Saturday, September 24, 2022

মূত্রনালীর ইনফেকশন by ডা: জ্যোৎস্না মাহবুব খান

মূত্রনালীর ইনফেকশন
ইউটিআই বা মূত্রনালীর ইনফেকশন এক ধরনের সাধারণ সমস্যা, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউই আক্রান্ত হতে পারে। তবে মধ্য বয়সী মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হন। গ্রীষ্মকালেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে সব ঋতুতেই হয়ে থাকে। প্রতিটি জীব খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে, তার প্রয়োজনীয় অংশ শোষণ করে এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ বা বর্জ্য দ্রব্য পায়খানা ও প্রস্রাবের মাধ্যমে দেহ থেকে বের করে দেয় এটাই স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো কারণে প্রস্রাব করা যদি যন্ত্রণাদায়ক হয় তবে বুঝতে হবে এটা কোনো রোগের উপসর্গ। এসব উপসর্গের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে- মূত্রনালীতে ইনফেকশন, প্রস্রাবের থলিতে ইনফেকশন, পাইলাইটিস, প্রোস্টটাইটিস, ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বা সিস্ট ফেটে যাওয়া, সিফিলিস ও গনোরিয়ায় আক্রান্ত হলেও হতে পারে।
মূত্রনালীর সংক্রমণের লক্ষণগুলো রোগীর বয়স এবং মূত্রনালীর উপরিভাগ অথবা নিম্নভাগ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত মূত্রনালীর উপরিভাগ সংক্রমণে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে- উপর পেটে বা পিঠের দিকে বা কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা, প্রস্রাব করতে জ্বালা যন্ত্রণা বোধ করা, ব্যথার সাথে কাঁপুনি দিয়ে অনেক জ্বর, খাবারে অরুচি, বমিভাব বা বমি হয়ে যাওয়া, পিপাসা বোধ করা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং ঘোলাটে দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হওয়া ইত্যাদি।
মূত্রনালী ও মূত্রথলি থেকে ইনফেকশন সাধারণত উপরের দিকে অগ্রসর হয়ে মূত্রনালীর উপরের অংশকে আক্রান্ত করে। সদ্য বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে মূত্রনালীর উপরের অংশের প্রদাহকে বলা হয় হানিমুন পাইলাইটিস এবং নিচের দিকের প্রদাহকে বলা হয় হানিমুন সিস্টাইটিস।
মূত্রনালীর নিচের অংশ সংক্রমণে কতগুলো উপসর্গ দেখা দেয়- তলপেটে ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ এবং প্রস্রাব হওয়ার সময় তীব্র ব্যথা হওয়া, ফোঁটায় ফোঁটায় গরম প্রস্রাব হওয়া। প্রস্রাব করতে জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভব করা, প্রস্রাবের সাথে কখনো কখনো রক্ত পুঁজ নির্গমন হওয়া ইত্যাদি। শিশুদের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা দেয় তা হলো জ্বর, ঘন ঘন প্রস্রাব করা, প্রস্রাব করার সময় কান্নাকাটি করা, বিছানায় প্রস্রাব করা, বমি ও ডায়রিয়া হওয়া, খাবারে অরুচি ও দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা করতে হবে কোনো সংক্রমণ আছে কিনা দেখার জন্য। প্রস্রাব কালচার করে সঠিক এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। তার সাথে ব্যথানাশক ওষুধ দিতে হবে। প্রয়োজনে এক্স-রে করে রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিতে হবে।
মূত্রনালীর ইনফেকশন দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হতে পারে বিভিন্ন কারণে যেমন একবার ইনফেকশন হলে উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক না খাওয়া বা এন্টিবায়োটিকের কোর্স অসমাপ্ত করা, প্রস্রাবের বেগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখা, কোষ্ঠ কাঠিন্য, মলত্যাগের পর মলদ্বার ঠিকমত পরিষ্কার না করা, স্বামী বা মেল পার্টনারের চিকিৎসা না করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব ইত্যাদি। দীর্ঘস্থায়ী মূত্রনালীর ইনফেকশন থাকলে তা উপরের দিকে উঠে কিডনিকে আক্রান্ত করতে পারে। সুতরাং এ ইনফেকশনকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয় যথাযথ সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় মূত্রনালীর ইনফেকশন হলে সঠিক এন্টিবায়োটিক খাওয়াতে হবে এবং মাঝে মধ্যেই প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা করে দেখতে হবে ইনফেকশন মুক্ত আছে কিনা। কারণ এ সময় ইনফেকশন থাকলে মা এবং গর্ভস্থ সন্তান ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
মূত্রনালীর ইনফেকশন প্রতিরোধে প্রচুর পানি পান করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে বিশেষ করে মাসিকের সময়। প্রস্রাবের চাপ থাকলে সময়মতো প্রস্রাব করে মূত্রথলি খালি রাখা উচিত। কখনো অনেক সময় আটকে রাখা উচিত নয়। প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত এবং নিয়মিত ওষুধ খাওয়া উচিত।
লেখক : জেনারেল প্রাকটিশনার (মহিলা ও শিশু)
মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।

Tuesday, September 20, 2022

পরিপাকতন্ত্রকে কেন দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয়? অন্ত্র সম্পর্কে ৭টি বিস্ময়কর তথ্য

অন্ত্রের রয়েছে স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্র।
আপনার শরীরের কোন অংশে মেরুদণ্ডের চাইতেও বেশি নিউরন থাকে এবং কোন অংশটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে?
সম্ভবত "অন্ত্র" আপনার প্রথম উত্তর ছিল না। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, আমাদের অন্ত্র লাখো নিউরনের সঙ্গে সংযুক্ত, যে কারণে অন্ত্রকে মানবদেহের "দ্বিতীয় মস্তিষ্ক" হিসেবে ডাকা হয়।
আমাদের পরিপাকতন্ত্রের কাজ শুধুমাত্র খাবার দাবার শোষণ করা নয়, বরং এর-চাইতেও আরও বেশি কিছু।
আমাদের শরীরে যে পরিমাণ রোগজীবাণু রয়েছে সেগুলো আমাদের শরীরকে অসুস্থ করে ফেলতে পারে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে কিনা সে বিষয়ে এখনও গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এবার জেনে নেয়া যাক অন্ত্র সংক্রান্ত কিছু বিস্ময়কর তথ্য:
১. অন্ত্রের রয়েছে স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্র:
পুষ্টিবিদ ডা. মেগান রসি বলেছেন, " শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের তুলনায় আমাদের অন্ত্র স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এটি মস্তিষ্কের কোন কোন সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।"
ডা. মেগান রসি একাধারে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এবং অন্ত্রের চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি বইও লিখেছেন।
অন্ত্রের এই স্বাধীনভাবে কাজ করাকে অভ্যন্তরীণ স্নায়ুতন্ত্র (ইএনএস) বলা হয়, যেটা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (সিএনএস) একটি শাখা। যার কাজ শুধুমাত্র পরিপাকতন্ত্রের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা।
এই পুরো ব্যবস্থাটা নিউরনের সমন্বয়ে তৈরি একটি নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে। যেটা পাকস্থলী ও হজম-ক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত।
অন্ত্রকে মানবদেহের "দ্বিতীয় মস্তিষ্ক" হিসেবে ডাকা হয়।
অন্ত্রের এই অভ্যন্তরীণ স্নায়ুতন্ত্র মূলত সিম্প্যথেটিক ও প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
২. আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অন্ত্রের ভূমিকা:
ডাঃ রসি'র মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার পেছনে অন্ত্রের স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা আমাদের রোগ প্রতিরোধক কোষের ৭০% অন্ত্রের ভিতরে থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল বা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাগুলো, সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সাধারণ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
৩. কতোবার টয়লেট হওয়া স্বাভাবিক?
আমাদের শরীরের বর্জ্য শুধুমাত্র খাদ্যের অবশিষ্টাংশ নয়। বরং এর ৫০% জুড়ে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া।
এরমধ্যে এমন সব ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যেটা কিনা আমাদের শরীরের জন্য আসলেই উপকারী।
এ কারণে, যাদের অন্ত্রে "খারাপ" ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ফিকাল ট্রান্সপ্লান্ট একটি কার্যকর চিকিৎসা হতে পারে।
এই চিকিৎসা স্টুল ট্রান্সপ্লান্ট বা মল প্রতিস্থাপন হিসেবেও পরিচিত। এটি এমন এক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া যেখানে একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকে মলের ব্যাকটেরিয়া অসুস্থ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
এই বিষয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে ডাঃ রসির কাছে জানতে চাওয়া হয় আমাদের দিনে কয়বার টয়লেটে যাওয়া উচিত?।
তিনি বলেন, প্রতিদিন তিনবার থেকে শুরু করে সপ্তাহে তিনবার টয়লেট হওয়া গবেষণায় স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়।
৪. অন্ত্র সুস্থতায় খাদ্য নির্বাচন:
আমাদের অন্ত্রে রয়েছে কয়েক ট্রিলিয়ন জীবাণুর বসতি।
এই জীবাণুগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ কেননা তারা নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টিকর উপাদান হজম করতে সাহায্য করে।
প্রতিটি মাইক্রোবায়াল গ্রুপ একেক ধরণের খাবারের উপর কাজ করে।
তাই বিভিন্ন বৈচিত্র্যের খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে, যা আমাদের আরও সুস্থ হয়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কিত।
"আমি বলতে চাই যে মাইক্রোবসরা আমাদের অভ্যন্তরীণ পোষা প্রাণীর মতো, আপনি যার যত্ন নিতে এবং লালন পালন করতে চান," বলেছেন ডাঃ রসি।
যারা সবসময় একই ধরণে খাবার খায় তাদের অন্ত্রের জীবাণুগুলো এতোটা সক্রিয় বা শক্তিশালী থাকেনা।
৫. অন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত আপনার মেজাজ মর্জি:
ডাঃ রসি বলেছেন যে আপনার যদি অন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে আপনি কতোটা মানসিক চাপে আছেন সেটা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন: "ডাক্তারি অনুশীলনে থাকাকালে আমি সবসময় আমার রোগীদের দিনে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য ধ্যান করার পরামর্শ দিতাম। চার সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ধ্যান করায় এক পর্যায়ে এটি তাদের অভ্যাসে পরিণত হতো। এবং এতে তাদের অন্ত্রের সমস্যাও ঠিক হয়ে যায়।
"তাই মানসিক চাপমুক্ত থাকা সত্যিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ।"
আমাদের অন্ত্রের সঙ্গে মেজাজ যুক্ত থাকার পেছনে একটি সাধারণ কারণ হল, আমাদের পরিপাকতন্ত্রে আনুমানিক ৮০% থেকে ৯০% সেরোটোনিন উৎপন্ন হয়।
সেরোটোনিন এক ধরণের রাসায়নিক বার্তাবাহক যার সঙ্গে আমাদের পরিপাক ক্রিয়া থেকে শুরু করে মানসিক রোগ সংক্রান্ত শরীরের নানা কার্যক্রম জড়িত।
এক কথায় সেরোটোনিনের নি:সরণের ওপর নির্ভর করে আমাদের মেজাজ ভাল থাকা, না থাকা।
দীর্ঘমেয়াদী চাপ শরীরে সেরোটোনিন নি:সরণের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে যা আমাদের মন মেজাজ, উদ্বেগের মাত্রা এবং সুখের মতো মানসিক অবস্থা প্রভাবিত করতে পারে।
পশু এবং মানুষের ওপর আগের গবেষণাগুলো থেকে পাওয়া তথ্য প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, বিষণ্ণতাসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর অন্ত্রে মাইক্রোবায়াল গোলযোগ পাওয়া গেছে।
সাইকোবায়োটিক্সের ওপর নতুন একটি গবেষণা চলছে। যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে সুস্থ অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
৬. বিশ্বাসের নেতিবাচক প্রভাব:
যদি আপনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে কয়েক ধরণের খাবার আপনার জন্য খারাপ, তাহলে আপনার এ সংক্রান্ত নেতিবাচক উপসর্গ দেখা দেবে।
সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, আপনি যদি কোন নির্দিষ্ট ধরণের খাবার খেতে ভয় পাওয়া শুরু করেন তবে সেটি খাওয়ার সময় আপনার উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে।
কেননা কিছু মানুষের পাকস্থলী বেশ সংবেদনশীল।
ডাঃ রসি বলেন, "আমার ক্লিনিকে আমি প্রতিনিয়ত দেখেছি যে একটা বিশ্বাস কিভাবে অন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে"। অনেকে বিশ্বাস করে যে গ্লুটেন বা ল্যাকটোস তাদের জন্য খারাপ হবে, বাস্তবে তাদের ওইসব খাবারে এলার্জি বা অসহিষ্ণুতা না থাকলেও শুধুমাত্র বিশ্বাসের কারণে সেগুলো খাওয়ার পরে তারা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
৭. আপনি চাইলেই পারেন পরিপাক স্বাস্থ্য উন্নত করতে:
ডঃ রসি কিছু অভ্যাস তালিকাভুক্ত করেছেন। যা পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখার জন্য মেনে চলা প্রয়োজন। সেগুলো হল:
  • অন্ত্রের মাইক্রোবায়াল সক্রিয় ও শক্তিশালী রাখতে বিভিন্ন ধরণের খাবার খান।
  • পছন্দমতো উপায়ে নিজের মানসিক চাপ মোকাবিলা করুন: সেটা হতে পারে, ধ্যান, শিথিলকরণ, বা যোগব্যায়াম।
  • আপনার যদি ইতিমধ্যে অন্ত্র সমস্যা থাকে, তাহলে অ্যালকোহল, ক্যাফিন এবং মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কেননা এ ধরণের উপাদান সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ভালভাবে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আপনি যদি ঘুমের ধরণ পরিবর্তন করে দেহঘড়ির ছন্দ ব্যাহত করেন তবে আপনার অন্ত্রের জীবাণুগুলির চক্রও বাধাগ্রস্ত হবে। এবং মনে রাখবেন, অন্ত্রের জীবাণুগুলোকে সুস্থ রাখতে তাদের সঙ্গে ভাল আচরণ করা জরুরি।
অন্ত্র ঠিক রাখতে খেতে হবে নানা ধরণের খাবার।

টমাস আলভা এডিসনঃ বধিরতা যার জন্য ছিল আশীর্বাদ… by সাইকা তাসনিম

বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন অনেকটা খোলা বইয়ের মত। তাদের ব্যর্থতা-সফলতা অনেক কিছুই আমাদের জানা থাকে। কিন্তু তাদের জীবনে এমন আরো অনেক কিছুর উপস্থিতি আছে যা থেক যায় আমাদের সম্পূর্ণ অজানা। তেমনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ও বিজ্ঞানী হলেন টমাস আলভা এডিসন। হয়ত আমরা অনেকেই টমাস আলভা এডিসনের ব্যাপারে জানি। তার আবিষ্কার, সফলতা সব ব্যাপারেই জানি কিন্তু তার জীবনের এমন কিছু জিনিস রয়েছে যেগুলো আমাদের অজানা। নিচে সেগুলো দেওয়া হল-
টিচারদের অনাগ্রহ
সাত ভাইবোনের মধ্যে টমাস আলভা এডিসন ছিলেন সবার ছোট। তার স্কুলের শিক্ষকরা তাকে খুবই দুর্বল ছাত্র ভেবেছিল। পড়ায় মন বসতো না বিধায় প্রায় সময়ই শিক্ষকরা প্রায় সময়ই তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিত। কিন্তু এডিসন তার সাফল্যের জন্য তার সম্পূর্ণ কৃ্তিত্ব তার মাকে দিয়েছেন। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তার পাশে তার মাকে পেয়েছেন। তার প্রতি শিক্ষকদের অনীহার কারণে তার মা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনেন। তার প্রতি তার মায়ের পুরো আস্থা ছিল। তিনি নিজেই পরবর্তিতে এডিসনের পড়ানোর দায়িত্ব নেন।
প্রথম ল্যাব
ছোটবেলা থেকে এডিসনের তার চারপাশের জিনিসের প্রতি আগ্রহ ছিল অসীম। ৯ বছর বয়স থেকেই তিনি বাসায় ছোট ছোট এক্সিপেরিমেন্ট চালান। তিনি তার হাত খরচের পুরোটাই এক্সপেরিমেন্টের জন্য বিভিন্ন কেমিক্যাল কেনার জন্য ব্যয় করতেন। তিনি এমন কিছু কেমিক্যাল কিনেছিলেন যেগুলো ছিল অমূল্য। তিনি সেগুলোকে সাবধানে একটি বোতলে সংরক্ষন করতেন। বোতলগুলোকে সবার কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য সেগুলোকে “বিষ” নামে লিখে রেখেছিলেন। ১০ বছর বয়সে বাড়ির বেজমেন্টে তিনি তার প্রথম ল্যাবরেটরি বানান।
বধিরতা,আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ
এডিসনের কানে শোনায় সমস্যা ছিল। তিনি কানে শুনতে পেতেন না। অনেকের ধারনা তিনি তার বাবার কাছ থেকে বধিরতা পেয়েছেন কারণ তার বাবাও শুনতে পেতেন না। কিন্তু বধিরতার ফলে তার বেশ সুবিধাও হয়েছে। যেহেতু তিনি শুনতে পেতেন না তাই মনযোগ সহকারে কাজ করতে পারতেন। কোন শব্দই তার কানে যেত না যার কারণে তার কাজে কোন বিঘ্ন ঘটতো না। এছাড়াও তিনি কাজপাগল বিজ্ঞানী ছিলেন। বধিরতার কারণে তিনি বেশি সময় ধরে কাজ করতে পারতেন। বস্তুতই বধিরতা তার জন্য আশীর্বাদ ছিল।
প্রথমবার চাকরিচ্যুত হওয়া
১৪ বছর বয়সে এডিসন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। তিনি দিনের বেলা কাজ না করে রাতের বেলা কাজ করতেন যাতে করে তিনি তার এক্সপেরিমেন্ট গুলো করতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই চাকরি রক্ষা করা সম্ভব হয় নি। ব্যাটারিতে সালফিউরিক এসিডের উপর পরীক্ষা চালানোর সময় আগুন ধরে যায়। আগুনে টেলিগ্রাফ অফিস ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর এই ঘটনার পরেই তার চাকরি চলে যায়।
প্রথম প্যাটেন্ট
নিবার্চনের সময় ভোটিং রেকর্ড করার জন্য এডিসন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করে। সেই সময়ে তার বয়স ছিল ২২ বছর। তিনি সেই আবিষ্কারের জন্য প্যাটেন্ট ও নেন। ভোট রেকর্ড করার জন্য ব্যবস্থাপককে প্রত্যেকবার সুইচ পরিবর্তন করতে হত। কিন্তু মেম্বাররা সঠিক ভাবে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারেনি। ভোট ঠিকমত রেকর্ড করা যায়নি কারণ মেম্বাররা বারবার তাদের ভোট চেঞ্জ করছিল। পরবর্তীতে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান যন্ত্রটি বাতিল করে দেন ও প্যাটেন্ট ও বাতিল হয়ে যায়।
মিনাকে গোপন কোডের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব
এডিসনের স্ত্রী মেরি মারা যাওয়ার ২ বছর পর তার সাথে সুদর্শন মিনা মিলারের সাথে দেখা হয়। এটি উভয়ের জন্যই প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে যাওয়া ছিল। তারা একসাথে সময় কাটাতো। এডিসন তাকে মোর্স কোড ট্যাপিং ভাষাও শিখিয়েছিল। তারা যখন অন্যান্য মানুষদের সাথে থাকতো তখন মোর্স কোড ট্যাপিং এর মাধ্যমে কথা বলত। একদিন এডিসন মিনাকে মোর্স কোডের মাধ্যমে “. – — ..- .-.. -.. -.– — ..- — .- .-. .-. -.– — .” ম্যাসেজ পাঠায় ও মিনাও তাকে “-.– .” লিখে ফিরতি বার্তা দেয়। এর কিছুদিন পরেই তারা বিয়ে করে।
রহস্যজনক ট্যাটু
মিচুয়াল লাইফ ইন্সুরেন্সের রেজিস্টার মতে এডিসনের বাম হাতে ট্যাটু আঁকা ছিল। ট্যাটুতে মাত্র ৫ টি ডট ছিল। ট্যাটুর ব্যাপারটি সম্পূর্ণই রহস্যজনক ছিল কারণ কেউই এই ট্যাটুর মানে জানতো না। এডিসনই প্রথম আনঅফিসিয়ালি stencil-pen ব্যবহার করে ট্যাটু মেশিন বানায়। ১৮৭৬ সালে তিনি stencil-pen এর জন্য প্যাটেন্ট গ্রহন করেন। পরবর্তীতে Samuel O’Reilly এডিসনের ট্যাটু মেশিনকে কিছুটা পরিবর্তন করেন।
এক্সরে
হাসপাতালগুলিতে ব্যবহৃত আধুনিক ফ্লোরোস্কোপ আবিষ্কারের জন্য এডিসন এক্স-রে ব্যবহার করেছিলেন। সেই সময় এক্স-রে গুলি অনিরাপদ বলে বিবেচিত হতো না। এডিসন তার কর্মচারী ক্লারেন্স ড্যালিকে একটি ফ্লোরোস্কোপ তৈরি করতে নির্দেশ দেন। ক্লারেন্স তার হাতে এক্স-রে টিউব পরীক্ষা করেন এবং এর ফলে তার হাতে সংক্রমণ তৈরি হয়। এই সংক্রামনের ফলে ড্যালিকে শুধু তার হাত নয় বরং তার জীবন ও হারাতে হয়েছিল। এডিসন ড্যালির মৃত্যুর ব্যাপারে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন ও হতাশ হয়ে পড়েন। পরে তিনি এক্সরে গবেষনা বন্ধ করে দেন।
কংক্রিটের বাসা
এডিসন এক সময়ে সিমেন্ট ব্যবসা শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। তিনি নিই ইয়র্ক শহরের বাসস্থানের সমস্যা সমাধানের করতে চেয়েছিলেন। তিনি ছাচের মাধ্যমে শুধু সিমেন্ট দিয়ে বাড়ি বানাতে চেয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সাইজের জানালা,সিড়ি ও বাথটাব বানানোর কথাও ভেবেছিলেন ছাচের মাধ্যমে। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত ছিল না। তাই এই পরিকল্পনা থেকে তাকে সরে আসতে হয়। যদিও তিনি নিজের জন্য এরকম একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন। তিনি কংক্রিটের পিয়ানো ও আসবাবপত্রও বানিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো জনসাধারনের মনযোগ আকর্ষন করতে ব্যর্থ হয়।
হাতি ও এডিসন
একশতের ও বেশি পাওয়ার স্টেশনের মাধ্যমে এডিসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদুৎ সরবরাহ করত কিন্তু তিনি DC ব্যবস্থায় বিদুৎ সরবরাহের পক্ষপাতিত্ব ছিলেন না। এমন সময়ে তিনি DC ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রমানের জন্য একটি সুযোগ পেয়ে যান। হুট করে সার্কাসের একটি হাতি বন্য হয়ে ওঠে। এই বুনো হাতির আক্রমনে বেশ কিছু মানুষ মারাও যান। হাতিটি একটি হুমকি হয়ে দাড়িয়েছিল ও সার্কাস মালিক একে মেরে ফেলতে চান। যদিও এডিসন হাতিটি মারার পক্ষে ছিলেন না তাও তিনি এটির দায়িত্ব নেন প্রমানের জন্য। তিনি হাতিটির উপর ৬০০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক AC current ব্যবহার করেন ও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাতিটি মারা যান।

Monday, September 19, 2022

স্পন্ডিলাইটিস : কী করবেন আর কী করবেন না

অফিস ডেস্কে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই টনটন করে উঠছে পিঠ, কাঁধ।কিংবা বাড়িতেও একটানা টিভি দেখতে গিয়ে বা ঘুম থেকে উঠে ঘাড় ঘোরাতে গেলেই মনে হচ্ছে কলকব্জা বশে নেই। দৈনন্দিন দৌড় ঝাঁপের সময়ও মাঝে মাঝেই টের পান যে ব্যথা, তা আধুনিক জীবনযাত্রার অসুখ বা লাইফস্টাইল ডিজিজ বলছেন চিকিৎসকরা। শিরদাঁড়ার হাড় ক্ষয়ের জানান দেয় অকালেই। সহজ করে বললে, স্পন্ডিলাইটিস বাসা বাঁধছে শরীরে। এ রোগের কোনো বয়সসীমা যেমন নেই, তেমন নেই কোনো লিঙ্গ প্রাধান্যও। শিশুদের বেলাতেও এমন উচ্চতায় টেবিল-চেয়ার দিন, যাতে পড়তে বা লিখতে গেলে খুব ঘাড় ঝোঁকাতে না হয়। এই অসুখ সামলাতে নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম আছে, বিশেষ করে কিছু স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ।
কেবল ঘাড়ে ব্যথাই নয়, হাতে এবং ব্যথার অংশ অবশ হয়ে যাওয়া, সূচ ফোটানোর মতো বোধ হওয়া মাথা ঘোরার সমস্যাও এই অসুখের লক্ষণ। তবে এ রোগের হাত থেকে বাঁচতে কেবল ওষুধ খেলেই হবে না, মেনে চলতে হবে কিছু অভ্যাসও। মাংসপেশিকে শক্ত রাখার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করুন। ছয় ঘণ্টা থেকে আট ঘণ্টা ঘুমোতেই হবে রাতে। বালিশ ব্যবহার করা নিয়েও সচেতন হোন। অনেকেই বালিশ ছাড়া ঘুমোন। কখনোই বালিশ ছাড়া ঘুমোবেন না। নরম দেখে একটা বালিশ নিন। কেমন বালিশে শোবেন তা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। ঘুম ভাঙার পর পাশ ফিরে উঠুন। সোজা উঠলে মেরুদণ্ডে চাপ পড়বে আরো। রান্না করার সময় একটা চুল ব্যবহার করুন। সাধারণ টয়লেট নয়, কমোডের ব্যবস্থা করুন। কমোড একান্তই না থাকলে প্লাস্টিকের কমোড কিনুন।
চিকিৎসকের মতে, শুধু ওষুধ খাওয়াই নয়, তার পাশাপাশি কাজ করার ভঙ্গীও বদলাতে হবে। ঘাড় বা পিঠ বেঁকিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসার অভ্যাস বদলাতেই হবে। আমাদের শিরদাঁড়ায় কিছু ডিস্ক রয়েছে তা ব্যবহারের ফলে নষ্ট হতে পারে। এরা আশপাশের হাড় ও মাংসপেশির উপরে চাপ দেয়। পেশার তাগিদে তেমনভাবে বসতে হলে মাঝে মাঝেই উঠে হাঁটতে হবে। ঘাড় এ দিক ও দিক ঘুরিয়ে নিতে হবে, ঘড়ির কাঁটার দিকে ও ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘাড় ঘুরিয়ে ফের সিটে এসে বসুন। চাকা লাগানো ঘোরানো চেয়ারে না বসে চেষ্টা করুন। কাঠের চেয়ারের ব্যবস্থা করতে হবে। চেয়ারে সোজা বসুন। আরাম করে হেলান দিয়ে পিঠকে সাপোর্ট দিয়ে নয়, এতে মেরুদণ্ডকে বেঁকে যেতে থাকে। ২০-৩০ মিনিট অন্তর অবশ্যই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। খেয়াল রাখবেন বসার সময় পা যেন মাটি ছুঁয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে বেল্ট, কলার বা বিশেষ ট্রাকশান নেয়ার ব্যায়াম দেওয়া হয়।
অস্থি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পন্ডিলাইটিস আসলে শিরদাঁড়ার হাড়ের সমস্যা। জন্মের পর থেকে আমাদের হাড়ের সংযোগস্থল বা অস্থিসন্ধিগুলো যেমন থাকে, তা নিয়েই আমরা বেড়ে উঠি, এ বার সে সব ব্যবহার করতে করতে যন্ত্রের মতোই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। কখনও আবার অস্থিসন্ধির অঞ্চলে থাকা তরল জেল বাইরে বেরিয়েও আসে। তখনই জানান দেয় ব্যথা। ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সারাক্ষণের ব্যথা, ঘাড় নাড়াতে অসুবিধা হওয়া এই রোগের মূল কষ্টের দিক। ঘাড়ের দিকের অংশে এই রোগ হলে তাকে আমরা বলি, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলাইটিস। আবার শিরদাঁড়ার নিচের দিকের অংশে অর্থাৎ পিঠের নিচের দিকে হলে তাকে আমরা বলি লাম্বার স্পন্ডিলাইটিস।

যে ব্যাঙ নিখুঁতভাবে প্রেগনেন্সি পরীক্ষা করতে পারে

ব্যাঙ দিয়ে প্রেগনেন্সি টেস্টের একটি পুস্তিকা
আফ্রিকায় সাহারা মরুভূমির আশেপাশের দেশগুলোতে, যা সাব-সাহারান এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে ছিল বিশেষ এক জাতের নখওয়ালা ব্যাঙ। এর নাম জেনোপস।
ওই এলাকার পানিতে লাখ লাখ বছর ধরে শান্তিতেই বাস করছিল ব্যাঙটি। কিন্তু হঠাৎ করেই, ১৯৩০ এর দশকে, ব্রিটিশ এক বিজ্ঞানী তার জীবনে বড়ো ধরনের এক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিলেন। কিন্তু কীভাবে?
জেনোপস নামের এই ব্যাঙটির শরীরে তিনি ইনজেকশন দিয়ে মানুষের মূত্র ঢুকিয়ে দিলেন।
ল্যান্সলট হগবেন নামের এই প্রাণীবিজ্ঞানীর কাজই যেন ছিল বিভিন্ন প্রাণীর শরীরের নানা রকমের জিনিস, বিশেষ করে হরমোন ঢুকিয়ে দেওয়া। তার উদ্দেশ্য ছিল এর ফলে ওই প্রাণীর শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটে সেটা লক্ষ্য করা।
প্রেগনেন্সি পরীক্ষায় এই জেনোপস ব্যাঙ ব্যবহার করা হতো ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত।
ঠিক এই একই ধরনের আরেকটি পরীক্ষার পর, অনেকটা দুর্ঘটনাবশতই, তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন যে এই ব্যাঙের ভেতরে প্রেগনেন্সি হরমোন ঢুকিয়ে দিলে সেটি ডিম পাড়তে শুরু করে দেয়।
শুধু তাই নয়, আজকের দিনে ভাবলে খুব অবাক হতে হয় যে ওই জেনোপস ব্যাঙ নির্ভুলভাবে ফলাফল বলে দিতে পারতো।
পরীক্ষাটি ছিল এরকম: নারী জেনোপস ব্যাঙের চামড়ার নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে নারীর মূত্র ঢকিয়ে দেওয়া হতো। ৫-১২ ঘন্টা পর দেখা হতো ব্যাঙটি ডিম পেড়েছে কিনা।
ডিম পাড়লে নিশ্চিত হওয়া যেত যে ওই নারী গর্ভবতী।
প্রেগনেন্সি টেস্ট এখন খুব সহজ ও সাধারণ একটি বিষয়। একজন নারী ঘরে বসে একটি স্টিক দিয়েই জেনে নিতে পারেন তিনি গর্ভধারণ করেছেন কিনা।
নিখুঁতভাবেই বলে দিতে পারতো ব্যাঙটি। পরীক্ষাগারে করা হতো এই টেস্ট।
কিন্তু কয়েক দশক আগেও এই কাজটা এতোটা সহজ ছিল না।
মরেন সাইমন্স নামের এক নারী বলছিলেন, ১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি এই ব্যাঙ-এর সাহায্যে কীভাবে তার প্রেগনেন্সি টেস্ট করা হয়েছিল। তার এখনও মনে আছে এরকম এক পরীক্ষার কথা।
বিবিসিকে তিনি বলেন, "আমার মাথায় এই দৃশ্যটা এখনও পরিষ্কার গেঁথে আছে, অন্তত দুবার, একজন ডাক্তার আমার কাছে এসে বললেন, আপনি গর্ভবতী হয়েছেন - ব্যাঙটা ডিম পেড়েছে।"
সাধারণ লোকজনের জন্যে এই জেনোপস টেস্ট ব্যবহার করা হতো না। শুধুমাত্র জরুরী চিকিৎসাতেই এই এই পরীক্ষাটা করা হতো। যেমন আসলেই ভ্রুণের মতো কোন কিছুর জন্ম হচ্ছে নাকি তৈরি হচ্ছে টিউমার - সেটা নির্ণয় করতে জেনোপস টেস্ট করা হতো।
ব্রিটেনের অল্প কিছু হাসপাতালের ল্যাবে এই জেনোপস পরীক্ষা করা হতো।
মরেনের দুবার মিসক্যারেজ অর্থাৎ সন্তান জন্ম হওয়ার আগেই গর্ভপাত হয়ে গিয়েছিল। এবং এই জেনোপস ব্যাঙ-ই সেই সত্যটা বলতে পেরেছিল।
অল্প কিছু ল্যাবে এই পরীক্ষা করা হতো।
তিনি বলেন, "আমি এখন বুঝতে পারি যে ওরকম একটা টেস্ট করিয়ে আমাকে কতোটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।"
চিকিৎসা-ইতিহাসবিদ জেসে ওলসজিঙ্কো-গ্রিন বলেন, আধুনিক কালে এই টেস্টটিকে খুব অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে এটা ছিল খুব বড় ধরনের ঘটনা। আজকে যেমন বাড়িতে পরীক্ষা করেই বোঝা যায় কেউ সন্তানসম্ভবা কিনা, তখনও এই টেস্ট অনেকটা সেরকমই ছিল।
গর্ভধারণ ও তার পরীক্ষার ব্যাপারে এটা ছিল একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
"আপনি নিজেকে ১৯৩০ এর দশকে নিয়ে যান, তখন বুঝতে পারবেন, কারণ সেসময় কেউ গর্ভধারণ করেছেন কিনা সেটা বোঝার উপায় ছিল না। এ নিয়ে কথাও বলা যেত না। সংবাদপত্রে প্রেগনেন্সি শব্দটাই লেখা যেত না। এটা এতোটাই জীববিজ্ঞানের বিষয় ছিল। ছিল অভদ্রতাও," বলেন তিনি।
তিনি বলছেন, এই টেস্টের মাধ্যমেই প্রেগনেন্সি বিষয়টি দৃশ্যমান হলো। আর সেটা করেছিল জেনোপস নামের এই ব্যাঙটি।
"প্রেগনেন্সি পরীক্ষা হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীর আবিষ্কার। কিন্তু ওই জেনোপস টেস্টের মাধ্যমেই গর্ভধারণ, শিশু জন্মদান এবং প্রজননের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে," বলেন তিনি।
১৯৭০ এর দশকেই বাড়িতে বসে প্রেগনেন্সি টেস্টের উপায় বের হলো। এর পর থেকেই জেনোপস ব্যাঙ ফিরে গেল তার শান্তিপূর্ণ জীবনে।
পরীক্ষাটি ছিল এরকম: নারী জেনোপস ব্যাঙের চামড়ার নিচে মূত্র ঢকিয়ে দেওয়া হতো। ৫-১২ ঘন্টা পর দেখা হতো ব্যাঙটি ডিম পেড়েছে কিনা।

Thursday, September 15, 2022

গল্প- অবচেতনের সহোদরা by জাকির তালুকদার

[৪৮ বছর মনের ওপর পলেস্তারা পড়ার মতো যথেষ্ট সময় বলে যখন মনে হতে থাকে, ঠিক তখনি একজন বোনের আর্তি হুড়মুড় করে ধসিয়ে দেয় ভুলে-যাওয়া দেয়ালগুলোকে। আর মানুষ তখন পুরোপুরি ফিরে যায় ৪৮ বছর আগে।]

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ১৭ বছর হলে এখন ৬৫। কিন্তু গোলাম রসুলকে দেখলে কেউ তার বয়সের কথা ধারণাই করতে পারবে না। বড়জোর এটুকু বলতে পারবে যে, বয়স তার পঞ্চাশের এপার-ওপার। গোলাম রসুলের দোকানের সামনে সাইকেল থেকে নেমে আবদুর রশিদ বলল – ব্যানার্জিরা গাছ বেচবে রসুলভাই। চলো কাল দেখে আসি গাছগুলো। দেখেশুনে দরদাম করা যাবে।

নিশ্চিন্দিপুরের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের একসময়ের রেশন-ডিলার আরশেদ আলীর সেজো ছেলে আবদুর রশিদ। রেশন দোকান ছাড়াও আরো ব্যবসা আছে আরশেদ আলীর; কিন্তু লাল হয়ে গেছে রেশন দোকানের কল্যাণেই। সেই স্বাধীনতার পরপরের কথা। বঙ্গবন্ধু সে-সময় সব জিনিসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন রেশনে। বাজারে তখন চাল-গম-তেলের আগুনদর। লোকে বলে রেশনের জিনিস বস্ন্যাকমার্কেট করত আরশেদ আলী। আরশেদ আলীর কানেও গেছে কথাটা; কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য করে না সে এ-ব্যাপারে। করলই না-হয় সে কালোবাজারি। আরশেদ আলী তবে ছাড়বে কেন? সেও তো বঙ্গবন্ধুর দলেরই লোক, সত্তরের ইলেকশনে ভোটও দিয়েছিল নৌকায়। ওর দোকানঘরে টাঙানো থাকত বঙ্গবন্ধু আর সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ছবি। প্রথমটা অবশ্য পঁচাত্তরে পনেরোই আগস্টের পর নামিয়ে রেখেছিল আরশেদ আলী। এ থেকেই বোঝা যায়, হাওয়া বুঝে পাল খাটাতে জানে আরশেদ আলী। তারপর রেশন উঠে গেল। এলো ভিজিডি কার্ড। কিন্তু পুঁজি যা বানিয়েছিল আরশেদ আলী, তা দিয়ে নানা ধরনের ব্যবসা করে এখন এলাকার মান্যিগণ্যি লোক। এহেন বাপের সেজো ছেলে আবদুর রশিদ জন্মদাতার বৈষয়িক বুদ্ধির এক কানাকড়িও পায়নি। আরশেদ আলীর অনেক দোকান। ধরে-বেঁধে ছেলেকে কোনো দোকানে বসালে মনমরা হয়ে বসে থাকে, খদ্দেরদের ত্যাড়া কথা বলে। আরশেদ আলী ব্যাটাকে পোষ মানানোর জন্য বিয়েও দিয়েছে অল্প বয়সেই। বছর ঘুরতে না ঘুরতে রশিদের বউ একটা নাতিও উপহার দিয়েছে আরশেদ আলীকে। কিন্তু রশিদকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আটকানো যায়নি। বিভিন্ন ব্যবসায় ফেল মেরে আবদুর রশিদ এখন কাঠের ব্যবসা করছে পার্টনারশিপে।

আবদুর রশিদের পার্টনার গোলাম রসুল নিশ্চিন্দিপুর বাজারের ‘পলাশ ফার্নিচার হাউজ’-এর মালিক। স্বাস্থ্যটা খুব সুন্দর। হাত-পায়ের থোকা থোকা পেশিই বলে দেয় একসময় দশাসই জোয়ান ছিল সে। এখনো অবশ্য মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়েনি। মাথার চুল উঠে গেছে সামনে আর ওপর থেকে। শুধু কানের পাশ আর ঘাড়ের ওপর দিয়ে অল্প কাঁচা আর বেশি পাকা চুলের একটা রেখা ঘিরে রেখেছে চকচকে টাককে। গোলাম রসুল অবশ্য এখানকার আদি বাসিন্দা নয়। সে এসেছে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়। ঢাকায় তার বাপ কী একটা চাকরি করত। পঁচিশে মার্চের রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে ব্রাশফায়ারে মারা গেছিল। মা আর বোনকে নিয়ে গোলাম রসুল আটকা পড়েছিল ঢাকাতেই। বাধ্য হয়ে সেখানেই ছিল। কিন্তু রাজাকার আর মিলিটারিরা ওর বোনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আর চুপ থাকেনি সে। মাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিল নিশ্চিন্দিপুরে। মায়ের দূরসম্পর্কের ভাই শওকত উকিলের বাড়িতে মাকে রেখে যুদ্ধে গেল গোলাম রসুল। যুদ্ধশেষে আর ঢাকায় ফিরে যায়নি। উকিলের একমাত্র মেয়ে নয়নতারাকে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেছে সে। এর মধ্যে শওকত উকিল মরে গেছে। দুই ছেলে এক মেয়ের বাপ হয়েছে গোলাম রসুল। যুদ্ধশেষে ঢাকায় গিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজেছে বোনকে, কিন্তু পায়নি। বোনের কথা কখনো মুখে আনে না গোলাম রসুল। কিন্তু ওর ঘনিষ্ঠ লোকেরা জানে, বোনের জন্যে একটা ভীষণ নরম জায়গা আছে ওর বুকের মধ্যে।

আবদুর রশিদের কথা শুনে মুখ তুলল গোলাম রসুল। একটা ন্যাকড়ায় হাত মুছতে মুছতে বসল বেঞ্চিতে। জানতে চাইল – ব্যানার্জিদের গাছগুলো কি ভালো?

ভালো মানে! – বেঞ্চিতে একটা চাপড় মেরে বলল আবদুর রশিদ – এই তল্লাটে অমন গাছ অন্য কোথাও নেই, এ আমি হলপ করে বলতে পারি রসুলভাই। চলো না নিজের চোখেই দেখবে।

বলতে বলতে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে গোলাম রসুলের দিকে বাড়িয়ে ধরল আবদুর রশিদ। গোলাম রসুল বয়সে ওর বেশ কয়েক বছরের বড়। আগে লুকিয়ে সিগারেট টানত আবদুর রশিদ। একসঙ্গে কাজ করতে হয়, বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে হিসাবপত্তর করতে হয়। বারবার আড়ালে সিগারেট টানতে যেত আবদুর রশিদ। বুঝতে পেরে তার সামনেই সিগারেট খাওয়ার পারমিশন দিয়ে দিয়েছে গোলাম রসুল।

আবদুর রশিদের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে দেশলাই জ্বালালো গোলাম রসুল। নিজেরটা ধরিয়ে রশিদের দিকে আগুনটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে দেখল রাস্তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সে। সেদিকে তাকিয়ে ছাপা শাড়িপরা একটা মেয়েকে দেখতে পেল গোলাম রসুল। ওর চেনা মেয়েটা। দুখু পাগলার বউ পুতুল। দুখু পাগলা অর্থাৎ দুখেন ছেলেটার রাজনীতির খাই ছিল খুব। আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করত। মাকে নিয়ে থাকত। হঠাৎ একদিন বিয়ে করে বউ নিয়ে এলো। কোথা থেকে কে জানে। ওর শ্বশুরবাড়ি কোথায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, শালা-সম্বন্ধী কেউ আছে কিনা তা জানে না নিশ্চিন্দিপুরের মানুষ। তাই অনেকের ধারণা, পুতুলকে তুলে এনেছিল দুখেন কোনো দূরের গ্রাম থেকে। মা আর বউ নিয়ে ভালোই ছিল দুখেন। কিন্ত মাথায় অতিবিপস্নবী রাজনীতির পোকা। সর্বহারাদের দলে নাম লিখিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। কাটা বন্দুক আর কয়েকটা থ্রি-নট-থ্রি দিয়ে সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিজিবিকে হারিয়ে বিপস্নব করবে। ছয়-সাত মাস পরে খবর এলো ধরা পড়েছে দুখেন পুলিশের হাতে। জেলে বোধহয় মাত্রাছাড়া টর্চার করা হয়েছিল। বছর দেড়েক পরে বদ্ধপাগল অবস্থায় ছাড়া পেল জেল থেকে। একেবারে বদ্ধপাগল। এখানে-সেখানে পড়ে থাকত, নিজের মনে বিড়বিড় করত। তারপরে বছর-দুই হলো উধাও গ্রাম থেকে।
কোথায় গেছে কেউ জানে না। মাঝে মাঝে গুজব শোনা যায় কেউ এখানে দেখেছে কেউ সেখানে দেখেছে – কিন্তু ওই পর্যন্তই।

আর এদিকে যা হওয়ার তাই ঘটল। শাশুড়িকে নিয়ে থাকে পুতুল। বাপের বাড়ির কথা নেই মুখে। রাত-বিরেতে ঘরের দরজায় টোকা, ফিসফিস করে ডাকা শুরু হলো কদিন বাদেই। শাশুড়িরও  নাকি সায় ছিল। খেয়ে তো বাঁচতে হবে। কিছুদিন পর জানা গেল ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে বুড়ো চৌধুরীর ছেলে খোকা চৌধুরী মজমা করছে রোজ পুতুলের ঘরে। আরো অনেকের চোখ ছিল পুতুলের ওপর, কিন্তু খোকা চৌধুরীর সঙ্গে পাল্লা দিতে যাবে কে? অমন বুকের পাটা নিশ্চিন্দিপুরে কারো নেই। কিন্তু হালে শোনা যাচ্ছে, খোকা চৌধুরীর সঙ্গে আর বনিবনা নেই পুতুলের। ব্যানার্জি-গিন্নির কাছে আশ্রয় নিয়েছে পুতুল। কাজকাম করে, থাকে ব্যানার্জিদের বাড়িতেই। ব্যানার্জিদের বাড়িতে অবশ্য বেশি লোক নেই। শুধু বুড়োবুড়ি দুজন আর সরকারমশাই। ব্যানার্জিরা আগে এই তল্লাটের জমিদার ছিল। দুই ছেলের একজন ডাক্তার, একজন ঠিকাদার। একজন থাকেন ইরানে, একজন ঢাকায়। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে ওপারে। বহরমপুরের এক বনেদি পয়সাওয়ালা ঘরে। এখানকার বিশাল বাড়ি আর সম্পত্তি আগলে রেখেছে দুই বুড়াবুড়ি আর তাদের পরিবারের সঙ্গে ষাট বছরের সম্পর্কযুক্ত সরকারমশাই।

আবদুর রশিদের ঘাড়ে একটা থাবড়া মারল গোলাম রসুল। চমকে উঠে পুতুলের ওপর থেকে দৃষ্টি ফেরাল সে। হেসে উঠে বলল গোলাম রসুল – কী রে! চোখ দিয়ে যে চাটছিস মেয়েটাকে। অবশ্য তুই যে চান্স নিতে গেছিলি, সে-খবরও আমি জানি।

মুখ কাঁচুমাঁচু করে ফেলল আবদুর রশিদ – কী যে বলো রসুলভাই। আল্লাহর কিরে, অমন বদচিন্তা আমার মনে আসেনি কখনো।

গোলাম রসুল বলল, জানি বাবা জানি। চিন্তা তোর মাথায় ঠিকই এসেছিল। তুই তো কিছুদিন ঘুরঘুরও করেছিস। পারিসনি শুধু ওই খোকা চৌধুরী আর তার দুই সাগরেদ হীরু আর অনন্ত গু-ার ভয়ে।

-------দুই-------

পরদিন সকালে ব্যানার্জিদের বাগানে এলো দুজন। আবদুর রশিদ গেল সরকারমশাইকে খুঁজতে। তিনিই গাছ দেখাবেন, দামদস্ত্তর করবেন; কিন্তু সরকারমশাই বাজারে গেছেন। অবশ্য ফেরার কথা কিছুক্ষণ বাদেই। অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল ওরা।

বাগানটা ব্যানার্জিদের বাড়ির পেছনদিকে। বিরাট বড় বাগান। আম-কাঁঠাল, কড়ই আর শিমুলের গাছ। বাগানের পরই বিরাট পুকুর। গোটা এলাকাই দেড় মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এখন অবশ্য পাঁচিল ভেঙে পড়েছে এখানে-ওখানে। পুকুরের ঘাটের অবস্থাও সেরকম। পুকুরের ধারে চিৎ হয়ে শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল গোলাম রসুল। পাশে বসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল আবদুর রশিদ। হঠাৎ উলটো দিকের ঘাটে চোখ আটকে গেল ওর। সিঁড়িতে বসে গা ডলছে পুতুল। মুখ তুলে ওদের দিকে পিছন ফিরে টুপ করে ডুব দিলো বারকয়েক। তারপর ঘাটে উঠে চুল মুছল, আঁচল চিপল পিছন ফিরেই। ভেজা কাপড়ের নিচে দেহের বাঁকগুলো স্পষ্টই বোঝা যায়। নিজের অজামেত্মই ঢোক গিলল আবদুর রশিদ। শরীর বটে মেয়েটার। চট করে গোলাম রসুলের দিকে তাকাল আবদুর রশিদ। চোখ বুঁজে চিৎ হয়ে আছে সে। মুখ তুলে আবার পুতুলের দিকে তাকাল আবদুর রশিদ। পুতুল ততক্ষণে ব্যানার্জি বাড়ির খিড়কি দুয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।

এই সময় আরো লোকের উপস্থিতি অনুভব করল আবদুর রশিদ। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো তিনজন মানুষ। ভালো করে তাকাতেই আঁতকে উঠল সে। খোকা চৌধুরী আর তার দুই সঙ্গী হীরু, অনন্ত। অনমেত্মর হাতে ওর সবসময়ের অস্ত্র – সাইকেলের চেইন। দৌড়ে গিয়ে খোকা চৌধুরী জাপটে ধরল পুতুলকে। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে একটা ঝোপের দিকে।

ছেড়ে দাও আমাকে, ছেড়ে দাও বলছি – চেঁচিয়ে উঠল পুতুল। এতক্ষণে বোধহয় তন্দ্রামতো লেগেছিল গোলাম রসুলের। পুতুলের চিৎকার শুনে চোখ খুলল। ভয়ে উত্তেজনায় এরই মধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে আবদুর রশিদ। কোনোমতে বলল – খোকা চৌধুরী … পুতুলকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে!

পুতুলের চিৎকার শোনা গেল আবার – ভাই তোমরা আমাকে বাঁচাও!

‘ভাই’ শব্দটা কানে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিক শক খাবার মতো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল গোলাম রসুল। একরোখা ষাঁড়ের মতো ছুটল ঝোপের দিকে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তার পিছু নিল আবদুর রশিদও। ঝোপের কাছে গোলাম রসুলের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে হীরু আর অনন্ত। বলল – এদিকে আইসেন না। মাগিটার বড় বাড় হইছিল। টাইট দিয়ে চলে যাব আমরা।

রাগে ফুলছে গোলাম রসুল – এ কি মগের মুলস্নুক পেয়েছ? মেয়েছেলেকে জোর করে …

কথা শেষ না হতেই মুখিয়ে উঠল অনন্ত – যা খুশি করব আমরা। ও কি আপনার বউ না বেটি যে নাক গলাতে আইছেন?

আর সহ্য করতে পারল না গোলাম রসুল। চটাস করে চড় মারল অনমেত্মর গালে। স্তম্ভিত হয়ে গেল অনন্ত। হীরু আর আবদুর রশিদও কম অবাক হয়নি। এই তল্লাটে কেউ অনন্তর গায়ে হাত তুলতে পারে! তার ওপরে এই প্রায়-বুড়ো, নিশ্চিন্দিপুরের অস্থানীয় গোলাম রসুল। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে কোমর থেকে ছোরা বের করল হীরু। ভাঁজ খুলছে। জোয়ান বয়সে ঘুসি মেরে ঝুনো নারকেল ছিলেছে গোলাম রসুল। সেই রকমের ওজনের একটা ঘুসি ছুড়ল হীরুর মুখ লক্ষ্য করে। কাটা কলাগাছের মতো ধপাস করে মাটিতে পড়ল হীরু। হাত থেকে ছুরি ছিটকে চলে গেছে দূরে। হাতের চেইন ঘুরিয়ে মারল অনন্ত। সরে দাঁড়িয়েছিল গোলাম রসুল। তবু ডান ভুরুর কাছে কপাল ছুঁয়ে গেল চেইন। সঙ্গে সঙ্গে চামড়া ফেটে রক্ত বেরোল। কিন্তু ভ্রম্নক্ষেপ না করে অনন্তর কবজি ধরে মোচড় দিলো গোলাম রসুল। ফট শব্দ তুলে ভাঙল কবজির হাড়। পেছনদিকে কষে একটা লাথি মারতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনন্ত। তারপর উঠে দাঁড়িয়েই ছুট দিলো বাগানের গেটের দিকে। এদিকে হীরু সবেমাত্র মাথা তুলতে যাচ্ছে। তার চোয়াল বরাবর লাথি হাঁকাল গোলাম রসুল। এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনন্ত যেদিকে গেছে সেদিকেই দৌড় লাগাল হীরু।

ঝোপের ওপাশে গাঁ-গাঁ শব্দ হচ্ছে। বোধহয় খোকা চৌধুরী মুখ চেপে ধরেছে পুতুলের। টর্পেডোর মতো ছুটে গেল গোলাম রসুল।

পুতুলকে চিৎ করে ফেলে ওর ওপর উঠে বসেছে খোকা চৌধুরী। শাড়ি, বস্নাউজ ছিঁড়ে ফেলেছে। কোমরের কাছে হাত দিয়ে পেটিকোটের ফিতে ধরে টানছে। ঝাঁকড়া চুল মুঠি করে ধরে খোকা চৌধুরীকে টেনে তুলল গোলাম রসুল। তারপর ধাঁই করে বসাল ঝুনো নারকেল-ছেলা ঘুসি। পড়ে গিয়েও এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়াল খোকা চৌধুরী। চোখে আগুন জ্বলছে – আমার কাজে নাক গলানোর শাস্তি তুমি পাবে। চবিবশ ঘণ্টার মধ্যে তোমাকে যদি নিশ্চিন্দিপুরছাড়া না করি তো …

অনন্তর ফেলে যাওয়া চেইনটা তুলে নিয়ে এগোচ্ছে গোলাম রসুল। দেখতে পেয়ে মুখের কথা শেষ না করেই ছুট লাগাল খোকা চৌধুরী। বলা যায় না বাবা। যে-মূর্তি ধরেছে গোলাম রসুল – জানে মেরে ফেলতে পারে!

------তিন------

মাঝরাতে দাওয়ার বাঁশের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে গোলাম রসুল। একা। কপালে লিউকোপস্নাস্ট দিয়ে তুলো লাগানো। তারার আলোয় ঝকঝক করছে আকাশ। আটচলিস্নশ বছর আগে ফিরে গেছে সে। একাত্তরের সেই রাতটাও এমনি তারাজ্বলা ছিল। সেদিনও বাতাসে ভেসে এসে গোলাম রসুলের কানের পর্দায় আছড়ে পড়েছিল দুটো শব্দ – ‘ভাইজান বাঁচাও!’

সেদিন কিছুই করতে পারেনি গোলাম রসুল।

আজ এত বছর পরে বোধহয় একটু সান্তবনার শান্তি নিয়ে ঘুমাতে পারবে সে।