হারিয়ে যেতে নেই মানা by আকাশ মামুন ষ

বালিহাঁসের ডানায় চড়ে শীত এসেছে। শুষ্ক হিমেল হাওয়ায় দেহমনে জেঁকে বসেছে জড়তা। এই জড়তাকে পাশ কাটিয়ে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ল্যাবে বিভিন্ন রাসায়নিকের উৎকট গন্ধ, মিডটার্ম, প্রেজেন্টেশন দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছি। সবকিছু কেমন যেন পানসে, একঘেয়ে ঠেকছে। তাই তো ক্লাস, ল্যাবের বৃত্তে বন্দি জীবন থেকে বাইরে এসে ভিন্নতার ছোঁয়া লাগাতে ট্যুরের প্রস্তাব করল অষ্টম সেমিস্টারের সানি।


সৈয়দ আলম স্যারকে জানাতেই পাওয়া গেল সহযোগিতার আশ্বাস। ঠিক করা হলো, ট্যুর হবে বুড়িগঙ্গা হয়ে মেঘনার বাঁকে মোহনপুর চরে। অনেকেই স্থান আর নৌপথের জন্য পিছিয়ে গেল। শেষতক ৩৪০ জন নিবন্ধন করল। ৭ জানুয়ারি সকাল আটটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় থাকার কথা থাকলেও সবাই আসতে আসতে সাড়ে আটটা পেরিয়ে গেল। কুয়াশার আবরণ ভেদ করে আর শেষবারের মতো আয়নায় নিজেকে গুছিয়ে নিতেই এতটা দেরি। অষ্টম সেমিস্টারের মনির আবার এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ল। বেচারা নিবন্ধন করেও শেষ পর্যন্ত যেতে পারল না। নয়টা নাগাদ আমিনুল স্যার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে সবাইকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। ইতিমধ্যে যোগ হয়েছেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান শাহজাহান স্যার, সামদ স্যার, নাজমুল স্যার, জামির স্যার ও সৈয়দ আলম স্যার। রই রই করে সবাই লঞ্চে উঠে পড়তেই লঞ্চ ছেড়ে দিল। এরই মধ্যে কে যেন আমিনুল স্যারের ৩ বছরের ছেলে ফারহানের সঙ্গে মজা করতে গেল। চিৎকার দিয়ে সে বলে উঠল বাবা দেখ না বড় বড় বাচ্চারা কেমন দুষ্টুমি করে। সবাই এক চোট হেসে নিল। পোস্তগোলা সেতু পেরুতেই সূর্যের দেখা মিলল। যেন ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভেঙে উঁকি মারল গম্ভীর মুখে। ততক্ষণে সকালের নাশতা হয়ে গেছে। লঞ্চের ছাদে সকালের রোদে প্লেইং কার্ড নিয়ে বসেছে আকাশ, জুয়েল, আশরাফ ও শাওন। শাহজাহান আর সৈয়দ আলম স্যার এসে যোগ দিলেন তাতে। যে শাহজাহান স্যার পাঁচ মিনিট পরে ক্লাসে ঢুকলে উপস্থিতি দেন না, ল্যাব রিপোর্ট ছাড়া ল্যাবে ঢুকতে দেন না, তিনি কি-না ছাত্রদের সঙ্গে কার্ড খেলছেন। বিশ্বাসই যেন হচ্ছিল না। বেলা বাড়তেই দ্বিতীয়তলা থেকে অ্যামপ্লিফায়ারে ভেসে এলো মিউজিকের তাল। শীত কাটিয়ে তারুণ্য যেন নেচে উঠল। কে যেন শাহজাহান স্যার ও সৈয়দ আলম স্যারকে ডেকে নিয়ে এল। বয়সের ছাপকে পেছনে ফেলে সবার সঙ্গে নেচে উঠলো শাহজাহান স্যার।
সঙ্গে যোগ দিলেন আমিনুল স্যার, সামাদ স্যার , নাজমুল স্যার ও জামির স্যার। দুপুর ২টা নাগদ লঞ্চ ভিড়ল মোহনপুর। শখের ক্যামেরাটা নিয়ে নেমে পড়ল কাউসার, সুমন, রাখি ও হাসান আমিনুল স্যার। কিন্তু বেচারা ষষ্ঠ সেমিস্টারের শরিফ নদীতে শখের ক্যামেরাটা ফেলে মনটাই খারাপ। কেন যে ঊর্মিলাটা এলো না_ বলে উঠলো জুঁই। মেয়েদের একটা দল কাছেই সরিষার ক্ষেত দেখে ছুটল ছবি তুলতে। কোমরবেঁধে মোরগ যুদ্ধ খেলতে নেমে গেল সজীব, সোহান, রুবেল, রকিব, রাসেল, জেমস, শরিফ, রোহান, জয়নুল, অখিল, অরিন্দম, রাজন, রাসেল, রাজিব ও জীবন। জামির স্যারের নেতৃত্বে অষ্টম সেমিস্টার ও সামাদ স্যারের নেতৃত্বে বাকিরা নেমে গেল ফুটবল নিয়ে। ৪-২ গোলে জামির স্যারের দল জয়ী হলো। এবার ক্রিকেটে নেমে গেল সৈয়দ আলম ও আমিনুল স্যারের নেতৃত্বে দুটি দল। বিকেল চারটায় খেতে দেওয়া হলো। ফেরার পথে সবাইকে মাতিয়ে রাখল সঙ্গীতানুষ্ঠান। সঙ্গীতে পুরস্কার পেল অষ্টম সেমিস্টারের জাকির, রুমি, সপ্তম সেমিস্টারের জয়নুল, ষষ্ঠ সেমিস্টারের জাহাঙ্গীর, সপ্তম সেমিস্টারের রকির ব্যান্ড দল অবিনশ্বর, জামির স্যার ও আমিনুল স্যার।
শেষ দিকে লঞ্চের ছাদে খোলা গলায় টেবিল চাপড়ে গেয়ে উঠল জুয়েল, সাইফুল, আকাশ, লালন, বাপ্পী, বিকাশ, পারভেজ, মুন্না, শাহিন, শুভ, শাওন, মোবারক, হাসন, রুমী, লিজা, রাখি ও ঋণী।
মাঝখানে আমিনুল স্যার গলা মেলাল কফি হাউজ গানে। রাত নয়টায় লঞ্চ সদরঘাটে ভিড়ল। যারা লঞ্চে ভ্রমণের বিপক্ষে ছিল তারাও বলে উঠল ইট ওয়াজ এ গ্রেট মোমেন্ট। চারদিকে হিম পড়ছে। সারাদিনের আনন্দ স্মৃতি বুক পকেটে নিয়ে নিয়ন আলোয় পথ দেখে ফিরে চলল যে যার ঘরে।

1 comment:

  1. এত দিন পর দেখে ভাল লাগলো। একটি স্মৃতিময় দিন ছিল। অনার্স শেষ বর্ষের ট্যুর ছিল ওটা। সমকালে তখন জিয়া ভাই নিউজটা ছেপেছিল। জানিনা জিয়া ভাই এখনও সমকালে আছে কিনা।

    ReplyDelete

Powered by Blogger.