Sunday, February 15, 2026

গাজা নিয়ে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজকদের বিতর্কিত মন্তব্য, সরে দাঁড়ালেন অরুন্ধতী রায়

ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায় ফিলিস্তিনের গাজা ঘিরে আয়োজকদের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি জানান, উৎসবের জুরি প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ভিম ভেন্ডার্সের মন্তব্যের প্রতিবাদে তিনি উৎসবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে গাজা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ভেন্ডার্স বলেছিলেন, চলচ্চিত্র ‘রাজনীতির বাইরে থাকা’ উচিত।

বিবৃতিতে অরুন্ধতী বলেন, বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে ভেন্ডার্স ও জুরির অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া আমাকে ‘স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ’ করেছে।

অরুন্ধতীর উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার জিতে। এবারের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে ১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভজ ইট দোজ ওয়ানজ’-এর পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ দেখানোর কথা ছিল। অরুন্ধতী চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

অরুন্ধতী বলেন, ভেন্ডার্স ও জুরির অন্য সদস্যদের ‘বিবেকবর্জিত’ মন্তব্য তাঁকে ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে’ নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির ইসরায়েলের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভেন্ডার্স বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে আমরা আসলেই ঢুকতে পারি না।’ তিনি নির্মাতাদের ‘রাজনীতির পাল্টা ভারসাম্য’ রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।

জুরির আরেক সদস্য ইভা পুশ্চিন্সকা বলেন, এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নিতে জুরির কাছে প্রত্যাশা করা ‘কিছুটা অন্যায্য’।

বিবৃতিতে অরুন্ধতী বলেন, ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়, তাঁদের এ মন্তব্য সত্যিই হতবাক করে দেওয়ার মতো ব্যাপার।’

গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েল রাষ্ট্রের গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেন অরুন্ধতী রায়।

অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নির্মাতা ও শিল্পীরা যদি দাঁড়িয়ে এটা বলতে না পারেন, তাহলে তাঁদের জেনে রাখা উচিত, ইতিহাস তাঁদের বিচার করবে।’

অরুন্ধতী ভারতের বিখ্যাত জীবিত লেখকদের একজন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীব্র সমালোচক এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থক।

গাজা ইস্যুতে এবারের উৎসব কর্তৃপক্ষের অবস্থানের প্রতিবাদে মিসরের দুই প্রয়াত নির্মাতার দুটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র দুটি হলো আতিয়াত আল আবনুদির ‘স্যাড সং অব তোহা’ ও হুসেন শরিফের ‘দ্য ডিজলোকেশন অব আম্বার’।

এক বিবৃতিতে উৎসবের এক নারী মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ‘বার্লিনালে (বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব) এসব সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়।’

এ মুখপাত্র আরও বলেন, উৎসবে ‘আমরা তাঁদের স্বাগত জানাতে পারছি না বলে দুঃখিত। তাঁদের উপস্থিতি উৎসবের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করত।’

রাজনীতি থেকে দূরে থাকা

বার্লিনালের ঐতিহ্যগতভাবে সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল আয়োজনের খ্যাতি আছে, কিন্তু এবারের আসরে এখন পর্যন্ত অনেক তারকাকে সমসাময়িক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে অবস্থান গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

‘সানি ড্যান্সার’ ছবির মার্কিন অভিনেতা নিল প্যাট্রিক হ্যারিসকে শুক্রবার প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি আপনার শিল্পকে রাজনৈতিক বলে মনে করেন? এটি কি ‘ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’ সাহায্য করতে পারে?

উত্তর হ্যারিস বলেন, আমি ‘অরাজনৈতিক কাজ করতে আগ্রহী।’ আমি এমন কাজ করতে চাই, যা আমাদের ‘বিকটভাবে অ্যালগরিদমভিত্তিক ও বিভক্ত পৃথিবীতে’ মানুষের মধ্যে সংযোগ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

এবারের আসরে সম্মানসূচক ‘গোল্ডেন বিয়ার’ বিজয়ী মালয়েশীয় অভিনেত্রী মিশেল ইয়োকে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, সেখানকার পরিস্থিতির ‘সবকিছু বুঝি, আমি এমনটি দাবি করতে পারি না।’

আগের বিতর্ক

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব এর আগেও গাজা প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্কিত হয়েছে।

২০২৪ সালে এই উৎসবের সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছিল ‘নো আদার ল্যান্ড’। প্রামাণ্যচিত্রটি ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনপদ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নিয়ে নির্মিত।

জার্মানির সরকারি কর্মকর্তারা সে বছরের পুরস্কার অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ছবির পরিচালক এবং অন্যদের গাজা–বিষয়ক বক্তব্যকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।

হামাসের যোদ্ধারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায়। এতে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন। জবাবে গাজায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায়
ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায়। ছবি: লেখকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে

ভারতকে ট্রাম্পের বাণিজ্যসুবিধায়ও মাথাব্যথা বাড়ল মোদির

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৩ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, ভারতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর এ ঘোষণায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পোস্টে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এ চমৎকার ঘোষণার জন্য ১৪০ কোটি ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনেক ধন্যবাদ।’

কিন্তু ওয়াশিংটন থেকে এ সপ্তাহে আসা নতুন ঘোষণা মোদির আগের আনন্দে জল ঢেলে দিয়েছে। ভারতের ওপর আরোপ করা শুল্ক ৫০ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে এনেছে ওয়াশিংটন। এতে করে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এখন এশিয়ার অন্যান্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে এক কাতারে নেমে এসেছে। কিন্তু এ সুবিধার কারণে ভারতের বাণিজ্য ও বিদেশনীতি–সংক্রান্ত সম্ভাব্য খরচ বাড়ছে; যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে ভারত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ বাড়বে। এটা নিয়ে ভারতে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের কৃষকদের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণে মার্কিন পণ্য আমদানি হলে তাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচিত চুক্তিতে সই না করার দাবিতে তাঁরা ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন।

ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, চুক্তির শর্তগুলো দেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে একধরনের বড় আপোস। এতে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এবং ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালার ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার সদস্যরা চুক্তির নতুন শর্ত নিয়ে মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দুই নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পর কয়েক দিন একধরনের উচ্ছ্বাস ও আশাবাদের জোয়ার দেখা গিয়েছিল। গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে তা দ্বিগুণ করা হয়। ফলে দুদেশের সম্পর্কে একধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। কিন্তু ট্রাম্প ও মোদির সাম্প্রতিক পোস্টের পর সেই অচলাবস্থার অবসান হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল।

নতুন চুক্তির শর্ত ঘোষণার পর ভারতের শেয়ারবাজারের সূচক ৩ শতাংশ এবং ডলারের বিপরীতে রুপির মানও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে দেশটির মাহিন্দ্রা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনীশ শাহ এক বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘এ চুক্তি ভারতের প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় এক অর্থবহ গতি যোগ করেছে।’

ভারতের প্রবৃদ্ধি আগে থেকে বেশ ভালো ছিল। অতিরিক্ত শুল্কের চাপে পড়ে গত কয়েক মাসে মোদি সরকার কর ব্যবস্থা ও শ্রম আইন সহজ করতে একগুচ্ছ সংস্কার পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে। রেটিং সংস্থা ফিচ সলিউশনসের ইউনিট ‘বিএমআই’ পূর্বাভাস দিয়েছে, এসব উদ্যোগ ভারতকে ‘আরও একটি প্রান্তিকে দুর্দান্ত অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের দিকে ক্রমে এগিয়ে নিচ্ছে।’

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় মধ্যস্থতাকারীরা একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। এতে দুপক্ষের অন্তর্বর্তী চুক্তির বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, তাঁর আশা নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন আগামী মার্চ মাসের কোনো এক সময় প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিতে সই করবে।

যৌথ বিবৃতিতে রাশিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ভারতকে রুশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনা বন্ধ করতে হবে, এমন কোনো কথাও ছিল না। সবচেয়ে কাছাকাছি যে ইঙ্গিতটি পাওয়া যায় তা হলো, ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সমন্বয়ের’ প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরে ভারত ৫০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার যে অঙ্গীকার করেছে, তাতে জ্বালানি পণ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে হোয়াইট হাউসের ফ্যাক্ট শিটে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার ব্যাপারে ভারতের অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কিন্তু ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী এ–সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেননি।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক জোট এড়িয়ে চলার দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্যও দেশটির রয়েছে।

শুধু তেল কেনা-সংক্রান্ত বক্তব্যই ভারতীয়দের উদ্বিগ্ন করেনি। ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কৃষিপণ্য এবং আরও কয়েকটি খাতে ভারত শুল্ক কমাবে। কৃষিপণ্যের মধ্যে ‘তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, সয়াবিন তেলও’ রয়েছে।

কিন্তু হোয়াইট হাউসের ফ্যাক্ট শিটে ফল ও সয়াবিন তেলের মাঝখানে চুপিসারে এক শব্দগুচ্ছ ঢোকানো হয়। তা হলো ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’। ভারতের কাছে এই  দুটি অতিরিক্ত শব্দের গুরুত্ব অনেক। এখানে ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’ বলতে বিভিন্ন ধরনের শুকনো দানাশস্য বোঝানো হয়েছে; যা ডাল রান্নার মূল উপাদান ও দেশটির খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের প্রধান উৎস।

সম্প্রতি ভারতের কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বিভিন্ন ধরনের ডালে স্বনির্ভরতা নিয়ে একটি নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে ডাল আমদানি করা আনন্দের বিষয় নয়; বরং লজ্জার।’

চৌহান একই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকে সমর্থন করে বলেন, এটি এমন একটি চুক্তি; যা ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখবে।

গত বুধবার হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফ্যাক্ট শিটে পরিবর্তন দেখা গেছে। সেখান থেকে ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’ শব্দগুচ্ছ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আরও কিছু বিষয় সম্পাদনা করা হয়েছে। আগের নথিতে বলা হয়েছিল, ভারত ৫০ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের মার্কিন পণ্য কেনার বিষয়ে ‘অঙ্গীকার করেছে’। পরে তা বদলে লেখা হয়েছে, ভারত তা কেনার ‘ইচ্ছা প্রকাশ করেছে’।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, শ্রমিক ও শিল্প খাতের জন্য স্পষ্ট বিজয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সব বাণিজ্য অংশীদার তাদের চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষা করবে।’

যুক্তরাষ্ট্র সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি  
যুক্তরাষ্ট্র সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বড় ব্যবধানে হেরেছেন চরমোনাই পীরের তিন ভাই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় বেশ সরব থাকলেও ভোটের ফলাফলে সাফল্য দেখাতে পারেনি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইসলামী আন্দোলন ২৫৩ আসনে প্রার্থী দিলেও জিতেছে মাত্র একটিতে। এ ছাড়া কোনো আসনেই তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। চরমোনাই পীর ও দলের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমের তিন ভাই এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জিততে পারেননি একজনও।

চরমোনাই পীরের ভাই দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে দ্বিতীয় হলেও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। বরিশাল-৫ আসনে তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট। অন্যদিকে ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট পেয়ে আসনটিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।

অন্যদিকে বরিশাল-৬ আসনে ফয়জুল করীম তৃতীয় হয়েছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান ৮১ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৩৩ ভোট। আর হাতপাখা প্রতীকের ফয়জুল করীম পেয়েছেন ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট।

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে প্রার্থী ছিলেন চরমোনাই পীরের আরেক ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব এবং বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান।

প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী, সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।

পীরের আরেক ভাই মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ ঢাকা-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন। তিনি ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। এই আসনে মোট ভোট পড়েছে ৪৫ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ৭৭ হাজার ৩৬৭ ভোট পেয়ে এই আসনে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী তানভীর আহমেদ পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৪৪৭ ভোট। আর হাতপাখা প্রতীকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ পেয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ৫১৮ ভোট। এতে তাঁর জামানতও রক্ষা হয়নি।

ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর ফয়জুল করীম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া স্ট্যাটাসে বরিশাল-৫ আসনে নিজের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা তুলে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

এবারের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের কয়েকটি আসনে আলোচনায় ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। তাঁদের মধ্যে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে এই দলে যোগদান করেন সাবেক সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী ও পটুয়াখালী--৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে বিএনপি থেকে যোগদানকারী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ও বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে মাওলানা অলি উল্লাহ। তবে তাঁদের মধ্যে বরগুনা-১ আসনে অলি উল্লাহ ছাড়া সবাই হেরেছেন। পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির এ বি এম মোশাররফ হোসেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন ৭০ হাজার ১২৭ ভোট। অপরদিকে পিরোজপুর-৩ আসনে বিএনপির রুহুল আমীন দুলাল ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এখানে এনসিপির প্রার্থী শামীম হামিদী (শাপলা কলি) ৩৬ হাজার ৬১৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং রুস্তম আলী ফরাজী (হাতপাখা) ৩৫ হাজার ৯৬৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

১৯৮৭ সালে দলটি প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেল ইসলামী আন্দোলন।

বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণার মাঠে বেশ সরব থাকলেও ভোটের ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এর পেছনে মূল কারণ ছিল জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের জোট ভেঙে যাওয়া। দুই দলের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার বড় সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, দেশে চরমোনাই দরবারের সামাজিক প্রভাব রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ও উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। তবে এই প্রভাব এখনো কার্যকর ভোটব্যাংকে রূপ নিতে পারেনি।
রফিকুল আলম আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলনের ভোটভিত্তি এখনো সীমিত পরিসরেই রয়ে গেছে। তার ওপর বিএনপি ও জামায়াতের মতো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এই সীমিত ভোটব্যাংক নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তরুণ ও শহরের ভোটারদের সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক ভাষা ও আবেগপ্রবণ সংযোগ এখনো দৃঢ়ভাবে তৈরি হয়নি, যা সংসদীয় রাজনীতিতে বড় পরিসরে সমর্থন অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে কাজ করছে।

সৈয়দ ফয়জুল করীম, এছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের ও সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ (বাঁ থেকে)
সৈয়দ ফয়জুল করীম, এছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের ও সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ (বাঁ থেকে) ছবি: সংগৃহীত

হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল বিক্ষোভ করবে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য

নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা এবং দেশজুড়ে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।

আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই কর্মসূচির কথা জানান ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘নির্বাচন–পরবর্তী এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এটার প্রতিবাদ করতে চাই।’ সহিংসতা না থামলে তাঁরা রাজপথে আরও কর্মসূচি দেবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

দেশজুড়ে ৩২টি আসনে ফলাফল গণনায় কারচুপি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের জোটের ৩২ প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীরা এমন বক্তব্য দিয়েছেন। কিছু কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। কোথাও কোথাও ভোট গণনায় সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না। অনেক জায়গায় ফলাফল শিটে কাটছাঁট, পেনসিলে লেখা, কোথাও ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর এবং কোথাও এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়াই ফল প্রকাশ করা হয়েছে।’

৩২ আসনে ফলাফল কারচুপির অভিযোগ তুলেছে ১১ দলীয় ঐক্য। এগুলোর ফলাফল পুনরায় গণনা নিয়ে আইনের দারস্থ হবেন বলেও জানান হামিদুর রহমান আযাদ।

ভোট গ্রহণের সময় তুলনামূলক সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলেও অনেক জায়গায় ভয়ের পরিবেশ ছিল বলে অভিযোগ করেন হামিদুর রহমান আযাদ। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এখানে জাল ভোট হয়েছে প্রচুর, কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়েছে। কোথাও কোথাও হুমকি, সন্ত্রাস, মারামারি অথবা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ব্রিফিংয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিক্ষোভ কর্মসূচির কথা জানান। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে
১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিক্ষোভ কর্মসূচির কথা জানান। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে। ছবি: প্রথম আলো

সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে: জামায়াত আমির

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।’

আজ রোববার দুপুরে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

সড়ক দুর্ঘটনা ও অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া দলের দুই কর্মীর স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন জামায়াতের আমির।

শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশটা তো সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে ইনশা আল্লাহ। সংসদে একটা দল সরকারি দল হিসেবে, আরেকটা দল বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় কোনো গাড়ি চলে না, মিনিমাম দুই চাকা লাগে। সরকারি দল যদি ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করে, আমাদের সহযোগিতা থাকবে। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে আমরা তো জনগণের পক্ষে অবস্থান নেব। আমাদের অবস্থান হবে ক্লিয়ার।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘তারেক সাহেব কী নিয়ে আলাপ করবেন, এটা উনার মনের ব্যাপার। আমি তো উনার মনের ব্যাপার বলতে পারব না। উনি যদি আমার সঙ্গে আলাপ করেন, দেশ এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইনশা আল্লাহ আমরা আলাপ করব।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংসদ চলতে হলে তো সরকারি দল ও বিরোধী দল লাগবে। সরকারি দল, বিরোধী দল হাতে হাত রেখে চলবে, যদি দেশ সঠিক পথে চলে। যদি বেঠিক পথে চলে, তাহলে ওই চাকা চালাব না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি তো এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এরা তো এখন ভূগোলে নাই। কেন নাই? তারা (জাতীয় পার্টি) তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন তারা শুধু ভোটের জগৎ থেকে যায়নি, জনগণের মন থেকেও উঠে গেছে। এটা ওই কারণে—তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি। জামায়াতে ইসলামী ওই ভুল করবে না।’

এর আগে রোববার সকালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায় জামায়াত সমর্থক শাহ আলমের স্মরণসভায় তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সম্মান করা আমার ইমানি দায়িত্ব। কৃষক-শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করে হালাল রুজি উপার্জন করেন। তাঁদের ঘামের গন্ধ আমার কাছে আতরের মতো মনে হয়। অনেক সময় দেখি কেউ কেউ গরিব মানুষের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আড়ালে গিয়ে হাত মুছে ফেলেন। কিন্তু আমি তাঁদের সেই ঘামকে সম্মানের চোখে দেখি, ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুই শ্রেণির মানুষের সান্নিধ্যে বিশেষ আনন্দ পাই। একদল হলো নিষ্পাপ শিশু, যাদের কাছে গেলে ফেরেশতার সান্নিধ্যে থাকার অনুভূতি হয়। আরেক দল হলো দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেন।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি কোনো ধনী পরিবারে জন্ম নেইনি। আল্লাহর রহমতে আমি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই কৃষক-শ্রমিকদের সম্মান না করলে তা আমার বাবাকে অপমান করার শামিল হবে।’ স্মরণসভায় তিনি শাহ আলমের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন।

প্রসঙ্গত, ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে যাওয়ার পথে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে জামায়াতের সমর্থক শাহ আলম (৫০) মারা যান।
ইটনার স্মরণসভা শেষে জামায়াতের আমির সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালামের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিকলী উপজেলার ছাতিরচরে যান। এর আগে সকাল ৮টার দিকে তিনি সড়কপথে কিশোরগঞ্জ শহরে পৌঁছান।

৩ ফেব্রুয়ারি কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভা শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালাম (৬০) নিহত হন।
জামায়াতের আমিরের কিশোরগঞ্জ সফরের সময় তাঁর সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি সামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমির মো. রমজান আলী, জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির মোসাদ্দেক ভূঞা, কাপাসিয়ার নবনির্বাচিত এমপি সালাউদ্দিন আইয়ুবী, ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের মজলিশে শুরা সদস্য রোকন রেজা শেখ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

স্মরণসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায়
স্মরণসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায়। ছবি: সংগৃহীত

হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল by মইনুল ইসলাম

প্রকাশ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ঃ স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগস্টের ২৯ তারিখে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।

কমিটিকে সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে বাংলাদেশের অর্থনীতির হালহকিকত গভীরভাবে পর্যালোচনা করে তিন মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কমিটি ১ ডিসেম্বর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের শ্বেতপত্রটির খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। শ্বেতপত্রটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ’ (ডিসসেকশান অব আ ডেভেলপমেন্ট ন্যারেটিভ)। প্রায় ৩৯৬ পৃষ্ঠার খসড়া প্রতিবেদনে রয়েছে ২৪টি অধ্যায়। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দাবি করেছেন যে হাসিনার শাসনামলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ‘চামচা পুঁজিবাদ’ (ক্রনি ক্যাপিটালিজম) থেকে সরাসরি ‘চোরতন্ত্রে’ (ক্লেপ্টোক্রেসি) রূপান্তরিত হয়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা ভূমিধস বিজয় অর্জন করেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের লাগামহীন তৎপরতা শুরু করেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন। কেউ কেউ বলেন যে এই প্রক্রিয়ায় সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী উৎসাহিত করতেন। এই শ্বেতপত্র হাসিনার কথিত উন্নয়ন বয়ানের আড়ালে লুকানো ‘অবিশ্বাস্য লুটপাটতন্ত্রের একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদের দলিল’ হিসেবে টিকে থাকবে। শ্বেতপত্রের একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করলে নিচের বিষয়গুলো প্রধানভাবে উঠে আসবে। 

এক.

শ্বেতপত্র কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ভৌত অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। শ্বেতপত্রে খাতওয়ারি লুণ্ঠনের তথ্য-উপাত্ত উদ্‌ঘাটন করে লুণ্ঠিত অর্থের প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়েছে।

শ্বেতপত্রে মোট ২৮টি দুর্নীতির পদ্ধতির মাধ্যমে লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণে নিয়ে আসা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত ও কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। লুটেরা রাজনীতিবিদদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের খেলোয়াড়, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঠিকাদার ও মধ্যস্বত্বভোগী, হাসিনার আত্মীয়স্বজন এবং ‘ইনফ্লুয়েন্স প্যাডলার’ ও ‘হুইলার-ডিলাররা’ এই লুটপাটতন্ত্রের প্রধান চরিত্র।

এই লুটেরারা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশের নির্বাহী বিভাগ, সিভিল প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো, সরকারি রাজস্ব আহরণ বিভাগগুলো ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণকারী বিভাগগুলোকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফায়দা হাসিলের অংশীদার করে ফেলেছে। দেশের বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণকে তারা দুর্বল করে ফেলেছে। ধস নামিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনকে তছনছ করে দিয়েছে।

দুই.

কানাডায় ৪৭ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। দুবাইয়ে ৯৭২ জন বাংলাদেশির রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি রয়েছে। মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কার্যক্রমে ঘরবাড়ি কিনেছেন ন্যূনতম ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে প্রতিবছর গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তিন.

সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামালের নির্দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৪ সাল থেকে ‘উপাত্ত কারসাজি’–এর কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিবছর জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাথাপিছু জিডিপি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য দেশের মোট জনসংখ্যাকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে দেশের রপ্তানি আয়কে। মূল্যস্ফীতির হারকে সব সময় কমিয়ে দেখানো হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যাকে কম দেখানো হয়েছে, যাতে দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের সাফল্যকে বাড়িয়ে দেখানো যায়।

দেশের জনগণের জন্মহার ও মৃত্যুহারকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো যায়। একই সঙ্গে দেশের ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’কে কম দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হচ্ছে বলে প্রচার করা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আগের বছরে সাবেক সরকার যতখানি দেখিয়েছিল, তার চেয়ে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে।

চার.

দেশের সাতটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এর আনুমানিক পরিমাণ ৮০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এই মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-মাওয়া-যশোর-পায়রা রেলপথ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প, পায়রা বন্দর প্রকল্প ও মাতারবাড়ী কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর যথাযথ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ ও ‘কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস’ না করার কারণে এই ৭০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত সৃষ্টি হয়েছে।

পাঁচ.

দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ পৌনে সাত লাখ কোটি টাকা। শ্বেতপত্র কমিটি প্রকৃত খেলাপি ঋণকে ‘ডিসট্রেসড অ্যাসেট’ নামে অভিহিত করেছে। শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে যে এই ডিসট্রেসড অ্যাসেট দিয়ে সাড়ে ১৩টি মেট্রোরেল কিংবা সাড়ে ২২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। অবৈধ হুন্ডি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ লাখ কোটি টাকা। ১০টি ব্যাংক ‘টেকনিক্যালি দেউলিয়া’ হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত আর বাকি আটটা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এগুলোতে তারল্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

বড় ধরনের ঋণ লুটপাটের শিকার হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও বেসিক ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক ও অন্য শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকঋণ, প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে লুটেরারা।

ছয়.

দেশের শেয়ারবাজার থেকে কমপক্ষে ২৭ বিলিয়ন ডলার সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে। নানা রকম কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে এক ট্রিলিয়ন টাকার (এক লাখ কোটি) বেশি লুটপাট করেছে কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি। ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজারের পরিকল্পিত ধসের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির রিপোর্টকে কোনো পাত্তা দেওয়া হয়নি। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হারিয়ে ফেলেছে।

সাত.

দেশের জনগণের আয়বৈষম্য-পরিমাপক জিনি সহগ ২০২২ সালে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে যে ৭২টি দেশ তাদের আয়বৈষম্য রিপোর্ট করেছে, তার মধ্যে এর চেয়ে বেশি জিনি সহগের মান ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও পানামা—এই তিন দেশে বিদ্যমান। তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের সম্পদবৈষম্যের পরিমাপক জিনি সহগ, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালে যেটা শূন্য দশমিক ৮২ থেকে শূন্য দশমিক ৮৪–এ পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখন একটি মারাত্মক উচ্চ আয়বৈষম্য ও সম্পদবৈষম্যের দেশ।

আট.

দেশের মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির হারকে ১৯৯৫ সাল থেকে কয়েক শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এ জন্য উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের অনেকে বাংলাদেশের এই জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ‘প্যারাডক্স’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। স্বৈরশাসকের পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাবেক সরকারের প্রক্ষেপিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে কমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে এসে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।

নয়.

আনুমানিক ৭৭ হাজার কোটি থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের কবজায় চলে গেছে বলে শ্বেতপত্রে জানানো হয়েছে। ৭০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজনীতিবিদদের করায়ত্ত হয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই আমলা ও রাজনীতিবিদদের স্ত্রী-সন্তানেরা পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে।

ড. মইনুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল

যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ‘কারসাজিতেই’ কি ইরানে রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ, কী বলছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটনই কৌশল করে ইরানে ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে রাতারাতি ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক দরপতন হয়। হঠাৎ করে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের জেরে সৃষ্ট আর্থিক সংকট গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানে বিক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।

রাজধানী থেকে সেই বিক্ষোভ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। জানুয়ারি মাসজুড়ে চলা ওই বিক্ষোভ এতটাই তীব্র রূপ নিয়েছিল যে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটিতে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী বিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল।

বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর। ইরানে অনেক দিন ধরেই মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বরে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতন সাধারণ ইরানিদের ওপর বিশাল বড় আঘাত হয়ে আসে।

প্রতিবাদ জানাতে তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। দ্রুত ওই বিক্ষোভ ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভের সময় ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেন-এজেই বলেছিলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শত্রুদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছেন।’

বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার কঠোর বলপ্রয়োগ করেছিল। পশ্চিমা বিশ্বভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বিক্ষোভে ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৫০ শিশুও রয়েছে।

‘ডলার–ঘাটতি’ কী

ডলারের ঘাটতি বলতে বোঝায় সেই পরিস্থিতি, যখন কোনো দেশের কাছে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য পর্যাপ্ত মার্কিন ডলার থাকে না।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে অন্যতম প্রধান মুদ্রা মার্কিন ডলার। বিশেষ করে তেল, যন্ত্রপাতি ও ঋণ পরিশোধের জন্য ডলার ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ, যেকোনো দেশের জন্য নিয়মিত ডলারের জোগান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রপ্তানি কমে গেলে এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ অবরুদ্ধ হলে ডলারের মারাত্মক সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রার মান দুর্বল হয়ে যায়, আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে পায়, সঙ্গে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে পড়ে।

জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ রেজা ফারজানেগান বলেন, ‘ইরানে ডলারের ঘাটতি তৈরি করা হয়েছিল একসঙ্গে দুটি প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে। সেগুলো হলো তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করা।’

ইরানের অর্থনীতি তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল বিক্রি থেকে রাজস্ব আয় কমে গেলে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

রেজা ফারজানেগান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানকে ইরানের সঙ্গে ডলারে লেনদেন করার ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে ইরানের বিদেশে থাকা বিদ্যমান রিজার্ভ আটকে গেছে এবং নতুন ডলার দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এটি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওই নিষেধাজ্ঞায় বলেছে, কেউ ইরানের তেল কিনলে বা বিক্রি করলে তাকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট কী বললেন

ইরানকে কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে—গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসে একটি শুনানিতে এ প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মুদ্রার মান দ্রুত নিম্নমুখী করার কৌশল নিয়েছিল।

বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা (অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে) যা করেছি, তা হলো দেশে ডলারের তীব্র ঘাটতি সৃষ্টি করা।’

মার্কিন অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ডিসেম্বরে আমাদের এই কৌশল চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন ইরানের একটি অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ধসে পড়ে...ইরানি মুদ্রা দ্রুত নিম্নমুখী হয়, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়। এর ফলে আমরা ইরানের মানুষকে সড়কে নেমে বিক্ষোভ–প্রতিবাদ করতে দেখেছি।’

ইরানের নেতারা পাগলের মতো দেশের বাইরে অর্থ পাঠাচ্ছিলেন বলেও দাবি করেন বেসেন্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ইরানি নেতৃত্ব উন্মত্তভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাঠাচ্ছে। তারা আসলে বিপদ বুঝে পালিয়ে যাওয়ার ধান্দা করছে। এটা ভালো লক্ষণ, হয়তো তারা বুঝতে পেরেছে তাদের শেষ সময় খুবই কাছে।’

এর আগে, গত মাসে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ফক্স নিউজের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেসেন্ট ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, কীভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানে সে সময় চলমান বিক্ষোভে ভূমিকা রাখছে।

বেসেন্ট বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অর্থ মন্ত্রণালয়কে ইরানের ওপর সর্বাধিক চাপ প্রয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তা কার্যকর হয়েছে। এ কারণে ডিসেম্বর মাসে তাদের অর্থনীতি ধসে পড়েছে। তারা আমদানি করতে পারেনি এবং প্রতিবাদে মানুষ সড়কে বিক্ষোভে নেমেছে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওই ডলার কারসাজির কারণে জানুয়ারিতে ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রার মান এতটাই পড়ে যায় যে ১ ডলার বিপরীতে ইরানি মুদ্রার বিনিময় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল।

এক বছর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যা ছিল, ১ ডলার সমান ৭ লাখ রিয়াল। গত বছরের তুলনায় ইরানে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানে বিক্ষোভের সময়ের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানে বিক্ষোভের সময়ের চিত্র। ছবি: কোলাজ/রয়টার্স

এপস্টেইন নথি প্রকাশে পদত্যাগ ও তদন্তের মুখে যেসব প্রভাবশালী

জেফরি এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথিগুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন তোলপাড়। নথিতে নিজের নাম থাকায় অস্বস্তিতে অনেক প্রভাবশালী। নথিতে নাম আসার পর এপস্টেইন-সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। অনুতপ্ত ধনকুবের বিল গেটস। কম পরিচিত অনেক প্রভাবশালীকে আবার নানা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুরু হয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নতুন নথিগুলো ৩০ লাখ পৃষ্ঠার। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এ নথিতে যৌন অপরাধী এপস্টেইনের বিশাল চক্রের তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে পর্দার আড়ালে অভিজাত সমাজের অনেকে কতটা ভয়ানক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রো খান্নার ভাষ্য, প্রকাশিত নথি মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

নথিতে বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে নাম এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ধনকুবের ইলন মাস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকসহ অনেকের। এর বাইরে প্রভাবশালী, কিন্তু কম পরিচিত যেসব ব্যক্তি নথিতে নাম আসার কারণে সমস্যার মুখে পড়েছেন, চলুন জেনে নেওয়া যাক তাঁদের পরিচয়।

বোরগে ব্রেন্ডে

বোরগে ব্রেন্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রধান। বয়স ৬০ বছর। তাঁর নাম এসেছে এপস্টেইন নথিতে। তিনি নরওয়ের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বোরগে নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এপস্টেইনের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

যদিও এপস্টেইনের অপরাধমূলক কাজকর্ম সম্পর্কে ‘পুরোপুরি অজ্ঞ’ ছিলেন বলে দাবি করেছেন বোরগে। এরপরও এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গভর্নিং বোর্ড। সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের আয়োজন করে এই বোর্ড।

থর্বজর্ন জাগল্যান্ড

থর্বজর্ন জাগল্যান্ড ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরে তিনি ইউরোপীয় কাউন্সিলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন জাগল্যান্ড। এই কমিটি প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার দিয়ে থাকে।

থর্বজর্নের নাম এসেছে এপস্টেইন নথিতে। নতুন প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর ব্যাপক ই-মেইল চালাচালি হয়েছিল। এর জেরে ‘দুর্নীতিতে জড়িত থাকার সন্দেহে’ থর্বজর্নের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে নরওয়ের পুলিশ।

মোনা জুল

৬৬ বছর বয়সী মোনা জুল নরওয়ের একজন কূটনীতিক। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে অসলো চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির আগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যে গোপন আলাপ হয়েছিল, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মোনা। মোনার স্বামী তেরজে রোড-লারসনও একজন কূটনীতিক এবং অসলো আলোচনার মধ্যস্থতাকারী।

মোনা-লারসন দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। এই দুজনের নামে ১ কোটি ডলার দিয়ে গেছেন এপস্টেইন। নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জর্ডানে নরওয়ের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মোনা। তবে এপস্টেইন নথি-সংশ্লিষ্ট কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলায় সাময়িক সময়ের জন্য ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

ডিন ক্যামেন

‘ফার্স্ট’ নামের রোবোটিকস প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী ডিন ক্যামেন। নতুন নথিতে এপস্টেইন ও তাঁর সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে ক্যামেনের ছবি রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে জড়িত থাকার দায়ে বর্তমানে ম্যাক্সওয়েল কারাগারে রয়েছেন। নথিতে নাম আসার পর ফার্স্টের পরিচালক বোর্ড থেকে ছুটি নিয়েছেন ডিন ক্যামেন।

ব্রাড কার্প

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান পল ভাইস। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৮ বছর ধরে চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রার্ড কার্প। তবে এপস্টেইন নথিতে নাম আসার পর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন এই আইনজীবী। নথিতে দেখা গেছে, নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে এপস্টেইনের বাড়িতে নৈশভোজের নিমন্ত্রণ পেয়ে কার্প তাঁকে লিখেছিলেন, ‘এই সন্ধ্যা কখনোই ভুলব না।’

মিরোস্লাভ লাইচাক

এপস্টেইন নথিতে নাম এসেছে স্লোভাকিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাইচাকের। নথিতে এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁকে বার্তা আদান-প্রদান করতে দেখা গেছে। কয়েকজন নারীর সঙ্গেও দেখা গেছে দুজনকে। সে সময় স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন লাইচাক।

ক্যারোলাইন ল্যাং

এপস্টেইন নথিতে নাম আসার পর চলচ্চিত্র প্রযোজকদের একটি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন ফরাসি চলচ্চিত্র প্রযোজক ও সাবেক অভিনেত্রী ক্যারোলাইন ল্যাং। তিনি বলেছেন, তিনি ও এপস্টেইন শিল্পকর্ম কেনার একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো বিনিয়োগ করেননি।

জর্জ মিশেল

উত্তর আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ শাসন নিয়ে তিন বছর ধরে চলা সংকটের শেষ হয়েছিল ১৯৯৮ সালের একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। ওই চুক্তি-সংশ্লিষ্ট আলোচনায় ভূমিকা রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিনেটর জর্জ মিশেল। এপস্টেইন ফাইলে তাঁর নাম আসার পর উত্তর আয়ারল্যান্ডের কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল পিস, সিকিউরিটি অ্যান্ড জাস্টিস থেকে মিশেলের নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এপস্টেইন নথি প্রকাশে পদত্যাগ ও তদন্তের মুখে যেসব প্রভাবশালী

গণভোটে দেওয়া জনরায় উপেক্ষা করলে দায়ভার বিএনপিকে নিতে হবে: ১১–দলীয় ঐক্য

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে জুলাই সনদ অনুসরণ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে দেওয়া জনরায় উপেক্ষা করলে দায়ভার বিএনপিকে নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এ জোটের নেতারা।

শনিবার রাত সাড়ে আটটায় রাজধানীর মগবাজার জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এই হুঁশিয়ারি দেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

উল্লেখ্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে। ফলে সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জুলাই সনদে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে উচ্চকক্ষ গঠনে পিআর পদ্ধতির অনুসরণ করা হবে কি না, ব্রিফিংয়ে সেটি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংসদের উচ্চকক্ষ পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট (দ্বিমত)’ দিয়েছিল। আবার গণভোটে যাতে ‘না’ জয়যুক্ত হয়, সে জন্য দলটি বিভিন্নভাবে ক্যাম্পেইন করেছে। কিন্তু যেহেতু ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে, এখন দলটি উচ্চকক্ষ গঠনে জুলাই জাতীয় সনদ অনুসরণ না–ও করতে পারে।

তবে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পরে সব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাতিল হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারেই সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে।

হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার পরে জনগণকে উপেক্ষা করে কিছু করলে সেই দায়ভার বিএনপিকে নিতে হবে। জনগণ সেই সিদ্ধান্ত মানবে না।

প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটি বৈঠক করে। বৈঠকের বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক স্বার্থে যখন যে ভূমিকা রাখা উচিত, ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সংসদে ও সংসদের বাইরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই ভূমিকা পালন করবে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক বলেন, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেহেতু নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করেছে, পরে অভিযোগ থাকা আসনের বিষয়ে তাঁরা আইনের আশ্রয় নেবেন।

এ সময় নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন স্থানে অনেক নারীকে আহত করা হয়েছে উল্লেখ করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আহত হয়ে অনেকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশে নৈরাজ্য আবার তৈরি হয় কি না, সেই প্রশ্ন এখন জনমনে তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পুরোনো রাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে আমরা বেরোতে না পারলে নতুন বাংলাদেশের আশা স্তিমিত হয়ে যাবে।’

ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। মগবাজার, ঢাকা; ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। মগবাজার, ঢাকা; ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: প্রথম আলো

যাদুকাটা নদীর তীরে শিমুলবাগানে আজ বসন্ত উৎসব by খলিল রহমান

‘বসন্তের ফুল যত, যাবো মোরা দুজনে কুড়াতে...’। আজ পয়লা ফাল্গুন, বসন্তকাল। শিমুলগাছ ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। ঝরা ফুলে লাল হয়ে আছে সবুজ ঘাসের জমিন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানের এমন দৃশ্য মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। বসন্তকে বরণ করে নিতে এখানে আজ দিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পশ্চিম পাড়ে মানিগাঁও এলাকায় এই শিমুলবাগানের অবস্থান। যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে থাকা এই বাগান এখন অনেকের কাছে প্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। এখানে এলে একই সঙ্গে হাওর, নদী, পাহাড়ের দেখা মেলে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি ২০২৩ সাল থেকে সুনামগঞ্জের চোখজুড়ানো এই শিমুলবাগানে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে আসছে।

জেলা সংস্কৃতি কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী জানালেন, বেলা ১১টায় উৎসবের উদ্বোধন করেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সই গো...’ গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এবার উৎসবে সুনামগঞ্জের প্রায় ২০০ শিল্পী অংশ নিয়েছেন। সংগীত, নৃত্য, কবিতা, আদিবাসী ও পাহাড়ি নৃত্য, বাউল গানসহ লোক–ঐতিহ্যের সব আয়োজন জমে উঠেছে উৎসবে।

বসন্তবরণে শিমুলবাগান সেজেছে নতুন রূপে। বাগানজুড়ে গাছের ডালে থোকা থোকা ফুল, পাখির কলরব। পাশেই নদীর কলতান। ফুল, পাখি আর বসন্তের হাওয়ায় মন উদাস হয়ে ওঠে। শিমুলবাগানে ফুল ফোটার অপেক্ষায় থাকেন অনেকে। কেউ কেউ অপেক্ষায় থাকেন পয়লা ফাল্গুনের। বাসন্তী সাজে ছুটে আসেন যাদুকাটা নদীর তীরের এই শিমুলবাগানে। কেউ আসেন পরিবার নিয়ে, কারও সঙ্গে থাকে প্রিয় মানুষ। কেউবা আবার একা এসে নিজেকে খোঁজেন প্রকৃতির মধ্যে।

বিশেষ এই দিন ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা আসেন। বাগানে ঘুরে বেড়ান, ছবি তোলেন। তরুণেরা দল বেঁধে গানে মাতেন। শাহ আবদুল করিম, হাছন রাজা, দুর্বিন শাহের গানের সুর ছড়িয়ে পড়ে বাগানজুড়ে। কেউ কেউ গাছের ছায়ায় প্রিয় মানুষের হাত ধরে উদাস হন। কেউ আবার নিরিবিলি বসে সময় কাটান, ঝরে পড়া ফুল কুড়ান। ভালোবাসার গল্পে কাটে তাঁদের সকাল-দুপুর। শুধু বড়রা নন, শিশুরাও আসে শিমুলবাগানে। আনন্দে মাতে তারা। দৌড়াদৌড়ি, ঘোড়ায় চড়া, দোলনায় দোল খাওয়া, পাহাড় দেখা—সবই চলে।

স্থানীয় বাসিন্দা, কবি ও আলোকচিত্রী অমিয় হাসান জানালেন এই বাগান গড়ে ওঠার কথা। ২০০১ সালে এই বাগান গড়ে তোলেন এলাকার একজন বৃক্ষপ্রেমী, সমাজকর্মী প্রয়াত জয়নাল আবেদীন। তাঁর উত্তরসূরিরা এই বাগানের নাম দিয়েছেন ‘জয়নাল শিমুল বাগান’। ৩০ একর জায়গাজুড়ে এই বাগানে রয়েছে প্রায় তিন হাজার গাছ। বলা হয়, এটি দেশের সবচেয়ে বড় শিমুলবাগান। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ফুল ফুটতে থাকে। মাসজুড়েই গাছে ফুল থাকে। এরপর ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। একসময় গাছে নতুন পাতা গজায়, তখন সবুজ হয়ে ওঠে বাগান।

প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে রাখাব উদ্দিন জানান, বাগানে এ সময় অনেক পর্যটক আসেন। তাঁদের সুবিধার জন্য এখানে ক্যানটিন চালু করা হয়েছে, বিশ্রামের ব্যবস্থাও আছে। উপজেলা প্রশাসন থেকেও এখানে একটি গেস্টহাউস করা হয়েছে। বাগানের সৌন্দর্যবর্ধনসহ তাঁদের আরও কিছু কাজের পরিকল্পনা আছে।

বসন্ত উৎসবে সংগীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করছেন একদল শিল্পী। আজ শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে
বসন্ত উৎসবে সংগীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করছেন একদল শিল্পী। আজ শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে। ছবি: প্রথম আলো

ইসরায়েলের আগ্রাসন: গাজা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ‘বাধা’ সরানোর আহ্বান by আদ্দিস আবাবা

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া সব ‘প্রতিবন্ধকতা’ অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার ইথিওপিয়ায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি সরাসরি বক্তৃতা দেননি। তাঁর পক্ষে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তফা তাঁর (আব্বাস) লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শোনান।

লিখিত ওই বক্তব্যে আব্বাস বলেন, ‘চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে ইসরায়েলি দখলদারদের তৈরি করা সব বাধা দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর আমরা জোর দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, গাজার দৈনন্দিন শাসনকাজ

তদারকির জন্য গঠিত টেকনোক্র্যাট কমিটির কাজেও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বাধা রয়েছে। পরিষেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা, মানবিক সহায়তা সমন্বয় ও দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য এসব বাধা দূর করা জরুরি। হামাসের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েল ‘ক্রমাগত লঙ্ঘন’ করে চলেছে।

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এটি চুক্তির স্থায়িত্ব ও দ্বিতীয় ধাপের পূর্ণ বাস্তবায়নকে হুমকির মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এ যুদ্ধবিরতি গত মাসে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করলেও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সহিংসতা থামেনি। এ জন্য ইসরায়েল ও হামাস একে অপরকে দায়ী করছে।

গাজা যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো এ চুক্তির লক্ষ্য। গত নভেম্বরে জাতিসংঘ এ চুক্তির অনুমোদন দেয়। চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীকে পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে প্রত্যাহার এবং হামাসকে অস্ত্র হস্তান্তর করতে হবে। নিরাপত্তার জন্য সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে। 

মাহমুদ আব্বাস
মাহমুদ আব্বাস

৩০টি আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ জামায়াতের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলটির মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের এ অভিযোগ করেন।

দলটির অভিযোগ, জালিয়াতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন আসনে ভোট গণনায় অতিরিক্ত দেরি, পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া ফলাফল প্রকাশ, ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর, এমনকি পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখাসহ বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।

এহসানুল মাহবুব বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা প্রায় ৩০টি আসনে এ ধরনের চরম অব্যবস্থাপনা দেখেছি; যেখানে ভোট জালিয়াতি হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।’

জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা বলেন, এই ৩০ আসনে ভোট আবার গণনার জন্য তাঁরা নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছেন। কিন্তু কমিশন অভিযোগ আমলে না নিয়ে ফল প্রকাশ করেছে।

দেশের আরও বেশ কিছু আসনে কারচুপি হওয়ার অভিযোগ তুলে এহসানুল মাহবুব বলেন, তাঁরা যাচাই-বাছাই করে সেই আসনগুলো নিয়েও পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলবেন।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসব আসনে দলটি অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে, সেগুলোতে ভোটের ব্যবধান ১ হাজার থেকে ১০ হাজার। এসব আসনের মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩ ও ৫, লালমনিরহাট-১ ও ২, গাইবান্ধা-৪, বগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১, যশোর-৩, খুলনা-৩ ও ৫, বরগুনা-১ ও ২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২, ময়মনসিংহ-১, ৪ ও ১০, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১ ও ১৭, গোপালগঞ্জ-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও কক্সবাজার-৪।

বিভিন্ন জায়গায় হামলার অভিযোগ

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে জামায়াত ও ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা হামলা করছে বলেও অভিযোগ করেন এহসানুল মাহবুব। তিনি বলেন, ‘বিশেষত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় আমরা মারাত্মক ধরনের আক্রমণের শিকার হচ্ছি। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে আমাদের সমর্থক, প্রার্থীর এজেন্ট, ক্ষেত্রবিশেষে নারীদের ওপরও হামলা করা হচ্ছে। শতাধিক ঘটনা ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি।’

ফ্যাসিবাদের পতনের পর এমন হামলা কাম্য নয় উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকবে।’

ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল বলেন, অভিযোগ করা আসনগুলোতে জামায়াত ও ঐক্যে থাকা দলগুলো নিশ্চিত জয় পেত। তাই তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন। প্রতিকার না পেলে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হবেন।

এ সময় ঢাকা-৬ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল মান্নান অভিযোগ করেন, তাঁর আসনে কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল শিটে পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর দিয়ে ফলাফল তৈরি করা হয়। কোথাও পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখা হয়।

এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশনকে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করা হলেও কমিশন কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে বলেও অভিযোগ করেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এই প্রার্থী।

প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের। মগবাজার, ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের। মগবাজার, ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: প্রথম আলো

হালদায় জোয়ারে ভাসছিল মৃত ডলফিন, গত ১১ মাসে মরল ৫টি

প্রকাশ ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদীতে জোয়ারের পানিতে ভাসছিল একটি মৃত ডলফিন। নৌ পুলিশ সেটি উদ্ধার করে নদী পাড়ে এনে রেখেছে। ডলফিনটির সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করবে মৎস্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার হালদা রিভার রিসার্স সেন্টার।

আজ মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাস মুন্সিরহাট এলাকায় নদীতে জোয়ারের সময় ভাসমান অবস্থায় ডলফিনটি উদ্ধার করা হয়।

গত ১১ মাসের ব্যবধানে এ নিয়ে পাঁচটি মৃত ডলফিন হালদা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্স সেন্টার।

হালদা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মুহাম্মদ রমজান আলী প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার হওয়া ডলফিনটি কয়েক দিন আগে মারা গেছে। এটির শরীরে পচন ধরেছে। শরীরের চামড়া ফুলে উঠেছে। তবে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর এটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।

উদ্ধারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলফিনটির ওজন ২৫ থেকে ২৮ কেজি। দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে চার ফুট। এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরে নদীর হাটহজারীর বাড়িঘাণা অংশে আরেকটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে গত ১১ মাসে মোট পাঁচটি মৃত ডলফিন উদ্ধার হয় নদী থেকে। এ ছাড়া গত সাড়ে ছয় বছরে হালদা থেকে ৫০টি মৃত ডলফিন উদ্ধার হলো। দু-একটি ছাড়া প্রায় সব ডলফিনেরই শরীরে আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করেছিল উদ্ধারকারী দল। একাধিক ডলফিনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ।

হালদা নদী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাভুক্ত (অতি বিপন্ন প্রজাতি) হালদার ডলফিন। বিশ্বের বিভিন্ন নদীতে এই প্রজাতির ডলফিন আছে মাত্র ১ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে শুধু হালদাতেই ছিল ১৭০টি। গত সাড়ে ছয় বছরে হালদায় ৫০টি ডলফিন মারা গেছে।

হাটহাজারী উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নৌ পুলিশ এটি উদ্ধার করে। পরে আমরা গিয়ে সুরতহাল করি। পরে ময়নাতদন্ত করে এটির মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা হবে।’

হালদা নদী থেকে উদ্ধার করা মৃত ডলফিন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাস মুন্সিরহাট নদীর পাড়ে
হালদা নদী থেকে উদ্ধার করা মৃত ডলফিন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাস মুন্সিরহাট নদীর পাড়ে। ছবি: নৌ পুলিশের সৌজন্যে

আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন -সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রুমিন ফারহানা ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর বিপরীতে বিএনপি সমর্থন দিয়েছিল মিত্র দলের এক প্রার্থীকে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামে নিজ বাসায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন আলোচিত এই নারী প্রার্থী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভংকর কর্মকারবদর উদ্দিন

প্রথম আলো: শুরুতেই এই বিজয়ের বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।

রুমিন ফারহানা: প্রথমেই আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আমাকে মাঠে টিকে থাকার শক্তি ও সাহস দিয়েছেন। আমার এলাকার নেতা–কর্মী ও আসনের প্রত্যেক ভোটারের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন। তাঁরা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন; শ্রম দিয়েছেন। একেকজন কর্মী কতটা কষ্ট করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দিনের পর দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাননি। এই জয় আমার একার নয়, এটি আমার নেতা–কর্মীদের জয়। এমনকি যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, কঠোর সমালোচনা করেছেন বা অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁদের আচরণ অনেক সাধারণ মানুষকে আমার পক্ষে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার আসনের প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
প্রথম আলো: ভোট নিয়ে আপনার সন্তুষ্টি কতটা?

রুমিন ফারহানা: আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া এই এলাকায় সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হতো না। প্রশাসন পুরোপুরি আমার বিপক্ষে ছিল। প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছে। শুরু থেকেই প্রশাসন আমার সঙ্গে বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর আচরণ করেছে। বিএনপির নেতা–কর্মীরা সমানে আইন ভঙ্গ করলেও প্রশাসন চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। প্রশাসন কানা–বোবা হয়ে ছিল। তবে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকায় না থাকলে আমি ভোট করতে পারতাম না। পুলিশও সহযোগিতা করেছে। যেখানেই অনিয়ম হয়েছে, আমি সেনাবাহিনীকে জানিয়েছি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে। কেউ আমার কাছে কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেনি, আমিও কাউকে কিছু দিইনি।
প্রথম আলো: আপনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। দল মনোনয়ন না দেওয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করলেন। ধানের শীষে নির্বাচন না করায় ভোটের মাঠে কি কোনো প্রভাব পড়েছিল?

রুমিন ফারহানা: নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তার কারণ, গত ১৮ মাসে বিএনপি যা করেছে, আমি যদি তাদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতাম, সেই কর্মকাণ্ডের দায় আংশিকভাবে আমার ওপরও আসত। তবে আমি ওই সময় প্রকাশ্যে অনেক বিষয়ে সমালোচনা করেছি। ফলে দল মনোনয়ন না দেওয়াটা আমার জন্য এক অর্থে আশীর্বাদই হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও এলাকার মানুষের আস্থা—এসব মিলিয়েই আমি জয় পেয়েছি। বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকাটা আমার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে বলেই মনে করি।

প্রথম আলো: নির্বাচনের সময় আপনাকে ও আপনার সহযোগীদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে দল ফেরাতে চাইলে আপনার অবস্থান কী হবে?

রুমিন ফারহানা: এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু ভাবিনি। সময়ই সিদ্ধান্ত দেবে।
প্রথম আলো: আপনার জয়ে নারী ভোটারদের ভূমিকা কতটা ছিল?

রুমিন ফারহানা: নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বলছেন, স্বামী হয়তো অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তবে স্ত্রী বলেছেন, তিনি আমাকে ভোট দেবেন। আমি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছি, তাঁরা সহজে আমার কাছে আসতে পারবেন; নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন এবং আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াব, যা অন্য অনেক প্রার্থীর পক্ষে কঠিন। নারীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। বলা যায়, তাঁদের একচেটিয়া সমর্থন আমি পেয়েছি। তাই তাঁদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাও অনেক বেশি।
প্রথম আলো: ভোটের প্রচারণায় আপনি অনেক সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে যদি বলেন...

রুমিন ফারহানা: গত দুই সপ্তাহে আমার এলাকায় ৪০-৫০টি কর্মসূচি হয়েছে। সপ্তাহে দু-তিনটিও হয়েছে। একটি টাকাও নেতা–কর্মীরা আমার কাছ থেকে নেননি। নির্বাচনের সময় দরিদ্র মানুষ এক হাজার টাকা এনে দিয়েছেন। মধ্যবিত্তরা এক-দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেক প্রান্তিক মানুষ তাঁদের এক বছরের সঞ্চয় এনে দিয়েছেন। আমি নিতে চাইনি, তবু তাঁরা জোর করে দিয়েছেন। এ কারণে আমি বলি, আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন।
প্রথম আলো: সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার কাজের তালিকায় অগ্রাধিকার কী থাকবে?

রুমিন ফারহানা: আমার প্রথম অগ্রাধিকার অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে গ্যাসক্ষেত্র আছে, কিন্তু অনেকের ঘরে গ্যাস নেই। আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ গ্যাস পাবে, এটা নিশ্চিত করতে চাই। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির-মসজিদসহ শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন করতে চাই। আশুগঞ্জ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বন্দর আছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই, যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
প্রথম আলো: সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা সদরকে পৌরসভা করার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে?

রুমিন ফারহানা: অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই।
প্রথম আলো: এবারের সংসদেও নারী প্রতিনিধিত্ব কম থাকছে। নারীর অধিকার ও সম–অধিকার নিয়ে আপনি কতটা সোচ্চার থাকবেন?

রুমিন ফারহানা: আমি অবশ্যই সোচ্চার থাকব। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে কারও অধিকার কেউ কাউকে এনে দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়। ধরুন, আমাকে তো দল মনোনয়ন দেয়নি। দল কি জানত না, আমার এলাকায় আমার কী অবস্থান? আর যদি না জেনে থাকে, সেটা দলের ব্যর্থতা। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয়নি। আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা করে; মানুষের ওপর ভরসা করে। বিএনপি নারীদের বিষয়ে খুব সম–অধিকারের কথা বলে। আমরা তো দলে এ কারণেই গিয়েছিলাম যে নারী হিসেবে আমি বৈষম্যের শিকার হবে না। তারা কেন ৩ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেয়? বিএনপিতে নারীদের এই অবস্থান জানলে আমি কখনোই বিএনপি করতাম না।
প্রথম আলো: জাতীয় সংসদে আপনি স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে থাকবেন। সরকারি দলে থাকলে কি সুবিধা বেশি হতো?

রুমিন ফারহানা: আমি তা মনে করি না। বরাদ্দ সবার জন্য সমান। সততার সঙ্গে কাজ করতে চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবেও সম্ভব। কেউ যদি অযথা বাধা দেন, তার জবাব জনগণ দেবে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

রুমিন ফারহানা
রুমিন ফারহানা

অল্প ব্যবধানে জামায়াত নেতাদের হার: ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বনাম পরিসংখ্যান

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণঃ “ডাক্তার শফিক কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিল? পিরোজপুর-২ তে দেলোয়ার হোসেন সাইদির ছেলেকে মাত্র ৭০ ভোটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুলনাতে মিয়া গোলাম পরোয়ারকে মাত্র ২০০০ ভোটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। জামাত ৫০০০ এর কম ভোটে হেরেছে এমন আসনের সংখ্যা ৫৩টি। মূলত এই ৫৩টি আসনে কারচুপি করে হারানো হয়েছে জামাতকে। জামাত প্রকৃতপক্ষে ১৩৫টি আসনে জিতেছে। কিন্তু ডিপ স্টেট সংখ্যা কমিয়ে ৭০-৮০ টি দিতে চাচ্ছে।” বক্তব্যটি একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর। ভোটের পরদিন, অর্থাৎ, ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে এমন ভাষ্য ফেসবুকে ছড়াতে দেখা যায়। এমন আরেকটি পোস্টে আরেক ব্যবহারকারী লেখেন, “…৫৭ টি আসনে জামায়াত প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান মাত্র ৭০টি থেকে ২, ৩, ৪, ৫ হাজার, নির্বাচন কতটা প্রতিদ্ধন্দিতা হয়েছে এই সব আসন গুলি দেখলে বুজা যায়!” (বানান অপরিবর্তিত)।

ডিসমিসল্যাব বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এমন অন্তত এক ডজন পোস্ট ও মন্তব্য সংগ্রহ করেছে, যার মূল বক্তব্য হলো কারচুপি বা ষড়যন্ত্র না হলে আরো অনেক বেশি আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা জয়লাভ করতেন।

এমন দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথম আলোর প্রকাশিত আসনভিত্তিক ফলাফল থেকে বিজয়ী ও মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রাপ্ত ভোট সংগ্রহ করে তাদের মধ্যকার ব্যবধান গণনা করে ডিসমিসল্যাব।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে মোট ২২টি আসনে, ৫৩টিতে নয়। এসব আসনে ব্যবধান ৩৮৫ ভোট থেকে ৪,৭০২ ভোটের মধ্যে। কিন্তু সব মিলিয়ে ৫ হাজারের নিচে থাকা আসনের সংখ্যা ২২টির বেশি নয়।

এই ২২টি আসনের ফল জোটভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ১১টি আসনে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ৯টিতে। একটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, একটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অর্থাৎ ৫ হাজারের কম ব্যবধানের আসনগুলোর অর্ধেকেই জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

এই তালিকায় জামায়াত জোট সরাসরি পরাজিত হয়েছে ৯টি আসনে। এদের একজন এনসিপির মো. আব্দুল আহাদ, একজন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ওমর ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হক এবং বাকি ৬ জন জামায়াতে ইসলামীর, যার মধ্যে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও রয়েছেন।

সবচেয়ে কম ব্যবধানের পাঁচটি আসনের মধ্যে মাদারীপুর-১-এ ব্যবধান ৩৮৫ ভোট, সিরাজগঞ্জ-৪-এ ৫৯৪ ভোট। এই দুটি আসনেই বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত বা তাদের মিত্র প্রার্থী। অন্যদিকে কক্সবাজার-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে যথাক্রমে ৯২৯, ১০২৬ ও ১০৬১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা। অর্থাৎ সংকীর্ণ ব্যবধান উভয় জোটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়েছে।

জোটভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব আসনে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা পরাজিত হয়েছে, সেখানে মোট ব্যবধানের যোগফল ২৬ হাজার ৯০৭ ভোট। এতে করে গড় পরাজয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯৯০ ভোট। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা যেসব আসনে পরাজিত হয়েছে, সেখানে মোট ব্যবধানের যোগফল ৩০ হাজার ৮২০ ভোট এবং গড় পরাজয়ের ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৫৬৮ ভোট। অর্থাৎ, স্বল্প ব্যবধানের আসনগুলোর মধ্যে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের গড় পরাজয়ের ব্যবধান ভোটের হিসাবে বিএনপি জোটের তুলনায় বেশি।

২৯৭টি আসনের ফলাফলকে ভোটের ব্যবধান অনুযায়ী ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজালে দেখা যায়, সবচেয়ে কম ব্যবধানের ৫০টি আসনের পরিসর ৩৮৫ ভোট থেকে ৯ হাজার ৫৮১ ভোট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ৫০টি আসনের মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২৪টিতে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২২টিতে। তিনটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটি আসনে জয় পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

অর্থাৎ ৫০টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ভেতরে কোনো একক জোটের একচেটিয়া প্রাধান্য দেখা যায় না, বরং বিএনপি জোটের প্রার্থীরাই বেশি হেরেছেন।

এ ছাড়া খুলনা-৫ আসন নিয়ে ভাইরাল পোস্টে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। প্রদত্ত ফল অনুযায়ী, ওই আসনে বিজয়ী ও মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৬০৮ ভোট। সংখ্যাটি ৫ হাজারের নিচে হলেও দাবিতে উল্লেখিত ভোটসংখ্যার সঙ্গে তা মেলে না। একাধিক পোস্টে বলা হয়েছে, পিরোজপুর-২ আসনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলেকে মাত্র ৭০ ভোটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দাবিও সঠিক নয়। ব্যবধানটি বরং ৮ হাজার ২৮৮ ভোটের। ফলাফল অনুযায়ী বিজয়ী আহম্মদ সোহেল মনজুর পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট এবং শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট।

প্রতিবেদনের শুরুতে যে পোস্টের কথা বলা হয়েছে, সেটি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। একাধিক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ‘ডাক্তার শফিক কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিল?’ ক্যাপশনের পোস্টটি পাওয়া যায় (১, ২, ৩)।

প্রচারণাটি শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একাধিক ব্যবহারকারী এই তত্ত্বটিকে বিভিন্ন পোস্টের নিচে মন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন জবিয়ানস নামের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট ছিল, ‘জামাত শিবিরের কয়েকজন দেখলাম অভিযোগ করছে, মিডিয়া ক্যু করে তাদের আমীর এবং অন্যান্যদের রেজাল্ট চেঞ্জ করা হচ্ছে।…’ (৪) সেখানে একজন ব্যবহারকারীকে ‘ডাক্তার শফিক কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিল’ শীর্ষক লেখাটি মন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়।

গণমাধ্যম আমার দেশের একটি ফেসবুক পোস্টের বিষয়বস্তু ছিল জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের দলীয় কার্যালয়ে হাজির হওয়া। সেখানেও কমেন্ট সেকশনে অন্তত দুজন ব্যবহারকারী একই দাবি করেছেন।

এ ছাড়া তানভীর স্যার নামের একটি ভেরিফায়েড পেজ থেকে পোস্ট করে বলা হয়, যদি চরমোনাই পীর সাহেবও তাঁর দল নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করতেন, তবে হাতপাখা প্রতীকের ভোট একত্র হয়ে জোটের পক্ষে আরও ৪০-৫০টি আসনে জয়লাভ করা যেত। এই পোস্টেও দাবি করা হয়, ‘পিরোজপুর-২ আসনে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে মাত্র ৭০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। খুলনায় মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রায় ২০০০ ভোটে হেরেছেন। জামায়াত ৫০০০ ভোটের কম ব্যবধানে হেরেছে, এমন আসনের সংখ্যা প্রায় ৫৩টি।” যার কোনোটিই সত্য নয়। “তানভীর স্যার” পেজের পোস্টের লেখা আবার একজন ব্যবহারকারী কমেন্ট করেন ‘নাটশেল টুডে’ পেজের একটি পোস্টে।

প্রায় একই দাবি দেখা যায় সাংবাদিক মনিরুজ্জামান নামের পরিচিত প্যারোডি প্রোফাইল থেকে দেওয়া একটি পোস্টেও। (৫) তাঁর পোস্টে জামায়াতের আমিরের মঞ্চে অসুস্থ হয়ে পড়ার সময়ের একটি দৃশ্যের ছবি যুক্ত করে লেখা হয়, “৬৮ টা আসন+ ৫০০০ কম মার্জিনের ৫০ আসন মানে দেশের ২০০+ উপজেলায় জামায়াতের নিয়ন্ত্রণ থাকবে যারা ৫ আগস্টের পর জামায়াতে আসছিলা তোমরা আবার ফিরে যাও শফিক দাদুই চেঞ্জমেকার” (বানান অপরিবর্তিত)।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2Fk55kroav%2FDismisslab-1.JPG?rect=80%2C0%2C1272%2C848&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট