চামড়ার বাজারে মন্দা

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার দোহাই দিয়ে পাইকার ও আড়তদাররা চামড়ার দাম কম দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। অন্যবার আগে থেকেই চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও এবার না দেয়ায় চামড়া কিনে বিপাকে পড়েন খুচরা ব্যবসায়ীরা। যে দাম দিয়ে তারা চামড়া কিনেছেন সে তুলনায় পাইকার ও আড়তদারদের কাছ থেকে বেশি দর পাচ্ছেন না। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এবার আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা খুব বেশি নেই। তাই চামড়ার দামও কম। এদিকে চামড়ার দাম কম হওয়ায় বিপুল পরিমাণে চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


চামড়ার খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বর্গফুট চামড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে তারা কিনলেও আড়তদাররা ৭৫ থেকে ৮০ টাকার বেশি দাম দিতে চাচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চামড়ার দাম আরও কম দেয়া হচ্ছে বলেও জানান খুচরা ব্যবসায়ীরা। চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিক ও রফতানিকারকরা বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম। গত বছর ঈদের আগেই চামড়া রফতানির অর্ডার ছিল। এবার এখন পর্যন্ত কোনো অর্ডার আসছে না। তাই চামড়ার দাম কিছুটা কম। চামড়ার দাম নির্ধারণ না হওয়াও এবার চামড়ার দাম কম হওয়ার একটি কারণ বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, গত বছর প্রতি বর্গফুট চামড়া ৫৫ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার তা করা হয়নি। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান পর্যাপ্ত টাকার অভাবেও আড়তদাররা বেশি চামড়া কিনতে পারছেন না। ফলে চামড়ার সরবরাহ ভালো থাকার পাশাপাশি টাকার অভাবে চামড়ার দাম কম হাকা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট অনেকেই ট্যানারি মালিকদের এসব যুক্তি মানতে নারাজ। তারা বলছেন, বিশ্ব মন্দা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। তাই বিশ্ব মন্দার এই যুক্তিতে তারা দাম কমানোর কৌশল হিসেবেই গণ্য করছেন। অন্যবার ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনার একটি দর আগে ঠিক করে দিলেও এবার তা না দেয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বেলাল হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ঘন ঘন ওঠানামা করায় আগে থেকে দাম নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া আগের বছরগুলোতে দাম বেঁধে দিলেও আড়তদাররা তা মেনে চলেনি।
তবে আগে থেকে চামড়ার দর ঠিক করা থাকলে সমস্যা এড়ানো যেত বলে মনে করেন ঢাকা ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ রশীদ ভুঁইয়া। তিনি বলেন, দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলে মানুষের মধ্যে একটা ধারণা থাকে। সেক্ষেত্রে ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে খুচরা ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাদের মধ্যে একটা স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করে। দাম ঠিক না থাকায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দরে চামড়া কিনেছেন। এখন বিক্রি করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাম কম পাচ্ছেন তারা।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক চামড়া কিনতে এবার ব্যবসায়ীদের ৩৫২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। গত বছর এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২৫ কোটি টাকা। অনেকেই মনে করছেন এবছর চামড়া ব্যবসায়ীদের যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। সেজন্যই তারা চামড়া কিনতে পারছেন না। ফলে চামড়ার দামও কম। চামড়ার দাম কম হওয়ায় ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। আর এজন্য তারা দায়ী করছেন সিন্ডিকেটকে। তারা বলছেন, যেহেতু আমাদের দেশে চামড়ার দাম তুলনামূলকভাবে কম। তাই একটি সিন্ডিকেট ভারতে চামড়া পাচার করে বেশি লাভ গুনতে চাইবে। কারণ ভারতে চামড়ার দাম ভালো পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিশনের সভাপতি শাহীন আহমদ বলেন, যে পরিমাণ পশু জবাই হয়েছে তাতে চামড়ার সরবরাহ ঘাটতির কোনো কারণ নেই। বরং আমরা আশঙ্কা করছি, অবৈধ পথে চামড়া ভারতে চলে যেতে পারে। একটি চক্র বরাবরের মতো এখনও সক্রিয়। তাই তিনি সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানান। তিনি বলেন, সরকারের কাছে অনুরোধ করছি সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করুন। তা না হলে চামড়া অবৈধ পথে ভারতে চলে যেতে পারে।
দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রফতানি পণ্য চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যের কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক যোগানই আসে ঈদুল আজহার সময়। এবারের ঈদে সারাদেশে ৪০ লাখেরও বেশি গরু-মহিষ এবং ৩৫ থেকে ৪০ লাখের মতো ছাগল কোরবানি হয়েছে বলে ধারণা করছে ট্যানারি মালিকরা। কাঁচা চামড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের রাত থেকেই ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকার চামড়া আড়তগুলোতে আসতে শুরু করে। কিন্তু যে পরিমাণ চামড়া আসবে বলে ধারণা করেছিলাম তা আসছে না। ফলে এখন পর্যন্ত সরবরাহ দেখে মনে হচ্ছে এবার ৭০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৫ কোটি ৩২ লাখ ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে তা সামান্য কমে হয় ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আয় হয়েছে ৯ কোটি ২৮ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ কম।
এদিকে বাংলাদেশ হাইড এবং স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিশেনের সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, চামড়ার বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার কিছু কারণ আছে। তবে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টি মুখ্য নয়। তিনি বলেন, অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী না বুঝে ব্যবসা করতে আসে। তাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নানাভাবে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে চামড়া কিনলেও আড়তদাররা ন্যায্যমূল্য দিয়ে চামড়া কিনেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম তুলনামূলক কম। গত তিন মাস ধরে চামড়ার দাম নিম্নমুখী। তাই আমরাও বেশি দাম দিয়ে চামড়া কেনার পক্ষপাতি নই। শাহীন আহমেদ বলেন, ট্যানারি মালিকরা বিশ্ব মন্দার আভাসে শঙ্কিত। তাই বাজারে চামড়ার দাম তুলনামূলকভাবে কম।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত কোরবানির পশুর চামড়া আমদানি হলেও ক্রয়ে আগ্রহ নেই কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের। আন্তর্জাতিক বাজারে ফিনিসড লেদারের অর্ডার কমে যাওয়ায় দেশীয় ট্যানারি মালিকরাও অতিরিক্ত চামড়ার মজুত করতে চাচ্ছেন না। আর ব্যবসায়ীদের দাবি, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ব্যবসা না বুঝেই বেশি দামে চামড়া কিনে বাজার অস্থির করে তুলেছেন। এই সুযোগে একটি সিন্ডিকেট পাচারের উদ্দেশ্যে চামড়া সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। এতে করে বিপুল পরিমাণ চামড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আড়তদাররা জানান, এবারের ঈদে কক্সবাজার তিন পার্বত্য জেলাসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে ৩ লাখ গরুর ও ৭০ হাজার ছাগলের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাঁচা চামড়ার আড়তদার সমবায় সমিতি। সকাল পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ চামড়া আতুরের ডিপো এলাকায় জড়ো হলেও সব চামড়া আড়তদাররা সংগ্রহ করতে পারেননি। আড়তদারদের সঙ্গে বেপারীদের দামের বিস্তর ফারাক থাকায় আড়তদাররা চামড়া সংগ্রহ করতে পারছেন না।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, ঈদের আগে চামড়ার দাম নির্ধারণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাকে কেন্দ্র করে চামড়ার বাজারে ধসের আশঙ্কার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা ভারতীয় এজেন্টদের মাধ্যমে কৌশলে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশীয় কিছু চোরাকারবারিকে এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কোরবানির ঈদকে ঘিরে গড়ে তুলেছে তাদের চামড়ার বাজার। এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকার চামড়া রাজশাহীর সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল দিয়ে পাচার হয়ে গেছে এবং আরও কয়েক কোটি টাকার চামড়া পাচারের লক্ষ্যে ওইসব সীমান্ত এলাকায় গুদামজাত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

No comments

Powered by Blogger.