রাজধানীতে ঈদের ছুটিতে বিএনপি নেতাসহ ৬ খুন

কোরবানির ছুটির গত তিন দিনে রাজধানীতে বিএনপি নেতাসহ ৬ জন খুন হয়েছে। শেরেবাংলানগরে গুলি করে হত্যা করা হয় ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল বাকি ওরফে মিল্টনকে (৪০), সবুজবাগের কমলাপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত (২৫) তরুণীর খণ্ডিত লাশ, খিলক্ষেতে ইশরাত জাহান ইভা (৮) নামের এক বালিকাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়; খিলগাঁওয়ে শিশু হৃদয়ের (৬) লাশ পাওয়া যায় ঝিলের পানিতে, লালবাগে গৃহবধূ শান্তা বেগমকে (২০) গলা কেটে হত্যা করে বেড়িবাঁধে ফেলে রাখা হয়। যাত্রাবাড়ীতে খুন হয় অজ্ঞাত (৪৫) এক ব্যক্তি। পুলিশের ধারণা, অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে ওই ব্যক্তি খুন হয়েছেন।


বিএনপি নেতা খুন : শেরেবাংলানগর এলাকায় একটি ক্যাবল অপারেটরের অফিস কক্ষ থেকে গতকাল সকালে উদ্ধার করা হয় ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল বাকি ওরফে মিল্টনের গুলিবিদ্ধ লাশ। পুলিশ জানায়, তার মাথায়, গলায় ও পিঠে তিনটি গুলি করা হয়। কে বা কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, এ বিষয়ে পুলিশ গতকাল পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি। মিল্টনের ভাই আব্দুল বাতেন জানান, মিল্টন রাজনীতির পাশাপাশি কেবল অপারেটর ব্যবসা করতো। মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় কল্যাণপুরে ভায়রার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়। এরপর সে আর ফিরে আসেনি। রাত ১১টায় ভায়রার সঙ্গে ফোনে কথা বলে মিল্টন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর পেয়ে শেরেবাংলানগরে ডিশ টিভির অফিসে গিয়ে তার লাশ পাওয়া যায়। বাতেন বলেন, ১৯৯২ সাল থেকে মিল্টন কেবল ব্যবসা করে আসছে। এর আগেও তাকে একাধিকবার হুমকি দেয়া হয়েছিল। তার ধারণা, কেবল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই প্রতিপক্ষের লোকজন তার ভাইকে হত্যা করতে পারে। নিহত মিল্টনের বাবার নাম মৃত মোমিনুল আহমেদ। মিকাত (১২), ঐশী (৬) ও লাম নামে তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বাসা ৪০০/২, পশ্চিম শেওড়াপাড়া মিরপুর। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের মাঝিরগাঁওয়ে।
তরুণীর খণ্ডিত লাশ : কোরবানির দিন সোমবার ভোরে কমলাপুর এলাকা থেকে সবুজবাগ থানা পুলিশ অজ্ঞাত এক তরুণীর মাথা বিচ্ছিন্ন খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে। সবুজবাগ থানার এসআই দীপক কুমার পাল জানান, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কমলাপুর ফুট ওভার ব্রিজের দক্ষিণ দিক আইসিডি দেয়াল সংলগ্ন ফুটপাত থেকে মাথাবিহীন দেহটি বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া যায়। এর কিছুক্ষণ পরই আশপাশে খুঁজে ২০ গজ দূরে একটি ম্যানহোলের ভেতরে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় মাথাটি পাওয়া যায়। তার বয়স আনুমানিক ২৩ বছর। নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ওই তরুণীর হাত ও পা বাঁধা ছিল। সালোয়ার পরা তরুণীর পায়ে আলতা দেয়া ছিল। এসআই দীপক আরও বলেন, কোরবানির দিন ভোরে এই তরুণীকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যার আগে তাকে পাশবিক নির্যাতন করা হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। ময়নাতদন্তের জন্য মৃৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ডোবা থেকে বালিকার লাশ উদ্ধার : খিলক্ষেতের নামাপাড়া বোডগার্ড সংলগ্ন ডোবা থেকে ইশরাত জাহান ইভার লাশ উদ্ধার করা হয়। খিলক্ষেত থানার এসআই শাহজাহান জানান, কোরবানির দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় মেয়েটির লাশ পাওয়া যায়। লাশটি একটি বস্তার ভেতরে ছিল। তার দুই কানে কালো দাগ এবং দুই হাত ও দুই পা রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। শরীরের বিভিন্নস্থানে ফুটন্ত পানিতে সেঁকা দেয়ার মতো ফোসকা পড়া দাগ ছিল। পুলিশের ধারণা, তাকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে ডোবায় ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। ইভার মামা স্বপন জানান, গত ২ নভেম্বর ইভা বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। বিভিন্নস্থানে খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর পেয়ে ওই দিন থানায় গিয়ে ভাগ্নির লাশ শনাক্ত করেন তিনি। ইভা আল-মানারাত মডেল স্কুলের প্লে-গ্রুপের ছাত্রী ছিল। তার বাবার নাম মো. ইউসুফ আলী। তিনি বিআরটিসি’র গাড়ি চালক। বাসা ক-২১১/২/এ, খিলক্ষেত নামাপাড়া। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের উত্তর বেরুরা এলাকায়। তবে কি কারণে বা কারা তাকে হত্যা করেছে এ বিষয়ে ইভার স্বজনরা কিছু জানাতে পারেনি।
অপহরণের পর শিশু খুন : খিলগাঁওয়ের গোড়ান আদর্শবাগ ঝিল থেকে কোরবানির দিন সকালে উদ্ধার করা হয় শিশু হৃদয়ের লাশ। খিলগাঁও থানার এসআই আলমাস জানান, স্থানীয় লোকের কাছে খবর পেয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় ঝিলের ড্রেজারের পাইপের সঙ্গে ভাসমান অবস্থায় লাশ পাওয়া যায়। হৃদয়ের বাবা রিকশাচালক আমিরুল হোসেন জানান, গত ৪ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে তিনি রিকশা নিয়ে বাসার সামনে আসলে ছেলেটি রিকশায় চড়ার বায়না ধরে। পরে হৃদয়কে রিকশায় তুলে আমি বাসার ভেতরে যাই। কিছুক্ষণ পর বাইরে গিয়ে রিকশা ও ছেলেটিকে পাওয়া যায়নি। দুর্বৃত্তরা রিকশাসহ ছেলেটিকেও অপহরণ করে নেয়। পুলিশের ধারণা, যারা রিকশাটি চুরি করেছে তারাই শিশুটিকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে ঝিলে ফেলে দিতে পারে। আমিরুল হোসেনের বাসা ১৭৮, উত্তর গোড়ান এলাকায়।
গলা কেটে গৃহবধূকে হত্যা : লালবাগ এলাকায় কোরবানির দিন রাতে গৃহবধূ শান্তা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার স্বামী স্বপনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। লালবাগ থানার ওসি মো.আজিজুজ্জামান জানান, সোমবার রাতে বেড়িবাঁধে শান্তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পায় স্থানীয়রা। হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, লাশটি কামরাঙ্গীরচর থানা থেকে উদ্ধার করা হলেও বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ওই স্থানটি লালবাগ থানা এলাকার। ওসি জানান, নিহতের বাবা মোহাম্মদ খোকন বাদী হয়ে স্বপনের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেছেন। তিনি মামলায় অভিযোগ করেছেন, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার মেয়েকে হত্যা করেছে। শান্তার স্বামী স্বপন ঢাকায় রিকশা চালাতো। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর এলাকায়। তারা থাকতো কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম কুলারঘাট এলাকায় হাবু মিয়ার বাড়িতে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি খুন : কোরবানির দিন সকালে যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের সামনে থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী থানার এসআই প্রদীপ কুমার জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টার্মিনালের সামনে পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য পাঠানো হয়। তার পরনে ছিল সাদা চেক লুঙ্গি। তিনি বলেন, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে সামান্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিত্সাধীন অবস্থায় ওই দিনই রাত সাড়ে ১১টায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশের ধারণা, অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। তারপরও ময়নাতদন্তের পর মৃত্যু সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান এসআই প্রদীপ কুমার।

No comments

Powered by Blogger.