি তিন চাকার জীবন। বানের পানির চেয়ে দ্রুত পায়ে তাঁরা চলে এসেছেন ঢাকায়। আরও আসছেন এবং আরও অনেকে পেছনে ধুঁকছেন।

সরকার যে তাঁদের ব্যথার ব্যথী হবে, তেমন ভরসা নেই। বিজনেস অ্যাজ অ্যাজুয়াল চলবে। তার পরও জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, লোনাপানির জোয়ার, মিল-কারখানা বন্ধসহ হরেক কারণে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের ঢলের পেছন পেছন ক্রমেই এগিয়ে আসবে সামাজিক নৈরাজ্যের দিন। রেজাউলের মতো হঠাৎ নিঃস্ব রিকশাচালকেরাই আমাদের ঘাসফড়িং, নৈরাজ্যের পূর্বাভাস বহন করে তাঁরা আসছেন। তাঁরা আর তাঁদের জীবন এক চিরস্থায়ী অফ টপিক! সরকার ও বিরোধী দল রাজনীতিতে ব্যস্ত। এসব দেখার সময় কোথায় তাদের?

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।  
bagharu@gmail.com

গণমাধ্যম -প্রেস কমিশন বনাম সম্প্রচার নীতিমালা by শওকত মাহমুদ

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে নাগরিকদের মন-মগজে তোলপাড়। এই প্রতিক্রিয়ায় হয়তো ভয় পেয়েছে সরকারও; যে জন্য তথ্যমন্ত্রী ছাড়া আর কোনো মন্ত্রী এর পক্ষে মুখ খুলছেন না। এমন সময়ে ভয়ানক সব শর্ত জুড়ে দিয়ে একটি গেজেট করা হয়েছে যে জনগণ একে ‘সম্প্রচার ভীতিমালা’ হিসেবেই ভাবছে। আসলে কী এমন প্রয়োজন পড়ল যে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের শর্তওয়ালা অংশগুলোর বাস্তবায়নে আইনের আগে নীতিমালা নাজেল করা হলো!

নীতিমালা না মানলে কী হবে? কয়েক মাসের মধ্যে নাকি তথ্যমন্ত্রী আইন করবেন। স্বাধীনতার পর মিডিয়া এত বছর এমন নীতিমালা ছাড়াই চলল। সম্প্রচার গণমাধ্যম এক যুগ অমন সব দাঁতালো আইন ছাড়া চলল, তা আর কয়েকটা মাস অপেক্ষা করলে কী হতো? একবারে আইন করে রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্টে পাস করিয়ে নেওয়া যেত। মনে হয়, সামনের আন্দোলন সামাল দেওয়ার জন্য কণ্ঠরোধের এই ভীতিকর আয়োজন। সর্বোপরি বিরোধী দল ও জনগণকে পর্দার অন্তরালে নিয়ে ফেলা। গণমাধ্যমের জন্য উপনিষদের মন্ত্রই সরকার অনুসরণ করছে: ‘হিরণ্ময় পাত্রে সত্যেরে আবৃত রাখো’।

ভাব ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য বিশ্বের প্রায় সর্বত্র আন্দোলন হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। বঙ্গ-পাক-ভারত উপমহাদেশে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের পরিপূরক ছিল মত প্রকাশের অধিকারের আন্দোলন। স্বাধীন বাংলাদেশেও এর ব্যত্যয় তো হয়ইনি, বরং সগৌরবে ধারাবাহিকতাকে উঁচু রেখেছে।

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জন্য বাংলাদেশের একমাত্র প্রেস কমিশনের রিপোর্টটি একটি যুগান্তকারী দলিল। এই দলিল দুষ্প্রাপ্য বলে এর উল্লেখও কম। আজকের তথ্যমন্ত্রী সংবিধানের যে ৩৯ অনুচ্ছেদের ডুগডুগি বাজাচ্ছেন, সে সম্পর্কে প্রেস কমিশন সেই ১৯৮৩ সালেই মত দিয়ে রেখেছে। ভাবতে অবাক লাগে, বিশ্বের নানা দেশ যখন তথ্য অধিকার বা তথ্যের স্বাধীনতা আইন করার চিন্তাও করেনি, আমাদের ওই কমিশন দুর্নীতি রোধে এবং নাগরিক অধিকার প্রশস্তকরণে ওই আইন করার তাগিদ দিয়েছিল। সম্প্রচার নীতিমালা কমিটির সদস্যরা বোধ হয় এসব জানতেন না।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশনের সদস্য ছিলেন ডাকসাইটে সম্পাদক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা। বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিষয়ে প্রেস কমিশনের পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ভারত বাদে বিশ্বের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ হিসেবে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টি উল্লিখিত নেই। ভারতীয় সংবিধানে এই নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানটি ১৯৫১-এর প্রথম সংশোধনী মারফত অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশের সংবিধান শুরু থেকেই তা ধারণ করে। এই বাধাকে অনেকেই বিরোধিতা করছেন এ জন্য যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ে অথবা এর সংবেদনশীলতার ব্যাপারে সংবাদপত্র সূক্ষ্ম পরিমিতিবোধ দেখিয়ে আসছে। এ বিষয়ে এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে যে সংবাদপত্র সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। আমরা মনে করি, সংবাদপত্রকে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবাধে মত প্রকাশ ও পর্যালোচনা করতে দেওয়া উচিত। এটা অনস্বীকার্য, এ ধরনের আলোচনা নানা দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে সদর্থক অবদান রাখতে পারে, যা অন্যভাবে জানা সম্ভব নয়। এ-ও মনে রাখা প্রয়োজন যে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি কোনো স্থির বিষয় নয় এবং সংবাদপত্রে এসবের ব্যাপক আলোচনা বরং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য সহায়ক।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার একটি শর্ত যে বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়, তা বাংলাদেশের মানুষ কখনো বুঝতে পারেনি বা বোঝার জন্য কোনো দৃষ্টান্তও তৈরি হয়নি। বর্তমান সময়ে দৈনিক ইনকিলাব সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল তথ্যমন্ত্রী বর্ণিত একটি কারণের জন্য। তিনি বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য সাতক্ষীরা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছিল। কিন্তু অন্য আইনে, অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তি আইনে কর্মটি সারা হয় এবং কয়েকজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

জারি করা সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নে তথ্য মন্ত্রণালয় প্রেস কমিশনের সুপারিশে কান তো দেয়ইনি, বরং সংবিধানের শর্তকে এক ধাপ ডিঙিয়ে গেছে। বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাখ্যায় নীতিমালা বলছে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের অনুকূলে এমন ধরনের প্রচারণা, যা বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে বিরোধের কোনো একটি বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে, এমন দৃশ্য ও বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। এটি কেমন কথা? মেলে না তো ওই শর্তের সঙ্গে। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যদি হিম্মত থাকে, প্রকাশ করুক বন্ধু ও শত্রু রাষ্ট্রের তালিকা। তা না হলে মিডিয়া বুঝবে কী করে?

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপে‌ক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হলো।

এর প্রতিটি শর্ত সম্পর্কে প্রেস কমিশনের রিপোর্ট বিশদ আলোচনা করেছে এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা যেন ওসব শর্তের বেড়িতে আটকা না পড়ে, সে কথাও জোর দিয়ে বলা হয়েছে। যুক্তিসংগত বাধানিষেধ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে প্রদত্ত লোপেজ কমিশনের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে আতাউর কমিশন বলছে—‘স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার ধারণাটি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্বটি কার্যত অধিকারের লঙ্ঘনে পৌঁছে যায়।’ সবার উচিত রোগের প্রতিকার অনুসন্ধান, রোগীকে মেরে ফেলা নয়। আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠা-পুরুষ জেমস ম্যাডিসন, বিল অব রাইটস, যাতে কংগ্রেসকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাবিরোধী আইন করতে বারণ করা হয়, উত্থাপনকালে এই অধিকারের বিধিনিষেধ সম্পর্কে বলেছিলেন, যদি কোনো গাছের আগাছা কাটতে গিয়ে ফলদায়ক ডালটি কাটা পড়ে, তবে ক্ষতিকারক আগাছা বাড়তে দেওয়া ভালো। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘আই উড র‍্যাদার প্রেফার এ কমপ্লিটলি ফ্রি প্রেস উইথ অল দ্য ডেঞ্জারস ইনভলবড ইন দ্য রং ইউজ অব দ্য ​ফ্রিডম দ্যান এ সাপ্রেসড অর রেগুলেটেড প্রেস।’ (একটি দমিত বা নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আমি বরং বেশি পছন্দ করব অপব্যবহারের সকল বিপদসহই একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম।)

ভারতীয় সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে ছয়টি মূল স্বাধীনতার কথা আছে। প্রথমটি হলো ভাব ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’—এ দুটি শব্দই ওই সংবিধানে নেই। কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নানা রায়ে এই অধিকারের ব্যাখ্যায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি টেনে এনে তা নিশ্চিত করেছেন। ভারতীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুভাষ সি. ক্যাশপ তাঁর আমাদের সংবিধান বইয়েউল্লেখ করেছেন—‘সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবিনিময়ের প্রধান শর্তই হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। আদালতের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তুলে ধরা এবং সংবিধানের ঘোষণা অস্বীকার করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিপন্থী যেসব আইন ও প্রশাসনিক নির্দেশ থাকবে, সেগুলো বাতিল করা (এক্সপ্রেস নিউজ পেপার্স প্রা. লি. বনাম কেন্দ্র AIR 1958 SC 896)। ফলে সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ চালু করা অথবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংবাদ ও মতামত প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি, বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে বিবেচিত হয় (বীরেন্দ্র বনাম পাঞ্জাব AIR 1958 SC 896)।’

বাংলাদেশ প্রেস কমিশন রাষ্ট্রদ্রোহ বা জনশৃঙ্খলা সম্পর্কে এই মতামত জানিয়েছে যে রাষ্ট্র ও সরকারকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। সরকারের সমালোচনা মানে রাষ্ট্রের সমালোচনা নয়। দণ্ডবিধির ১২৪(ক)–এর অপব্যবহারে অতীতে বহু সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছে। এ ধারাটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বড় প্রতিবন্ধক। এটি সর্বমহলে স্বীকৃত যে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রতিটি বিরোধী দলের অধিকার রয়েছে সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরার। রিপোর্টের সুপারিশ হলো, দণ্ডবিধির ১২৪(ক) এমনভাবে সংশোধন করা উ​চিত, যাতে সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের আওতায় না পড়ে, যদি না সহিংসতা ও জনবিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়া হয়।

বর্তমান সরকারের জারি করা সম্প্রচার নীতিমালায় (ভীতি) সরকারের সমালোচনার কণ্ঠরোধই প্রাধান্য পেয়েছে।
২০১২ সালের ১৫ মে হাইকোর্ট বরেণ্য ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল উপন্যাসটি রায়ের আদলে লেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অমন ঘটনা এ মাটিতে এই প্রথম। ভাব প্রকাশের অন্যতম বাহন সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যও। সাংবাদিকতা সত্য তুলে ধরে, আর সাহিত্য এগোয় সমান্তরাল সত্য রচনার মধ্য দিয়ে।

আশা করি, সরকার পুরো নীতিমালা বাতিল করে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে আলোকিত নীতিমালা প্রণয়নের আয়োজন করবে। তবে বিচার বিভাগকে সংসদের তাঁবে নিয়ে আসার কতৃ‌র্ত্বপরায়ণ উদ্যোগে সে আশা উবে যাচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘সত্য নির্ধারণ মন্ত্রণালয়’ হয়ে ওঠার ভয়ানক ক্ষমতা গণতন্ত্রকে যে আরও বিপর্যস্ত করবে, এতে সন্দেহ নেই।

শওকত মাহমুদ: সাংবাদিক। সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।

বাংলাদেশের পাকিস্তান উপসর্গ by মিজানুর রহমান খান

বাংলাদেশ ক্রমেই গণতান্ত্রিক শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়ার দিকে যাচ্ছে কি না, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। দেশটি এমন দিকে যাচ্ছে, যেখান থেকে তার ফেরা আর কখনোই সহজ হবে না। সরকারি পরিসংখ্যানই নির্দেশ করছে যে জনপ্রশাসনে এমন কিছু ভয়ানক লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে, যা আগে দেখা যায়নি৷ এ জন্য ক্ষমতাসীন না কেবল বিরোধী দল, কে কতটা দায়ী, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে কিন্তু তাতে বাস্তবতার হেরফের হবে না। শাসনগত কিছু মৌলিক বিষয় নষ্ট করা হলে তা পরে আর ঠিক করা অসম্ভব কিংবা দুরূহ হয়ে পড়ে৷

পাকিস্তানে সেনাপ্রধানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মানতে কথিত জাতীয় ঐকমত্য এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত! শাসন অনুপযোগী পরিবেশে ‘জাতীয় ঐকমত্য’ জনপ্রতিনিধিদের জন্য কত লজ্জা ও অপমানজনক হতে পারে, সেটা নওয়াজ-জারদারি ও ইমরান-কাদরিরা দেখিয়ে দিচ্ছেন। পাকিস্তানে যা ঘটল, তা অনুচ্চারিত অভ্যুত্থান। সামরিক বাহিনী কার্যত দেশ চালাচ্ছে। ঐতিহাসিক ম্যান্ডেটধারী নওয়াজ ও সংসদীয় বিরোধী দল, যেটি রওশন এরশাদ মার্কা নয়, তারা নাটকের চরিত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের এই ত্রাহি মধুসূদন অবস্থাটি হৃদয়ঙ্গম করা উচিত। তারা দ্রুত স্বীকার করলে ভালো যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সমস্যা দুই বড় দলের ঐকমত্য মানে স্রেফ একটি আশু ভোট উৎসবের মধ্যেই নিহিত নয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করলে এবং প্রধান বিরোধী দলের তরফে জ্বালাও-পোড়াও দূরে থাক, গোলাপের পাপড়ি ছিটানোও দেখা যাচ্ছে যথেষ্ট নয়। আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন,‘এখন আমরা সবাই জানি কে পাকিস্তান শাসন করছে (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ আগস্ট ২০১৪)।’ ১৬ মাস আগে পাকিস্তান ভোট করেছিল। দুই দল মিলে বিচারক, নির্বাচন কমিশনার এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গড়েও শান্তি মিলল না। এখন উর্দিধারীদের মধ্যস্থতা লাগছে৷

পাকিস্তানে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল একদা এতটাই তিক্ত বিরোধে লিপ্ত ছিল যে তারা কখনো প্রতিষ্ঠান গড়তে দিতে রাজি হয়নি। সেই অবস্থা চলছে এখানেও। তারা গণতন্ত্র বলতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর বুঝে এসেছে এবং ইদানীং কার্যত তাও বিসর্জন দিয়েছে। দুই বড় দলের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠাকেই বলা হয়েছে জাতীয় ঐক্য। কিন্তু সেটা অর্জন করতেও পাকিস্তান এত বেশি সময় নিয়েছে যে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে তারা বাকি রাখেনি। তাই বিরোধ মীমাংসার জন্য কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই গ্রহণযোগ্য নয়। সেনারাই তাই সেরা সংবিধান রক্ষাকর্তা।

একজন সাহসী ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি পদে থাকা সত্ত্বেও ইমরান-কাদরিরা বলছেন, নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত নওয়াজকে স্বপদে বহাল রেখে সম্ভব নয়। অথচ পাকিস্তানি ইসি বাংলাদেশ কায়দায় নয়, রীতিমতো দ্বিদলীয় স্বচ্ছতায়, সুষ্ঠু সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এটা যখন করার ছিল তখন তারা করেনি। জেনারেলদের ধাওয়া খেয়ে বিদেশে নির্বাসনে গিয়েই তবে বেনজির-নওয়াজ গণতন্ত্র সনদে সই করেছিলেন এবং বেনজির নিহত হওয়ার পরে দুই দল একত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী পাস করেছে। পাকিস্তান এভাবে প্রমাণ করছে যে অত্যন্ত বেশি সময় গণতান্ত্রিক খেলার নিয়ম মানতে অপারগ থাকলে তার কড়া মাশুল দিতে হয়।

প্রেসক্লাবে শাহদীন মালিকের উদ্যোগে ডাকা গুম হওয়া পরিবারের জবানবন্দিতে পাকিস্তানি আমল, বিশেষ করে একাত্তরের এবং তার আগের নিষ্ঠুরতার বিবরণ এসেছে। শহীদ মতিউর ও জোহাদের স্মরণ করেছেন ড. কামাল হোসেন। পাঞ্জাবি শাসক চক্র সংখ্যালঘু হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠকে শাসনে অপকৌশল আরোপ করেছিল। তারা পণ করেছিল, যে করেই হোক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে গদি ছাড়া যাবে না। রক্তের উত্তরাধিকার না থাকার ঘাটতি পূরণ করেছে কঠিন কায়েমি স্বার্থ। সাতচল্লিশের আগেও একদল লোক ছিল, যাদের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের সঙ্গে দেখা গেছে। তারা ভেবেছে, নতুন রাষ্ট্র হলে হিন্দু জমিদারেরা রিক্ত হবে, চলে যাবে। তাদের সম্পদ ও প্রভাবশালী শূন্যস্থানগুলো মুফতে মিলবে। তারা সংখ্যায় লঘু কিন্তু সুবিধাভোগী, ক্ষমতার সঙ্গে থেকে তারা পাঞ্জাবি সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বোল তুলেছে। ‘বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ’কে নিষ্ক্রিয় করতে পাঞ্জাবিরা আমলাতন্ত্রকে কবজাবন্দী করতে পেরেছিল। ঐতিহ্যগতভাবে আমলাতন্ত্র সব সময় শানশওকত ও ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট পছন্দ করে, নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সব সময় নির্বাচনকে যমের মতো ভয় করেছে। সোহরাওয়ার্দীর ওপর আঘাত হানো। কারণ, তাঁর জনপ্রিয় ভিত্তি আছে। তাঁকে সরাও, খয়ের খাঁ বসাও। নির্বাচন লাগবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পকেট কমিটির মহামারি সাতচল্লিশে স্বাধীনতালাভের পরপরই শাসকগোষ্ঠীর কূটকৌশল স্মরণ করিয়ে দেয়। চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে পূর্ববঙ্গে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর মিশন ছিল, মুসলিম লীগের বিভিন্ন স্তর থেকে বাঙালির জনপ্রতিনিধি হটাও। পাঞ্জাবিদের পেয়ারের বান্দা বসাও।

কায়েমি স্বার্থান্বেষীরা মূলত সংখ্যালঘু হয়। অথচ তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে শাসন করবে, এটাই ঔপনিবেশিক শাসনের মৌলিক কলা। বাংলাদেশ শাসনে আমরা ভিন্ন কী দেখি? পাঞ্জাবি নীতি ছিল, রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল পদগুলোয় বশংবদ আর প্রশাসনের মুখ্য পদগুলোয় অবাঙালি বসাও। বাঙালি হলো বিরোধী দল। ক্ষমতার প্রতিপক্ষ। সুতরাং ওই বশংবদের দল ও অবাঙালি আমলাদের কাজ ছিল বাঙালিদের মধ্যে অনৈক্য ও হানাহানির প্রতিটি সুযোগকে ব্যবহার করা। তারা হাসতে হাসতে নির্বাচনপদ্ধতি বিকৃত করেছিল। মূল কারণ নির্বাচনভীতি, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের জয়ের পরে তা আরও জেঁকে বসল। তাঁবেদার অবাঙালিদের তালুবন্দী মুসলিম লীগ ওই ভোটে মুছে গেল। তাই দুই মাস না যেতেই যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাঙা হলো। সুষ্ঠু নির্বাচনভীতির কারণেই গণপরিষদ ভাঙা হয়েছিল। কারণ, চুয়ান্নতে দ্বিকক্ষ সংসদীয় ছাঁচে খসড়া সংবিধান বিল চূড়ান্ত হলো। তখন তারা দেখল, এটা পাস হলে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে নিম্নকক্ষে। তাই পাঞ্জাবিরা সেটা চুয়ান্নর অক্টোবরে ভেঙে দিল। রাজনীতিক দিয়েই গণপরিষদকে চূড়ান্তভাবে অকার্যকর, অপমানিত, অপদস্থ করে তাকে সমাহিত করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সামরিক বাহিনী ছিল পর্দার আড়ালে।

পর্দা সরতেই গোলাম মোহাম্মদ, বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মতো ভাঁড়দের দেখা গেল। মঞ্চে প্রবেশ উদ্যত ‘নায়কের’ মুখচ্ছবি দর্শক গ্রিন রুমের অলিন্দ থেকেই দেখতে পেলেন। রাজনীতিকেরা যেখানে সম্পূর্ণ অপদার্থ, শুধু ক্ষমতায় থাকার লোভে আত্মমর্যাদা শতভাগ বিসর্জনে প্রস্তুত, সেখানে সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের বাঁচাতে পারেন না। প্রধান বিচারপতি মুনির পাঞ্জাবি ষড়যন্ত্রকেই অভিবাদন জানালেন। এর একটু বাদেই আমরা দেখলাম, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হচ্ছে। এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে পরোক্ষ ভোটের বিধানসংবলিত দ্বিতীয় গণপরিষদ হলো ১৯৫৫ সালে। এর পর থেকে সত্তরের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি সংবিধান সংশোধনী সেনাস্বার্থ রক্ষা সাপেক্ষে করা হয়েছে। তারা এমনভাবেই তাদের ক্ষমতার প্রতিপক্ষকে ঠেকাল যে টানাটানিতে দেশটাই ভেঙে গেল। নির্বাচন ও জনপ্রতিনিধিত্ব অস্বীকার এবং ধ্বংস করার কারণেই বাঙালির ভোটে গড়া পাকিস্তান ভোটের অভাবে (ভাতের অভাবে নয়!) হাড় জিরজির হতে হতে মারা গেল।

পাকিস্তানে আরেকবার পর্দা সরেছে। সেখানে আইয়ুবরূপী  জেনারেল রাহিল যেন একই ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো। তারা প্রমাণ রেখে চলছে ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা নেওয়ার জাতি নয়। এই লেখা শুরু করেছিলাম এটা বোঝাতে যে শাসন অনুপযোগী অকার্যকরতা বাংলাদেশে গভীর হচ্ছে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, অভিযোগপত্রভুক্তদের মন্ত্রিসভায় অযোগ্য করতে। আর বাংলাদেশে এটিই, এমনকি দণ্ডিত থাকা মন্ত্রী হওয়ার গর্বিত যোগ্যতা হতে পারে। গত মন্ত্রিসভার একজন আদালতেই বলেন দণ্ড সরান, মন্ত্রী হব। অভিযুক্ত, দণ্ডিত ও বিচারাধীন আসামির মধ্যকার বাস্তব পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। সরকারি প্রভাব ও নিগড়মুক্ত কোনো গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কার্যকর অস্তিত্ব দ্রুত লোপ পাচ্ছে। শত গুমের গণশুনানিতে কেউ কোনো সরকারি সংস্থাকে সমীহ করে কথা বলেননি। ষাটের দশকে অন্যায্য গ্রেপ্তার ভন্ডুলের কার্যকর অস্ত্র ছিল হেবিয়াস কর্পাস রিট। আজ তা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক যে কামাল হোসেন হয়তো তার তুলনামূলক স্মৃতিচারণা অর্থহীন মনে করেন। বরং অনন্য গণসংগীতশিল্পী সায়ানের কণ্ঠে যখন সুর উঠল ‘আল্লাহ তুমি কার’, তখন তা অধিকতর অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। সমবেতদের হৃদয় ছুঁয়ে গেল, তাঁদের চোখ ভি​জিয়ে দিল। সম্প্রচার ও গুম নীতি হলো ক্ষমতাসীনদের মনস্তত্ত্বের এক্স-রে রিপোর্ট। এতে তাদের আমলাতন্ত্র তোয়াজ ব্যাধি ধরা পড়েছে। মনে হচ্ছে লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শাসনব্যবস্থার পদ্ধতিগত বিকৃতকরণের মধ্যে পার্থক্য টানার সময় এসেছে। ২০০২-০৬ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা যখন বছরে গড়ে ৮১২, তখন সেটা ২০০৯-১৩ সালে গড়ে মাত্র ১২৩টিতে নেমে এসেছে। অথচ এখন এক দিনেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দেড় শর বেশি অভিযোগপত্র জন্ম নেওয়ার তুঘলকি নজির তৈরি হচ্ছে।

বিএনপি-আওয়ামী সংঘাত হ্রাস কি শান্তির লক্ষণ? পুলিশের ওপর হামলার সংখ্যাগত তুলনা বিশ্লেষণে ভয়ানক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। বিএনপির গত আমলে বছরে গড়ে পুলিশ যেখানে ২৮১টি হামলার শিকার হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগের গত পাঁচ বছরে পুলিশের ওপর গড়ে বছরে ৬৬৫টি হামলা হয়েছে। গত বছর ইতিহাসের সর্বোচ্চ এক হাজার ২৫৭টি হামলা হয়েছে পুলিশের ওপর। শুধু ভোটদান বাক্সের গণতন্ত্র এ রকম চিত্র বদলাবে না। একটা সমাজ রূপান্তরকরণ লাগবে। গাঢ় কৃষ্ণপক্ষের গভীর অমানিশা ভেদ করে এক দিনে ঢাকায় দুটি আশাবাদী হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। গুম আর সম্প্রচার নীতিবিরোধী অর্থবহ নাগরিক সংলাপ হয়েছে। এই নাগরিক সমাজকে অকুণ্ঠ অভিবাদন।

ষাটের দশকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও খান সারোয়ার মুরশিদ নিউ ভেলুজ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন। কারণ, তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজ রূপান্তরকরণের জন্য পুরোনা মূল্যবোধে আঘাত হানতে হবে। ড. কামালের অক্সফোর্ড গবেষণাপত্রের ভাষায়, মূল্যবোধ যখন ‘কর্তৃত্ববাদী, ঔপনিবেশিক এবং সামন্ততান্ত্রিক ধারানির্ভর’ হয়, তখন তা দিয়ে সমাজ রূপান্তরকরণ ঘটানো যায় না। বর্তমানে আমরা সেই রুগ্‌ণ ধারায় হাবুডুবু খাচ্ছি। সবার আগে এটা ছুড়ে ফেলতে হবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে নিউ ভেলুজ—যা দুই বড় দলের অপরাজনীতি প্রত্যাখ্যা​ন করবে, তা পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ কামনা করি।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

গাজা পুনর্গঠনে ২০ বছর লাগবে

ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজার পুনর্গঠনে ২০ বছর লাগবে বলে জানিয়েছে শেল্টার ক্লাস্টার নামের একটি আন্তর্জাতিক হাউজিং প্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশন ও রেডক্রসের সহায়তায় ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজার অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করে ওই প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে গাজার প্রশাসনিক দফতর থেকে জানানো হয়েছিল, গাজার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোকে গড়ে তুলতে দেশটির ৬০০ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলার খরচ হবে। এছাড়াও ভেঙে পড়া অবকাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বাধা হল ইসরাইল ও মিসরের অবরোধ।
বাইরের বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইল কর্তৃক অবরুদ্ধ গাজার একমাত্র পথ হল মিসরের ট্রানজিট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সিসি সরকার গাজার প্রতি শুরু থেকেই বৈরী। এছাড়া ইসরাইল শুরু থেকেই হামাস কনক্রিটের দিয়ে রকেট তৈরি করবে এই অজুহাতে গাজায় নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে। শেল্টার ক্লাস্টার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলায় গাজায় ১৭ হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে এর আগের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ হাজার বাড়ি এখনও সংস্কার করা হয়নি। আরব সাগরের উপকূলের ক্ষুদ্র এলাকা কৃষিপ্রধান গাজার অধিবাসীর সংখ্যা ১৮ লাখের বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিনির্ভর এই এলাকাটি বহন করছে ইসরাইলি হামলার চিত্র। এমনিতেই সেখানে মানুষের তুলনায় ৭৫ হাজার ঘরবাড়ি কম রয়েছে। সেখানে নতুন করে ১৭ হাজার ঘরবাড়ির ধ্বংস সেখানাকার আবাসন সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলবে। এদিকে নরওয়ে ও মিসরের পক্ষ থেকে গাজার অবকাঠামো সংস্কারের জন্য একটি ফান্ড করার ঘোষণা দিলেও এ বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি।

পাকিস্তান অচল করে দেব

পাকিস্তানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে মারাত্মক ট্রাফিক জ্যামে পড়েছে ইসলামাবাদ। অধিকাংশ রাজপথের প্রবেশপথ ও প্রস্থান দিক অবরুদ্ধ থাকায় জ্যামে নাকাল নগরবাসী। অচল ইসলামাবাদে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শনিবার রাতে রেড জোনে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর রোববার স্মরণকালের সর্বোচ্চ জ্যামের মুখে পড়ে ইসলামাবাদ।
কনটেইনার ও ভারি যানবাহন দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে অনেক পথ। ইমরান খান ও তাহির-উল কাদরির নেতৃত্বে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ ঢুকে পড়েছে রেড জোনে। এদিকে, প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পিটিআই ও পিএটি। রাজধানীর মতো প্রয়োজন হলে সমগ্র পাকিস্তানে যানজট বাধিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা বলেন, ‘সারা পাকিস্তান অচল করে দেব।’

রেড জোনে চলছে যুদ্ধ

জনসমুদ্রে হঠাৎ রক্তের প্লাবন। থেমে থেমে উঠছে কান্নার ঢেউ। টিয়ারগ্যাস আর বুলেটে ক্ষতবিক্ষত মানুষ। পড়িমরি করে ছুটছেন এদিকে-ওদিকে। প্রচণ্ড ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। জ্বলে যাচ্ছে চোখ-মুখ। কিন্তু দাঁড়ানোর উপায় নেই। দৌড়ে পালাতে হবে। নারীরা কোথায় যাবেন?
অসহায় আর্তনাদে রাস্তায় শুয়ে পড়ছেন তারা। কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজে চোখ দিয়ে টপ টপ পানি পড়ছে। শিশুরা বুঝতে পারছে না হঠাৎ কী হল? পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সবচেয়ে স্পর্শকাতর রেড জোন এলাকায় ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হল পাকিস্তানি নারী ও শিশুরা। ইমরান খান ও তাহির-উল কাদরির পার্লামেন্ট ভবন দখলের ঘোষণায় সামনে মার্চ করার মুহূর্তেই আক্রমণ করে পুলিশ। শুরু হয় সংঘর্ষ। পাকিস্তানের রেড জোন হঠাৎ হয়ে ওঠে যুদ্ধ জোন। গ্রেফতার হতে পারেন ইমরান-কাদরি : ইমরান খান ও তাহির-উল কাদরিকে গ্রেফতারের বিষয়ে গভীরভাবে বিবেচনা করছে পাকিস্তান সরকার। শনিবার রাতে ডন নিউজের খবরে বলা হয়, পার্লামেন্ট ভবন রক্ষায় যে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না প্রশাসন। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন দখলে নেয়ার চেষ্টা করলে অপারেশন চালিয়ে তাদের দমন করা হবে। পুলিশ ইমরান ও কাদরির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে তাদের আটক করা হবে। ইতিমধ্যে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কনটেইনার ছেড়ে বাইরে ইমরান : সমর্থকদের সংগঠিত ও উৎসাহ দিয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিতে কনটেইনার ছেড়ে দিয়েছে ইমরান খান। এখন তিনি কর্মীদের সঙ্গে সেক্রেটারিয়েট রোডে অবস্থান করছেন।
সেনাবাহিনী নীরব দর্শক : পাকিস্তানের রেড জোনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরও নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ভবন দখলে নেয়ার চেষ্টার পরও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি বা সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। কিছুদিন আগে রেড জোনে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশের সময় অবশ্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সরকারি ভবনগুলো তারা রক্ষা করবে।
বিক্ষোভকারীরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত-পুলিশ : বিক্ষোভকারীরা দা, কুড়াল, হাতুড়ি, গুলতি, ছুরিসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রেড জোনে ঢুকেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রোববার ইসলামাবাদ পুলিশের প্রধান খালিদ খতক বলেন, ‘প্রায় একশ’ বিক্ষোভকারীকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছে দা, কুড়াল, হাতুড়ি পাওয়া গেছে।’
সহিংসতা ত্যাগের আহ্বান বিলাওয়াল ভুট্টোর : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিপিবি প্রধান আসিফ আলী জারদারির ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো সবপক্ষকে থামার আহ্বান জানিয়েছেন। রোববার সকালে এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, এ সংকট পাকিস্তানের জন্য দুঃখজনক ও লজ্জাকর দিন।
ইতিহাসের অন্ধকারতম দিন-গিলানি : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিপিপি নেতা ইউসুফ রাজা গিলানি রেড জোন সংঘর্ষের দিন পাকিস্তান ইতিহাসের ‘অন্ধকারতম’ দিন বলে অভিহিত করেছেন। রোববার তিনি বলেন, সামরিক শাসনামলেও এমন ঘটনা ঘটেনি। শক্তি প্রয়োগ কোনো সমাধান নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মোশাররফ মর্মাহত ; ইসলামবাদে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে আতংকিত ও মর্মাহত হয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। রোববার তার ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, ‘নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি আক্রমণে আমি আতংকিত ও মর্মাহত। বিশেষ করে নারী ও শিশুর ওপর হামলার আমি তীব্র নিন্দা জানাই।
নওয়াজের উচিত ইমরানের সঙ্গে কথা বলা : জামায়াত : পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর সিরাজুল হক বলেছেন, ‘আমি মনে করি নওয়াজ শরিফের উচিত ইমরান খানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করা। আমি মনে করি পরিস্থিতি ভালো হয়ে যাবে।
নওয়াজের বিরুদ্ধে আরও মামলা দায়ের হবে : কাদরি : বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি বাহিনীর হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেছেন পিএটি প্রধান তাহির-উল কাদরি। রোববার তিনি বলেন, নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে আরও এফআইআর দায়ের করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমি ইমরানকে অভিনন্দন জানাই, তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমার শরীরটা ভালো ছিল না। এটা ইমরান-কাদরির যুদ্ধ। আমরা এক সঙ্গে লড়ব।
দক্ষ হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ-মরিয়ম নওয়াজ : নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ বলেছেন, পরিস্থিতি খুব দক্ষ হাতে সুন্দরভাবে সামলানো হয়েছে। সরকার অত্যন্ত সাহস ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করেছে। আলহামদুলিল্লাহ! কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
এটা গণতন্ত্র নয়, একনায়কতন্ত্র-পিটিআই : পিটিআই নেতা শাহ মাহমুদ কোরেশি সরকারের হামলাকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ’ বলে সমালোচনা করেছেন।
সরকারের আর কোনো উপায় ছিল না : মারভি
নওয়াজ সরকারের প্রভাবশালী নেতা মারভি মেনন বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ারগ্যাস ছুঁড়তে সরকার বাধ্য হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা ছিল নজিরবিহীন। এর আগে কেউ পার্লামেন্ট ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেনি।
খাদ্য নেই, পানি নেই : খাদ্য ও পানির সংকটে ভুগছে বিক্ষোভকারীরা। টানা ১৪ দিন ধরে তারা ইসলামাবাদের রাস্তায় অবস্থান করছে। এমন অবস্থায় পিটিআই ও পিএটি তাদের সমর্থকদের নেতার কাছাকাছি অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছে।
শরিফ, নেসার কাউকেই ছাড়া হবে না : ইমরান
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, তার ভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান কাউকেই ছাড়া হবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পিটিআই নেতা ইমরান খান। রেড জোনে সংঘর্ষ ও হত্যার জন্য তাদের দায়ী করে হত্যা মামলা করা হবে বলে জানান ইমরান।
রোববার ইমরান বলেন, আজ হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেয়ার দিন। আমি বলতে চাই, শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। দুই শরিফ ও নিসার কাউকেই ক্ষমা করা হবে না।
ইমরান আমার ভাই : কাদরি
পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি) প্রধান তাহির-উল কাদরি ইমরানকে নিজের ‘ভাই’ উল্লেখ করে একসঙ্গে ‘যুদ্ধ’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার সকালে তিনি বলেন, পিটিআই চেয়ারম্যান ইমরান খান আমার ভাই। আমরা একই কারণে একই উদ্দেশে লড়াই করে যাব।
বিষাক্ত টিয়ারগ্যাস ছুড়ছে পুলিশ! : পাকিস্তানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ টিয়ারগ্যাস ছঁড়ছে পুলিশ। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে রোববার এই তথ্য প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো।

থিয়েটারওয়ালায় মিলি-নিশো

ফের একসঙ্গে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো ও ফারহানা মিলি। সম্প্রতি ‘থিয়েটারওয়ালা’ নামের একটি নাটকে দ্বিতীয়বারের মতো জুটিবদ্ধ হয়েছেন এ দুই তারকা। নাটকটির রচনা ও পরিচালনা করেছেন আশরাফ দিপু। গত সপ্তাহে রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন লোকেশনে নাটকটির শুটিং সম্পন্ন হয়েছে।
নাটকে একজন থিয়েটার কর্মী শায়ান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো এবং আকেজন ছাত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ফারহানা মিলি। ফারহানা মিলির সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় প্রসঙ্গে আফরান নিশো বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে মিলি একজন ভালো মানুষ। মনপুরা হিট হওয়ার পরও তার মধ্যে সেই সহজ-সরলতাই রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করে তা হচ্ছে- মিলি কো-আর্টিস্টকে যথেষ্ট সম্মান দিতে জানেন। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিল্পী। এ নাটকটির গল্প চমৎকার। কাজ করে আমি সন্তুষ্ট।’ ফারহানা মিলি বলেন, ‘আমাদের দু’জনের সমন্বয়ে পুরো ইউনিটের সহযোগিতায় নতুন যে কাজটি আমরা করেছি আশা করছি এটিও দর্শকের কাছে ভীষণ ভালো লাগবে।’ আসছে ঈদে নাটকটি একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান।

সন্ত্রাসবাদ রুখতে সবার সহায়তা দরকার by জন কেরি

বহুধাবিভক্ত অঞ্চল ও জটিল বিশ্বব্যবস্থায় আইএস অনেক দেশের জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য এই বিরাজমান ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা আর তাদের তরিকা হচ্ছে গণহত্যা। এ ব্যাপার দুটি নস্যাৎ করতে সামরিক শক্তির সঙ্গে সারা দুনিয়ার রাজনৈতিক, মানবিক, অর্থনৈতিক, আইনি ও গোয়েন্দা সমর্থন লাগবে।

নৃশংসতার এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছে সংগঠনটি। তারা গলা কেটে, ক্রুশবিদ্ধ করে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে। এমনকি তারা সুন্নি মুসলমানদেরও হত্যা করেছে, অথচ তারা নিজেদের সুন্নি হিসেবে দাবি করে। তবে তারা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই নয়, সারা দুনিয়ার জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে।

আইএসের জন্ম হয়েছে আল-কায়েদা থেকে। এই সংগঠনটি সেখানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সহিংস তৎপরতা চালিয়েছে। ফলে আইএস একদল প্রস্তুত জিহাদি পেয়ে গেছে, যারা শুধু নিজেদের অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, সারা দুনিয়াতেই প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তারা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ ও ইরাকের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বকে সফলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। সংগঠনটির নেতৃত্ব বরাবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে গত মে মাসে সংগঠনটির সন্ত্রাসীরা ব্রাসেলসে ইহুদি জাদুঘরের সামনে তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে, গুলিবিদ্ধ আরেক ব্যক্তি ১৩ দিন পর মারা গেছেন। তারা নিজেদের পরিচয় গোপন করে কোথাও একবার যেতে পারলে সেখানেই খতরনাক হয়ে উঠবে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়।

প্রমাণ আছে, বাধা না পেলে এই সন্ত্রাসীরা শুধু ইরাক ও সিরিয়াতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাবেক আল-কায়েদার এই নবরূপ আইএস তেল চুরি, অপহরণ ও ইরাক/সিরিয়ার আর্থিক খাতে চাঁদাবাজি করে প্রভূত অর্থের মালিক হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উন্নত অস্ত্র চুরি করে তারা এখন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের চেয়ে ভূমি দখলে তারা অনেক পারদর্শী। জর্ডান, লেবানন ও তুরস্কের অনেক ভূমি তারা দখল করে ফেলেছে। এমনকি বিপজ্জনকভাবে ইসরায়েলেরও অনেক কাছে এসে পড়েছে তারা।

আইএসের যোদ্ধারা অত্যন্ত বর্বর ও নৃশংস আচরণ করছে। তারা একদিকে যেমন শিয়া মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের হত্যা করে গোষ্ঠীগত বিবাদ তৈরি করছে, অন্যদিকে কৌশলীভাবে সুন্নিদেরও হত্যা করে ভূমি দখল করছে। সম্প্রতি তারা মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলির মুণ্ডুপাত করেছে, এই ঘটনা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ও অন্য দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত বৃহৎ ঐক্যের মাধ্যমে আইএস নামক এই ক্যানসারকে আর বাড়তে দেওয়া হবে না। দুনিয়া এই দুষ্টক্ষত সারিয়ে তুলতে পারবে এবং শেষমেশ এটাকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে। আইএস অত্যন্ত ঘৃণ্য একটি সংগঠন, কিন্তু তারা সর্বশক্তিমান নয়। উত্তর ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের পর এর লক্ষণ দেখা যেতে শুরু করেছে, এর ফলে ইরাকি ও কুর্দি সেনারা আক্রমণে যেতে পারছে। আমাদের সহায়তায় ইরাকি নেতারা নতুন করে সংগঠিত হতে পেরেছেন, এর মাধ্যমে তারা আইএসকে একঘরে করতে ইরাকের অন্য সম্প্রদায়গুলোকে একত্র করতে পেরেছে।

শুধু বিমান হামলা করেই শত্রুকে পরাজিত করা যাবে না। দুনিয়ার অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা আরও সাড়া প্রত্যাশা করছি। ইরাকি বাহিনী ও সিরিয়ার ন্যায়সংগত বিরোধিতাকে আমাদের সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন—এরাই আইএসকে যুদ্ধক্ষেত্রে মোকাবিলা করছে। আইএসের সক্ষমতাকে কমজোর করে দিতে হবে, তাদের গণমাধ্যমে পরিচালিত চরমপন্থী প্রচারণারও মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা উন্নত করতে হবে, জনগণকে রক্ষায় সহযোগিতার পরিসর বাড়াতে হবে।

আগামী সপ্তাহে ওয়েলসে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ও আমি আমাদের ইউরোপীয় বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হব। লক্ষ্য হচ্ছে, বৃহত্তর একটি ঐক্য গড়ে তোলা। বৈঠকের পর আমি ও চাক হেগেল মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছি, সেখানকার সবচেয়ে আক্রান্ত দেশগুলোকে নিয়ে একটি ঐক্য গঠনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে আমরা সেখানে যাব।

সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র সভাপতিত্ব করবে। সেখানে আমরা একটি বৃহত্তর ঐক্য গঠনের চেষ্টা করব ও বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কী কী বিপদ ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে আলোকপাত করব। ওদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই  হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিষদের পরিকল্পনা পেশ করবেন।

এই যুদ্ধে প্রায় সব দেশেরই কিছু না কিছু করার আছে। কেউ কেউ সামরিক সহায়তা দেবে, প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে। কেউ দেবে মানবিক সহায়তা, এ অঞ্চলের লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। অন্যরা শুধু ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠনেই সহায়তা দেবে না, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থায় যে চিড় ধরেছে, সেটা জোড়া লাগাতেও সহায়তা দেবে। ইরাকে এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, সেখানে অনেকেই আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মানবিক সহায়তা ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আমাদের প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে ডজন খানেক রাষ্ট্র সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার নিশ্চিতভাবে এদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাতও রয়েছে। কিন্তু কোনো শিষ্টাচারসম্পন্ন জাতিই আইএসের এই নৃশংসতা মানতে পারবে না, এই দুষ্ট ক্ষত সারানোয় কোনো দায়িত্ব পালন করবে না, তা হয় না।

আইএসের এই ঘৃণ্য রাজনীতির কারণে বিবদমান প্রতিবেশীরাই ইরাকের নতুন সরকারকে সহায়তায় এগিয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায়, এই জোট আইএস ও অন্য সমমনা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর উদ্ভবের কারণ খতিয়ে দেখবে।

জোট গঠন করা খুব কঠিন ব্যাপার, কিন্তু একটি অভিন্ন শত্রুকে মোকাবিলায় এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প হতে পারে না। সাদ্দাম হোসেন যখন ১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণ করেন, তখন কিন্তু প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তৃতীয় জেমস এ বেকার নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নেননি বা তাড়াহুড়ো করেও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁরা কৌশলগতভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি জোট গঠন করেন, যাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব দ্রুতই বিজয় অর্জিত হয়।

দায়িত্বশীল দেশ ও সে দেশের জনগণ একত্র হলেই চরমপন্থাকে পরাজিত করা সম্ভব।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
জন কেরি: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।