শ নি বা রে র বিশেষ প্রতিবেদন- পতিত জমিতে বিষমুক্ত সবজি by সুমন্ত চক্রবর্ত্তী

আমাদের দেশে শীতকালে হরেক রকম সবজি পাওয়া যায়। শীতে সবজি চাষও হয় বেশি। কিন্তু সারা বছরই যে সবজি চাষ করা সম্ভব, তা হয়তো অনেকে জানেন না। আবার অনেকের মধ্যে এমন ধারণাও আছে, সবজি চাষ করে লাভ পেতে চাইলে বিঘা বিঘা জমিতে আবাদ করতে হয়।


তপ্রচলিত এসব ধারণা ভেঙে দিয়েছেন খুলনার দাকোপ উপজেলার আইলা-বিধ্বস্ত কামারখোলা গ্রামের নারীরা। তাঁরা বসতভিটার লাগোয়া পতিত জমিতে সারা বছরই সবজি চাষ করছেন। সেই সবজি বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। গ্রামের অন্তত ৩০০ পরিবার রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই সবজি চাষ করে যে সাফল্য পেয়েছেন, তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের লোকজন বাড়িতে সবজি চাষ শুরু করেছেন।
শুরু যেভাবে: প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এই এলাকার সাধারণ মানুষ বেশির ভাগ সময় সরকারি-বেসরকারি সাহায্যের আশায় থাকতেন। দুর্যোগের পর ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করতেন; কোনো সংস্থার ত্রাণ এলে ছুটে যেতেন। যাঁদের ভাগ্যে ত্রাণ জুটত না, তাঁরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতেন। এখন আর সেই অবস্থা নেই। তাঁদের অনেকেই আজ সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী।
শুরুটা হয়েছিল গ্রামের প্রবীর মোড়লের (৬০) হাত ধরে। শখের বশে তিনি টুকটাক বাগান করতেন। ১৯৭৫ সালে নিজেদের খাওয়ার জন্য বাড়ির লাগোয়া এক চিলতে জমিতে মুলা, লাউসহ কয়েকটি সবজির চাষ করলেন। ফলন বেশ ভালোই হলো। শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহে স্থানীয় কৃষিমেলায় তাঁর সবজির প্রদর্শনী করলেন। পুরস্কারও পেলেন। পরে তিনি বিভিন্ন সময়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। চলতে থাকে সবজির চাষও। প্রবীর ১৯৭৫ ও ’৭৬ সালে কৃষিমেলায় মুলা ও লাউ প্রদর্শনী করে পুরস্কার পান। এরপর ’৮১ সালে কপি, ’৮৪ সালে সূর্যমুখী ও ২০০৪ সালে মুলা ও টমেটো চাষ করে পুরস্কার লাভ করেন।
বাড়ির লাগোয়া পতিত জমিতে সবজি চাষ করে প্রবীরের এই সাফল্য দেখে প্রথম দিকে গ্রামের দু-একজন নারী উৎসাহী হলেন। তিনি তাঁদের পরামর্শও দিলেন। এরপর অনেকেই সবজি চাষে উৎসাহ দেখালেন। তখন প্রবীর নিজে সবজি চাষের পাশাপাশি গ্রামের নারীদের সবজি চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। সেই প্রশিক্ষণ পেয়ে নারীরা মৌসুমভেদে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ঢ্যাঁড়স, পুঁইশাক, বেগুন, টমেটো, চিচিঙ্গা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, ওল, পেঁপে, গাজরসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ করতে থাকেন। ধীরে ধীরে সবজি চাষ জনপ্রিয় হতে থাকে। একপর্যায়ে তা বাণিজ্যিক চাষে রূপ পায়।
সবজির গ্রামে একদিন: উপজেলা সদর থেকে কাঁচা সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কামারখোলা গ্রাম। সম্প্রতি সেই গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, প্রায় প্রতিটি বাড়ির লাগোয়া জমিতে সবজি। সবুজে ভরা গ্রামটি দেখলে প্রাণে যেন সজীবতা আসে! গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন খেতে দেখা গেল টমেটো, লালশাক, বেগুন, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, পেঁপে, ঢ্যাঁড়সসহ নানা সবজি। কোনো বাগানে নারীরা সবজিগাছের পরিচর্যা করছেন। কোনো বাগান থেকে তোলা হচ্ছে সবজি। কোথাও আবার সবজি তুলে বাজারে পাঠানোর জন্য বস্তাবন্দী করতে দেখা গেল।
সফল যাঁরা: কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারিয়ে নিঃস্ব কামারখোলা গ্রামের নূরজাহান খাতুনের (৪০) পরিবার আগে ত্রাণের ওপর নির্ভর করত। স্বামীর আয়ের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অভাবে সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই নূরজাহান সবজি চাষ করে ভাগ্য বদলিয়েছেন। চলতি বছর তিনি আট শতক জমিতে আলু ও বেগুনের চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করেছেন। খেতে যে সবজি আছে তা বিক্রি করে প্রায় চার হাজার টাকা পাবেন বলে আশা করছেন।
একই গ্রামের জোবা মোড়ল জানালেন, এ বছর সাত শতক জমিতে সবজি চাষ করেছেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে তিনি পাঁচ হাজার টাকা লাভ করেছেন।
একই গ্রামের রহিমা শেখ গত বছর ১২ শতক জমিতে আলু চাষ করেন। কিন্তু তেমন লাভ পাননি। এ বছর সেই জমিতে মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক ও পেঁপে চাষ করেছেন। খরচ বাদে এরই মধ্যে প্রায় আট হাজার টাকা লাভ করেছেন। চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মৌসুমের শুরুতে যেকোনো সবজি বিক্রি করতে পারলে অনেক বেশি দাম পাওয়া যায়।
জোবা, রহিমা, সুলতানা বেগম, মরিয়ম বেগম, সাহেলা বেগমসহ গ্রামের অনেক নারীই সবজি চাষ করে ভাগ্য বদলিয়েছেন। তাঁদের দেখাদেখি সাহেবের আবাদ গ্রামের সুশান্ত জোয়ারদার, পশ্চিম বাজুয়া গ্রামের তরুণ ঘরামি ও স্বপন ঘরামি, চালনা গ্রামের সত্যজিৎ হালদারসহ অনেকেই বাড়ির পাশের জমিতে সবজি চাষ শুরু করেছেন। সবজি চাষ ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম কামারখোলা, লাউদোকসহ আশপাশের অন্তত ১২টি গ্রামে।
সবজির বাজার: কামারখোলা গ্রামে উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। পাঠানো হয় খুলনা শহরের পাইকারি বাজারেও। স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রতিদিন সকালে বাজার বসে। দাকোপের বিভিন্ন ইউনিয়নের লোক ও খুলনা নগরের অনেক ব্যবসায়ী কম দামে সবজি কিনতে এখানে আসেন।
প্রবীর মোড়ল জানান, গত কয়েক বছরে সবজি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মোটামুটিভাবে ২০০৯ সাল থেকে এখানে বাণিজ্যিকভাবে এই চাষ শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই গ্রামে চাষিরা কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। জৈব সার ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করেন বলে বিভিন্ন এলাকায় এই গ্রামের সবজির সুনাম রয়েছে। প্রবীর জানালেন, চলতি বছরও আট শতক জমিতে সবজি চাষ করেছেন তিনি।
গ্রামবাসীর দুঃখ: কামারখোলা গ্রামে যাতায়াতের জন্য একটি সড়ক রয়েছে, তাও কাঁচা। সবজি বিক্রি করতে হলে চাষিদের সেই কাঁচা সড়ক হয়ে নদী পেরিয়ে চালনা বাজারে যেতে হয়। একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এ ছাড়া স্থানীয় বাটি নদীর ভাঙনের মুখে রয়েছে গ্রামটি। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত রাস্তাসহ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হোক।
তাঁদের কথা: দাকোপের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘সবজি চাষ করে কামারখোলা গ্রামের মানুষ ভালো সাফল্য দেখিয়েছে। এই সাফাল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ সবজি চাষে এগিয়ে আসছে। আমরা সবাইকে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছি।’ তিনি জানান, কামারখোলার সবজির বিশেষত্ব হলো, চাষিরা গোবর, আবর্জনা-খড়কুটো দিয়ে তৈরি সার ব্যবহার করেন।
কামারখোলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান উমা শংকর রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কামারখোলার নারীরা পরিবারের চাহিদা পূরণ করে সবজি বিক্রি করছেন। সেই টাকায় সংসারে সচ্ছলতা আনার চেষ্টা করছেন।

No comments

Powered by Blogger.