Tuesday, July 12, 2016

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে হামলার হুমকি

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ‘বাস্তব ব্যবস্থা’ গ্রহণের হুমকি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। ওয়াশিংটন ও সিউল একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা মোতায়েন করা নিয়ে শুক্রবার মতৈক্যের ঘোষণা দেওয়ার পর কট্টর কমিউনিস্ট রাষ্ট্রটি এ হুমকি দিল। গত দেড় বছরে উত্তর কোরিয়ার বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী-ব্যবস্থা ‘টার্মিনাল হাই অ্যালটিটুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড)’ মোতায়েনে মতৈক্যের ওই ঘোষণা দেয়। থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র দূর থেকেই ধ্বংস করা যাবে। কখন ও কোথায় এ ব্যবস্থা মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তবে স্থান বাছাইয়ের কাজটি এখন শেষ পর্যায়ে বলে জানানো হয়েছে। সামরিক বাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে উত্তর কোরিয়ায় সরকারি গণমাধ্যমে বলা হয়, ‘নির্মম প্রতিশোধ-মূলক হামলার ব্যাপারে আমাদের সেনারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ খবরে আরও বলা হয়,
দক্ষিণ কোরিয়ার ভেতর ওই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবস্থান ও স্থান সম্পর্কে যখনই জানা যাবে, ওই মুহূর্ত থেকে ওই ব্যবস্থার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  উত্তর কোরিয়া মাঝেমধ্যেই প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও এর মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ রকম হামলার হুমকি দিয়ে থাকে। এ দুই দেশের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়ে গেলে পিয়ংইয়ংয়ের এমন বাগাড়ম্বরপূর্ণ মন্তব্য করাটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এ পদক্ষেপকে ‘স্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে মন্তব্য করে পিয়ংইয়ং। থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণার এক দিন পরই শনিবার উত্তর কোরিয়া তার একটি ডুবোজাহাজ থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইতিমধ্যে চীন ও রাশিয়া এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ঘরপোড়ার মধ্যে আলুপোড়া নয়

গুলশানের পর শোলাকিয়া। ঈদের ছুটিতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা চালিয়েছে। গুলশানে নিহত হয়েছেন ১৭ জন বিদেশিসহ ২০ জন। পুলিশের দুজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পুলিশের ৩৫ জন সদস্য। শোলাকিয়ায় পুলিশের দুই সদস্যসহ নিহত হয়েছেন চারজন। অন্যরা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে। এর আগে বছরাধিককাল ধরে জঙ্গিগোষ্ঠীর চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন মুক্তমনা ব্লগার, প্রগতিশীল পুস্তক প্রকাশক, শিক্ষক, বাউল গবেষক, মাজারের খাদেম, পীর, পুরোহিত, যাজক, ভিক্ষু, আহমদিয়া মসজিদে নামাজরত মুসল্লি, মহররম অনুষ্ঠানের শিয়া সম্প্রদায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সমাজের দুর্বল অংশের মানুষ। এর প্রতিটি হত্যার প্রকৃতি একই ধরনের। এসব ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চেষ্ট ছিল এ কথা বলা যাবে না। তারা বেশ কিছু ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধীদের ধরতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের অপরাধ প্রমাণ করার ঝামেলায় না গিয়ে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ পথ বেছে নিয়েছে।
তবে পুলিশ এসব হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে হত্যাকারীদের সঙ্গে ভিকটিমদেরও অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। মুক্তমনা ব্লগার বা প্রকাশক হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রথম কাজ ছিল এসব ব্যক্তি ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখেছেন কি না, সেটা খোঁজ করা। এসব ভিকটিমের ল্যাপটপ ঘেঁটে খুঁজে দেখতে চেয়েছে এঁরা ধর্মদ্রোহী কি না। প্রকাশ্য বক্তৃতায় বলেছে যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন লেখা বা বক্তব্য সহ্য করা হবে না। পরে যখন এই হত্যাকাণ্ড বিস্তৃত হয়েছে সুদৃঢ় গ্রামাঞ্চলে যাজক, পুরোহিত, ভিক্ষু ও ইমাম হত্যায়; তখন অবশ্য এসব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তাদের কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। প্রতিকারের পদ্ধতি হিসেবে এলাকায় এলাকায় জনগণের হাতে বাঁশের লাঠি ও বাঁশি তুলে দিয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা অনেকটা রাজনীতিকদের মতো বক্তৃতা দিয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কোনো কোনো সময়ে বলা হয়েছে যে এসব ঘটনা ‘পূর্বপরিকল্পিত’। কিন্তু ঘটনার পর পূর্বপরিকল্পনার কথা বলে দায় এড়ানো যায় না।
বছরাধিককাল ধরে ধারাবাহিক এসব হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সাইট ইন্টেলিজেন্সে আইএসকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে তারা এর দায় স্বীকার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল-কায়েদা ইন সাব কন্টিনেন্ট এসব হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। তাদের এই দাবির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশে আইএস আছে এবং তাদের নির্মূলে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে আগ্রহী বলে বারবার উল্লেখ করে আসছে। বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি প্রমাণ করার তাদের এই অতি আগ্রহ স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। তাদের নিজ সৃষ্ট ভূতের ভয় দেখিয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো এ দেশেও তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বাংলাদেশকেও তারা আরেকটি পাকিস্তান বা আফগানিস্তান বানাতে চায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ এ প্রসঙ্গে সব সময় বলে আসছে যে বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা বারবারই বলেছে, এসব কাজ মূলত দেশজ জঙ্গিগোষ্ঠীর। এ কথার যৌক্তিকতা ছিল এবং আছে। আসলে বাংলাদেশে ২৯টির ওপর জঙ্গিগোষ্ঠী বহুদিন ধরে তৎপর। তার ওপর রয়েছে হিযবুত তাহরীরের মতো আধুনিক সংগঠন এবং সর্বোপরি জামায়াতে ইসলামী; যারা বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতার সময় এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানের সৃষ্ট তাণ্ডবকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেছে। ক্ষমতার বাইরে ২০-দলীয় জোটে একই ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র জামায়াত-সৃষ্ট তাণ্ডব বিএনপির বিশেষ সমর্থন পেয়েছে। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা উভয়ে মিলে চার শ স্কুলঘর পুড়িয়ে দেওয়া, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার হত্যার মতো ঘৃণিত কাজগুলো করেছে।
আর ২০১৫-এর ওই নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে খালেদা জিয়া স্বয়ং মাঠে নেমেছেন তাঁর পেট্রলবোমার আগুন–সন্ত্রাস নিয়ে। তাঁর ঘোষণাকৃত অবরোধ কর্মসূচি সেই সময়েই সব প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেললেও আজ অবধি সেই অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়নি। এসবের ধারাবাহিকতায় বর্তমান জঙ্গি তৎপরতা যে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে চলেছে, এটা দাবি করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। গুলশান হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা জিয়া তাঁর দেওয়া বিবৃতিতে ওই ঘটনাকে ‘রক্তাক্ত অভ্যুত্থান’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং একে বর্তমান সরকারের ‘দুঃশাসনের বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেবল তিনি নন, বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরামের নেতা ড. কামাল হোসেন একে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার অভাবের কারণেই সৃষ্ট বলে দাবি করেছেন এবং খালেদা জিয়ার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গুলশানের ঘটনাকে এরই বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের কথা যদি মেনে নিতে হয় তাহলে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্রে যে জঙ্গি হামলা হয়েছে, সেগুলো কোন আইনের শাসন বা মত প্রকাশের অভাবের কারণে হয়েছে তার ব্যাখ্যা তিনি বা খালেদা জিয়া দেননি। কেবল তাঁরাই নন, আমাদের বাম বন্ধুরাও একই সুরে কথা বলছেন। নিজেরা ঐক্যের ডাক দিলেও ১৪ দলের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দেওয়ার কথা বললে তাঁরা সেখানে মিলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ আগ্রহ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপিকে এক টেবিলে আলোচনায় বসানো। সে রকম প্রস্তাবই দেওয়া হয়েছে সিপিবির পক্ষ থেকে ১৪ দলের সমন্বয়ককে। আপাতদৃষ্টিতে তাঁদের এই প্রস্তাব যৌক্তিক বলে অনেকে মনে করতে পারেন। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, সেখানে খালেদা জিয়ার ‘জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান যেন মনে হয় তারই প্রতিধ্বনি।
এতে দোষটা কোথায় বলে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। বিষয়টা যদি এত সরল-সহজ হতো, তাহলে বলার কিছু থাকত না। কিন্তু যে জামায়াতের ক্যাডাররা বিভিন্ন নামে এসব সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত আছে, পুলিশের কাছে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তাদের জামায়াত কানেকশন গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গিরা স্বীকার করছে, সেই জামায়াতের সঙ্গ বজায় রেখে বিএনপির এই বক্তব্য কোন দিক নির্দেশ করে? বিএনপির জামায়াতের সঙ্গ ছড়ার দাবি ১৪ দল বা কেবল সরকার-সমর্থকদের নয়; বিএনপিকে যাঁরা সমর্থন করেন, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন পরামর্শ দেন, তাঁরাও বেগম জিয়াকে একই অনুরোধ করেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত এ ধরনের একটি খবর বলছে, গণস্বাস্থে্যর প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁকে এ ধরনের পরামর্শ দিলে তিনি (বেগম জিয়া) সরাসরি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে ওই পরামর্শ তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে। আসলে ঘটনা তা–ই। ২০১৪ সালের নির্বাচনের বাস মিস করে তিনি এখন যত তাড়াতাড়ি একটা নির্বাচন করা যায় তার জন্য ব্যস্ত। এখানে তিনি তাঁর পূর্বতন দাবি অনুযায়ী কেবল তথাকথিত নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিতে চান। সেই স্বপ্ন তিনি ছাড়েননি। গুলশান-শোলাকিয়ার ঘটনা তাঁর জন্য এক মোক্ষম সুযোগের সৃষ্টি করেছে। তিনি তাই ‘ঘরপোড়ার মধ্যে আলুপোড়া’ দিতে চান। গুলশান বা শোলাকিয়ার ঘটনায় তিনি যতখানি না নিন্দা করেছেন, তার চেয়ে বেশি নিন্দা করেছেন সরকারকে। ঈদের দিন সমাগত অনুগতদের সামনে বক্তৃতায় তিনি শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদকে ‘স্বাস্থ্যবান’ করার অভিযোগ এনেছেন এবং শেষে পরিষ্কার করে বলেই ফেলেছেন জঙ্গিরা তার কাজ করে ফেলেছে। এখন সরকারের উচিত পদত্যাগ করে নির্বাচন দেওয়া। জঙ্গির দেওয়া আগুনে তিনি এই আলুই পোড়া দিতে চান। তাঁর এই বক্তব্য হঠাৎ খায়েশ থেকে নয়; বিডিআর বিদ্রোহ থেকে এই সরকারের পতন ঘটাতে তিনি ধারাবাহিকভাবে যেসব ষড়যন্ত্র করে এসেছেন, এটা তারই একটি বহিঃপ্রকাশ। তিনি সম্ভবত দেশের এই জটিল সময়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের কিছু বক্তব্যে উৎসাহিত হয়েছেন।
এসব গণমাধ্যম বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার জন্য বাংলাদেশের বিভাজনের রাজনীতিকে দায়ী করেছে। এমনকি ভারতের গণমাধ্যম দ্যা হিন্দু বা টাইমস অব ইন্ডিয়া এ ধরনের মতই প্রকাশ করেছে তাদের সম্পাদকীয়তে। পশ্চিমের কূটনৈতিক মহলও সম্ভবত তাঁকে এখন এই দাবি তুলতে উৎসাহিতও করছে, যেমন করেছে এর আগে। কিন্তু বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে যে ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছিল, তার সামান্যতমও বাস্তবায়ন করতে পারা যায়নি। হেফাজতের তথাকথিত অবস্থানের পক্ষে ঢাকাবাসীকে দাঁড়ানোর যে আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর সেই আহ্বান আলোর মুখ দেখার আগেই হেফাজতিরা ওই অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। দশম সংসদের নির্বাচনকালীন এবং তার বর্ষপূর্তিতে তাঁদের হত্যা, ধ্বংস ও আগুন–সন্ত্রাস ব্যর্থ হয়েছে। এবারও হবে। তবে বেগম জিয়ার ক্ষমতার উদগ্র বাসনা এবং তাঁর নানান ধরনের বহিঃপ্রকাশ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে লাভ নেই। তাতে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার অবসান বা তার মূলোৎপাটন করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শগত লড়াই। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি, কিন্তু তার রাজনীতিকে পরাজিত করতে পারিনি। এই রাজনীতির মধ্যেই এ দেশের জঙ্গিবাদ, উগ্র মৌলবাদী ধ্যানধারণা, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বীজ রোপিত রয়েছে। তা–ই আজ বৃহৎ রূপ নিয়ে দংশন করছে। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদী, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতার এই রাজনীতির বিরুদ্ধে জনচেতনাকে জাগ্রত করে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে গোটা জাতিকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সে কথাই বলেছেন। বলেছেন অন্যরাও। এই সবকিছুকে এক মোহনায় মেলাতে হবে। তবেই জঙ্গিবাদের বীভৎস সব বহিঃপ্রকাশের হাত থেকে দেশবাসী রক্ষা পাবে। দেশ রক্ষা পাবে।
রাশেদ খান মেনন: বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী। সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

জঙ্গিমুক্ত হোক শিক্ষাঙ্গন

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রাণঘাতী জঙ্গি হামলার ঘটনা আমাদের একাধিক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেখানে সন্ত্রাসী হানায় অংশ নেওয়া পাঁচ তরুণের মধ্যে চারজনই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সচ্ছল পরিবারের সন্তান। আগে বলা হতো আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হতাশ তরুণেরা জঙ্গিবাদে দীক্ষা নিয়ে থাকে। কিন্তু ইংরেজি মাধ্যমের নামকরা স্কুলে কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এসব শিক্ষার্থীর বেলায় সেই যুক্তি খাটে না। তাঁদের জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়া এবং ঠান্ডা মাথায় মানুষ হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধে যুক্ত হওয়া আমাদের গভীর উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাঙ্গন হলো জাতির মেধা ও মনন চর্চা এবং মানবতাবোধ তৈরির স্থান। কিন্তু গুলশানে সন্ত্রাসী হামলাকারীদের পরিচয় জানার পর এ কথা বলার সুযোগ নেই যে সবাই সেখানে জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার চর্চা করেন। এর প্রতিকারে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো আবশ্যক বলেই মনে করি।
কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও। তবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি করতে সরকারি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপই একমাত্র সমাধান নয়। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও একযোগে কাজ করতে হবে। জঙ্গিবাদের কুফল ও বিপদ সম্পর্কে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব তরুণ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন, তঁাদের ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠনের কথাও ভাবতে পারে। শিক্ষাঙ্গনকে আমরা কোনোভাবে জঙ্গিবাদের সূতিকাগারে পরিণত হতে দিতে পারি না। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ কিংবা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমাজবিজ্ঞান তথা মানবিক শিক্ষামুক্ত রাখার প্রবণতা পরিহার করা এখন সময়ের দাবি।