প্রতিবেশী-গ্যাংটকে গণ্ডোগল নয়, সম্ভাবনার সড়ক by শেখ রোকন

বাংলাদেশে মাঝে মধ্যেই যে 'লুক ইস্ট' পররাষ্ট্রনীতির কথা বলা হয়, তার তাৎপর্য হচ্ছে চীনের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ভৌগোলিকভাবে না যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে দুর্গম মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে কীভাবে তা সম্ভব, এ নিয়ে আলোচনারও শেষ নেই। অথচ ঘরের কাছের সিকিমেই রয়েছে সম্ভাবনার সেই সড়কপথ
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বহুল আলোচিত বাংলাদেশ সফরের ডামাডোলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যখন
ঢাকা ও নয়াদিলি্লর আশা কিংবা আশঙ্কা চরমে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দিলি্লর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ও সিকিম ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে একটি 'স্পেশাল শর্ট কোর্সের' আয়োজনও চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ১০ জন করে তরুণ পেশাজীবী_ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, মানবাধিকার কর্মী_ এই কোর্সের অংশগ্রহণকারী। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচক দুই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপকরা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিকতা বিবেচনায় কেবল নয়, মনমোহনের সফরকে সামনে রেখেও এমন একটি আয়োজন নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু স্বীকার করে বলি, তার চেয়েও আকর্ষণীয় ছিল কোর্সটির প্রথম ভেন্যু_ সিকিম। পঞ্চগড় সীমান্ত পার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত মাত্র কয়েক কিলোমিটার সমতলভূমি। তারপর সিকিমের পাহাড়ি অঞ্চল। আলোচিত কোর্সের সহআয়োজক সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পাঁচদিন কাটাতে হবে এই সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে। অংশগ্রহণকারীদের একজন হিসেবে সুযোগ পাওয়ার পরপরই যে শব্দযুগল মনের মধ্যে নেচে উঠেছিল, তা হচ্ছে_ 'গ্যাংটকে গণ্ডগোল'।
সন্দেহ নেই, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের কল্যাণেই ভারতের সিকিম রাজ্যের রাজধানী শহর গ্যাংটকের সঙ্গে গণ্ডোগল শব্দটি বাঙালি পাঠকের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে। বাস্তবে গ্যাংটক শান্ত, ছোট্ট পার্বত্য জনপদ। পূর্ব হিমালয় পর্বতশ্রেণীর শিবালিক পর্বতে ১৪৩৭ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং মাত্র ২৫ বর্গকিলোমিটারের এ শহরের জনসংখ্যাও সামান্য। সিকিম সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সদর দফতরে ভরা হলেও পাশের রাজ্যগুলোর প্রধান শহর কলকাতা, পাটনা বা গৌহাটির মতো ঘিঞ্জি হয়ে পড়েনি। ঘন সবুজ গাছপালা আর নীল আকাশে মোড়ানো শহরটিতে পা দিলেই মন ভালো হয়ে যায়। প্রায় সারা বছর তুলো তুলো মেঘ ঘুরে বেড়ায়; ফাঁক পেলেই দরজা বা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে গায়ে এসে ঝাপটা মারে যখন-তখন। সিকিমের 'লাইফলাইন' তিস্তা গ্যাংটক শহর থেকে দূরে বয়ে চলছে; কিন্তু চপলা পাহাড়ি নদীটির কুলকুল ধ্বনি রাজধানীর সর্বত্র। স্থানভেদে নাগরিক ও যান্ত্রিক আওয়াজের তারতম্য হয়; কিন্তু কুলকুল ধ্বনির ব্যত্যয় নেই, বিরামও নেই। গ্যাংটকজুড়ে রয়েছে আক্ষরিক অর্থেই 'শত শত' ছোট-বড় ঝরনা। দিন-রাত কুলকুল শব্দে বয়ে চলে। বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে সড়কপথ থেকে কখনও ডানে, কখনও বামে তিস্তাকে পাশে নিয়ে এগিয়ে চলার পর রাতের আঁধারে গ্যাংটকে পেঁৗছলে কারও মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে নদীটি পিছু ছাড়েনি। কয়েকশ' গজ পাশেই রয়েছে। সব মিলিয়ে গ্যাংটক এক নয়নাভিরাম, নিরিবিলি শহরের নাম।
কৌশলগত দিক থেকে হিমালয় অঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ 'সিকিম' যদিও সতের শতক থেকে বারংবার তিব্বতি, নেপালি ও ব্রিটিশ আগ্রাসনের শিকার হয়েছে; যদিও ১৯৭৫ সালে ২২তম প্রদেশ হিসেবে ভারতের অঙ্গীভূত হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে; ভারত ও চীনের বাণিজ্য কিংবা সামরিক কৌশলের দিক থেকে যদিও বেশ স্পর্শকাতর; যদিও সিকিম হচ্ছে হিমালয়গত প্রাণবৈচিত্র্যের 'হটস্পট'; এর রাজধানী গ্যাংটকে আর যাই হোক গণ্ডোগল চোখে পড়ে না।
গণ্ডগোল যতটুকু তা বোধহয় গ্যাংটক থেকে অন্তত ২০ কিলোমিটার দূরে, রাংপোতে। বিশেষ করে সত্যজিতের গোয়েন্দা কাহিনীর পাঠকের বড় অংশ যারা, সেই বাংলাদেশিদের জন্য। রাংপো হচ্ছে সিকিমের প্রবেশদ্বার, কাস্টমস চেকপোস্ট। সিকিম কড়াকড়িভাবে 'সংরক্ষিত' রাজ্য। ভারতীয় নাগরিকদেরও প্রবেশ করতে হলে চেকিংয়ের সম্মুখীন হতে হয়। দেখাতে হয় জাতীয় পরিচয়পত্র। জীববৈচিত্র্য 'হটস্পট' রক্ষায় বাইরে থেকে পশুপাখি ও কাঁচামাল ঢোকানোর ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি। চেকপোস্টে বড় করে নিষিদ্ধ তালিকা টানানো। ঝরনা ও নদী বিধৌত পর্বত কন্যা সিকিম যদিও পর্যটনের জন্য স্বর্গসমান; বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশে ভয়ানক কড়াকড়ি। প্রবেশ আর প্রস্থানের সময় লিখিত দিতে হবে। আর পাঁচটি দেশের নাগরিকদের প্রবেশ বলতে গেলে পুরোপুরি নিষিদ্ধ_ চীন, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নাইজেরিয়া ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনারের জোর সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও ভিসা আবেদনের সময়ই বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলটিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল সিকিমে প্রবেশ করতে গেলে ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমতি লাগবে। পাসপোর্টের এক পৃষ্ঠা খরচ করে সে অনুমতির ছাপ থাকা সত্ত্বেও কলকাতা বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রশ্ন ও নানা নথি তলব ও ফোনাফোনির যেন শেষ ছিল না। রাংপোতে গিয়েও আরেক দফা আটকে থাকা।
ভারতের জন্য চীন ও পাকিস্তানের স্পর্শকাতরতা সহজবোধ্য। শ্রীলংকার অধুনা বিধ্বস্ত তামিল টাইগারদের ব্যাপারেও সতর্কতার কারণ থাকতে পারে। ক্ষুদ্র অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় নাইজেরিয়ার 'অবদান' অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু 'বন্ধুরাষ্ট্র' বাংলাদেশ কেন নিষিদ্ধের তালিকায়? ক্লিয়ারেন্সের জন্য রাংপো চেকপোস্টে অপেক্ষা করতে করতে অর্থহীন জেনেও দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে এই প্রশ্ন করার পর তিনি যথারীতি 'ওপরের নির্দেশ আছে' বলেছিলেন। একই প্রশ্ন করা হয়েছিল কোর্স চলাকালেও। সিকিমের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা সেখানে উপস্থিত কয়েকজন বলেছেন, তার বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলছেন। যোগাযোগের সুগমতা ও জ্বালানি-বিদ্যুৎ আদান-প্রদানের প্রশ্নে সিকিমের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে তারা দূরত্ব চান না। তারা চান ঢাকা-গ্যাংটক যোগাযোগ বাড়ূক। দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের দিলি্ল ঘুরে নয়, কমবেশি ৫০ কিলোমিটার পার হয়ে সরাসরি।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোর্সে অংশ নিতে কিংবা লেকচার দিতে আসা তরুণ পেশাজীবী ও অধ্যাপকরাও বলেছেন, হিমালয়ের কন্যা সাত বোন রাজ্যের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সন্তান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হলে উভয় পক্ষের কতটা লাভ। কলকাতার সঙ্গে থাকতে পারলে ঢাকা-গৌহাটি সরাসরি ফ্লাইট নয় কেন? কেন সাত বোন রাজ্যের কেন্দ্রীয় শহরটির সঙ্গে মাল ও যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ থাকবে না? ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস আরও সম্প্রসারিত হয়ে গৌহাটি কিংবা শিলং যেতেই পারে। ঢাকা থেকে গৌহাটি অবধি যে নৌরুট '৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের আগ পর্যন্তও চালু ছিল, তা পুনর্বহালে আপত্তি কোথায়? বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট চালুর প্রশ্নে এসব কথা বহু আলোচিত। কিন্তু সিকিমের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রশ্নটি অনালোচিতই রয়ে গেছে। অথচ গ্যাংটকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল শুনেছিল আরও বড় সম্ভাবনার কথাটিই।
সম্ভাবনার কথাটি শুনিয়েছেন জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক এবং সিকিমের সন্তান ড. মাহেন্দ্র পি. লামা। ভারতীয় নীতিনির্ধারণে তার সম্পৃক্ততার কথা অনেকেরই অজানা নয়। বর্তমানে তিনি সার্কের আওতায় গঠিত নাগরিকসভা 'সাউথ এশিয়া ফোরাম'-এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়েছেন। স্বাগত বক্তব্যে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণাঢ্য পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে সিকিমের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার ফাঁকে তিনি বললেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও পর্যটন যোগাযোগে বাংলাদেশ সিকিমকে কাজে লাগাতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে চীনের একমাত্র স্থলবন্দর নাথুলা পাস সিকিমে অবস্থিত এবং ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তা বন্ধ ছিল। তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান যাতে ওই স্থলবন্দরটি ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য তার নেতৃত্বাধীন 'দ্য নাথুলা ট্রেড স্টাডি গ্রুপ' সুপারিশও করেছে।
বাংলাদেশে মাঝে মধ্যেই যে 'লুক ইস্ট' পররাষ্ট্রনীতির কথা বলা হয়, তার তাৎপর্য হচ্ছে চীনের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ভৌগোলিকভাবে না যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে দুর্গম মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে কীভাবে তা সম্ভব, এ নিয়ে আলোচনারও শেষ নেই। অথচ ঘরের কাছের সিকিমেই রয়েছে সম্ভাবনার সেই সড়কপথ। গ্যাংটক নিয়ে গত কয়েক দশকে আমাদের মধ্যে গত কয়েক দশকে জমা গণ্ডগোলের মেঘ সরিয়ে কত তাড়াতাড়ি আমরা তা ব্যবহার করতে পারি সেটাই এখন দেখার বিষয়!

শেখ রোকন : সাংবাদিক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.