Tuesday, March 18, 2014

পর্তুগালে পাওয়া গেল ইউরোপের সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের খোঁজ

‘জুরাসিক পার্ক' ছবির কল্যাণে ডাইনোসর আজ আরও পরিচিত হয়ে উঠেছে৷ কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমাদের সব কিছু এখনো জানা হয়নি৷ এই যেমন সম্প্রতি পর্তুগালে একেবারে নতুন প্রজাতির ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে৷ নাম–টোরভোসরাস গুরনেয়ি৷ টিরানোসরাস এক্স-এর মতো চরিত্রের এই ডাইনোসর প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াতো৷ ইউরোপে এর আগে এত বড় আকারের ডাইনোসরের খুঁজে পাওয়া যায় নি৷ জুরাসিক যুগের অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও এত বড় ডাইনোসর পাওয়া কঠিন৷
টোরভোসরাস টিরানোসরাস এক্স-এরও ৮ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করতো৷ ভয়ংকর হিংস্র এই প্রাণীর সামনে বাকিরা অসহায় বোধ করতো৷ মাংসাশী এই প্রাণী দু'পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতো৷ দাঁত ছিল ব্লেডের মতো ও প্রায় ১০ সেন্টিমিটার লম্বা৷ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এদের উচ্চতা ১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারতো৷ ওজন ৪ থেকে ৫ টন৷
এর আগে উত্তর অ্যামেরিকায় টোরভোসরাস টানেরি নামের যে ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, তাদের সঙ্গে পর্তুগালের টোরভোসরাস গুরনেয়ির মিল রয়েছে, হয়ত আত্মীয়তাও ছিল বলে মনে করা হচ্ছে৷ তবে দুই মহাদেশে এদের বিবর্তন আলাদাভাবে হয়েছে৷ বিচ্ছিন্নভাবে নতুন এই ডাইনোসর প্রজাতির জীবাশ্মের আবিষ্কার বেশ সাড়া ফেলেছে৷ কিন্তু এর একটা অন্য মাত্রাও রয়েছে৷ জুরাসিক যুগের ‘ফুড চেন' বা খাদ্য-খাদকের শৃঙ্খলা সম্পর্কেও এবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে৷ মাংসাশী এই দৈত্য সমসাময়িক নিরামিশাষী সরোপড জাতীয় ডাইনোসরকে অনায়াসে খেয়ে ফেলতো৷ এছাড়া দুই মহাদেশে ডাইনোসারদের বিবর্তনের তুলনামূলক বিশ্লেষণের কাজও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন৷

টেলিগ্রাফকে খালেদা জিয়া- বাংলাদেশ কখনও জঙ্গিদের অভয়াশ্রম হবে না

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ভারত। তবে বিএনপি নয়া দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ই-মেইলের মাধ্যমে তিনি এ সাক্ষাৎকারটি দেন সোনিয়া সরকারকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনও জঙ্গিদের নিরাপদ অভয়াশ্রম হবে না। গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বাংলাদেশ শুধু আমাদের স্বার্থে নয়, আমাদের অঞ্চলের স্বার্থের জন্যও প্রয়োজন। সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো:

নিরাপত্তাহীনতা ও ঘুষ সাংবাদিকতা

পাকিস্তানের গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ এলে ডন, জং ও পিটিভি—এ নামগুলো আসে। অন্তত ২০০২ সাল পর্যন্ত তাই-ই ছিল। কোনো রাজনীতিবিদ বা গণতান্ত্রিক নেতা নন, চার তারকা জেনারেল ফৌজি শাসক পারভেজ মোশাররফ সম্প্রচার আইন উদার করলেন। শুরু হলো মিডিয়া বুম—গণমাধ্যমের নবজাগরণ। মোশাররফ যে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিলেন, এর জন্য তাঁকে মহানুভব ভাবার কোনো কারণ নেই। পেছনে ছিল দুটো ঘটনা:১৯৯৯ সালে ভারতের সঙ্গে সৃষ্ট কার্গিল যুদ্ধ। ওই বছরই তালেবান জঙ্গিদের ভারতীয় বিমান ছিনতাই। দুটি ক্ষেত্রেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মনে করে, অন্তত প্রচার-যুদ্ধে তারা ভারতের কাছে হেরে গেছে। ভারত যেভাবে ইলেকট্রনিক মিডিয়া দিয়ে আক্রমণ চালিয়েছে, পাকিস্তান তার মোক্ষম জবাব দিতে পারেনি। কারণ তার দেশে কোনো শক্তিশালী নিউজ চ্যানেল নেই। এ অবস্থায় দেশে দরকার আধুনিক ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম, যারা দেশের স্বার্থে ভারতের বিরুদ্ধে প্রচার-যুদ্ধে নামতে পারবে। সেই শুরু।
বর্তমানে দেশটিতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা শয়ের কাছাকাছি। প্রাইভেট রেডিও অগুনতি। বড় শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানে মিডিয়ার সরব উপস্থিতি। সাধারণ মানুষের মধ্যে উর্দুভাষী দৈনিকগুলো জনপ্রিয়। বেশির ভাগ উর্দু দৈনিকই ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। সে তুলনায় শহুরে এলিটদের পছন্দের ইংরেজি দৈনিকগুলো যথেষ্ট উদার ও পেশাদার। প্রয়াত মীর খলিলুর রেহমান ৬০ বছর আগে জং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় জিয়ো টিভি ও জিয়ো নিউজ এ গ্রুপেরই টেলিভিশন। পাকিস্তানের শীর্ষ সাংবাদিকেরা রয়েছেন এ গ্রুপের সঙ্গে। এর পরেই আছে ডন নিউজ টিভি, ডেইলি ডন-এর মালিকানাও তাদের। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতিষ্ঠিত ডন পত্রিকা কর্তৃপক্ষের দাবি, মাসে তাদের পেজ ভিউ এক কোটির ওপরে। পাকিস্তানে সংবাদপত্রের পাঠক দিন দিন বাড়ছে। দৈনিক বিক্রি ৬১ লাখ কপির কাছাকাছি।
২. কিন্তু হলে কী হবে। সে দেশে সাংবাদিকদের বিপদের শেষ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা পাকিস্তান। রিপোর্টারদের অপহরণ, নির্যাতন ও পিটিয়ে হত্যা সেখানে নিয়মিত ঘটনা। পাকিস্তানে সাংবাদিকদের সেনাবাহিনী, সামরিক গোয়েন্দা, তালেবান জঙ্গিদের মন বুঝে চলতে হয়। গত তিন বছরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদক সৈয়দ সালিম শেহজাদসহ দুই ডজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সালিম শেহজাদ প্রভাবশালী সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচনের চেষ্টা করতেন। ধারণা করা হয়, তাঁর হত্যার পেছনে আইএসআইয়ের হাত রয়েছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তানসহ উপজাতীয় অঞ্চলগুলোতে আদিবাসী সাংবাদিকদের সত্যিকারের হিরো মনে করা হয়। আল-কায়েদা নেতা, গোত্রপ্রধান, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সশস্ত্র জঙ্গি—সবখানে তাঁরা সোর্স রাখেন। এই আদিবাসী রিপোর্টাররা ঠিকভাবে কাজ না করলে বিশ্বের কোনো গণমাধ্যম, তা সে যত প্রভাবশালী হোক না কেন, এ অঞ্চলের কোনো খবরই পেত না। কারণ মূল ধারার গণমাধ্যম ও বিদেশি সাংবাদিকেরা কেউই সেসব জায়গায় একাকী যাওয়ার সাহস পান না। মুকাররম খান আতিফের কথা আমরা কেউ ভুলতে পারি না।
২০১২ সালে পেশোয়ারের শাবকাদার শহরে নিজ বাড়ির কাছে একটি মসজিদের সামনে তালেবান জঙ্গিরা হত্যা করেছিল ভয়েস অব আমেরিকার পশতুভাষী রেডিওর এই রিপোর্টারকে। লাশের পাশে ছিল রক্তমাখা একটি চিরকুট। তাতে লেখা: বাড়াবাড়ি করার পরিণতি এ রকমই হয়। ভদ্রলোকের নাম ইমতিয়াজ আলম, সাউথ এশিয়ান ফ্রি মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের (সাফমা) সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলছিলেন, ‘প্রতিদিন সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সময় গালে চুমু খেয়ে মনে মনে বলি, আহা! আবার এই মুখখানা দেখতে পাব তো!’ ২০০৯ সালের এক সকালে ইমতিয়াজের মুঠোফোনটি বেজে ওঠে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ, ‘আমরা জানি, আপনার মেয়ে এই পথ ধরে স্কুলে যাচ্ছে। সাবধান।’ ওই হুমকির পর থেকে তিনি মেয়েকে স্কুলে পাঠান দেহরক্ষীসহ। করাচিতে সাফমার অফিসটা যেন একটি বাঙ্কার। ইমতিয়াজ নিজে গাড়িতে অস্ত্র রাখেন। বাসা ও অফিস দুই জায়গাতেই তাঁকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
৩. পাকিস্তানে সাংবাদিকেরা তথ্য পাওয়ার অধিকার যথেষ্ট ভোগ করেন। তার পরও অনেক সময় কারও কারও বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’কে বড় করে দেখার অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ইংরেজি দ্য নেশন পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি প্রতিবেদনে বলা হলো, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিনিধি ম্যাথিও রোজেনবার্গ প্রকৃতপক্ষে সিআইএ ও মোসাদের চর। রিপোর্টে তথ্য-প্রমাণের কোনো বালাই ছিল না। কেবলই অজ্ঞাত সূত্র! তত্ক্ষণাত্ দেশ ছাড়তে হয় রোজেনবার্গকে। পরে এ বিষয়ে পশ্চিমারা চাপ দিলে দ্য নেশন-এর সম্পাদক শিরিন মিজারির সাফাই, শিরোনাম প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে শেষ হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে এটি তথ্যভিত্তিক নয়, কেবলই ধারণা! এই হলো অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মান। পাকিস্তানে গণমাধ্যমগুলোর দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম উপায় মার্কিনবিরোধিতা। যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তান আক্রমণ করে, তবে পাকিস্তানিদের কী করতে হবে, কীভাবে জবাব দিতে হবে, তাও টেলিভিশন-রেডিওর টক শোতে আলোচনা হয়। কোনো কোনো নিউজ চ্যানেলে বাজানো হয় রণসংগীত! গুজবনির্ভর রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি আছে অদক্ষতা, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। রাষ্ট্রীয় বড় বড় অনুষ্ঠান কভার করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আনাড়ি রিপোর্টারকে।
কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর স্বার্থে সাংবাদিকেরা ব্যবহূত হন। সাংবাদিকেরা রিপোর্ট লেখেন, আবার তাঁদের স্বার্থে রিপোর্ট প্রত্যাহার করে নেন। সাংবাদিকেরা এ জন্য দায়ী করেন তাঁদের নিম্ন বেতন, কম সুযোগ-সুবিধাকে। স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা নেই, দুর্বল চাকরি নিরাপত্তা ও পেশাগত মানের দুর্বলতার কারণে পাকিস্তানের মিডিয়া মার্কেটে ‘ব্ল্যাকমেইল জার্নালিজম’ বা ঘুষ সাংবাদিকতা শব্দ দুটি বিশেষ জায়গা পেয়েছে। রিপোর্টার সালমান সিদ্দিকী গত বছর করাচিতে একটি সম্মেলন কভার করতে গিয়ে সৃষ্ট অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন সম্প্রতি একটি ব্লগে। সেখানে গিয়ে একটি খাতায় তিনি নাম স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি খাম। খুলে দেখেন, ভেতরে পাঁচ হাজার রুপি। ততক্ষণে সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সম্মেলনকেন্দ্র ত্যাগ করার আগে খামটি তিনি ওই এনজিও কর্মকর্তার মুখে ছুড়ে মারেন। সালমান লিখেছেন, ‘আমি বিস্মিত, তারা কীভাবে ঠিক করে কোনো রিপোর্টারকে কত টাকায় কেনা যাবে!’ তাঁর পরামর্শ, এসব ঘুষখোর সাংবাদিকের বুকে প্রেসকার্ড নয়, তাঁরা কত টাকায় বিক্রি হতে রাজি, সেই ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া উচিত।
৪. গণমাধ্যমের এ-সংকটের চেহারাটা পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রে অনেকটাই অভিন্ন। সার্বিকভাবে ভারত হয়তো কিছুটা এগিয়ে আছে তাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে। পাকিস্তানে এখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চলছে বটে, কিন্তু সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করতে হলে যেতে হবে অনেক দূর। সময় লাগবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে। আর শক্তিশালী গণমাধ্যমই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে।
কাজী আলিম-উজ-জামান: সাংবাদিক।
ইমেইল: alim_zaman@yahoo.com

মুক্তিযুদ্ধের মর্ম: হিংসা, ঘৃণা ও বৈষম্যহীনতা

ষোলোই ডিসেম্বরের কয়েক সপ্তাহ পরে জেলখানায় যাই। পুলিশের গাড়িতে কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নেমে ভেতরে ঢুকে অন্য রকম অনুভূতি হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এই জেলখানার ইতিহাস একাকার হয়ে আছে। শুধু চোর, ডাকাত, খুনি ও অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত ও দণ্ডিতরাই নয়, এই জেলখানায় কত রাজনৈতিক সংগঠনের দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মী তাঁদের জীবনের কত অমূল্য সময় কাটিয়েছেন। মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব ছিলেন। ছিলেন অসংখ্য জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী ও কমিউনিস্ট নেতা-কর্মী। যাঁরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছেন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন; তাঁদের ঠাঁই হয়েছে এই কারাগারে। তাঁরা বিনা বিচারে বছরের পর বছর এখানে কাটিয়েছেন যৌবনের অমূল্য দিনগুলো। তাঁদের কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ যদি হয়েই থাকে, তা তাঁদের দেশপ্রেম। জেলখানায় গিয়ে তাঁদের কথা ভেবে রোমাঞ্চিত হই। অন্যদিকে এই কারাগারেই যুগে যুগে ঠাঁই হয়েছে অনেক সমাজবিরোধী, মানবতাবিরোধী ও দেশদ্রোহীর। বস্তুত তাদেরই এখানে থাকার কথা, তাদের জন্যই এই স্থাপনা তৈরি। আমি যেদিন যাই, সেদিনও কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের সংখ্যাই ছিল বেশি। তখন সাধারণ অপরাধীর সংখ্যা কম। নিয়াজীর আত্মসমর্পণের পরপরই বহু পাকিস্তানি দালালকে গ্রেপ্তার করে জেলে নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করার কয়েক দিন পরে একদিন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেসব বিখ্যাত দালাল আটক আছেন, তাঁদের অবস্থা সচক্ষে দেখে আসো। পরদিন তিনি আইজি আবদুল খালেক, আইজি বা ডিআইজি প্রিজন ও অন্যান্য কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে যান। আমরা কয়েকজন তাঁর সঙ্গে যাই।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার তাজউদ্দীন সাহেবের অতি পরিচিত জায়গা। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অনেকবার তাঁকে ওখানকার বাসিন্দা হতে হয়েছে। তিনি জেলের ভেতরে গিয়ে ঘুরে ঘুরে অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। কিছুটা বিব্রতও বোধ করেন। শুধু পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক নেতারা নন, বন্দী ছিলেন লেখক-বুদ্ধিজীবীদের অনেকে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কাজী দীন মোহাম্মদ প্রমুখ। ড. দীন মোহাম্মদকেও কিছু একটা জিজ্ঞেস করেন। কারা পরিদর্শন শেষে তাজউদ্দীন সাহেব সাংবাদিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কিছুক্ষণ কথা বলেন। তাঁর কথার মধ্যে একটি কথা ছিল, ‘এখানে তো দেখলাম অনেকেই আমাদের আগের চেনাজানা লোক।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু ছিল একটি পরিপূর্ণ যুদ্ধ এবং প্রথাগত যুদ্ধ নয় জনযুদ্ধ, সেখানে দেখা যায় একই পরিবারের দুই ভাই গেছেন মুক্তিযুদ্ধে, আরেক ভাই পাকিস্তানি বাহিনীর দালালি করেছেন। এক ভাই অস্ত্র হাতে নিয়ে হত্যা করেছেন শত্রু সৈন্যকে, অন্য ভাই পাকিস্তানিদের সরবরাহ করা অস্ত্রে হত্যা করেছেন মুক্তিসেনা বা স্বাধীনতাকামীদের। সাম্প্রতিক সময়েই ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধে এমনটি হয়নি। সেখানে অধিকৃত মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে হো চি মিনের সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করেছেন। সেখানে রাজাকার আলবদর ছিল না। সৈয়দ আলী আহসান কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর ভাই সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন দেশে থেকে দখলদার সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। হয়েছেন উপাচার্য। একই পরিবারে স্বাধীনতাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা এবং শান্তিবাহিনীর রাজাকার আলবদর থাকায় স্বাধীনতার পরে সংহত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজটি কঠিন হয়ে পড়ে। যতই আদর্শ থাকুক, একটি সময় রক্তসম্পর্ক, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্ব বড় হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে যে উপাদানটি যোগ হয় তা হলো বঙ্গবন্ধুর স্নেহশীলতা। কিন্তু তাঁর সেই ক্ষমাশীলতার মর্যাদা স্বাধীনতাবিরোধীরা দেয়নি। কারণ, জাতি হিসেবেই আমাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধের চেয়ে কৃতঘ্নতার উপাদান বেশি। স্বাধীনতাবিরোধীরা কোনো জাতির সর্বোচ্চ বিশ্বাসঘাতক। যেকোনো প্রাণীর মতো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারাও একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যুগ যুগ মানুষ তাদের ঘৃণার চোখে দেখে। যেমন, মীর জাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ চিরকাল ঘৃণার পাত্র। ঘৃণা জিনিসটি মানুষের মনের ব্যাপার। সভ্য জগতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রকাশের প্রয়োজন হয় না। জীবিত বা মৃত কারও প্রতি অথবা কোনো গোত্রের প্রতি প্রকাশ্যে ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে খাঁটি দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটে না। দেশপ্রেম অতি উঁচু স্তরের মানবিক মূল্যবোধ। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ১২ মার্চ জানিয়েছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা স্তম্ভের’ পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় রাজাকারদের প্রতি নতুন প্রজন্মের সন্তানদের ঘৃণা জানানোর জন্য ‘ঘৃণা স্তম্ভ’ নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাবে ভূষিত করার প্রক্রিয়া চলছে।’ [সমকাল, ১৩ মার্চ]
মাননীয় মন্ত্রীর এই নীতিনির্ধারণী বক্তব্য আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন মনে হয়েছে। ২০০৮ বা ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়, তাতে এ ধরনের কোনো অঙ্গীকার ছিল বলে মনে পড়ে না। কয়েক দিন আগে তিনি ঘোষণা করেছেন, আরও বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাকে বীর উত্তম, বীর বিক্রম প্রভৃতি খেতাব দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধুর সরকার যাঁদের খেতাব দিয়েছে, তার বাইরে ৪৩ বছর পরে আবার নতুন করে খেতাব দেওয়া শুরু হলে অন্য দলের মুক্তিযোদ্ধারা না পেলেও শুধু দলীয় মুক্তিযোদ্ধাদের খেতাব দিয়েই সন্তুষ্ট করতে পারবে বলে মনে হয় না। দাবিদার যে কত বের হবে, তা এখন কল্পনাও করা যাবে না। তা ছাড়া যত দেরিতেই হোক, কোনো না কোনো দিন যখন অন্য কোনো দলের সরকার আসবে, তারা যে বিপুলসংখ্যক দলীয় লোককে মুক্তিযোদ্ধার খেতাব দেবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়। একদিন এমন ব্যক্তিও খেতাব পাবেন, একাত্তরে যার বয়স ছিল পাঁচ মাস। অথবা এমন কোনো বৃদ্ধ, যিনি একাত্তরে পাকিস্তানিদের সেনাক্যাম্পে ফাইফরমাশ খেটেছেন। আমাদের এ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দৃষ্টান্ত প্রচুর। আমার ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধুপ্রতিম জনাব মোজাম্মেল হককে আমি খুব ভালোভাবে জানি ’৭২ থেকে। আমাদের অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিক টঙ্গীর অধিবাসী প্রয়াত মীজানুর রহমান, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুবই স্নেহভাজন এবং তাঁর অফিস ও বাসভবনে যখন-তখন ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত, মোজাম্মেল ভাইকে ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। তিনি অতি সজ্জন ও সরল মানুষ। খাঁটি আওয়ামী লীগের নেতা। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ায় আমি সন্তুষ্ট হই। শপথ নেওয়ার কয়েক মিনিট পরেই তাঁর সঙ্গে আমার কোলাকুলি ও কথা হয়। তখনই বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সুযোগ আছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে তাঁর কাজ করার আগ্রহও রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে কৃষক শ্রমিক পরিবারেই মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বিপুল। তাঁদের অনেকেই আর্থিক অসচ্ছলতায় রয়েছেন। অনেকে ভাতা পাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তাঁদের ভাতা বাড়িয়েছে। কিছু সুযোগ-সুবিধাও। আরও সম্মানজনকভাবে যাতে তাঁরা জীবনযাপন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় করতে পারে। দেশজুড়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মুক্তিযোদ্ধা স্তম্ভ এবং ঘৃণা স্তম্ভ বানিয়ে জাতিকে আত্মমর্যাদাশীল ও সুসংহত করা যাবে না। দেশটি ছোট ও ঘনবসতিপূর্ণ। হিংসা ও হানাহানির সুবন্দোবস্ত করা হলে তার কুফল ভোগ করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। বিশেষ করে গ্রামপ্রধান এই দেশে। ঘৃণা স্তম্ভ বানানোর বিষয়টি ও অন্যান্য নতুনতর সিদ্ধান্ত মন্ত্রিপরিষদের কোনো সভায় আলোচনার পর গৃহীত হয়েছে কি না, জানি না। দু-একটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত জাতির ও দলের অপূরণীয় ক্ষতি করে। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের দুই বছরের সিনিয়রিটি দেওয়াটা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল। প্রশাসন বিভক্ত হয়ে যায়।
যার পরিণামে ২১টি বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়। সামরিক-বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের অন্যভাবে পুরস্কৃত করা যেত। ওই সিদ্ধান্তের পর ৯৫ শতাংশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাননি। সব দেশেরই স্বাধীনতাসংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র। অনেক দেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মিল নেই। পাকিস্তান এমনিতেই ছিল ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত—দুই মুল্লুকে দুই খণ্ড। লাখ লাখ বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনে ছিলেন। হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাঁদের অনেকে অংশ নেওয়ার অশেষ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। সেটা তাঁদের অপরাধ নয়। কলকাতায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অবদান রেখেছেন বেশি কিন্তু ছিলেন নিরাপদে। করাচিতে একাত্তরে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা ছিলেন হায়েনার খাঁচার মধ্যে। তাঁদের বেদনাকে মূল্য না দেওয়া ছিল চরম নির্বুদ্ধিতা। দুই বছর পর তাঁরা যখন দেশে ফেরেন, জাতিসংঘের মাধ্যমে তাঁদের দুই বছরের জুনিয়রকে ‘স্যার’ বলতে বাধ্য করা হয়। মুখে তাঁরা ‘স্যার’ বলেছেন বটে, তাঁদের বুকের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। কারও কারও মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জেগেছে। প্রায় সব দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অর্থ ও তাৎপর্য তাদের সব জনগোষ্ঠীর কাছে অভিন্ন। বাংলাদেশে তা নয়। এক এক শ্রেণীর কাছে এক এক রকম। তা ছাড়া বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খোলামেলাভাবে একাডেমিক আলোচনাও বিপজ্জনক। কিছু কথা রেখেঢেকে বলতে হয়। যৌন প্রসঙ্গে গুরুজনের সামনে আলোচনা যেমন নিষিদ্ধ (taboo), তেমনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুক্ত আলোচনাও— বিশেষ প্রচলিত ডিসকোর্সের বাইরে ভিন্ন ব্যাখ্যা—দেশদ্রোহিতার শামিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অর্থ বা ব্যাখ্যা এক এক শ্রেণীর কাছে এক এক রকম হওয়ার কারণ কী? খুব বাস্তব কারণ রয়েছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধারাও সবাই অভিন্ন মত পোষণ করেন না। যিনি একাত্তরের ২৬ মার্চ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন শত্রুর বিরুদ্ধে, তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধের যে আবেদন, যিনি আট মাস নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘পাকসেনাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে’ পড়েন, তাঁর কাছে অন্য রকম আবেদন। যাঁরা ভারতের মাটিতে থেকে যুদ্ধ করেছেন আর যাঁরা বাংলাদেশের মাটিতে থেকে লড়াই করেছেন—তাঁদের মনোজগৎ এক রকম হতে পারে না। যাঁরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এদিক-ওদিক থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলা করেছেন গেরিলা কায়দায় কাদের সিদ্দিকীর মতো, তাঁদের সঙ্গে সার্ভিস থেকে যোগ দেওয়া সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনার মিল হবে না। যাঁরা নয় মাস দালালি না করলেও জীবিকার জন্য টিক্কা সরকারের চাকরি-বাকরি করেছেন, তাঁদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অন্য রকম।
যে গরিবের তিনটি ছেলেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে শহীদ হয়েছেন, তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ এক জিনিস। যে উচ্চবিত্তের এক ছেলে শহীদ হয়েছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মিডিয়াকে অন্যভাবে ব্যবহার করবেন। যেসব হিন্দুর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকার, তাঁদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ এক জিনিস আর সেপ্টেম্বর মাসে এক পাঞ্জাবি তাঁর ঢাকার বাড়িটি যাঁর কাছে পানির দামে বেঁচে দিয়ে চলে যান, তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ অন্য জিনিস। যাঁরা সেদিন মোনাজাত করেছেন যে পাকিস্তানটা টিকে থাকুক, তাঁদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একটা ‘গন্ডগোল’ ছাড়া কিছু নয়। ৪৩ বছর যাবৎ বিভিন্ন গোত্র নিজ নিজ স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করছে। ফলে মূল চেতনাটি গেছে হারিয়ে। জাতিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে যাঁরা যুদ্ধ করেন, তাঁদের কাছে চাকরিতে দুই বছরের সিনিয়রিটি তুচ্ছ, দুটি ইনক্রিমেন্ট হাস্যকর প্রাপ্তি। আজ মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট ব্যবহূত হয় প্রমোশনের জন্য, চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য, জাতীয় পদক-পুরস্কারের জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অমেধাবী সন্তানদের ভর্তির জন্য, ভালো পোস্টিংয়ের জন্য। মহাজোটের আমলে সম্ভবত আজ ৯৯ শতাংশ সরকারি চাকুরে মুক্তিযোদ্ধা—কারও বয়স ৪৪-এর কম হলেও। যে দল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, যেসব দলের একাত্তরে জন্মই হয়নি এবং যেসব দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল পাকিস্তান রক্ষা করতে, তারা মুক্তিযুদ্ধকে অপব্যবহার করলে দুঃখ নেই। কিন্তু যে দল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলের কাছে মুক্তিযুদ্ধের মহিমা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চেয়ে বেদনার আর কিছু হতে পারে না। যে জিনিস হাজার বছরে কোনো জাতির জীবনে একবারই মাত্র আসে, তাকে যার-তার সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। ‘আর একটি মুক্তিযুদ্ধ’ বা ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের’ কথা শোনা যায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মুখে। তাতে মুক্তিযুদ্ধের মহিমা ক্ষুণ্ন হয়। মুুক্তিযুদ্ধ হয়েই ছিল একটি সংহত, সম্প্রীতিপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনের জন্য, যেখানে থাকবে না হিংসা, ঘৃণা ও বৈষম্যের কোনো স্থান।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

বাংলাদেশকে তুলে ধরার প্রশংসনীয় উদ্যোগ

ঢাকায় জাপানের বাংলা ভাষার ছাত্রছাত্রীরা
বিদেশে বাংলাদেশকে সঠিকভাবে তুলে ধরার নানা রকম উদ্যোগ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আজকাল প্রায় নিয়মিতভাবে নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ ঠিক কতটা ফলপ্রসূ, তা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়নি। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের নানা রকম অগ্রগতি সত্ত্বেও খুব একটা ইতিবাচকভাবে যে বাংলাদেশকে আমরা বিদেশিদের কাছে নিয়ে যেতে পারছি, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশকে দেখা হয় সমস্যাসংকুল এমন এক দেশ হিসেবে, যে দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভাবমূর্তির এই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে বিদেশে আমাদের প্রকৃত বন্ধুরা সবচেয়ে ফলপ্রসূ হতে পারে। প্রয়াত রাজনীতিবিদ তাকেশি হায়াকাওয়ার মতো বাংলাদেশের বিশিষ্ট বন্ধুরা জাপানে আমাদের দেশ সম্পর্কে সার্বিক নেতিবাচক ধারণা কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠায় সাহায্য করেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একটি উদ্যোগের প্রশংসা অবশ্যই করতে হয়। সেই উদ্যোগটি ছিল জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রছাত্রীকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো এবং কাছে থেকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ দেশের সঠিক পরিচিতি তাঁদের সামনে তুলে ধরা। জাপানের সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর যে কয়েক শ বাংলাদেশি নাগরিককে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় জাপানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, সেই দলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা একেবারে কম নয়।
আজ যাঁরা ছাত্র, ভবিষ্যতে তাঁরাই দেশ পরিচালনার হাল ধরবেন বলে তরুণদের আমন্ত্রণ জানানো অবশ্যই এমন এক ভবিষ্যৎমুখী ভাবনা, ভবিষ্যতে যা হয়তো দুই দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তুলতে সহায়ক হবে। জাপান সরকার অনেক আগে থেকে সেই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছে বলেই বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও অনেকে আমন্ত্রিত হয়ে জাপান ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। সেই মাপকাঠিতে আমরা অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। উদ্যোগটি এ কারণে আরও বেশি অর্থবহ যে, আমন্ত্রিত সেই শিক্ষার্থীদের সবাই টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও বাংলার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়াবলি নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। ধরে নেওয়া যায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তাঁদের অনেকেই পেশাগত জীবনে সম্ভবত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবেন। বাংলাদেশের সঙ্গে এক দীর্ঘমেয়াদি বন্ধনে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা তাঁদের বেলায় অন্য যেকোনো জাপানি নাগরিকের চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণেই এখন থেকে দেশের পরিচয় তাঁদের সামনে আরও ভালোভাবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সেই বন্ধনকে অনেক বেশি অর্থবহ করে তোলা হয়তো সম্ভব। উদ্যোগের সূচনা টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর আগে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ কোর্স চালু হওয়ার সময় থেকে। টোকিওতে বাংলাদেশের দূতাবাস সেই সময় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও দূতাবাসের সক্রিয় সহযোগিতার হাত প্রসারিত আছে এবং সেই সূত্র ধরেই রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের পাঠ শেষ করা ছাত্রছাত্রীদের সপ্তাহ খানেকের জন্য বাংলাদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়ার অনুরোধ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে করেছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাবের গুরুত্ব অনুধাবন করে এতে সায় দেওয়ায় ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে বাস্তবায়িত হয় জাপানে বাংলার ছাত্রছাত্রীদের সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ ভ্রমণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে ১০ জন ছাত্রের সেই দলটি বাংলাদেশে ছয় দিন অবস্থানকালে ভাষাশহীদদের স্মরণে আয়োজিত বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ছাড়াও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের দেওয়া নৈশভোজে যোগ দিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে বাংলা ভাষায় আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিল। এ ছাড়া জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তারা গিয়েছিল এবং মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সুন্দরবন দেখার সুযোগও তাদের হয়েছিল।
সড়কপথে সুন্দরবন যাওয়া ছিল আরেক মনোরম অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া তারা খুলনা শহরে জেলা প্রশাসকের আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীদের নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা কাছ থেকে দেখে আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত উপভোগ করেছে। সে অনুষ্ঠানে জাপানি ছাত্রছাত্রীরাও মঞ্চে উঠে পরিষ্কার বাংলায় ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ’ গাইতে শুরু করলে অভিভূত স্থানীয় শিল্পী ও দর্শকেরাও কণ্ঠ মেলান। সবশেষে লঞ্চে সুন্দরবন ভ্রমণ তাদের জন্য যেন ছিল বাংলার সমৃদ্ধ প্রকৃতিকে কাছে থেকে দেখে মুগ্ধ হওয়া। ছয় দিনের নানা রকম অভিজ্ঞতায় ভরপুর ভ্রমণের শেষে দেশে ফিরে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এলে তাদের প্রায় সবাইকেই বিষণ্ন হতে দেখা গেছে। সেই বিষণ্নতা ছিল বাংলাদেশকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারার পর হঠাৎ করেই অল্প সময়ের মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি হওয়ার বিষণ্নতা। ছাত্রছাত্রীদের প্রায় সবাইকেই বলতে শোনা গেছে, আবারও তারা ফিরে আসবে বাংলাদেশের চমৎকার পরিবেশে। তাদের সবার কাছেই বাংলাদেশের যে দিকটিকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে, তা হলো দেশটির মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতায় তারা মুগ্ধ। ফলে ভবিষ্যতে আবারও কাজের সূত্রে বাংলাদেশে আসতে হলে অতিথিপরায়ণ বাংলাদেশিদের আতিথেয়তার কথা তারা অবশ্যই মনে রাখবে। বাংলাদেশ ভ্রমণের স্মৃতি তাদের মনে যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ফিরতি পথে বিমানযাত্রায় তাদের মধ্যে কারও কারও চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আশা করা যায়, বাংলাদেশ সরকার জাপানে বাংলা নিয়ে লেখাপড়া করা তরুণদের আমন্ত্রণ জানানোর এই কর্মসূচি কেবল একবারের মধ্যে সীমিত না রেখে নিয়মিত এক বার্ষিক আয়োজনে পরিণত করে নেবে। বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তির এই আকালের সময়ে এর চেয়ে ফলপ্রসূ ও অর্থবহ উদ্যোগ অন্য কিছুতে তো আর হতে পারে না।
টোকিও, জাপান
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

ক্রিমিয়ার ভাগ্য নির্ধারণের রায়

ক্রিমিয়া : ইউক্রেন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু
রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে গতকাল রোববার রায় দিয়েছে ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়ার জনগণ। গণভোটের ফল আজ সোমবার ঘোষণা করা হতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষেই ক্রিমিয়ার জনগণ রায় দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গণভোটকে অবৈধ আখ্যায়িত করেছে। তবে রাশিয়ার দাবি, আন্তর্জাতিক আইনেই সব পদক্ষেপ নিচ্ছে মস্কো। ক্রিমিয়ায় গতকাল স্থানীয় সময় সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। চলে রাত আটটা পর্যন্ত। ভোট শুরুর ছয় ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় বেলা দুইটা পর্যন্ত ‘রেকর্ড পরিমাণ ভোট পড়েছে’ বলে দাবি করেন নির্বাচন কর্মকর্তা মিখাইলো মালিসেভ। তাঁর দাবি, প্রথম ছয় ঘণ্টার মধ্যেই ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। গণভোটের ব্যালটে দুটি প্রশ্ন ছিল। একটি হলো, ভোটাররা ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে চান কি না। অন্যটি হলো, ভোটাররা ১৯৯২ সালের সংবিধান ফিরে পেতে চান কি না,
যেখানে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেছিল ক্রিমিয়া। বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষেই গণভোটের রায় যাবে। অবশ্য ক্রিমিয়ার ২০ লাখ জনগণের মধ্যে ১২ শতাংশ জাতিগত তাতার জনগোষ্ঠী গণভোট বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছে। ক্রিমিয়ায় জাতিগতভাবে রুশ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৯ শতাংশ)। তারা রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষেই রায় দেবে—এটা প্রায় নিশ্চিত। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিপক্ষে ভোট দেবে জাতিগত ইউক্রেনিয়ান জনগোষ্ঠী; যারা ক্রিমিয়ার মোট জনগণের মাত্র ২৪ শতাংশ। ক্রিমিয়ার রুশপন্থী প্রধানমন্ত্রী সার্গে আকসিয়োনভ ভোট দিয়ে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চলছে। জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিচ্ছে। কোনো কেন্দ্রে সমস্যা নেই।’ সেভাস্তোপোলের একটি ব্যস্ত কেন্দ্রে ৬৬ বছর বয়সী একজন নারী ভোটার বলেন, ‘আমি চাই, আমার বাড়ি রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হোক।
আমার স্বজনদের অনেক দিন ধরেই দেখি না আমি।’ ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সঙ্গেই রাখতে চান—এমন ব্যক্তিদের চাওয়া হলো, ইউক্রেনের সঙ্গে থাকলেও ক্রিমিয়াকে আগের চেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। সেরি রেসেৎনিক বলেন, ‘ক্রিমিয়াকে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া উচিত, যাতে ক্রিমিয়া নিজের অর্থনৈতিক খাত নিজেই পরিচালনা করতে পারে।’ এদিকে নির্বাচনের পর ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টের অধিবেশন বসবে। ভোটের ফল পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন আইনপ্রণেতারা। কিন্তু ভোটের ফল যা-ই হোক, ক্রিমিয়া থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার না করার ঘোষণা দিয়েছে ইউক্রেন। ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের ১৫ হাজার সেনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ ইউক্রেনের পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। তাই ভোটের পর ক্রিমিয়া পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স।

ককপিটে শেষ কথা কে বলেছিলেন?

যাত্রীদের স্মরণে কুয়ালালামপুরে
বার্তা লিখছেন এক নারী রয়টার্স
‘সব ঠিক আছে, শুভরাত্রি।’ মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের নিখোঁজ হওয়া এমএইচ৩৭০ ফ্লাইটের ককপিট থেকে পাওয়া সর্বশেষ এ কথা কে বলেছিলেন? উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন, তাঁর প্রথম সহকারী নাকি ককপিটে তাঁদের সঙ্গে থাকা অন্য কেউ এ কথাগুলো বলেছিলেন? মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, ওই কথা দুই পাইলটের যেকোনো একজনের হতে পারে। উড়োজাহাজটির পাইলট হিসেবে ছিলেন ৫৩ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন জাহারি আহমেদ শাহ। সূত্র জানায়, উড়োজাহাজটি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশ তাঁর বাড়ির বাইরে অবস্থান নিলেও ভেতরে যায়নি।
তবে সম্প্রতি তাঁর বাড়ির ভেতরে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় সেখানে সম্ভবত একটি ফ্লাইট সিমুলেটর পাওয়া গেছে। একটি ইউটিউব ভিডিওতে জাহারিকে একজনের সামনে বসে থাকতে দেখা গেছে। ভিডিওটি তিনি নিজেই আপলোড করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ১৮ হাজার ৩৬৫ ঘণ্টা ফ্লাইট চালনা করার অভিজ্ঞতা থাকা জাহারি ফ্লাইট প্রশিক্ষক ছিলেন। জাহারির প্রথম সহকারী পাইলট হিসেবে ছিলেন ফারিক আব হামিদ (২৭)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রশিক্ষণ চলাকালে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অধীনে তিনি একটি উড়োজাহাজ অবতরণ করান। ফারিকের ওই অবতরণকে ‘পাঠ্যবইয়ের মতো নিখুঁত’ বলে আখ্যা দেন ওই কর্মকর্তা। ২০০৭ সালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে যোগ দেন ফারিক। দুই হাজার ৭৬৩ ঘণ্টা ফ্লাইট চালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ফ্লাইট সিমুলেটর হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষে বোয়িং ৭৭৭-২০০ উড়োজাহাজটিতে যোগ দেন তিনি। সিএনএন।

প্রধানমন্ত্রীর সম্পদ শুধু দুটি মুঠোফোন!

সুশীল কৈরালা
সাদামাটা জীবনযাপনের জন্য এমনিতে পরিচিত নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা। তাই বলে তাঁর কোনো সম্পদ থাকবে না? তাঁর কোনো বাড়ি নেই, জমি নেই, গাড়ি নেই, কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগ নেই! আছে শুধু দুটি মুঠোফোন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বসন্ত গৌতম গত শনিবার এমন তথ্যই জানান। তাঁর সম্পদ বিবরণী পূরণ করতে গিয়ে কর্মকর্তারা পড়েছেন ভীষণ বিপদে। ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে বাকি ঘরগুলো ফাঁকা রাখতে হচ্ছে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর যে আর কোনো সম্পদ নেই! বসন্ত গৌতম আরও জানান, ৭৫ বছর বয়সী অবিবাহিত কৈরালার কোনো সোনাদানা কিংবা রুপা নেই। তাঁর নামে অন্য কোনো সম্পদও নেই। বসন্ত গৌতম বলেন, ‘এই মুঠোফোন দুটিকে প্রধানমন্ত্রীর সম্পদ হিসেবে আমরা উল্লেখ করতে পারছি না।
এ কারণে সম্পদের বিবরণী কীভাবে পূরণ করব, তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।’ ওই কর্মকর্তা জানান, এমন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সম্পদ উল্লেখ না করেই প্রধানমন্ত্রীর সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন তাঁরা। বিবরণীতে কেবল প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য থাকবে। গত মাসে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন কৈরালা। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ওঠার আগে কাঠমান্ডুর উপকণ্ঠে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। দলের প্রেসিডেন্টের জন্য নেপালি কংগ্রেস ওই বাসাটি ভাড়া করেছিল। কৈরালা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পরও সাদামাটাভাবে জীবন যাপনই করছেন। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রীরা কৈরালার ঠিক উল্টো জীবন যাপন করতেন। এমনকি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি ইউসিপিএ-মাওবাদী প্রধানমন্ত্রীও অনেক বিলাসী জীবন যাপন করতেন। পিটিআই।