সমকালীন প্রসঙ্গ-চিকিৎসা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ সম্পূর্ণ হতে চলেছে by বদরুদ্দীন উমর

নগণের ভোটে নির্বাচিত এমপি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সরকারি আমলারা, এমনকি জজ সাহেবরা সরকারি অর্থে দেশে ও বিদেশে নিজেদের চিকিৎসা করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। এই ব্যয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে করা হচ্ছে। কিন্তু যারা উপরোক্ত ক্ষমতাবান লোকদের চিকিৎসার জন্য এই বড় আকারে ব্যয়ভার বহন করছেন তাদের নিজেদের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা তো দূরের কথা মোটামুটি একটা ব্যবস্থাও নেই! সামান্য যে ব্যবস্থা আগে ছিল সেটাও বন্ধ করে,


সব রকম সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহার করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি যে দেশে ও যে শাসন ব্যবস্থায় বিরাজ করে তাকে সভ্য ও গণতান্ত্রিক বলা থেকে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে?


১৯৭২ সালে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সে প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন থেকে সব কর্মকাণ্ড ব্যবসায়ের মধ্যে লয়প্রাপ্ত হচ্ছে। লুটতরাজ, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, সন্ত্রাস ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রাম থেকেই যে পুঁজি সংগঠিত হতে শুরু করে, সেটা মূলত ব্যবসায়ী পুঁজিতেই রূপান্তরিত হয়। এভাবে ব্যবসায়ী শ্রেণীই পরিণত হয় বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীতে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্যদের আশি শতাংশের ওপর এখন ব্যবসায়ী অথবা ব্যবসায়ের সঙ্গে নানা যোগসূত্রে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ যে আজ সাধারণভাবে ব্যবসায়ীদের দ্বারাই শাসিত হচ্ছে এর থেকে তার বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
যাই হোক, বাংলাদেশ এখন ব্যবসায়ী শ্রেণীর দ্বারা শাসিত হচ্ছে এটুকু বললেই এখানকার পুরো অবস্থা বোঝা যাবে না। আসলে সবকিছুই এখন ব্যবসায়ী চিন্তাভাবনা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন শিক্ষাদীক্ষা, কাব্য-সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, নৃত্যসঙ্গীত চর্চা ইত্যাদি সব ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গেই ব্যবসার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ব্যবসায়ের দিক বিবেচনার বাইরে রেখে এ ধরনের কোনো চর্চার কথা এখন বাংলাদেশে ভাবাই যায় না। শুধু শিল্প-সংস্কৃতিই নয়, চিকিৎসাও এই একই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। বলাবাহুল্য যে, অন্য সবকিছুর বাণিজ্যিকীকরণের থেকে চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণই সাধারণভাবে জনগণের জন্য সব থেকে পীড়নমূলক ও যন্ত্রণার বিষয়। চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ এখন বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে এর সঙ্গে কোনো প্রকৃত সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ এবং শাসন ব্যবস্থার সম্পর্ক নেই। এর দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার অসভ্য এবং অগণতান্ত্রিক চরিত্রের পরিচয় অত সহজেই পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে এখন চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। চক্ষুরোগ, হৃদরোগ, কিডনিরোগ, স্নায়ুরোগ, ডায়াবেটিস থেকে নিয়ে অনেক ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে হচ্ছে। এই চিকিৎসার মান উন্নত। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে জনগণের জন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে এটা বলা যাবে না। কারণ যে উন্নত চিকিৎসার কথা ওপরে বলা হলো তা এত বেশি ব্যয়সাপেক্ষ যে, সাধারণ কোনো রোগীর পক্ষে, গরিব তো বটেই, এমনকি মধ্যবিত্তশ্রেণীর রোগীর পক্ষেও এই চিকিৎসা লাভ সম্ভব হয় না। কাজেই গুরুতর কোনো অসুখ হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা লাভ না করেই তাদের মৃত্যু হয়। যেখানে অর্থশালী লোকেরা টাকাপয়সা দিয়ে চিকিৎসা করে আরোগ্য লাভ করে এবং অন্যরা বিনা চিকিৎসায় মারা যায় তাদের মৃত্যুকে হত্যা ছাড়া আর কী বলা যায়? সাধারণভাবে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো ব্যক্তিবিশেষ দায়ী নয়। এর দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের। এর দায়িত্ব রাষ্ট্রের ম্যানেজার ক্ষমতাসীন সরকারের।
এখানে এত কথা বলার কারণ সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে কিছুদিন আগে পর্যন্ত গরিব ও স্বল্পবিত্ত মানুষের যে সামান্য সুযোগ-সুবিধা ছিল তা ক্রমে সংকুচিত হয়ে বা কমে এসে এখন চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে একটা বাণিজ্যিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এই বাণিজ্য এখন শুধু ব্যক্তিবিশেষই করছে না, সরকারিভাবেও এই বাণিজ্য এখন এক বাস্তব ব্যাপার। ১৯৮৬ সালে এরশাদের শাসনামলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রথম ঁংবৎ ভবব চালু হয়েছিল। এর ফলে চিকিৎসার জন্য প্রত্যেক রোগীকে টিকিট কেটে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। তখনও পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। ডাক্তারদের ফি তো ছিলই না, নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো টাকাপয়সা লাগত না এবং ওষুধপত্রও মোটামুটি বিনামূল্যেই রোগীদের দেওয়া হতো। এসব সুযোগ-সুবিধাই পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার হতে হতে এমন জায়গায় এসেছে, যেখানে বিনামূল্যে কিছুই হওয়ার উপায় নেই। রক্ত পরীক্ষা থেকে অন্য যে কোনো ধরনের পরীক্ষার জন্যই সরকারি হাসপাতালে টাকা দিতে হয়। ওষুধপত্রও বিনামূল্যে দেওয়া হয় না, দৌড়াদৌড়ি করে রোগীর লোকজনকে বাজার থেকে কিনতে হয়।
এসব তো আছেই। এর ওপর এখন যে নতুন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে তাতে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের জন্যও ফি দিতে হবে! প্রাথমিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ২০০ টাকা ফির বিনিময়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের রোগী দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে! মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ, ক্যান্সার, লিভার, চক্ষু, নিউরু সাইনারি ইত্যাদি বিভাগের ডাক্তাররা বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত ২০০ টাকা ফির বিনিময়ে রোগী দেখবেন। এর জন্য রোগীদের টিকিট কাটতে হবে। এই টিকিটে এক মাস পর্যন্ত ডাক্তার দেখানো যাবে। এক মাস পার হলে প্রয়োজনে আবার ২০০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হবে (দৈনিক ইত্তেফাক ২১.৯.২০১১)।
কয়েক দিন আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রাণগোপাল এক টেলিভিশন টক শোতে বলেন, তার উদ্যোগ ও প্রভাবেই সেখানে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বলাবাহুল্য, এ ব্যাপারে তার অতি উৎসাহ থাকলেও এটা যে সরকারি স্বাস্থ্যনীতির কাঠামোর মধ্যেই হয়েছে এতে সন্দেহ নেই। সরকারি নীতির বাইরে গিয়ে এ ধরনের কিছু করার ক্ষমতা কারও নেই। এই একই টক শোতে প্রাণগোপাল বলেন, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা করেছেন। তখন সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুব উন্নত এবং চিকিৎসা ছিল বিনামূল্যে। এখানকার সরকারি হাসপাতালে পর্যন্ত রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা তো দূরের কথা ডাক্তারদের জন্য নতুনভাবে ফির ব্যবস্থা যিনি নিজের উদ্যোগে করছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের উন্নত চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা বলতে তার কোনো অসুবিধা হলো না। না হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, তাদের মতো বেপরোয়া, জনস্বার্থের প্রতি শুধু উদাসীন নয়, রীতিমতো বিরুদ্ধভাবাপন্নদের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করে আসা ডাক্তার প্রাণগোপালের পক্ষে রোগীদের জন্য এক প্রাণঘাতী ব্যবস্থা চালু করার ব্যাপারে তার উদ্যোগের কথা বলতে কোনো অসুবিধা হয় না।
আগেই বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ব্যবস্থা এখন চালু হচ্ছে, সেটা সরকারি স্বাস্থ্যনীতির কাঠামোরই অন্তর্গত। কাজেই এই ব্যবস্থা যে শুধু এই হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন নয়। এটা ভাবাই এক অবাস্তব ব্যাপার। সরকারি নীতির আওতায় এ ব্যবস্থা অল্পদিনের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিয়ে অন্য সব সরকারি হাসপাতালেই চালু হবে। গ্রামাঞ্চলে সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোও এই নববিধানের আওতার বাইরে থাকবে না। এভাবে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে গরিব ও মধ্যবিত্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা লাভের সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হবে। এর পরিণতিতে দেশের অধিকাংশ লোকেরই বিনা চিকিৎসায় রোগভোগ ও মৃত্যুবরণ ছাড়া অন্য উপায় থাকবে না।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সরকারি আমলারা, এমনকি জজ সাহেবরা সরকারি অর্থে দেশে ও বিদেশে নিজেদের চিকিৎসা করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। এই ব্যয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে করা হচ্ছে। কিন্তু যারা উপরোক্ত ক্ষমতাবান লোকদের চিকিৎসার জন্য এই বড় আকারে ব্যয়ভার বহন করছেন তাদের নিজেদের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা তো দূরের কথা মোটামুটি একটা ব্যবস্থাও নেই! সামান্য যে ব্যবস্থা আগে ছিল সেটাও বন্ধ করে, সব রকম সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহার করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি যে দেশে ও যে শাসন ব্যবস্থায় বিরাজ করে তাকে সভ্য ও গণতান্ত্রিক বলা থেকে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে?
১০.১০.২০১১
 

No comments

Powered by Blogger.