Sunday, February 11, 2018

‘ব্যাটেলিং বেগমদের’ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ by জাস্টিন রাওলাত

ম্যাকিয়াভেলি হয়ে সান জু-কে পেরিয়ে আসুন। যদি আপনি জানতে চান কিভাবে শত্রুকে পরাজিত করতে হয় এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে হয় তাহলে এর বাস্তব ক্ষেত্র হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতি।
দেশে সবচেয়ে শীর্ষে থাকা দু’নারীর মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলছে লড়াই। বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে শাস্তি দেয়া হলো তার সর্বশেষ সুবিধা নেয়া। বাংলাদেশিরা তাদের ‘ব্যাটেলিং বেগম’ নামে অভিহিত করেন। ‘বেগম’ শব্দটি মুসলিম নারীদের উচ্চ পদ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে যে সংঘাত তা নারীসুলভ কিছু নয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ঘোর বিরোধী বিএনপির খালেদা জিয়ার মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা দেশকে সহিংসতার সর্পিল পথে টেনে নিয়ে গেছে। বাসে বোমা মারা, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- বিরক্তিকরভাবে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ঘটনা সব সময় এমন ছিল না। তারা (হাসিনা-খালেদা) ১৯৮০ দশকে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল (অব.) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে উৎখাত করে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রকৃতপক্ষেই একসঙ্গে কাজ করেছেন। দু’নারীই রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী। তিক্ত এক যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে পাকিস্তানের কাছ থেকে। ওই স্বাধীনতা যুদ্ধে শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারী তারা।
এরপরে ট্র্যাজেডি তাদের দু’জনকেই রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের জাতির জনক, স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখা হয়। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালে। অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার, স্বাধীনতার অন্য এক নায়ক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমান ১৯৭০ দশকের শেষের দিকে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তিনি প্রেসিডেন্ট হন ১৯৭৭ সালে। তাকেও হত্যা করা হয় ১৯৮১ সালে।
কিন্তু এই দুই নারী এরশাদকে পরাজিত করতে নিজেদের শক্তি এক করে লড়াই করলেও তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে লেগে পড়েন। ১৯৯০ দশকের শুরু থেকে তাদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতার পালাবদল হয়। এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ একেবারে শীর্ষে রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তারা ভীষণ সাহস দেখিয়েছেন। আর নিষ্ঠুরভাবে ক্ষমতা সুরক্ষিত করেছেন। শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন, এমনকি নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোতে ভোট নেয়া শুরুর আগেই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। এটা এ জন্য নয়, তার নেতাকর্মীরা ব্যালট বাক্স ভরাট করেছে। তিনি এমনভাবে জিতেছেন কারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। এর ফলে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ৩০০ আসলের জাতীয় সংসদে ১৫৩টি আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর এর ফলে দলটি সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
বাংলাদেশি রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষককে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যখন প্রধান বিরোধী দলের প্রার্থীরা সরে গেলেন তখন অন্য প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি?
আমার প্রশ্ন শুনে তিনি বড় করে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, অবশ্যই তারা করেছিল। তারা শুধু মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিল। অথবা তাদের দিয়ে সেটা করানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন প্রভাবিত হওয়া ক্যারেক্টার অনেক।
গত নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শেখ হাসিনা তার বিরোধী পক্ষ বিএনপির নেতাকর্মীদের পিছু নেন। তিনি তাদের জোটের অংশীদার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেন।
এর ওপর আগামী ডিসেম্বরে নতুন আরেকটি নির্বাচন। তার আগে এ সপ্তাহে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের জন্য জেল দেয়া হয়েছে। এতে খালেদা জিয়াকে ওই নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার চেষ্টা হতে পারে। আর তা হলে শেখ হাসিনা চতুর্থ দফায় বড় বিজয় পাবেন। এর কারণ, বাংলাদেশের আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তিকে যদি দুই বছরের বেশি সাজা দেয়া হয় তাহলে তিনি রাজনৈতিক কোনো পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন খালেদা জিয়া। ফলে আদালত যদি রায়ে স্থগিতাদেশ দেন, এবং তা যতদিন বহাল থাকবে, সে সময়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। শাস্তি হওয়ার আগের দিন তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের বলেছেন, ‘বিরোধী দলবিহীন ফাঁকা মাঠে কাউকে গোল দিতে দেয়া হবে না’। কিন্তু তিনি জানেন তার বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় আছে। দুর্নীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রদ্রোহিতা পর্যন্ত প্রতিটি অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩০টি ফৌজদারি অভিযোগ মুলতবি আছে।
খালেদা জিয়ার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মনে করেন, খালেদা জিয়াকে ও তার দলের ক্ষতি করার উদ্দেশে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি নেতারা বলছেন, রায় দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার ও আটক বন্ধ করতে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ ঠেকানোর মাধ্যমে সরকার মতপ্রকাশের অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন করছে বলেও দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। রায়কে কেন্দ্র করে রাস্তায় নেমে আসা খালেদা জিয়ার কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে নিয়ন্ত্রণ করতে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে এবং লাঠিচার্জ করেছে। এক্ষেত্রে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার দাবি করে তারা উদার ও গণতান্ত্রিক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এভাবে দমন করার মাধ্যমে তাদের সেই দাবি অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেছে।
তবে প্রকৃত সত্য হলো, দুই বেগম ও তাদের মধ্যকার সীমাহীন লড়াইয়ে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন অনেক বাংলাদেশি।
আপনি যদি বাংলাদেশের রাস্তায় কোনো ক্যাফেতে রাজনীতি নিয়ে কথা বলা শুরু করেন তাহলে আপনি সব সময়ই একই রকম কণ্ঠ শুনতে পাবেন। একই রকম মত পাবেন। বাংলাদেশিরা মনে করছেন এই ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তারা শেষ হয়ে যাচ্ছেন। এই ব্যক্তিগত শত্রুতাই এখন রাজনীতিতে বড় ঘটনা। এতেও বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্রে আছেন এই দু’নারী। তারা থামবেন না, যদিও তাদের বয়স এখন ৭০ উত্তীর্ণ। কিন্তু কেউই সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নন।
বৃহস্পতিবার তিনি আদালত ছেড়ে যাওয়ার সময় ক্রন্দনরত আত্মীয়-স্বজন ও নেতাকর্মীদের বলেছেন- আমি ফিরে আসবো। কান্না করো না।
(জাস্টিন রাউলাত, বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক করেসপন্ডেন্ট। অনলাইন বিবিসিতে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

সিরিয়ায় ইসরাইলের প্রবল হামলা

সিরিয়ার অভ্যন্তরে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যাটারি, সেনা ঘাঁটি ও ইরানি অবস্থানগুলোর ওপর শনিবার এসব হামলা হয় বলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিরয়েছে। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির তাৎক্ষণিক বিবরণ পাওয়া যায়নি। তবে এর ফলে আরো ব্যাপক সঙ্ঘাত সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সিরিয়ার বিমানবিধ্বংসী গোলায় তাদের একটি এফ-১৬ জঙ্গিবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর তারা এই হামলা চালায়। এ তাদের আটটি জঙ্গিবিমান অংশ নেয়। সিরিয়া থেকে তাদের ভূখণ্ডে ইরানি ড্রোন অনুপ্রবেশ করেছিল বলেও দাবি করেছে ইসরাইল। সিরিয়ায় ইরানের অবস্থান সংযত রাখতে সে দেশে প্রায়ই ইসরাইল হামলা চালিয়ে থাকে। ১৯৮২ সালের পর এবারই সিরিয়ায় কোনো ইসরাইলি বিমান বিধ্বস্ত হলো।

প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন

পারিবারিক সহিংতার আশঙ্কাজনিত জরুরি ফোন পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে তারাই সেই ঘটনার শিকার হলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়োতে শনিবার এই দুর্ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ এ কথা জানিয়েছে। পুলিশ প্রধান জো মোরবিজার সাংবাদিকদের জানান,
পুলিশ কর্মকর্তা এন্থনি মোরেলি (৫৪) ও এরিক জোয়েরিং (৩৯) জরুরি ফোন পেয়ে ওয়েস্টারভিলের একটি এপার্টমেন্টে ছুটে যাওয়া মাত্রই বন্দুকের গুলির মুখে পড়েন এবং প্রাণ হারান। মোরেলি গত ২৯ বছর এবং জোয়েরিং ১৬ বছর ধরে ওয়েস্টারভিলের পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তারা ৯১১ থেকে কল পেয়ে সাড়া দেন এবং কলার ফোন করেই রিসিভার রেখে দেয়। ঘটনায় আহত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তার সম্পর্কে বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি। ঘটনার পর পরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে নিহতদের প্রতি তার শোক এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

তাইওয়ানে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭



তাইওয়ানের হুয়ালিন প্রদেশে রোববার শক্তিশালী ভুমিকম্পে আরো দুই পর্যটকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা ১৭ তে দাঁড়ায়। খবর সিনহুয়ার। মঙ্গলবার রাতে ৬ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের ১ শ’ ঘণ্টা পর এই আফটার শকে উদ্ধার দল একটি হেলে পড়া ১২ তলা বিশিষ্ট ভবনের নিচ থেকে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে।
শনিবার একই পরিবারের চার সদস্যের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মৃতদেহ দুটি একই পরিবারের বলে জানানো হয়। পরিবারটি বেইজিং থেকে তাইওয়ানে বেড়াতে এসে ওই ভবনের দোতলায় ওঠে। উদ্ধারকারীরা জানায়, ভূমিকম্পে ১২ তলা বিশিষ্ট ভবনটির প্রথম চার তলা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় এবং হেলে যাওয়ায় উদ্ধার কাজ দুরুহ হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলের সদস্য হুয়াং জানান, ভবনটির প্রথম তলা এমনভাবে হেলে পড়েছে যে দেখতে অনেকটা কয়েকটি সেন্ডুইচের মত দেখায় এবং নিচে গর্ত হয়ে গেছে। ভবনটির ছাদ, মেঝে এবং দেয়াল একসঙ্গে মুচড়ে গেছে। আমরা ভবনটি যাতে ধসে না যায় সে জন্য উদ্ধারে ভারি যন্ত্র ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করছি। উদ্ধার কাজের জন্য এক একটি দেয়াল ফুটো করতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগছে বলে তিনি জানান। পরিবারটি তৃতীয় তলার যে কক্ষে আটকা পড়েছিল উদ্ধারকারীরা শনিবার সেখানে পৌঁছতে পেরেছে এবং পাঁচ জনের মধ্যে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করতে পেরেছে। কিন্তু রোববার উদ্ধারকারীরা পরিবারটির অপর দু’জনের দেহ ছাদের বিমে চাপা পড়া অবস্থায় দেখতে পায় এবং মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য ছাদ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ভূমিকম্পে নিহত ১৭ জনের মধ্যে চীনের নয়জন, তাইওয়ানের পাঁচজন, ফিলিপাইনের একজন এবং কানাডার দুইজন নাগরিক। ভূমিকম্পে ২ শ’ ৮৫ জন আহত হন।

জিয়ার ভূমিকা : ইতিহাস কী বলে by এ কে এম এনামুল হক

চিফ জাস্টিস আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ কর্তৃক ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ এ ক্যু এর পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্টেটর নিযুক্ত হন। জিয়াউর রহমানকে তিনি এভাবে মূল্যায়ন করেছেন, ‘সেনাবাহিনীর মধ্যে তিনি একজন স্বভাবজাত নেতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার অবদান অবশ্যই অমূল্য। সেনাবাহিনীতে জওয়ানেরা মনে করে, তার মাথার চার পাশে একটা জ্যোতির্বলয় আছে।’(বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি পৃ: ৩৬)। ইদানীং আওয়ামী লীগের বেশ কিছু প্রথম সারির নেতা প্রচার করছেন- জিয়া বন্দুকের নলের মাধ্যমে বিচারপতি সায়েম থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মার্শাল ল প্রবর্তন করেছিলেন। এটা গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতি, তথা দেশের ইতিহাসকে কলঙ্কময় করার প্রয়াসমাত্র। প্রেসিডেন্ট জাস্টিস সায়েম তার ক্ষমতা ত্যাগের রহস্য এভাবে ব্যক্ত করেছেন- ‘পরিস্থিতি ছিল এরকম এবং আমি সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ দ্রুত হারাচ্ছিলাম। তখন আমি প্রেসিডেন্ট পদে থেকে ইস্তফা দেয়ার কথা চিন্তা করি। অন্য দিকে, প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেয়ার সপ্তাহ খানেক আগে আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা: ইউসূফ আলী ও আমার সার্জেন ডা: মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান আমাকে পরীক্ষা করে বললেন- আমার প্রোস্টেট অপারেশন করতে হবে। তারা বললেন, ওষুধে কিছু দিন চলবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপারেশন করতেই হবে (পৃ : ৩৪)। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিশেষ সহযোগীর নেতৃত্বে উপদেষ্টা কাউন্সিলের কিছু সিনিয়র বেসামরিক সদস্য আমাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেয়ার অনুরোধ করেন। তারা বলেন, তারা তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অধীনে কাজ করতে চান। সায়েম আরো লিখেছেন- ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর সকালে আমি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করি। সেই সকালে খোন্দকার মোশতাক আহমদ আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগে সামরিক আইন আদেশে সংশোধনী এনেছিলেন এ ধারাটি যুক্ত করার মাধ্যমে : (ক-ক) কোনো কারণে যদি আমি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণে অপারগ হই অথবা যদি আমি প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দিতে চাই, তাহলে আদেশ বলে আমি যেকোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করতে পারি এবং তার কাছে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারি। সে ব্যক্তি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বা আমার মাধ্যমে নিয়োজিত সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো বিচারকের সামনে প্রয়োজনীয় শপথ পাঠের পর প্রেসিডেন্ট পদে প্রবেশ করবেন; অর্থাৎ বিধিবদ্ধভাবে বিচারপতি সায়ে লে: জেনারেল জিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এখানে জিয়ার জবরদস্তির কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না।
১৫ আগস্টের ক্যু এবং নভেম্বর বিপ্লব
‘আমার বাইরের ঘরের দরজায় ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙতেই আমি ভাবলাম, কি হচ্ছে! এত সকালে দরজার ওপর এরকম ধাক্কাধাক্কি! দ্রুত গিয়ে দরোজা খুলে দিতেই যা দেখলাম, তার জন্য তৈরি ছিল না সদ্যঘুমভাঙা চোখ। আমার একটু দূরে দাঁড়িয়ে মেজর রশিদ (পরে লে: কর্নেল (অব:) সশস্ত্র। তার পাশে আরো দুইজন অফিসার। প্রথমজন মেজর হাফিজ, আমার ব্রিগেড মেজর, অন্যজন লে. কর্নেল আমীন আহমদ চৌধুরী আর্মি হেড কোয়ার্টাসে কর্মরত। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। মনে হলো, এ দুইজনকে জবরদস্তি করে ধরে আনা হয়েছে। আমার চমক ভাঙার আগেই রশিদ উচ্চারণ করল ভয়ঙ্কর একটি বাক্য- উই হ্যাভ কিলড শেখ মুজিব। অস্বাভাবিক একটা কিছু যে ঘটেছে সেটা আগন্তুকদের দেখেই বুঝেছি। তাই বলে একি শুনি! আমাকে আরো হতভম্ব করে দিয়ে রশিদ বলে যেতে লাগল, উই হ্যাভ টেকেন ওভার দ্য কন্ট্রোল অব দ্য গভর্নমেন্ট আন্ডার দ্য লিডারশিপ অব খন্দকার মোশতাক।’ মেজর রশিদ ছিল আমার অধীনস্থ আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক। মাস খানেক আগে সে ভারত থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফেরে। তার পোস্টিং হয় যশোর। কয়েক দিন পরই সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ মেজর রশিদের পোস্টিং পাল্টে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসেন। উল্লেখ্য, এ ধরনের পোস্টিং সেনাপ্রধানের একান্তই নিজস্ব দায়িত্ব। রশিদের কথা শেষ হতে না হতেই পেছনে বেজে উঠল টেলিফোন। দরজা থেকে সরে গিয়ে রিসিভার তুললাম। ভেসে এল সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর কণ্ঠস্বর ‘শাফায়াত, তুমি কি জান বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কারা ফায়ার করেছে?
উনি তো আমাকে বিশ্বাস করলেন না।’ ...আমি উত্তর দিলাম, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না। তবে এই মাত্র মেজর রশিদ এসে জানাল, তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে এবং তারা সরকারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। আমাকে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার বিরুদ্ধে হুমকিও দিয়েছে। সেনাপ্রধানকে তাও জানালাম। তবে সেনা প্রধানের সঙ্গে কথা শেষে তার অবস্থান কী, সে সম্পর্কে কিছু বুঝতে পারলাম না, প্রতিরোধ উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপারে পরামর্শ বা নির্দেশ কিছুই পেলাম না। কর্নেল শাফায়াত জামিল আলো লিখেছেন, ফোন করে এসে ড্রইংরুমে দেখি, মেজর হাফিজ একা। রশিদ আর তার সঙ্গী আর একজন অফিসার চলে গেছে। ঝটপট ইউনিফর্ম পরে তৈরি হয়ে মেজর হাফিজকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আগে যাবো ডেপুটি চিফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায়। জিয়ার বাসার দিকে পা বাড়ালাম দ্রুত। কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর দরজা ডেপুটি চিফ নিজে খুলে দেন। কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে ওঠা চেহারা। স্লিপিং ড্রেসে পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়। এক দিকের গালে সেভিং ক্রিম লাগানো, আরেক দিকে পরিষ্কার। এত সকালে আমাকে দেখে বিস্ময় আর প্রশ্ন মেশানো দৃষ্টি তার চোখে। খবরটা দিলাম তাকে। রশীদের আগমন আর চিফের সাথে আমার কথোপকথনের কথাও জানালাম। মনে হলো- জিয়া হকচকিত হয়ে গেলেন। তবে বিচলিত হলেন না। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন So what? President is dead! Vice President is there. Get your works ready, uphold the constitution. সে মুহূর্তে যেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ধ্বনিত হলো তার কণ্ঠে। (কর্নেল শাফায়াত পৃ:-১১৩) জেনারেল জিয়া সংবিধান রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে কর্নেল শাফায়াত জামিলকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিলেন অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। বোঝা যাচ্ছে, কর্নেল জামিলের জেনারেল জিয়ার বাসায় পৌঁছার আগে তিনি (জিয়া) এই ক্যু ও হত্যাযজ্ঞ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলেন। তার যদি অভ্যুত্থানকারীদের সাথে যোগসাজশ থাকত তাহলে কর্নেল জামিলের ক্যু এর সংবাদ দেয়ার পর হকচকিত হতেন না; অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতেন না। কর্নেল জামিল জিয়ার বন্ধু ছিলেন না। বরং ৩ নভেম্বরের ক্যু এর নেতা ছিলেন। ফারুক রশিদরা ক্যু কার্যকর করার সময় জিয়াকে কোনোভাবে অবহিত করেননি। ক্যু’য়ে অংশগ্রহণ থাকলে তারই সর্বাগ্রে এ সম্বন্ধে জানার কথা। আর ফারুক-রশিদদের জিয়াকে এ ব্যাপারে অবহিত করার অভিযোগ, জিয়ার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ক্ষোভের অভিব্যক্তি ও অসততা। কারণ জিয়া তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার এবং তাদের ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্র করেছিলেন।
নভেম্বর বিপ্লব
১৫ আগস্ট ’৭৫ সালে কতিপয় সেনা অফিসার কর্তৃক বিদ্রোহের মাধ্যমে নিষ্ঠুরভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বৃহৎ অংশের আনুগত্য লাভে তাকে বেগ পেতে হয়নি। তিনি বঙ্গভবনে কেবিনেটের নেতৃত্বে থাকলেও বিদ্রোহী মেজররা বঙ্গভবনেই অবস্থান করছিলেন। এ দিকে, সেনাবাহিনীতে ছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ খালেদ মোশাররফ এবং ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল ২-৩ নভেম্বর ’৭৫ সালে পাল্টা ক্যু করেন সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার নামে। যখন খালেদ-শাফায়াত সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে রেডিও-টেলিভিশন স্টেশনের দখল নিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ফারুক-রশিদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করান। ৩ নভেম্বর সারা দিন প্রেসিডেন্ট মোশতাক এবং ক্যু-এর নেতাদের মধ্যে আলোচনায় বিদ্রোহী মেজরদের বাংলাদেশ বিমানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার সাপেক্ষে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের বিদেশে ফরেন অফিসে চাকরি দিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। এ দিকে, দুপুরে জিয়ার পদত্যাগ, খালেদ মোশাররফের সেনাপ্রধান নিযুক্তি, প্রধান বিচারপতি সায়েমের প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ এবং মোশতাকের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলো। সেনানিবাসে ও দেশব্যাপী দ্রুত নানা গুজবের ডালপালার বিস্তার প্রসারিত হতে থাকে। সেনানিবাসে কে বা কারা উসকানিমূলক লিফলেট ছড়াল। সেনাপ্রধান জিয়াকে গৃহবন্দী করা ও অন্তরীণ করাকে সাধারণ সৈনিকেরা সঠিকভাবে গ্রহণ করেননি। তাই সেনানিবাসে বেশ উত্তেজনা দেখা দিলো। জাসদের গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালায়। তারা ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই অফিসাদের কল্লা চাই’- স্লোগান দিয়ে বারো দফা দাবি উত্থাপন করে, যা ছিল সৈনিকদের সংশ্লিষ্ট। এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বেশ কিছু অফিসার ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ কর্তৃক নিহত হন। এ দিকে, জিয়া সমর্থক সৈনিকেরা তাকে তাদের ইউনিট লাইনে নিয়ে যায়। কর্ণেল তাহের তার পরিকল্পনামতো জেনারেল জিয়াকে রেডিও-টেলিভিশনে বক্তব্য রাখতে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হলেন। তাই বলা যায়, জাসদ ও কর্নেল (অব.) তাহের তাদের মিশন বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তারা মূলত জিয়ার ভাবমর্যাদা ব্যবহার করে দেশে এক অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জিয়া ও তার অনুগতদের বিচক্ষণতায় ও ত্বরিত পদক্ষেপে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাহেরের পরিকল্পনা নিখুঁত ছিল। কিন্তু জিয়ার বুদ্ধি ও কৌশলের কাছে তাকে হার মানতে হয়। পরে এর জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। জাসদ ও তাহেরের হঠকারিতায় ১৭ জন অফিসার প্রাণ হারান, যারা ছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সেনানীদের কয়েকজন। ‘৭ নভেম্বর এবং এর অব্যহিত কয়েক দিনের মধ্যে জিয়া তার একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এ দিকে, তাহের ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা আত্মগোপন করার মাধ্যমে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এক পক্ষ কালের মধ্যে জাসদের উল্লেখযোগ্য নেতারা অন্তরীণ হন। আর তাদের সেনা বিদ্রোহ, অফিসার হত্যার উসকানির জন্য আইনানুগভাবে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়।’ কর্নেল শাফায়াত জামিল পৃ: ১৫০।তাহেরের চরম হঠকারী কর্মকাণ্ডকে এখনো কিছু জাসদ নেতা অপব্যাখ্যা দিয়ে ইতিহাস বিকৃতির আশ্রয় নিচ্ছেন।
স্বাধীনতার ঘোষণা
‘৩ মার্চ ১৯৭১ সালে। সকাল সাড়ে ৯টা। এই প্রথম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্যাপারে প্রথম প্রকাশ্য আলোচনা। এ দিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছিল। সামরিক বাহিনীর অন্যান্য বাঙালি অফিসাররা অস্থির হয়ে উঠছিলেন। তাদের সবার মনে একটি চিন্তা পাক খেয়ে ফিরছিল- কী করা যায়? কী করব? বিভিন্ন খবরা-খবর নিয়ে তারা বারবার ছুটে আসছিলেন মেজর জিয়ার কাছে। মেজর জিয়া ছিলেন তখনকার অষ্টম বেঙ্গল ব্যাটালিয়ানের বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত।’ (দক্ষিণ রণাঙ্গন- মেজর রফিক)। ‘২৫ মার্চ রাত ১১টায় অষ্টম ব্যাটালিয়নের অফিসার কমান্ডিং জানজুয়া আকস্মিকভাবে মেজর জিয়ার কাছে নির্দেশ পাঠালেন- এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওযার জন্য। এ আকস্মিক ও রহস্যজনক নির্দেশের অর্থ মেজর জিয়ার কাছে বোধগম্য হলো না। রাত সাড়ে ১১টায় জানজুয়া নিজে এসে মেজর জিয়াকে নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ষোল শহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওয়ানা করে দেয়। কিন্তু রাস্তায় ব্যারিকেড সরিয়ে সরিয়ে যেতে তার দেরি হচ্ছিল। আগ্রাবাদে যখন একটা বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তার ট্রাক দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন পেছন থেকে ছুটে আসে এক ডজ গাড়ি। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে আসেন মেজর জিয়ার কাছে। হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যান রাস্তার একধারে।’ ‘পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে’ শহরে বহু লোক হতাহত হয়েছে। খালেকুজ্জামানের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর থেকে কথাকটি ঝরে পড়ে। কী করবেন জিয়া ভাই এখন? মাত্র আধমিনিট গভীর চিন্তায় তলিয়ে যান মেজর জিয়া। তারপর বজ্রনির্ঘোষে বলে ওঠেন-উই রিভোল্ট।’ সাথে সাথে তিনি খালেকুজ্জামানকে ফিরে যেতে বললেন। বললেন, ব্যাটালিয়নকে তৈরি করার জন্য ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে নির্দেশ দিতে। আর সে সাথে নির্দেশ পাঠান ব্যাটালিয়নের সব পশ্চিমা অফিসারদের গ্রেফতারে।’
(দক্ষিণ রণাঙ্গন ১৯৭১-মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি)। এটাই ছিল বাংলার মাটিতে সর্ব প্রথম রিভোল্ট, তথা স্বাধীনতার ঘোষণা এবং শত্রুকে পাল্টা আক্রমণ। শুরু হয়ে গেল বাঙালির স্বাধীনতার জন্য প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ যা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় এবং বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। পাকিস্তানি সামরিকজান্তার প্লান ছিল, অকস্মাৎ বাঙালিদের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে অপ্রস্তুত জাতিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। (মেজর জেনারেল ফজলে মুকিম) অবস্থার পরিণতি সেটাই হতে যাচ্ছিল। আক্রান্ত অপ্রস্তুত মানুষেরা কিছু প্রতিরোধ গড়ে তুললেও হতবিহ্বল নেতৃত্বহীন জনগণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় দিগ্বিদিক পালাচ্ছিল। শিগগিরই হয়তো তারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হতো। কিন্তু মেজর জিয়ার স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং পরবর্তীকালে কালুরঘাটস্থ বেতার কেন্দ্র থেকে বারবার স্বাধীনতার ঘোষণা হতবিহ্বল জাতিকে জিয়ন কাঠির মতো উদ্বুদ্ধ করেছিল। উদ্দীপিত জাতি প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়ে অবশেষে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। একমাত্র জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বে গ্রহণীয় হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের রেডিও ও টেলিভিশনে তা প্রচারিত হয়। মেজর জিয়া ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তিনি কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ওইসব যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল পাকিস্তানি ২০তম বেলুচ রেজিমেন্ট এবং কুমিল্লা থেকে আগত ৫৩ ব্রিগেড। আর নিশ্চিহ্ন হয়েছিল কমান্ডোরা যারা অবাঙালিদের বাড়ি বাড়ি ঘাঁটি গড়েছিল। (দক্ষিণ রণাঙ্গন পৃ : ১০) ইতিহাসবিদ কে এম রইসুদ্দিন খান তার বাংলাদেশ-ইতিহাস পরিক্রমা পৃ:৬৭৫ এ লিখেছেন- মেজর জিয়াউর রহমান পরপর তিনটি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা জানিয়ে দেন। যখন হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত কী মৃত, তা নিয়ে বাংলার মানুষের মনে সংশয় দেখা দিয়েছিল, তখন তার নামে জিয়ার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। ওপরে বর্ণিত কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। আশা করি, ইতিহাস বিকৃতিকারীদের মুখে ছাই দিয়ে আসল সত্য প্রকাশ পাবে এবং মিথ্যার সমাধি রচিত হবে।
লেখক :  অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার., বাংলাদেশ বিমানবাহিনী

মিথ্যা মামলায় সত্য সাক্ষী by তৈমূর আলম খন্দকার

বাংলাদেশে যিনি বিচার বিভাগের প্রধান, সংবিধানের ৯৪(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক তিনিই বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান- তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক প্রধান তো বটেই, অধিকন্তু তিনি অ্যাপিলেট ডিভিশন থেকে তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত সব বিষয়ে বিচারিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা রাখেন। বিচারের ক্ষেত্রে তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।  সত্য-মিথ্যা যাচাইপূর্বক সত্যকে সমর্থন করাটাই বিচার বিভাগের কাজ। পুলিশের কাজ কী? আইনকে সচল রাখা, অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং কেউ আইনের ব্যত্যয় ঘটালে তাকে দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক আদালতের সামনে বিচারের জন্য পেশ করা। তদন্তের কাজটিও পুলিশের ওপর বর্তায়। ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলা মোকদ্দমা তদন্ত করার জন্য ১৫৪ ধারা থেকে ১৭৬ ধারা পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
আইনের পরিভাষায় পুলিশ INQURY-INVESTIGATION যা-ই করুক না কেন, সত্যকে খুঁজে বের করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। মামলা মোকদ্দমা রাষ্ট্রের একটি UNPRODUCTIVE খাত, যা থেকে খরচের তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অপ্রতুল। তথাপি এ খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় সভ্যতা ও রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। রাষ্ট্র যদি একটি প্রতিষ্ঠান হয়, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতীয়মান হয়, এর প্রতিপক্ষ জনগণ। কারণ, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে এমন প্রতিনিধি দ্বারা রাষ্ট্র বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে না। এ কারণেই জনগণকে নিবৃত্ত করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক, যাদের জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল, তারাই জনগণের অধিকার আদায়ে কার্যত প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ এখন প্রশ্ন হলোÑ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিরা জনগণের কতটুকু সেবা করে যাচ্ছেন? শুধু জনগণ হলেই একটি রাষ্ট্র গঠিত হয় না। তবে রাষ্ট্রের একাধিক উপাদানের মধ্যে ‘জনগণই’ মূল উপাদান এবং সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। উক্ত অনুচ্ছেদ মোতাবেক, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ উক্ত অনুচ্ছেদের (২) উপ-ধারায় আরো বলা হয়েছেÑ ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ সংবিধানের বর্ণিত বিষয়গুলো যদি মিলিয়ে পড়া যায়, তবে দেশের সর্বোচ্চ আইন হলো ‘সংবিধান’, যা দ্বারা শুধু জনগণের কর্তৃত্বের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। সংবিধান যদি জনগণের রক্ষাকবচ হয় তবে জনগণের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার কেন আজ রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের দ্বারা পদদলিত?সমাজের অবস্থান এ পর্যায়ে চলে গেছে যে মনে হচ্ছে, খুনি খুন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করবে; কিন্তু তাকে খুনি বলা যাবে না। যদি কেউ খুনিকে খুনি বলে তবে তার হয়রানির শেষ হবে না। নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাস্তায় দাঁড়ানো যাবে না। চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করা যাবে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বললেই জনগণের অর্থে লালিত যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, তারাই জনতার ওপর হামলা করে, আর বানোয়াট মামলা তো আছেই। ভিত্তিহীন মামলাই বর্তমানে রাষ্ট্রযন্ত্রকর্তৃক জনগণকে হয়রানির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে অনেকগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও আইন রয়েছে, যাদের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব শুধু জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। আইন ও সংবিধান সে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সুর্নিদিষ্ট ক্ষমতা ও অধিক্ষেত্র প্রদান করলেও সরকারের তথা সরকার প্রধানের সন্তুষ্টি বিধান করে নিজ পোস্ট-পজিশনকে সযত্নে রক্ষা করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন। দুদক বা দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে সরকারের মদদ জোগানোই তাদের কাজ। ক্ষমতাসীন দলের কোনো দুর্নীতি তাদের চোখে পড়ে না বলেই জনগণের ধারণা। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও রিমান্ডের নামে যে ‘বাণিজ্য’ হয় তা নিয়েও কেউ কোনো কথা বলে না। সরকারি দলের আঙ্গুলি নির্দেশে ভৌতিক এজাহার দিয়ে গ্রামগঞ্জের অনেক পরিবারের সন্তানেরা গ্রেফতার ও রিমান্ড বাণিজ্যের অসহনীয় অত্যাচারে এলাকায় টিকতে না পেরে রাজধানীতে রিকশাচালিয়ে পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহ করছে। এ খবরও কেউ রাখে না। সব দুুর্নীতির খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব কি দুদকের নয়?
যারা জনগণের বিভিন্ন কর্মের শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্বে নিয়োজিত তারাই অনেক সময়ে জনগণের রক্ত-মাংস এমনভাবে চুষে খাচ্ছে, যার ফলে জনগণ হচ্ছে হাড্ডিসার। অন্য দিকে প্রজাতন্ত্রের বহু কর্মকর্তা হচ্ছে পোয়াবারো। তাদের আর্থিকসঙ্গতি এ পর্যায়ের যে, তারা চাঁদের দেশের জমি বিক্রি হলেও তা হয়তো ক্রয় করার ক্ষমতা রাখেন। আমলারা যদি জনগণের স্বার্থ ন্যূনতম বিবেচনা করতেন তবে দেশের সাধারণ মানুষকে এত হয়রানির শিকার হতে হতো না। পবিত্র কুরআন শরিফে সূরা বাকারায় (আয়াত-১৮) মহান আল্লাহপাক এক শ্রেণীর লোক সম্পর্কে বলেন যে, ‘এরা কানে শোনে না, চোখে দেখে না, কথাও বলতে পারে না; অতএব এসব লোক ফিরে আসবে না।’ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অবস্থা সেই অন্ধ, মুক ও বধিরদের মতো কেন হবে, যারা জনগণের মৌলিক অধিকার ও জন্মগত অধিকার বা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের অধিকারকে গুরুত্ব প্রদান না করে শুধু নির্বিচারে ক্ষমতাসীনদের তাবেদারি করে যাচ্ছে। পুলিশ যেভাবে জনগণের অধিকার হরণ করছে তা ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলকেও হার মানিয়েছে। মামলা সৃজন করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মিথ্যা চার্জশিট ও সে চার্জশিটে সাজা হওয়া বর্তমানে অসম্ভব বিষয়ই না। আমরা জজ মিয়া নাটকের কথা শুনেছি। বিএনপির মহাসচিব নাকি সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে আগুন দেন এবং সে মামলায় চার্জশিট পুলিশই দিয়েছে। এখন এ মামলায় মহাসচিবের সাজা হলেও আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। মিথ্যার ওপর ভাসছে দেশ ও জাতি। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বিচারসম্পর্কিত সব বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা দরকার। তিনি যদি তা দেখেন না বা দেখার ফুসরত (সময়) পান না, আমরা কার কাছে যাব? বিচারপতি এস কে সিনহা মূর্তি স্থাপনসহ অনেক বিতর্কের জন্ম দিলেও ‘নিম্ন আদালত বলতে আইন মন্ত্রণালয়’ প্রকাশ্যে বলে সত্যের অবতারণা করেছিলেন। এ জন্য তিনি অনেক বোবা কান্না, আর্তনাদ ও বুকফাটা কান্নার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। পুলিশ গণমানুষের অধিকার হরণ করে, নিম্ন আদালতগুলোও তেমনি ভূমিকা রাখে। আদালত সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখতে হবে। সিদ্ধান্ত দেয়ার প্রশ্নে সরকারের মুখের দিকে চেয়ে থাকলে চলে না। সরকার অসন্তুষ্ট হতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিম্ন আদালত যেন না দেয়। যে নিজেকে পরাধীন মনে করে শত আইন পাস করেও তাকে স্বাধীন বানানো যাবে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক, বিচারপতি এস কে সিনহার একটি রায় নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে বিচারিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে মন্তব্য করেছেন। বিদ্যমান অবস্থায়, এ দেশকে পুলিশি প্রজাতন্ত্র বললে কি ভুল করা হবে?
লেখক: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
taimuralamkhandaker@gmail.com

বেগম জিয়া প্রতিহিংসার শিকার by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

যেমনটি ভাবা হয়েছিল তেমনটিই হয়েছে। আশঙ্কায় ছিল মানুষ। আইনপক্ষের যুক্তিবাদী লোকেরা বলেছিল তিনি বেকসুর খালাস পাবেন। অপর দিকে ক্ষমতাপক্ষের লোকেরা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছিলেন তাকে জেলে যেতেই হবে। ছাগলের তৃতীয় ছানাটি বলেছিল ‘এক দিনের জন্য হলেও তাকে জেলে যেতেই হবে’। পতিত স্বৈরাচার তাকে জেলে দেয়ার মধ্যদিয়ে প্রতিশোধের সুযোগ সন্ধান করছিল। সরকারের তোতা পাখিটি দাবি করেছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ভাগ্যিস তিনি ফাঁসি দাবি করেননি। আদালত বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। শাস্তি দিয়েছেন তারেক রহমানসহ অন্যদের। তাও আবার ডাবল। বিচারব্যবস্থার ওপর সরকারের অদৃশ্য হাত যখন প্রবল, তখন এমনটিই হবে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে কিভাবে নাস্তানাবুদ হয়েছেন- পাঠক সাধারণের নিশ্চয়ই তা মনে আছে। তার এই ক্ষমাহীন ঔদ্ধত্য! এর কারণে রাজাকার উপাধি পেতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয়েছে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরো প্রমাণ করা যায়। তারেক রহমানকে যে বিচারক বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সরকার। অবশেষে ভদ্রলোক মালয়েশিয়া পালিয়ে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। নিম্ন আদালত এমনিতেই সরকারের অধীন রয়েছে। সেখানে দুর্নীতিও ব্যাপক। টিআইবি ব্যাপক অনুসন্ধান সাপেক্ষে এ ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছিল। সেজন্য তাদের কম নাকানি- চুবানি খেতে হয়নি। সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বিতাড়ন করার পর ‘নিম্ন আদালত নিয়ন্ত্রণবিধি’ জায়েজ করতে অবশ্য সরকারের বেগ পেতে হয়নি। রাষ্ট্রের দুই অঙ্গ- আইন সভা তথা জাতীয় সংসদ এবং নির্বাহী বিভাগ তথা আমলাতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ দলীয়করণের পর সরকার বিচার বিভাগকে অনুরূপ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ষোড়শ সংশোধনী গ্রহণ করে, তা অবশেষে তাদেরই মনোনীত বিচারপতি বাতিল করে দিলে তাদের মাথায় বাজ পড়ে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটির ইতিহাস যারা জানেন তারা স্বীকার করবেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ২০০৮ সালের ৩ জুন তৎকালীন ক্ষমতাসীন তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই মামলাটি দায়ের করে। একই সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়। রাজনৈতিক সচেতন মহল জানেন যে ওই সব মামলার উদ্দেশ্য ছিল ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ কার্যকর করা। এ ফর্মুলা দিয়ে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রী- বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিতাড়ন করে তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। বেগম খালেদা জিয়া কোনোক্রমেই বিদেশে যেতে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পনা অবশেষে ভেস্তে যায়। তার প্রতিপক্ষ বিদেশে গিয়েও ফিরে আসতে সক্ষম হন। অভিযোগ আছে- ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের কুশীলবদের সাথে ‘প্যাকেজ ডিল’ এর আওতায় তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ক্ষমতায় যেতে না যেতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার কিংবা নিষ্পত্তি করা হয়। তখন বিবেকসম্পন্ন একজন প্রবীণ প্রফেসর বলেছিলেন, ওই মামলাগুলো মোকাবেলা করার পরই কেবল তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেন। এই অপরাধে! তাকে অবশ্য মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনের পদটি ছাড়তে হয়। সে যা হোক, ওই সময়ের দায়ের করা মামলা ছাড়াও এই আমলে আরো অনেক মামলা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আরো ৩৫টি মামলা রয়েছে। অন্যান্য আদালতের উপস্থাপিত মামলা ছাড়াও আলিয়া মাদরাসার বিশেষ আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে এরকম মামলার সংখ্যা ১৪টি। এর মধ্যে রয়েছে রায় হওয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা। এখন জিয়া চ্যারিটিবল ট্রাস্ট মামলার শুনানি চলছে। আরো রয়েছে গেটকো নাইকোসহ কয়েকটি বিস্ফোরক আইনের মামলা। দেশবাসী দেখছেন, এর আগে মোটামুটি প্রতি সপ্তাহে তিন দিনই খালেদা জিয়াকে ওই আদালতে হাজির থাকতে হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে একটি সামরিক সমর্থিত সরকার যে ফর্মুলায় তাকে মাইনাস করতে চেয়েছে, তিনি এখন একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে একই ফর্মুলা প্রয়োগ করছেন। এখানে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে হয়, দূরদর্শী বেগম খালেদা জিয়া আনুগত্যের প্রতিশ্রুতিশীল একটি সামরিক সরকারের স্থায়ীকরণের চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সরকারের প্রতিষ্ঠাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফল কি এই যে তাকে অব্যাহত রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে জেলে জীবনযাপন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতীতে একটি নির্মম ও শোকাবহ পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হত্যা ষড়যন্ত্র ও জুলুমের কোনো স্থান নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজনীতির সেই নির্মম ও ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় অল্প বয়সে তার স্বামীকে হারিয়েছেন। ১/১১-এর সময় কারাগারে থাকতে তিনি মাকে হারিয়েছেন। এই সরকারের সময় অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছেন। জ্যেষ্ঠ সন্তান নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূরদেশে এখনো চিকিৎসাধীন। কাছে নেই পরিবারের আর কেউ। পরিবার আপনজন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে যাপন করছিলেন একান্ত নিঃসঙ্গ জীবন। কষ্টের কথা এই বয়সে তাকে নির্মম নিপীড়নের শিকার হতে হলো। বিস্ময়ের ব্যাপার বেগম খালেদা জিয়া এ অবস্থায় এই বয়সে এখনো অনড় সুদৃঢ় এবং অটল রয়েছেন। তিনি হেঁটে হেঁটে নিজেকে জেলে সমর্পণ করেছেন। বিচার পূর্ববর্তী সন্ধ্যায় এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছি। আমাকে জেল বা সাজার ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। আমি মাথা নত করব না। জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে পিছু হটব না। আপনাদের খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেনি। ন্যায়বিচার হলে আমার কিছুই হবে না। আর যদি ক্ষমতাসীন মহলকে তুষ্ট করার জন্য রায় হয়, তা কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে থাকবে। দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না। আমি আপনাদের সাথেই আছি, আপনাদের সাথেই থাকব।’ বিগত ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া অনেকবার নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেফতার করে। তাকে সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপন করা বিশেষ কারাগারে রাখা হয়। উল্লেখ্য, ওই সময় অনুরূপ কারাগারে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের আদেশে মুক্ত হন খালেদা জিয়া। অনুরূপভাবে তারেক রহমানও কারা নির্যাতনের পর হাইকোর্টের আদেশে চিকিৎসার জন্য ব্রিটেনে যান। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেশ কয়েকবার তিনি আটকাদেশের মুখোমুখি হন। ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে এবং ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর আটক হন তিনি। ১৯৮৭ সালের হোটেল পূর্বাণীতে এক অনুষ্ঠান থেকে আটক করে আরো কয়েকজন নেতার সাথে তাকে মতিঝিল থানায় নেয়া হয়। সে সময় পুলিশ তাকে জেলে পাঠায়নি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কিছু সময় তাকে একরকম গৃহবন্দী করা হয়। আওয়ামী লীগ শাসন আমলের বিগত এক দশকে তিনি সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের মুখোমুখি হন। তাকে সেনানিবাসের বাসা থেকে অপমানজনকভাবে বিদায় করা হয়। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানের বাসায় অবরুদ্ধ করা হয়। ওই সময় তার একটি জনসভায় বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল। ২০০৫ সালের ৫ জানুয়ারি তার গুলশানের কার্যালয়ের দুই পাশে বালু বোঝাই ট্রাক রেখে তাকে কার্যত গৃহবন্দী করা হয়। সরকারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য এই ব্যবস্থা নেয়া হয়। ৯৩ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আদালতে হাজিরা দেয়ার পর তাকে বাসায় ফিরতে দেয়া হয়। এ সময় ‘ট্রাকের চাকায় পিষ্ঠ গণতন্ত্র ’ অভিধাটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অন্যায় অত্যাচার থেমে থাকেনি। দল হিসেবে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য স্বৈরাচার এরশাদ নিপীড়ন ও বিভাজনের নীতি অনুসরণ করেছিল। তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জেল জুলুমের সাথে নকল বিএনপি তৈরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রথম থেকে বিগত প্রায় এক দশক ধরে শুধু হামলা-মামলা, জেল-জুলুম করেই ক্ষান্ত হয়নি, অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। এখন তারা বিএনপিকে ভাগ করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এতে অতীতে লাভ হয়নি। বর্তমানেও হবে না। যারা অবৈধভাবে হিরো হতে চেয়েছেন, তারা সবাই জিরো হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া এ ধরনের লোকদের সতর্ক করেছেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমা করা হবে না বলেও সাবধান করেছেন। আমাদের বিশ্বাস বিএনপিতে এখন আর এরকম লোক নেই। শত অন্যায় অত্যাচার করেও বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। বর্তমান রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে গণগ্রেফতার। পুলিশ বলেছিল যারা প্রিজন ভ্যানে আক্রমণ করেছিল তাদেরই ধরা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে রাজধানীসহ সর্বত্র জেলা উপজেলা পর্যায়ে গণগ্রেফতারি চলছে। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, ‘তাহলে কি ঢাকার বাইরে থেকে তারা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পুলিশের ওপর হামলা করেছিল?’ শুধু তাই নয়, গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীগ তালিকা তৈরি করছে। তালিকা ধরে পুলিশ গ্রেফতারবাণিজ্য করছে। শাসক দলকে এটা মনে করিয়ে দেয়া যায় যে, অত্যাচার-অনাচার কোনো কালেই কোনো শক্তিধর শাসককে রক্ষা করতে পারেনি। বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো সরকারের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশের যে কয়টি নির্বাচনে যতটি আসন থেকে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করেছেন, কোনো দিন কোনো পর্যায়ে তিনি পরাজয় বরণ করেননি। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে আনুষ্ঠানিক যোগদানের পর বিএনপি পুনরুজ্জীবন লাভ করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই সময়ে বিশেষত যুবসমাজের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার সম্মোহনী নেতৃত্ব লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশে এর আগে গৃহীত বিভিন্ন জনমত জরিপেও খালেদা জিয়ার অপূর্ব জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। শহীদ জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারকে তিনি যথার্থভাবে ধারণ করেন। শহীদ জিয়াউর রহমান যেমন একজন সামরিক শাসক হয়েও বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন, ঠিক তেমনি বেগম খালেদা জিয়া এরশাদ অপহৃত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৯০ সালে জাতীয় সমঝোতাকে মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রপতি সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। বিগত দশ বছর ধরে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নিরলস নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন গণতন্ত্রের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার বিগত প্রায় চার দশকের রাজনীতিতে তিনি প্রতিবেশী বা কোনো পরাশক্তির সাথে আপস করেননি। তাই বাংলাদেশের আপামর জনগণ তাকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বলেই বিশ্বাস করে। আর এ দুটো কারণেই বেগম খালেদা জিয়াকে শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি ভয়। ক্ষমতাসীন দল নিজেদের স্বাধীনতার মালিক মোখতার বলেই মনে করে। কিন্তু জনগণ অবিশ্বাস্য রকম বিরোধী তাদের। এই নীরব জনগোষ্ঠী বারবার জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তার প্রমাণ রেখেছে। সুতরাং ক্ষমতাসীন দল বেগম খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপিকেই তাদের চিরস্থায়ী ক্ষমতার পথে একমাত্র কাঁটা মনে করে। ২০১৩ সালে ৫টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে যখন বিএনপির ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ তখন ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতার জোরে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে ক্ষমতায় যাওয়ার এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় না যেতে দেয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন বোগাস নির্বাচন এ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলাফল। এ বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত জাতীয় নির্বাচন ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া নেতৃত্ব এবং বিএনপির জনপ্রিয়তাই আওয়ামী লীগের সামনে একমাত্র চ্যালেঞ্জ। ইতোপূর্বে তারা এরশাদ এবং অন্য বিরোধীদের ‘গৃহপালিত জীবে’ পরিণত করেছিল। বিএনপিকে দিয়ে তা সম্ভব নয়। সুতরাং খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে নির্বাসন দেয়ার জন্যই এই মামলা, এই রায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, ‘এ নির্বাচনকে সামনে রেখেই সরকারের যত আত্মঘাতী খেলা এবং এ খেলায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আইন আদালত।’ এ পর্যবেক্ষণের পক্ষে প্রামাণ্য ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে রায়ের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ঘিরে সরকারি তৎপরতা। বরাবরের মতো এবারো রায়ের দিন পালিত হলো- অঘোষিত সরকারি হরতাল। ঢাকার প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেয়া হলো। সব যানবাহনকে চলাচল না করার নির্দেশ দেয়া হলো। সরকারি সমর্থক পরিবহন মালিক শ্রমিকরা তাদের ঘোষিত ২০ হাজার পাহারাদার বসিয়ে মানুষের গমনাগমন প্রতিরোধ করেছে। এভাবে তারা সারা দেশে বিভীষিকা ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। সরকারের এ অন্যায় কার্যব্যবস্থায় নিদারুণ কষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষের। ‘একটি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সবকিছু বন্ধ করে দেয়া কেবল বেআইনি নয়, অমানবিকও।’ যেখানে সরকারের দায়িত্ব জীবন সচল রাখা, সেখানে তারা সবকিছু অচল করেছে। এ যেন নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। খালেদা জিয়ার মামলার রায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রথম কারাদণ্ড। এটি যদি সত্যি সত্যি একজন দুর্নীতিবাজ নেতার বিরুদ্ধে হতো, তা হলে মানুষ খুশি হতো। কিন্তু এটি এমন একজনের বিরুদ্ধে, যার নামে বিগত প্রায় ৪০ বছরে কোনো বদনাম শোনা যায়নি। দেশে এবং বিদেশে এই মামলার রায় একটি রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি হিসেবে গৃহীত হবে। যেহেতু নির্বাচন সমাগত, আর বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছেন সরকারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী; সুতরাং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে এটি সর্বত্র প্রমাণিত হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন যখন কারাদণ্ডাদেশ শুনছেন তখন তার প্রতিপক্ষ নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন। বেগম খালেদা জিয়া শাস্তি ঘোষণার পরও থেকেছেন অবিচল এবং ধীরস্থির। তিনি জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছেন। দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনেতা হিসেবে শাসক আওয়ামী লীগের প্রতি হুমকি ও নির্যাতনের পথ পরিহার করে শান্তি ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি শাসক দলের শুভবুদ্ধির উদয় কামনা করেছেন। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতে অস্থির, উদ্বেগ, ব্যাকুল এবং আবেগাকুল না হয়ে সবার উচিত ধৈর্য ধারণ করা। জেলের পথে এটাই ছিল তার সর্বশেষ উচ্চারণ। সবার উচিত দেশনেত্রী প্রদত্ত উপদেশ মেনে অগণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর না হওয়া। বরং ক্ষোভকে শক্তিতে পরিণত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রামে নিজের অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করে জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। এভাবে আমাদের রক্তের বিনিময়ে যদি গণতন্ত্র মুক্তি পায় তাহলে মুক্তি পাবে খালেদা জিয়া, মুক্তি পাবে স্বাধীনতা এবং মুক্তি পাবে বাংলাদেশ।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

নির্দেশ পালন : ট্রাম্প প্রশাসনে by শফিক রেহমান

১৯৫২-র পূর্ব পাকিস্তান থেকে এবার ফাস্ট ফরোয়ার্ড ২০১৭-১৮-র আমেরিকাতে। প্রফেসর সাইদুর রহমানের বক্তব্য থেকে আসুন প্রফেসর জেমস স্টাভরাইডিসের বক্তব্যে। নেটো-র (NATO) অবসরপ্রাপ্ত সুপৃম এলায়েড কমান্ডার এবং বর্তমানে টাফটস (Tufts) ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুল অফ ল অ্যান্ড ডিপ্লম্যাসি-র ডিন জেমস স্টাভরাইডিস (James Stavridis) টাইম ম্যাগাজিনে (২৭.১১.২০১৭) বড় প্রশ্ন (Big Question, বিগ কোয়েশ্চন) শীর্ষক কলামে বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন। তার লেখাটির শিরোনাম হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আপত্তিকারীদের কাজ করা উচিত কি না? (Should objectors serve the Trump Administration?) সশস্ত্র বাহিনীতে তিনি নেভিতে এডমিরাল ছিলেন। লেখক স্টাভরাইডিসের (৬২) বিশাল অভিজ্ঞতা যেহেতু সেনাতন্ত্র, আমলাতন্ত্র, আইন ও কূটনীতিতে সেহেতু তার এই ছোট নিবন্ধটি এখন আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যারা কাজ করছেন তাদের কাছে অবশ্য পাঠ্য হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ, বিশেষত সেনাতন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও কূটনীতিতে যারা কোনোভাবেই তাদের সবার ওপরের পদে অধিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু নির্দেশ মেনে নিতে পারছেন না, তারা সেই সঙ্গিন প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন- আমি কি ওপরের নির্দেশ মেনে চলব? নাকি বিবেকের নির্দেশ মেনে চলব? যদি বিবেকের নির্দেশই মেনে চলতে চাই, তাহলে করণীয় কি? এই একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনের সময়ে আমার পিতা সাইদুর রহমান।
রিটায়ার্ড এডমিরাল, বর্তমানে প্রফেসর ও চিন্তাবিদ লেখক জেমস স্টাভরাইডিস উত্তর দিয়েছেন :৩৭ বছর নেভিতে কাজ করেছি জনসেবার জন্য। তাই আমি আমাদের দেশ ও জাতির সেবার জন্য নির্লজ্জভাবে বলে থাকি। আমি মনে করি যে কোনো নাগরিকের এই দায়িত্ব পালন করে চলা উচিত। কিন্তু সম্প্রতি আমার ছাত্ররা যে একটা কঠিন প্রশ্ন তুলছে : যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি ও চরিত্র বিষয়ে আমার প্রচণ্ড মতবিরোধিতা  থাকে, তাহলে কি আমি তার প্রশাসনে চাকরি করতে পারব? তেমন চাকরি করা নৈতিকতাচ্যুতি হবে না?
আমি ছাত্রদের উত্তর দেই মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে : প্রথমত, মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তিবিশেষের চাইতে (তিনি যদি একজন প্রেসিডেন্টও হন) বেশি ইম্পরট্যান্ট হচ্ছে দেশ। আর তাই তোমার উচিত মোটামুটি কিভাবে তুমি তোমার দেশকে সেবা করতে পার সেটা সব সময় ভাবতে হবে। প্রশাসনে থাকলেও দেশের চিন্তা সবচেয়ে বেশি করবে। দ্বিতীয়ত, আমি উপদেশ দেব, এমন কোনো কাজ নিও না যেখানে প্রেসিডেন্টের সরাসরি অধীনে থাকতে হবে। আমার কোনো ছাত্রই প্রেসিডেন্টের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা সভায় এখনই চাকরি পাবে না। আমি বলছি এমন কাজের কথা, যেটা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার নিকট বৃত্তের মধ্যে পড়ে, যেমন হোয়াইট হাউসে কোনো চাকরির কথা। এই ধরনের পদে কোনো চাকরি নিও না। আমার বলতে দুঃখ হচ্ছে, তবুও বলছি, এই প্রেসিডেন্টের সংগঠনের যত কাছাকাছি তুমি যাবে ততই তোমার সুনাম ও সততা বিষয়ে ঝুকির মধ্যে পড়তে হবে। আর তৃতীয়ত, আদর্শ ও নৈতিক কারণে যদি কোনো প্রেসিডেন্টের কোনো কাজ বা নীতির সাথে তোমার মৌলিক মতভিন্নতা হয়, তাহলে তোমার পদত্যাগ করা উচিত হবে। ছাত্রদের প্রতি শেষ কথা হলো, সরাসরি ট্রাম্পের অধীনে বা হোয়াইট হাউসে কাজ না নিয়ে তোমার উচিত হবে ইউএসএইড (USAID) অথবা সিআইএ (CIA) অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা স্বদেশ নিরাপত্তা দফতরে (Department of Homeland Security) কাজ নেয়া। সেই কাজে খুব পরিশ্রম করে বোঝাবে যে তুমি সুযোগ্য ও দক্ষতর কর্মচারি। তুমি যে কাজে খুব ভালো, স্মার্ট, বাকপটু (আর্টিকুলেট) সেটা বুঝলে তোমার ব্যক্তিগত ভীতি ও আদর্শ যাই থাকুক না কেন, ওপরওয়ালারা নিজেদের স্বার্থে তোমার ওপরই নির্ভর করবে। নিজের গুণ ও যোগ্যতা বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হও। দুঃখের বিষয় আমার উপদেশ বহু ছাত্রই নিচ্ছে না এবং তারা সরকারি চাকরির দিকে যেতে চাইছে না। এখানে বলা উচিত, সম্প্রতি আমেরিকার ৬০% ক্যারিয়ার রাষ্ট্রদূতরা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পররাষ্ট্র দফতরে কাজ করার আবেদনপত্র কমে গেছে ৫০%। আমি আশা করি, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সেক্রেটারি অফ স্টেট) রেক্স টিলারসনের উচিত হবে তার দফতরের এসব সমস্যার দিকে নজর দেয়া।
আমার এই উপদেশমূলক লেকচার আমি শেষ করি গৃসের একটি উপকথা বলে : দায়েদালাস একজন উদ্ভাবক (ইনভেন্টর) ছিলেন। তিনি বন্দি হয়েছিলেন। তখন তিনি মুক্তি কিভাবে পাওয়া যেতে পারে সেটি উদ্ভাবনের চিন্তা করেন। তিনি কৃত্রিম ডানা উদ্ভাবন করেন যেটা তিনি ও তার ছেলে ইকারাস তাদের গায়ে লাগিয়ে কৃট দ্বীপ থেকে পালাতে পারেন। ইকারাস ডানা পেয়ে খুব খুশি হয়ে উড়তে থাকল এবং যতটা পারে সূর্যের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করছিল। এক পর্যায়ে তার পিতা তাকে সাবধান করে বললেন, তুমি সূর্যের বেশি কাছে যেও না। যদি কাছে যাও তাহলে বিপদে পড়বে। কিন্তু ইকারাস তার পিতার সতর্কবাণীকে পাত্তা দিল না। সে সূর্যের আরো কাছে উড়তে গেল। ফলে যে মোম দিয়ে তার ডানা দুটি দেহের সঙ্গে আটকান ছিল সেই মোম গলে গেল। ইকারাস ধপাস করে সমুদ্রে পড়ে মারা গেল। এটা নিছকই গল্প। কিন্তু এই গল্পে আমার ছাত্রদের হুশিয়ারি দেই এই প্রেসিডেন্ট পদধারী সূর্যের খুব কাছে উড়তে যেও না। তাহলে তোমার ডানা দুটিকে যে মোম আটকে রেখেছে সেটা দ্রুত গলে যাবে। প্রফেসর জেমস স্টাভরাইডিসের উপদেশে হোক বা নাই হোক, ইতিমধ্যে আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করে কিছু আমলা পদত্যাগ করেছেন অথবা অন্য কোনো দফতরে ট্রান্সফার নিয়েছেন। ১২ জানুয়ারি ২০১৮-তে পানামায় নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জন ফিলি ((John Feeley) পদত্যাগ করেন। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তার গভীর মতবিরোধিতার কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। রয়টার্স বলেছে, পররাষ্ট্র দফতরে ল্যাটিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র স্টাফদের অন্যতম ছিলেন। জন ফিলি স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি এমন একটা জায়গায় পৌছেছেন যে ট্রাম্পের অধীনে কাজ করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। ফিলি বলেন, পররাষ্ট্র দফতরে জুনিয়র অফিসার রূপে যোগ দেয়ার সময়ে আমাকে সই করতে হয়েছিল একটা অঙ্গীকারনামায় যেখানে লেখা ছিল, আমি প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসনের চাকরি করব সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে- এমনকি কোন বিশেষ নীতিতে একমত পোষণ না করলেও। পররাষ্ট্র দফতরের আমার টিচাররা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, যদি আমি সেটা করতে পারছি না এখন বিশ্বাস করি তাহলে আমার পদত্যাগ করাটাই সম্মানজনক হবে। সেই সময়টা এখন এসেছে।
জন ফিলি পানামায় রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে।
১৫ জানুয়ারি ২০১৮-তে রয়টার্সে সংবাদ প্রকাশিত হয় : কয়েক দিনের মধ্যেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চলেছেন আমেরিকার শরণার্থীবিষয়ক শীর্ষ কূটনীতিক সাইমন হেনশো। এমনটি হলে তিনি হবেন তৃতীয় আমেরিকান কর্মকর্তা, যিনি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শরণার্থী সম্পর্কিত চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন বা ওই পদ ছেড়ে ভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত সহকারী সচিব সাইমন হেনশো তার শরণার্থী খাতের সহকর্মীদের এক ই-মেইলে জানিয়েছেন যে, তিনি আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে ব্যুরো থেকে বিদায় নেবেন। ২৯ জানুয়ারি ২০১৮-তে এফবিআইয়ের উপপরিচালক এনড্রু ম্যাককাব স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এফবিআইয়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে আসছিলেন অনেক দিন ধরে। তিনি দাবি করছিলেন এফবিআই ও তার বিশেষ কৌসুলি রবার্ট মুয়েলার, রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক বিষয়ে যে তদন্ত করছে, সেটা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এফবিআই যে তার বিরুদ্ধে কাজ করছে তার প্রমাণ হিসেবে ট্রাম্প এনড্রু ম্যাককাবের নাম বলেছিলেন। ম্যাককাবের স্ত্রী বিরোধী দল ডেমক্রেটস পার্টির সমর্থক। এটাও ম্যাককাবের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। তাই ম্যাককাব পড়ে যান সেই সংকটে- তিনি কার নির্দেশ মেনে চলবেন? নিজের বিবেকের- নাকি ওপরের নির্দেশ? ম্যাককাবের ওপর ট্রাম্প অব্যাহত চাপ রেখেছিলেন। অবশেষে ম্যাককাব অবসরে যেতে অবিলম্বে ছুটিতে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮-তে সিএনএনের একটি রিপোর্টে জানানো হয়, অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে একের পর এক খালি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের পদ। পদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী রাষ্ট্রদূতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে স্বেচ্ছা অবসরে যাচ্ছেন অনেকে। এমন সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৭১-এ ইয়াহিয়া প্রশাসনের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে কিছু বাঙালি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক তাদের বিবেকের নির্দেশে পাকিস্তানি পক্ষ ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। আমেরিকায় জন ফিলি, সাইমন হেনশো, এনড্রু ম্যাককাব প্রমুখ তাদের বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী চলেছেন। কিন্তু তাদের ও তাদের পারিবারিক সদস্যদের বেচে থাকার সমস্যায় পড়তে হবে নাÑ যেটা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে সাইদুর রহমানের পরিবারের। স্বাধীন বাংলাদেশে এখন সরকারি চাকরির বাইরে অন্য ধরনের জব অপরচুনিটি সৃষ্টি হলেও কেউ যদি সরকার বিরোধীরূপে ছাপ পেয়ে যান তাহলে তার জন্য নতুন চাকরির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। সুতরাং প্রফেসর স্টাভরাইডিসের উপদেশ মেনে বিবেকের নির্দেশ অনুসারে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। আর তাই ওপরের নির্দেশ মেনে চলার নিরাপদ পথটিই খুজে নেন সরকারি চাকরিজীবীরা। তারা হয়তো নিজেদের প্রবোধ দেন ওপরওয়ালার ওপর সব দোষ চাপিয়ে। যেমন, নাৎসি জার্মানিতে বিভিন্ন পাপাচারের সব দায় সেখানে সেনাতন্ত্র ও আমলাতন্ত্র চাপিয়েছিল সর্বোচ্চ পদের অধিকারী চান্সেলর এডলফ হিটলারের ওপর। যুদ্ধে পরাজিত হবার পরে এদের মধ্যে যাদের বিচার হয়েছিল বিখ্যাত নুরেমবার্গ ট্রায়াল-এ, সেখানে বিচারপতিরা রায় দিয়েছিলেন, না, একটা সময় আসে সেখানে, যখন মানুষের চলা উচিত বিবেকের নির্দেশে।
আমার পিতা প্রফেসর সাইদুর রহমান ১৯৫২-তে মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তার বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী ভাষা আন্দোলনের পক্ষে দাড়িয়েছিলেন। শেষ বিচারে সাইদুর রহমান জয়ী হয়েছিলেন- কারণ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়েছিল বাংলা। এরপরে এপৃল ১৯৭১-এ ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভাইস চান্সেলর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীও তার বিবেকের নির্দেশে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯৭১-এ সেই সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে এবং বিদেশে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত কিছু বিবেকবান আমলা ও সেনা তাদের বিবেকের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। এরপর ডিসেম্বর ১৯৭১-এ মুক্তি আন্দোলন জয়ী হয়। অর্থাৎ, শেষ বিচারে আবু সাঈদ চৌধুরীও জয়ী হয়েছিলেন। আমি তখন কর্মরত ছিলাম হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার শীর্ষপদে- একটিং জেনারেল ম্যানেজার পদে। এই হোটেলের মালিকানা পরোক্ষভাবে ছিল পাকিস্তান সরকারের। করাচি থেকে আমার ওপর চাপ এসেছিল আমি যেন ৭ মার্চে দেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ না মেনে পাকিস্তান সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী হোটেল চালাই। কিন্তু আমি চলেছিলাম বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী এবং এক পর্যায়ে ৮ জুন ১৯৭১-এ সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে মুক্তি আন্দোলনে যোগ দেই। কিন্তু সেসব লম্বা ইতিহাস পরে বলা যাবে। এখন ৪৬ বছর পরে ২০১৭-তে এডমিরাল ও প্রফেসর স্টাভরাইডিস বাংলাদেশের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার উপদেশ আমেরিকানদের দিলেন!

আলাদা লেন : ‘সাধারণ’ বনাম ‘অসাধারণ’ by মীযানুল করীম

এখন রাজধানীসহ বড় বড় শহরের ব্যস্ত সড়কে দেখা যায়, অনেক তরুণ সাইকেল চালিয়ে কলেজ বা ভার্সিটিতে যাচ্ছে। তাদের অনেকেই আসে বেশ দূর থেকে। যন্ত্রযানে পরিপূর্ণ, যানজটে ঠাসা ও জনাকীর্ণ রাস্তায় এই দ্বিচক্রযান চালিয়ে যাওয়া যে কী কঠিন-কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ, তা সাইকেলচালকের পাশাপাশি তাদের যারা দেখে থাকেন, তারাও উপলব্ধি করেন। এ অবস্থায় অন্তত মহানগর ক’টিতে কিছু ব্যস্ত সড়কে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন স্থাপনের দাবি উঠেছে। কিন্তু এর কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। অথচ হঠাৎ করে জানা গেল, সড়কে আলাদা ভিআইপি লেন চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে সাথে সাথে। ভিআইপি মানে, ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পার্সন (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি)। তাদের গুরুত্ব দেয়ার কারণটা সবার বেলায় যথার্থ হোক বা না হোক, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। যোগ্যতা ও সততা মিলিয়ে গুণাবলি যতটাই থাকুক, তারা ক্ষমতাবান। তাই মর্যাদাও বেশি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভিভিআইপি, মানে খুব বেশি গুরুত্বের অধিকারী। সংক্ষেপে বলা যায়, তারা ভেরি ভিআইপি। এটা সবাই জানেন, ভিআইপিদের পদ-পদবি-প্রটোকল থাকে। সরকার তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। এখন শোনা যাচ্ছে, তাদের সুযোগ-সুবিধার তালিকায় যোগ হবে সড়কে আলাদা লেনে যাতায়াতের ব্যবস্থা। সাধারণের চলাচলের রাস্তা থেকে তাদের পথটা পৃথক থাকবে। এ দিক দিয়ে তাদের বলা যায় ‘অসাধারণ।’ কিন্তু এ নিয়ে বিভিন্ন মহল ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছে। শরীরের জন্য যেসব ব্যায়াম বা কাজ সবচেয়ে উপকারী, সেগুলোর মধ্যে আছে হাঁটা, জগিং, সাইকেল চালানো, সাঁতার প্রভৃতি। এজন্য এসব নিয়মিত করা স্বাস্থ্য ভালো রাখা বা নীরোগ থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নগরীতে জগিং দূরের কথা, ভোরে হাঁটার সুযোগও দিন দিন কমছে। সাঁতারের পুকুর তো ছোট শহরেও ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। মহানগরীতে পুকুর আর ডুমুরের ফুল প্রায় সমার্থক। ব্যয়বহুল ও হাতেগোনা কয়েকটা সুইমিংপুলে দু’এক ঘণ্টা সাঁতরানোর খরচও ধনী পরিবার ছাড়া অন্যদের বহন করা অসম্ভব। এ অবস্থায় সাইক্লিংয়ের ওপর ভরসা করতে হয়। কিন্তু এই পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলার মতো পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা আমাদের শহরগুলোতে নেই। আজকাল ভোরের দিকে অনেক ছেলে (কিছু মেয়েও আছে) দল বেঁধে সাইকেল চালাতে বের হয়। কিন্তু সড়কগুলোতে ভোর থেকেই বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে সাইকেল চালাতে হয় মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে। তদুপরি, ভাঙাচোরা রাস্তার সাথে যোগ হয়েছে ধুলাবালুর তাণ্ডব। ইউরোপ মহাদেশ শুধু নয়, এশিয়ার চীনসহ বিভিন্ন দেশের মতো এই দেশেও স্বাস্থ্য ও পরিবেশের স্বার্থে সাইকেল চালানোকে নির্বিঘ্ন করে এতে উৎসাহ দেয়া জরুরি। এ জন্য প্রথমে অন্তত রাজধানীর রাস্তায় আলাদা লেন আবশ্যক। কিছু দিন আগে লেখক শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ইউরোপ সফরের অভিজ্ঞতা থেকে সাইকেলের জন্য পৃথক লেন স্থাপনের ওপর জোর দিয়ে লিখেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকার অসংখ্য সাইকেলচালকের জীবন কিংবা দূষণমুক্ত বায়ুর চেয়ে কয়েকজন ভিআইপির সুবিধা নিয়ে বেশি চিন্তিত। ‘ভিআইপি’ কারা? যাদের এই পরিভাষায় বিশেষ মর্যাদা ও সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তাদের কতজন এগুলো পাওয়ার যোগ্য কিংবা তারা তাদের পদ-পদবি অনুযায়ী জনগণের প্রতি দায়িত্ব কতখানি পালন করছেন? এসব প্রশ্ন এখন জনমনে জাগাটাই স্বাভাবিক, যা সুবিধাভোগীদের জন্য স্বস্তিকর হবে না। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কিংবা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত এবং বিশেষ কাজে নিয়োজিত যারা, তাদের অনেক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হয় জনস্বার্থেই। কিন্তু সে জন্য জনগণের স্থায়ী অসুবিধা ঘটে, এমন বৈষম্যমূলক ও শ্রেণীভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া ন্যায়নীতির পরিপন্থী। এটা রাস্তায় চলাচলের বেলায়ও প্রযোজ্য। আমাদের দেশে যানজট এবং যাতায়াতের অন্যান্য সমস্যা অবর্ণনীয়। এটা জাতীয় জীবনে প্রতিনিয়ত বিপুল সময়, শক্তি ও অর্থের অপচয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত রাজধানীতে গত কয়েক বছরে ঘন ঘন ‘ভিআইপি যন্ত্রণা’ সাধারণ নাগরিকদের চলাচলের ক্ষেত্রে দুর্ভোগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানীতে এক দিকে যানের তুলনায় সড়ক অপরিসর, অধিকাংশ সময় সড়ক থাকে অনুপযোগী, আধুনিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত, গণপরিবহন নিতান্তই অপর্যাপ্ত ও অসুবিধাজনক। এই প্রেক্ষাপটে আলাদা ভিআইপি লেন জনগণের দুর্গতি ও যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেবে। এতে মূলত রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবিধানমাফিক, জনগণই এর মালিক। তাদের বিপাকে ফেলে অল্প কয়েকজনের সুবিধাভোগের নিশ্চয়তা সুফলের চেয়ে সমস্যাই বেশি সৃষ্টি করবে। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে হবে খুবই ভেবেচিন্তে এবং সংশ্লিষ্ট সবার মত নিয়ে। ভিআইপি লেন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা ঘোষণার আগেই এর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এতে অনুমান করা যায়, সরকারের এ ধরনের ভাবনাচিন্তা দেশের মানুষের কাছে কতটা যৌক্তিক ও উদ্বেগজনক। পত্রপত্রিকাও এ ব্যাপারে বিরোধিতা ও বক্রোক্তি করছে। একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রাসঙ্গিক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম How about a VIP world? এর নিচে উপশিরোনামে বলা হয়েছে- Every person is important. এই লেখায় বলা হয়েছে, ‘সাধারণ নাগরিকেরা অবহেলিত হওয়া, তাদের হাঁটাচলায় কষ্ট পাওয়া এবং বন্ধ রাস্তা ও যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হওয়া খুবই মন্দ ব্যাপার। এখন ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের পর্যায়ে নামিয়ে দেয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে চরম গণবিরোধী মানসিকতাই প্রকট হয়ে উঠছে।’ আরো বলা হয়েছে, ‘আলাদা লেন করার আইডিয়া উদ্ভটই শুধু নয়, এটা গণমানুষের প্রতি উন্নাসিকতা ও হেয় করার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এমন ভাবনা গণপ্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।’ এতে আরো উল্লেখ করা হয়, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার ব্রিগেডের জন্য র‌্যাপিড ট্রানজিট আর মেট্রোরেল সুবিধা রাখার সুপারিশ রয়েছে স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লানে। অন্যান্য সেবাপ্রতিষ্ঠানও তা ব্যবহার করতে পারে।’ যানজট নিরসনে মনোযোগী হতে আহবান জানিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর এক মিলিয়নের বেশি কর্মঘণ্টা এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার অর্থের সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে শুধু যানজটেই। দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদকীয় শিরোনাম : “সড়কে ভিআইপিদের জন্য ‘অভিজাত’ লেন/সাধারণ মানুষের কী হবে?” এতে উল্লেখ করা হয়, আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের চাহিদাই যেখানে পূরণ হয় না, সেখানে শুধু ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন কেন? এ ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের যুক্তি দেখানো হয়েছে। তবে আমাদের বক্তব্য হলো, অন্যান্য দেশে অনেক বিকল্প থাকে। কাজেই তাদের হিসাব আলাদা। তীব্র যানজটে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সেবা খাতের যানবাহনগুলোর চলাচল প্রায়ই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই জরুরি কাজে নিয়োজিত যানের জন্য আলাদা লেন করা যায়। কিন্তু আমাদের সড়কগুলো তেমন প্রশস্ত নয় যে, তা করা যাবে।’ এই সম্পাদকীয়তে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, উদ্ভট খেয়াল পরিত্যাগ করে বরং ঢাকার যানজট কিভাবে কমানো যায়, তা নিয়েই ভাবা উচিত। ফুটপাথ ও রাজপথ দখলমুক্ত হলে যানজট অনেকটাই সহনীয় হতে পারে। পত্রিকাটির বক্তব্য- সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য কোনো উদ্যোগ না নিয়ে তথাকথিত ভিআইপিদের জন্য অভিজাত লেন করার সার্থকতা আমরা দেখছি না।’ প্রসঙ্গত বলা দরকার, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের সর্বাধিক ভারতবান্ধব সরকার। গত বছর সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ঘোষণা করেছেন, Not a few but every person is important. তাহলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের চলাচল সুবিধাসহ সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কি সরকারের গুরু দায়িত্ব নয়? সরকার ভিআইপি- সেইসাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জরুরি সেবা কাজে নিয়োজিত যানবাহন চলাচলে রাজধানীতে পৃথক লেনের ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে। এ জন্য কেবিনেট বিভাগ প্রস্তাব দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে। এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফেসবুকে নানা মন্তব্যের সাথে কার্টুনে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হচ্ছে। এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, ‘আলাদা লেন করা অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক।’ উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবি উল্লিখিত প্রস্তাব প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। একই দাবি নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির। টিআইবির মতে, সড়কের আলাদা লেনের যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, এটা সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহারের শামিল। আমাদের সংবিধানে বর্ণিত- সুযোগের সমতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ধর্ম, গোষ্ঠী প্রভৃতি কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্য প্রদর্শন না করার মতো মহান নীতিগুলোর পরিপন্থী এই প্রস্তাব।’ আলোচ্য প্রস্তাব উত্থাপন ও সমর্থন করতে গিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘যুক্তি’ দেখিয়েছে, ‘ভিআইপিরা রাস্তার বাম দিক দিয়ে না গিয়ে ডান দিক দিয়ে যান; উল্টো দিক দিয়ে যান; এতে নানা রকম ঝামেলা হচ্ছে।’ কিন্তু টিআইবির মতে, এসব কথা সম্পূর্ণ অসমর্থনযোগ্য। কারণ, পরিচয় ও অবস্থান নির্বিশেষে সবাই আইন কানুন মেনে চলতে বাধ্য। অন্যায্য ও আইনবহির্ভূত আচরণের দরুন অসাংবিধানিক ও বৈষম্যপূর্ণ নিয়ম চালু করা অবিমৃশ্যকারিতা। এটা ক্ষমতাশালীদের উৎসাহ দেবে অনৈতিক আচরণ করার জন্য। তা ছাড়া, জনদুর্ভোগ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দেবে।’ ‘নৌ সড়ক রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি’র বিবৃতিতে বলা হয়, যানজট নিরসনে ফলপ্রসূ উদ্যোগ না নিয়ে বিশেষ শ্রেণীর চলাচলের সুবিধার জন্য আলাদা লেন তৈরি হলে সমাজ-রাষ্ট্রে শ্রেণীবৈষম্য এবং মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যাবে বহুগুণ। ভিআইপিসহ সবার স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত পদক্ষেপই কাম্য।
ভিআইপি বনাম ইআইপি
আমরা ভিআইপি, ভিভিআইপি, সিআইপি প্রমুখের সাথে পরিচিত। তাদের অনেকেই হয়তো এসব মর্যাদা লাভের সমান যোগ্য নন। আর এসব শ্রেণীকরণের সূত্রে ব্রাহ্মণ-শূদ্র সম্পর্কগোছের বর্ণবিভেদ বা বৈষম্য তো একেবারেই অবাঞ্ছিত। এবার ভিআইপি লেনের তোড়জোড় দেখে কেউ কেউ বলছেন, আসলে গুরুত্ব দিতে হবে সব ‘ইআইপি’কে। প্রশ্ন হলো, ‘ইআইপি’ আবার কী জিনিস? জবাব হলো, এর পুরো অর্থ- Everybody is Important Person. এ কথার সমর্থনে বলা হচ্ছে, সব মানুষ যে সমান, তা বহু আগেই বিভিন্ন ধর্ম বলেছে। আর বাংলাদেশ সংবিধানেও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে সব নাগরিকের আইনি সমতার কথা। আমাদের সংবিধানের উৎস মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই যুদ্ধের সূচনাকালেই বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণীত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র অনুসারে বাংলাদেশের মূল স্তম্ভতুল্য নীতি ও আদর্শ তিনটি- জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। এখন যদি কোনো বিশেষ শ্রেণী কিংবা কিছু ব্যক্তির বিশেষ সুবিধার্থে জনগণের চলাচলের রাস্তায় আলাদা লেন করা হয়, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই সুমহান চেতনার সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে?
পাদটীকা : একটি পত্রিকার কার্টুনে দেখা যায়, প্রচণ্ড যানজটে গাড়ির দীর্ঘ সারির ওপর দিয়ে এবং টাকার স্তূপের জোরে ভিআইপি গাড়ি পার হয়ে যাচ্ছে। আর একজন ভিআইপি সে গাড়ি থেকে কালো চশমা পরে মাথা বের করে আছেন।
শহীদ সঙ্গীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ লিখেছেন, ‘আসুন, ভিআইপিদের হাতে হাত মিলাই। জনগণের রাজপথের যানজটে আটকে গেলে শুধু তাদের জন্য তৈরি করা আলাদা লেনে তাদের হাতে হাত রেখে ব্যবহার করি। হুম্’
পুনশ্চ : সরকার ভিআইপির সাথে জরুরি কাজের যানবাহন চলাচলের জন্যও আলাদা লেন বানাতে চান। এ দেশে ‘জরুরি’ কথাটার কত ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে, তা সবার জানা। এমনও দেখা যায়, গাড়ির গায়ে লেখা আছে ‘জরুরি ডিশ মেরামতের কাজে নিয়োজিত।’ এমনকি, কখনো কখনো ‘জরুরি’ লেখা দামি গাড়িতে সাজগোজ করা তরুণী ও মহিলাদের দেখা যায়, বাচ্চাকাচ্চাসমেত। হয়তো তারা যাচ্ছেন বেড়াতে বা পিকনিকে। এসব দেখে রসিক পথচারী টিপ্পনী কাটেন, ‘তারা জরুরি ভ্রমণে নিয়োজিত!’

সরকার কি আগেই জানত? by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

এটাই এখন জনমনে ধারণা যে, সরকার হয়তো জানত, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আখতারুজ্জামানের বিশেষ আদালতে কী দণ্ড দেয়া হবে। আমরা সবাই জানি, নিম্ন আদালত স্বাধীন নয়, বরং তা নির্বাহী বিভাগের অধীন। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য নিম্ন আদালতের বিচারকদেরও সুপ্রিম কোর্টের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিলেন। তা নিয়ে সরকারের সাথে প্রথম থেকেই তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। সে দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র সঙ্ঘাতে রূপ নেয়। যে এস কে সিনহা সরকারের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন, যিনি যুদ্ধাপরাধীদের একের পর এক মৃত্যুদণ্ড দিয়ে গেছেন, তাকেও সরকার শেষ পর্যন্ত হেনস্তার চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপিরা একযোগে সিনহার বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পদ তো বটেই, সিনহাকে তারা দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছেন। তারপর থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ষোড়শ সংশোধনী রায়ের পর্যবেক্ষণ পছন্দ হয়নি বলে বিদায় নিতে হয়েছে। দৃশ্যত এটাই মনে হতে পারে। কিন্তু আরো সত্য এই যে, তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নিম্ন আদালতকে সরকারের কব্জা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।  সেটাও ছিল তার একটি বড় ‘অপরাধ’। সুতরাং তাকে শায়েস্তা করার জন্য প্রবাসে হলেও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ নাকি আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিকে বলেছেন, সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে। আর সে কারণে আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি তার সাথে একই বেঞ্চে বসতে অস্বীকার করেছেন। ‘অস্বীকার করেছেন’ কি না তা প্রমাণিত হয়নি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাসহ কোনো বিচারপতি ওই প্রজ্ঞাপনের কোনো প্রতিবাদ করেননি। আবার সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেই যে তিনি দোষী হয়ে গেলেন, তাও নয়। অতএব, সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল আর বিচারকগণ তার সাথে একই বেঞ্চে বসতে অস্বীকার করলেন, তাই বা কী করে হতে পারে? সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে হবে যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য। আর দুর্নীতির অভিযোগ? সেটা তো রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করবেন না, এই অভিযোগ প্রমাণ করার কথা দুর্নীতি দমন কমিশনের। দুর্নীতিবাজ প্রমাণিত হলেই কেবল সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, তার সাথে অন্যরা বসবেন কি বসবেন না। আর কে দুর্নীতিবাজ তা আদালতের বিবেচ্য বিষয়। যখন তা বিবেচনার জন্য আদালতের কাছে আসে, তখন মাননীয় আদালত বিবেচনা করবেন। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দুর্নীতি করেছেন কি না, তা প্রমাণের আগেই তার সহযোগীরা তাকে স্বেচ্ছায় বয়কট করলেন! তখনই বোঝা গিয়েছিল, সামনে বিচার বিভাগের ওপর ঝড় আসছে। বিচারপতিগণ যদি একবার সরকারের অন্যায় আবদার মেনে নেন, তাহলে সরকার সে অন্যায় বারবার করে যেতেই থাকবে। ঘটলও তাই। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বিদায় নিতে হলো। এরপর মাস তিনেকের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের কারণে পদত্যাগ করলেন আপিল বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। এবার অ্যাটর্নি জেনারেল উচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করে বসলেন। নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হাসানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি উচ্চ আদালতের ওপর একহাত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিছু বিচারপতির আদালত চালানোর অব্যবস্থা দ্বারা গোটা বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তিনি অবশ্য জানান, ঢালাওভাবে সব বিচারপতির বিরুদ্ধে এসব কথা বলছেন না। মাহবুবে আলম বলেন, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটা বিরাট অংশ দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছেন এবং এখনো যারা সৎ আছেন, এভাবে চলতে থাকলে তাদের সততা বজায় রাখা কঠিন হবে। বহু ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের আদেশ ও নির্দেশ লঙ্ঘন করে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ প্রদান করতে থাকে বলে উল্লেখ করে মাহবুবে আলম বলেছেন, আমি ঢালাওভাবে সমস্ত বেঞ্চের জন্য এ কথা বলছি না। অনেক বিচারকই বিচারকার্য হাতের মুঠোয় রেখেছেন এবং আদালতের কর্মকর্তারা তাদের কথামতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
তারা সঠিকভাবে আইনজীবীদের প্রত্যাশামতো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছু বিচারপতির আদালত চালানোর অব্যবস্থা দ্বারা সমস্ত বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তার কারণ ‘সুগন্ধের পরিধি হয় সীমিত, অথচ দুর্গন্ধের পরিধি বিস্তৃত’। তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের বিচার বিভাগের অবক্ষয় ঘটেছে। সাধারণ জনগণের কাছে এ আদালতের যে ভাবমূর্তি ছিল, তাতে পরিবর্তন ঘটেছে। ইতঃপূর্বে একজন প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা দেয়ার সময় এ আদালতের কিছু অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরেছিলাম। এ বক্তব্যে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তদন্তের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তদন্ত অনেকটা অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু যখন পরবর্তী বিচারপতি এলেন, তখন তার দফতর থেকে সে ফাইলটি নিখোঁজ হয়ে গেল। তিনি বলেন, হয়তো দেখা যায়, চার বছর আগে করা মামলা লিস্টে বহাল তবিয়তে আছে; অথচ দুই মাস আগে করা মামলার চূড়ান্ত শুনানি হয়ে যাচ্ছে। আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী মামলা নিচের থেকে উঠানোর কাজে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘আদালতে যোগদানের পর দেখেছি, সকাল সাড়ে ১০টায় কাঁটায় কাঁটায় অনেক বিচারপতি এজলাসে বসতেন এবং কোর্টে আসীন হওয়া ও কোর্ট থেকে নেমে যাওয়ার ব্যাপারে কজলিস্টে যে সময় দেয়া আছে, তার কোনো ব্যত্যয় হতো না। কিন্তু এখন কজলিস্টে যে সময় ধার্য করে দেয়া হয়েছে, তার সাথে বিচারকদের আদালতে ওঠা বা নামার কোনো সঙ্গতি নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’ এখানেই থেমে থাকেননি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বিশেষ বিশেষ কোর্ট বিশেষ ‘বিশেষ আইনজীবীর কোর্টে’ পরিণত হয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কাছ থেকে ব্রিফ নিয়ে তাদের নিয়োগ করা হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী ব্যক্তিরা অনেকে জেনে গেছেন, কোন কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলায় জেতা যাবে। এটা ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ বিষয়ে অনেকেই ছুটছেন বিচারপতিদের সন্তান-স্ত্রী যারা আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন, তাদের দিকে। এটা করছেন এই চিন্তা করে যে, এদের নিয়ে গেলে হয়তো মামলায় জেতা যাবে। বিচারপতিদের আত্মীয় বা সন্তান আগেও এ পেশায় ছিলেন; কিন্তু কখনো এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। এখন কেন বিচারপ্রার্থীদের আচরণ এরূপ হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। মাহবুবে আলম আরো বলেছেন, কোনো কোনো বেঞ্চের বিচারপতিরা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তার বেঞ্চ অফিসারের ওপর। আইনজীবীদের কথায় তারা কোনো কর্ণপাত করেন না। বরং তারা পরিচালিত হন তাদের বেঞ্চ অফিসারদের প্রভাবে। ইতোমধ্যে একজন বিচারপতি অবসরে গিয়েছেন। তার প্রতিটি মামলার রায়ই ছিল একই রকম বাক্যসমৃদ্ধ। অনেকে হাসাহাসি করতেন এই বলে যে, তার হয়ে রায় লিখে দিচ্ছেন তার বেঞ্চ অফিসার। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আদালতের রায় নিয়ে জাল-জালিয়াতি শুরু হয়ে গেছে। আদালত থেকে জামিন দেয়া হয়নি, অথচ জামিনের কাগজ তৈরি করে আসামিরা জেল থেকে বেরিয়ে গেছে। ফৌজদারি মামলার জামিনের শুনানির ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, এই মাহবুবে আলম এত দিন কোথায় ছিলেন? যে বিচারপতি খায়রুল হক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান নেয়ার পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার রায় বদলে দিলেন, তার বেলায় নৈতিকতা নিয়ে কোথায় ছিলেন মাহবুবে আলম? সেই রায় নির্দেশিত পথে ছিল বলে কি তখন চুপ ছিলেন? এখন দুই প্রধান বিচারপতি চলে যাওয়ার পর তার সাহস অনেক বেড়েছে। যদি মুরাদ থাকত, তবে তার দৃষ্টিতে অভিযুক্ত বিচারপতিদের নাম ধরে ধরে তিনি বলতে পারতেন; কিন্তু ঢালাও অভিযোগ করতেন না। অনেকের মতে, উত্থাপিত এসব অভিযোগের অর্থ হলো উচ্চ আদালতের বিচারপতিগণও নিম্ন আদালতের বিচারকদের মতো এই সরকারের কথামতো চলুন। সরকার পক্ষ বলছে, নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়ার মামলার যে রায় হয়েছে, তাতে সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। বিচারক নিজের বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী রায় দিয়েছেন; দিয়ে থাকলে তিনি বাহবা পেতে পারেন। এখানেও মাহবুবে আলমের কথায় ফিরে যাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, উচ্চ আদালতে কোনো কোনো মামলা চার বছরেও নড়ে না। কোনো কোনোটা দুই মাসেই শেষ হয়ে যায়। বেগম জিয়ার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য সপ্তাহে চার দিন পর্যন্ত তাকে আদালতে টেনে আনা হয়েছে অসুস্থতা সত্ত্বেও। একেবারে রকেটের গতিতে তার মামলার রায় দেয়া হলো। আর রায় হলো কার্যত সরকারের আকাক্সক্ষার অনুরূপ। তার পরও দাবি করা হচ্ছে, এ রায় সম্পূর্ণ সরকারি প্রভাবমুক্ত। কিন্তু যে আদালতে দুর্নীতির একটি মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে খালাস দেয়া হলো, সেই আদালতের রায় ও বিচারককে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো কেন? শুধু প্রশ্নই তোলা হয়নি, সেই বিচারককে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। শঠতার একটা সীমারেখা আছে। সরকার সে সীমরেখা বহু আগেই অতিক্রম করেছে বলে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে। সুতরাং মনে হওয়া স্বাভাবিক, ৮ ফেব্রুয়ারি কী রায় দেয়া হবে, তা আগে থেকেই জানতেন ক্ষমতাসীনেরা। আর সে কারণে রায়ের আগে সারা দেশে সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া দমানোর জন্য বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। রাজধানীকে করেছে অবরুদ্ধ। কোটি মানুষকে জিম্মি করেছে। নগরীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার আদালতে যাত্রাপথে পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডারদের বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তার পেছনে পেছনে আদালত পর্যন্ত ছুটে গেছে। ‘এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রুধিবে এই জোয়ারের জল গগনে যখন উঠিছে চাঁদ’।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

বাংলা গদ্যকে বাঁচাও by এবনে গোলাম সামাদ

মানুষ কথা বলা প্রাণী। সে যে ভাষায় কথা বলে, তা হলো গদ্য। যখন বলছি, বাংলা গদ্যকে বাঁচাও তখন প্রধানত বলছি, লিখিত গদ্যকে বাঁচাবার কথা; কেবলই মুখের ভাষাকে নয়। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার (মৃত্যু ১৯৮০ খ্রি. ১১ ফেব্রুয়ারি) বাংলা গদ্য সম্বন্ধে তার লেখা ‘বাংলা দেশের ইতিহাস’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে বলেছেন, খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতকের শেষ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমে এবং সম্ভবত এর আগেই বাংলা গদ্যভাষার একটা সবল প্রাঞ্জল রূপ ছিল। এ ভাষা ছিল সর্বাংশে সাহিত্যের উপযোগী। কিন্তু যে কারণেই হোক, দেশীয় সাহিত্যিকরা এ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেননি। তারা কবিতাই লেখা পছন্দ করেছেন। তিনি তাঁর এই অভিমত প্রদান করেছেন প্রধানত পর্তুগিজ মিশনারি মানুয়েল-দ্য- আস্্সুম্পসাঁও লিখিত ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ (Cripar Xaxtrer Orthobhed) নামক বইয়ের গদ্যের ওপর নির্ভর করে। মানুলে-দ্য-আস্্সুম্পসাঁও এই বাংলা গদ্য লিখতে শিখেছিলেন ঢাকার কাছে অবস্থিত ভাওয়াল নামক স্থানে। এ বাংলা গদ্য হলো, সাধু বাংলা গদ্য। তিনি বইটা লিখেছিলেন ১৭৩৪ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু বইটা ছাপা হয়েছিল ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন শহর থেকে। এ বই ছাপা হয় রোমান অক্ষরে, পর্তুগিজ উচ্চারণ অনুসারে। বাংলা ছাপার অক্ষর তখনো তৈরি হয়নি। বাংলা ছাপার অক্ষর প্রথম তৈরি করান নাথানিয়েল ব্রাসি হলহেড ১৭৭৮ সালে হুগলিতে। এই অক্ষরে ছাপা হয় তার ইংরেজি ভাষায় লেখা বাংলা ব্যাকরণের বাংলা বাক্যগুলো।
 বাংলাভাষায় বাংলা অক্ষরে বই ছাপানো আরম্ভ করেন শ্রীরামপুর থেকে ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা। এসব বইয়ের ভাষা ছিল বাংলা সাধু গদ্য, কোনো অঞ্চলের বিশেষ বাংলাভাষা নয়। মিশনারিরা যে কেবল খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের জন্য বই ছাপিয়েছিলেন, তা নয়। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারের জন্য বই ছাপিয়েছিলেন। যেমন শব ব্যবচ্ছেদ, জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তারা বই ছাপান। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবলই খ্রিষ্টধর্ম প্রচার নয়। এ দেশের মানুষের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার করাও ছিল তাদের বই ছাপানোর অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাভাষায় উন্নতমানের সাধু বাংলা গদ্যে বই লিখেছেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। রমেশচন্দ্র মজুমদার মহাশয় মনে করতেন, চলতি (কথিত) বাংলা গদ্যে ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে বই লেখা সঙ্গত নয়। তিনি ছিলেন প্রমথ চৌধুরীর কথ্য বাংলা গদ্যের বিশেষভাবে বিরোধী। কারণ তিনি মনে করতেন, এটা বাংলা গ্রন্থের বিষয়বস্তুকে হালকা করে ফেলবে। থাকবে না ভাবের গভীরতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চলিত বা কথ্য বাংলাকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে অনুমতি প্রদানে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মোহিতলাল মজুমদার ছিলেন চলতি বাংলা ব্যবহারের ঘোর বিরোধী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলে যে, চলতি বাংলা পূর্ব বাংলার কোথাও ব্যবহৃত হয় না। পূর্ববাংলার মানুষের কাছে ভাষাটাকে মনে হতে পারে, বিশেষভাবে বিদেশী যা জন্ম দিতে পারে বাংলা প্রদেশে ভাষা নিয়ে বিরোধ। কিন্তু সাধু বাংলাভাষা বাংলা প্রদেশে কোনো বিশেষ অঞ্চলের ভাষা নয়, তা হলো সাধারণ লিখিত গদ্যভাষা। এটা সবার সাধারণ বাংলাভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেনের (১৯০১-১৯৯২) মতে, বাংলাভাষাকে মোটামুটি পাঁচটি উপভাষায় বিভক্ত করা চলে।
এগুলো হলো : মধ্য-পশ্চিমবঙ্গের উপভাষা বা রাঢ়ি; দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের উপভাষা বা ঝাড়খণ্ডি; উত্তরবঙ্গের উপভাষা বা বরেন্দ্রি; পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের উপভাষা বা বঙ্গালি এবং উত্তর-পূর্ববঙ্গের উপভাষা বা কামরূপী। ভাষাতাত্ত্বিক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) তার লিখিত ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে (১৯৬৫) বলেছেন, ভাষার প্রকৃত আর স্বাভাবিক জীবন হলো তার উপভাষাগুলো। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান সংকলন করেন ১৯৬৪ সালে। এটা তার জীবনের উল্লেখযোগ্য কীর্তি। কিন্তু বর্তমানে আনিসুজ্জামান (পদ্মভূষণ) চাচ্ছেন বাংলাদেশে তার ব্যক্তিগত পছন্দের প্রমিত বাংলার প্রবর্তন। ‘প্রমিত’ বাংলা বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন, কেবলই রাঢ়ি বাংলা উপভাষার একটা বিশেষ রূপকে। প্রশ্ন উঠছে, এরকম প্রমিত বাংলার প্রচলন বাস্তবে সম্ভব কি না এবং সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, তা উচিত কি না। কোনো ভাষাকে এভাবে বেঁধে দিতে গেলে অনেক সময়ই তা পরিণত হতে পারে মৃত ভাষায়। এবারের বইমেলায় উদ্বোধনী ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিন। কিন্তু তিনি বললেন না, ‘নিজেদের’ ভাষা ও সংস্কৃতি বলতে আসলে ঠিক কী বুঝতে হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা। তিনি তার বক্তৃতায় আরো বললেন, বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক, এ দেশ হবে শান্তিপূর্ণ, এ দেশে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মকর্ম পালন করবে, এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও তাদের ভাষা চর্চা করতে পারবে। তা ছাড়া, আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলছি। সেখানে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা হবে (নয়া দিগন্ত, ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। কিন্তু আমাদের কাছে যা বোধগম্য হচ্ছে না, তা হলো-হারিয়ে যাওয়া ভাষা নিয়ে গবেষণা করে আমরা বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে লাভবান হবো? পৃথিবীতে কত ভাষা ছিল আর কত ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে, তার হিসাব কারও জানা আছে বলে মনে হয় না। বিলাতে এক সময় কর্নিশ (Cornish) বলে একটা ভাষা ছিল। কিন্তু ভাষাটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ভাষায় যারা কথা বলত, তারা এখন কথা বলছে ইংরেজি ভাষায়। সব ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। ভাষার বিলুপ্তি ঘটে। এটাই ইতিহাস। আমরা জানি, জাতিসঙ্ঘের ভাষা হিসেবে পাঁচটি ভাষা স্বীকৃত। সেগুলো হলো- ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান, চীনা ও স্প্যানিশ (হিসপানি)। এ পাঁচটি ভাষার মধ্যে আমরা একমাত্র ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষা ক’টি শিখবার কতটা সুযোগ পাই? আমাদের ভাষা ইনস্টিটিউটে কতগুলো ভাষার চর্চা করা হবে?
আমাদের এ আন্তর্জাতিকতার শেষ কোথায়? গরিব দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় এ ধরনের আন্তর্জাতিকতাকে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু বলা যেতে পারে বলে মনে হয় না। আমার মনে পড়ে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তখন সবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রাজশাহীতে দলে দলে মুসলিম শরণার্থী আসছে প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ থেকে। প্রথম দিকে তাদের অবস্থা ছিল খুবই অসহায়। কিন্তু পরে তাদের অবস্থা হয়ে উঠল স্থানীয় আদিবাসীর চাইতে অনেক সচ্ছল। কেননা, তারা অনেকেই করতে পারল রাজশাহী থেকে যাওয়া হিন্দুদের সাথে তাদের সম্পত্তি বিনিময়। ভারতে এক বিঘা সম্পত্তি দিয়ে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় পাওয়া সম্ভব হলো পাঁচ বিঘা সম্পত্তি। অন্য দিকে, ভারত থেকে অনেকে এলেন চাকরি পছন্দ করে। তারা এখানে পেতে থাকলেন যথেষ্ট বেতন। লাভ করলেন স্থানীয় মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা। করতে পারলেন তাদের সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার আত্মউন্নতিতে। কিন্তু ভারত থেকে আসা মুসলমানদের একটি অংশ থেকে গেল সঙ্কটের মধ্যে। কয়েক বছর পর আমার এক বন্ধু আমাকে বলল, তাদের অবস্থাও যথেষ্ট ভালো হয়ে উঠবে। কেননা ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এদের আর্থিক সহায়তা দেবে বলে। ভারত সরকারের লক্ষ্য হলো, এ দেশে তার কিছু মুৎসুদ্দি সৃষ্টি করা। পরে বিভিন্ন ঘটনা থেকে আমার মনে হয়েছে, সে বন্ধুর দেয়া তথ্য একেবারেই মিথ্যা ছিল না। আমাদের দেশে এখন যারা বেশি প্রগতির কথা বলছেন, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রচার করছেন, তাদের একটা বড় অংশই ভারত থেকে আসা অথবা তাদের বংশধর। প্রমিত বাংলার সমর্থকদের মধ্যেও তাদের প্রাধান্য লক্ষ্য করার মতো। পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষার মধ্যে এখন ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। অথচ ইংরেজি ভাষার উন্নয়নের জন্য ইংরেজরা কোনো একাডেমি স্থাপনের প্রয়োজন দেখেননি। ইংরেজি ভাষার কোনো একাডেমি গড়ার প্রয়োজন দেখেননি ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষরা। ইংরেজি ভাষার প্রথম অভিধান রচক ডক্টর স্যামুয়েল জনসন সম্পূর্ণরূপে নিজের উদ্যোগে ইংরেজি অভিধান প্রণয়ন করেন ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নোয়া ওয়েবস্টার তার বিখ্যাত অভিধান রচনা করেন ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে। আমাদের দেশে ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাভাষার কোনো একাডেমি ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলেই বাংলাভাষা সাহিত্যের ঘটেছে বিপুল বিকাশ। এটা ঘটেছে কোনো সরকারি উদ্যোগে নয়, ব্যক্তি উদ্যোগে। এ সময় অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে বাংলা অভিধান সঙ্কলন করেছেন।
তাদের মধ্যে রাজশেখর বসুর (১৮৮০-১৯৬০) নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য হয়ে আছে। বাংলাভাষার অগ্রগতিও হয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগেরই ফলে। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখছি, এই উদ্যোগ যেন শ্লথ হতে চলেছে। আমরা ক’দিন আগে দেখলাম, বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ করে আনা হলো প্রণব মুখোপাধ্যায়কে। তিনি বাংলাভাষা ও সাহিত্যের গবেষক নন। তিনি জীবনে সাহিত্য চর্চা কতটা করেছেন, আমরা তা জানি না। এমন একজন ব্যক্তিকে কেন বাংলা একাডেমিতে বাংলা ভাষা সাহিত্যের ওপর বক্তৃতা দেয়ার জন্য আনা হলো, সেটা হয়ে উঠেছে খুবই প্রশ্নসাপেক্ষ। তিনি বাংলা একাডেমিতে যা বললেন, সেটা মোটেও গুরুত্ববহ নয়। বাংলা একাডেমির বর্তমান প্রেসিডেন্টকে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০১৪ সালে প্রদান করেছিলেন ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব। এটা তার সাথে জড়িত কি না তা আমরা বলতে পারি না। বাংলা একাডেমি যেন হয়ে উঠতে চাচ্ছে একটা বিশেষ ধরনের রাজনীতির আখড়া, যেটা আমাদের কাম্য হতে পারে না। শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালে। এতে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে আছে দুইটা দিক। একটা হলো- আমরা মুসলমান, আর একটা হলো- আমরা বাঙালি।’ যদি এ কথা আমরা মানতে চাই, তবে অবশ্যই বলতে হবে যে, বাংলাভাষী মুসলমান ও বাংলাভাষী হিন্দুর সংস্কৃতি এক নয়। ধর্ম মানুষের ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের জীবনযাপন প্রণালীতে তাই ধর্ম ফেলে বিপুল প্রভাব। হিন্দুদের কাছে গো-মাতা পূজনীয়। গরুর গোশত ভক্ষণ ভয়ঙ্কর পাপ। মুসলমানের কাছে তা নয়। হিন্দুর মনে আঘাত লাগতে পারে ভেবে বাংলাভাষী মুসলমান বাংলাদেশে গো-গোশত ভক্ষণ পরিত্যাগ করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, সব ধর্মের অধিকারের কথা। কিন্তু হিন্দুরা একসময় মা কালীর মন্দিরে নরবলি দিয়েছে। হিন্দুরা এক সময় বিধবাকে পুড়িয়ে মেরেছে। হিন্দুদের কেউ যদি ধর্মের যুক্তি তুলে এসব প্রাচীন ভয়াবহ প্রথায় ফিরে যেতে চায়, তবে নিশ্চয় সেটা হতে দেয়া যায় না। হিন্দু ধর্মে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের এবং মুসলমানদের ভাবে অস্পৃশ্য এবং অশুচি। আমরা তাদের এ মনোভাবকে নিশ্চয় স্বাগত জানাতে পারি না। ১৯৭১ সালে কোনো ধর্মের যুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন দেশে পরিণত করতে চাওয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এক পর্যায়ে গঠন করা হলো হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। এটা কি ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরিচায়ক নয়?
কারা টেনে আনছে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা, সেটা আমাদের উপলব্ধিতে থাকা দরকার। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে না। সেটা ভালো কথা। এটাও মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কেবল দেশের রক্ষক নন, তিনি একটা বিশেষ ধর্মবিশ্বাসেরও রক্ষক। মনে হচ্ছে, মহলবিশেষের পক্ষ থেকে আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়কে করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে অস্পষ্ট। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) ‘বাঙালির উৎপত্তি’ নামে একটি প্রবন্ধ আছে। এ প্রবন্ধে তিনি বাংলাভাষীদের একজাতি বলে মানতে চাননি। তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী জনসমষ্টির মধ্যে থাকতে দেখা যায় কোল বংশীয় অনার্যদের, থাকতে দেখা যায় দ্রাবিড় বংশীয় অনার্যদের, থাকতে দেখা যায় আর্য বংশীয়দের এবং আরো দেখা যায় বাংলাভাষী মুসলমানকে। তিনি ইংরেজদের একজাতি বলেছেন। কিন্তু বাংলাভাষী মানুষদের একজাতি বলতে চাননি। তার মতে ইংরেজ জাতি গঠিত হয়েছে স্যাক্সন, ডেন ও নরমানদের সংমিশ্রণে। এ তিনটি জাতি হলো আর্য বংশীয়। কিন্তু সব বাংলাভাষী মানুষ আর্য বংশীয় নয়। আজকের বাংলাদেশ একটা পৃথক রাষ্ট্র হতে পেরেছে বাংলাভাষী মুসলমান থাকার কারণেই। বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলমান কেবল একটি ধর্ম সম্প্রদায় নয়, তারাই হলো এই রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। তাদের ওপর নির্ভর করছে বর্তমান বাংলাদেশের অস্তিত্ব। অনেক কিছুই এখন ওলটপালট করার চেষ্টা চলছে। যেমন শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটিতে গিয়ে বলেছিলেন, এ দেশের সব লোক বাঙালি বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু এখন তার মেয়ে বলছেন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রক্ষারও কথা। কিন্তু এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এতই ক্ষুদ্র যে, এদের পৃথক অস্তিত্ব রক্ষা করা যাবে বলে মনে হয় না। আমাদের বাংলা একাডেমি যেন শেখ মুজিবের চিন্তাচেতনা থেকে অনেক দূরে সরে যেতে চাচ্ছে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমাচার by প্রাণ গোপাল দত্ত

The word 'university' is derived from the Latin universitas magistrorum et scholarium, which roughly means 'community of teachers and scholars.'
The original Latin word 'universitas' refers in general to 'a number of persons associated into one body, a society, company, community, guild, corporation, etc.'
'An institution of higher education offering tuition in mainly non vocational subjects and typically having the power to confer degrees,' with the earlier emphasis on its corporate organization considered as applying historically to Medieval universities.’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় হলো ছাত্র, শিক্ষক ও পণ্ডিত শিক্ষাবিদদের এক মহান কর্মস্থল, যেখান থেকে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত শিক্ষাদান করে, যাচাইয়ের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ডিগ্রি প্রদান করে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে শুধু যে পত্রপত্রিকায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে তা নয়, খোদ ইউজিসির চেয়ারম্যান, শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এবং রাষ্ট্রের অভিভাবক মহামান্য রাষ্ট্রপতিও অনেক নির্দেশনা প্রদান ও অনুরোধ করেছেন, উষ্মাও প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান শুধু একজন সজ্জন বা ভালো শিক্ষক নন, একজন পণ্ডিত ব্যক্তিও। আমার শ্রদ্ধার পাত্র এবং অনেক দিন ধরে তাকে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হিসেবে চিনি। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আপ্রাণ চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছেন না। না পারছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে, না পারছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়াতে। এ কথা বলা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে, সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও বেশ ঊর্ধ্বমুখী নয়। এমনকি সত্তরের দশকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নামিদামি শিক্ষকরা ছিলেন, যাদের শুধু শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর কাছে তারা ছিলেন নমস্য। আমরা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় ঘুরেছি একনজর MAC স্যার অর্থাৎ মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী স্যারকে দেখার জন্য। আবদুল মতিন চৌধুরী স্যারকে দেখার জন্য কত যে চেষ্টা করে দর্শন পেয়েছি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখনও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্যাতিমান শিক্ষক নেই আমি বলব না, তবে সংখ্যায় তারা অনেক কম। গোবিন্দ দেব স্যারকে দেখলে শুধু দার্শনিক মনে হতো না, মনে হতো আরও বেশি কিছু। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষাবিদ-পণ্ডিত প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল মান্নান, আপনাদের সমীপে বিবেচনার জন্য আমার সামান্য নিবেদন। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব দিচ্ছে না, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসির আইন-কানুন মেনে চলছে না, তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করা কঠিন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, শিক্ষামন্ত্রী এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে বিনীত অনুরোধ, যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কনভোকেশন অনুষ্ঠিত হয়, দয়া করে ওইসব জটিল অর্থাৎ নিয়ম না মানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে যাবেন না। কী হবে, একদিন না হয় সংবাদমাধ্যমে আপনাদের দেখানো হবে না। ওইসব তৃতীয় ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে গিয়ে আপনারাও দ্বৈত বিশ্বাসের আশ্রয় নেন। আপনাদের ওইসব অনুষ্ঠানে দেখে ভবিষ্যৎ ছাত্ররাও মনে করে, নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয়টি খুবই ভালো, নতুবা এরকম স্বনামধন্য ব্যক্তিরা কী করে আসেন?
কিছুদিন আগে আমার কাছে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এসেছিলেন Convocation Speaker হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। তাদের Campus, নাম-ধাম বিস্তারিত শুনে আমি অপারগতা প্রকাশ করলে আবারও বিনীত অনুরোধ করে অন্য কাউকে সুপারিশ করে ঠিক করে দেয়ার জন্য। তখন বিনীত জবাব দিয়েছি, আমি যে কারণে যাব না, ঠিক একই কারণে অন্যকে অনুরোধ আমি করতে পারব না। অত্যন্ত বিরক্ত, রাগান্বিত হয়ে চলে যাওয়ার সময় তারা হাসিমুখে কোনো কথাও বলেননি। আমি মনে করি, জীবনে সবচেয়ে উচিত কাজটি আমি করতে পেরেছি। সাড়ে সতেরো বছর বয়সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ক্যাম্পাস না পেলেও হতাশা ছিল না। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর এবং বিশাল আকৃতির হাসপাতাল ছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সেই হাসপাতালটি। হোস্টেলে সিট পেতে অসুবিধা হয়নি, সর্বোপরি পাহাড় ঘেরা একটি খেলার মাঠ, সন্ধ্যায় শেয়ালের ডাক- সবই ছিল আকর্ষণীয়। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়নের অদেসা স্টেট মেডিকেল ইন্সটিটিউটের রিজিওনাল হাসপাতালের বিশাল ক্যাম্পাস, পরবর্তী সময়ে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির সেই বিরাটাকার ক্যাম্পাস, সর্বশেষ জার্মানির টিউবিনগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস- একই সঙ্গে কত শিক্ষক, কত শিক্ষার্থীর সমাবেশ। কী অসাধারণ শৃঙ্খলা। ক্লাসের সময় কেউ বাইরে নেই। বিরতির সময় দলবদ্ধ হয়ে উন্মুক্ত মাঠে বসে লেখাপড়া, খেলাধুলা- সে যে কী অসাধারণ দৃশ্য! প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, ক্যাম্পাস সবকিছু দেখে মনে হয় এগুলো উচ্চশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, অবাক হওয়ার কিছুই নেই, যদি কেউ এগুলোকে কোনো ডিপার্টমেন্টাল শপের সঙ্গে তুলনা করেন। কোনো বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী অথবা স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত বিশেষ শিশু বা Gifted Child যদি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর ৫ বছর ঘুরেফিরে আসে, তাহলে সেও একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে বের হয়ে আসবে- কথিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা সম্ভব কি? এ কথাও সত্য, কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিক বিবেচনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে, তাদের শিক্ষার মান ও পরিবেশ বিবেচনায়।
পুনশ্চ: যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শর্ত পূরণ করেনি, অডিট অ্যাকাউন্টস সময়মতো দাখিল করে না, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু কনভোকেশন গাউন পরার জন্য বা টেলিভিশনে প্রদর্শিত হওয়ার জন্য আপনারা যাবেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ছাত্ররা ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাবে না।
অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক; সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

এক শিক্ষামন্ত্রীকে দুষে কী লাভ! by তারেক শামসুর রেহমান

জাতীয় সংসদে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতা, অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু এ দাবি তোলেন। তার বক্তব্য শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি শুনেছেন। তিনি তার বিবেক-বিবেচনায় জাতির স্বার্থে যতটুকু করা প্রয়োজন, অবশ্যই তা করবেন। সরকারের শরিক কিংবা বিরোধী দল, যেভাবেই আমরা জাতীয় পার্টিকে বিবেচনায় নিই না কেন, এই পার্টির একজন সংসদ সদস্য যখন প্রকাশ্যেই সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার দাবি তোলেন, তখন বিষয়টিকে কি আমরা খুব হালকাভাবে নিতে পারি? এমন কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই যার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি, এমনকি ক্লাস ওয়ানের প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। এটা মহামারীর মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্ন ফাঁসকারীদের আদৌ চিহ্নিত করতে পারছে না। জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু যেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন, সেদিন এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়, যা ৬ ফেব্রুয়ারির সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয়েছে। এর আগে এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছিল। অনেকে স্মরণ করতে পারেন, শিক্ষামন্ত্রী তার একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে তিনি শিক্ষা অধিদফতরের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আপনারা ঘুষ খান সহনীয় মাত্রায়। যদিও পরে এর একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন তিনি। অস্বীকার করেছিলেন যে এভাবে তিনি কথাটা বলেননি। কিন্তু টিভি ফুটেজে তার বক্তব্য স্পষ্ট ধরা পড়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি হয়তো সত্যি সত্যিই এভাবে কথাটা বলতে চাননি। একজন মন্ত্রী এভাবে বলতে পারেন না- এটাই স্বাভাবিক। তার ওই বক্তব্যের সেদিন সমালোচনা হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদের কোনো কোনো সদস্য তার ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলেন। এটা সত্য, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়েছে, এবং হচ্ছে। এই ক’বছরে আমাদের অনেক অর্জন আছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় যদি বারবার ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায় এবং তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে দক্ষ জনশক্তি আমরা গড়ে তুলব কীভাবে? আমরা একটা তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলছি, যারা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার জনশক্তি হওয়ার পরিবর্তে ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে অদক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠছে। এই অদক্ষ জনশক্তি আমাদের কী দেবে? শিক্ষামন্ত্রী সজ্জন ব্যক্তি। বাম রাজনীতির মানসিকতায় যিনি নিজেকে কৈশোরে তৈরি করেছিলেন, তার কাছে দুর্নীতি কখনও মুখ্য বিষয় হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। কেন তিনি নকল বন্ধ করতে পারবেন না? প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা কঠিন কিছু নয়। এটা সম্ভব। প্রযুক্তির এই যুগে এটা কঠিন কোনো কাজ নয়। কিন্তু তিনি বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন! বোধকরি তার ব্যক্তিজীবন দিয়ে জাতীয় নীতি বাস্তবায়নকে বিচার করা যাবে না। তিনি ব্যক্তিজীবনে অতি সাধারণ একজন মানুষ। আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতার মতো প্রতিপক্ষের নেতাদের সমালোচনা করতে অশ্লীল বাক্য কখনও ব্যবহার করেন না। খারাপ কথাও তিনি বলেন না। আমাদের ভালো লাগা এখানেই। কিন্তু শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে যে ‘শক্ত’ অবস্থানে যাওয়ার কথা, সেখানে তিনি প্রচণ্ডভাবে ব্যর্থ। ধারণা করছি, তার এ দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। তার নিজের ব্যক্তিগত ইমেজের স্বার্থেই তিনি সরে দাঁড়াবেন, এই প্রত্যাশা করতেই পারি।
২. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে যখন আলোচনা করছি, তখন সঙ্গত কারণেই উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে যান। সেখানে তিনি প্রতিবারই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কথা বলেন। কথাগুলো শুনতে ভালোই শোনায়। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি, তারা উৎসাহিত হই তার কথায়। কিন্তু এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগটি কী? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে তিনি কি জ্ঞাত আছেন? সেখানে যে অনিয়ম হচ্ছে, তা দূরীকরণে তার কোনো উদ্যোগ তো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রায় ৩৫-৩৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী এইচএসসি পাস করে। তাদের জন্য উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেখানে কারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন? রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, টিআইবি আমাদের জানিয়েছে, টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে! টিআইবি বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সংবাদ সম্মেলনে ভয়াবহ এ তথ্যটি উপস্থাপন করেছিল। তারপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েও যখন এ ধরনের কথা শুনি, তখন আমাকে একধরনের হতাশায় পেয়ে যায়। যদি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না হয়, তাহলে দক্ষ জনশক্তি আমরা গড়ে তুলব কীভাবে? যারা টাকার বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষক হন, তারা পড়ানো ও গবেষণার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছাত্ররা। এতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের যে উদ্যোগ, তা ভেস্তে যেতে বাধ্য। আরও একটা কথা। নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে একধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ভালো শিক্ষকরা পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় সেখান থেকে ভালো ছাত্ররা বের হচ্ছে। অন্যদিকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যোগ্য শিক্ষকের অভাব থাকায় সেখানকার ছাত্ররা বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন রাষ্ট্রপতির কাছে একটি সুপারিশ করেছে, যেখানে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। দেখা যাবে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একেকটি বিভাগে সিনিয়র শিক্ষকের (প্রফেসর) সংখ্যা এত বেশি যে তাদের অনেকেরই পড়ানোর মতো কোর্স থাকে না। ফলে তাদের কিছুটা আর্থিক সুবিধা দিয়ে (যা মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশে আছে) প্রেষণে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাঠানো যায়।
সেই সঙ্গে আরও একটি সুপারিশ রাখছি : অনেক সিনিয়র শিক্ষক সাম্প্রতিক সময়ে অবসরে গেছেন। কিন্তু তারা শারীরিকভাবে সুস্থ। তাদের কাউকে কাউকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করতে দেখি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ‘বিশেষ বিবেচনায়’ নিয়োগদান করা যেতে পারে। এজন্য হয়তো প্রচলিত আইন সংশোধন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ উদ্যোগটি নিতে পারে। তাহলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকের অভাব দূর হবে। একজন শিক্ষকের ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনঃনিয়োগের সুযোগ নেই। অথচ অবসরপ্রাপ্ত এসব শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উপকৃত হচ্ছে। তাহলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সুযোগটি পাবে না কেন? আমি আমার অনেক সিনিয়র সহকর্মীকে জানি যারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। জামালপুর ও নেত্রকোনায় দুটি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে যাচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে- এখানে শিক্ষকতায় কারা যাবেন? শুধু প্রভাষক আর সহকারী অধ্যাপকদের দিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন চলছে। উচ্চশিক্ষার জন্য এটা ভালো খবর নয়। প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চান। উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু উদ্যোগটি নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই। কাজটি মঞ্জুরি কমিশনের করা উচিত। কিন্তু মঞ্জুরি কমিশনের নেতৃত্ব এখানে ব্যর্থ। তারা কোনো উদ্যোগ নিতে পারছে না। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন অনেক- ১৩৫ কিংবা আরও বেশি। মাত্র ৫ সদস্য নিয়ে মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষে এসব বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করা কঠিন একটি কাজ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আলাদা একটি কমিশন করা জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেকটি ‘সনদ তৈরির’ কারখানায় পরিণত হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাই একধরনের নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ মুহূর্তে সমাজের বাস্তবতা। এর প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। কিন্তু যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তাদের ‘সাহায্য’ করা। এটা মঞ্জুরি কমিশন পারছে না। মাত্র একজন সদস্য এ কাজে নিয়োজিত। তার একার পক্ষে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করা সম্ভব নয়। এ কারণেই একটি কমিশন গঠন করা জরুরি। একসময় কথা উঠেছিল একটি ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ গঠন করা হবে, যাদের কাজ হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করা। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক পক্ষের চাপে সেই ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ আজও গঠন করা সম্ভব হয়নি। আমরা চাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়–ক। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যদি পারিবারিকভাবে পরিচালিত হয়, যদি সেগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করে, তাহলে কোনোদিনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। সেখানে যোগ্য ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের রয়েছে একটি বিশাল তরুণ প্রজন্ম। এ তরুণ প্রজন্মকে আমরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারি, যা চীন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া করেছে। এজন্যই চীন, দক্ষিণ কোরিয়া আজ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। ব্যক্তিবিশেষকে সামনে রেখে নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে, যার কোনো চাহিদা নেই অভ্যন্তরীণ বাজারে কিংবা বিশ্ববাজারে। বিবিএ’র নামে ‘শিক্ষিত কেরানি’ তৈরি করছি আমরা, যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারছেন না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন ধীরে ধীরে ‘বেসরকারি’ চরিত্র পাচ্ছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রতিটি বিভাগে এখন সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে অর্থ আয়ের একটি ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। কিছু শিক্ষক এ থেকে লাভবান হচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে তা কোনো অবদান রাখছে না। এখানেও ‘সনদ বিক্রির’ অভিযোগ উঠেছে। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে নৈরাজ্য। উপাচার্যরা নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। দুদক তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে। এক্ষেত্রেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলে জনগণের টাকায়।
৩. শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ের শিক্ষামন্ত্রী। এর আগে কোনো শিক্ষামন্ত্রী এত দীর্ঘদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ছিলেন না। বোধকরি তিনিই একমাত্র শিক্ষামন্ত্রী, যিনি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়েছেন এবং সংসদে তাকে বরখাস্তের দাবি জানানো হয়েছে। আমাদের দুঃখ এখানেই, তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে এ কথাও সত্য, তিনি পদত্যাগ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শৈথিল্য আছে। মন্ত্রণালয়ের অন্য অনেক কর্মকর্তাও এর জন্য দায়ী। দুদক এদের কর্মকাণ্ডও খতিয়ে দেখতে পারে। একুশ শতকে এসে যেখানে যোগ্য ও দক্ষ জনশক্তি আমাদের দরকার, সেখানে আমরা ‘সনদ বিক্রির’ কারখানা প্রতিষ্ঠা করে অদক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছি। শিক্ষামন্ত্রী ‘জ্ঞানভিত্তিক’ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে, আমরা ধীরে ধীরে জ্ঞান ও মেধাহীন একটি জাতিতে পরিণত হতে চলেছি। তাই পুরো মন্ত্রণালয়েই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেঙে আলাদা একটি উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে ঢেলে সাজাতে হবে। সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। আইন করে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে সেখানে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধতন শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রেষণে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা কমিশন গঠন করতে হবে। অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য
tsrahaman09@gmail.com

দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সাজার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের উল্লাস by বদরুদ্দীন উমর

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাজার পর ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা ‘holier-than-thou’ অর্থাৎ ‘তোমার থেকে অনেক বেশি পূতপবিত্র’ ভাব ধারণ করে ইচ্ছেমতো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার ভাষা খুব অশ্লীল। ১৯৭২ সাল থেকেই লুটতরাজ, চুরি, দুর্নীতি করে যে নব্য ধনিক ও শাসক শ্রেণী বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, অশ্লীলতা তাদের জিহ্বার ভূষণ হবে, এর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। খালেদা জিয়া দোষী কী নির্দোষ, এ প্রশ্ন বাদ দিয়ে প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, বাংলাদেশে যেখানে শাসন কর্তৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে চোর-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজদের রাজত্ব ও দোর্দণ্ড প্রতাপ, সেখানে খালেদা জিয়ার দুর্নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ মহলে যে হৈ-হুল্লা দেখা যাচ্ছে এটা হাস্যকর। এ অবস্থা দেখে দেশের লোকও সর্বত্র হাসাহাসি করছে। বাংলাদেশে এখন দুর্নীতি কোনো ব্যতিক্রমী ব্যাপার নয়। প্রতিদিনের সংবাদপত্রে বড় বড় চুরি, দুর্নীতি, লুটতরাজের খবর এখন পাওয়া যায়। সরকারি ব্যাংক লুটপাট, নানা ধরনের সরকারি প্রকল্পে চুরি-দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সদস্যদের নানা অপরাধমূলক কাজের রিপোর্ট এসব খবরে থাকে। মাত্র কয়েক দিন আগে ৬ ফেব্রুয়ারি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় ছাত্রলীগ নেতাদের মাদক ব্যবসার ওপর একটা দীর্ঘ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতির আখড়া হিসেবে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড প্রবল প্রতাপে ও বেপরোয়াভাবে চলে আসছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও তার টাকা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাদের পারস্পরিক সংঘর্ষের খবরও কোনো নতুন ব্যাপার নয়। এখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির সঙ্গে মাদক ব্যবসাতেও বেশ বড় আকারে নিযুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে ‘প্রথম আলো’র উপরোক্ত রিপোর্টটি উল্লেখযোগ্য উপরোক্ত রিপোর্ট থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা দরকার। এতে বলা হয়েছে, ‘রাজধানীর পল্টনের নাইটিঙ্গেল মোড়ে গত ১৪ ডিসেম্বর পুলিশ ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি নূরে মোজাচ্ছেম ওরফে রঙ্গনসহ তিনজনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়, এই তিনজন দীর্ঘদিন ধরে পল্টনসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা বিক্রি করে আসছেন। শুধু নূরে মোজাচ্ছেম নন, ঢাকায় বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক মাদক বেচাকেনায় জড়িত রয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন শাখার নেতাদের অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আবাসিক হলগুলোকে তারা ব্যবহার করছেন মাদক কেনাবেচার নিরাপদ স্থান হিসেবে। সম্প্রতি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই তালিকা ধরে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, মাদক ব্যবসায় জড়িত ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে আটজন ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা, দু’জন সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, তিনজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক নেতা, পাঁচজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কর্মী এবং দু’জন ধানমণ্ডি থানা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক শীর্ষস্থানীয় নেতা।’ এ বিষয়ে ছাত্রলীগের একজন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, এটা অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। তিনি যখন এসএম হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, তখন থেকেই মাদক বেচাকেনায় যুক্ত হন।’’ এখানেই শেষ নয়। একই দিনে ‘প্রথম আলো’য় ‘ঢাকার ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ব্যবসায় ২৪ জন’ শীর্ষক অন্য এক রিপোর্টে বলা হয়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও রাজধানীর আরও ছয়টি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার তথ্য এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইন্সটিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, ধানমণ্ডির ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি। সম্প্রতি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে এই ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ২৪ জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের দুই নেতা, পাঁচ কর্মী ও যুবলীগের দুই নেতার নাম রয়েছে। পুলিশের একজন উপপরিদর্শকের নামও আছে এই তালিকায়।’ তাহলে এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, ছাত্রলীগের শুধু নেতা নয়, কর্মীরা পর্যন্ত মাদক ব্যবসার মতো এক বিপজ্জনক অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে এই রিপোর্ট তৈরি করলেও সরকারি দলের এই অপরাধীদের দু’-চারজনকে গ্রেফতার ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও তাদের শাস্তির কোনো ব্যাপার নেই।
সরকারের ছত্রছায়ায় তারা নিরাপদে মাদক ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কাজ বেপরোয়াভাবে করে চলেছে। এসব রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শুধু নেতা নয়, কর্মীরা পর্যন্ত দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। এসব সংগঠনের মধ্যে পচন না ধরলে তাদের নেতা-কর্মীদের এই দুর্নীতি তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার তা হল, দলের উচ্চপর্যায়ে পচন না ধরলে এবং তারা নিজেরা দুর্নীতিতে ডুবে না থাকলে নিচের স্তরে এই দুর্নীতি কখনও সম্ভব নয়। নেতৃত্বের দুর্নীতি দ্বারাই নিচের পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা দুর্নীতিতে ‘উদ্বুদ্ধ’ হয়েছে। তারা এটা উপলব্ধি করেছে যে, উচ্চপর্যায়ে যেভাবে চুরি-দুর্নীতি চলছে তাতে তারা দুর্নীতি করলে তাদেরকে ধরার কোনো সম্ভাবনা সরকারের নেই। এ অবস্থায় তারা বেশ সহজেই মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের দুর্নীতি ও অপরাধ অবাধে চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। কতভাবে উচ্চপর্যায়ে এই দুর্নীতি হচ্ছে তার হিসাব নেই। ব্যাংক লুটপাট, প্রশ্ন ফাঁস, নদী-নালা-বিল দখল, নানা ধরনের প্রকল্পে ঘুষ ইত্যাদি সব ধরনের চুরি-দুর্নীতিই চলছে। শুধু তাই নয়, চুরি-দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টিও সরকার তাদের দলীয় লোকদের জন্য করছে। এর একটি রিপোর্ট বিগত ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রকাশিত হয়েছে সমকাল পত্রিকায়। ‘আসছে নির্বাচনী বরাদ্দ’ শীর্ষক এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘‘দেশের প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে ১০টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে একটি করে মোট তিন হাজার অত্যাধুনিক একাডেমিক ভবন। আর মাত্র ১০ মাস পরে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সাতটি ক্যাটাগরিতে এসব ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর’ (ইইডি) চলতি মাসেই এসব ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করতে চলেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যদের চাহিদা ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে প্রতিটি আসনে ১০টি করে মোট তিন হাজার বিদ্যালয় এ প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হবে। এটিকে বর্তমান এমপিদের জন্য ‘নির্বাচনী বরাদ্দ’ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।’’ এ ধরনের নির্বাচনী বরাদ্দ যে বিদ্যমান সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের সময় নিজেদের প্রচার সুবিধার ব্যবস্থা, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক হতে পারে না। শুধু তাই নয়, এই কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের একটা বড় অংশ যে দুর্নীতির মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের পকেটে যাবে, এতেও কোনো সন্দেহ নেই। এই দুর্নীতি যাতে সরকারের পক্ষে সম্ভব না হয় এজন্য ভারতের আগামী সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের বরাদ্দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পার্টি ও মহল সোচ্চার হয়েছে। কিন্তু এখানে এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ নেই। সরকারের দমন-পীড়নের মুখে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলার কোনো ব্যাপার নেই। কাজেই সরকার বেশ প্রকাশ্যেই নিজেদের দলীয় লোকদের জন্য এই প্রচার সুবিধা ও দুর্নীতির ব্যবস্থা করছে। বাংলাদেশে সরকারের লোকরা যে কতভাবে দুর্নীতি করছে তার তালিকা দেয়া এখানে সম্ভব নয়। তার প্রয়োজনও নেই। কারণ এসব দুর্নীতি এত প্রকাশ্যে ও বেপরোয়াভাবে হচ্ছে যে এসব এখন সাধারণভাবে জনগণের জানা। এই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা ও মামলায় তার সাজা নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা থেকে পাতি নেতারা যেভাবে ‘holier-than-thou’ ভাব ধারণ করে লম্ফঝম্ফ করছেন, একে অশ্লীল ও হাস্যকর ছাড়া আর কী বলা যায়?
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল