ফিরে দেখা ও সামনে চলা-স্বাধীনতার চার দশক by রেহমান সোবহান

শুক্রবার জাতীয় জাদুঘরে একাত্তরের ভাবকল্প ও চার দশকের যাত্রা শীর্ষক স্মারক অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বা সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মূল বক্তব্যের সংক্ষেপিত ভাষান্তর বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক গোটা বছরজুড়েই আমরা পালন করেছি। বিগত চার দশকে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে, যে জন্য আমরা গর্ববোধ করতে পারি। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্বে প্রতিযোগিতায় সক্ষম। মানব উন্নয়ন ও নারী-পুরুষ সমতায় আমরা


ভারতের তুলনায় এগিয়ে যেতে পেরেছি। আড়াই কোটি নারী পেয়েছেন ক্ষুদ্রঋণের সুফল। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের কঠোর শ্রমে-ঘামে আয় করা বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠানোর কারণে কমেছে সাহায্যনির্ভরতা। আমরা চারটি অপেক্ষাকৃত অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পেরেছি, যেখানে ব্যালটের মাধ্যমে সদ্যবিদায়ী সরকারের পরিবর্তে ক্ষমতায় এসেছে বিরোধী দল। এক সময়ে যে দেশকে 'বাস্কেট কেস' হিসেবে বাতিলের খাতায় নাম তুলে দেওয়া হয়েছিল, সে দেশের জন্য এসব অর্জন মোটেই তুচ্ছ নয়।
বাংলাদেশের জন্ম ঐতিহাসিক কোনো দুর্ঘটনার কারণে নয়। সাম্রাজ্যিক বোঝা বহনে অক্ষম হয়ে পড়া ঔপনিবেশিক শাসকদের বিদায় বেলার কোনো উপহারও নয় এ স্বাধীনতা। দীর্ঘ সংগ্রামের ফল এ স্বাধীনতা, যার শেষ অধ্যায় ছিল রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের শাসকরা যে উন্নত জীবন থেকে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করেছিল, সেটা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে তাদের মধ্যে প্রেরণা সৃষ্টি সম্ভব হয়। এ প্রেরণাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে, যাকে আমরা বলে থাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আর তা ভালোভাবেই ধারণ করে আছে আমাদের সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় চার নীতিমালা_ গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।
গণতন্ত্র : আমাদের পৃথক জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ছিল পাকিস্তানি শাসক শ্রেণীর দ্বারা বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্রমাগত অস্বীকারের ফল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ২৩ বছর পর সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা গণহত্যা চাপিয়ে দিয়ে এই গণরায় বানচালের পথে চলে। তাদের এই ঘৃণ্য অপরাধ থেকেই জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা লাভ করে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পরও সামরিক শাসন ও বেসামরিক স্বৈরশাসন মোকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু কে ভেবেছিল যে ১৯৯০ সালে গণতন্ত্রের দ্বিতীয় জন্মের ১৭ বছর পরও সংঘাতের রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পেঁৗছে যাবে, যেখানে সামরিক বাহিনী জরুরি আইন জারির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সুযোগ পেয়ে যাবে। তবে গণতন্ত্রের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় যে, বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না যা থেকে বলা যায় যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে কাজ না করার ঘটনা থেকে আমরা সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছি। একের পর এক শাসনামলে বিরোধীদের প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর একটি কারণ বিরোধীদের জাতীয় সংসদ বর্জন করে চলার অপরিপকস্ফ কৌশল। এর ফলে জাতীয় সংসদ কার্যত অকার্যকর থেকে যাচ্ছে। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়_ অনেক রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহারের প্রবণতা। যদিও বর্তমান শাসক মহাজোট কিছু প্রার্থীর জন্য পরিমিত উপায়ে সংসদে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু সার্বিকভাবে বাংলাদেশে রাজনীতি এখনও ধনীদের খেলা হিসেবেই রয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিকৃত হতে থাকায় শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই আপস করে চলতে হচ্ছে। প্রশাসনের জন্য নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব লক্ষণীয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও তা থেকে মুক্ত নয়। এমনকি আইনের শাসনের শেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত বিচার বিভাগও হুমকির মুখে। বিগত নির্বাচিত সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগদানের বিষয়টিকেও রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদ : আমাদের জাতিসত্তার অন্যতম স্তম্ভ জাতীয়তাবাদ। আমাদের জাতীয় স্বকীয়তার বিষয়ে জাতির স্থপতিরা সচেতন ছিলেন। দেশের প্রতিষ্ঠাতারা মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন জোগানো বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গেও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছেন। তাদের উপলব্ধিতে এটাও ছিল যে পাকিস্তানি শাসকরা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে বহুলাংশে বিসর্জন দিয়েছে। তাদের কাছে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা গ্রহণের কারণেই এমনটি ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশ আমলেও এমনটি ঘটতে দেখছি। আশির দশকে আমাদের বৈদেশিক সহায়তা ছিল মোট জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি। তখন বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান এবং দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সহায়তাদানকারী কোনো কোনো দেশ এ নির্ভরতাকে বাজারমুখী, বেসরকারি খাতভিত্তিক উন্নয়ন নীতি ও কৌশল প্রণয়নের জন্য কাজে লাগাতে সচেষ্ট ছিল। তাদের চাপে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দাবির চেয়েও দ্রতগতিতে আমাদের আমদানি নীতি উদার করতে বাধ্য করা হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝরি শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা জিডিপির দুই শতাংশের মতো। কিন্তু এখনও দাতারা আমাদের নীতি প্রণয়নে প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট রয়েছে, বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে, যেখানে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। পদ্মা সেতুর জন্য তাদের ৩২০ কোটি ডলারের অর্থ জোগানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা এ প্রকল্পের সার্বিক কাজে তদারকি করার সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতির বড় অংশের জোগান আসে প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থ থেকে, যা বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে পাওয়া অর্থের ছয় গুণ। আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্ট ব্যবস্থাকে ভালো রাখার জন্য তাদেরই প্রশংসা প্রাপ্য।
গত দশকে বাংলাদেশ সাহায্যনির্ভর থেকে বাণিজ্যনির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি ছিল ৫০ কোটি ডলার। এখন তা ৫০ গুণ বেড়ে হয়েছে ২৫০০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের ওপর আমাদের পোশাকের বাজারের বিপুল নির্ভরতা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এবং সর্বশেষে ভারতের বাজারে এ পণ্য রফতানির সুযোগ মিলেছে। চীন এ পণ্যের রফতানি বাজার থেকে ক্রমে সরে যাওয়ায় বাংলাদেশে এ খাতের বিকাশের অপরিমেয় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে কেবল তৈরি পোশাক রফতানির ওপর নির্ভরতায় বিপদ রয়েছে এবং এ উপলব্ধি থেকে আমাদের রফতানি বহুমুখী করার তাগিদ বাড়ছে। চামড়া থেকে জাহাজ_ নানা ধরনের পণ্য এ তালিকায় থাকতে হবে।
আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত এখন বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তাদের আমদানির পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি ডলার। আগামী দুই দশকে তারা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরেই তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এই দেশটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী চীন, যে দেশটি এখন আমাদের প্রধান আমদানি-উৎস। অর্থনৈতিক ক্ষমতায় তারা বিশ্বে এক নম্বর হতে চলেছে। দুই বড় অর্থনীতির দেশ প্রতিবেশী_ এটাও বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নীতিগত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতি মনোযোগী হতে হবে এবং এটাই হবে সঠিক জাতীয়তাবাদী অবস্থান। এখন বিদেশি সাহায্যের ওপর যেখানে জিডিপির দুই শতাংশেরও কম নির্ভরতা, তখন নীতিগত স্বায়ত্তশাসন ফিরে পাওয়া কঠিন হবে না। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে কেবল দাতারাই সরকারের নীতি প্রভাবিত করছে না, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ করপোরেট মহল এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীও বিশেষ বিশেষ নীতির ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব খাটাতে শুরু করেছে। আমরা বিশেষভাবে তা দেখছি শেয়ারবাজার এবং খেলাপি ঋণের মতো ইস্যুতে।
ধর্মনিরপেক্ষতা : সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম বিষয়টি যুক্ত হয়েছিল ধর্মকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহারের তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে। পাকিস্তান আমলে লোভী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ রাজনৈতিক নেতারা তাদের অগণতান্ত্রিক শাসনকে আড়াল করার জন্য ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে। ধর্মের অপব্যবহার চূড়ান্ত মাত্রায় পেঁৗছায় ১৯৭১ সালের গণহত্যার সময়। বাংলাদেশের স্থপতিরা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ধর্মের অপব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। তবে স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সরকারের আমলে আমরা শুনেছি যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হচ্ছে মসজিদে তালা পড়া এবং ধর্মীয় শিক্ষা বন্ধ করা। এমনকি গত দশকে নির্বাচনী প্রচারের সময় বলা হয়েছে, আজানের পরিবর্তে সর্বত্র কাঁসর ঘণ্টা ও উলুধ্বনি শোনা যাবে। ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ের শাসকরা ধর্মনিরপেক্ষতার অপব্যাখ্যা করতে থাকেন। সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে অন্যান্য ধর্মের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মের অপব্যবহার ১৯৭১ সালের মতো গণহত্যার দিকে দেশকে নিয়ে যায়নি বটে, কিন্তু আমরা ইতিমধ্যেই এমন সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছি, যা পরিচালিত হচ্ছে ধর্মের নামে এবং এটা গণতন্ত্রের প্রতি চরম হুমকি সৃষ্টি হয়ে আছে। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে উচ্চাভিলাষী রাজনীতিক ও জেনারেলরা ক্ষমতা দখল ও অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় রাখার জন্য ধর্মের অপব্যবহার করতে থাকলে আজ হোক কাল হোক আদর্শগতভাবে উদ্বুদ্ধ মৌলবাদীরা একই স্লোগানকে ব্যালট বাক্সের পরিবর্তে সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের বিশ্বাসকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশাধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটা ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এখনও বিশেষ ধর্মকে অগ্রাধিকার প্রদানের বিষয়টি রয়ে গেছে। সংবিধান সংশোধনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার সহযোগী কিছু রাজনৈতিক নেতার বিচারের উদ্যোগ।
সমাজতন্ত্র : সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্য থেকেই সংবিধানে সমাজতন্ত্র যুক্ত করা হয়। তিতুমীর ও নুরলদীনের আন্দোলন থেকে ষাটের দশকের ছয় দফা ও ১১ দফার আন্দোলনেও সামাজিক ন্যায়বিচারের ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও বঙ্গবন্ধু এ বিষয়টি সামনে আনেন। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কৃষক সমাজ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই কৃষক সমাজই মুক্তি সংগ্রামে অগ্রভাগে ছিল। তাদের সঙ্গে আরও ছিল শ্রমিক ও ছাত্র সমাজ। এই অংশই গণহত্যার প্রধান শিকার হয়েছে, তাদের স্ত্রী ও কন্যারা ধর্ষিত হয়েছে। সংবিধানের মৌল নীতিমালায় সমাজতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করা তাদের অবদানেরই স্বীকৃতি। আশা করা হয়েছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠদের আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হবে। আমরা এমন সমাজ চাইনি যেখানে সুবিধাভোগী শ্রেণী সৃষ্টি হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত চার দশকে আমরা এমন উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করেছি যা চরম অসম, ব্যাপকভাবে অন্যায্য সমাজ গড়ে তুলেছে। পাকিস্তান আমলের বৈশিষ্ট্য ছিল দুই অর্থনীতি, এখন বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য দুই সমাজ।
আমরা দেখছি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ ও অপশাসন ব্যক্তিগত অপরাধের কারণ হয়ে উঠছে। মতিঝিলের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি এবং এসব খেলাপির পৃষ্ঠপোষক রাজনীতিকরা মাস্তানদের লালন-পালন করে চলেছে, যাদের কাছ থেকে তারা নির্বাচনে সুবিধা গ্রহণ করে। আবার এই মাস্তানরাই রাজনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্ককে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকে। এসব অপরাধীর অনেকেই রাজনীতিতে প্রবেশ করে এবং কেউ কেউ জনপ্রতিনিধিও হয়ে যায়।
এগিয়ে চলা : আমরা কি স্বাধীনতার স্বপ্ন অর্থবহ করে তুলব? আমরা কি এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলব যা ক্ষমতাবানদের লোভ-লালসা নয় বরং জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য কাজ করবে? আমরা কি আমাদের নীতিপ্রণয়ন প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ফিরে পাব? আমরা কি একটি সহিষ্ণু, বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে সব ধরনের বিশ্বাসীদের প্রতি সম্মান জানানো হবে এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা সমান অধিকার ভোগ করবে?
আমি অনেক দিন বেঁচে থাকতে চাই এটা দেখার জন্য, যখন বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠরা আমাদের করপোরেট খাতের উল্লেখযোগ্য অংশের হিস্যা পাবে, যেসব মহিলার শ্রমের কারণে আমাদের রফতানি খাতের ৮০ শতাংশ অর্জিত হচ্ছে তারা সম্মিলিতভাবে তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের অন্তত এক-তৃতীয়াংশের হিস্যা পাবে। আমি দেখতে চাই ঢাকা ও চট্টগ্রামের বস্তিবাসীর জন্য বহুতল আবাসিক ভবন গড়ে তোলা হয়েছে এবং ভূমিহীনদের জন্য মিলেছে ঘর। আমি দেখতে চাই তামাক, পাট ও আখচাষিরা কারখানার মালিকানায় ভাগ পাচ্ছে এবং চা বাগানের শ্রমিকরা পাচ্ছে বাগানের মালিকানার অংশ। আমি দেখতে চাই, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা ও হিমাগারে প্রতিষ্ঠিত হোক ফল ও সবজি উৎপাদকদের মালিকানা। আমি সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চাই যখন দেখব বড় ধরনের শ্রম-সেবা রফতানি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যেখানে রয়েছে প্রবাসে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর মালিকানা। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই যেখানে সুবিধাভোগী মধ্যস্বত্বভোগীর পরিবর্তে কাজ, দক্ষতা ও উৎপাদনের জন্য পুরস্কার মিলবে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে কেবল কাজের অধিকার নিশ্চিত হবে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি থাকবে নীতিগত এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে। আমাদের কৃষক ও কারিগরদের, গ্রামীণ শিল্পে যুক্তদের, তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।
এ পথে চলতে হলে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি দরকার। গণতান্ত্রিক সমাজে নির্বাচিতরাই হবেন এ চালিকাশক্তি। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাধারণ নির্বাচনের সময় দিনবদলের কথা বলেছেন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক ভাষণে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দরিদ্রদের ক্ষমতায়নের কথা বলেছেন, ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাসের কথা বলেছেন। তিনি ক্ষমতার বাকি দুই বছরে তার কিছু ধারণা বাস্তবায়ন করবেন, এমন আশা কি করতে পারি না?
আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, কেবল রাষ্ট্রই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি নয়। আমাদের রয়েছে নতুন বড় ও ছোট অনেক উদ্যোক্তা, যারা ঋণখেলাপি নয় কিংবা বাজারে কারসাজিও সৃষ্টি করে না বরং তারা প্রকৃত উদ্যোক্তা। তারা এই পরিবর্তনকে সমর্থন করবে। আমাদের প্রাণচঞ্চল স্বেচ্ছাসেবী, কঠোর পরিশ্রমী কৃষক সমাজ, প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য গ্রামীণ নারী সমাজ এবং উদ্যমী, কঠোর পরিশ্রমী, ক্রমবর্ধমান নারী প্রাধান্যের শ্রমশক্তি_ তারাও এ পরিবর্তনের রূপকার। সর্বোপরি রয়েছে তরুণ প্রজন্ম_ যারা দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও দূরদৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে চলা নেতৃত্বের কারণে হতোদ্যম ও ক্লান্ত, তাদেরও পরিবর্তন এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংগঠিত করতে হবে।
উপসংহারে বলতে চাই, দুই সমাজের উদ্ভব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে প্রদত্ত সামাজিক চুক্তির লঙ্ঘন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যখন সাধারণ জনগণ সমবেত হয়েছিল তখন তারা এটা চায়নি যে তাদের শাসকরা একটি অন্যায্য সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে নেতৃত্ব দেবেন। শাসন ব্যবস্থার গলদও তারা আশা করেনি। তাদের আশা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সম্মান জানাতে ব্যর্থতা রয়েছে। অধিকতর ন্যায্য ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের রক্তঋণ রয়েছে এবং তা শোধ করতেই হবে।

No comments

Powered by Blogger.