Monday, November 9, 2009

বলছি সেই কামানটির কথা -চারদিক by স্বপন কুমার দাস

আজকে বোফোর্স কামানের যুগে ‘বিবি মরিয়ম’কে সুবৃহত্ ও আকর্ষণীয় একটি লৌহখণ্ড বলেই এ যুগের ছেলেমেয়েদের কাছে মনে হতে পারে। অথচ এককালে এ কামানটি ছিল বড় বিস্ময়। ঢাকার চার শ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ কামানটি। এ কামানের সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে মীর জুমলার নাম আর সেকালের ঢাকার কামান তৈরির কারিগরদের দক্ষতা। কামানটি ছিল ঢাকাবাসীর গর্বের ও ভালোবাসার ধন। একটি কামান নিয়ে কোনো নগরবাসীর এত আবেগ এত উচ্ছ্বাস ইতিহাসে বিরল।
১৭ শতকের গোড়ার দিকে সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপন করেন। ঢাকায় গড়ে ওঠে প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে ঢাকার নিরাপত্তা নিয়েও শাসকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। ঢাকার চারদিকে প্রবাহিত নদীতে তখন মগ, পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের উপদ্রব ছিল। তাই ঢাকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে বেশ কিছু কামান তৈরি করা হয়। এসব কামানের মধ্যে দুটি কামান ছিল বিখ্যাত। বিশালত্বে, নির্মাণশৈলীতে ও সৌন্দর্যে এগুলো ছিল ভারতখ্যাত। কামান দুটির একটির নাম কালে খাঁ জমজম ও অপরটির নাম বিবি মরিয়ম। ব্রিটিশ রাজকর্মচারী ও পর্যটকেরা কালে খাঁকে দেখেই সবচেয়ে বেশি অবাক হন এবং এর বৃত্তান্ত লিখে রাখেন। কালে খাঁ বুড়িগঙ্গা নদীতে তলিয়ে গেলে সবার চোখ পড়ে বিবি মরিয়মের দিকে। বিবি মরিয়ম হয়ে ওঠে দর্শনীয় বস্তু। বিবি মরিয়মের দৈর্ঘ্য ১১ ফুট। মুখের ব্যাস ছয় ইঞ্চি। কামানে ব্যবহূত গোলার ওজন পাঁচ মণ। অত্যন্ত শক্ত ও পেটানো লোহা দিয়ে কামানটি তৈরি করা হয়েছে। তাতে মরচে ধরে না।
কামানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার কামান তৈরির কারিগরদের দক্ষতা। মোগল আমলে ঢাকায় অনেক উন্নতমানের কামান তৈরির কারিগর ছিলেন। মজবুত ও টেকসই কামান তৈরিতে তাঁরা ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তখন ঢাকায় এ শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। সুবেদার ও জমিদারেরা ফরমায়েশ দিয়ে এসব কারিগর দিয়ে তাঁদের প্রয়োজনীয় কামান তৈরি করিয়ে নিতেন। বর্তমানে মুর্শিদাবাদে যে বিশাল কামানটি দেখা যায়, নবাব আলীবর্দী খান ঢাকায় কামান তৈরির কারিগর জনার্ধন কর্মকারকে দিয়ে তা তৈরি করিয়ে নেন। তবে কালে খাঁ জমজম ও বিবি মরিয়মের নকশা তৈরি এবং নির্মাণকাজ তদারকি করেন মোগল কামান নির্মাতারা।
সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৬০ সালে মীর জুমলাকে বাংলার সুবেদার নিয়োগ করেন। মীর জুমলা ১৬৬১ সালে আসাম অভিযানের সময় ৬৭৫টি ভারী কামান ব্যবহার করেন। তাঁর মধ্যে বিবি মরিয়ম ছিল সর্ববৃহত্। যুদ্ধশেষে বিজয়ী হয়ে তিনি বিবি মরিয়মকে বড় কাটরার দক্ষিণে সোয়ারিঘাটে স্থাপন করেন। তখন থেকে কামানটি মীর জুমলার কামান নামে পরিচিত লাভ করে। কালে খাঁর মতো মীর জুমলাও একই ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছিল মোগল শাসকদের পতনের পর। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকার ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও বিখ্যাত গ্রন্থাগার ডি. অয়লি লিখেছেন, ‘বিবি মরিয়ম ধীরে ধীরে কাদাপানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছিল। বর্ষাকালে কামানটির অর্ধেক থাকত পানির নিচে।’ ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালটার্স ১৮৪০ সালে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কামানটিকে কাদাপানি থেকে উদ্ধার করে চকবাজারের উত্তরে একটি বেদির ওপর স্থাপন করেন। তখন চকবাজার ছিল ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর স্থান। কামানটি চকবাজারে এনে রাখার পর তা দর্শনীয় হয়ে ওঠে। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে সব বয়সী মানুষ এ কামান দেখার জন্য ভিড় করে। হিন্দু রমণীরা এসে কামানটির মুখে সিঁদুরের ফোঁটা দেন।
চকবাজার ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হলে ১৯২৫ সালে ঢাকার জাদুঘরের কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টশালী কামানটিকে চকবাজার থেকে এনে সদরঘাটে স্থাপন করেন। তখন সদরঘাট ছিল ঢাকার সবচেয়ে মনোরম স্থান। এখানে এনে রাখার পর কামানটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গত শতকের পঞ্চাশ দশকে পাকিস্তান আমলে মীর জুমলাকে সদরঘাট থেকে এনে শোভাবর্ধনের জন্য গুলিস্তানের চৌরাস্তার মাঝখানে স্থাপন করা হয়। তখন গুলিস্তান ছিল ঢাকার কেন্দ্রস্থল এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। এখানে এনে রাখার পর কামানটি গুলিস্তানের কামান নামে পরিচিতি লাভ করে। তখনো কামানটি বেশ জনপ্রিয় ছিল ঢাকাবাসীর কাছে। তখনো মানুষ কামানটি দেখে শিহরিত হতো। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় বেগম মতিয়া চৌধুরী এ কামানের ওপর দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন লাখো মানুষের সামনে।
১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের সময় মীর জুমলাকে গুলিস্তানের মোড় থেকে উঠিয়ে এনে ওসমানী উদ্যানের প্রধান ফটকের পেছনে স্থাপন করা হয়। আর তখন থেকেই এ কামান লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে দেশবাসী তো বটেই, ঢাকাবাসীও কামানটিকে ভুলতে বসেছে। তাই ঢাকাবাসীর কেউ কেউ মনে করেন, প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন সুবেদার মীর জুমলার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক এ কামানকে লালবাগ দুর্গের কিংবা জাতীয় জাদুঘরের সামনে এনে রাখাই সমীচীন। তা হলে ঢাকাবাসী তাঁদের ভালোবাসা ও গর্বের ধন মীর জুমলাকে নিত্যদিন পাবেন।

বিচার বনাম রাজনীতি -সময়চিত্র by আসিফ নজরুল

গত এক দশকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু কিছু সুপারিশের সঙ্গে অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতিক একমত হয়েছেন। এসব বিষয়ে সমাজের কোনো অংশ থেকেই আসলে কখনো আপত্তি ওঠেনি। এমন একটি বিষয় হচ্ছে সংসদে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নিরপেক্ষতা সংসদীয় গণতন্ত্রের সাফল্যের একটি বড় শর্ত। বৃটেনে শত বছরের সাংবিধানিক রীতিই গড়ে উঠেছে যে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ দল থেকে পদত্যাগ করেন। এই পদত্যাগ তাঁর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে এবং এই নিরপেক্ষতাকে গোটা জাতি সম্মান জানান পরবর্তী নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রার্থী না দিয়ে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে ১৯৮৫ সালে সংবিধান সংশোধন করে দল থেকে স্পিকারের পদত্যাগকে উত্সাহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এমন একটি আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল যে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার তাঁদের পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন। বড় দল দুটোর নির্বাচনী ইশতেহারে এই অঙ্গীকার ছিল।
এমন একটি পটভূমিতে বর্তমান সংসদের ডেপুটি স্পিকার মারাত্মক একটি মন্তব্য করেছেন সেদিন। পত্র-পত্রিকা যদি সঠিক লিখে থাকে তাহলে তিনি বলেছেন: ‘জিয়াই মুজিবের হত্যাকারী’। এটি মারাত্মক কারণ জাতীয় সংসদের অভিভাবক হিসেবে এই উত্তপ্ত বিতর্ক উসকে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই তাঁর। এটি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের সঙ্গেও বেমানান। তিনি জাতীয় সংসদের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক, যে প্রতিষ্ঠানের অভিভাবককে অবশ্যই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে, দলীয় রাজনীতির বাগিবতণ্ডা থেকে দূরে থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের চূড়ান্ত পর্ব যখন চলছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে, তখন এ ধরনের মন্তব্য আমরা আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতার মুখে শুনেছি। যে বিষয়ের নিষ্পত্তি আদালতে হতে চলেছে, সেটি নিয়ে কোনো দায়িত্বশীল রাজনীতিকের মন্তব্য করা শোভনীয় নয়, কাঙ্ক্ষিতও নয়। সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে ইতিমধ্যে গণমাধ্যম এমনকি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সতর্ক করেছেন। রাজনীতিবিদদের সৌভাগ্য বলতে হবে, এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সতর্কবাণী তাঁদের শোনানো হয়নি আদালত থেকে।

২.
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের জাতির ইতিহাসে চরম কলঙ্কিত অধ্যায়। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শুধু তাঁকে নয়, বাংলাদেশে প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতিকেও নির্মূল করার চিন্তা ছিল কারও কারও মধ্যে। তা না হলে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর জেলখানায় ভেতরে তাঁর অনুসারী চার নেতাকেও হত্যা করা হতো না। বঙ্গবন্ধুর আমলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, বিরোধী দলকে নির্মমভাবে দমনের চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু ১৫ আগস্টে তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে তিক্ত বিভাজনের সূত্রপাত করেছে তা তুলনাহীন; তার মাশুল আজও দিতে হচ্ছে দেশকে। আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে অবশ্যই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়া জরুরি। এই বিচারকে অন্তত বিচার চলাকালীন রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করাও সমপরিমাণ জরুরি।
বিচারকার্য শেষ হলে আপিল ডিভিশনের পূর্ণাঙ্গ রায় অবশ্যই পাব আমরা। শুধু অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে নয়, হয়তো অন্য বহু রাজনীতিক এবং সেনানায়ক সম্পর্কে আমরা প্রাসঙ্গিক মন্তব্য পেতে পারি সেখানে। গবেষণা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা জোরদার হলে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে দেশি-বিদেশি কিছু মহলের ইন্ধন সম্পর্কেও নতুন প্রামাণ্য তথ্য আমাদের সাংবাদিক বা গবেষকেরা একসময় উদ্ধার করতে পারবেন। ততদিন পর্যন্ত আমাদের সবার অপেক্ষা করে থাকাটাই শ্রেয়। তা না করে সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কখনো সফিউল্লাহ, কখনো জিয়াউর রহমান, কখনো এমনকি খালেদ মোশাররফকে দায়ী করে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকেরা বিবৃতি দেওয়া অব্যাহত রাখলে এই বিচারের আবেদন লঘু হয়ে পড়তে পারে। স্বাভাবিকভাবে মানুষের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে উল্লিখিত ব্যক্তিরা দায়ী হলে এই মামলার অভিযোগপত্রে তা বলা হয়নি কেন?
কোনো ঘটনার সুবিধাভোগী বহু মানুষ থাকতে পারেন। ১৫ আগস্ট বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার সুযোগ কর্নেল তাহের বা খালেদ মোশাররফের ছিল। দুর্ভাগ্য হোক, কৌশলগত ভুল হোক, তাঁরা সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি, পেরেছেন জিয়াউর রহমান। তাঁর আগে এবং তাঁর সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়েছেন আওয়ামী লীগেরও কিছু নেতা। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে তাঁদের কার কী ভূমিকা ছিল তা তাই শুধু কে কে সুবিধাভোগী হয়েছেন সেই বিচারে করা সম্ভব না। এ নিয়ে অবশ্যই যৌক্তিক গবেষণা এমনকি রাজনৈতিক বাগিবতণ্ডাও হতে পারে। তবে বিচার চলাকালীন এসব বিষয়ে ধারণাপ্রসূত মন্তব্য করা থেকে আমাদের সবার বিরত থাকাই শ্রেয়।

৩.
ভুল সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করা থেকে বিরত নেই বিএনপিরও একশ্রেণীর নেতা। ইতিপূর্বে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বিচার চলাকালীন ১৫ আগস্টকে ১/১১-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই নিষ্ঠুর মন্তব্য শুধু আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নয়, যেকোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষকে আহত করেছিল। এর পরও বিভিন্ন সময়ে বিএনপির কিছু নেতা আকার-ইঙ্গিতে এমন ধারণা দিয়েছেন, যাতে বঙ্গবন্ধু হতাকাণ্ডের বিচারে তাঁদের সমর্থন নেই বলে মনে হতে পারে।
আমাদের সবার বোঝা প্রয়োজন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নয় আর। এই বিচারকে কেন্দ্র করে কোনো রকম রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টা করাও ঠিক হবে না কারও জন্য। এটি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। রাজনৈতিক বিতণ্ডা থেকে দূরে থেকে এই বিচার প্রক্রিয়াকে শ্রদ্ধা জানানো যেকোনো সুনাগরিকের কর্তব্য।

৪.
১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি দেশে বর্তমানে বিরাজমান সংঘাতের রাজনীতির একটি চিত্র মাত্র। বিরোধী দল কর্তৃক এখনো সংসদ বর্জন অব্যাহত রয়েছে, সরকার পতনের অপরিণত হুংকারও তারা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের কেউ কেউ সংসদকে বিরোধী দল সম্পর্কে কুত্সা রটনার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন। স্বয়ং দুই প্রধান নেত্রী হঠাত্ হঠাত্ তাঁদের সংযম হারিয়ে ফেলে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছেন। ১/১১ পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গঠনমূলক কাজ ও চিন্তার মধ্য দিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতিযোগিতার যে প্রত্যাশা আমরা নির্বাচনের পর পোষণ করতে শুরু করছিলাম তা ইতিমধ্যে হোঁচট খেতে শুরু করেছে।
আমার ধারণা, আমাদের দুই নেত্রীর এখনই খুব সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। আমাদের সবার চেয়ে তাঁদেরই বেশি জানার কথা, সংঘাতের রাজনীতি দেশে গণতন্ত্র পুনর্নির্মাণের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই ঝুঁকি আরও বেশি। চীন ও ভারতের মতো দুই উদীয়মান মহাশক্তিধর দেশের স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে। ৯/১১ ঘটনার পর একদিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব, অন্যদিকে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। জ্বালানি শক্তির সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিলাষ রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর। এদের কেউ কেউ বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতার পালাবদল ত্বরান্বিত করার বা তা ঠেকিয়ে রাখার মতো শক্তিশালী। এসব মহলের স্বার্থ রক্ষা করে চলেন বা এদের দ্বারা ব্যবহূত হন এমন মানুষও কম নয় এ দেশে। দুই নেত্রী তথা দুই বড় দলের সংঘাত এদের শক্তিকে আরও সুসংহত করবে। কখনো কখনো তা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে তা ১/১১ সময়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আরও নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন আমাদের।
দুই দলের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বিতর্কের কিছু সনাতনী বিষয় আদালত, কিছু বিষয় ঐতিহাসিক আর কিছু বিষয় জনগণের রায়ের ওপর ছেড়ে দিন। আওয়ামী লীগের চেষ্টা থাক বিগত বিএনপি সরকারের তুলনায় অনেক বেশি জনকল্যাণমুখী সুশাসন দেশকে প্রদান করার জন্য। বিএনপির চেষ্টা থাকুক আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক শ্রেয় দল হিসেবে আগামী নির্বাচনের জন্য নিজেকে উপস্থাপনের।
যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি আমরা, তা কেবল এভাবেই সম্ভব।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পতিসরের রবীন্দ্র স্মৃতি-নিদর্শন -সংরক্ষণ by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববঙ্গের জমিদারি পতিসর থেকে সমপ্রতি পাওয়া কবির স্বহস্তে লিখিত পত্রখানি সেখানেই সংরক্ষণ করতে চায় এলাকাবাসী। পত্রখানি পাওয়া গেছে কবির পতিসরের মুসলমান পাচক মৃত কবেজ আলি মণ্ডলের বাড়িতে রক্ষিত পুরোনো কাগজপত্রের পুঁটুলি থেকে। এখন থেকে ১১৩ বছর আগে, ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ২৮ ভাদ্র তারিখে ছয় পৃষ্ঠাব্যাপী কবি এই দীর্ঘ চিঠিখানি লিখেছিলেন বোলপুর থেকে। কবির স্মৃতি রোমন্থনের নানা তথ্য আছে এতে। তবে কাকে কবি চিঠিখানি লিখেছিলেন তা ঠিক বোঝা যায় না। চিঠিখানি উদ্ধার করেছেন রবীন্দ্রপ্রেমী যুবক মতিউর রহমান মামুন। মতিউর রহমান মামুন সন্ধান পেয়েছেন আরেক দুর্লভ সংগ্রহের—কবির পতিসর ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ ও পতিসর জমিদারির আয়-ব্যয়ের খরচের খাতা। শেষোক্তটি রক্ষিত আছে পতিসরের সন্নিকটবর্তী রানীনগর উপজেলার বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের জনৈক কলেজশিক্ষকের কাছে।
রবীন্দ্রনাথের চিঠি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ে গেছেন সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা এসে—তাঁরা সেটি সংরক্ষণ করবেন তাঁদের জাদুঘরে। হিসাবের খাতাটিও চলে যাবে জাতীয় জাদুঘরে, ঢাকায়। এলাকাবাসী পতিসরের কাচারিবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত ‘রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘরে’ তা রাখতে চায়। ২০০৮ সালে এখানকার এই জাদুঘরের দ্বারোদ্ঘাটন করেছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক। এই জাদুঘরে পতিসরে কবির স্মৃতিবিজড়িত অনেক নিদর্শনসামগ্রীই রয়েছে—পালঙ্ক, আলমারি, ঘড়ি, আরাম চেয়ার, বাথটাব, লোহার সিন্দুক, পতিসরে ব্যবহূত কবির নাগর বোটের দরজা, আয়না ইত্যাদি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্থানীয় চাষিদের নিয়ে যে কলের লাঙল দিয়ে জমিচাষ করতেন, তাও এনে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এই জাদুঘরে।
পতিসরের এই জাদুঘর আদতে স্মৃতি জাদুঘর। সারা পৃথিবীতেই ‘পারসোনালিয়া’ বা ‘মেমোরিয়াল মিউজিয়ম’ নামে এ ধরনের জাদুঘর রয়েছে। প্রখ্যাত মনীষীদের ব্যবহূত নিদর্শন দিয়েই এ ধরনের জাদুঘর গড়ে ওঠে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আছে, দিল্লিতে ‘নেহরু জাদুঘর’, কলিকাতার জোড়াসাঁকোতে ‘রবীন্দ্র জাদুঘর’ শান্তিনিকেতনে ‘রবীন্দ্রভবন’ ইত্যাদি। আমাদের দেশেও প্রায় দুই ডজন এ ধরনের জাদুঘর বা সংগ্রহশালা আছে।
ঢাকায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’, সিলেটে জেনারেল ওসমানি স্মৃতি জাদুঘর, সুনামগঞ্জে হাসন রাজা জাদুঘর, শাহজাদপুরে ‘রবীন্দ্র স্মৃতি মিউজিয়াম’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য স্মৃতি জাদুঘর। পতিসরের বাসিন্দারা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক ঋণী। কবির স্মৃতিনিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে সেই অপরিশোধ্য তাঁরা খানিকটা হলেও শোধ করতে চান। স্থানীয় বাসিন্দাদের এই আবেদনের পেছনে অবশ্য যুক্তি আছে।
কবি-পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবদ্দশায়ই একান্নবর্তী পরিবারের ভাগ-বাটোয়ারা করে দেন। জমিদারি ভাগ হওয়ার আগে পূর্ববঙ্গের তিনটি জমিদারি—কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর এবং রাজশাহীর কালিগ্রাম পরগনা রবীন্দ্রনাথই দেখাশোনা করতেন। জমিদারি ভাগ হওয়ার পর কালিগ্রাম পরগনা হয় রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জমিদারি। কালিগ্রাম পরগনার সদর এই পতিসর। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কবির যোগাযোগ ছিল পতিসরের সঙ্গে। পূর্ববঙ্গের অন্য অঞ্চল থেকে এখানকার প্রকৃতি যেন বেশ খানিকটা আলাদা—ধূসর, উদাস। পতিসরে লেখা কবির কবিতা, গান, ছোটগল্প, প্রবন্ধ এবং স্বজনদের কাছে লেখা চিঠিপত্রে এই স্বতন্ত্র প্রকৃতির আভাস মেলে। প্রজা হিতার্থে কবি এখানে গ্রামোন্নয়নমূলক বেশ কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল প্রজাদের দারিদ্র্য দূরীকরণ, চিকিত্সা বিধান, জলকষ্ট সমস্যার সমাধান, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত, সুষ্ঠু বিচার—সালিসি-ব্যবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ পতিসরে তাঁর গ্রামোন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন কয়েকজন দক্ষ সমাজকর্মীর দ্বারা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য—কালিমোহন ঘোষ, অতুল সেন, ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’খ্যাত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পুঠিয়ার রাজ-এস্টেটের দেওয়ান প্রসন্নকুমার মজুমদারের পুত্র শৈলেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। এখানকার কৃষির উন্নতির জন্যই পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষ্টিতে স্নাতক করে এনেছিলেন। রথীন্দ্রনাথ পতিসরের চাষিদের সঙ্গে নিজেই যে কলের লাঙল চালিয়েছেন তা আগেই উল্লেখ করেছি। ১৯০৫ সালে কবি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’। কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল অধিক মুনাফালোভী মহাজনদের হাত থেকে গরিব চাষিদের রক্ষা করা। চাষিদের অল্প সুদে ঋণ দিতেই বন্ধুদের আর্থিক সহায়তায় এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করেন। পরে অবশ্য কবি নোবেল পুরস্কারের অর্থের বড় একটি অংশ এই ব্যাংকে জমা রাখেন। প্রায় ২০ বছর ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’ কার্যকর ছিল। কবি পতিসর কাচারির পূর্ব পাশের খোলা জায়গায় রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠা করে রেশম বস্ত্র বয়নের প্রকল্পও চালু করেন। প্রজাদের নিরক্ষতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে রাতোয়াল, কামতা ও পতিসরে মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় (১৯৩৭ সালের ২৬ জুলাই পতিসরে শেষ যাত্রার কবি শেষোক্ত মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়টি ‘রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’ নাম দিয়ে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন) এবং বেশ কটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য, পতিসর কামতা ও রাতোয়ালে তিনি দাতব্য চিকিত্সালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানকার প্রজাদের যে তিনি কত ভালোবাসতেন, তা পতিসরের জনৈক গ্রাম-কর্মীকে লেখা চিঠি থেকেই বোঝা যায়: ‘আমাদের গ্রামের জীবনযাত্রা বড়ই নিরানন্দ হইয়া পড়িয়াছে। প্রাণের শুষ্কতা দূর করা চাই। হিতানুষ্ঠানগুলোকে যথাসম্ভব উত্সবে পরিণত করিতে চেষ্টা করিয়ো।’
পতিসরের বাসিন্দারা তাঁদের প্রিয় কবির এখানকার কোনো স্মৃতিচিহ্নই হারিয়ে যেতে দেবেন না। এখানে যেসব স্মৃতি-নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তা তাঁরা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে চান—কবির অমর স্মৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ থেকেই। তাঁদের এই উদ্যোগ বা আকাঙ্ক্ষা আদৌ অযৌক্তিক নয়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর চশমা, সিলেটের নূর মঞ্জিলে প্রদর্শিত জেনারেল ওসমানির বেতের লাঠি, সুনামগঞ্জের হাসন রাজা জাদুঘরে উপস্থাপিত হাসন রাজার আলখাল্লা কিংবা শাহজাদপুর রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘরে রক্ষিত পিয়ানো যতটা আবেদন সৃষ্টি করে আছে; তা স্থানান্তর করে যত বড় জাদুঘরেই নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তার মর্যাদা হ্রাস পাবে।
পতিসরে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শনগুলো পতিসরের জাদুঘরেই সংরক্ষণের ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে অবশ্যই তা হতে হবে সর্বসাধারণের প্রদর্শন উপযোগী, নিশ্চিত করতে হবে প্রদর্শনী সামগ্রীর সুষ্ঠু নিরাপত্তাব্যবস্থায়।
সাইফুদ্দীন চৌধুরী: অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লাভের গুড় যেন পিঁপড়ায় না খায় -চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল জেটিতে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে দামের ক্ষেত্রে এত দিন যে বড় রকমের ফাঁকি ছিল, তা দরপত্র ডাকার পর স্পষ্ট হয়ে গেছে। গত শনিবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য এখন ৫০৫ টাকা নিচ্ছে। অথচ দরপত্র আহ্বান করার পর একই প্রতিষ্ঠান এ কাজে দর উল্লেখ করেছে ১৫৫ টাকা। আগে এ কোম্পানিটি একই কাজের জন্য নিত এক হাজার ২০০ টাকা।
কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পর কয়েক বছরের মধ্যে দরের এমন পার্থক্য হওয়া বিস্ময়কর। এই সময়ে সার্বিক ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু দরের এ নাটকীয় পতন থেকে অনুধাবন করা যায় যে একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজের দায়িত্ব দেওয়াতেই এত দিন তারা বেশি দরে কাজ করতে পেরেছে। এখন প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে তারা দর কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এত দিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজের দাম নিত। এর ফলে নিশ্চয় লাভবান হয়েছে বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তার স্বার্থ। কথায় বলে, লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। একদিকে আমদানি-খরচ বেশি হওয়ায় ভোক্তাকেই এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি, পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকেই সে অর্থ তুলে আনা হয়েছে। অন্যদিকে এতে রপ্তানি-ব্যয়ও বেড়ে যায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে এই বাড়তি অর্থ চলে যায় একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজের কাছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। জলপথে দেশের বেশির ভাগ আমদানি-রপ্তানির পণ্য ওঠানো-নামানো হয় এ বন্দর দিয়ে। সঠিকভাবে তদারক করতে ব্যর্থ হলে এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বন্দরের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া না গেলে আমদানি-রপ্তানিতে অতিরিক্ত ব্যয় চলতেই থাকবে, আর এতে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে দেশের জনগণ।

চিনির দাম বাড়ানোর দাবি অযৌক্তিক -দ্রব্যমূল্যে এখনো উত্তাপ

বাজার-পরিস্থিতি নিয়ে তেমন একটা সুখবর মিলছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে তাই অসন্তোষ বাড়ছে। মূলত জিনিসপত্রের দাম একটা চড়া পর্যায়ে উঠে রয়েছে; সেখান থেকে নামার কোনো লক্ষণ নেই। এটাকে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে বলে তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই চড়া স্তরের স্থিতিশীলতা কাঙ্ক্ষিত নয়, বরং আতঙ্কের; এ জন্য যে কোনো কোনো দ্রব্যের দাম আরও বাড়বে—এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এক বছর আগের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় কিছু পণ্যের দাম কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে এমন চিত্রই পাওয়া যায়। এতে খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। এক বছর আগে দেশের পরিস্থিতি যা ছিল, এখন নিশ্চয়ই তা নয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেও উঁচু স্তরের স্থিতিশীলতা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এখন কেন দাম কমছে না—এ প্রশ্নের জবাব মেলা কঠিন। সরবরাহ-ঘাটতি কতখানি দায়ী আর ব্যবসায়ীদের কারসাজি কতখানি দায়ী, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। বিশেষ করে বাজার যখন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন এই বিতর্ক জোরদার হয়। একইভাবে পণ্যের চাহিদা-জোগানের বিষয়ে সরকারের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-পরিসংখ্যান নেই, নেই বাজার নিয়ে যথাযথ গবেষণা। সর্বোপরি বাজারে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে—এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও হয়ে রয়েছে দুর্বল। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে বাজার তদারক ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা বহু ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়েছে। সুতরাং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার সরকারের জন্য বরাবরই একটি স্পর্শকাতর বিষয়।
এর মধ্যে প্রথম আলোর এক সংবাদ থেকে জানা গেছে, চিনি ব্যবসায়ীরা আবারও চিনির দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী অবশ্য সরাসরি এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। কিন্তু তাতে বাজারে যে চিনির দাম বাড়বে না, এ নিশ্চয়তা মেলেনি। বস্তুত, কয়েক মাস ধরে চিনির দাম নিয়ে যেসব কাণ্ড হয়েছে, তাতে সরকারের অদক্ষতাই প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষত, অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্যমন্ত্রী চিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি চিনির মূল্য ৪৯ টাকা নির্ধারণ করে দেন। অথচ বাজারে এই দাম থাকেনি। টিসিবির হিসাব অনুসারেই গতকাল বাজারে কেজিপ্রতি চিনি ৫২ থেকে ৫৪ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তাহলে কোন যুক্তিতে চিনির দাম আরও বাড়ানোর দাবি তোলা হয়?
আবার আগামী দিনগুলোয় চালের দাম নিয়ে একটি শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উত্পাদনে ঘাটতি হওয়ায় ভারত বিশ্ববাজার থেকে চাল কিনবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ভয়াবহ বন্যার কারণে ফিলিপাইনে চালের উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো বিশ্ববাজারের চালের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আর তার কিছুটা প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়া বিচিত্র কিছু নয়। নীতিনির্ধারকদের তাই এই দিকটায় নজর রাখা প্রয়োজন।

আকাশ ছাড়িয়ে স্বপ্ন -চারদিক by রেজাউল হক

কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে নরসিংদী জেলার লাগোয়া মির্জানগর গ্রাম। গাজীপুর জেলার এই প্রান্তিক গ্রামটির মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষি। গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরের মানুষ সেখানে ফসলের রূপকার।
কৃষিনির্ভর গ্রামটিতে ২০ বছর ধরে ফসল ও বৃক্ষের নতুন নতুন চাষবাসের প্রসার ঘটছে। কিন্তু এসব চাষপদ্ধতির কারিগরি দিকগুলো সম্পর্কে মানুষের কাছে অনেক তথ্য পোঁছেনি। কৃষিবিষয়ক কারিগরি তথ্যের বিশাল শূন্যতার মধ্যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এখানকার কৃষি। অথচ জরুরি সময়ে সঠিক সমাধান পেলে বেঁচে যেতে পারে কৃষকের কষ্টের ফসল—যেমনটা বেঁচে গেছে সাদির উদ্দিন প্রধানের লিচুবাগান।
গ্রামের বড় বাঁশবাগানগুলোর একটার পাশে প্রধান বাড়ি বলে পরিচিত সাদির উদ্দিনদের বাড়ি। তাঁর দুই মেয়ে এক ছেলে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি ছোট ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস।
বছর বিশেক আগে কলমের চারা লাগিয়ে সদির উদ্দিন লিচুবাগান করেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি আর নিজের কেনা কিছু জমি মিলিয়ে গড়ে তোলেন বাগান। ১৪ শতাংশ জমির বাগানে ১৯টা ‘বেলারি’ জাতের লিচুগাছ রয়েছে। গ্রামের মমতাজ উদ্দিন নামে প্রয়াত একজনের লিচুবাগান ছিল। অল্প জমির বাগান থেকে তাঁর আয় দেখে লিচুবাগান করার দিকে ঝোঁকেন সাদির উদ্দিন।
গত মৌসুমে ২৫ হাজার টাকা আর আগের মৌসুমে ৩৫ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেন সাদির উদ্দিন। আগে বাগান আগাম বেচে দিতেন ব্যাপারিদের কাছে। লিচুতে সিঁদুরে রং এলে ব্যাপারিরা কিনে নেয়, লিচু পেড়ে নেওয়া পর্যন্ত তারাই বাগানের দেখভাল করে। এ ধরনের আগাম বিক্রিতে ৮-১০ হাজার টাকার বেশি পেতেন না সাদির উদ্দিন।
দুই মৌসুম ধরে নিজেই লিচু বিক্রি করেন সাদির উদ্দিন। এতে আগের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি টাকা আসে। এই জমিতে ধান চাষ করলে হয়তো বছরে একবার করতে পারতেন। উঁচু জমি বলে হলুদ বা শাকসবজি চাষ করা যেত। এতে বছরে দুই-আড়াই হাজার টাকার বেশি আসত না বলে জানান তিনি।
বাগান পরিচর্যার টুকিটাকি প্রতিবেশী ও ব্যাপারিদের কাছ থেকে শিখেছেন। সেই সামান্য জানা নিয়েই সারা বছর বাগানের যত্ন নেন। অনেক সমস্যারই সমাধানের উপায় তাঁর জানার বাইরে। আগে দু-একবার ঘন কুয়াশার জন্য লিচুগাছে ফুল ফোটেনি। এক টাকাও আসেনি বাগান থেকে। আবার পোক্ত হওয়ার আগেই ফল ঝরে যায়। বোঁটার গোড়ায় পোকার আক্রমণ। পাতায় সাদা ছত্রাক। পাতা ঝাঁঝরা করে ফেলে পোকা। এসব সমাধানের জন্য এখানে-সেখানে দৌড়ান। সঠিক সমাধান পাওয়া যায় না।
বাগানে সমস্যা হলে চলে যান কীটনাশক বিক্রেতাদের কাছে। একটা সমস্যায় পড়ে কীটনাশকের দোকানে গিয়ে তাদের কথামতো ৬০০ টাকার ওষুধ কিনে গাছে ছিটিয়েছেন। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। খরচাটাই সার।
গত মৌসুমে বেশ লিচু ধরেছিল। কিন্তু ফল মোটরদানার মতো হওয়ার পর ঝরে পড়তে থাকে। আশপাশের অনেকের কাছে গিয়েছেন। কেউ সমাধান দিতে পারেনি। প্রতিবেশী কৃষকদের কাছ থেকে জানতে পারেন, আড়ালবাজারে কমিউনিটি ইনফরমেশন সেন্টার আছে। নাম আকাশমেলা। সেখানে চাষবাসের সমস্যার কথা জানালে তারা সমাধান এনে দেয়। ‘সেখানে গেলাম। সমস্যার কথা তাদের জানালাম। দুই দিন পরে সমাধান পাই। তাদের পরামর্শমতো ওষুধ কিনে ১০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করেছি। লিচু ঝরা বন্ধ হয়ে যায়।’ বললেন সাদির উদ্দিন। ফলবাগানটা রক্ষা হয়। ২৫ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেন তিনি। আগের মৌসুমের চেয়ে ১০ হাজার কম। গতবার জমি নিয়ে মামলায় জড়িয়েছেন। বিস্তর খরচ। বহুবার হাজিরা দিতে হয়েছে। ভালোভাবে বাগানের পরিচর্যা হয়নি বলে ফলন কম হয়েছে। মামলার খরচ জোগাতে প্রায় ৫ গণ্ডা জমি বেচে দিতে হয়েছে। লিচুবাগানের টাকাটা না এলে হয়তো আরও সম্পত্তি খোয়াতে হতো।
আকাশমেলার স্বত্বাধিকারী মাহবুব-এ-এলাহী ব্যক্তি-উদ্যোগে আড়ালবাজারে ২০০৫ সালে গড়ে তোলেন কম্পিউটারের দোকান। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে তাঁর প্রবল আগ্রহ, আয়ের উপায়ও এটি। ২০০৬ সালে গ্রামীণফোনের কমিউনিটি ইনফরমেশন সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হয় আকাশমেলা। ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সেবা পাওয়া যায় এখানে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (বিআইআইডি) উদ্যোগে আকাশমেলায় কৃষিবিষয়ক তথ্য ও পরামর্শ সেবার সূচনা করা হয়েছে।
মাহবুব জানান, সাদির উদ্দিনের সমস্যাটি জানার পর তিনি সমস্যাটি ই-মেইল করে পাঠিয়ে দেন ঢাকা উইন ইনকরপোরেটে। সেখান থেকে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শসহ ফিরতি মেইল আসে দুই দিন পর। এই সেবার জন্য তাঁর কাছ থেকে কোনো টাকাপয়সা নেওয়া হয়নি।
তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারলে লাভবান হতে পারে কৃষক, বাঁচতে পারে কৃষি। আকাশমেলার এই উদ্যোগ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কৃষকদের মধ্যে তথ্য নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য বিআইআইডির একটি উদ্যোগ ই-কৃষি। আকাশ মেলার মাধ্যমে শতাধিক কৃষক যুক্ত হয়েছেন ই-কৃষির সঙ্গে। মাসে একবার তাঁদের সভা বসে। এর সঙ্গে যুক্ত আছেন সরকারি কৃষি সম্প্রসারণকর্মী। ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে আরও সমৃদ্ধ হতে পারে গ্রামীণ কৃষি, এটি তারই ইঙ্গিত।

কর্নেল তাহের: এক অমীমাংসিত চরিত্র -পঁচাত্তরের নভেম্বর by শাহাদুজ্জামান

কর্নেল তাহেরের যাত্রাপথটিকে অনুসরণ করতে গিয়ে লক্ষ করি সাহসী, নাটকীয়, সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা এ মানুষটির অস্থির পথপরিক্রমা একটি চূড়ান্ত মুহূর্তে গিয়ে পৌঁছায় পঁচাত্তরের সাতই নভেম্বরে। কিন্তু ঐতিহাসিক দিনক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে যে নজিরবিহীন কিম্ভূত টানাপোড়েন রয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় দেখি দশকের পর দশক ধরে এই তারিখটির মূল রূপকার কর্নেল তাহের এবং তাঁর উদ্দেশ্যকে ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার করে রাখার চেষ্টা। সাতই নভেম্বরের ওপর যে দাপ্তরিক তকমা রয়েছে, তার সঙ্গে এর মূল উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন আগেই বলেছি, একটি ঐতিহাসিক মোচড়ে কার্নেল তাহেরের হাত থেকে ফসকে গেছে তাঁরই হাতে তৈরি দিন সাতই নভেম্বর। এ তারিখটির জট খুলতে ইতিমধ্যেই সক্রিয় হয়েছেন অনেকে। সেই সত্তরের দশকেই তাহেরকে নিয়ে প্রথম বিস্তারিত গবেষণাটি করেন লরেন্স লিফশুলত্স, যার ফল তাঁর আনফিনিসড রেভ্যুলেশন বইটি। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে সাক্ষাত্কার দিয়ে, স্মৃতিকথা লিখে সেই সময়টির অনুপুঙ্খ বয়ান দিয়েছেন সেদিনের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত জাসদের অনেক নেতা-কর্মী, সৈনিক সংস্থার সদস্য এবং কর্নেল তাহের পরিবারের সদস্যরাও। আমি নিজে লিফশুলত্স থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বহুজনের সঙ্গে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে বুঝে ওঠার চেষ্টা করি সেই কালপর্বটিকে।
নানা টুকরো তথ্য আর স্মৃতিকথার ভেতর আমি সেই মানুষটিকে দেখি, যিনি সাতই নভেম্বরের পূর্বাপর সময়ে ক্র্যাচে ভর দিয়ে নারায়ণগঞ্জের নিজের বাসা থেকে ক্যান্টনমেন্ট, সেখান থেকে অভ্যুত্থানের কার্যালয় অ্যালিফ্যান্ট রোডে ভাইয়ের বাড়িতে ছোটাছুটি করছেন। তাহেরের কৈশোর থেকে তারুণ্যের যাত্রাপথটির পরিপ্রেক্ষিতে ওই ছোটাছুটি যখন লক্ষ করি তখন টের পাই, তাহের বুঝতে পারছেন প্রতিটি ঘণ্টা-মিনিট তখন গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ গড়ার যে স্বপ্ন করোটিতে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন তাহের, তার শেষ সুযোগ তখন তাঁর সামনে। বাংলাদেশ তখন এক টালমাটাল নৌকার মতো দুলছে। ঠান্ডা লড়াইয়ের পৃথিবী তখন পুঁজিবাদী আর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে স্টষ্ট বিভক্ত। বাংলাদেশ নৌকার বিহ্বল মাঝি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নানা দোদুল্যমানতায় শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পালে লাগাবেন সমাজতন্ত্রের হাওয়া। কিন্তু তাঁর রক্তাক্ত দেহ নদীতে ছুড়ে ফেলে নৌকাকে ঘোর পুঁজিবাদী স্রোতে টেনে নিতে তখন উদ্যত খন্দকার মোশতাক। সে স্রোতকে খানিকটা বাধাগ্রস্ত করেন খালেদ মোশাররফ তাঁর দ্বিধান্বিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু অস্পষ্ট খালেদের রাজনৈতিক অভিপ্রায়। পাল্টা আঘাতের জন্য তখন প্রস্তুত পুঁজিবাদী বলয়। সেই ক্রান্তিতে তাহের দ্রুত নৌকাটির হাল সমাজতন্ত্রের দিকে টানার শেষ চেষ্টা করেন। কোনো ধোঁয়াচ্ছন্ন সমাজতন্ত্র নয়, তাঁর ভাবনায় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। জাসদের প্ল্যাটফর্মে এবং তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় সাতই নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লব। বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে, বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক এবং কাকতালীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন কর্নেল তাহেরকে নির্ভর করতে হয় তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়ার ওপর। অভ্যুত্থানের কৌশল হিসেবেই তাহের সেদিন বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন জেনারেল জিয়াকে। তারপর যে বিচিত্র নাগরদোলায় ইতিহাসের চাকা ঘুরে যায়, দৃশ্যপট থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে পড়া জেনারেল জিয়া যেভাবে দৃশ্যের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন এবং খেলার ছক পুরোটা বদলে তাঁরই মুক্তিদাতা তাহেরকে দৃশ্যপট থেকে সম্পূর্ণ বিদায় করার জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করেন, তার সীমাহীন নাটকীয়তাটি আমি ধরার চেষ্টা করেছি আমার ক্রাচের কর্নেল বইটিতে।
সাতই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের দুটো অধ্যায় ছিল—একটি সামরিক, অন্যটি বেসামরিক। অভ্যুত্থানের সামরিক অধ্যায়টি সফল হয়েছিল পুরোটাই, বেসামরিক অধ্যায়টির জন্য তাহের নির্ভর করেছিলেন জাসদের গণবাহিনীর ওপর, সে অধ্যায়টি ব্যর্থ হয়েছিল। এ নিয়ে জাসদ নেতাদের মিশ্র মতামত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য জাসদের তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। বরাবরের মতো তিনি তাঁর রহস্য বজায় রেখেছেন। কিন্তু ঘটনা এই যে বাংলাদেশের দীর্ঘ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে সাতই নভেম্বরই প্রথম এবং শেষবারের মতো সমাজতান্ত্রিক আদর্শের কোনো দল ক্ষমতা গ্রহণের এতটা নিকটবর্তী হয়েছিল।
দিনটি তাঁদের হাত ফসকে গেলে অবশেষে শুরু হয় তাহেরসহ জাসদ নেতাদের প্রহসনমূলক বিচার। তাহেরের ভাই ডক্টর আনোয়ার হোসেন সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন ঢাকায় কারাবন্দী ছিলেন, তখন জেলে দেখা করতে গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে। তিনি আমাকে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন জেলের ঠিক সেই জায়গাগুলো, যেখানে সাতই নভেম্বরের সেই প্রহসনমূলক বিচারের অস্থায়ী আদালত বসেছিল। স্মৃতিচারণা করছিলেন তাহেরকে নিয়ে স্লোগান দিয়ে আদালত ত্যাগের দৃশ্যের। আরেক আসামি মেজর জিয়াউদ্দীন বলছিলেন, এই বিচারের সীমাহীন ষড়যন্ত্রে আবেগ আক্রান্ত ছিলেন তাঁরা। তিনি আদলতকক্ষে বসেই কবিতা লিখেছেন অজস্র। কর্নেল তাহের ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে কবিতাটি পড়েছিলেন, সেটি ছিল জিয়াউদ্দীনেরই লেখা। বন্দী তাহেরকে মুক্ত করতে তখন এক আত্মঘাতী দল জিম্মি করে ভারতীয় হাইকমিশনারকে। সে জিম্মি নাটকে নিহত হন তাহেরের ভাই বাহার। তাহেরকে রক্ষার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। প্রধান আসামি না হলেও বিচারে একমাত্র তাহেরকেই দেওয়া হয় ফাঁসির আদেশ। ইতিহাস যারা সে মুহূর্তে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে, তারা স্পষ্ট জানত, ইতিহাস সে মুহূর্তে ছিল একটি মানুষেরই হাতের মুঠোয়, তিনি কর্নেল তাহের।
আমরা জেনেছি, বীরের মতো ফাঁসির মঞ্চে উঠেছেন তাহের। ভোর রাতে উঠে পরিপাটি করে সেজেছেন। স্ত্রীর আনা আম কেটে খেয়েছেন এবং কবিতা কণ্ঠে নিয়ে ফাঁসির দড়ি পরেছেন। বরাবরের মতোই নাটকীয়, কিন্তু স্থির সংকল্প। বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক লজ্জাই রয়েছে, তার অন্যতম একটি তাহেরের এই প্রহসনমূলক ফাঁসি। যত দিন তাহেরের ফাঁসির ষড়যন্ত্রটি জনসমক্ষে উন্মোচিত না হচ্ছে, তত দিন এ লজ্জা ঘোচার নয়। তাহেরের মৃত্যুর পর থেকে একটি অমীমাংসিত ইতিহাসের ছায়া তাড়িত করে বেড়াচ্ছে একটি পরিবারকে। স্বল্পস্থায়ী দাম্পত্য জীবন লুত্ফার—দেড় বছরের মাথায় স্বামীকে দেখলেন পা হারাতে, সাত বছরের মাথায় জীবন। তাঁকে দেখি বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকেন ছোট ছেলে অসুস্থ মিশুর জন্য। আরেক ছেলে যিশু আমার সামনে খুলে ধরে ট্রাংকবোঝাই করে সযত্নে রেখে দেওয়া কর্নেল তাহেরবিষয়ক কাগজপত্রের স্তূপ। মেয়ে নীতু বসে বসে তৈরি করেন বাবার নামে ওয়েবসাইট। সাতই নভেম্বরের চাকাটি অন্যদিকে ঘুরলে নিয়তি তাঁদের নিয়ে যেত অন্যত্র।
অবশ্য সাতই নভেম্বরের চাকাটি অন্যদিকে ঘোরার সুযোগ আদৌ ছিল কি না, সে প্রশ্নও তোলেন অনেকে। প্রশ্ন ওঠে, জাসদ যথার্থ সমাজতান্ত্রিক দল ছিল কি না? প্রশ্ন ওঠে, তাহের বিপ্লব নিয়ে খানিকটা তাড়াহুড়ো করে হঠকারী সিদ্ধন্ত নিয়ে ফেলেছিলেন কি না? সেনাবহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার প্রমুখ যাঁদের ভাবনার মূল ঘোর শৃঙ্খলা নিয়ে, অনেকেই তাঁদের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে বোধগম্য কারণেই তাহেরকে উল্লেখ করেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবে, উল্লেখ করেন সিপাহি অফিসারের ভেতর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মদদদাতা হিসেবে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের কাছে কর্নেল তাহের একটি অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ। কারণ তাঁরাই তাহেরের মৃত্যুর কারণ আবার আওয়ামী লীগের কাছেও কর্নেল তাহের কোনো স্বস্তিকর প্রসঙ্গ নয়। কারণ তাহের সক্রিয় ছিলেন তত্কালীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ জাসদের সঙ্গে। এমনকি খোদ জাসদের কাছেও তাহের হয়ে উঠতে পারেন বিব্রতকর প্রসঙ্গ। কারণ তাহেরকে নেতৃত্বে ঠেলে দিয়ে সে সময় যথার্থ সহযোগিতা দিতে পারেননি তাঁরা। তাহের মৃত্যুকে বরণ করে নিলেও বেঁচে গেছেন তাঁরা সবাই।
একটি স্বাপ্নিক প্রজন্মের নিঃসঙ্গ বলি কর্নেল তাহের। কিন্তু কেবল সাফল্য অথবা ব্যর্থতায় নয়, তাহেরকে আমি দেখতে চেষ্টা করি তাঁর আকাঙ্ক্ষার ভেতর। অর্থ, কীর্তি, সচ্ছলতার ঘোড়দৌড়ের ভেতর এমন স্বপ্নের বারুদ কোথাও দেখি না বলে খুঁড়ে দেখার চেষ্টা করি এই বিতর্কিত আপাতব্যর্থ চরিত্রটিকে। ঠিক ইতিহাস নয়, গবেষণা নয় আবার প্রচলিত অর্থে উপন্যাসও নয়—এই তিন উপাদান মিলিয়েই শুরু করি আমার গ্রন্থ ক্রাচের কর্নেল...এক কর্নেলের গল্প ।। যুদ্ধাহত, ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটা এক কর্নেল। কিংবা এ গল্প হয়তো শুধু ওই কর্নেলের নয়। জাদুর হাওয়া লাগা আরও অনেক মানুষের। নাগরদোলায় চেপে বসা এক জনপদের। ঘোর লাগা এক সময়ের। (শেষ)
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।

আলো থেকে অন্ধকারে পতিত হওয়ার কাহিনী -৭ নভেম্বর ১৯৭৫ by সৈয়দ বদরুল আহ্সান

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। বাঙালি জাতির যে স্বপ্ন ছিল, যে প্রত্যাশা ছিল তা সবই আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যখন তথাকথিত সিপাহি জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে সামরিক শাসনকে আনুষ্ঠানিকতা দেওয়া হয়। একটু ভেবে দেখুন, ওই দিনটিতে আমরা কী হারিয়েছি। এই দেশের তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা যথা খালেদ মোশাররফ, হুদা ও হায়দারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই মিথ্যা প্রচার করা হয় যে তাঁরা ভারতীয় দালাল ছিলেন। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই আপনি অনুধাবন করবেন, এই তিনটি মানুষ কী সাহসের সঙ্গে কতটা আত্মমর্যাদা বজায় রেখেই না দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন। ওই যে তাঁদের হত্যা করা হলো, আজ পর্যন্ত সেই হত্যার বিচার হলো না। আর আমরা এই লজ্জা মাথায় নিয়েই নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে আসছি যে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, গণতন্ত্র আরও সুদৃঢ় হবে। এ সবই মুখের কথা। বাস্তব সত্য হলো এই যে যত দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, চার জাতীয় নেতার হত্যাকারী এবং ৭ নভেম্বরের হত্যাকারীদের বিচার না হয়, তত দিন আপনি আমি আমরা কেউ-ই এই দেশে সভ্যসমাজ পুনরায় গড়ে তোলার কথা ভাবতে পারি না।
আজ কিছুসংখ্যক মানুষ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলার চেষ্টা করবে যে ১৯৭৫-এর এই দিনে বাংলাদেশকে ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। সেই কথা যে পুরোটা মিথ্যে, তা বোধকরি আর আমাদের বোঝার বাকি নেই। প্রকৃত সত্য এই যে কর্নেল তাহের যখন জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতায় বসিয়ে দেন, তখন দেশকে পঙ্গু করারই একটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য অনেক ব্যক্তি এখনো রয়েছেন, যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাহেরের উদ্দেশ্য মহত্ ছিল এবং তিনি জনকল্যাণমুখী এবং সমাজতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরে। আসলেও কি তাই?
তাহেরের দেশপ্রেম সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যখনই আমাদের মনে পড়ে যায় যে তাঁর নেতৃত্বে এবং তাঁরই প্রেরণায় সেই দিন খালেদ মোশাররফের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে কথা ওঠে এবং তাঁকে মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে হেয় করা হয়, তখন আমাদের দুঃখ হয়। এরই পাশাপাশি যখন স্মরণ করি যে তাহের মোশাররফকে প্রতিহত করার জন্য জিয়ার পক্ষ অবলম্বন করেন, তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সেদিন কর্নেল তাহের একটি ভুল করেছিলেন এবং সেই ভুলের জন্য এক বছর যেতে না যেতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়। যে জিয়াকে তিনি বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করলেন এবং যে জিয়াকে ব্যবহার করে তিনি দেশে একটি বিপ্লব সংঘটিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই জিয়াই তাঁকে একটি প্রহসনমূলক বিচারের দ্বারা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন।
এই ছিল তাহেরের ভুল। কিন্তু সেই ১৯৭৫ সালে ভুল অনেক হয়েছে এবং সেটা বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে। খালেদ মোশাররফের কথাই ভাবুন না একবার। ৩ নভেম্বরে তিনি একটি শান্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন এবং তাঁর এই পদক্ষেপের ফলে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল আমাদের মনে, সে সত্য কারও ভোলার কথা নয়। খন্দকার মোশতাক ও তাঁর খুনি চক্র অবশেষে বিতাড়িত হয়েছে, সেটাই একটি আশার বাণী ছিল জাতির জন্য। মোশাররফ জাতিকে আরও দৃঢ়ভাবে, আরও জোরদারভাবে দেশকে আবার সেই পুরোনো মূল্যবোধ উদ্ধারের কাজে ব্যবহার করতে পারতেন, যে মূল্যবোধ ইতিমধ্যেই ১৫ আগস্টে ধ্বংস করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সেই ধরনের কোনো উত্সাহ মোশাররফ আমাদের দিতে পারেননি। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন সর্বমোট তিন দিন এবং এই তিন দিনই তিনি ব্যস্ত রইলেন বঙ্গভবনে রাজনৈতিক দরকষাকষি নিয়ে। তিনি বুঝে উঠতে পারেননি যে তিনি বঙ্গভবনে যতটা সময় অতিবাহিত করছেন, ততটাই তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। তাহের তাঁর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী স্লোগান উঠছে। এই দিকে আবার সংঘটিত হলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ। সেই পুরোনো ইতিহাস অবলোকন করলে অথবা স্মৃতিচারণা করলে সহজেই বোঝা যায়, সেই সময় কী গভীর এবং বেদনাদায়ক ভুলগুলো করা হয় এবং ওই সব ভুলের কারণেই ৭ নভেম্বর সকালে আমাদের জীবনে আঁধার নেমে আসে। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল এবং পরে চার নেতাকে হত্যা করল, তাদের আবার বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমরা হলফ করে বলতে পারি না, এসব খুনিকে খালেদ মোশাররফই দেশত্যাগে সাহায্য করেছিলেন কি না। কিন্তু তাঁর ক্ষমতা গ্রহণ করা সত্ত্বেও যে তিনি মুজিবনগর সরকারের চার নেতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না, সেইটি আমাদের সামনে আজ একটি বড় ধরনের সত্য।
ভুলের কথা আরও বলা যায়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে ১৫ আগস্টে কেউ রক্ষা করার উদ্যোগ নেয়নি। যে বড় মাপের মানুষ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে গেলেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে, সে মহামানবকে প্রাণ দিতে হলো অসহায়ভাবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও কিন্তু প্রচুর সময় ছিল হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার। সরকারকে রক্ষা করা যেত এবং উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন, যদি তিন বাহিনীর প্রধান সম্মিলিতভাবে খুনিদের বিরুদ্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নারকীয় ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে তিন বাহিনীর প্রধান খন্দকার মোশতাকের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করলেন। এবং তারপর তিন মাস চলে গেল কেউ কিছু করতে পারলেন না। ঠিক একইভাবে যখন ৭ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে জিয়া ও তাহের সমর্থক সৈনিকেরা রাস্তায় নেমে পড়ল, তখন আর কিছুই করা গেল না। যে লজ্জা আমাদের মাথা নত করতে বাধ্য করল তথাকথিত সিপাই-জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে, সেই লজ্জা আমাদের জীবনে আজও রয়ে গেছে।
এবং কী ছিল সেই লজ্জা? স্মরণ করুন ৭ নভেম্বরের ভয়াবহ দৃশ্যগুলো। বিভিন্ন সেনানিবাসে দেশপ্রেমিক সৈনিক ও অফিসারদের হত্যা করার পর্ব চলছে। কোনো দলিল নেই এবং কোনো প্রমাণ নেই যে কর্নেল তাহের এবং জেনারেল জিয়া চেষ্টা করেছেন খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীদের প্রাণে বাঁচাতে। রাজধানী ঢাকার সড়কে সেই পাকিস্তানি কায়দায় স্লোগান শোনা গেল পুরো উদ্যমে। যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শোনা গিয়েছিল ১৫ আগস্টের ভোরবেলায়, সেই ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ই আরও জোরালোভাবে আমাদের শোনানো হলো ৭ নভেম্বরে। গোটা বাংলাদেশটাকে মনে হলো একটি ছোট পাকিস্তান। আবার এও বলা যায় যে সেদিন আমাদের কাছে মনে হয়েছিল, দেশটি একটি বানানা রিপাবলিকে পরিণত হয়েছে। যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আমরা পাকিস্তানে সংগ্রাম করেছি এবং সংগ্রামে জয়ী হয়েছি, সেই সামরিক শাসন আবার স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের জীবনের ধারাটাকে একেবারে ইতিহাসবিরোধী একটি স্রোতে পরিণত করে দিল।
৭ নভেম্বর আমাদের আনন্দ দেয় না এবং সেটা এই কারণে যে ওই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে একটি কলঙ্ক বয়ে এনেছে। আমাদের বুঝতে সেদিন অসুবিধা হয়নি যে ৭ নভেম্বরে বাঙালিকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এবং অচিরেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই শুনতে পেলাম যে আমরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে পারব না। সেই খন্দকার আব্দুল হামিদ, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁকেই জিয়া তাঁর কাছে টেনে নিলেন। এবং এই ব্যক্তির মুখে প্রথম উচ্চারিত হয় ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর কথা। সুদূর জার্মানি থেকে এম জি তোয়াবকে দেশে আনা হয় বিমান বাহিনী পরিচালনার জন্য। তিনি একটি সিরাত সম্মেলনের আয়োজন করলেন এবং সবাইকে জানিয়ে দিলেন যে বাঙালির রাষ্ট্র পরিণত হতে চলেছে পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলমান রাষ্ট্রে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ আমাদের শিক্ষা দেয় যে দেশের নেতাদের অনায়াসে হত্যা করা যায়। এর পর যারা হত্যা করে তাদেরকে আবার কূটনীতিকের রূপ দেওয়া যায়। ৭ নভেম্বরে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছেন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। পরবর্তী সময়ে একে একে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা, সৈনিক এবং অফিসারকে আমরা হারিয়েছি। মনে পড়ে ওই সব মুক্তিযোদ্ধার কথা, যাঁদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে জিয়া হত্যার দায়ে? ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর কারণেই এ দেশে ইতিহাস বিকৃতির সূচনা হয় এবং এই দিনটি সুযোগ করে দেয় সেই পুরোনো পাকিস্তানি দোসরদের, যাতে করে তারা বাংলাদেশে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে।
এসব কথা শেষ হওয়ার নয়। আমাদের আঁধার এখনো কাটেনি। যে আলোর ভুবন আমরা তৈরি করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দ্বারা, সেই ভুবনটি আঁধারে ছেয়ে গেছে ওই দিন, যেদিন খালেদ মোশাররফকে প্রাণ দিতে হলো এই স্বাধীন দেশে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন আমাদের আলো দেখিয়েছেন এই বলে যে জেলহত্যা মামলার বিষয়ে পুনর্বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তার পাশাপাশি আমাদের দাবি এটাও থাকবে যেন, ৭ নভেম্বরের হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে তদন্ত ও বিচারের প্রক্রিয়ার সূচনা করা হয়।
আর একটি কথা। ৭ নভেম্বরের কলঙ্ক যত দিন পর্যন্ত না আমরা মুছে ফেলতে পারি, তত দিন পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, আমাদের আত্মমর্যাদা বিপদমুক্ত হবে না। যে বাঙালি ১৯৭১-এর ইতিহাস জানে, সেই বাঙালি তো জিন্দাবাদ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তার বিশ্বাস, তার দেশপ্রেম, তার সমস্ত সুন্দর চিন্তা ওই দুটি শব্দে আবদ্ধ—এবং তা হলো ‘জয় বাংলা’।
সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক।

মাদারীপুরের পথে-প্রান্তরে -প্রান্তকথা by শান্ত নূরুননবী

গানপাগল মিল্লাত হোসেন পথে পথে গেয়ে চলেছেন, ‘শাহ মাদারের নামের জেলা/ মাদারীপুর ভাই...।’ গান থেকেই জানা যাচ্ছে, মাদারীপুর জন্ম দিয়েছে বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি ফজলুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর খলিল, সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাস, হাজি শরিয়ত উল্লাহ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই চালিয়েছিলেন এ অঞ্চল থেকেই। মাদারীপুরের খেজুরের গুড়ের বিশিষ্ট্য স্বাদ। আর আছে কদম বাড়ি গণেশ পাগলা আশ্রম।
বাংলা ১৩০০ শতকের মাঝামাঝিতে এখানে এক পাগলের আবির্ভাব ঘটে। জনশ্রুতি আছে, অসাধ্য সাধনের ক্ষমতা ছিল তাঁর। যা বলতেন, তা-ই ফলত। তাঁর নামে গড়ে ওঠা এই আশ্রমে প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে হয় কুম্ভ মেলা। সাতক্ষীরা, যশোর, মেহেরপুরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল তো বটেই, ওপার বাংলা থেকেও ভক্তকুল মিছিল আকারে আসে ঢাক বাজাতে বাজাতে। লক্ষ লক্ষ ভক্তের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে মাদারীপুরের গণেশ পাগলা আশ্রম।
আবৃত্তিপাগল একজন সংগঠক উদ্ভাস-এর কুমার লাভলুর সঙ্গে অনেক ঘোরাঘুরি হলো এই শহরে। বড় নীরব এই শহর। যানজট নেই, ঠেলাঠেলি নেই, নেই শব্দদূষণের যন্ত্রণা। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁর বাঁধানো কূলে ‘শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে’ পুরো দিনের ক্লান্তি মুছে দিয়ে হূদয়ে শান্তি জোগাতে। অনতিদূরে লঞ্চঘাটের আলোগুলো মায়ার ইশারা সৃষ্টি করে যেন। কুমার লাভলুর আমন্ত্রণে সুদৃশ্য শকুনী লেকের পারে স্বাধীনতা অঙ্গনে হাজির হই। ১৯৪৭ সালের দিকে এখান থেকে মাটি তুলে জমি উঁচু করে নতুন মাদারীপুর শহরের পত্তন করা হয়। লেকের চতুর্দিকের পরিধি ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার। তখন অসংখ্য শকুন থাকত এখানে। শকুনদের আবাস আজ শকুনী লেক।
স্বাধীনতা চত্বর হলো মাদারীপুরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সমাবেশের ক্ষুদ্র ময়দান। পাশেই মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন, জীর্ণ, সংকীর্ণ। নাটক তো দূরের কথা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করারও উপযুক্ত নয়। তবুও এর ভেতর নিয়মিত চলে সংস্কৃতির নামে প্রগতির চর্চা, ডাল-পালা মেলে মাদরীপুরবাসীর সুকুমার অনুভূতি। লেকের অপর পাড়ে শিল্পকলা একাডেমী ভবনে চলছিল একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। সীমা সাহা, জবা দে, রিতু, নিতু, প্রিয়াঙ্কার গানের জাদু ঢাকা থেকে আসা রহিমা, মিজান ও শহীদের মতো আমাকেও আবিষ্ট করে। পৃষ্ঠপোষকতা নেই, ভালো মিলনায়তন নেই, তাতে কী? আছে মানুষের ভালোবাসা, শিল্পের প্রতি, সৌন্দর্যচর্চার প্রতি মাদারীপুরের মানুষের অদম্য আকর্ষণ।
মাদারীপুরের পরিচিত মুখ, সাংবাদিক পলাশের কাছে জানলাম, শহরসংলগ্ন চরমুগুরিয়ার বানরগুলো ভালো নেই। খাদ্যাভাব চরমে উঠেছে এই প্রাণীগুলোর। জঠর জ্বালায় অস্থির ওরা বাড়ি-ঘরে অনুপ্রবেশ করে আজকাল। রান্নাঘর, শোবার ঘর ওলট-পালট করে খাবার খোঁজে। বানরগুলোর জন্য মায়া আছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। কিন্তু আর কত সওয়া যায়। মাদারীপুর লিগ্যাল এইডের কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘এখন মানুষ নিজের মা-বাপরেই খাইতে দিতে পারে না, বানরদের কী খাওয়াইব?’ এর আগে বানরদের খাওয়ানোর জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল, এখন তাও বন্ধ। কেন বন্ধ, তা কেউ বলতে পারে না। অথচ এখনো চরমুগুরিয়ায় বানর আছে প্রায় আড়াই হাজার। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী ভিড় জমায় চরমুগুরিয়ায় বানরের কাণ্ডকারখানা দেখতে। তারাই হাতে করে কলা, চীনা বাদাম ইত্যাদি নিয়ে যায়। বানরেরা তাই দর্শনার্থী দেখলে খুশি লুকিয়ে রাখে না। তবে বানরকে এভাবে খাবার দেওয়া ওদের জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনবে কি না, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ কারও নেই। একবার আড়িয়াল খাঁর ওপারে বানরগুলোর জন্য বিকল্প অভয়ারণ্য গড়ে তোলার কথা শোনা গিয়েছিল। সে রকম কোনো বাস্তব উদ্যোগ আদৌ নেওয়া হয়েছে কি না জানা যায়নি। এখন এলাকাবাসী বানরের উত্পাত থেকে যেমন মুক্তি চায়, তেমনি চায় প্রাণীগুলোর বাসস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা। কেবল কর্তৃপক্ষই এ ব্যাপারে উদাসীন।
মাদারীপুর থেকে ফেরার পথে দেখি, এম এম হাফিজ পাবলিক লাইব্রেরির ভেতর অনেক পাঠক একাগ্র পাঠে মগ্ন। বইপাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়নি একেবারে। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই লাইব্রেরি থেকেই পরিচালিত হয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মাদারীপুর শাখার কার্যক্রম।
বইয়ের প্রসঙ্গ আসতেই স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রতন কুমার দাসের কাছে জানলাম ডা. আব্দুল বারি সম্পর্কে। তিনি ইতিহাসের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। তাঁর দেখা না হলে নিভৃতে থাকা দেশের এই জ্ঞানী ব্যক্তির সম্পর্কে হয়তো কোনো দিন জানাই হতো না।
অন্ধকার চেম্বারে মোমের আলো জ্বালিয়ে ভক্ত-বন্ধুদের ইতিহাসের নানা সত্য শুনিয়ে যাচ্ছিলেন আব্দুল বারি। তাঁর কথা বলার সময় অন্য দিকে তাকানো বারণ, নোট নেওয়া নিষেধ; তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে মনোযোগ দিয়ে। বললেন, ‘নারীজাগরণে আপনাদের রংপুরের বেগম রোকেয়ার অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তাঁরও আগে, বাংলার নারী উন্নয়নে নবাব ফয়জুন্নেছা, কামিনী রায় বা আমাদের কুসুম কুমারীদের কথা আমরা একবারও উচ্চারণ করব না কেন! তেমনি ধরেন আজকে আমাদের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পেছনে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে ভুলতেই বসেছি।’ তাঁর ক্ষেদ, গান্ধীজির অহিংস আলোর ঝাপটায় নেতাজি হারিয়ে যাচ্ছেন। তাই তিনি বাংলায় নেতাজিকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছেন। গতানুগতিক জীবনীগ্রন্থ নয় এটি। তিনি বলেন, নেতাজিকে নিয়ে এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা বই। ৩৬৮ পৃষ্ঠার এই মূল্যবান বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকার বিভাস। বইতে আছে নেতাজির জীবন, সংগ্রাম, বিশ্বাস ও আদর্শের চমকপ্রদ বিবরণ। বইয়ের পাতায় পাতায় আছে নেতাজিসহ তাঁর সহযোদ্ধা এবং তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আসবাব, পোশাক, অস্ত্র, স্থান, দলিল, চিঠি ইত্যাদির অসংখ্য সাদা-কালো ফটোগ্রাফ। কত কষ্টই না করেছেন তিনি বইটি লিখতে! ঘুরেছেন এশিয়া-আমেরিকার নানা দেশ। কিন্তু রয়ে গেছেন মাদারীপুরে, মাটির টানে।
তিনি জানান, ‘আমি যা তার থাইকা বেশি কিছু লেখছি। এইটা কোনো নামকরা কেউ লিখলে লোকে আগ্রহ করে কিনত। তবে আমি বাজারে বেচতে চাই না। যারা সত্যিকারের ইতিহাস জানতে চায়, তাদের হাতে পৌঁছালেই খুশি হতাম।’ আরও বই লিখেছেন তিনি। বিস্মৃত বাঙালী, বাংলার নারী (৪৭ পূর্ব), অগ্নিযুগের বাঙালী বিপ্লবী ও বৃহত্তর মাদারীপুরের ইতিহাস প্রকাশের কাজ চলছে। ইতিহাস বয়ানের এক সহজ, সরল, আকর্ষণীয় ভাষা তাঁর আয়ত্তে। যেন কালের সাক্ষী কেউ গল্প শোনাচ্ছেন পাঠককে। কামনা করি, ডা. আব্দুল বারির বই ইতিহাসপ্রেমী মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যাক।
শান্ত নূরুননবী: লেখক ও উন্নয়নকর্মী।

দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো -ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা by আশীষ-উর-রহমান

গগনচুম্বী অপচয়
বিমানে নাকি হিড়িক পড়েছে উড়োজাহাজ ভাড়া করার। কোনো বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ছাড়াই তারা উদ্যত ১১টি হাওয়াই জাহাজ ভাড়া নিতে। আমাদের বিমান গত ১৭ বছরে শুধু মেরামতি ও ক্রয়কাজে মাত্র ৭০০ কোটি টাকা অপচয় করছে। দেশবাসীকে এ তথ্য পরিবেশন করছেন জাতীয় সংসদের সংসদীয় উপকমিটি। যা হোক, তবু দেশবাসী এই উচ্চমার্গীয় ব্যাপারস্যাপার জেনে ধন্য হলেন। সাধারণ লোকের পক্ষে এক জমিজিরাত বেচে বিদেশে গতর খাটতে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে চিরকালই উড়োজাহাজ তাদের ধরাছোঁয়ার বহু বাইরে মুখ তুলে আকাশে তাকিয়ে উড়ে যেতে দেখার জিনিস। এমন উচ্চমার্গগামী বস্তুর কোনকাটা মেরামতিতে তো এমন অঙ্কই উপযুক্ত। তবে অঙ্কটি চলে গেছে অপচয়ের খাতে এই যা। আকাশচারীর গগনচুম্বী অপচয় হবে না তো কি ঠেলাগাড়ির মতো জিনিসের হবে? বছরে গড়পড়তা ৪২ কেটি টাকার কাছাকছি। প্রতিমাসে কোটির ওপরে। অপচয়ের অঙ্কই বলে দিচ্ছে এ অবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানের লাভের মুখ দেখার আশা করা আহাম্মকি। অবশ্য আমাদের বিমানের উদ্দেশ্য মহত্। তারা দেশবাসীকে সেবা দিচ্ছে (বিদেশিরা নিতান্ত দায়ে না ঠেকলে বিমানে চড়েন না), লাভের মতো বাণিজ্যস্বার্থকে তারা সে কারণেই হয়তো পরিত্যাজ্য জ্ঞান করেছে। হাওয়াই জাহাজ বলে কথা। হাওয়া মার্গের বিষয় পায়ে হাঁটা লোকের মোটা মগজে না ঢোকারই কথা। অপিচ তারা না বুঝে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করে বসবেন বলেই হয়তো এ ধরনের হিসাবপত্র সব সময় সাধারণ্যে প্রকাশ করা হয় না। নয়তো ১৭ বছর ধরে যে অপচয়ের তুঘলকি চলছিল, তা প্রথম চোটেই বন্ধ করা হলো না কেন? পানির পাত্র ফুটো হলে লোকে তো আগে পাত্রের ফুটো বন্ধ করেন; এরপর সেখানে পানি ভরেন। অথচ আমাদের উচ্চপর্যায়ের কর্তারা ফুটো কলসিতেই ১৭ বছর ৭০০ কোটি টাকা ঢেলে তারপর সেই তথ্য জানালেন দেশবাসীকে। হ্যাঁ, বিষয়টি যে আদপেই উচ্চমার্গীয় অন্তত অপচয়ের অঙ্ক দেখে এবার তা হূদয়ঙ্গম করতে পারবেন গরিব দেশের নুন আনতে পান্তা ফুরোনো আমজনতা। এখন দেখা যাক হাওয়াই জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রে কী চমক উপহার দেয় তারা।
শালা-দুলাভাই রসায়ন
শ্যালক-ভগ্নিপতির সম্পর্ক বাংলায় বড়ই মধুরতর। ছানার গোল্লার সঙ্গে যেমন চিনির সিরার রসায়ন। কাজেই দুলাভাই সুযোগ পেলে শালার নাম ভাঙাতেই পারেন। নিজের শালা তাতে গোস্সা না হলে অন্যের গাত্রদাহ কেন? অন্তত হাওয়া অনুচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় কলেজ অধ্যক্ষ দুলাভাই তার সাংসদ শ্যালকের নাম ভাঙিয়েছেন। ভাঙানোর মতো নাম কি সবার থাকে নাকি? যাদের আছে তারা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। ভাগ্য যখন সহায়তা দিয়েই রেখেছে, তখন তাকে সদ্ব্যবহার করতে বিরত থাকবেন এত নির্বোদ্ধা নয় এ যুগের বাঙালি। অতএব দুলাভাই শ্যালকের নাম-মাহাত্ম্যের কল্যাণে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে একটু সচেষ্ট হয়েছেন মাত্র। কী-ই বা এমন জগচ্ছাড়া কাজ! মাত্র তো আড়াই কোটি টাকার দরপত্র। এলজিইডির। অন্য প্রতিযোগীদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিজের করে নিয়েছেন। সমঝোতা তো খুবই ভালো জিনিস। সেই সমঝোতার পথেই তিনি কাজটি নিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে। যারা সমঝোতায় আসতে চায়নি, তাদের একটু ধমক-ধামক দিতে হয়েছে বটে। এটুকু তো দিতেই হয়। ভালো কাজে কি সবার মন থাকে নাকি! জগতের এই এক মুসিবত। তখন বেয়াড়াদের দিকে একটু চোখ গরম করে তাকাতে হয়। এটা তো জগতেরই নিয়ম। অতএব সবকিছু নিয়মমাফিকই হয়েছে। অথচ এ নিয়ে পত্রপত্রিকাওয়ালারা অযথাই পানি ঘোলা করছে। প্রথম আলো দুই কলাম জুড়ে প্রতিবেদন করে দিল! সাধে কি আর নাম-মাহাত্ম্য যাদের আছে, তারা পত্রপত্রিকাওয়ালাদের ওপর রুষ্ট হন। দুলাভাই যে এত করে বলছেন তার কোনো কসুর নেই, সব নিয়মমাফিক হয়েছে, কিন্তু সে কথায় কান দিলে তো! কান নিয়েছে চিলে, অমনি সবাই ছুটছে চিলের পিছু পিছু। না, দেশটার এ কারণেই উন্নতি হচ্ছে না!
অন্তিম আশা
বিশ্ব প্রশমন দিবস এবার পালিত হলো আমাদের দেশে। বিষয়টি নতুন বিধায় অনেকেই সম্মক অবগত নন। চিকিত্সকেরা ঢাকায় সম্প্রতি এ নিয়ে এক সেমিনারে বলেছেন, এটি বিশেষ এক ধরনের চিকিত্সা। ক্যান্সার বা এমন দুরারোগ্য ব্যাধিতে যারা আক্রান্ত, তাদের অন্তিম দিনগুলো অত্যন্ত যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই দুঃসহ যন্ত্রণার উপশম দেওয়ার জন্যই এই প্রশমন বিষয়ের চিকিত্সা। এতে শুধু চিকিত্সকেরাই নন, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির যন্ত্রণা লাঘবে রোগীর স্বজনদেরও সহমর্মিতা নিয়ে সহায়তা দিতে আসা উচিত। প্রশমন বিভাগ নামের একটি বিভাগও খোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যাপিত জীবনের দিনগুলো পাড়ি দিতে মানুষের বহু ঝক্কি-ঝামেলা, কষ্ট-ক্লান্তি সহ্য করে এগিয়ে আসতে হয়। খুশি-আনন্দ থাকে না তা নয়। তবে এমনি বলা হয়েছিল যে ‘সংসার পথ সংকট অতি কণ্টকময় হে।’ তো সেই কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে বিদায়ের দিনগুলো যেন একটু স্বস্তিতে শান্তিতে কাটে, এই তো মানুষের চিরকালের চাওয়া। প্রশমনের বিষয়টি সেই চাওয়াটুকু পূরণের একটি সহায়ক উদ্যোগ।
আমাদের অনেক ভালো উদ্যোগই শেষাবধি খাপছাড়াভাবে সম্পন্ন হয়। এই উদ্যোগটি অন্তত তার উদ্দেশ্য ঠিক ঠিক পূরণ করুক। তাতে যন্ত্রণাকাতর মৃত্যুপথযাত্রী কিছু মানুষ অন্তত শান্তিতে চোখ বুজতে পারবেন। শান্তিময় মৃত্যুর চেয়ে প্রগাঢ় প্রত্যাশা আর কী আছে মানুষের!
হেমন্তের দিন
মৌসুম বদলাচ্ছে। রোদের আঁচে তার আভাসটি আছে, তবে এখনো তা খুব মৃদু। দিনের দৈর্ঘ্য কমছে, সেও এমন নয় যে বেলা গড়াতেই সন্ধ্যার আবছায়া নেমে আসছে। এখনো সে মাপজোক আমলে আনা সতর্ক পর্যবেক্ষণের বিষয়। কাঁচাবাজারে নতুন সবজির আগমন। বদলের লক্ষণ হিসেবে একে ধরতে চাইলে ধরা যেতে পারে, তবে কৃষিতে যে আধুনিক প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে, এতে এখন ভরবছরই নানা জাতের শাকসবজি দুর্মূল্য সত্ত্বেও সুপ্রচুর। ফলে সবজির ওপর নির্ভর করে ঋতু বদলের সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি এড়ানো যায় না। এ ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়ার উপায় হলো ঢাকা শহরের ফুটপাতের দিকে তাকানো। পথের পাশে বেশ কয়েক দিন থেকেই বিকোচ্ছে গুড়-নারকেল দেওয়া ভাপা আর গরম গরম চিতই। আরা যা কিছুই চাই না হোক, বাংলায় শীতের আগমনীর দূত হিসেবে পিঠার মতো কিছু হয় না। সেই পিঠাই প্রমাণ, বদলে যাচ্ছে মৌসুম। দরজায় কড়া নাড়ছে শীত।
নিসর্গের এ শহরে কুণ্ঠিত, দ্বিধাজড়িত। তার শ্যামল স্নিগ্ধতা, ঋতুতে ঋতুতে তার রূপ বদলের যে বৈচিত্র্য, এর প্রকাশ এখানে সুলভ নয়। চরমভাপাপন্ন দু-একটি ঋতু বাদ দিলে বাদবাকি ঋতুগুলো কখন আসে আর কখন যায়, দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টায় ছত্রিশ রকমের কাজে ব্যস্ত নাগরিকের পক্ষে তা ঠাহর করাই মুশকিল। কিন্তু আমাদের এই ঢাকা মহানগরের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যও আছে। এখানে বহু মানুষই এসেছে গ্রাম থেকে। মাটির কাছাকাছি তাদের অবস্থান। ঋতুর বদল তারাই টের পায় আগে। পিঠাপুলির পসরা সাজিয়ে হেমন্তের শুরুতেই ঋতু বদলের বার্তা নিয়ে এসেছে তারাই। বিকোচ্ছেও প্রচুর। ভাপা পাঁচ ও দশ, চিতই তিন টাকা। দুর্মূল্যের বাজারেও পিঠার দাম বাড়েনি, গতবারের মতোই আছে জানালেন বিক্রেতারা। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’—বাঙালির চিরকালের প্রত্যাশার কথাটা উঠে এসেছিল মধ্যযুগের কবির পঙিক্ততে। দুধভাত সব বঙ্গসন্তানের কাছে এখনো অস্পৃশ্য দূরত্বেই রয়ে গেছে। বছরের একটি মৌসুমে অন্তত কিছু পিঠাপুলি তার নাগালে থাকুক।
দুর্বলেরে রক্ষা করো
দুটি ছবি। ফুলদানিতে সাজানো ফুল নিয়ে দাঁড়ানো পাশাপাশি তাঁরা। ফুলের মতোই স্নিগ্ধ সুন্দর দুই বোন। অন্য ছবিটি বড়ই মর্মান্তিক। তাঁরাই দুই বোন। হাসপাতালের বিছানায় শায়িত। এসিডে ঝলসে গেছে তাঁদের ফুলের মতো কোমল মুখ। প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে তাঁদের ছবি। কুষ্টিয়ার খোকশার কমলাপুরের শিলা ও নিলুফা। বড় নিলুফা শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি এসেছিলেন ছোট বোন শিলার বিয়েতে। বিয়ের আগের রাতেই ঘুমিয়ে থাকা তাঁদের ওপর জানালা দিয়ে এসিড ছুড়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ওঁদের বাবা মামলা করেছেন থানায়।
কয়েক দিন আগে আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল বগুড়ার শেরপুরে। এক বীরপুঙ্গব এসিডে ঝলসে দিয়েছে মৌ নামের স্কুলে পড়া এক কিশোরীকে। তারপর যা সচরাচর হয়ে থাকে আমাদের এখানে, ঘটনা তা-ই। যন্ত্রণাকাতর মেয়েকে নিয়ে তার পরিবার ঢাকায় এসেছে চিকিত্সা করাতে। আর ওই দুরাত্মা পালিয়ে গেছে। থানায় মামলাও হয়েছে। তবে পুলিশ নাকি তাকে খুঁজেই পাচ্ছে না। শিলা-নিলুফার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দুর্বৃত্তরা উধাও কর্পূরের মতো একবোরে নিঃশেষে উবে যাওয়া তো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, আছে তারা কোথাও ঘাপটি মেরে। পরিস্থিতি বুঝে কিছুদিন পর বেরিয়ে আসবে নিশ্চয়ই। এবং অবধারিতভাবে এসে হুমকি-ধমকি দেবে মামলা তুলে নিতে। না হলে...। একপর্যায়ে অভিভাবকেরা হাল ছেড়ে দেবেন। এক জীবনযন্ত্রণা নিয়ে কাটবে ফুলের মতো কোমল এই মেয়েদের পরমায়ু। এই তো হয় আমাদের এখানে।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ১,৮০৫ জন নারী ও ৭১৪ জন শিশু এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। এসিড নিয়ন্ত্রণে সরকার একটি আইন করছে বটে কিন্তু বাস্ততার প্রয়োগ নেই। ফলে যত্রতত্র এসিড পাওয়া যাচ্ছে এবং তা ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে প্রধানত নারী ও শিশুদের ওপর। ২০০২ সালে শাস্তির আইন হয়েছে। সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। তবে এখনো কেউ সেই সাজা ভোগ করেনি। ফলে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি, অপরাধের দৃষ্টান্তই শুধু বাড়ছে।
আসলে আমাদের সবগুলো ব্যাপারই কেমন যেন এক ধরনের গোলমেলে হয়ে পড়ে। যা হওয়ার তা না হয়ে অন্য রকম হয়ে যায়। দুনিয়াজোড়াই বিশেষ সম্মান আর প্রযত্ন দেওয়া হয় নারী ও শিশুদের প্রতি। অথচ আমাদের এখানে তাদের ওপরই ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে এসিডের মতো দাহ্য পদার্থ। প্রতিকারহীন ঘটনাপরম্পরা। আমাদের কী করণীয় তা বলে গিয়েছিলেন কবি—‘দুর্বলেরে রক্ষা করো দুর্জনেরে হানো...।’ আমরা গানটি গেয়েছি শুধু, কাজে তা পরিণত করিনি কখনো।
আশীষ-উর-রহমান: সাংবাদিক।

মাছের আকাল ঠেকাতে এর ব্যবহার বন্ধের বিকল্প নেই -কারেন্ট জালের যথেচ্ছ ব্যবহার

কারেন্ট জাল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে, এ থেকে জাটকা বা পোনা মাছও রেহাই পায় না। ফলে তা দীর্ঘ মেয়াদে মত্স্যসম্পদের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ থাকলেও এর ব্যবহার থেমে নেই। প্রথম আলোর ক্রোড়পত্র ‘আলোকিত চট্টগ্রাম’-এ ৫ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কক্সবাজারে প্রায় ছয় হাজার ট্রলারে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে মাছ ধরা হচ্ছে। কক্সবাজার শহরের ফিশারিঘাট, নুনিয়াছটা ও বাঁকখালী নদীর মত্স্য অবতরণকেন্দ্রে বেশি পরিমাণে এ ধরনের জালের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলাতেও এর যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। এসব জাল থেকে মা-ইলিশ, জাটকাসহ অন্যান্য প্রজাতির ছোট মাছও রক্ষা পাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে মাছের আকাল দেখা দিতে পারে।
কক্সবাজার জেলা মত্স্য বিভাগ অনিয়মিতভাবে কিছু অভিযান পরিচালনা করে ঠিকই, কিন্তু তাতে কারেন্ট জালের ব্যবহার কিছুতেই কমছে না। বোটমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করেছেন, মত্স্য বিভাগের তদারকি না থাকায় সাগর-উপকূলে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বাড়ছে। কক্সবাজারে হাজার হাজার কারেন্ট জালের ব্যবহার যেন সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে ব্যঙ্গ করছে।
শুধু কক্সবাজারই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ কারেন্ট জাল দিয়ে নির্বিচারে জাটকা, রেণু পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন করা হচ্ছে। এই নিধনের ফলে দেশের মত্স্যসম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ অশুভ প্রবণতা বন্ধ না হলে অচিরেই মাছের আকাল দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জনগণের একটি বড় অংশ প্রাণিজ আমিষ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই মত্স্যসম্পদ রক্ষায় কারেন্ট জালের ব্যবহার, উত্পাদন ও বিপণন বন্ধ করার বিকল্প নেই। এ জন্য নদীগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি, অভিযান চালানো ও নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

কেনার চেয়ে বেশি দামে ভাড়া নেওয়া কেন -বিমানের উড়োজাহাজ ভাড়া

‘বাংলাদেশ বিমান’ ও ‘দুর্নীতি’—এ দুটি যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। উড়োজাহাজ কেনা ও ভাড়ার ক্ষেত্রে বিগত সব রাজনৈতিক সরকারের ধারাবাহিকতায় এবারও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, যে চারটি বোয়িং ৭৭৭ ভাড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ভাড়া বাবদ চার বছরে তার জন্য খরচ দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার ৫০ কোটি টাকা। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ যোগ করলে ভাড়া বাবদ ব্যয় আরও বাড়বে। অথচ বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, পুরোনো বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর চারটি উড়োজাহাজের বিক্রয়মূল্য এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। উড়োজাহাজ কেনার চেয়েও ভাড়া বেশি হলে উড়োজাহাজ ভাড়া করতে হবে কেন? তাহলে কি ভাড়া করার পরিকল্পনা নেওয়ার সময় এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়নি? এটা-কি নিছক অদক্ষতা, নাকি মধ্যস্বত্বভোগীদের ‘কমিশন-বাণিজ্যের’ স্বার্থ দেখতে গিয়ে তারা বিমানের স্বার্থ বিবেচনার ধার ধারেননি?
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করা হলেও এটি অচলায়তনের বৃত্ত থেকে এখনো বেরোতে পারেনি। কোম্পানিতে পরিণত করা হলেও বাংলাদেশ বিমান চলে বাংলাদেশের জনগণের টাকায়। এর শতভাগ মালিকানা সরকারের হাতেই। দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বুদ্ধিমত্তা, সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করা হলে এটিকে লাভজনক করা অসম্ভব ছিল না। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে বিমান যেভাবে চলছে, সেভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। বিমানের খোলনলচে বদলে ফেলে এটিকে ব্যবসায়িকভাবে মোটামুটি সচ্ছল-স্বনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া একান্ত জরুরি।
এ জন্য বিমানের ব্যবসা বোঝেন, অভিজ্ঞতা আছে, এমন কাউকে এ সংস্থা পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে। অবসরপ্রাপ্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র বানিয়ে বিমানকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যাবে না।
বাংলাদেশ বিমানের সেবার মান খুব সুবিধার নয়; এর ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে অহরহ প্রশ্ন ওঠে। আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে এতগুলো উড়োজাহাজ ভাড়া নেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। বিমান এই আর্থিক চাপ কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিমানকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করার কৌশল খুঁজে বের করতে হবে সরকারকে। এ জন্য বিমানসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পেশাদারদের নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এবার কার্যালয়ে ঢুকে গুলি, নিহত ১

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাকের পর এবার অরল্যান্ডো শহরে এক বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছে। এতে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার অরল্যান্ডো শহরে একটি কার্যালয়ে ঢুকে বন্দুকধারী এ ঘটনা ঘটায়। পুলিশ অবশ্য পরে বন্দুকধারীকে গ্রেপ্তার করেছে।
অরল্যান্ডো পুলিশ জানায়, জ্যাসন রড্রিগুয়েজ নামের ৪০ বছর বয়সী ওই বন্দুকধারী একসময় ওই কার্যালয়ে চাকরি করতেন। রড্রিগুয়েজ তাঁর মায়ের বাসায় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বলে অরল্যান্ডোর পুলিশপ্রধান ভ্যাই ডেমিংস জানান।
বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়, রড্রিগুয়েজ রেনল্ড স্মিথ অ্যান্ড হিল নামের একটি প্রকৌশল সংস্থায় কাজ করতেন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ২০০৭ সালে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
গতকাল শুক্রবার গ্রিনিচমান সময় বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রড্রিগুয়েজ সে কার্যালয়ে ঢুকে গুলি চালায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অফিসকর্মীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। এ সময় রড্রিগুয়েজের গুলিতে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার টেক্সাসের একটি সামরিক ঘাঁটিতে বন্দুকধারী মেজরের গুলিতে ১৩ জন নিহত হওয়ার পরদিনই অরল্যান্ডোতে এ ঘটনা ঘটল।

সোমালিয়ায় ‘ব্যভিচার’-এর অভিযোগে পাথর মেরে হত্যা

সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে কট্টর মৌলবাদীরা ব্যভিচারের অভিযোগ এনে গতকাল শুক্রবার এক ব্যক্তিকে পাথর মেরে হত্যা করেছে। মৌলবাদীরা অবশ্য তাঁর সন্তান সম্ভাবা প্রেমিকাকে সন্তান জন্মের আগ পর্যন্ত রেহাই দিয়েছে। তবে সোমালিয়ার কট্টর মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন আল শাবাবের একজন মুখপাত্র জানান, ‘শিশু সন্তান জন্মের পর ওই মেয়েটিকে হত্যা করা হবে।’
আবাস হোসেন আবদিরহমান (৩৩) নামের ওই ব্যক্তিকে মেরকা শহরে প্রায় ৩০০ লোকের সামনে পাথর মেরে হত্যা করা হয়। পাথর মারার সময় তিনি চিত্কার করছিলেন। তাঁর বেয়ে তখন প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সাত মিনিট পর তাঁর দেহ নিথর হয়ে যায়। আল-শাবাব কর্মকর্তা শেখ সুলদান আলা মোহামেদ দাবি করেন, আবদিরহমান একটি ইসলামী আদালতে ব্যভিচারের কথা স্বীকার করেছেন।
বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়, ওই নারীকে হত্যা করা হলে তাঁর শিশু সন্তানকে লালন-পালনের জন্য স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সোমালিয়ায় ১৮ বছর ধরে কোনো নিয়মতান্ত্রিক একক সরকারের অস্তিত্ব নেই। রাজধানী মোগাদিসু ও এর আশপাশের এলাকায় কেবল জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের কর্তৃত্ব রয়েছে। আর সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে ইসলামপন্থী দলগুলো। ওই অঞ্চলে তাঁরা কট্টর শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালাচ্ছে। গত এক বছরে বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক ও অন্যান্য ‘অনাচার’-এর অভিযোগে সোমালিয়ায় আরও দুজনকে পাথর ছুড়ে হত্যা করেছে মৌলবাদীরা। গত বছর ধর্ষিত হওয়ার পরও ১৩ বছরের একটি শিশু-কন্যাকে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। মানবাধিকার কর্মীরা জানান, ওই শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট শেখ শরিফ শেখ আহমেদ বলেন, ‘আল শাবাব মানুষ হত্যা ও নারী নির্যাতনের মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’
আল-শাবাব সোমালিয়ায় নারীদের মোটা কাপড়ের পোশাক পরতে বাধ্য করছে। তারা চায়, নারীরা পুরো শরীর ঢেকে চলুক। কিন্তু এর পেছনে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট শেখ শরিফ বলেন ‘এ ধরনের পোশাক তারা বিক্রি করে। তারা নারীদের এই পোশাক কিনতে বাধ্য করে।’

ফিলিস্তিনে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না আব্বাস

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আগামী জানুয়ারিতে আবার নির্বাচন করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। স্থানীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে পুনরায় শান্তি আলোচনা নিয়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে আগামী নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা হামাস বলেছে, তারা গাজায় কোনো নির্বাচন হতে দেবে না। অবশ্য ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আব্বাসের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে আব্বাস যে অবস্থানেই থাকেন না কেন, তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন।

যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরোধী -মরক্কোয় হিলারি ক্লিনটন

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের ব্যাপারে ওয়াশিংটনে অবস্থানের কথা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের এই বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করে। গত মঙ্গলবার মরক্কোর ম্যারাক্যাচে ‘সিক্সথ ফোরাম ফর দ্য ফিউচার কনফারেন্স’-এ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের কথা জানান।
হিলারি ক্লিনটন বলেন, ইসরায়েলি বসতির ব্যাপারে ওবামা প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার ও স্পষ্ট। সেটা বদলায়নি। বিরামহীনভাবে ইসরায়েলের বসতি স্থাপনের বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্র বৈধ বলে মেনে নিতে নারাজ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসলিম বিশ্বে বাণিজ্যিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আরও বেশি করে শোনা এবং সহযোগিতার পথ খুঁজে বের করা, যাতে আমরা অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারি।’ তিনি উদ্যোক্তাদের উত্সাহ দান, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়া ও নারীর শিক্ষার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
হিলারি বলেন, আন্তরিকতাহীন অলংকারবহুল ভাষা নয়, কাজের ফলই আসল ব্যাপার বলে তাঁর বিশ্বাস। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি শক্তি, ঋণ প্রাপ্তির মতো মৌলিক চাহিদার দিকে সব সম্প্রদায়েরই নজর থাকে বেশি।

স্ত্রীকে সতর্ক করলেন সারকোজি

স্ত্রী কারলা ব্রুনিকে তাঁর নিজের পদমর্যাদার যথাসম্ভব কম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি। সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে, ব্রুনি তাঁর স্বামীর প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক নানা সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। প্রেসিডেন্টকে তিনি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমেও বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে।
কার্লা ব্রুনির এক বন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ জানায়, প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে স্ত্রী ব্রুনির কাছে এ ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন। তিনি ব্রুনিকে রাজনৈতিক ব্যাপারে মাথা না ঘামানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে তাঁর ডানপন্থী রাজনৈতিক মিত্র দল সারকোজির সমালোচনাও শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, ব্রুনি তাঁর বামঘেঁষা মতাদর্শ নিয়ে প্রেসিডেন্টের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছেন। এমন সমালোচনা ওঠার পর ব্রুনিকে তিনি চুপ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
সারকোজির ইউএমপি পার্টির সদস্যরাও অভিযোগ তুলেছেন, প্রেসিডেন্ট তাঁর সাবেক সুপার মডেল স্ত্রীর কথায় বশীভূত হয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এখন ব্রুনিকে এ যুগের ‘ম্যারি আনতোইনেত্তে’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এর আগের স্ত্রীকে নিয়েও সারকোজি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন। বর্তমান স্ত্রী ব্রুনিকে নিয়েও ফের বিড়ম্বনায় পড়লেন তিনি। এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে ফ্রান্সের ৩৯ ভাগ মানুষ এখন তাঁকে সমর্থন করেন। ২০০৭ সালের নির্বাচনের পর তাঁর জনপ্রিয়তায় এমন ভাটা আগে কখনো পড়েনি। সামনের মার্চে দেশের স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ অবস্থায় দলের ভাবমূর্তি উদ্ধারে সারকোজি এ উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে অনেকে মনে করছেন।

রিয়ালিটি শোতে মিশেল ওবামা

একটু ব্যতিক্রমী বা ভিন্নধর্মী কিছু করার জন্য তিনি আগে থেকেই পরিচিত। তাঁর পর্যায়ের অন্য সবাই যা করেন, তিনি তা থেকে খানিকটা ব্যতিক্রমী হওয়ার চেষ্টা করেন। এই আচরণের জন্য ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা ইতিমধ্যে মার্কিনিদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছেন। তবে এসবের জন্য নিন্দুকও কম জোটেনি মিশেলের।
নতুন খবর হলো, হালের এই অন্যতম ক্ষমতাশালী নারী একটি টিভি রিয়ালিটি শোতে অংশ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় টিভি রিয়ালিটি শো ‘আয়রন শেফ আমেরিকা’য় তিনি অতিথি শিল্পী হিসেবে হাজির হন। এই শোতে ব্রিটিশ শেভ নাইজেলা লসন বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
‘আয়রন শেফ আমেরিকা’ বিখ্যাত রাঁধুনিদের নিয়ে করা হয়। এই শোর জন্য হোয়াইট হাউসে বসেই মিশেলকে ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছে। আগামী বছর এ শো সম্প্রচার করা হবে।
শোতে অংশ নিতে গিয়ে মিশেল রান্না করেছেন। রান্নার অনেক উপকরণ তিনি হোয়াইট হাউসের বাগান থেকে সংগ্রহ করেছেন। মিশেল নিজ হাতেই ওই সব সবজি চাষ করেছেন।
অনেকের ধারণা, মিশেল প্রচারণার জন্য এ শোতে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তা নয়। বেশি করে শাক-সবজি খেয়ে সুস্থ-সবল জীবন যাপনে উত্সাহিত করতেই মিশেল এ শোতে অংশ নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ লাখ দর্শক এ শো দেখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে কয়েকজন বিখ্যাত রাঁধুনির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যাবে মিশেলকে। তিনি শিশুদের সুস্বাস্থ্যের জন্য শাক-সবজির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন।

পাকিস্তানে জঙ্গিদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে সেনা অভিযান, নিহত ২৪ -বন্দুকধারীদের গুলিতে সেনা কর্মকর্তা আহত

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গতকালশুক্রবার দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে জঙ্গিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে অভিযান চালিয়েছে। এতে ২৪ জঙ্গি নিহত হয়েছে এদিকে রাজধানী ইসলামাবাদে গতকাল বন্দুকধারীদের গুলিতে একজন সেনা কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। এ সময় তাঁর গাড়িচালকও আহত হন। একটি মোটরবাইকে করে এসে অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীরা এ হামলা চালায়।
সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, সেনারা তিন দিক থেকে অগ্রসর হয়ে জঙ্গিদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মাকিন গ্রামে ঢোকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘মাকিন গ্রামে ঢুকতে গিয়ে আমরা খুব একটা বাধার মুখে পড়িনি। সেনারা এখন এলাকাটি বিস্ফোরকমুক্ত করছে। একই সঙ্গে তারা সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।’
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, মাকিন গ্রামে সংঘর্ষে ২৪ জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে কোনো সামরিক মুখপাত্রের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল ইসলামাবাদে অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীদের গুলিতে আহত ব্যক্তিদের পরিচয়ের ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পুলিশ। তবে একজন সামরিক কর্মকর্তা জানান, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ব্রিগেডিয়ার রয়েছেন। ডন টেলিভিশন জানিয়েছে, একটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে ওই ব্রিগেডিয়ার কাজ করেন।
মধ্য অক্টোবরে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযান শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ইসলামাবাদে সেনাদের ওপর হামলা চালানো হলো।
গত ২২ অক্টোবর একই ধরনের হামলায় একজন ব্রিগেডিয়ার ও তাঁর গাড়িচালক নিহত হন। এ ঘটনার কয়েক দিন পর একটি সামরিক যান লক্ষ্য করে গুলি করে বন্দুকধারীরা। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তালেবান হামলার আশঙ্কা উপেক্ষা করে করাচিতে ফ্যাশন উইক

র্যাম্পে একের পর এক হেঁটে চলেছেন স্বল্পবসনা সুন্দরীরা। কারও পরনে অফ শোলডার, ব্যাকলেস গাউন। কেউ বা পরে আছেন হল্টার নেক টপ। দৃশ্যটি পাকিস্তানের করাচি শহরের একটি ফ্যাশন উইকের। বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই এ দৃশ্য স্বাভাবিক হলেও জঙ্গি হামলায় ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তানে এই ছবি বিরল। জঙ্গি হামলার আশঙ্কা উপেক্ষা করে গত বুধবার শুরু হয়েছে করাচি ফ্যাশন উইক। বিপুল দর্শক টানছে এই ফ্যাশন শো।
সম্প্রতি দেশটিতে একের পর এক জঙ্গি হামলার কারণে করাচি ফ্যাশন উইক তিন সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান শুরু করা সম্ভব হয়েছে। ফ্যাশন উইককে মৌলবাদী ও জঙ্গি অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে দেখছেন আয়োজকেরা। ফ্যাশন উইকের প্রধান আয়োজক আয়েশা তামি হক বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে এটা কঠিন সময়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যখন কঠিন লড়াই চলছে, তখন এ ধরনের একটি অনুষ্ঠান করতে পেরে আমরা গর্বিত।’
ফ্যাশন উইকে অংশ নিয়েছেন ৩২ জন ডিজাইনার। জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় বিদেশি ডিজাইনারদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
তালেবান যেখানে হরহামেশাই মেয়েদের স্কুল উড়িয়ে দিচ্ছে, পারতপক্ষে যেখানে তারা মেয়েদের ঘর থেকেই বের হতে দিতে চায় না, সেখানে ফ্যাশন উইক? অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তাঁরা কি কোনো ভয় পাননি? প্রশ্ন ছিল ডিজাইনার সনিয়া বাটলারের প্রতি। তিনি বলেন, ‘আমি সাহসী নারী। কাউকেই ভয় পাই না।’ ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এসেছেন ডিজাইনার সমর মেহেদি। তিনি বলেন, ‘জীবন থেমে থাকে না। যারা জীবনের গতি থামিয়ে দিতে চায়, তাদের দেখিয়ে দিতে চাই, আমরা কী করতে পারি।’
পাকিস্তানের বিখ্যাত মডেল নাদিয়া হুসেন অবশ্য বেশি খোলামেলা পোশাক পরার পক্ষে নন। কিন্তু সৃজনশীলতার জন্য যে স্বাধীনতার দরকার, সে কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। নাদিয়া বলেন, ‘আমাদের দেশে যত সমস্যাই থাকুক, আমাদের ডিজাইনারেরা অনেক বেশি সৃজনশীল। আর আমাদের মডেলদের মতো সুন্দরী বিশ্বের আর কোথায় আছে?

সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেথাইল্যান্ড -থাকসিনকে কম্বোডিয়ার উপদেষ্টা নিয়োগ

দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড গতকাল শুক্রবার সীমান্তবর্তী চেকপয়েন্ট বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এ ছাড়া ২০০১ সালে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত একটি তেল-গ্যাস চুক্তিও বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে থাই সরকার।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার থাকসিনের নিয়োগ নিয়ে দুই দেশ চরম কূটনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। ওই দিন উভয়েই তাদের নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
২০০৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন থাকসিন সিনাওয়াত্রা। গত বছর থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন তিনি। থাইল্যান্ডের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কম্বোডিয়া সরকার এবং সেদেশের প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় গত বুধবার।
থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী সুদীপ দুগসুবান বলেছেন, ‘কম্বোডিয়া চরমপন্থাসম্পৃক্ত নীতি অবলম্বন করলে এবং কোনো ধরনের মীমাংসায় আসতে না চাইলে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতেই থাকবে। এমনকি সীমান্তের নিরাপত্তা চৌকি বন্ধ করে দিতে পারে থাইল্যান্ড।’ তবে সুদীপ জানান, এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত-বাণিজ্য স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাসিট পিরমিয়া বলেন, থাইল্যান্ড উপসাগরে ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি বিতর্কিত অঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে কম্বোডিয়া ও তখনকার থাকসিন সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তিটি এখন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে থাই সরকার। তিনি বলেন, থাইল্যান্ড সরকার মনে করে, থাকসিনকে কম্বোডিয়ার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি এই চুক্তিকে প্রভাবিত করেছে। কেননা, থাকসিন সিনাওয়াত্রা কম্বোডিয়ার সঙ্গে থাইল্যান্ডের অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
কাসিট পিরমিয়া বলেন, বিগত আট বছরে এই চুক্তির ফলে কোনে উন্নতি হয়নি। আগামী মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি চুক্তিটি বাতিল করার প্রস্তাব করবেন।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রিহ ভিহিয়া নামের একটি প্রাচীন মন্দির অবস্থিত। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে এখানকার ভূমির মালিকানা নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত দুই দেশের সেনাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার ছোটখাটো যুদ্ধও হয়েছে।
কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রদূতকে গতকাল খুব ভোরে ব্যাংকক থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ড সরকার ব্যাংককে কম্বোডিয়ার দূতাবাসে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
গতকাল জাপানের টোকিও নগরে মেকং নদীবিধৌত দেশগুলোর একটি সম্মেলন শুরু হয়েছে। সেখানে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অভিজিত ভেজ্জাজিভা ও কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী সুদীপ বলেছেন, ‘ওই সম্মেলনের বাইরে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক করার কোনো পরিকল্পনা নেই।’ এ ব্যাপারে কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকেও তাত্ক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে কম্বোডিয়া টেলিভিশন বলেছে, রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ড সরকার থাকসিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। একজন সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, থাকসিনের নেতৃত্ব ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার প্রতি কম্বোডিয়া সরকারের শ্রদ্ধা রয়েছে। থাকসিন উপদেষ্টা হিসেবে যোগদান করলে তিনি কম্বোডিয়ার জন্য একটা সম্পদে পরিণত হবেন।
অন্যদিকে থাইল্যান্ড সরকার আভাস দিয়েছে, দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত থাকসিন কম্বোডিয়া সফর করলে অথবা সেখানে বসতি স্থাপন করলে তাঁকে ফেরত চাইবে থাইল্যান্ড।

অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তৃতীয় পরাজয়

প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ০-৫ গোলে হার। এরপর ০-১ গোলে পরাজয় ভিয়েতনামের কাছে। কাল থাইল্যান্ডের কাছে ০-৩ গোলে হেরে এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাই পর্ব থেকে বিদায় নিয়ে নিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল।
ব্যাংকক স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথম মিনিটে আপিসিট খামওয়াংয়ের গোলে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশি যুবারা। ৩৫ মিনিটে আরও এগিয়ে যেতে পারত স্বাগতিকেরা। কিন্তু একটা পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের গোলকিপার সোহেল। এরপর ম্যাচের ৭০ ও ৭১ মিনিটে ইয়ুইয়েন সারাচের দুই গোলে বড় পরাজয়ই ‘উপহার’ পায় বাংলাদেশ। আগামীকাল চতুর্থ ম্যাচে ম্যাকাওয়ের বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। ৩ ম্যাচের সবকটিতে জিতে ৯ পয়েন্ট নিয়ে ‘ই’ গ্রুপের শীর্ষে থাইল্যান্ড।

জেমির কথাটা মনে রেখেছিলাম

আট নম্বরে নেমে অপরাজিত ৭৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে ম্যাচ জিতিয়েছেন। এতেও পুরো বোঝানো যাচ্ছে না কৃতিত্বটা। গত পরশু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যে পরিস্থিতিতে জয়, এর তুল্য কিছু যে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া ভার। এ নিয়েই কথা বললেন স্মরণীয় এই জয়ের নায়ক নাঈম ইসলাম

অমন একটা ইনিংস, অমন একটা জয়... রাতটা কীভাবে উদ্যাপন করলেন?
নাঈম ইসলাম: না, বিশেষ কিছু না। রাতে টিম ডিনার ছিল। পরদিন সকালেই ঢাকার ফ্লাইট ছিল, সেখান থেকে ফিরে তাই লাগেজ-টাগেজ গোছাতে হলো। এরপর ঘুম।
ওই ইনিংসের পর তো আপনার নামে ধন্য-ধন্য পড়ে গেছে। এতসব প্রশংসার মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে কোনটা?
নাঈম: প্রশংসা... প্রশংসা... ও হ্যাঁ, বিকেএসপিতে আমাদের রুশো স্যার ফোন করে বলেছেন, ‘তুই তো এমনই খেলিস। তোর কাছ থেকে আমি আরও আগেই এমন কিছু আশা করেছিলাম। যাক, দেরিতে হলেও তো হয়েছে। এখন থেকে যেন নিয়মিতই এমন হয়।’ স্যারের কথাটা খুব ভালো লেগেছে।
জাতীয় দলে খেলা শুরু করার পর নিশ্চয়ই বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরশু যা করলেন, তেমন কিছু করারই স্বপ্ন ছিল, নাকি এর চেয়েও বড় কিছু?
নাঈম: স্বপ্ন দেখতাম, কোনো একদিন আমি একা ব্যাট করে বড় কোনো দলকে হারিয়ে দেব। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তো আমরা আগেই সিরিজ জিতে গিয়েছিলাম। সিরিজটা যদি ২-২ থাকত, আর আমি এমন ব্যাট করে ম্যাচ জেতাতাম, তাহলে আরও ভালো লাগত। ভবিষ্যতে আরও ক্রুশিয়াল সময়ে এমন খেলে বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতানোর স্বপ্ন দেখি।
ব্যাটিংয়ের সময় কী ভাবছিলেন? টিভিতে অন্য কোনো ব্যাটসম্যানকে এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জেতাতে দেখার স্মৃতি, না অন্য কিছু?
নাঈম: এ রকম কিছুই না। শুধু চিন্তা করছিলাম, শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং করব। তবে নাজমুল ক্রিজে আসার পর পুরোনো একটা ঘটনা মনে পড়ছিল। জিম্বাবুয়েতে একটা প্র্যাকটিস ম্যাচেও আমি আর নাজমুল ব্যাট করছিলাম। আমি ১ রান নিয়ে ওকে স্ট্রাইক দেওয়ার পর ও আউট হয়ে যায়। ওই ম্যাচের পর জেমি (কোচ জেমি সিডন্স) আমাকে বুঝিয়েছেন, ‘দেখো, তুমি ১ রান নেওয়ায় নিজেও রান করতে পারলে না, দলও হেরে গেল। ভবিষ্যতে এমন অবস্থায় নিজে দায়িত্ব নেবে।’ তো এ দিন জেমির কথাটা আমি মনে রেখেছিলাম।
পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াটাই আপনার ইনিংসটাকে আরও মহিমান্বিত করেছে...
নাঈম: বাংলাদেশ হেরে গেলে হয়তো কথা হতো, নাজমুলের ওপর আমি কেন একটু বিশ্বাস রাখলাম না! আমি জেনেশুনেই ঝুঁকিটা নিয়েছি। ভবিষ্যতেও এমনই করব। প্রতিদিন হয়তো পারব না।

ভবিষ্যতে তো এই ইনিংসটাও আপনাকে বিশ্বাস জোগাবে—একবার যখন পেরেছি, আবার কেন পারব না...
নাঈম: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই।
এর উল্টো দিক হলো, এখন আপনার কাছ থেকে সবার প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। আস্কিং রেট ৮-৯-১০... সবাই আপনার কাছ থেকে ছক্কা চাইবে। চাপটা কি বেড়ে গেল?
নাঈম: না, চাপের কী আছে? আমি যেখানে ব্যাটিং করি, সেখানে সব সময় ভালো কিছু করার সুযোগ আসে না। সুযোগ পেলে টিমের জন্য কিছু করতে চাই। ভবিষ্যতে এর চেয়েও টাফ সিচুয়েশনে এমন কিছু করতে চাই।
 আট নম্বরে নেমে অপরাজিত ৭৩... আপনার পরিচয় কী ভাই—বোলিং অলরাউন্ডার, না ব্যাটিং অলরাউন্ডার?
নাঈম: আমি তো নিজেকে ব্যাটিং অলরাউন্ডারই মনে করি। তবে আমাদের দলের এখন যে অবস্থা, তাতে ওপরে ব্যাট করার সুযোগ নেই।

জয়ের সুবাস পাচ্ছিল নিউজিল্যান্ড

গত রাত একটায় এ রিপোর্ট খেলা পর্যন্ত আবুধাবিতে পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড সিরিজ ১-১ হতে চলেছিল। নিউজিল্যান্ডের ৩০৩ রানের জবাবে ৩৫ ওভারে ৬ উইকেটে ১৫৯ রান তুলেছে পাকিস্তান। বাকি ১৫ ওভারে ১৪৫ রান করে এই ম্যাচ জিতে যাবে পাকিস্তান—এটা তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সমর্থকেরাও আশা করতে পারছিল না।
নিউজিল্যান্ডকে শক্ত একটা জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল ব্রেন্ডন ম্যককালামের সেঞ্চুরি। তারপর পাকিস্তানের শুরুটাও খারাপ হয়নি, সালমান বাট আর খালিদ লতিফের উদ্বোধনী জুটিতে ৭৭ রান। দলীয় ১২৪ রানে বিদায় নিলেন ইউনুস খান। এক রান যোগ হতেই প্রবল বলে বিদায় গত ম্যাচের নায়ক শহিদ আফ্রিদির। ম্যাচ থেকেও যেন বিদায়ের ঘণ্টা বাজল পাকিস্তানের।
এর আগে সেঞ্চরির পর ব্রেন্ডন ম্যাককালামের উল্লাসটা কি একটু বাড়াবাড়িই মনে হয়েছে আপনার? হয়ে থাকলে সেটি ক্ষমার দৃষ্টিতেই দেখুন। কারণ ১৬২ ম্যাচের এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মাত্রই দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করলেন ম্যাককালাম। প্রথমটি আয়ারল্যান্ডের মতো পুঁচকে দলের বিপক্ষে করেছিলেন। বড় দলের বিপক্ষে এই প্রথম। সেই প্রথমের উদ্যাপন তো একটু লাগামছাড়া হবেই।
ম্যাককালামের ১২৯ বলে ১৪টি চার আর ৩টি ছক্কায় ১৩১, মার্টিন গাপটিলের ৬২ আর ভেট্টোরি-ওরামের দুটি ছোট্ট কিন্তু কার্যকর ইনিংসে নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে গেছে তিন শর ওপরে। আগের সর্বশেষ ৯ ইনিংসে কোনো ফিফটি দেখেনি ম্যাককালামের ব্যাট। এমন এক দিনে এই ডান-হাতি ব্যাটসম্যান ফর্মে ফিরলেন, যখন ৩ ম্যাচ সিরিজে ০-১-এ পিছিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ড জয় পেতে ছিল মরিয়া।
আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামটা ঠিক রানপ্রসবা নয়। এর আগে এখানে ৩০০ পেরোনো স্কোর একটাই হয়েছে, সেটিও প্রথমে ব্যাট করেই। নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার সময় ইউনুস খানকে কি চিন্তাগ্রস্ত দেখাল সে কারণেই?
সংক্ষিপ্ত স্কোর: নিউজিল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৩০৩/৮ (ম্যাককালাম ১৩১, গাপটিল ৬২, ভেট্টোরি ৩০, ওরাম ৩৩*; গুল ২/৫৯, রাজ্জাক ২/৬০, আফ্রিদি ২/৪৯)।
পাকিস্তান: ৩৫ ওভারে ১৫৯/৬ (বাট ৫৯, লতিফ ৪৫, ইউনুস ১৯, আফ্রিদি ০, আকমল ৪, ইউসুফ ১৮, মালিক ৭*, রাজ্জাক ১*, অতিরিক্ত ৬। স্ট্রাইরিশ ৩/২৩, ভেট্টরি ২/৩৭।) * অসমাপ্ত

নাইজেরিয়ায় উড়ছে এশিয়ার পতাকাও

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও জার্মানি বিদায় নিয়েছে। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের শিরোপা লড়াইয়ে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের মধ্যে ইতালির সঙ্গে টিকে থাকল স্পেন। বার্কিনা ফাসোকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে তারা।
শেষ আটে উড়ছে এশিয়ার পতাকাও। মেক্সিকোকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হারিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া উঠেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলাও ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকলে ম্যাচটি গড়ায় টাইব্রেকারে।
এদিন শেষ আট নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন নাইজেরিয়া ও উরুগুয়ে। ৫-০ গোলে জিতে নিউজিল্যান্ড রূপকথার ইতি টেনেছে নাইজেরিয়া। আর ইরানের বিপক্ষে উরুগুয়ের জয়টি ২-১ গোলের।

তৃতীয় রাউন্ডেই পিছিয়ে পড়ল শেখ রাসেল

দুই ম্যাচ পরই থেমে গেছে শেখ রাসেলের জয়যাত্রা। থামিয়ে দিয়েছে আরামবাগ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে কাল সিটিসেল বাংলাদেশ লিগে শেখ রাসেল-আরামবাগ ম্যাচ ছিল ২-২। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামে স্থানীয় মোহামেডান ২-০ গোলে রহমতগঞ্জকে হারিয়ে প্রথম জয় পেয়েছে।
তৃতীয় রাউন্ডেই আবাহনী-মোহামেডানের চেয়ে পিছিয়ে পড়ল শেখ রাসেল। টানা তিন জয়ে দুই প্রধানের পয়েন্ট ৯। ২ জয়, ১ ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট শেখ রাসেলের।
৩৯ মিনিটে নাইজেরিয়ান খেলোয়াড় সুবাইর মোহাম্মদের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আরামবাগ। পরের মিনিটেই শেখ রাসেলকে সমতায় ফেরান আগের দুই ম্যাচে চার গোল করা স্ট্রাইকার রনি। ৫৭ মিনিটে আবার এগিয়ে গেল রাসেল, এবার গোল করলেন ঘানাইয়ান মরো মোহাম্মদ। ৬৩ মিনিটে ২-২, সুবাইর গোলে ম্যাচে ফিরল আরামবাগ।
শেষ পর্যন্ত জয় পেতে পারত রাসেল। ইনজুরি সময়ে সামিরের গোল বাতিল করে দেন রেফারি। প্রথমে রেফারি গোলের বাঁশি বাজালেও পরে লাইন্সম্যানের পরামর্শে বাতিল করেন। রাসেলের খেলোয়াড়েরা প্রতিবাদ জানাতে থাকলে খেলা বন্ধ থাকে ১৫ মিনিট।
চট্টগ্রামে নতুন কোচকে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই জয় উপহার দিয়েছে চট্টগ্রাম মোহামেডান। বিদায়ী কোচ নজরুল ইসলামের বদলে দায়িত্ব নেবেন স্বপন দাশ। প্রথম বি-লিগে চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ ছিলেন স্বপন। নতুন কোচ স্বপন দাশ আজকালের মধ্যে দায়িত্ব নেবেন।
টানা দুই ম্যাচে হারের পর তৌহিদের জোড়া গোলে কাল জিতল চট্টগ্রাম মোহামেডান। আর এই জয়ে চট্টগ্রামের দলটি আত্মবিশ্বাস পেয়েছে কিছুটা।
প্রথম ম্যাচে কোচ নজরুল ইসলাম বিহীন মোহামেডান আরামবাগের কাছে ১-৬ গোলে ও পরের ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চট্টগ্রাম আবাহনীর কাছে ০-১ গোলে হেরেছিল। তবে কালও প্রথম তিন মিনিটেই গোল হজম করতে বসছিল দলটি। বাঁ প্রান্তে বিপ্লবের ক্রস থেকে ফাঁকায় বল পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ রাফায়েল। এই রাফায়েল গতবার মোহামেডানের সাফল্যের অন্যতম নায়ক ছিলেন। প্রথমার্ধে মোহামেডানও সহজ সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু রিদন ও প্যাট্রিক নষ্ট করেন সুযোগ।
গোলের জন্য ৭৪ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিল মোহামেডান। লিংকনের থ্রু থেকে তৌহিদ তীব্র শটে বল জালে জড়ান। পিছিয়ে পড়া রহমতগঞ্জ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে গেছে, উল্টো শেষ বাঁশি বাজার এক মিনিট আগে আরও এক গোল খেয়ে বসল দলটি। গোল করলেন আবার সেই তৌহিদ।

এসএ গেমস এখন গলার ফাঁস

প্রথমে ঠিক ছিল, এবারের এসএ গেমসে ১৭টি খেলা হবে। পূর্বনির্ধারিত ১৫টির সঙ্গে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের পছন্দের কোটায় গলফ আর কুস্তি ঢুকল। পরে ক্রিকেট, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন, সাইক্লিং, ভলিবল ও জুডো যোগ হওয়ায় সংখ্যাটা ঠেকেছে গতবারের চেয়ে তিনটি বেশি—২৩!
ক্রিকেট, গলফ আগে ছিল না। এবার উচ্চাভিলাষী হয়ে এ দুটি খেলাকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট যোগ করার যুক্তি, এতে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। যুব ক্রিকেট দিয়ে কীভাবে আয়োজকেরা টাকা তুলবেন, তা অবশ্য খোলাসা করে এখনো বলা হয়নি। গলফ নেওয়া হয়েছে সোনা জয়ের আশায়। আর এ খেলাগুলো যোগ করায় গেমসের কলেবর বেড়ে রীতিমতো গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, কুস্তির মতো নিয়মিত ইভেন্টগুলো শুরুতে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফুটবল, হকি, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, শ্যুটিং, কাবাডি, টেবিল টেনিস, ভারোত্তোলনে অবশ্য কাচি পড়েনি। তায়কোয়ান্দো, কারাতে, জুডো, আর্চারি, বক্সিং, উশু, স্কোয়াশ, হ্যান্ডবল—এই খেলাগুলোকে সুযোগ দিয়ে গেমসে ফিরিয়ে আনা হলো বাস্কেটবল।
অন্য সব খেলা কোনো রকমে এদিক-সেদিক চালিয়ে নিতে পারলেও স্কোয়াশ নিয়ে এখন বড় বিপদ। গুলশানে স্কোয়াশকে জায়গা দিয়ে নতুন কোর্ট করার উদ্যোগ ভেস্তে গেল জায়গা নিয়ে মামলা হওয়ায়। রাজশাহীর স্কোয়াশ কোর্টে যেতে বলা হলো ফেডারেশনকে, কিন্তু ওখানে মাত্র একটি কোর্ট। অন্তত দুটি কোর্ট হলেও ফেডারেশন চিন্তা করত।
বিকল্প হিসেবে ঢাকা ক্লাবের কোর্ট সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে ৩৮ লাখ টাকার বাজেট দিয়েছে ফেডারেশন। সরকার নিজের টাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোর্ট সংস্কার করবে কেন—জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ দিচ্ছে এমন যুক্তি। এ অবস্থায় স্কোয়াশ আদৌ হবে কি না অনিশ্চিত। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হামিদ যদিও আশাবাদী, ‘ঢাকা ক্লাবের কোর্ট দেশের বাইরের নয়। সরকার ওটা সংস্কার না করলে শো’টা খারাপ হবে, এই আর কি! কিন্তু আমরা চাই, ঢাকা ক্লাবেই খেলা হোক। মাননীয় মন্ত্রী সোমবার দেখা করতে বলেছেন। দেখা যাক, কী হয়।’
স্কোয়াশের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জেরবার উশুকেও বাদ দেওয়ার চিন্তা ঢুকেছে অনেকের মাথায়। আগামী ১৮ নভেম্বর ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় অলিম্পিক কমিটির সভায় খেলা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব আনার সুযোগ দেখছেন বিওএ সহসভাপতি মিজানুর রহমান মানু, ‘স্কোয়াশের নিজম্ব অবকাঠামোই নেই। উশুতে চলছে বিশৃঙ্খলা। এ অবস্থায় এই দুটি খেলার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত হয়তো নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে ১৮ তারিখের সভায়।’
বিওএ মহাসচিব কুতুবউদ্দিন আহমেদ অবশ্য খেলা কমানোর পক্ষে নন, ‘সব খেলা হবে। কোনো সমস্যা দেখছি না।’ স্কোয়াশের ব্যাপারে তাঁর কথা, ‘ওখানে দু-চার, পাঁচ লাখ টাকা লাগলে চালিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু আরও বেশি টাকা লাগলে এবং সরকার তা না দিলে খেলা হবে না।’
গেমসের দুই মাস আগে বাংলাদেশ যদি বলে, স্কোয়াশ হবে না, তাহলে ব্যাপারটা কেমন দেখাবে? বিদেশিরা হাসাহাসি করবে না? ওদিকে সাঁতারে ১৬ বছরের পুরোনো বোর্ড। গেমসের মাঝপথে এটি নষ্ট হয়ে গেলে? সাঁতারু শাহজাহান আলী মনে করেন, ‘দেশের সম্মানই তাহলে থাকবে না।’ ফেডারেশন এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা কখনোই রাখতে পারেনি। সরকারকে বিব্রত করলে না চেয়ার চলে যায়, এই ভয়!
অবকাঠামোগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি হলো না। এ নিয়ে সর্বত্র হতাশা। তবে বিওএ মহাসচিবের দাবি, ‘সব ঠিকমতোই চলছে। অবকাঠামোও ভালোই আছে। এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।’
একদিকে খেলা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে অ্যাথলেটিকসের কোনো থ্রোয়িং ইভেন্টই নেই! সাঁতারে বাদ ৩৮ ইভেন্টের অর্ধেকই। বিওএ মহাসচিবের যুক্তি, ‘খেলা বাড়িয়ে ইভেন্ট কমিয়েছি। এতে আমাদের সুবিধাই হলো।’ সাঁতার-অ্যাথলেটিকসে অসম্পূর্ণ একটা প্রতিযোগিতা হবে। সুবিধাই বটে!
প্রায় ২২-২৩ শ অ্যাথলেট-কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গুলশান-বনানীর রেস্ট হাউসসহ ঢাকার দ্বিতীয় সারির হোটেলও খোঁজা হচ্ছে এখন। উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানসহ গেমস ব্যবস্থাপনার জন্য বরাদ্দ ৪৯ কোটি, কিন্তু টাকা পাওয়া যায়নি এখনো। এ সপ্তাহের মধ্যে অন্তত ৫-৬ কোটি টাকা পাওয়া না গেলে গেমস আয়োজন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বলছেন, ‘গেমস করতে অভিজ্ঞ লোক দরকার। অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে এটা হয় না। এ জন্যই লেজে-গোবরে অবস্থা।’

ম্যাককুলাম ঝড়ে পাকিস্তানকে ৬৪ রানে হারালো নিউজিল্যান্ড

মরু শহর আবুধাবিতে মরুঝড় নতুন কিছু নয়। কিন্তু কাল শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম যা করলেন, তাকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা যায়? মরুঝড় তো এর কাছে কিছুই না। ম্যাককুলাম তাণ্ডবের কথা বোধ হয় পাকিস্তান দলের চেয়ে ভালো কেউ বলতে পারবে না। কারণ সেই তাণ্ডবের সবচেয়ে বড় শিকার যে তারাই।
২০০৯ ক্রিকেট মৌসুমটা একেবারেই ভালো যায়নি ব্রেন্ডন ম্যাককুলামের। প্রত্যাশার কাছে প্রাপ্তির অসহনীয় অমিলে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলেন তিনি। ২০০৮-এর শুরুর দিকে আইপিএলে কলকাতা নাইটরাইডার্সের হয়ে একটি ম্যাচে দানবীয় ১৫৭ রানের পর যেন প্রত্যাশার চাপেই চাপা পড়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দলের সহ-অধিনায়ক পদ থেকে বাদ পড়া তো ছিলই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর ইনিংস ওপেন করার সামর্থ্য নিয়ে বিতর্ক। সব মিলিয়ে একেবারেই বাজে একটি সময় কাটছিল নিউজিল্যান্ড দলের এই উইকেটকিপার কাম উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ১৩৮ রানের বিশাল পরাজয় হয়তো তাতিয়ে রেখেছিল কিউই ব্যাটসম্যানদের। এর সঙ্গে অবশ্যই ম্যাককুলামকে, তাই তো তাঁর মাত্র দ্বিতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরির ওপর ভর করে নিউজিল্যান্ড পাকিস্তানের সামনে দাঁড় করাল ৩০৩ রানের এক লড়াকু স্কোর। ম্যাককুলাম নিজে করলেন ১৩১। গুপটিল করলেন ৬২। ড্যানিয়েল ভেট্টরি ও জ্যাকব ওরামের ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ দুটি ‘তিরিশ’ এ (যথাক্রমে ৩০ ও ৩৩) কিউই দলের এই ব্যাটিং সাফল্য। এর আগে টস জিতে ব্যাট হাতে নেওয়ার নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টরির সিদ্ধান্তকে যেন দারুণ সম্মানই জানালেন তাঁর দলের বাকি সদস্যরা। ম্যাককুলামের তাণ্ডবের দিনে পাকিস্তানের উমর গুল, আবদুল রাজ্জাক ও শহীদ আফ্রিদি ২টি করে উইকেট নেন যথাক্রমে ৫৯, ৬০ ও ৪৯ রানের বিনিময়ে।
৩০৪ রান করলে জিতবে, এমন একটি কঠিন অথচ ‘খুবই সম্ভব’ লক্ষ্যে খেলতে নেমে পাকিস্তান দলের শুরুটা ছিল চমত্কার। সালমান বাট ও খালিদ লতিফ উদ্বোধনী জুটিকে টেনে নিয়ে যান ৭৭ রান পর্যন্ত। সুন্দর একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের বাকি ব্যাটসম্যানদের দলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যর্থতাই কেবল কাল পাকিস্তান দলকে জিততে দেয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হলো স্কট স্টাইরিসের এক অসাধারণ স্পেল। তিনি তাঁর স্লো-মিডিয়াম ভেলকিতে পাকিস্তানের তিন গুরুত্বপূর্ণ মিডল অর্ডার ইউনিস খান, শহীদ আফ্রিদি ও কামরান আকমলকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠালে পাকিস্তান পরিণত হয় ১৩৪/৫-এ। এরপর মোহাম্মদ ইউসুফ, শোয়েব মালিক ও আবদুল রাজ্জাক মরিয়া হয়ে দলকে ম্যাচে ফেরত আনার চেষ্টা চালালেও তাঁদের সেই প্রচেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। দলের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার দিনে পাকিস্তানের ইনিংস থেমে যায় ২৩৯ রানে, নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ থেকে ৬৪ রান দূরে থেকেই। ভেট্টরি ৩৭ রানে ২টি, কাই মিলস ৫৭ রানে ২টি উইকেট নিলেও পাকিস্তান ব্যাটিংয়ে মোক্ষম ধাক্কাটা দেন স্টাইরিস মাত্র ২৩ রানে ৩টি উইকেট নিয়ে।
কালকে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যান-বোলারদের লড়াইয়ের মুখে পাকিস্তানের ভেঙে পড়া এই সিরিজের বাকি ওয়ানডেগুলোতে দুর্দান্ত লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিই রেখে গেল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর
নিউজিল্যান্ড ৩০৩/৮ (৫০ ওভার)
ম্যাককুলাম ১৩১, গুপটিল ৬২
গুল ২/৫৯, রাজ্জাক ২/৬০, আফ্রিদি ২/৪৯
পাকিস্তান ২৩৯ (৪৭.২ ওভার)
সালমান বাট ৫৯, খালিদ লতিফ ৪৫
স্টাইরিস ৩/২৩, ভেট্টরি ২/৩৭
ফল: নিউজিল্যান্ড ৬৪ রানে জয়ী।