আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা অনেক বাস্তবায়ন নেই by পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য

রসিংদী পৌর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডে অভিযোগের আঙুল উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য প্রভাবশালী মন্ত্রীর দিকে। সদ্যসমাপ্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থীর বিশাল পরাজয়, সারা দেশের বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শেয়ারবাজারে ধস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা বিষয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার। শুধু বাইরে নয়, খোদ ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও সরকারের সমালোচনায় মুখর।
এসবের পাশাপাশি রয়েছে ঈদের পর বিরোধীদলীয় জোটের আন্দোলনের প্রস্তুতি। আছে দলের সাংগঠনিক নাজুক অবস্থা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং মহাজোটের শরিকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা।


কিন্তু এত কিছুর পরও সরকার কিংবা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো আগাম প্রস্তুতি বা কৌশল নেই সমস্যা মোকাবিলায়। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে_শুরু হচ্ছে, হবে। দলীয় সর্বোচ্চ কার্যকরী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও আলোচনা হয় না দলের সমস্যা ও সমাধানের কৌশল নিয়ে।
এরপর কোনো সিদ্ধান্ত এলেও তা বাস্তবায়নে নেই কার্যকর উদ্যোগ। এসব কারণে ক্ষমতার মধ্য মেয়াদেই সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।
তবে সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময় বলা হলেও এ ব্যাপারে কোনোই পদক্ষেপ নেই। উপরন্তু সরকারের মধ্য মেয়াদেই ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিকদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতাও প্রকট হয়েছে। শরিকদের মধ্যকার দূরত্ব নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হলেও নেই তার বাস্তবায়ন।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করেন দল এবং মহাজোটে সমন্বয় নেই এবং দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়নে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকিতে মোটেই উদ্বিগ্ন নয় দলটি। বরং জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্দোলনের জবাব দেওয়ার কথা বলেন শীর্ষ নেতারা। কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহার পূরণেও অনেকটাই ব্যর্থ সরকার।
দলীয় সূত্র জানায়, আগে দলের তরফ থেকে নেতারা বিরোধী দলের আন্দোলনের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেও খালেদা জিয়ার রোর্ড মার্চ এবং জনসভায় লোকসমাগম দেখে উদ্বিগ্ন শাসক দলটি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের নিজেই স্বীকার করেন দলের মধ্যে এবং মহাজোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথা। তিনি বলেন, দলীয় ফোরামে দলকে সাংগঠনিকভাবে মজবুত করতে অনেক সিদ্ধান্ত এলেও এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাঁদের ওপর তাঁদের অনীহার কারণে সিদ্ধান্তগুলো পরিকল্পনার পর্যায়েই থমকে থাকে।
ওবায়দুল কাদের ঈদের সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের এলাকায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে বড় আকারে গণসংযোগের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি তিনি সরকারের ভুল কাজগুলোর কথা স্বীকার করে সরকারের অর্জনগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরার ওপরও জোর দেন।
সূত্র জানায়, ঈদের পর চলমান আন্দোলনকে চাঙা করতে নতুনভাবে মাঠে নামবে চারদলীয় জোট। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের মাঠ চাঙা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। আন্দোলনকে চাঙা করতে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া খুলনা ও চট্টগ্রামে রোড মার্চসহ বিভাগ ও বৃহত্তর জেলাগুলোতে সমাবেশ এবং ঢাকায় জনসভা করারও পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছেন।
বিএনপির এই পরিকল্পনার বিপরীতে আওয়ামী লীগের নেই কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা। তবে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী মনে করেন, আন্দোলন করবে বিরোধী দল। আর সরকারি দলের দায়িত্ব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন।
বিরোধী দলের কর্মসূচির সঙ্গে পাল্টাপাল্টি কিছুতে যাওয়ার বিপক্ষে নিজের অবস্থান জানিয়ে মতিয়া চৌধুরী বলেন, সরকারের কাজ সময় নষ্ট না করে ইশতেহার বাস্তবায়ন করা। বিরোধী দলের আন্দোলনে সরকারের মাথা ব্যথা নেই বলেও জানান তিনি।
সংগঠনকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা সম্পর্কে মতিয়া চৌধুরী বলেন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলমান প্রক্রিয়া এবং তৃণমূলের সম্মেলন অনুষ্ঠান শুরুর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
সরকারের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে এ কথা স্বীকার করে সরকারের ভালো কাজ ও অর্জন প্রচার করতে জেলায় জেলায় সমাবেশ করার কথা জানালেন ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ।
কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে হানিফ বলেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হবে জেলায় জেলায় সমাবেশ। ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা এ সমাবেশে সরকারের অর্জন তুলে ধরা হবে।
বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো মাথা ব্যথা নেই মন্তব্য করে হানিফ বলেন, দলকে শক্তিশালী করতে ঈদের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করা হবে। শুরু হওয়া তৃণমূল কাউন্সিল আরো জোরদার হবে।
নিজ সংগঠনের এই দুর্বল চিত্রের পাশাপাশি মহাজোট শরিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত উপেক্ষা করা, নিয়মিত বৈঠক না হওয়া, মূল্যায়ন না করা এবং সর্বোপরি বৈঠক হলেও বৈঠকের গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়েও শরিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
মহাজোট শরিকদের মধ্যে বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতেও বিরোধী দলের অপপ্রচারের জবাব, সংবিধান সংশোধনে জনমত সৃষ্টি এবং মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা করতে জোট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে কার্যকর সাড়া পায়নি শাসক দলটি।
তবে মহাজোট শরিকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ মানতে নারাজ মতিয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হলেও মহাজোট শরিকদের সঙ্গে সরকারের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চলছে। কিভাবে যোগাযোগ আছে তা অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করেননি।

No comments

Powered by Blogger.