Friday, April 24, 2015

দোষীরা চিহ্নিত তবুও গ্রেফতার হচ্ছে না

বুধবার বাংলামোটর মোড়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার
সময় সিএসএফের এক সদস্যকে মারধর করছে ছাত্রলীগের
কেন্দ্রীয় উপ-ক্রীড়া সম্পাদক গোলাম বাকি চৌধুরী (বাঁয়ে)।
সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান রুবেল এবং ছুটে
আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পরিকল্পনা ও
কর্মসূচিবিষয়ক সম্পাদক আশিকুল পাঠান সেতু (গোলচিহ্নিত)
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে তিন দফা হামলার ঘটনায় বিএনপি দুটি মামলা করেছে। একটি ২০ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে ও অপরটি ২২ এপ্রিল বাংলামোটরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায়। একই ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও দুটি মামলা হয়েছে। এসব হামলার ঘটনায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহারও হয়েছে। বহরে থাকা গাড়ি ছাড়াও পুলিশের সামনে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িতে এবং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যদের (সিএসএফ) ওপর হামলা হয়েছে। এসব হামলাকারীদের অনেকের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি অস্ত্রের ছবিসহ হামলাকারীর ছবিও প্রকাশ হয়েছে। অথচ গত কয়েকদিনে তাদের একজনকেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেফতারের বিষয়ে গতানুগতিক ভাষায় পুলিশ বলছে- ‘তদন্ত শুরু হয়েছে, আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। শনাক্ত করার পর দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’ নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয়ার সময় গত কয়েকদিনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে একের পর এক হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম সরকার যুগান্তরকে বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) অনিরাপদবোধ করলে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে পারেন। হামলার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পুনরায় এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে উত্তরে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণে মির্জা আব্বাসের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নেমেছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি গণসংযোগ চালাচ্ছেন। বিলি করছেন লিফলেট। চাচ্ছেন ভোট। ২০ এপ্রিল বিকালে খালেদা জিয়া গাড়িবহর নিয়ে তাবিথ আউয়ালের পক্ষে কারওয়ান বাজারে নির্বাচনী প্রচার চালান। এ সময় সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা ওই গাড়িবহরে হামলা চালায়। হামলার ঘটনায় তেজগাঁও থানায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাল্টাপাল্টি মামলা করে। হামলাকারীদের ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ভিডিও ফুটেজ ও পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে হামলাকারী কারা? তাদের পরিচয় কী? হামলাকারীরা চিহ্নিত হলেও পুলিশ তাদের শনাক্ত করতে পারছে না। ঘটনার ৪ দিনে একজন হামলাকারীও গ্রেফতার হয়নি। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার এসআই মুনসুর হোসেন মানিক যুগান্তরকে বলেন, ‘হামলাকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এখনও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।’ হামলাকারীদের ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং তাদের অনেকের দলীয় পরিচয়ও রয়েছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘পেপার কার্টিং ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করছি, কিছু ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে আছে।’ তিনি বলেন, ‘কারওয়ান বাজারে তো অনেক লোকজন, তাই হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে পারছি না। যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করছি।’ জানা যায়, ওই ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ বিএনপির অজ্ঞাতনামা ১০০ নেতাকর্মীকে আসামি করে তেজগাঁও থানায় মামলা করেছে। এই মামলাটির কোনো আসামি শনাক্ত হয়নি।
বুধবার বিকালে খালেদা জিয়া গাড়িবহর নিয়ে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালাতে যাচ্ছিলেন। বাংলামোটরের সিগন্যালে গাড়িবহর আটকা পড়লে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৪০-৫০ জন অস্ত্র নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালায়। এতে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী আহত হন। এই ঘটনায় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম রমনা থানায় মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ২৯। খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের পক্ষেও একটি মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর ২৮। ২০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক বাবু হাসান এজাহারে উল্লেখ করেন- ছাত্রলীগের নেতাকর্মী নিয়ে তিনি মেয়র প্রার্র্থী সাঈদ খোকনের নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। সোনারগাঁও ক্রসিং হয়ে বাংলামোটরের দিকে গেলে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর তাদের ওপর উঠিয়ে দেয়। এতে দুই কর্মী মারাত্মক আহত হন। এ বিষয়ে তারা প্রতিবাদ করতে গেলে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মীসহ (সিএসএফ) বিএনপির অজ্ঞাত ২০-২৫ জন নেতাকর্মী তাদের মারধর করেন। বুধবার রাতে বিএনপি ও ছাত্রলীগের পক্ষে পৃথক এ দুটি লিখিত অভিযোগ রমনা থানায় দেয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে মামলা দুটি রেকর্ড করা হয়।
এদিকে বুধবার বিকালে হামলার ঘটনায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে হামলাকারীদের ছবি দেখানো হয়। বৃহস্পতিবার বিভিন্ন পত্রিকায়ও তাদের ছবি প্রকাশ হয়। ছবিতে হামলাকারীদের একজনের কোমরে অস্ত্র গোঁজা অবস্থায় দেখা গেছে। ওই সশস্ত্র অস্ত্রধারীকে পুলিশের বাধা দেয়ার দৃশ্যও রয়েছে। অস্ত্রসহ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ হওয়ার পরও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেনি।
এ ব্যাপারে রমনা থানার ওসি মশিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, বারবার খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার দায় সরকারের। সরকারদলীয় লোকজন হামলা চালিয়ে আবার মামলাও করছে। এটা সরকারের ষড়যন্ত্র। আসামিরা চিহ্নিত হলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতারে কোনো ভূমিকা রাখছে না।

সিদ্ধান্ত বদলে ৩ কমিশনার

তিন সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একজন কমিশনার সীমিত পরিসরে সেনা মোতায়েনের নোট দিয়েছিলেন। অন্য দু’জন কমিশনার তাতে সায় দেন। এ কারণেই মূলত নির্বাচনী কার্যক্রমে সেনাবাহিনীকে পরোক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই সেনাবাহিনী চেয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে দেয়া ইসির চিঠি সংশোধন করে পুনরায় পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। বুধবার দ্বিতীয় দফায় পাঠানো ইসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয় ‘প্রতি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এক ব্যাটালিয়ন করে সেনাবাহিনীর সদস্য আগামী ২৬ থেকে ২৯ এপ্রিল চার দিন দায়িত্ব পালন করবেন। তারা মূলত সেনানিবাসের অভ্যন্তরেই রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে অবস্থান করবেন এবং রিটার্নিং অফিসারের অনুরোধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন।’ অথচ একদিন আগে মঙ্গলবার পাঠানো চিঠিতে ওই অংশে বলা হয়েছিল, ‘সেনাবাহিনী মূলত স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। রিটার্নিং অফিসার ডাকলেই তারা পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন।’ পরের চিঠিতে সেনা সদস্যদের ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ক্যান্টনমেন্টকে ঢাকার কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ করে ওই স্থান থেকে সবদিকে সহজেই যাওয়া যায়- এমন বিবেচনায় সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ। তিনি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনীর জন্য ‘বেস্ট পজিশন’ ক্যান্টনমেন্ট (সেনানিবাস)। সেনা মোতায়েনে প্রথম চিঠিতে ভুল-ত্র“টি হয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে পরে আগের চিঠিটি সংশোধিত আকারে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
আর নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী চিঠি দেয়া হয়েছে। ‘সেনাবাহিনী কোথায় থাকবে, ওই (মঙ্গলবার পাঠানো চিঠি) চিঠিতে উল্লেখ ছিল না। যেহেতু নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট রয়েছে। যে জন্য সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করার জন্য বলেছি। তারা সেখানেই প্রস্তুত থাকবে। তাদের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটও থাকবেন। রিটার্নিং অফিসারের দরকার হলে তাদের কাজে লাগাবেন। সেনা সদস্যরা নির্বাচনে টহল দেবেন না বলেও জানান তিনি।
ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগের নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ও রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে মোতায়েন করা হয়। এবারই প্রথম ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সেনা সদস্যদের আবদ্ধ রাখা হল। সেনা সদস্যরা মাঠে না থাকায় ভোটারদের মধ্যে আতংক থেকে যাবে বলেও মনে করছেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যে প্রক্রিয়ায় পুনরায় চিঠি তৈরি ও পাঠানো হয়েছে তাতে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সেনা মোতায়েন না করার বিষয়ে ইসির ওপর এক ধরনের চাপ ছিল। বুধবার সন্ধ্যায় ইসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী হাতে হাতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে চিঠিটি পৌঁছে দেন।
যদিও কোনো মহলের চাপে দ্বিতীয় দফা চিঠি পাঠানো হয়নি বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। বৃহস্পতিবার বিকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কোনো চাপে আমার বিন্দুমাত্র পিছিয়ে যাইনি। সেনাবাহিনী নিয়োগে যে চিঠি দেয়া হয়েছে তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু সেনাবাহিনীর অবস্থান কোথায় হবে- তা সুনির্দিষ্ট করেছি। যাতে সবাই জানতে পারেন- সেনাবাহিনী কোথায় রয়েছে, কিভাবে রয়েছে, কিভাবে তারা বের হবেন।
রাতে কমিশন সচিবালয় ত্যাগ প্রাক্কালে সিইসি বলেন, সেনাবাহিনী সবসময় রিজার্ভ ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকে। এবারের নির্বাচনেও তাই থাকবে। তিনি বলেন, ক্যান্টনমেন্ট হল ঢাকা সিটির কেন্দ্রবিন্দু। মিরপুরে যেতে গেলেও ক্যান্টনমেন্ট বেটার, উত্তরায় যেতে গেলেও ক্যান্টনমেন্ট বেটার। সেনা সদস্যদের তো এক জায়গায় থাকতে হবে? আমরা মনে করেছি, ক্যান্টনমেন্ট তাদের জন্য ‘বেস্ট পজিশন’। তবে তাদের ডাকা হলেই তারা মুভ করবে। তিনি বলেন, ‘কৌশলগতভাবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুভ করাটা সেনাবাহিনীর জন্য সহজ হবে। রিটার্নিং অফিসাররা ডাকা মাত্রই তারা চলে আসবে। ম্যাজিস্ট্রেটও তাদের সঙ্গে থাকবে।’ তাই কোনো সমস্যা হবে না বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে নির্বাচনে সেনা সদস্যদের টহল দেয়ার প্রয়োজন নেই মন্তব্য করে মো. শাহনেওয়াজ আরও বলেন, আমি আগেও বলেছি, আজকেও বলছি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যসহ র‌্যাব, বিজিবি, আনসার টহল ও অবস্থান নেবে। সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে রেখেছি, যখনই প্রয়োজন হবে রিটার্নিং অফিসারা বলার সঙ্গে সঙ্গে মুভ করবে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রয়োজনের তুলনায় এ নির্বাচনে আইনশৃংখলা বাহিনী অনেক বেশি। তাই আলাদাভাবে সেনাবাহিনীর টহল আপাতত প্রয়োজন হবে না। তবে প্রয়োজন হলে যে কোনো মুহূর্তে তারা টহল দেবেন।
শাহনেওয়াজ বলেন, ‘তিন সিটি নির্বাচনে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের যার যেখানে অবস্থান থাকা উচিত, সেখানে রাখা হবে। যাতে ভোটাররা সুন্দর সুশৃংখলভাবে ভোট দিতে পারেন। এ নিয়শ্চতার জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত হিসেবে সেনাবাহিনীকেও রেখেছি। চিঠির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, মূলত আমাদের এবং সেনাবাহিনীর অবস্থান বুঝাবার জন্যই চিঠি দেয়া হয়েছে। কোনো পরিবর্তন বা আলাদা কিছু নয়, জনগণের মনে যাতে সন্দেহ না থাকে। এ কারণেই আমার বলা, সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবেই কাজ করবে। তবে রিটার্নিং অফিসার চাইলে তারা কাজ করবে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা সঠিকভাবে থাকবে।
মাঠে না রেখে ক্যান্টনমেন্টে রাখা বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে পড়ে না। তবে ক্যান্টনমেন্টের চার পাশেই সিটি কর্পোরেশন এলাকা। কাজেই ধরে নেয়া যায়, তারা সিটির মধ্যেই অবস্থান করবে। স্বস্তির জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে সিইসি মঙ্গলবার জানান। কিন্তু সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে রাখলে জনমনে ওই স্বস্তি থাকবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগেও বলেছি, সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। স্ট্রাইকিং ফোর্স তখনই দরকার হয়, যখন রিটার্নিং অফিসাররা প্রয়োজন মনে করেন। তিনি বলেন, নিয়মিত আইনশৃংখলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখে জনমনে স্বস্তি থাকবে। এছাড়াও প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনী থাকবে। কাজেই যারা ভোট দেবেন ও ভোট প্রার্থনা করবেন কারোর সমস্যা হবে না।
এছাড়া আমাদের ভোটার ও ভোট প্রার্থনাকারীরা এত উত্তেজিত নয় যে, তাদের পাহারা দিতে হবে। তারপরও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে রেখেছি। চট্টগ্রামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন এলাকার পাশেই তাদের ক্যান্টনমেন্ট রয়েছে। কাজেই সমস্যা হবে না। তারা ক্যান্টনমেন্টে থাকবেন।

সেনারা বিদেশে নিরাপত্তা দিতে পারলে দেশে কেন নয়, প্রশ্ন খালেদার

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারের সময়
রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় বক্তব্য দেন। ছবি: ফোকাস বাংলা
নির্বাচন কমিশন সরকারকে বিশেষ সুবিধা দিতে
প্রথম সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েও পরে সরকারের
নির্দেশে সেখান থেকে সরে গেছে -খালেদা জিয়া
‘সরকার সমর্থকদের সুবিধা দিতে ইসি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে’
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, সেনাবাহিনী বিদেশে শান্তি মিশনে গিয়ে সে দেশের জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারলে তারা কেন দেশে জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারবে না?
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কুড়িল এলাকায় দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানোর সময় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া এমন প্রশ্ন তোলেন।
নির্বাচনী পথসভায় একজন পথচারী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ম্যাডাম, সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া সুষ্ঠু ভোট হবে না।’ এ কথা শুনে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ক্যান্টনমেন্টে বসে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা দেওয়া যায় না। পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে মারা হয়েছে, সে সময় সেনাবাহিনী কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী বিদেশে শান্তি মিশনে গিয়ে সেদেশের জনগণের নিরাপত্তা দিয়ে সুনাম অর্জন করেছে। এখন তারা কেন দেশে জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারবে না? ’ তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভোটকেন্দ্রে সেনা মোতায়েনের দাবি জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন চাই। সন্ত্রাসমুক্ত ঢাকা চাই। আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে গেছে। নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার কারণে পর পর তিন দিন আমাদের গাড়িবহরে হামলা করেছে। আমার প্রাণনাশের চেষ্টা করেছে। তারা ভেবেছিল গুলি করে আমার পথরোধ করবে। জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে আমরা সামনে এগিয়ে যাব।’
ভোটের দিন সবাইকে সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, চট্টগ্রামে বিএনপি-সমর্থিত মনজুর আলম, ঢাকায় তাবিথ আউয়াল ও মির্জা আব্বাসকে তারা ভোট দেবে।   
কুড়িল পথসভা শেষে খালেদা জিয়া রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড হয়ে গুলশান ১ ও ২ এলাকায় দলীয় প্রার্থীর পক্ষে লিফলেট বিতরণ করেন। সেখান থেকে তিনি বনানী মাঠের উল্টো দিকের ইউএই মার্কেট এলাকায় নির্বাচনী প্রচার চালান। এ সময় স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, আশরা ভালো নেই। এ কথা শুনে খালেদা জিয়া বলেন, পরিবর্তন হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব হাবীব উন নবী খান সোহেলসহ দলের শতাধিক নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে আছেন।
একদিন বিরতির পর দলীয় প্রার্থীর পক্ষে আজ প্রচারে বের হন খালেদা জিয়া। সাড়ে চারটার দিকে তিনি গুলশানের বাসা থেকে বের হন। তাঁর গাড়িবহর প্রথমে রাজধানীর নতুন বাজার এলাকায় যায়। সেখান থেকে গাড়িবহর প্রগতি সরণি হয়ে যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় যায়। এরপর কুড়িল এলাকায় গিয়ে পথসভায় বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।
গত সোম, মঙ্গল ও বুধবার পর পর তিন দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার, ফকিরাপুল ও বাংলামোটর এলাকায় হামলার মুখে পড়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার আর নির্বাচনী প্রচারে নামেননি খালেদা জিয়া। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিন দিনের হামলায় খালেদা জিয়ার গাড়িসহ নিরাপত্তাকর্মীদের গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাড়ি-সংকটের কারণে খালেদা জিয়া বের হননি। এর আগে রোববার উত্তরায় তিনি নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সরকার-সমর্থকদের বাধার মুখে পড়েন।

আর চুপ রইবে না নারী

পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনায়
জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে টিএসসিতে গতকাল
গণনারী জমায়েতের আয়োজন করা হয়। জমায়েতের একপর্যায়ে
বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ জানানো হয়
বয়স্ক এক নারী তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করছিলেন, ‘ওই দিন সাবসিডিয়ারি পরীক্ষার ফল দেওয়ার কথা। প্রশাসনিক ভবনের বোর্ডে টানানো ফল দেখতে গেছেন। নিচু হয়ে বোর্ডে ফল দেখতে ঝোঁকার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো, অসংখ্য কালো হাত আমাকে ঘিরে ধরেছে। সেদিনের কথা কাছের কয়েকজন নারীবন্ধুকে ছাড়া আর কাউকে বলতে পারিনি। গলা ছেড়ে কেঁদেছিলাম, বন্ধুরা বলেছিল, রুমে যা, কাল দেখা যাবে। সে দেখা আর হলো না।’
এভাবে চুপ করে থাকার কারণেই নারীর এখন এই অবস্থা। তাই আর চুপ করে থাকা নয়। বলতে হবে সেসব নিপীড়নের কথা। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে এক গণ নারী জমায়েতে এক নারী এসব কথা বলেন। এ সময় অনেকেই স্মৃতিচারণ করেন। উদ্যোক্তারা সংবাদমাধ্যমে স্মৃতিচারণকারী নারীদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। বর্ষবরণে নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদে বিশিষ্ট কয়েকজন নারীর উদ্যোগে এ জমায়েত হয়।
প্রতিবাদী গানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া জমায়েতে উপস্থিত নারীরা বাঁশি বাজানোর অভিনব কর্মসূচির মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানের জানান দেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু মিতিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন ও কাবেরী গায়েন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, শিল্পী কৃষ্ণকলি ইসলাম, অভিনেত্রী বন্যা মির্জা, জ্যোতিকা জ্যোতি প্রমুখ। পরে সেখানে ‘বটতলা’র আয়োজনে যৌন নিপীড়নবিরোধী নাটক প্রদর্শন করা হয়। জমায়েত থেকে প্রতিবছর পয়লা বৈশাখের দিনটিকে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারী গণজমায়েতের দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
১৩ ছাত্রসংগঠনের সংবাদ সম্মেলন: নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় গতকাল মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করে ১৩টি ছাত্রসংগঠনের দুটি জোট-প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য। তারা যৌথভাবে ২৬ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১১টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্রতিবাদী সমাবেশ ও কুশপুত্তলিকা দাহ করবে। পরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি উপাচার্যকে স্মারকলিপি দেয়।
মশাল মিছিল, মানববন্ধন: যৌন নিপীড়কদের শাস্তি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রক্টরের অপসারণসহ ছয় দফা দাবিতে সন্ধ্যায় টিএসসিতে মশাল মিছিল করে ছাত্র ইউনিয়ন। মশাল মিছিল করে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী। সকালে ইডেন কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন।
প্রমাণ জমা পড়েনি: নারী লাঞ্ছনার ঘটনা তদন্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি ১৬ এপ্রিল প্রামাণিক তথ্য আহ্বান করেছিল। গতকাল ছিল তথ্য জমাদানের শেষ দিন। যোগাযোগ করা হলে কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অপেক্ষা করেছি, কিন্তু কেউ কোনো তথ্য জমা দেয়নি।’ এখন তদন্ত কীভাবে চলবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করাই তো আমাদের কাজ।’

কারচুপির সুযোগ দিতেই সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন : জামায়াত

জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডাঃ শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের জোর-জবরদস্তি করে ভোট কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্যই নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। জনগণ মনে করে সরকারের চাপের কারণেই নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। জনগণ নির্বাচন কমিশনের এ ভূমিকায় বিক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। জনগণ মনে করে মেরুদণ্ডহীন এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কখনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না। তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে নজীরবিহীন টালবাহানা আখ্যায়িত করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আজ এক বিবৃতিতে ডা. শফিক একথা বলেন।
তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি সর্বজনীন। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই জনগণ বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসছে। আর সরকারের মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা বরাবরই বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। অবশেষে জনগণের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন ২৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতা না দিয়ে শুধুমাত্র স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা না যেতেই গত ২৩ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সেনাবাহিনীকে সেনানিবাসে থাকার এবং রিটার্নিং অফিসার তাদের ডাকলে সাড়া দিবে মর্মে বক্তব্য দিয়েছেন। দেশবাসী মনে করে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরকারের মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে যে বক্তব্য দিয়ে আসছেন তাই সমর্থন করছে। সরকারি দলের সমর্থিত প্রার্থীদের জোর-জবরদস্তি করে ভোট কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্যই নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। নির্বাচন কমিশনের এ ন্যক্কারজনক ভূমিকা ভোটারগণকে হতাশ করেছে।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আদৌ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি-না সে ব্যাপারে জনগণ সন্দিহান। নির্বাচন কমিশনের এ ধরনের নতজানু ভূমিকা কারো কাম্য নয়।
আসন্ন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যেই ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে অবিলম্বে সেনা মোতায়েন করার জন্য তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ
দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে মাঠে নেমেছে জঙ্গি স্কোয়াড’ শিরোনামে আজ শুক্রবার প্রকাশিত রিপোর্টে গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা প্রচারণা’ চালানোর তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ আজ এক বিবৃতি দিয়েছেন। এ রিপোর্টে ‘নাশকতার মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ছক তৈরি করে মাঠে নেমেছে জামায়াত-শিবির। অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেনেড, পেট্রলবোমা মজুদ গড়ে তুলেছে জামায়াত-শিবির।’ মর্মে যেসব কথা লেখা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা। এ রিপোর্ট সম্পর্কে হামিদুর রহমান আযাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো গোটা রিপোর্টটিই অবাস্তব ও কাল্পনিক। এ রিপোর্টে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির অস্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, বরং ঘৃণা করে থাকে। কাজেই জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাশকতার মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য ছক তৈরি করা, কিংবা অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেনেড, পেট্রলবোমা মজুদ করা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। এভাবে ভিত্তিহীন মিথ্যা কাল্পনিক রিপোর্ট প্রচার করে দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মিথ্যা প্রচারণা চালানো থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

নির্বাচন কমিশনের ইউটার্ন by সিরাজুস সালেকিন

ভোল পাল্টাতে একদমই সময় নিলো না নির্বাচন কমিশন। সময়ের ব্যবধান মাত্র ২৪ ঘণ্টা। নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এমন ইউটার্ন একেবারেই অভিনব। মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ জানিয়েছিলেন, চার দিন ভোটের মাঠে মোতায়েন থাকবে সেনা। তিন ব্যাটালিয়ন সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠিও দেয়া হয় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে। পরদিনই গণেশ উল্টে গিয়ে পাঠানো হয় নতুন চিঠি। সেনানিবাসেই থাকবেন সেনাসদস্যরা। রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুরোধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবে তাদের। গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনারও একই কথা বলেছেন।
নির্বাচন কমিশনের এমন ইউটার্নে বিস্ময় তৈরি হয়েছে চারদিকে। তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্টজনেরা। আর জনসাধারণ হয়ে পড়েছেন আতঙ্কিত। নিজেদের ভোট দিতে পারবেন কি-না এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসির সিদ্ধান্ত ভোটারদের সঙ্গে ঠাট্টা ছাড়া আর কিছু না। কারণ ভোটারদের স্বস্তির কথা চিন্তা করেই সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ ছাড়া প্রধান বিরোধী জোট বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই সেনা মোতায়েনের পক্ষে ছিলেন। এমনকি সিইসির সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রার্থীদের মতবিনিময় সভায় বেশির ভাগ প্রার্থী সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে সেনাবাহিনী ছাড়াই সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলছিলেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, সিইসি হুকুম করলেই সেনা মোতায়েন হবে তা ঠিক নয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও সেনা মোতায়েন ছাড়াই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব বলে দাবি করেছিলেন। তার মতে, আগের সিটি নির্বাচনগুলো সেনা মোতায়েন ছাড়াই অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে। তাই এবারও সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই।
গতকাল সাংবাদিকদের সিইসি বলেন, সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টেই থাকবে। কারণ, ক্যান্টনমেন্ট হচ্ছে ঢাকা মহানগরের মাঝখানে অবস্থিত। সেখান থেকে উত্তর এবং দক্ষিণে যেতে সহজ হবে। তাই তাদের ক্যান্টনমেন্টেই অবস্থান নিতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান নিলেও রিটার্নিং কর্মকর্তার ডাকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে সাড়া দেবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের সিটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে সেনাবাহিনী ব্যবহারের সিদ্ধান্ত লোক দেখানো বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি রাস্তায় সেনাবাহিনীর টহল ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর পাশে সেনাবাহিনীর অবস্থান করানোর দাবি করেছেন। গতকাল বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং মানুষের মন ভোলানোর জন্য এই সশস্ত্র বাহিনীর তথাকথিত মোতায়েনের কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবে এটার কোন মূল্য নেই। কারণ কোন কেন্দ্রে যদি গণ্ডগোল হয় বা আশেপাশে গণ্ডগোল হয় তবে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে কামরাঙ্গীর চরেই হোক বা ধোলাইপাড়ে যেতে লাগবে এক ঘণ্টা। গণ্ডগোল তো একঘণ্টা লেগে থাকে না। স্ট্রাইকিং ফোর্স সেনানিবাসে থাকলে তারা শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে কোন প্রকার অবদান রাখতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। তবে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেক্ষেত্রে আমাদের বলার কিছু নেই। আমরা চাই নির্বাচন অবাধ ও নির্বিঘ্নে হোক। সেনাবাহিনীর সেনানিবাসে অবস্থান সম্পর্কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, এটা কোন কাজে আসবে না। যে উদ্দেশ্যে সেনা চাওয়া হয়েছে সে উদ্দেশ্য সাধন হবে না। এটা আইওয়াশ ছাড়া কোন কিছু না। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট না এটা সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বোঝাই যাচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়া বাকি সব দল সব ব্যক্তি দাবি করতেছে তাদের অসুবিধা কি? দিতে আপত্তি কেন? কারণটা কি? যেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয় এটা সবারই কাম্য হওয়া উচিত। যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা দরকার। তারা সিদ্ধান্ত নিতে এতদিন সময় নিল। এখন বলছে তারা ক্যান্টনমেন্টে থাকবে এগুলো তো উনাদের জন্য ঠাট্টা করা হচ্ছে আর কি! সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সেনাবাহিনী পথেঘাটে দৃশ্যমান থাকলে লোকের একটা আস্থার জায়গা তৈরি হবে। ভোটকেন্দ্রে কোন ধরনের হাঙ্গামা হবে না। সেনাবাহিনী দৃশ্যমান থাকলে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা যদি ক্যান্টনমেন্টে বসে থাকে দৃশ্যমান না থাকে তাহলে সেনা মোতায়েনের যে উদ্দেশ্য সেটা তো অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এটা তো স্পষ্ট যে সরকারি দল যা চাইবে সেটাই তো হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারি দলের লোক যা চাইছে সেটাই তো হচ্ছে। ফলে সেনাবাহিনী থাকছে না। ইসির সিদ্ধান্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কি? নির্বাচনের দুইদিন আগে এ কথাটা অবাস্তব হয়ে যাচ্ছে। ফিল্ডটা যেভাবে আছে ওভাবেই থাকছে। সমান করার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন এটা নিয়ে খেলা করছে। সেনা যদি ব্যবহার করতে হয় তবে তাদের সেনানিবাসের বাইরে থাকতে হবে। কাজে লাগাতে হবে। উপজেলা নির্বাচনে তারা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে ছিল। কিন্তু তাদের ব্যবহার করা হয়নি। এটা নির্ভর করে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর। নির্বাচন কমিশন যদি মনে করবে তারা সেনাবাহিনী ছাড়াই নির্বাচন করবে তবে তারা সব কিছুর যেন দায় নেয়। কারণ উপজেলা নির্বাচনে শেষদিকে অনেক অনিয়ম-সহিংসতা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এর দায় নেয়নি। নাগরিক হিসাবে আমরা এসব শুনতে চাই না। নির্বাচন কমিশনের এমন আচরণে প্রার্থীরা আস্থা হারিয়ে ফেলবেন। এভাবে তারা চোখে ধুলা দিচ্ছেন। এবং মাধ্যম হিসাবে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করছেন।
নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত জানানোর পরের দিন বুধবার হঠাৎ করে চিঠি দিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করে নির্বাচন কমিশন। ইসির নির্বাচন পরিচালনা বিভাগ-২ এর উপসচিব মো. সামসুল আলম স্বাক্ষরিত সংশোধিত চিঠি সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের কাছে পাঠানো হয়। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী সহায়তা চেয়ে একইভাবে একটি চিঠি পাঠানো হয়। তবে সেখানে সেনানিবাসে সেনাসদস্যদের অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। নতুন চিঠিতে এই বাক্যটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে এভাবে-তারা (সেনাবাহিনী) মূলত সেনানিবাসের অভ্যন্তরে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে অবস্থান করবেন এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুরোধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে তারা পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। মঙ্গলবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ জানান, স্ট্রাইকিং ও রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে ২৬শে এপ্রিল থেকে ২৯শে এপ্রিল পর্যন্ত সেনা মোতায়েন থাকবে। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনকে সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য এবং জনমনে যাতে কোন ভীতি না থাকে, ভোটাররা যাতে সুন্দরভাবে নির্বিঘ্নে নিশ্চিতে ভোট দিতে পারে সেজন্য আমরা সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর আগে সেনা মোতায়েন নিয়ে নাটকীয়তা চলে নির্বাচন কমিশনে। ১৯শে এপ্রিল ইসির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক হয়। ওই দিন বিকালে কমিশনরা একটি বৈঠকে প্রাথমিকভাবে ২৬ থেকে ২৯শে এপ্রিল পর্যন্ত সেনা মোতায়েনের বিষয়ে একমত হন। সোমবার বিকাল পর্যন্ত পাঁচ নির্বাচন কমিশনারের দুইজন মতামত দেননি। পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে ছিলেন। অন্য একজন নির্বাচন কমিশনার সিইসির অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। তবে অপর নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী পরিষ্কারভাবে কিছু জানাননি। অবশিষ্ট দুই নির্বাচন কমিশনার সোমবার পর্যন্ত তাদের মতামত সিইসির কাছে পাঠাননি। ফলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্তে পড়ে নির্বাচান কমিশন। নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানায়, মূলত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পরামর্শ করে। তাই তাদের ওপর কমিশন আস্থা রাখছে। ওই বৈঠক থেকে বের হয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সাংবাদিকদের জানান, সেনা মোতায়েনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এ ছাড়া প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনাররা বলেছিলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তারা যা করা দরকার সবকিছুই করবেন। উল্লেখ্য, গত ১৯শে মার্চ ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এই তিন সিটির ভোটগ্রহণ হবে ২৮শে এপ্রিল।

এ কেমন মশকারা? by সাজেদুল হক

এমন চমৎকার নাটক বহুদিন দেখা হয় না। এ যেন হুমায়ূন আহমেদের নাটকের চেয়েও হিট। একদিনেই ওলট-পালট হয়ে গেল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত। যারা এতদিন স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন বলে চিৎকার করতেন তারা এখন মুখ লুকানোর চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে নানা কিসিমের প্রধান নির্বাচন কমিশনার দেখা গেছে। এরই মধ্যে গায়েবি ভোট করে ইতিহাসে নিজের স্থান নিশ্চিত করে ফেলেছেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। শোনা যাচ্ছিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে নিজের অবস্থান কিছুটা পাল্টানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। বিরোধী প্রার্থীদের দাবি অনুযায়ী নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পক্ষে অবস্থান নেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নানা নাটকীয়তা শেষে মঙ্গলবার সিদ্ধান্তও নেয় কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজও জানান, চার দিনের জন্য তিন সিটিতে সেনা মোতায়েন হবে। সেনা চেয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠিও দেয়া হয় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে। আতঙ্কগ্রস্ত ভোটারদের অনেকের মধ্যে স্বস্তিও ফিরে আসে। সিদ্ধান্ত পাল্টাতে অবশ্য একদিনও লাগেনি। পরের দিনই কমিশনের নতুন চিঠি যায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে। বলা হয়, সেনা সদস্যরা সেনানিবাসেই থাকবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুরোধে তারা স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবেন। অথচ প্রচলিত আইনেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে সেনা তলব করতে পারেন। এজন্য কোন জগন্নাথ কমিশনের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না। এ ধরনের একটি বিনোদনমূলক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন ধন্যবাদ প্রাপ্য। এটা অবশ্য জাতির সঙ্গে এক ধরনের মশকারাও। ৫ই জানুয়ারির পরবর্তী যুগে এ ধরনের মশকারা করার অধিকার অবশ্যই তাদের রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কী কারণে হঠাৎ তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলো তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে কাদের খুশি করার জন্য ভোটের মাঠে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরে এলেন তা একেবারেই পরিষ্কার।
সেনা মোতায়েন নিয়ে এমন আরেকটি তুঘলকি কাণ্ডের কথাও স্মরণ করছেন পর্যবেক্ষকরা। তখন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের জমানা। রাস্তায় প্রতিদিনই চলছিল ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, রক্তাক্ত আন্দোলন। এমন পটভূমিতে ২০০৬ সালের ৮ই নভেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। ওই বছরের ৯ই ডিসেম্বর সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় উপদেষ্টা পরিষদ। এ সিদ্ধান্তসহ কয়েকটি বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন চার উপদেষ্টা। ১৩ই ডিসেম্বর নতুন সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। বলা হয়, সেনাসদস্যরা বিশ্রামে থাকবেন। তারা কোনপ্রকার অভিযানে যাবেন না। এ ছাড়া, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন চেয়েছিল। কিন্তু সরকার ওই নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করেনি।
অবশ্য শুধু সেনা মোতায়েন নয়, প্রায় প্রতিটি বিষয়েই কৌতুক করছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে প্রতিদিনই হামলার শিকার হচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। হামলাকারীদের পরিচয় সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত প্রকাশ হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে নীরব নয়! প্রধান নির্বাচন কমিশনার অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বলেছেন, তারা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য। প্রতিদিনই কোথাও কোথাও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক দুনিয়া এসব সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে। সব দেখেশুনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আজকের কাগজের সেই বিজ্ঞাপনের ঠিক উল্টো- আমাদের চোখ আর হাত দুটোই বাধা। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অবশ্য নির্বাচন কমিশনের দৌড় জানেন। যে কারণে কমিশনের নিষেধাজ্ঞার পরও তিনি প্রচারণায় রয়েছেন।
কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনও অবশ্য জানেন, তাদের বিরুদ্ধে দুর্বার কোন আন্দোলন গড়ে তোলার সক্ষমতা বিরোধীদের নেই। বিদেশীদের কার্যক্রম উদ্বেগেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এ অবস্থায় তারা থাকবেন তাদের মতোই। বিবেকের দায়বদ্ধতা বলে একটি বিষয় থাকলেও বাংলাদেশে পদত্যাগের নজির একেবারেই বিরল।
সাজেদুল হক
২৩শে এপ্রিল ২০১৫
ঢাকা

বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের গুপ্তচরবৃত্তি! by মিজানুর রহমান খান

নিউজিল্যান্ড বিশ্বরাজনীতিতে শান্তিপ্রিয় নিরীহ চরিত্রের দেশ, সেই দেশটিই কিনা বাংলাদেশের এক বা একাধিক স্থানে আড়ি পেতে আমাদের সবকিছুর ওপর নজরদারি করছে। অথচ আমাদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সম্পর্ক ক্রিকেট সূত্রে অতি মনোরম। দুঁদে ক্রীড়া লিখিয়ে উৎপল শুভ্রর কাছ থেকেই জানতে পেলাম, ক্রিকেট অঙ্গনের নক্ষত্রসম দেশটিকে গত তিন বছরের ব্যবধানে আমরা ঢাকার মাটিতে দুবার হোয়াইটওয়াশ করেছি। আমরা এর স্থানীয় নামকরণ করেছি বাংলাওয়াশ। তাদের মাটিতে টাইগাররা কখনো জয় পায়নি। তাই বলে তাদের মিডিয়া হয়তো বাংলাদেশকে ব্ল্যাকওয়াশ বলেনি। ব্ল্যাকওয়াশ কথাটা বলা এ কারণে যে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় টিম ‘ব্ল্যাক ক্যাপস’ (কালো টুপি) হিসেবে পরিচিত।
তবে আমাদের র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যা ব) এই ব্ল্যাক ক্যাপসের দেশটি কূটনৈতিকভাবে এক দশকের বেশি সময় ধরে কার্যত ‘ব্ল্যাকওয়াশ’ করে চলেছে। নিউজিল্যান্ডের সাংবাদিক নিকি হ্যাগার ও রেন গালাঘার ১৬ এপ্রিল ‘জিসিএসবি’স সিক্রেট বাংলাদেশ স্পাই মিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর চার দিন কেটে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কোনো প্রতিবাদ করেনি। কারণ, সম্ভবত রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে এটা কোনো গোপনীয় বিষয় নয়। কিউই (নিউজিল্যান্ড) গুপ্তচররা র্যা বকেই কেবল তথ্য দিচ্ছে না, গোপনে র্যা ব কী করছে, তা-ও জেনে নিচ্ছে। ২০০৯ সালের জিসিএসবি (গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস সিকিউরিটি ব্যুরো) প্রতিবেদন বলছে যে ‘র্যা বের সদর দপ্তর ও র্যা ব ইউনিটগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের তথ্যও তারা সংগ্রহ করছে।’ ১৬ এপ্রিলই এই খবর প্রথম বেরোল, তা কিন্তু নয়।
তবে বর্তমানে রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) হুইসেল ব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেন এর নেপথ্যের নায়ক। ইলেকট্রনিক সার্ভিলেন্সের কারণে তিনি যত নথিপত্র ফাঁস করতে পেরেছেন, তার ভিত্তিতে একটা বিশ্লেষণধর্মী নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছে দৈনিক নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড ও মার্কিন সংবাদ ওয়েবসাইট দি ইন্টারসেপ্ট। ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি স্নোডেনের যে দুটি নথির ভিত্তিতে করা হয়েছে, সে দুটি পরীক্ষা করে দেখলাম, বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র যে কথা প্রকাশ করতে চায়নি, তাই ফাঁস করা সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যা জানাতে চায়নি, তা-ই প্রকাশ করেছিলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, মার্কিন হুলিয়া মাথায় নিয়ে যিনি এখনো লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছেন।
আমরা তাই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের গোপন তারবার্তাগুলো পড়তে পেরেছিলাম। আর এবারে স্নোডেন নথির ভিত্তিতে আমরা যা জানলাম, তা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে বিশ্বকে জানাতে চেয়েছে। এটা নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কোনো একান্ত গোপন চুক্তির ফল নয় বলে প্রতীয়মান হয়। এর মূলে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে করা পাঁচ দেশীয় একটি গোয়েন্দা চুক্তি, সংক্ষেপে একে বলে ফাইভ আইজ, আবার এই পাঁচটি দেশ ফাইভ আইজ কথাটিরও একটি সাংকেতিক রূপ বের করেছে। সেটি হলো চার অক্ষরের: এফভিইওয়াই। বাংলাদেশ-সংক্রান্ত মার্কিন নথির গায়ে এই চার অক্ষর খোদাই করা আছে। এই সংকেত দিয়ে যে পাঁচ দেশকে বোঝানো হয় তারা হলো, মান্যবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড। তার মানে কি এটা দাঁড়ায় না যে, গুপ্তচরবৃত্তি নিউজিল্যান্ড করলেও তার দায় এড়াতে পারে না অপর চারটি দেশও? অবমুক্ত করা বা প্রকাশিত এই নথিটিই সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাঁচটি দেশই জনসাধারণের কাছে তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের করা পাপপুণ্য (দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশি রাষ্ট্রে) গোপন রাখার নীতি অনুসরণ
করছে। আমরা এখানে মনে রাখব, অনেক পাপের নিয়ামক ও ভাগীদার হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব যে আজও মার্কিনদের সমীহ করে, তার মূলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি বিষয় রয়েছে। তাই তারা সময়ে সময়ে সরকারিভাবে গোপন নথি অবমুক্ত করে। আবার এ-ও ঠিক, এ কাজেও তাদের সব সময় শ্বেতশুভ্র ভাবার কারণ নেই। ২০১৩ সালের নথির কিছু অংশ কালিঝুলি মেখে কী দরকার পড়েছিল অবমুক্ত করার লেবেল আঁটার, তা আমাদের জানার বাইরে। র্যা ববিষয়ক প্রকাশিত দুটি নথির আরেকটি হচ্ছে জিসিএসবির।
২০০৯ সালের জুলাই মাসের তৈরি করা জিসিএসবির প্রতিবেদনটি বেশ স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে যে বাংলাদেশের ওপর কিউই গোয়েন্দাগিরি এতটাই ‘স্বচ্ছ’ যে তারা বিষয়টি তাদের সরকারি ওয়েবসাইট জিসিএসবি.গভট.এনজেড-এ প্রকাশ করেছে বলেও উল্লেখ করেছে। করবে নাই বা কেন? মার্কিন নথিতেই আছে জিসিএসবি হলো এসএসপিএসি নামের ১০ দশীয় একটি জোটের চার্টার সদস্য, যেখানে ভারতও আছে। একটি লিংকের কথা সেখানে বলা আছে, যেটির আবার আধখানা অংশ কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেখানে প্রবেশ না করা যায়। মনে হচ্ছে ২০১৩ সালের নথিটি মার্কিনরা নিজ দায়িত্ব স্বীকার করে অবমুক্ত করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে কিউইদের তৈরি করা আট পৃষ্ঠার নথিটির গায়ে অবমুক্ত করার কোনো চিহ্ন নেই, এটা স্নোডেনের সংগ্রহ হয়ে থাকলে এটিও মার্কিন সরকার প্রকাশ করেছে বলে ধারণা করি। তবে এরও কয়েকটি স্থানে কালো কালিতে মুছে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আমাদের জন্য যেটা বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ২০১৩ সালের নথিতে ফাইভ আইজ মানে পাঁচটি দেশই বিশ্বকে বলছে, আমরা চীন ও ভারতের মতো দেশের ওপরও গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে থাকি। ওই দুই সাংবাদিক গত মাসের গোড়ায় প্রথম প্রকাশ করে যে নিউজিল্যান্ড তার প্রতিবেশী প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, যাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও শাসনগতভাবে খুবই ভঙ্গুর, তাদের ওপর গোপনে নজরদারি চালাচ্ছে আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাচার করছে। এ নিয়ে ঝড় যেটুকু উঠল, তা নিউজিল্যান্ডের বিরোধী শিবির থেকে। আর গুপ্তচরবৃত্তির শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে সামোয়ার প্রধানমন্ত্রী অকপটে বললেন, ‘আমাদের কিছুই লুকানোর নেই!’ ফিজির একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বললেন, ‘আমরা আগেই জানি।’
হিন্দুস্তান টাইমস-এর একজন সাংবাদিক যখন জানলেন যে নিউজিল্যান্ড ভারতের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে, তখন তার মনের অবস্থাটা সম্ভবত আমার মতোই হলো। তিনি মোদির সঙ্গে গত মাসে বিদেশ সফররত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মন্তব্য চাইলেন, কিন্তু পেলেন না। ভারত ও চীনের কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নজরে এল না। তাহলে সবকিছুই কি ‘স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক’? আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া বা সতর্ক হওয়ার কিছুই কি নেই? অবশ্যই আছে।
ওই দুই সাংবাদিক যে কারণে রিপোর্ট করেছেন, তার মূল কথা হলো নিউজিল্যান্ড আইন বলছে, তাদের গোয়েন্দা সংস্থা বিদেশে গোয়েন্দাবৃত্তি করবে, কিন্তু তা ভালো মানুষদের রক্ষার জন্য। কিন্তু র্যা ব যেহেতু মানবাধিকারের লঙ্ঘন করছে, তাই তাকে সহায়তা দেওয়ায় আইনের লঙ্ঘন ঘটছে। এ ধরনের বিভাজন মেনে চলা বাস্তবে দুরূহ। মার্কিন সিনেটর লেহি আইনের কথা হলো, যে বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তাকে কোনো সাহায্য করা যাবে না। অপারেশন ক্লিন হার্টের পরে গঠিত র্যা বকে তারা এবং তাদের জানিমিত্র ব্রিটেন প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান র্যা বের কথিত নির্যাতনের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন ছেপে হইচই ফেলল। ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত কমিশনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু তার অগ্রগতি জানি না। সুতরাং গলদ সারিয়ে বিদেশিরা আমাদের রাষ্ট্রকে, আমাদের র্যা বকে জাতে তুলবে, তেমন ভাবনা বাতুলতা।
বাস্তবতা হলো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে আড়ি পেতে পাওয়া মালমসলার আদান-প্রদান করবেই। যার যত হিম্মত, সে তত সুবিধা পাবে। সুতরাং কেবল উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে রাষ্ট্রের হিম্মত মাপা ঠিক হবে না। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটি নিয়েই বেড়ে উঠতে পারলে তার হিম্মত বাড়বে, অন্যের খাবারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
ফাইভ আইজ ও তার মিত্র দেশগুলো দেখাচ্ছে, পাইকারি ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তির যুগে তাদের কাছে ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কতটা খেলনা ও ফেলনা হতে পারে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা, বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার ধারণাগুলো এখন কত বেশি, কতটা গভীর ও ব্যাপকতায় আড়িপাতা যন্ত্র দিয়ে মাপা হচ্ছে ও হবে।
আমাদের জন্য এর প্রতিকার অধিকতর স্বচ্ছতা, সামাজিক সুবিচার ও গণতান্ত্রিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাই আমরা গণতন্ত্রের ওপরে, শক্তিশালী সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরে চোখধাঁধানো উন্নয়ন ও জিডিপির গল্পকে জায়গা দেওয়ার যেকোনো প্রবণতাকে নাকচ করে দিই। আমরা বেশ বুঝতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র নয়, ফাইভ আইজ নয়, সারাক্ষণ গোটা বিশ্বব্যবস্থার, বিশ্ব মুরব্বিদের রাডারে রয়েছি আমরা। আমাদের বন্ধুরা, উন্নয়ন অংশীদারেরা আমাদের রাষ্ট্রকে কমবেশি সন্দেহের চোখে দেখছে এবং তাদের উদ্বেগের সবটুকুই বৈধতার সংকটে ভুগছে না। ফাইভ আইজ জোটের বেশির ভাগেরই নিজস্ব আইনে নিজেদের নাগরিকদের ওপর আড়ি পাতা বারণ। তাই এই ঘাটতি মেটাতে পরস্পরের গোয়েন্দা সংস্থাকে তারা ব্যবহার বা অপব্যবহার করে থাকে। একমাত্র কানাডা বাদে আর চার দেশেরই নির্দিষ্টভাবে গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আড়ি পাতা কার্যক্রমের তদারকির জন্য খুবই শক্তিশালী ও গতিশীল সংসদীয় কমিটি রয়েছে। বাংলাদেশেরও তেমন কমিটি থাকা দরকার, যারা যেকোনো অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হবে।
সলোমান দ্বীপ, ফিজি, সামোয়া কি কোনো রাষ্ট্র হলো? এগুলো শুধু ভঙ্গুর বললে কম বলা হবে। ফাইভ আইজ নথিতে উল্লেখ করা ভঙ্গুর দেশগুলোর মধ্যে কেবল বাংলাদেশ ও র্যা বের গতিবিধি কীভাবে তারা তদারক করছে, সে বিষয়টিই বিস্তারিত ও সচিত্র প্রকাশ করেছে। ইদানীং ক্রিকেটে আমরা খুব নাম করছি। এ রকম বহু উৎসবের আড়ালে গণতন্ত্রের সংকট ও স্বচ্ছতার দুর্ভিক্ষ আড়ালে চলে যাচ্ছে। অথচ এটা কিউইদের ঢাকার মাঠে শুভ্র ধোলাই করার আনন্দেই মশগুল থাকার সময় নয়। নিউজিল্যান্ডের ডেইলি পোস্ট-এর সম্পাদক কিম গিলেসপি ১৭ জুলাই লিখেছেন, ‘কিউই গুপ্তচরদের বাংলাদেশ মিশন সত্য নয়, সেটা সরকারের বলা দরকার।’ আমরা বলি, নীরবতা ভেঙে এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের তরফে কিছু একটা বিবৃতি আসা দরকার। এটা সংসদে আলোচনা করারও বিষয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

মোনালিসার হাসিতে হাসবে অন্ধরাও!

যাদের দেখার ক্ষমতা আছে, তারাই এতদিন বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা দেখে আসছে। কিন্তু অন্ধ বা কোনো কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা মানুষ এত বিখ্যাত একটা চিত্রকর্ম দেখা থেকে বঞ্চিত হবে, তাই কি হয়? এবার স্পেনের মাদ্রিদের প্রাডো মিউজিয়ামে এমন এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে যেখানে অন্ধরাও ‘দেখতে’ পারবেন বিখ্যাত মোনালিসা। এ ‘দেখতে’ পারার মানে হলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে অনুভব করা। অন্ধদের জন্য এমন ধরনের প্রদর্শনী এবারই প্রথম। প্রদর্শনীতে মোনালিসা ছাড়াও বিশ্ববিখ্যাত আরও ছয়টি চিত্রকর্ম স্থান পাবে। প্রদর্শনীটির নাম দেয়া হয়েছে ‘টাচিং দ্য প্রাডো’। ৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী ২৮ জুন পর্যন্ত চলবে। চিত্রকর্মগুলোকে মূল চিত্রকর্মের আলোকে ত্রিমাত্রিক রূপ দেয়া হয়েছে। যাতে অন্ধরা এগুলো ছুঁয়ে অনুভব করতে পারে।
একটি বিশেষ পদ্ধতিতে এ চিত্রকর্মগুলোকে পুনরায় তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ এ পদ্ধতিটির নাম ‘ডিডো’। এটা এমন এক ধরনের প্রিন্টিং পদ্ধতি যাতে মূল ছবির একটি হাইরেজুলেশন ছবি এবং সঙ্গে মুখমণ্ডল, জামা-কাপড়সহ অন্যান্য উপাদান এমনভাবে প্রিন্ট করা হয়, যাতে অন্ধরা হাত দিয়ে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারে। রুবেন নামে এক অন্ধ বলেন, আমার জন্য ডিডো হচ্ছে কোনো কিছু দেখার বা বোঝার আরেকটি পন্থা, বিশ্বের সঙ্গে আমার সম্পর্কের একটি যোগসূত্র। তিনি বলেন, আমার আঙুলগুলো আমার চোখ। তাদের সাহায্যেই আমি দেখি, অনুভব করি। এমনকি জিনিসটি কেমন হতে পারে সে ধারণাও তৈরি হয়ে যায় আমার। একটি ডিডো প্রিন্ট করতে ৪০ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। রংয়ের লেয়ার, পুংখানুপুংখভাবে প্রতিটি অংশের থ্রিডি প্রিন্টিং করা হয় এ পদ্ধতিতে। নিউইয়র্ক টাইমস।

কিষাণ সমাবেশে কৃষকের আত্মহত্যা

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কিষাণ সমাবেশে আত্মহত্যা করলেন এক কৃষক। বুধবার সমাবেশ চলাকালীন গাছের ডালে ঝুলে আত্মহত্যা করেন ওই কৃষক। এএপির কর্মীরা দ্রুত তাকে নিচে নামিয়ে এনে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বুধবার মোদি সরকারের জমি অধিগ্রহণ বিলের বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে এএপির সভা চলছিল। তখনই গাছ থেকে ঝুলে পড়েন ওই কৃষক।
মৃত্যুর আগে একটি চিরকুট লিখে যান ওই কৃষক। সেখানে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন রাজস্থানের দাউসা জেলার বাসিন্দা গজেন্দ্র সিং রাজপুত। সুইসাইড নোটে তিনি লিখেছেন, ‘আমার তিনটি সন্তান রয়েছে। ঘরে খাবার কিছু নেই। খরায় সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে!’ পূর্বঘোষিত তারিখ অনুযায়ী এদিন যন্তর মন্তরে র‌্যালিতে অংশ নেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও এএপি প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। মোদি সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ বিলের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত ওই র‌্যালিতে যোগ দেয় অনেক কৃষক। র‌্যালিতে অংশ নেয়া ওই কৃষক গাছের উপর উঠে যায়। সেখানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে এএপি কর্মীরা নেমে আসার আহ্বান জানায়। এক পর্যায়ে এএপি কর্মীরা গাছে উঠে তাকে নামায়। এরপর ওই কৃষককে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আম আদমি নেতা কেজরিওয়াল তার ভাষণের পর ওই কৃষকের অবস্থা জানতে হাসপাতালে যান। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি দুঃখ পেয়েছি যে, সে যখন সবার সামনেই গাছে উঠল তখন কেউ বাধা দেয়নি।’ এএপি নেতা কুমার বিশ্বাস তখন বক্তব্য রাখছিলেন।
কুমার বিশ্বাস এ ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, পুলিশ কেন সক্রিয় হল না। তিনি বলেন, কেন পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখল। মনে হচ্ছে এটা মোদি-সরকারের ষড়যন্ত্র। ভারতে নতুন ভূমি অধিগ্রহণ আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বিজেপি সরকার। এ আইন অনুযায়ী, স্থানীয়দের মতামত ছাড়াই সরকার কল-কারখানার জন্য কৃষি জমি বরাদ্দ দিতে পারবে। সমাবেশে মোদিকে কটাক্ষ করে কেজরিওয়াল বলেন, কৃষকরা এখন আর প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করে না। কারণ, তিনি কৃষকদের জমি চুরি করে ধনীদের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছেন। আর এ জন্যই জরুরিভিত্তিতে জমি অধিগ্রহণ আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ বিলটি বাস্তবায়ন না করার জন্য কৃষকরা ছাড়াও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কংগ্রেস, আম আদমিসহ সব দল সংসদের পাশাপাশি মাঠেও নেমেছে।

প্রার্থী-ইশতেহারের ভোট, নাকি ‘রাজনৈতিক’ ভোট? by এ কে এম জাকারিয়া

জাতীয় রাজনীতি আপাতত ‘নির্দলীয়’ সিটি নির্বাচনে মনোযোগী হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে প্রার্থীদের এখন আর শুধু ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে হেঁটে হচ্ছে না; অনেকেই এখন দৌড়াচ্ছেন, কেউ সাইকেল চালাচ্ছেন, কেউ রাস্তাও ঝাড়ু দিচ্ছেন। ভোটারদের আকর্ষণে যত কৌশল নেওয়া যায় আর কি! নগরবাসীর সেবা করতে চান সবাই। প্রায় সব প্রার্থীই নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। আধুনিক ঢাকা, স্মার্ট ঢাকা, তিলোত্তমা ঢাকা, বাসযোগ্য ঢাকা, সবুজ ঢাকা, নিরাপদ ঢাকা—এসব প্রতিশ্রুতিতে ভেসে যাচ্ছেন নগরবাসী। দুনিয়ায় এখন বসবাসের সবচেয়ে অনুপযোগী শহর হিসেবে ঢাকার স্থান ২ নম্বরে। এমন একটি ‘গৌরব’ বয়ে বেড়াচ্ছে যে শহরটি, তার বাসিন্দাদের এখন আসলেই ধন্দে পড়ে যাওয়ার দশা। ঢাকার ‘সেবা’ করতে মরিয়া এই প্রার্থীদের কাকে রেখে কাকে যে তাঁরা ভোট দেবেন!
নির্দলীয় এই নির্বাচন নিয়ে যখন জাতীয় রাজনীতি মজেছে, তখন এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক যে এই নির্বাচনের সঙ্গে ঢাকা, এর উন্নয়ন বা এর বাসযোগ্যতার সম্পর্ক আসলে কতটুকু। যেসব প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের যোগ্যতা, ক্ষমতা বা তাঁদের দেওয়া ইশতেহার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয়টিই বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এসব বিবেচনায় নিয়ে কি ভোটাররা ভোট দেবেন, নাকি বিবেচনাটি হবে শুধুই জাতীয় রাজনীতি? আর প্রার্থী বা তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহারই যদি মূল বিবেচনার বিষয় হয়, তবে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, এসবের বাস্তবায়ন কি আদৌ সম্ভব? বর্তমান সিটি করপোরেশন বা যিনি মেয়র নির্বাচিত হবেন, সে ক্ষমতা কি তাঁর বা তাঁদের আছে?
নির্দলীয় এই নির্বাচনে যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের অনেকের প্রতি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত সমর্থন রয়েছে। দলের সমর্থন নিয়ে এবং দলের একক প্রার্থী হিসেবেই তাঁরা নির্বাচনে লড়ছেন। গণমাধ্যমেও কে কোন দল-সমর্থিত প্রার্থী, সেটা প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রার্থীরা যে নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছেন, তা দলীয়ভাবে দেওয়া কোনো ইশতেহার নয়। নিজেদের মতো করে যে যা পেরেছেন, ভোটারদের সামনে হাজির করেছেন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে সরকারি দলের সমর্থন পাওয়া দুই মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারের শুরুতেই বর্তমান আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সরকার ঢাকার জন্য কী কী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, কী কী চলমান আছে বা ভবিষ্যতে কী কী নেওয়া হবে, তার বর্ণনা দিয়েছেন। সরকারের এসব উদ্যোগের ফলে ঢাকাবাসী কী সুবিধা পেয়েছেন বা পাবেন, তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এসব অধিকাংশ কাজের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। এই দুই প্রার্থী ঢাকার জন্য সরকারের এসব ‘উন্নয়নকাজের’ বিবরণ দিয়ে নিজেদের পক্ষে ভোট চাইছেন, মেয়র হলে কী কী করবেন, সেগুলো তুলে ধরেছেন। উত্তরের প্রার্থী আনিসুল হক তো বিভিন্ন সময়ে বলেছেন যে সরকার-সমর্থিত প্রার্থী হওয়ায় ঢাকার জন্য কাজ করা অন্য যেকোনো প্রার্থীর চেয়ে তাঁর পক্ষে সহজ হবে।
সরকার-সমর্থিত দুই প্রার্থী ছাড়া আর কারও সেই সুযোগ নেই। বিএনপি-সমর্থিত দুই প্রার্থীর মধ্যে তাবিথ আউয়াল তাঁর ১২ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর আদালত ও মামলার জটিলতায় মির্জা আব্বাস অবশ্য এখনো নিজে মাঠেই নামতে পারেননি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বাইরে ঢাকার উত্তরের প্রার্থীদের মধ্যে বিকল্পধারা-সমর্থিত প্রার্থী মাহী বি. চৌধুরী, বামধারার গণসংহতি-সমর্থিত প্রার্থী জোনায়েদ সাকি বা সিপিবি ও বাসদ-সমর্থিত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ক্বাফী, দক্ষিণের সিপিবি ও বাসদ-সমর্থিত প্রার্থী বজলুর রশীদসহ অন্য প্রার্থীরাও নানা প্রতিশ্রুতির নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছেন।
প্রার্থীরা যে দল-সমর্থিতই হোন না কেন, সবগুলো ইশতেহারেই ঢাকার জরুরি সমস্যাগুলো জায়গা পেয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলোর সঙ্গেও ঢাকাবাসীর চাওয়ার মিল রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষমতা বর্তমান কাঠামোর সিটি করপোরেশন বা মেয়রের নেই। এর পরও মেয়র প্রার্থীরা কেন এসব প্রতিশ্রুতি দিলেন? কারণ, ঢাকাবাসী এই সমস্যাগুলোরই সমাধান চান এবং আশা করেন সিটি করপোরেশনের মাধ্যমেই ঢাকার এসব সমস্যার সমাধান হবে।
সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এ সাধারণভাবে সিটি করপোরেশনের ২৮টি কাজ চিহ্নিত আছে। অসংখ্য ধারা ও উপধারার মাধ্যমে এই কাজগুলোর বিস্তারিত দিকও লেখা রয়েছে। ‘বিস্তারিত কার্যাবলী’র (তৃতীয় তফসিল) মধ্যে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যে সুনির্দিষ্ট সাতটি কাজ নির্দিষ্ট করা আছে, যেমন জনস্বাস্থ্য, সংক্রামক ব্যাধি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন ইত্যাদি, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি, চিকিৎসা, সাহায্য এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ইত্যাদি। ঢাকা শহরে শুধু এসব কাজ ঠিকভাবে করতে হলেই উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের বর্তমান যে কাঠামো, তার চেয়েও একটি শক্তিশালী কাঠামো দরকার। বাকি কাজ তো দূরে থাক।
ইশতেহারে প্রার্থীরা যেসব উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে যানজট দূর করা, যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনা, শহরের পানি-বিদ্যুৎ সমস্যা দূর করা, জলাবদ্ধতা দূর করা, নগরীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, নগরকে দখল-দূষণমুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো। বাস্তবতা হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ভূমিকা রাখার কার্যত কোনো সুযোগ নেই। এসবের জন্য তাদের সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে। সবাই সেবা চায় সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে, অথচ ১২টি মন্ত্রণালয়ের অধীন ৫৬টি সংস্থা নগরবাসীকে নানা ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার ক্ষেত্রে সমন্বয় করার কাজটি সিটি করপোরেশনের বর্তমান কাঠামোতে সম্ভব নয়।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঢাকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো ধরনের সমন্বয় বৈঠক ডাকা হলে সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা যোগ দেন না। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডাকা এ ধরনের কোনো বৈঠককে দৃশ্যত মন্ত্রণালয়ের লোকজন পাত্তাই দিতে চান না। এ ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা-সংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠানের কাজ সমন্বয়ের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ডাকা এসব বৈঠকে তখন মন্ত্রণালয়ের লোকজনের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন ছিল। এখন সে ধরনের কোনো ব্যবস্থাও কার্যকর নেই। একক ঢাকা সিটি করপোরেশনই যেখানে সব সেবা সংস্থাকে এক করতে বা তাদের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশনের ডাকে তারা কতটুকু সাড়া দেবেন, কে জানে! সিটি করপোরেশনকে নগর সরকারে পরিণত করার দাবি অনেক পুরোনো। এক প্রার্থী নির্বাচিত হলে নগর সরকার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অনেকে বলেছেন সিটি করপোরেশনকে শক্তিশালী করবেন। কিন্তু কীভাবে? সরকারের চিন্তা–ভাবনায় তো তেমন কিছু নেই। সরকার না চাইলে মেয়র কীভাবে তা করবেন?
এই নির্বাচনের সঙ্গে তাই ঢাকার বাসযোগ্যতা, এর উন্নয়ন— এসবের সম্পর্ক খুবই কম। সিটি করপোরেশনের বর্তমান কাঠামোয় একজন মেয়র যদি সৎ, আন্তরিক, ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, ভিশনারি ও আধুনিকমনস্কও হন, তাহলে তিনি বড়জোর ঢাকার রাস্তাঘাটগুলো নিয়মিত মেরামত, সংস্কার, পার্ক-ফুটপাতগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কিছু গাছ লাগানো (এ কাজগুলোও পর্যপ্ত বাজেট ও তহবিলের ওপর নির্ভরশীল), যথাসময়ে নগরের ময়লা পরিষ্কার, বাজারগুলোর শৃঙ্খলা রক্ষা, জন্মনিবন্ধন বা এ ধরনের সনদ ও ট্রেড বা নানা ধরনের লাইসেন্স দেওয়ার কাজ সহজ করা, পৌরকরের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনা বা সিটি করপোরেশনের প্রশাসনে দুর্নীতি কমানো—এ ধরনের কিছু কাজ করতে পারবেন। এসবকে বড় পাওয়া মনে করে যারা সন্তুষ্ট থাকতে চান, এমন ভোটাররা হয়তো ভোট দেওয়ার সময় প্রার্থীর যোগ্যতাকেই সবচেয়ে বিবেচনায় নেবেন।
তবে অতীত বলছে, এ ধরনের নির্বাচনে প্রার্থী বা ইশতেহারে আস্থার চেয়ে রাজনৈতিক আস্থাই ভোটারদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীরা যখন বলছেন, এই নির্বাচন মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ আর বিএনপি যখন এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটানোর চেষ্টা করছে, তখন অতীতের মতো সম্ভবত রাজনীতিই চূড়ান্ত হয়ে উঠবে এই নির্বাচনে। এই দুই দলের বাইরে যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের জন্য যদি কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়, সেটাও হবে রাজনৈতিক কারণে, দুই দলের রাজনীতিতে বিরক্ত ঢাকাবাসী যদি নতুন কিছুর খোঁজ করে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর by আতাউর রহমান

গল্প আছে: জনৈক ব্যক্তি নিজের মোটরগাড়ি চালনাকালে পথ হারিয়ে পথিপার্শ্বে দণ্ডায়মান একজন বৃদ্ধকে পেয়ে গাড়ি থামিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ গলিয়ে ‘আমি কোথায় আছি? (অর্থাৎ জায়গাটার নাম কী)’ জিজ্ঞেস করতেই বৃদ্ধ তাঁর ফোকলা দাঁত বের করে আকর্ণবিস্তৃত হাসি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমাকে প্রতারিত করতে পারবেন না। আপনি একটি গাড়ির ভেতরে আছেন।’ পরে এ নিয়ে কথা উঠলে অপর এক রসিক ব্যক্তি নাকি বলেছিলেন ‘বৃদ্ধের উত্তরটা ঠিক পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তরের মতো হয়েছে—উত্তর সংক্ষিপ্ত হয়েছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি; আর প্রশ্নকর্তা প্রশ্নোত্তরের পূর্বে যে অবস্থানে ছিলেন পরেও সেই একই অবস্থানে অবস্থান করেছেন।’
গল্পটার অন্তর্নিহিত হিউমার যা-ই হোক, আসল কথা হচ্ছে এই যে পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর সংসদীয় গণতন্ত্রের একটা প্রত্যাশিত ও প্রয়োজনীয় অংশ। কেননা, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবরাখবরও যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আমজনতা তথা ম্যাংগো-পাবলিকের কাছে সরকারের জবাবদিহিরও পরিচয় মেলে। তো মনে পড়ে, স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী যখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেবিনেট মন্ত্রী তখন আমি ছিলাম ডাক অধিদপ্তরে সহকারী উপমহাপরিচালক (জনসংযোগ) এবং সেই সুবাদে সংসদ চলাকালে ডাক বিভাগ-সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের সুরাহার দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘কাউন্সিল অফিসার’। আমি তারকাচিহ্নিত প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য সম্পূরক প্রশ্নাবলির উত্তরসহ ডাক-সংক্রান্ত সব প্রশ্নের উত্তর তড়িঘড়ি তৈরি করে সময়ের স্বল্পতার কারণে খসড়া হাতে হাতে ডাক বিভাগের ডিজি ও মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের দ্বারা অনুমোদন করিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জেনারেল ওসমানীর কাছে নিয়ে যেতাম এবং তিনি সেটা দেখে দিলে পর চূড়ান্ত করে কপি তাঁর কাছে দিয়ে আসতাম; তিনি সেটা সংসদে যথাসময়ে পাঠ করে শোনাতেন।
তা একবার হয়েছে কী, একটি মনি অর্ডারের বিলি-বণ্টনসংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের বেলায় আমরা ইচ্ছেপূর্বক কিছু প্রচ্ছন্ন হাসির খোরাক রেখে দিয়েছিলাম বিধায় জেনারেল ওসমানী যখন সংসদে ওটা পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত সবাই হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন। আমি স্বয়ং গ্যালারিতে বসে তা প্রত্যক্ষ করেছি; তখন অবধি টিভি পার্লামেন্টে পৌঁছায়নি। সত্যি বলতে কি, সে সময় পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রায়ই খুব প্রাণবন্ত হতো এবং সরকারও সেটাকে খুব গুরুত্ব দিত। আর শুধু প্রশ্নোত্তর পর্বের কথাই বা বলি কেন, অতীতে সংসদের কার্যপ্রবাহে যথেষ্ট প্রাণ ও হাস্যরসের ব্যাপারও আমরা লক্ষ করেছি। এই যেমন সংসদে একবার জাতীয় পার্টির জনৈক সাংসদ একটি বক্তব্য দিয়ে প্রচুর হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিলেন। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলে মূলত সার নিয়ে কেলেঙ্কারির কারণেই নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় মাননীয় সাংসদ সংসদে দাঁড়িয়ে কাব্য করে বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিএনপি গেছে সারে আর আওয়ামী লীগ যাবে (ইলেকট্রিসিটির) তারে; কেবল জাতীয় পার্টিই পারে।’ সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন সদস্য দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মাননীয় সদস্য বলেছেন, জাতীয় পার্টি পারে। কিন্তু কী পারে সেটা তো বললেন না।’ সবাই তখন হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন। তা জাতীয় পার্টি কী পারে, সেটা তখন বোধগম্য না হলেও এখন আমরা বিলক্ষণ বুঝতে পারি—জাতীয় পার্টি যুগপৎ সরকারে ও বিরোধী দলে থাকতে পারে, যার নজির বোধকরি দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর আগের মতো অতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। কেননা, প্রায়ই দেখা যায়, সংসদে প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতার মধ্যে কেউ কেউ অনুপস্থিত; যার ফলে একজনের পরিবর্তে আরেকজন ‘প্রক্সি’ দিয়ে থাকেন। আর কাঁহাতক হাস্যরসের সওয়াল, বিশ্বনন্দিত চেক কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা যথার্থই বলেন, সংসারে সবকিছুরই এমনকি মৃত্যুরও একটা রসিকতার দিক আছে; অতএব সংসদের অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ হঠাৎ যে হাসির ফোয়ারা ছুটবে, সেটাই তো স্বাভাবিক এবং সেই পাকিস্তান আমল থেকেই এটা চলে আসছে। সংসদ শুরু হলে পর পত্রিকার পাতায় ‘গ্যালারি থেকে ক্ষণিক দৃষ্টি’ শীর্ষক কলাম নিয়মিত বের হতো। কিন্তু ইদানীং আর তেমনটা দেখা যায় না, আর সংসদে বিরোধী দল ‘গৃহপালিত’ হলে তেমনটা ঘটার কথাও না।
তবে হ্যাঁ, সদ্যসমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে জনৈক সরকারদলীয় সাংসদের কিছু বক্তব্য আমাদের যথেষ্ট হাসির খোরাক জুগিয়েছে বটে। বিদ্রোহী কবি নজরুলের ‘নারী’ শীর্ষক কবিতার দুটো লাইন ‘বিশ্বে যা–কিছু মহান সৃষ্টি চির–কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে ওটা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা।
সে যা হোক। মাননীয় সাংসদ সেদিন সংসদে নাকি আরও বলেছেন, দেশে বিদ্যমান পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের পাশাপাশি নারী কর্তৃক পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন পাস করা উচিত। তো পত্রিকার পাতায় এটা পাঠ করে তাৎক্ষণিক আমার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই বিদেশি মুখরোচক গল্পটি:
রোববারে গির্জায় প্রার্থনার শুরুতে পাদরি সাহেব সমবেত পুরুষ প্রার্থনাকারীদের উদ্দেশ করে বললেন, ‘আজকাল প্রায়ই স্ত্রীদের দ্বারা স্বামীরা অত্যাচারিত হওয়ার ঘটনা শোনা যাচ্ছে। তা যাঁরা এরূপ ঘটনার শিকার তাঁরা অনুগ্রহপূর্বক উঠে দাঁড়াবেন কি?’ সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ালেন। কেবল একজন প্রার্থনাকারী চেয়ারে ঠায় বসে রইলেন দেখে পাদরি সাহেব তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি অনেক ভাগ্যবান। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।’ লোকটি তখন অনেক কষ্টে কোমরটা চেয়ার থেকে তুলে বলল, ‘ধন্যবাদ, ফাদার। তবে আসল ব্যাপার তা নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে, ‘আমি একজন প্যারালাইসিসের রোগী; নইলে আমি সবার আগেই উঠে দাঁড়াতাম।’
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

চট্টগ্রাম সিটি, জয়-পরাজয় ঠিক হবে নেতিবাচক ভোটে! by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনজুর আলম ও আ জ ম নাছিরের মূল আকর্ষণী ক্ষমতা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার চেষ্টা করেছি। সদ্য সাবেক মেয়র মনজুর আলম সৎ, বিনয়ী ও সজ্জন ব্যক্তি—এ বিষয়ে দ্বিমত নেই কারোরই। তাঁর সম্পর্কে দুর্নীতির বড় ধরনের অভিযোগ যেমন কখনো ওঠেনি, তেমনি সিটি করপোরেশনকে দলীয় কর্মীদের প্রভাবমুক্ত রাখতে পারার সাফল্যও দেখিয়েছেন তিনি। কোনো ধরনের বিরোধ ও শত্রুতার পরিবেশ তৈরি না করেই তাঁর পূর্বসূরির উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন মনজুর আলম। নানা জনহিতকর কর্মকাণ্ডের সুবাদে এলাকায় তাঁর ও তাঁর পরিবারের সুনাম ছিল। ফলে দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। মূলত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত থাকলেও গত নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি তাঁকে সমর্থন জানালে নতুন ধরনের মেরুকরণ হয় এবং হেভিওয়েট প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেন তিনি।
অন্য দিকে নাছির তুলনামূলক নবীন ও প্রাণচঞ্চল। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে এসেছেন তিনি। ১৯৮০ ও ১৯৮২ সালে দুই দফায় নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। পরে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও সাংগঠনিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ পাননি। কিন্তু দলের ছাত্র ও যুবকদের একটি বড় অংশের মধ্যে তাঁর প্রতি আস্থা ও সমর্থন ছিল ঈর্ষণীয়।
ফলে দীর্ঘ বঞ্চনার পর ২০১৩ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ লাভ তাঁর অনিবার্য প্রাপ্তিই বলা যেতে পারে। রাজনীতির অঙ্গন ছাড়া ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও আ জ ম নাছিরের পরিচিতি আছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সহসভাপতি, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইত্যাদি পদে অধিষ্ঠিত থাকার ফলে তাঁর একটি তারুণ্যদীপ্ত ভাবমূর্তি আছে।
এই সদর্থক দিকগুলো আলোচনার পর স্বাভাবিকভাবে এই দুই প্রার্থীর সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার প্রসঙ্গটি আসবেই। তবে সেই ধান ভানার কাজে যাওয়ার আগে একটু শিবের গীত হয়ে যাক।
মহিউদ্দিন চৌধুরী তৃতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এমন কিছু পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী ও নগর উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের সংগঠন ‘ফোরাম ফর প্ল্যান্ড চিটাগং (এফপিসি)’ বিভিন্ন সময়ে এসব উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন এবং বিকল্প পরামর্শও দিয়েছেন। কিন্তু এসব পরামর্শে কর্ণপাত না করেই তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।
এমনকি আজীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেও হিন্দু সম্প্রদায়ের গো-শালা হিসেবে পরিচিত একটি জমি সিটি করপোরেশনের দখলে নিয়ে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে এই সম্প্রদায়ের একাংশেরও বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তাই চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে এই জনপ্রিয় ব্যক্তিটি যখন হারলেন তাঁরই এক কালের শিষ্য ও তাঁর তুলনায় অনেক নিষ্প্রভ মনজুর আলমের কাছে, তখন বিস্মিত হননি এ নগরের মানুষ। এ ফলাফলকে দম্ভের কাছে বিনয়ের হার বলে মনে করেছিলেন নাগরিকেরা। পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, আশাবাদী মানুষেরা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত হতাশই হয়েছেন।
অন্যান্য অবকাঠামোগত সাফল্যের কথা বাদ দিলেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমলে সেবা ও চিকিৎসা খাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাফল্য ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। করপোরেশনভুক্ত স্কুল-মাদ্রাসা-মক্তবের মান বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক কলেজ স্থাপন করে, সর্বোপরি এর সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করে নিজেকে নূর আহমদ চেয়ারম্যানের সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মহিউদ্দিন। করপোরেশন পরিচালিত হাসপাতাল ও মাতৃসদনগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর কাছে হয়ে উঠেছিল ঈর্ষণীয়।
চট্টগ্রামে প্রথম ও সর্ববৃহৎ সিএনজি স্টেশন স্থাপন, লাশ পরিবহনের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ির ব্যবস্থা, গণশৌচাগার নির্মাণ ছিল তাঁর সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমূলক কাজের নমুনা। অবৈধ স্থাপনা ভেঙে মহিউদ্দিন রাস্তাঘাট নির্মাণের সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেই আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, ও. আর. নিজাম রোড, পাহাড়তলীসহ অনেক প্রশস্ত সড়ক জন ও যান চলাচলের উপযোগী হয়েছে।
এসব দিক বিবেচনা করলে সদ্য সাবেক মেয়র মনজুর আলমের মেয়াদকালে সিটি করপোরেশনের সেবার মান যে কমেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হাসপাতাল ও মাতৃসদনগুলোর অবস্থা করুণ। এমনকি আবর্জনা অপসারণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যে নগরটি সারা দেশের রোল মডেলে পরিণত হয়েছিল, সেটি এখন প্রায় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে বলা চলে।
এসব ব্যর্থতার জন্য বিরোধীদলীয় মেয়রের প্রতি সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ ও উন্নয়নকাজে অর্থ বরাদ্দের অপ্রতুলতার কথা তুলতে পারেন অনেকেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও স্মরণে রাখতে হবে যে তিনটি নির্বাচনে মহিউদ্দিন মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তার মধ্যে দুটিই অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন সময়ে, যখন তাঁর দল আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দলে। অর্থাৎ সরকারের প্রথামাফিক বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হয়েছিলেন তিনিও। তাতে উন্নয়ন তৎপরতা রুদ্ধ করা যায়নি।
বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম সৎ, বিনয়ী ও সজ্জন ব্যক্তি এ কথা শুরুতেই বলেছি। কিন্তু যেখানে তাঁর ঔদার্য ও সাফল্য, সম্ভবত সেখানেই তাঁর ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা। দাপুটে মহিউদ্দিন যে কঠোর শৃঙ্খলায় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচালনা করেছেন, সেই কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেননি বলেই প্রশাসন থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত কর্মীদের মধ্যে শৈথিল্য দেখা গেছে, যার ফলে সেবার মান হয়েছে নিম্নমুখী। সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে সিটি করপোরেশনকে অবজ্ঞা করে বা সেই প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রভার বিস্তার করে যারা শহরজুড়ে যত্রতত্র বিলবোর্ড স্থাপন করে প্রায় অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার মতো দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি তিনি। সম্প্রতি নতুন পুলিশ কমিশনার এসে নিজ উদ্যোগেই এসব বিলবোর্ড উচ্ছেদ করে তাঁর সেই ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যেন। মোট কথা, নগরপিতা হিসেবে এই নগরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন মনজুর।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছিরের সবচেয়ে বড় সাফল্য দলের তরুণদের আনুগত্য লাভ করা এবং নিজের তারুণ্যদীপ্ত কর্মচঞ্চল একটি ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারা। গত ১০ বছরে এই নগরে ভোটারসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭৬ হাজার। অর্থাৎ এই বিশাল অঙ্কের ভোটারদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৮-এর মধ্যে। সুতরাং তরুণদের সমর্থন লাভের ওপর নির্বাচনের জয়-পরাজয় অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু ঠিক এই জায়গাটিতেই নাছিরের দুর্বলতার ক্ষেত্রটিও নিহিত বলে আমাদের ধারণা।
ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক বেশ কিছু কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। অন্তর্দলীয় কোন্দলে, টেন্ডার দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে, সাংবাদিক নির্যাতনসহ নানা উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে সরকারি দলের ছাত্র-যুবক-তরুণ নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। মহিউদ্দিন ও মনজুর এ ধরনের কর্মী-সমর্থকদের নগর ভবনে ঘেঁষতে দেননি, সাবেক রাজনীতিক ও বর্তমান ঠিকাদারদের রাখতে পেরেছেন সহনীয় দূরত্বে। নাছিরের পক্ষে সেটা কতটা সম্ভব হবে, সে সংশয়টা ভোটারদের মনে আসতেই পারে।
দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এবার নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে রায় দেওয়ার চেয়ে অপছন্দের প্রার্থীর বিপক্ষে রায় দেওয়ার তাগিদই যেন বেশি ভোটারদের। পরিতাপের বিষয়, সম্ভবত নেগেটিভ (নেতিবাচক) ভোটই হতে যাচ্ছে এবার জয়-পরাজয়ের নিয়ামক।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

ক্ষত যত ক্ষতি যত by শাহাদুজ্জামান

এই কথা প্রকাশ থাকুক যে এবারের পয়লা বৈশাখে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে শুধু নারীরা নন, লাঞ্ছিত হয়েছে এই দেশ, লাঞ্ছিত হয়েছে পুরুষ প্রজাতি। মনে পড়ছে, ২০০০ সালে নতুন শতাব্দী উদ্যাপনের সেই রাতে এমন এক ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলাম, লিখেছিলেন আরও অনেকে, বন্ধুবর চিত্রকর ঢালী আল মামুন এঁকেছিল মর্মস্পর্শী এক পেইন্টিং। কিন্তু শিল্পীর তুলি, লেখকের কলম আর কতটুকু ঠেকাতে পারে পতন? এবার সে ঘটনা ঘটেছে আরও বহুগুণ মাত্রায়। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না বহিরাগত, তারা কি একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্য? এসব তর্ক চলছে। তবে একটা বিষয় তর্কাতীত যে যারা ব্যাপারটা ঘটিয়েছে তারা সবাই পুরুষ। এক বিশেষ ধরনের পুরুষ। বিষয় নেহাত শ্লীলতা, অশ্লীলতার নয়, বিষয় আরও গভীর।
সমাজবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন কম্পিটেন্সি’ বলে। এই ধারণায় ঠিক যৌন আচরণ অর্থে নয়, বৃহত্তর অর্থে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সুস্থ আচরণের ক্ষমতাকে বোঝানো হয়। বলা হয়, যেভাবে অক্ষরজ্ঞান শিখতে হয়, কম্পিউটার শিখতে হয় সেভাবে, কোনো বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে মোকাবিলারও একটা শিক্ষা আছে। সে শিক্ষা পরোক্ষভাবে পরিবার থেকে আসে, পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া রুচিবোধ, নীতিবোধ থেকে আসে, আসে ধর্মবোধ থেকেও। অনেক ক্ষেত্রে এই বিষয়ের ওপর প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও তা অর্জন করার ব্যবস্থা করা হয়। যেসব পুরুষের কোনো সূত্র থেকেই সেই শিক্ষাটা আসে না, তারা পরিণত হয় প্রবৃত্তিসর্বস্ব, লিঙ্গসর্বস্ব এক একটা বেকুব জন্তুতে। পয়লা বৈশাখে টিএসসির মোড়ে জড়ো হয়েছিল তেমন কিছু বেকুব জন্তু। নানা ভিড়ভাট্টায় এই সব জন্তু যে চোরাগোপ্তা থাকে, তা সুবিদিত। জন্তুরা সচরাচর ভীত থাকে, আড়ালে থাকে কিন্তু এবারের পয়লা বৈশাখের ঘটনায় যা অভিনব তা হচ্ছে সেই সব বীভৎস জীব তাদের গুহা থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে বাদ্য বাজিয়ে, বিপুল জনসমাগমে তাদের পশুত্বের প্রদর্শনী করেছে।
এ ঘটনা আমাদের আরও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়। এই যে এরা প্রায় ঘণ্টাজুড়ে জনসমক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে যেতে পারল, সেই পারার সাহস এবং আস্থার উৎসটা কোথায়? সাহসের উৎস কি এই বিশ্বাস যে জনসমক্ষে যত বর্বরতাই ঘটুক সাধারণ মানুষ তাতে বাধা দিতে আসবে না? তার প্রমাণ তো আছে কিছুকাল আগে ঘটে যাওয়া অভিজিৎ হত্যার সময়েই। সাধারণ মানুষ শুধু নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও থাকবে নিষ্ক্রিয়, এই আস্থাও কি ছিল তাদের? যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা যদি এলাকায় বহিরাগত হয়ে থাকে তাহলে এসব বিশ্বাস, আস্থা তাদের এমন ঘৃণ্য কাজ করার সাহস জোগানোর কথা।
আর তারা যদি ক্যাম্পাসের ভেতরেরই হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে সেই সাহসের জোরটা তো হওয়ার কথা আরও বেশি। কিংবা ব্যাপারটা কি এমন যে কোনো এক গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই পাশবিকতা ঘটিয়েছে পয়লা বৈশাখের প্রেরণাকে ধ্বংস করার জন্য? সেটা অসম্ভব নয়, কারণ বৈশাখী মেলায় বোমা ফাটিয়ে মানুষ হত্যার মতো বীভৎস নৃশংসতার মাধ্যমে এমন চেষ্টা অতীতে হয়েছে। আমরা এও লক্ষ করছি যে দেশের ভেতর একটা সাংস্কৃতিক মেরুকরণ চলছে কিছুকাল। মেয়েরা তাদের পোশাক, আচরণ ইত্যাদি দিয়ে পুরুষদের বর্বর আচরণে প্ররোচিত করে—এমন কুযুক্তি দেওয়ার মানুষও এ দেশে কম নেই। ফলে নারীর ওপর এই আক্রমণ একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা পৌঁছানোর উদ্যোগও হতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। লিঙ্গ রাজনীতি কী করে আরও বৃহত্তর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।
মনস্তাত্ত্বিকেরা এও দেখিয়েছেন সংঘবদ্ধভাবে নারীর ওপর পুরুষের এই ধরনের আক্রমণের পেছনে যৌন তৃপ্তি নয়, বরং আছে শক্তি প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা। একজনকে দুর্বল অবস্থানে কোণঠাসা করে এ ধরনের শক্তি প্রদর্শনের ভেতর আছে সীমাহীন দেউলিয়াপনা, কাঙালপনা, হীনম্মন্যতা। ভাবনার ব্যাপার এই যে আমাদের এই সমাজ, পরিবার এমন হীন দেউলিয়া, জঘন্য পুরুষদের বেড়ে উঠতে সুযোগ দিয়েছে আর সেই সঙ্গে বেদনার এই যে, আমাদের রাষ্ট্র এই জন্তু পুরুষদের হাত থেকে নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
কিন্তু পয়লা বৈশাখের এই বর্বরতা এই অনুষ্ঠানের প্রেরণাকে বন্ধ করবে, নারীদের শঙ্কাহীন চলাচলকে রুদ্ধ করবে—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বৈশাখী মেলায় বোমা বিস্ফোরণও মানুষের ঢলকে কিছুমাত্র কমায়নি। লিঙ্গান্ধ জান্তব পুরুষদের হাত থেকে বিপন্ন নারীকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে মানবিক পুরুষই। লেখিকা পুরবী বসু তাঁর এক লেখায় প্রত্যাশা করেছেন যে তরুণ তাঁর পাঞ্জাবিতে ঢেকে দিয়েছেন নারীর অপমান, সেই পাঞ্জাবি হয়ে উঠুক অন্তহীন। সেই সঙ্গে আমি বরং সেই সমাজ প্রত্যাশা করব, যেখানে কোনো পুরুষ রক্ষাকর্তার পাঞ্জাবির মুখাপেক্ষী না হয়ে নারী নিজেই তার আত্মমর্যাদা রক্ষা করার অধিকারী হবে। পয়লা বৈশাখের ঐতিহ্য আমাদের সবার। সবাই মিলে এর মোকাবিলা করতে হবে আমাদের।
সেই কত কাল আগে বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন, ‘পুরুষেরা, যাহারা নানা প্রকার দুষ্টামি করে বা করিতে সক্ষম, তাহারা দিব্য স্বাধীনতা ভোগ করে, আর নিরীহ কোমলাঙ্গী অবলারা বন্দী থাকে। অশিক্ষিত, অমার্জিত রুচি পুরুষেরা বিনা শৃঙ্খলে থাকিবার উপযুক্ত নহে। আপনারা কিরূপে তাহাদিগকে মুক্তি দিয়া নিশ্চিন্ত থাকেন?’
এই অশিক্ষিত, অমার্জিত রুচি পুরুষদের অতিসত্বর বন্দী করবার গণদাবির প্রতি জানাই নিরঙ্কুশ সমর্থন।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

খালেদার গাড়িবহরে আক্রমণ, হামলাকারীরা চিহ্নিত তবুও ব্যবস্থা নেই

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে তিন দিনে তিন দফা হামলা হয়েছে। গাড়িবহরে যারা হামলা চালিয়েছে তাদের বেশির ভাগেরই ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পাওয়া গেছে তাদের নাম-পরিচয়ও। পুলিশ ভিডিও ফুটেজ ও স্টিল ছবি সংগ্রহ করেছে। প্রথম দিনে হামলার তিন দিন পেরিয়ে গেছে। তবু পুলিশ তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এমনকি সোমবারের প্রথম দফা হামলার পর পরের দুই দিন মঙ্গল ও বুধবারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাদেরও নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। তাদের গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, হামলাকারীরাই উল্টো মামলা করে বুক ফুলিয়ে ঘুরছে নিজ নিজ এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, হামলায় সরকারি দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেয়ায় পুলিশ তাদের চিনেও না চেনার ভান করছে। উল্টো হয়রানি করতে হামলাকারীদের দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতার ওপর দিন-দুপুরে এমন ন্যক্কারজনক হামলার পরও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেয়ায় আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সোমবার বিকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে প্রচারণায় মাঠে নামেন বেগম খালেদা জিয়া। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে খালেদার গাড়িবহর কাওরানবাজারের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছিল। এ সময় তেজগাঁও-কাওরানবাজার এলাকার স্থানীয় ছাত্রলীগকর্মী ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রথমে কালো পতাকা প্রদর্শন করেন। একপর্যায়ে তারা মিছিল করতে করতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সামনে গিয়ে ভাঙচুর শুরু করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া বিভিন্ন ফুটেজ ঘেঁটে দেখা যায়, কারওয়ানবাজারের হামলায় অংশ নেয়াদের মধ্যে ছিলেন- ঢাকা উত্তর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান, উত্তরের ছাত্রলীগ নেতা মাহমুদ তুহিন, কাওরানবাজারের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রোমান, একই ওয়ার্ডের সহসভাপতি মোহাম্মদ জাকির, একই ওয়ার্ডের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও ১ নং ইউনিটের সহসভাপতি আল-আমিন, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রলীগের সভাপতি জাকির হোসাইন সাগর ও ছাত্রলীগকর্মী মোহন। হামলায় অংশ নেয়া অন্যদের মধ্যে তেজতুরী বাজার ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আলী হোসেন সিজান ও বাউলবাগ ইউনিটের ছাত্রলীগ সভাপতি রনি খন্দকারও ছিলেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের অলি, দোলনসহ ৩০-৩৫ জন নেতাকর্মী এই হামলায় অংশ নেন বলে জানা গেছে। এছাড়া ২৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম জিল্লুও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। যদিও তিনি নিজেই উল্টো বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তারক্ষী (সিএসএফ) ও অজ্ঞাতনামা ছাত্রদল, যুবদল নেতাকর্মীদের নামে মামলা করেছেন। অপরদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে চেয়ারপারসনের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। দুটি মামলারই তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনসুর হোসেন মানিক। তিনি বলেন, এ ঘটনায় কারা আগে হামলা চালিয়েছিল এবং হামলায় কারা অংশ নিয়েছিল তা এখনও শনাক্ত করা যায়নি। তবে হামলাকারীদের শনাক্তের জন্য একটি ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন পত্রিকার এ সংক্রান্ত কাটিং সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া আরও ভিডিও ফুটেজের জন্য গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনাটি স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে রাজনৈতিক বিষয় রয়েছে। মামলার তদন্তের বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তদারক করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, অন্য কোন ঘটনা হলে তিন দিন নয়, ঘটনার রাতেই হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হয়ে যেতো। হামলাকারীদের সবার ছবিই বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। কারা হামলা ঘটিয়েছে তা দিনের আলোর মতে পরিষ্কার। জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি ঠিকই তবে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে আমরা হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। ডিসি বলেন, এ ঘটনায় দুই পক্ষ থেকে দুটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হামলার আগে কেউ তাদের উসকানি দিয়েছিল কি না তাও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। কাওরানবাজারের স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, হামলার ঘটনায় যাদের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তারা সবাই নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করছে।
সংশ্লিস্ট সূত্র জানায়, বাংলামোটরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বিষয়ক সম্পাদক আশিকুল পাঠানকে হামলায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। এছাড়া যেই যুবকের কোমরের পেছনের দিকে পিস্তল গুঁজে রাখা অবস্থায় দেখা গেছে, এসময় তার পাশে একজন পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন। আশিকুল ছাত্রলীগের কর্মী বলে জানা গেছে। তবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্য একটি ছবিতে তাকে আওয়ামীপন্থি এক কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা গেছে।
বাংলামোটরে হামলার ঘটনায়ও পাল্টাপাল্টি মামলা: এদিকে গত বুধবার বাংলামোটরে খালেদার গাড়িবহরে তৃতীয় দফা হামলার ঘটনায় রমনা থানায়ও পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। এ ঘটনাতেও হামলার পর হামলাকারীরাই আগে গিয়ে থানায় মামলা করেন। মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় শাহবাগ থানা ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক বাবু হাসান বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি মামলা (নং ২৮) দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় ৩০-৪০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বাবু হাসান দাবি করেন, বুধবার বিকাল ৫টায় ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকনের নির্বাচনী লিফলেট বিলির সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়ি তার কর্মীদের হত্যার উদ্দেশ্যে চাপা দেয়। এতে বাবু নিজেসহ লিটন ও জাকির দেওয়ান মাটিতে পড়ে গিয়ে আহত হন। এর প্রতিবাদ করলে গাড়িতে থাকা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের হুকুমে সিএসএফ সদস্যসহ অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জন বিএনপির নেতাকর্মী শটগান ও লাঠিসোটা দিয়ে তাদের আঘাত করে। এতে লিটন ও জাকির মারাত্মক জখম হন। এছাড়া সাঈদ খোকনের লিফলেট কেড়ে নিয়ে কর্মীদের হত্যার হুমকি দেয়া হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপরদিকে গতকাল সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে সাবেক আইজিপি ও সচিব এবং বিএনপির উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আব্দুল কাইয়ুম বাদী হয়ে একটি মামলা (নং ২৯) দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৪০-৫০ জন আওয়ামী সন্ত্রাসীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বুধবার বিকাল ৫টার পর ভোটের প্রচারে থাকা খালেদা জিয়ার গাড়িবহর বাংলামোটর এলাকা পার হওয়ার সময় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাঁশ, গজারির লাঠি, লোহার রড ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। তারা হিংস্রভাবে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের গাড়ি ভাঙচুর করতে থাকে। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বেপরোয়াভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-২৬১২ নম্বর গাড়ির চতুর্দিক থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ শুরু করে। এতে তার গাড়ির বাম দিকের গ্লাস ভেঙে যায়। রড ও লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে গাড়ির একটি অংশ খুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীদের আঘাতে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাকর্মী আতিক গুরুতর আহত হন এবং তার কোমর ভেঙে যায়। অপর নিরাপত্তাকর্মী মেজর (অব.) মঈনুল হোসেনের হাত-মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসীরা গুরুতর জখম করে। মেজর (অব.) আবদুল ওয়াহেদ, মেজর (অব.) আনোয়ারের হাত-মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে, লেফট্যানেন্ট (অব.) সামিউল হককে সন্ত্রাসীরা হত্যার উদ্দেশ্যে তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করে। এতে তার মাথা জখম হয়, ডান হাত ভেঙে দেয় সন্ত্রাসীরা, পিঠে লাঠি দ্বারা প্রচণ্ড আঘাত করে। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যালে নেয়া হলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তার ১৩টি সেলাই দেয়া হয়। গাড়িচালক মান্নাফ জখম হওয়াসহ আবদুল কাইয়ুম নিজেও গালে ও হাতে জখমপ্রাপ্ত হন বলে উল্লেখ করেন। মামলার অভিযোগে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সময় তাৎক্ষণিক কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ইতিপূর্বে খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরপর তিনবার সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এজাহারে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের আক্রমণে সাধারণ জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকরাও আহত হয়। সকল সন্ত্রাসীই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগসহ আওয়ামীপন্থি সন্ত্রাসী বলে জানা গেছে। সন্ত্রাসীদের আক্রমণের সময় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া তাদের ক্যামেরায় ছবি তুলেছে। ছবি দেখলেই সন্ত্রাসীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে বলা হয়েছে। দুটি মামলারই তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জুয়েল মিয়া বলেন, দুটি মামলার তদন্ত চলছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজ ও স্টিল ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে।

রানা প্লাজা ধসের দুই বছর- হতাহতদের পরিবারে চাকরির প্রত্যাশা by শাহাবুল শাহীন

রানা প্লাজা ধসে ডান পা হারানো গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর
উপজেলার সোনিয়া বেগম l ছবি: প্রথম আলো
গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার দক্ষিণ দামোদরপুর গ্রামের সোনিয়া বেগম (২০)। স্বামী মিজানুর রহমানসহ কাজ নিয়েছিলেন সাভারের রানা প্লাজার ইউএন স্টাইল নামের একটি পোশাক তৈরির কারখানায়। চাকরি নেওয়ার ২২ দিনের মাথায় ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভবনধসের ঘটনা ঘটে। মিজানুর অন্য কাজে বাইরে থাকায় বেঁচে যান। চাপা পড়েন সোনিয়া। তিন দিন পর উদ্ধার পেলেও তাঁর ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছে কোমরের নিচ পর্যন্ত।
সোনিয়া বলেন, ‘সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পা কাটা ও চিকিৎসা শেষে স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসি। এরপর সরকার ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ওই টাকা থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে পাচ্ছি। ১০ হাজার টাকায় এখনো চিকিৎসা ও সংসার চালাতে হচ্ছে।’
মিজানুর বলেন, ‘বর্তমানে বাড়িতে নিজ ঘরের পাশে ছোট আকারের একটি মনিহারি দোকান দিয়েছি। ওই টাকা আর দোকান দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘সরকার চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও অদ্যাবধি চাকরি পাইনি।’
গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় জানায়, রানা প্লাজা ধসে গাইবান্ধার ৪৯ জন নিহত হন। নিখোঁজ হন ১১ জন ও আহত হন শতাধিক কর্মী। ঘটনার পর কেবল প্রধানমন্ত্রীর অনুদান হিসেবে নিহত পরিবারপ্রতি ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিন দফায় প্রতি পরিবারকে ৪৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার নিহত দুটি ও নিখোঁজ দুটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্দশা ও আক্ষেপের কথা জানা গেছে। সাদুল্যাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামের নিহত স্মৃতি রানীর (২৫) মা সন্ধ্যা রানী বলেন, ‘আমাদের সহায়সম্পদ বলতে কিছুই নেই। মানুষের বসতভিটায় কোনোমতে মাথা গুঁজে আছি। তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। স্মৃতি রানীর চাকরির টাকা দিয়ে সংসার চলত। ওর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১ লাখ ও পরে ৪৫ হাজার টাকা পাই। তা দিয়ে মেয়ের শেষকৃত্য করি ও ৩০ শতক জমি বন্ধক নিই। এরপর দুই বছর হলো। কিন্তু আর কোনো অনুদান পাইনি। বড় মেয়ে মাধবী রানীকে নিয়ে আমি অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছি।’
স্মৃতি রানীর বড় বোন মাধবী রানী দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের টাকার চেক দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, নিহত পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেল, চাকরি তো দূরের কথা, কেউ খোঁজও নেয়নি।
একই ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাঙ্গামোড় গ্রামের দিনমজুর ওয়াহেদ আলীর ছেলে সবুজ মিয়া (১৮) ভবনধসের ঘটনায় নিহত হন। ঘটনার ১৬ দিন পর মুঠোফোনের সূত্র ধরে ছেলের হাড়গোড় ফিরে পান বাবা-মা। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে মজনু মিয়া গ্রামেই রিকশাভ্যান চালান। তাঁর পৃথক সংসার। দিনমজুরের আয় দিয়ে সংসার চলত না। সবুজ মিয়া প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা দিত। গতকাল তাঁদের বাড়িতে গেলে মা মনজিলা বেগম বলেন, ‘ছোল মরি যাওয়ার পর সোগসুদ্দাই ১ লাখ ৪৫ হাজার ট্যাকা পাচি। এ্যাই ট্যাকা দিয়ে এ্যাক বিঘ্যা জমি বন্ধক নিচি।’ বাবা দিনমজুর ওয়াহেদ আলী বলেন, সরকার নিহত প্রত্যেকের পরিবারে একজন করে চাকরি দেওয়ার কথা বললেও এখন আর কোনো খবর নেই।
রানা প্লাজার ভবনধসে একই গ্রামের আবদুল বারীর মেয়ে বীথি খাতুন (২১) ও সোনা মিয়ার স্ত্রী কামনা খাতুন (২২) নিখোঁজ হন। এখনো তাঁদের সন্ধান মেলেনি। আবদুল বারী ও সোনা মিয়া বলেন, টাকা পাওয়া তো দূরের কথা, সরকার তাঁদের খোঁজ দিতে পারেনি। এ সময় কামনা খাতুনের ছয় বছরের ছেলে কামরুল মিয়া নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিল। সে এখনো তাঁর মাকে খুঁজছে।
আট শিশুর পুনর্বাসন: রানা প্লাজার ভবনধসে বাবা-মা নিহত ও নিখোঁজ হয়েছে—এমন আটটি শিশু গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের অরকা-হোমস্ (ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন) নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বসবাস করছে। বিজিএমইএর সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
শিশুরা হচ্ছে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুপতলা গ্রামের আরিফ হোসেন ও ধানঘড়া এলাকার আলিফ হাসান, পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের শিহাব মিয়া, জামালপুর সদর উপজেলার সৌরভ হাসান, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মাওজি গ্রামের স্বপন ইসলাম, রংপুরের পীরগাছা উপজেলার নামাদোলা গ্রামের আল আমিন, কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার মেহেদি হাসান মারুফ ও নাজমুস সাকিব।