Monday, February 16, 2026

জেন-জি অভ্যুত্থানপরবর্তী নির্বাচন: বাংলাদেশে তরুণ শক্তির দৌড় কি রাজপথেই সীমাবদ্ধ

রয়টার্সের বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশে জেন–জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের হাত ধরে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে তরুণদের গঠিত দল পেয়েছে মাত্র ছয়টি আসন। এর মাধ্যমে রাজপথের সেই উত্তাল গণজোয়ারকে ভোটব্যাংকে রূপান্তর করার কঠিন চ্যালেঞ্জটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটাররা দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে বিপুলভাবে জয়ী করেছেন। দলটি এর আগেও তিনবার দেশ শাসন করেছে। সবশেষ ২০০১–০৬ মেয়াদে দলটি ক্ষমতায় ছিল।

অন্যদিকে ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি জোটের অংশ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি।

জোট গঠন নিয়ে সমর্থকদের অসন্তোষ

এনসিপির অনেক সমর্থক বলেছেন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গত ডিসেম্বরে নির্বাচনী জোটে যাওয়াই এনসিপির জন্য কাল হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কারণে তারা কার্যত মূল লড়াই থেকে ছিটকে গেছে।

শুরুতে প্রায় সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এনসিপি শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩০টি আসনে লড়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, ঢাকায় আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য খুন হওয়ার পর নিরাপত্তার খাতিরে বড় একটি দলের ছত্রচ্ছায়ায় যাওয়া প্রয়োজন ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত জনসমর্থন তৈরিতেও ব্যর্থ হয়েছে এনসিপি।

২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষের যে স্বপ্ন ছিল, তারা তা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট করাটা বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে হয়েছে। এ কারণে আমাদের মতো তরুণ ভোটাররা তাদের সমর্থন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

এনসিপির বিজয়ী ৬ প্রার্থীর একজন আবদুল্লাহ আল আমিন (৩২)। তিনি পেশায় আইনজীবী এবং দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব। তিনি বলেন, আরও অনেক আসনে তাঁর দলের জয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিছু আসনে তারা সামান্য ব্যবধানে হেরেছেন।

আল আমিন আরও বলেন, ‘আমাদের যাত্রা সবে শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে বাংলাদেশকে পরিবর্তনের যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চাই।’

নজর স্থানীয় নির্বাচনে

আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় তাঁদের জন্য ছয় আসনে জেতা সহজ হয়েছে।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ মনে করেন, এই জোট সেসব তরুণ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, যারা হাসিনার পতনের পর একটি নতুন ধারার রাজনীতি চেয়েছিলেন।

শাকিল আহমেদ আরও বলেন, অনেক মনে করছেন, দলটি পুরোনো রাজনৈতিক ধারাকে ভেঙে দেওয়ার বদলে সেই ধারাতেই ফিরে গেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার এই সিদ্ধান্তে তরুণদের ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিজেকে আরও সুসংগঠিত ও শাসনক্ষমতার যোগ্য হিসেবে প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, তাঁরা বিরোধী দলে থেকে নিজেদের পুনর্গঠন করবেন এবং এক বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগ দেবেন।

এর আগে গত ডিসেম্বরে দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেছিলেন, দল গোছানোর জন্য তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় তহবিল স্বল্পতা এবং নারী ও সংখ্যালঘু অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অস্পষ্ট অবস্থানের কারণে তাঁরা পিছিয়ে পড়েছেন।

অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, এনসিপি যদি নতুন করে নিজেদের স্বকীয়তা তৈরি করতে না পারে এবং এই জোট থেকে দূরত্ব বজায় না রাখে, তবে তারা জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। সে ক্ষেত্রে তারা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির বদলে কেবল একটি নামসর্বস্ব দলে পরিণত হয়েই থেকে যেতে পারে।

পরাজিত তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম তাসনিম জারা। ৩১ বছর বয়সী এই চিকিৎসক জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রতিবাদে ডিসেম্বরে এনসিপি ছেড়ে ঢাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন। তিনি ৪৪ হাজারের বেশি ভোট পেলেও বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

তাসনিম জারা বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি, পরিচ্ছন্ন ও সৎ প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা যায়। সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট হয়েছে। তবে স্বচ্ছ রাজনীতির ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে আরও দৃঢ় হতে হবে। ভয়ভীতি মোকাবিলায় সক্ষম আমাদের এমন একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

নির্বাচনে নিজের পাওয়া ভোটের সংখ্যা তুলে ধরে তাসিনম জারা আরও বলেন, ব্রিটেনে চিকিৎসাপেশায় ফিরে না গিয়ে তিনি দেশেই রাজনীতি চালিয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সেরা সময় এখনো সামনে।’

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নিজের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন নাহিদ ইসলাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নিজের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন নাহিদ ইসলাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

‘চার কারণে’ সাতক্ষীরার সব আসনে বিএনপির ভরাডুবি by কল্যাণ ব্যানার্জি

সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। এর মধ্যে দুটি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বাকি দুটি আসনে কার্যত প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। বিশেষ করে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ও তরুণ প্রার্থী মো. মরিুজ্জামানের পরাজয় দলটির নেতা-কর্মীদের হতাশ করেছে। বিপরীতে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ায় জামায়াত নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।

স্থানীয় নেতা-কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিএনপির এই ভরাডুবির পেছনে চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত ও বিদ্রোহী প্রার্থী, ৫ আগস্টের পর একটি সময় পর্যন্ত কিছু নেতা-কর্মীর চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট গঠন এবং নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে নিতে না পারা।

রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরাকে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হয়। চার বিজয়ীর মধ্যে সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য তিনজন এবারই প্রথম প্রার্থী হয়ে জয় পেয়েছেন। নতুনদের মধ্যে আছেন সাতক্ষীরা-১ (কলারোয়া-তালা) আসনে মো. ইজ্জত উল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে আব্দুল খালেক এবং সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে মুহা. রবিউল বাশার।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া)
এই আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও হেভিওয়েট প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ২৩ হাজার ৭৭৭ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯৫ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭২ ভোট।

স্থানীয় লোকজনের ধারণা ছিল, জেলার অন্য আসনে হারলেও এ আসনে জয় পাবে বিএনপি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, যার সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। এসব নিয়ন্ত্রণে হাবিবুল ইসলাম পুরোপুরি সফল হননি। পাশাপাশি নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার কার্যকর পাল্টা যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি দলটি।

সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা)

এ আসনে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের আব্দুল খালেক। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল রউফ পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৯৩ ভোট।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের মতে, আগে থেকেই এ আসনে তাঁদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। প্রার্থী হিসেবে আব্দুল রউফকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। আব্দুল আলিম ও তাজকিন আহমেদ মনোনয়ন দাবি করে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে একসঙ্গে কাজ করলেও ভেতরে বিরোধ ছিল। এ ছাড়া কুলিয়া এলাকার চিংড়ি রেণু সিন্ডিকেট নিয়েও বিতর্ক ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি)
আসনটিতে ৭৮ হাজার ৮৫৪ ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থীকে হারিয়ে জয় পান জামায়াতের রবিউল বাশার। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৩ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৯ ভোট এবং বিএনপি প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৮১৯ ভোট।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহিদুল আলম দীর্ঘদিন এলাকায় সক্রিয় থাকলেও দলীয় মনোনয়ন পান কাজী আলাউদ্দীন। এতে বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে টানা আন্দোলন হয়। শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না বদলানোয় শহিদুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে তাঁর পক্ষে কাজ করার অভিযোগে বিএনপির ৬৭ জন নেতাকে দলীয় সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীই এ আসনে বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ।

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)
এ আসনে ২১ হাজার ৪৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট। বিএনপির মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট।

স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, আগে থেকেই এ আসনে দলীয় কোন্দল ছিল। মনিরুজ্জামানকে প্রার্থী করায় দলের একটি অংশ অসন্তুষ্ট ছিল। তাঁরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও ভেতরে ভেতরে নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে গোপনে প্রচার চালানোর অভিযোগও আছে। পাশাপাশি বালু সিন্ডিকেটের প্রভাবও নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বিএনপির নেতা–কর্মীরা আরও বলেন, নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার বিরুদ্ধে বিকল্প হিসেবে শক্ত কোনো যুক্তি দাঁড় করাতেও পারেননি। এ ছাড়া শ্যামনগরের বালি সিন্ডিকেটের প্রভাব প্রতিপত্তিও প্রভাব ফেলেছে।

বিএনপির প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কথা বলতে চাননি। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর জামায়াত সংগঠন গোছাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে এবং তাঁদের মধ্যে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁরা বিভিন্ন কৌশলে নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে পেরেছেন।

আবু জাহিদের ভাষ্য, বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে দেরি করেছে। ৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন দেওয়া শুরু হলেও ২৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত হয়। এতে সময় নষ্ট হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে সময় লেগেছে। প্রার্থী নির্বাচনেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল বলে তিনি স্বীকার করেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2F9k2nniyz%2FWhatsApp-Image-2026-02-13-at-9.01.45-AM.jpeg?rect=0%2C0%2C1599%2C1066&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয়ী প্রার্থী ইজ্জত উল্লাহ, মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, মুহা. রবিউল বাসার ও গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

আগামীকাল সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথেরও প্রস্তুতি চলছে by রিয়াদুল করিম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আগামীকাল মঙ্গলবার সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ নেবেন। একই সঙ্গে তাঁদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও আলাদা শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচিতদের দুটি শপথের বিষয়ে প্রস্তুতিও নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগামীকাল দুটি শপথ হবে কি না বা জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে এখনই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে।

দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপির একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, দলটি মনে করছে, বিদ্যমান সংবিধানে যা আছে সেটা অনুসরণ করাই যৌক্তিক হবে। বিদ্যমান সংবিধানে শুধু সংসদ সদস্যদের শপথের কথা বলা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা এ ধরনের কিছু নেই। যদি সংবিধানে কখনো এটি ধারণ করা হয়, তখন এ রকম শপথের বিষয়টি আসবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আইনি ভিত্তি নিয়েও শুরু থেকে বিএনপির প্রশ্ন আছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। আগামীকাল সকালে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হবে মন্ত্রিসভার শপথ। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর শপথ বইয়ে সই করেন। শপথ নেওয়ার নির্ধারিত ফরম আছে। এগুলো আসনওয়ারি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের তফসিলে আছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার ফরম। সেটি অনুসারে সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেবেন, এমন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গতকাল রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ হবে। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।

তবে গতকাল বিএনপির সূত্র জানায়, আগামীকাল দলটি থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন এবং তাদের মিত্র দলের ৩ জন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নাও নিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এমনটা হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি ঝুলে যেতে পারে।

জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিয়ে ভিন্নমত আছে বিএনপির। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রায় সব বিষয়ে একমত। তারা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায়।

গতকাল কিশোরগঞ্জে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।’

সংস্কার বাস্তবায়নে পরিষদ

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেগুলো নিয়ে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সম্পর্কিত, এগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়েছে। তাতে ‘হ্যাঁ’জয়ী হয়েছে।

সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর। ইতিমধ্যে দুটি স্তর পার হয়েছে। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট হয়েছে । এতে ‘হ্যাঁ’জয়ী হওয়ায় তৃতীয় স্তর শুরু হওয়ার কথা। এই স্তরে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা আছে আদেশে।

প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমানো, কিছু নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, আইনসভা দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি সরাসরি সংবিধানে যুক্ত করার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে।

অবশ্য উচ্চকক্ষের গঠন পদ্ধতিসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দিয়েছিল বিএনপি। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নিজেদের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো রেখেছিল।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভিত্তি কী

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু এবার নিয়মিত সংসদ নয়, সংবিধান সংস্কারে কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ-এমনটি বলা হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে।

দলগুলোর সঙ্গে সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এ ধরনের একটি পরিষদ গঠনের বিষয়টি এসেছিল। তখন বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান-সম্পর্কিত যেসব সংস্কার প্রস্তাব জুলাই সনদে আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে। নিয়মিত সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ আছে। এভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে পরে এটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কিন্তু যদি আগামী সংসদকে সংবিধান সংস্কারের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকবে না। তবে ওই আলোচনায় বিএনপি এ ধরনের পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই-এমন মত দিয়েছিল।

এ ছাড়া সনদ বাস্তবায়নে অধ্যাদেশ নয়, একটি আদেশ জারির প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপি এর বিপক্ষে ছিল। তারা বলেছিল, এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।

পরে এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদেরও মত নিয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ’জারি করেন। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও রাখা হয়।

১৩ নভেম্বর এ আদেশ জারির পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে একটি নতুন আইডিয়া, একটা পরিষদ গঠনের কথা আদেশে বলা হয়েছে। তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করেছেন। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা আছে। সংবিধান মোতাবেক আদেশ জারির ক্ষমতা নেই।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ কাজ করবে কীভাবে

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে একই পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম সভা আহ্বান করা হবে। সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদের সদস্যরা সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচন করবেন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। তবে এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন না হলে কী হবে তা আদেশে উল্লেখ নেই।

আদেশে বলা হয়েছে, সংস্কার পরিষদের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ‘পরিষদ সদস্য’হিসেবে অভিহিত হবেন। পরিষদ তার অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবি, সংবিধান সংস্কার বিষয়ক প্রস্তাব উত্থাপনের পদ্ধতি, প্রস্তাব বিবেচনা ও গ্রহণ এবং অন্য সব বিষয়ে কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করবে। সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তত ৬০ জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত হবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উচ্চকক্ষ কবে

আদেশে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্য দিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে এবং কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে সদস্যদের শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত। উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে যে-কোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্দেশ্যে পরিষদ প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন করতে পারবে এবং সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারবে।

আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাবে একমত হলেও এর গঠন পদ্ধতি ও ক্ষমতা নিয়ে ভিন্নমত ছিল বিএনপির। দলটি নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের পক্ষে। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বাধ্য-বাধকতারও বিপক্ষে বিএনপি। দলটি যেভাবে উচ্চকক্ষ চায় সেটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছিল।

গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আইনগত বিবেচনার চেয়েও রাজনীতিতে প্রথম এবং প্রধান বিবেচনাটা আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। …আমরা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, জনরায় (গণভোটে হ্যাঁ জিতেছে) হয়েছে, আবার রাজনৈতিক দলের প্রতিও জনগণের সমর্থন দেখা গেছে। ফলে এর মধ্যে একটি সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা রাজনীতিকদের।’

জাতীয় সংসদ ভবন
জাতীয় সংসদ ভবন

২৮ আসনে জয়-পরাজয়ে যেভাবে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা by আসিফ হাওলাদার

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

যেসব আসনে বিদ্রোহীদের কাছে বিএনপি বা দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন, সেগুলো হলো ময়মনসিংহ-১, দিনাজপুর-৫, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-৩, চাঁদপুর-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।

বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। ময়মনসিংহ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৯২৬ ভোট। তাঁর চেয়ে ৬ হাজার ৩৩৯ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ সালমান ওমর।

বিদ্রোহীতে ধরাশায়ী বিএনপির জোটসঙ্গীরা

ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট পেয়ে তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ ভোট।

বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ‘ভাগ’ হয়ে যাওয়ায় এই আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব। ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা।

সিলেট-৫ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। এই আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। দেয়ালঘড়ি প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি। তিনি হেরেছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিনের কাছে। কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। জয়ী হওয়া আব্দুল্লাহ আল আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট।

এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা হলেন মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট আর গিয়াস পেয়েছেন ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। অর্থাৎ ভোট ‘ভাগ’ না হলে কাসেমীর জয় নিশ্চিত ছিল।

ধানের শীষ পেতে দলত্যাগ, তবু হার

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করেছেন রেদোয়ান আহমেদ। তাঁকে ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম (শাওন)।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী হন। ভোটে তিনি তৃতীয় হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪৫ হাজার ৪৬৩। তাঁকে ৭২ হাজার ৬৭৯ ভোটে পরাজিত করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আতাউর রহমান। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুল ইসলাম ৭৮ হাজার ৪৫৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করে তিনি ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯ ভোট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পেয়েছেন ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট।

বিএনপিতে বিদ্রোহী থাকায় যেসব আসনে সুবিধা পেল জামায়াত

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় যে ২১টি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থীরা সুবিধা পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসন অন্যতম।

বাঁশখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রামের এই আসনে ১০ হাজার ৬২ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

পাবনা-৪ আসনটির কথাও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। এই আসনে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৫ ভোট পেয়ে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডল। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৪ ভোট। দুজনের ভোটের পার্থক্য ৩ হাজার ৭০১।

এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু পেয়েছেন ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট। অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ায় অল্প ব্যবধানে হারতে হয়েছে হাবিবকে।

বাগেরহাট-১ আসনে ৩ হাজার ২০৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মশিউর রহমান খান। এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মো. শেখ মাছুদ রানা পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৬৭ ভোট এবং এম এ এইচ সেলিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। দুজনের মোট ভোট ১১ হাজার ৭৫০। অর্থাৎ এই দুই নেতা বিদ্রোহী না হলে বিএনপি প্রার্থী কপিলের সুবিধা হতে পারত।

একই রকম বা কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসনে।

ময়মনসিংহ-৬ সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এখানে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান। তিনি পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৩২৫ ভোট। এই আসনে জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৫১ হাজার ৯৭০ ভোট।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আখতারুল আলম পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৪৭৬ ভোট পান। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আখতার সুলতানা পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৩৩১ ভোট।

ঢাকা-১২ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান
ঢাকা-১২ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

তারেক-শফিকুর বৈঠক: এ ধরনের ‘নতুন সংস্কৃতি’ নিজেদের ভেতরে একটা গুণগত পরিবর্তন -তাহের

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, এ ধরনের ‘নতুন সংস্কৃতি’ নিজেদের ভেতরে একটা গুণগত পরিবর্তন।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় যান। দুই নেতার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

দুই নেতার সাক্ষাতের বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, ‘এটাকে আমরা ওয়েলকাম করি (স্বাগত জানাই)। আমি মনে করি, এ ধরনের নিউ কালচার (নতুন সংস্কৃতি) নিজেদের ভেতরে থাকাটা একটা গুণগত পরিবর্তন।’

আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। এ সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার প্রসঙ্গ তুলে ভবিষ্যতেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্মিলিতভাবে কাজের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, নিজেদের ভেতর আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াত মৌলিকভাবে একমত হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপিকে অগ্রাধিকার নির্ধারণেও পরামর্শ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি), মানুষের সিকিউরিটি (নিরাপত্তা)...এ বিষয়ে যেন সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।’

এ ছাড়া মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তনে বিএনপির গঠিত সরকার যেন কাজ করে, সে বিষয়েও জামায়াতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এই নায়েবে আমির।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে বিএনপির চেয়ারম্যান রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় প্রবেশ করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। এ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় বিএনপির একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেই জামায়াতের আমিরের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। সেখানে কুশলাদি বিনিময় ছাড়াও সমসাময়িক বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন। সাক্ষাৎ শেষে রাত ৭টা ৫৮ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহনকারী গাড়িটিকে জামায়াতের আমিরের বাসভবন ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

ইরানে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রূপান্তরে নেতৃত্ব দিতে আমি প্রস্তুত: রেজা পাহলভি

প্রকাশ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি বলেন, তিনি দেশটিতে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার জন্য নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত আছেন। ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়াটাই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’ বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর গতকাল শনিবার জার্মানির মিউনিখে এক সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে দেশটির সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সুইজারল্যান্ড বলেছে, আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান সরকার আগামী সপ্তাহে জেনেভায় নতুন দফা বৈঠকের আয়োজন করবে। আর এর মধ্যেই রেজা পাহলভি ইরানে নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছেড়েছিলেন। তারপর আর দেশে ফেরেননি। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

গতকাল মিউনিখে প্রায় দুই লাখ সমর্থকের সামনে বক্তব্য দেন রেজা পাহলভি। তিনি বলেন, ‘একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতে পাড়ি দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে আমি এখানে এসেছি।’

রেজা পাহলভি আরও বলেন, ‘আপনাদের জন্য রূপান্তরের নেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ, যেন একদিন আমরা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ পাই।’

এ সময় উপস্থিত জনতা ‘জাভিদ শাহ’ (শাহ দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগান দিচ্ছিলেন। তাঁরা সিংহ ও সূর্যের ছবিযুক্ত সবুজ, সাদা ও লাল রঙের পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। পতাকার ছবিটি ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের প্রতীক।

ওই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ৬২ বছর বয়সী ইরানি নাগরিক সাইদ। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি মৃত শাসনব্যবস্থা। এর অবসান হওয়া উচিত।’

রেজা পাহলভি দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা ইরানি নাগরিকদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাঁদের শনি ও রোববার ইরানি সময় রাত আটটায় নিজেদের বাড়ি ও ছাদের ওপর থেকে স্লোগান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যেন জার্মানি ও অন্যান্য দেশে চলমান প্রতিবাদ একযোগে হতে পারে।

গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউন থেকে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মল পর্যন্ত বিভিন্ন সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

কানাডার টরন্টোয় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘ট্রাম্প, এখনই পদক্ষেপ নিন।’
গত শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’ হতে পারে। তেহরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দ্বিতীয় আরেকটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজও পাঠিয়েছেন।

ইরানে গত মাসে বিক্ষোভ জোরালো হয়ে ওঠার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ওই আন্দোলনকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ইরানে ওই বিক্ষোভ চলাকালে ব্যাপক ধরপাকড় ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।

গতকাল সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জড়ো হওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করেন পাহলভি। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলছি… ইরানের মানুষ আপনাকে বলতে শুনেছে যে, তাদের জন্য সাহায্য আসছে। আপনার ওপর তাদের আস্থা আছে। তাদের সাহায্য করুন।’

রেজা পাহলভি আরও বলেন, ‘এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটার সময় এসেছে।’
জানুয়ারিতে ইরানে সরকারি দমন–পীড়ন শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত আছে।

তবে খুব সম্প্রতি ট্রাম্পকে বিক্ষোভকারীদের চেয়ে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে দেখা গেছে। মূলত এখন তাঁর সামরিক হুমকিগুলো তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেন্দ্রিক। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলো তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলা চালিয়েছিল।

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা গত সপ্তাহে ওমানে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান আগামী সপ্তাহে জেনেভায় নতুন করে বৈঠকের আয়োজন করবে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

মিউনিখের সমাবেশে রেজা পাহলভি। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মিউনিখের সমাবেশে রেজা পাহলভি। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে আশ্বস্ত করেছেন: জামায়াত আমির

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আশ্বস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় যান। এর ঠিক আধা ঘণ্টা পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ পোস্ট দেন শফিকুর রহমান।

সেখানে জামায়াতের আমির লেখেন, ‘আমাদের আলোচনায় তিনি (তারেক রহমান) আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এ আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’

জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে জামায়াত পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবে উল্লেখ করে পোস্টে শফিকুর রহমান লেখেন, ‘তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব।’

জামায়াতের আমির লেখেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়; বরং সংশোধন, বাধা দেওয়া নয়; বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

শফিকুর রহমান আরও লেখেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁর এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তাঁর এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’

ফেসবুক পোস্টে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ থেকে

নাহিদ ইসলামের বাসায় তারেক রহমান

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সাক্ষাতে নাহিদ তারেক রহমানকে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই যাতে একসঙ্গে থাকতে পারেন, সংলাপের মধ্য দিয়ে যাতে যেকোনো সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো যায়। বিএনপির পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার দুই দিন পর আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদের বাসায় যান তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও ছিলেন।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাহিদের বাসার ড্রয়িং রুমে তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎ হয়। এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত আখতার হোসেন এবং দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম নাহিদের সঙ্গে ছিলেন। প্রথমেই তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান নাহিদ। এরপর শহীদ আনাসের ফ্রেমে বাঁধা সেই মর্মস্পর্শী চিঠি তারেক রহমানকে উপহার দেন তিনি। এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলির একটি স্টিলের তৈরি প্রতিকৃতিও বিএনপির চেয়ারম্যানকে উপহার দেন নাহিদ ইসলাম। পরে দুজন বসে আলোচনা শুরু করেন।

আলোচনা শেষে রাত সোয়া নয়টার দিকে নাহিদের বাসা থেকে বের হয়ে যান তারেক রহমান। বাইরে সাংবাদিকেরা থাকলেও তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারেক রহমান চলে যাওয়ার পর নাহিদের বাসার নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘জনাব তারেক রহমান ও জনাব নাহিদ ইসলাম আজকে সৌজন্য সাক্ষাতে একত্রে বসেছেন। নির্বাচনে কয়েকটি আসনের ফলাফল নিয়ে এনসিপির প্রশ্ন থাকলেও তারেক রহমান যে রাজনৈতিক সৌজন্যবোধের জায়গা থেকে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, এই রাজনৈতিক সৌজন্যতা এবং তাঁর জয়ী হয়ে আসাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। নিজেদের মধ্যে মতভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা কীভাবে একত্রে দেশের জন্য কাজ করতে পারি, সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। সংস্কারের প্রশ্নকে কীভাবে সুরাহা করা যায় এবং বিচারের প্রশ্ন নিয়েও আমরা কথা বলেছি।’

তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলাম এবং বিএনপি ও এনসিপির এই নির্বাচন–পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা পরিবর্তনের আভাস দেয় উল্লেখ করে আখতার বলেন, ‘আমরা মনেপ্রাণে চাই, আমাদের রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য আলাদা হবে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে সব দল একসঙ্গে থাকব। সে ধরনের পরিবেশ অটুট থাকবে, এই প্রত্যাশা আমরা রাখছি।’

কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ‘পলিসি ডায়ালগের’ (নীতি–সংলাপ) মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেসব বিষয়েও তারেক রহমানের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান এনসিপির সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন–পরবর্তী যেসব সহিংসতা বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে, সেসব নিয়েও আমরা তারেক রহমানকে জানিয়েছি। তাঁদের দলের পক্ষ থেকে সে বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থানে জীবন দেওয়া ও অঙ্গহানি হওয়া বীর শহীদ ও গাজীদের পরিবারের যথোপযুক্ত পুনর্বাসন নিয়েও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আখতার। তিনি বলেন, নির্বাচন–পরবর্তী এই সৌজন্য সাক্ষাৎ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।

পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে থাকা যেকোনো রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে চায়—এমন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, পলিসির (নীতির) ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যাতে একত্রে বসতে পারি, সংলাপের মধ্য দিয়ে যাতে আমরা সমাধানে পৌঁছাতে পারি, সে ব্যাপারে নাহিদ ইসলাম আহ্বান জানিয়েছেন। সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বিএনপির নেতারাও জোরারোপ করেছেন। আমরা আশাবাদী, আজকের এই সাক্ষাৎ বা সংলাপের মধ্য দিয়েই আমরা দেশের সংকটকে সমাধানের দিকে নিতে পারব।’

বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগদানের কোনো আহ্বান এনসিপি পেয়েছে কি না, জানতে চাইলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এটা নির্বাচন–পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ। রাজনৈতিক যেসব বিষয়বস্তু থাকে, সে রকম কোনো বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়নি। নির্বাচনে জয়ী দল ও বিরোধী দল হিসেবে যাঁরা ফাংশন করবেন, তাঁদের মধ্যকার একটা সম্পর্কের সূচনা হিসেবে আজকের এই সাক্ষাৎ। অন্যান্য রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা হয়নি। সে বিষয়গুলো সামনের দিনে আমাদের মধ্যে আরও আলোচনা হবে। তখন এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানানো যাবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে বাসায় স্বাগত জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে বাসায় স্বাগত জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেলের সৌজন্যে

নিরঙ্কুশ জয়ের পর বাংলাদেশের নতুন নেতা কি পরিবর্তন আনতে পারবেন

বিবিসির বিশেষ প্রতিবেদনঃ মাত্র দুই বছর আগে শেখ হাসিনা যখন তাঁর পক্ষে কারচুপি করার অভিযোগে অভিযুক্ত এক নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তখন ভাবা কঠিন ছিল যে দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্ষমতার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এভাবে হঠাৎ ভেঙে পড়বে। কিংবা কার্যত বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া একটি বিরোধী দল এমনভাবে বিশাল ব্যবধানে ফিরে আসবে।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের চক্রে এটি হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার আরও একটি হাতবদলমাত্র। কয়েক দশক ধরে এ দুই দলই পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করে আসছে।

ব্যতিক্রম শুধু এটিই যে এবারই প্রথম বিএনপির নতুন নেতা তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও প্রথমবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

গত বছরের শেষ দিকে অসুস্থতায় তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া মারা যান। বিএনপির প্রয়াত এই চেয়ারপারসন চার দশক ধরে দলের প্রধান ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা দলের হাল ধরেছিলেন।

মায়ের শাসনামলে স্বজনপ্রীতির সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ যেমন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে, তেমন তিনি দুর্নীতির অভিযোগেরও মুখোমুখি হয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে লন্ডনে ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তিনি।

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান তাঁর মায়ের কারাবাস ও অসুস্থকালীন মাঝেমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া বিএনপির ‘ডি-ফ্যাক্টো’ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি মূলত একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচিত নন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভীন মুর্শিদ বলেন, ‘তাঁর (তারেক রহমান) পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকাটা তাঁর জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, মানুষ পরিবর্তনের সুযোগ দিতে চায়। ভাবতে চায়, নতুন ও ভালো কিছু করা প্রকৃতপক্ষেই সম্ভব। তাই অনেক আশা রয়েছে।’

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, ‘গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলো আমাদের আগে ঠিক করতে হবে।’

বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরে তা ভাঙার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।

তবে এবার ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্ম, যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তারা আর এমন ধারার (পুরোনো) রাজনীতি মেনে নিতে রাজি নয় বলে মনে হচ্ছে।

অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আর লড়াই করতে চাই না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় ছিল না। আমাদের দেশ যখন কোনো দুর্নীতি ছাড়া চলবে ও অর্থনীতি ভালো হবে, সেটাই হবে আমাদের মূল বিজয়।’

তাজিনের ২১ বছর বয়সী স্বজন তাহমিনা তাসনিম বলেন, ‘আমরা প্রথমেই মানুষের মধ্যে ঐক্য চাই। আমাদের একটি স্থিতিশীল দেশ ও অর্থনীতি পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি এবং জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। তাই, যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, আমরা আবার রাস্তায় নামার অধিকার রাখি।’

হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামল সংঘাতের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে।

নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এ ছাড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, খাদ্যদ্রব্যের দাম কমানো এবং বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও হবে বিশাল চ্যালেঞ্জ।

সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা মনে করেন, সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতার অভাব সব দলের ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুবার নিষিদ্ধ হওয়া ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য এবারই প্রথম উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন জয়ের অভিজ্ঞতা হলো।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ও জামায়াতে ইসলামীর জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের প্রথম নির্বাচনেই ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।

লুৎফা বলেন, ‘আমরা সংসদে এমন সব নেতাদের দেখতে যাচ্ছি, যাঁরা আগে কখনো সংসদে যাননি। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও তাঁদের দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই এটি একটি কঠিন কাজ হতে যাচ্ছে।’

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী। সেখানে ইসলামি আইনের কোনো উল্লেখ ছিল না। কিন্তু দলটির ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ‘জামায়াত রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করে, কারণ রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’ আর এটিই সব সময় প্রশ্ন তুলেছে যে দলটি ক্ষমতায় এলে প্রকৃতপক্ষে কী করবে।

নাভীন মুর্শিদ বলেন, এই নির্বাচনে জামায়াতের ফলাফল আশ্চর্যজনক কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘জামায়াত একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। কয়েক দশক ধরে তারা তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করেছে। আমি মনে করি, সেটি স্বীকার করতে হবে। তবে দলটির সমস্যাযুক্ত দিক হলো তারা মূলত “গণতন্ত্রবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও পিতৃতান্ত্রিক”।’

লুৎফা বলেন, সব রাজনৈতিক দলই বাংলাদেশের নারীদের হতাশ করেছে। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি ছিল নারী। তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব নারী জুলাই অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম, সব রাজনৈতিক দল আমাদের সেই সম্মিলিত ভূমিকাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা নির্বাচনী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন সংসদ সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তাঁরা সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নিয়ে আসতে পারেন।’

বাংলাদেশের ৩৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত। বাকি ৫০টি সংরক্ষিত আসন দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে মনোনীত নারীদের জন্য বরাদ্দ।

যদিও হাসিনার অধীন গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এ নির্বাচন ছিল একদম ভিন্ন, যেখানে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়েছে এবং ভোটের আগে ফলাফল জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর দলকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এর গ্রহণযোগ্যতার ওপর একটি ছায়া ফেলেছে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে তাঁরা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সমর্থন করবেন কি না, তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়।’

এই নেতা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরতে সময় লাগবে। কারণ, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যখন আপনি আপনার নিজের দেশের মানুষকে হত্যা, নৃশংসতা ও নিপীড়ন করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, তখন ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কোথায় হবে, তা জনগণই ঠিক করবে।’

ভারত থেকে শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবারের এ নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং আবার নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে।

বর্তমানে হাসিনার দলের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় আওয়ামী লীগকে চিরতরে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়াটা হবে অপরিপক্বতা।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী দীপেন, কম ভোটে হানজালা

মাত্র ৩৮৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ের ঘটনা যেমন আছে, তেমনি দেড় লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ের নজিরও রয়েছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন পার্বত্য রাঙামাটি আসনে বিএনপির প্রার্থী দীপেন দেওয়ান। অপর দিকে সবচেয়ে কম ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ছিলেন মাদারীপুর-১ আসনে। তাঁর কাছে মাত্র ৩৮৫ ভোটের ব্যবধানে হারেন বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার।

এবার নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে (প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। এ পর্যন্ত ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো ২১২টি, জামায়াতে ইসলামী ও মিত্র দলগুলো ৭৭টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন। আইনি জটিলতার কারণে দুটি আসনে ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি।

দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেড় লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন মোট চারজন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে তিনজন বিএনপির এবং একজন জামায়াতে ইসলামীর। তাঁরা হলেন রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. হারুন-অর-রশিদ, জামালপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং সাতক্ষীরা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ আবদুল খালেক।

এ ছাড়া এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন আরও ২৬ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন বিএনপির, ১ জন জামায়াতের এবং ১ জন জামায়াতের নির্বাচনী জোটে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)।

সর্বাধিক ভোটে জয়ী দীপেন দেওয়ান রাঙামাটিতে হারিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমাকে। তাঁদের ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২২। ধীনের শীষ প্রতীকে দীপেন দেওয়ান পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট। পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পান ৩১ হাজার ২২২ ভোট। এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখের বেশি।

রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. হারুন-অর-রশিদ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৫৫ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৩৭ হাজার ২৫৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত–সমর্থিত ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী এনসিপির জামিল হিজাযী পেয়েছেন ৬৭ হাজার ২৯৯ ভোট। এ আসনে ভোটার সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখের বেশি।

জামালপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬ হাজার ২১৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. মুজিবুর রহমান আজাদী পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৬১ ভোট। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি।

সাতক্ষীরা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ আবদুল খালেক ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৩০ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. আবদুর রউফ পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২২৯ ভোট। এ আসনে ৫ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি ভোটার রয়েছেন।

কম ভোটের ব্যবধানে জয়

মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৪ হাজার ৯০৯ ভোট। বিএনপির নাদিরা আক্তার ধানের শীষ প্রতীকে পান ৬৪ হাজার ৫২৪ ভোট। আসনটিতে মোট ভোটার ছিলেন সোয়া তিন লাখের বেশি।

এরপর সবচেয়ে কম ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন সিরাজগঞ্জ–৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম খান। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৭২। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এম আকবর আলী পান ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৮ ভোট। এ আসনে ভোটার সংখ্যা পৌনে পাঁচ লাখের বেশি।

কক্সবাজার–৪ আসনে ৯২৯ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৯০৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী। তিনি পান ১ লাখ ২১ হাজার ৯৮০ ভোট। এই আসনে ভোটার পৌনে চার লাখের বেশি।

চট্টগ্রাম–১৪ আসনে ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন বিএনপির জসীম উদ্দীন আহমেদ। তিনি পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের নির্বাচনী ঐক্যে থাকা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ওমর ফারুক। তিনি পান ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। এই আসনে ভোটার ৩ লাখ ১৩ হাজারের বেশি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৫ আসনে ১ হাজার ৬১ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন বিএনপির মো. আবদুল মান্নান। তিনি পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৭৬৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন। তিনি পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৭০৮ ভোট। এই আসনে ভোটার প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ।

জাতীয় পার্টি নিয়ে মানুষের আর ‘ওই আবেগ নাই’ by জহির রায়হান

রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনঃ রংপুর নগরের কেরামতিয়া জামে মসজিদ। গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সামনের চা-দোকানে গল্পে মেতেছিলেন মুন্সিপাড়ার সবুজ আলী, মকবুল হোসেন, আহম্মদ মিয়ারা। আলোচনার মূল বিষয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।

ভোটের ফলাফলে বিস্মিত সবুজ আলী বলেন, ‘ভোটের আগে মনে হচ্ছিল এবার রংপুরে জাতীয় পার্টি হারবে। কিন্তু এ রকম শোচনীয়ভাবে হারবে, এটা চিন্তা ছিল না।’

কথার ফাঁকে সত্তরোর্ধ্ব সবুজ আলী নিজেকে জাতীয় পার্টির একজন কর্মী পরিচয় দেন। বলেন, ‘এরশাদ যখন জেলে, সেই ’৯১ সালে, তখন থেকে লাঙ্গলকে ভোট দেই। এবারও দিছি। কিন্তু জাতীয় পার্টিক নিয়া রংপুরের মানুষের আর ওই আবেগ নাই। মানুষ এবার মুখ ফিরি দিছে।’

সবুজ আলীর এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায় গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে। জাতীয় পার্টির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগে কোনো আসন পায়নি জাতীয় পার্টি। এমনকি রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনেও দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের হেরেছেন।

বিভাগের ৮ জেলায় সংসদীয় আসন ৩৩টি। এর মধ্যে ১৮টি আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। জামায়াতের প্রার্থীরা ১৬টিতে এবং ২টিতে জয় পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা। বিএনপি পেয়েছে ১৪টি আসন। একটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থী।

জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের মানুষ। শহরে তাঁর পুরোনো বাড়ি রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি জেল থেকে প্রার্থী হয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জিতেছিলেন। সেই নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ১৭টি আসন জিতে জাপা। ১৯৯১ সালের পর আরও তিনটি নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ভালো ফল করে জাপা। ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসন পেয়েছিল জাপা।

রংপুর-৪ আসনের জয় পাওয়া এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রংপুরের ৬টি আসনে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগ নাই হয়ে গেছে, তেমনি জাতীয় পার্টিকেও রংপুরের মানুষ প্রত্যাখান করেছেন।

জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময়

এবার বিভাগে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতের আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে মাত্র একটিতে করে জয়লাভ করেছিল। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি জামায়াত। ১৮ বছর পর এই অঞ্চলে জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিকাশ নেই। তারা কী করতে চায়, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তারা রংপুর অঞ্চলের মানুষের ইমোশন (আবেগ) নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু মানুষ এবার ‘হামার ছওয়াল ইমোশনে’ সাড়া দেয়নি। জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখান করা ‘সংক্ষুব্ধ’ ভোটারদের জামায়াত কাজে লাগাতে পেরেছে বলেই মনে করেন তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলায় ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে আসছিল জামায়াত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব আসনে ঘিরে জোরালো তৎপরতা শুরু করে দলটি। ভোঠের মাঠে তাদের এমন সাংগঠনিক দক্ষতা ও কৌশল এবার ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এ টি এম আজম খান প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে এই এলাকায় জামায়াত-বিএনপির প্রভাব ছিল না। যার কারণে মানুষ নতুনটাকে বেছে নিয়েছে।

আগামী দিনে ভালো করতে চায় বিএনপি

অতীতের তুলনায় এবার রংপুরে বিএনপির আসনও বেড়েছে। ১৯৯১ সালে বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ১টি ও ১৯৯৬ সালে ৩টি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে বিএনপি ৯টি আসন পেলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটিকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিহাটের ১৪টি আসন পায়। দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ধরলে এই ৪ জেলার ১৫টি আসনেই তাদের দখলে। কিন্তু বিভাগীয় শহর রংপুরসহ কুড়িগ্রাম, নীলফামারীতে কোনো আসন পায়নি বিএনপি। গাইবান্ধার ৫টি আসনের মধ্যে শুধু গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী শামীম কায়সার জয়লাভ করেন।

বিএনপি রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন না করার কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
রংপুরের একজন বিএনপি নেতা প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও বিএনপি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রংপুরকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নগন্য। আবার যাঁরা আছেন, তাঁরাও রংপুর থেকে ভোট করেননি। স্থানীয় নেতাদের ওপর ভোটারদের আস্থার সংকট ছিল। যে সংকট ঠাকুরগাঁও বা লালমনিরহাটে ছিল না।

তবে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) আবদুল খালেক প্রথম আলো বলেন, ‘প্রতিটি জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। অনেক জায়গায় বিএনপি-জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ভোট কাটাকাটি করেছেন, মাঝখান দিয়ে জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তবে বিএনপির যাঁরা হেরেছেন, খুব অল্প ভোটে হেরেছেন। এটা কোনো সমস্যা নয়। সাংগঠনিকভাবে কাজ করলে আগামী দিনে এগুলো ভালো হবে।’

ভুলত্রুটি খুঁজছে জাতীয় পার্টি

রংপুর বিভাগে নীলফামারী সদর আসন বাদ দিয়ে ৩২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। কোনোটিতে জাতীয় পার্টি জিতেনি। দলের সাধারণ সম্পাদক গাইবান্ধার দুটি আসনে ভোট করলেও একটিতে তৃতীয় হয়েছেন, আরেকটিতে জামানত হারান।
রংপুরে জাপা নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের অন্তত তাঁর আসনে জিতবেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন এ আসন ধরে রাখার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে। এর পর থেকে রংপুরের মানুষের আলোচনায় জি এম কাদের।

জাপা নেতারা অবশ্য দলের চেয়ারম্যানের হারকে মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা এটিকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে দেখছেন। জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আজমল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গণসংযোগ করেছি। প্রতিটা বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। সবাই স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় পার্টির পক্ষে সাড়া দিছে। এখানে জাতীয় পার্টির এই ধরনের রেজাল্ট হওয়ার কথা না। এটা “সূক্ষ্ম কারচুপি” ছাড়া আর কিছু হয়নি।’

জাপা চেয়ারম্যানের গতকাল ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন ও সাংবাদিকদের বিফ্রিং করার কথা থাকলেও করেননি। সারা দিন তাঁর রংপুরের বাসভবন দ্য স্কাই ভিউতে ছিলেন।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল থেকে জাতীয় পার্টি রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকার নেতা–কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। বেলা দুইটার পর তিনি ঢাকার উদ্দেশে চলে যান। জি এম কাদের ভোট নিয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন কি না, তা জানতে চাইলে মিলন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বলেছেন, সবাই মিলে সংগঠন ঠিক করো। ভুলক্রটি কোথায়, কী কারণে এমন হলো। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2Fsit6cfbn%2FRANGPURDH049420260212IMG6061.JPG.JPG?rect=88%2C0%2C3207%2C2138&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। গত বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর নগরের কেল্লাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ছবি: মঈনুল ইসলাম

এক গ্রাম থেকেই সংসদ সদস্য হলেন তিনজন by গাজী ফিরোজ

গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের তিনটি আসন থেকে পৃথকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা। এই তিনজনই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটির নাম গহিরা। এক গ্রাম থেকে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকার লোকজনের মধ্যে খুশির আমেজ বিরাজ করছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত হন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। সাঈদ আল নোমান নির্বাচিত হয়েছেন নগরের চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, খুলশী, পাহাড়তলী) আসন থেকে। তিনজনই বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বড় ভাই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।

গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা। তাঁদের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে সাঈদ আল নোমানের বাড়ি। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে।

বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দাদের একজন নুর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি গহিরা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের মধ্যে গহিরা একমাত্র গ্রাম যেখান থেকে এবারের নির্বাচনে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এলাকার লোকজনের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নিজ সংসদীয় এলাকা ছাড়াও নিজেদের গ্রামের উন্নয়নে অবদান রাখবেন, বাসিন্দাদের সেটিই প্রত্যাশা।’

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর আবদুল্লাহ আল হারুন, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান গহিরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার ও পাকিস্তানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়িও এই গ্রামে। তিনি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী চৌধুরী মহিবুল হাসান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং রাউজান আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বাড়িও এই গহিরা গ্রামে।

রাউজান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার পাশাপাশি নির্বাচিত আরও দুজন সংসদ সদস্যের বাড়িও এই এলাকায়। তাঁরাও এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। গ্রামের জন্য এটি খুবই সুসংবাদ।’

প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের ও আবদুল্লাহ আল নোমানের কবর গহিরা গ্রামে। এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে তাঁদের ছেলে হুম্মাম কাদের ও সাঈদ আল নোমানের। তাঁরা দুজনই নিজ সংসদীয় আসনের পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

গহিরা গ্রাম থেকে এবারের নির্বাচনে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে এলাকার জন্য গর্বের বিষয় বলে মন্তব্য করেন গহিরা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রায়হান মাহমুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের শিক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাশাপাশি বাকি দুজনও অবদান রাখতে পারেন। এতে এলাকার লোকজন উপকৃত হবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2Fbvs984wu%2FUntitled-6-1f.png?rect=0%2C0%2C918%2C612&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। ফাইল ছবি