ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে by হকিকত জাহান হকি

বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সিনেমা হল মালিকদের মধ্যে বিরোধ, মতদ্বৈধতা চরমে পেঁৗছেছে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, বিদেশি চলচ্চিত্র চললে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ বলছেন, এ ক্ষেত্রে শিল্পে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, বিদেশি চলচ্চিত্র নয়; দেশি নির্মাতাদের মেধা, শক্তি ও সাহসকে কাজে লাগিয়েই পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে না দেওয়ার জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে


বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির নেতারা। এদিকে আমদানি করা চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শনের জন্য যথাসময়ে অনুমতি দিতে একই বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতারা।
সূত্র জানায়, রাজধানীর আটটি হলে ভারতীয় বাংলা ছবি 'জোর' প্রদর্শন করা হচ্ছে। 'জোরে'র পর চলবে বাংলা ছবি 'বদলা' ও 'সংগ্রাম'। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রদর্শন করা হবে ৯টি হিন্দি চলচ্চিত্র। এ ৯টি চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে_ সোলে, দিলওয়ালা দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, তারে জামিন পার, থ্রি ইডিয়ট, ডন-১, কাভি খুশি কাভি গাম, দিল তো
পাগল হ্যায় এবং ওয়ান্টেড। ২৩ ডিসেম্বর থেকে 'জোর' চলছে রাজধানীর মধুমিতা, অভিসার, পূর্ণিমা, আগমন, আজাদ, গীত, আশা ও গ্যারিসন হলে।
জানা গেছে, সিনেমা হল মালিকদের পক্ষ থেকে ওই ১২টি চলচ্চিত্র আমদানি করা হয়েছে। আমদানি নীতি অনুযায়ী, গত বছর ১২টি চলচ্চিত্র আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়। পরে এ নিয়ে হৈচৈ হলে আমদানি নীতিতে তা নিষিদ্ধ করা হয়। আমদানি নীতিতে অনুমতি বহাল থাকার সময় এলসি খোলার কারণে অবশেষে ১২টি চলচ্চিত্র আমদানি করার সুযোগ পান তারা। পরে উচ্চ আদালতের এক আদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বাংলা তিনটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছে। এরপর বাকি ৯টি হিন্দি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে বলে দাবি করেছেন সিনেমা হল মালিক সমিতির সভাপতি কেএমআর মঞ্জুর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সাল পর্যন্ত বছরে ১০৪টি চলচ্চিত্র তৈরি করা হতো। এখন এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭-এ। সংখ্যা কমে যাওয়া ও ভালো চলচ্চিত্র তৈরি না হওয়ার কারণে রাজধানীসহ সারাদেশের হলগুলোতে নাজুক অবস্থা চলছে। কোনো কোনো চলচ্চিত্র দু'এক দিন চলার পর আর চলছে না। ছবির মান কমে যাওয়ায় হলে দর্শকের উপস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। 'শো' চালিয়ে খরচ ওঠাতে পারছেন না হল মালিকরা। ক্রমেই লোকসান গুনতে গুনতে অনেকে হল বন্ধ করে দিয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, একসময়ের ১ হাজার ৪৩৫টি সিনেমা হলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ৬০৮টি। বাকি ৮২৭টি হল বন্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীতে এরই মধ্যে ৯টি সিনেমা হল ভেঙে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো হলো_ গুলিস্তান, নাজ, মুন, এলিফ্যান্ট রোডের মলি্লকা, সদরঘাটের রূপমহল, মৌলভীবাজারের তাজমহল, আরমানিটোলার শাবিস্তান, শ্যামলীর শ্যামলী ও ইসলামপুরের লায়ন সিনেমা হল।
সিনেমা হল মালিকরা বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান না থাকা, এফডিসিকে আধুনিকায়ন না করায় গোটা চলচ্চিত্র শিল্পে স্থবিরতা চলছে। একই সঙ্গে আকাশ প্রযুক্তি মুক্ত হওয়া, কেবলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া, ভিডিও পাইরেসি অবাধ হওয়ায় এ শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সভাপতি মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোতে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উদ্যোগ দেশের সংস্কৃতির জন্য আত্মঘাতী। এভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষার লক্ষ্যে দেশে উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছিলেন। জাতির জনকের এ নির্দেশ উপেক্ষা করে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে ঔদ্ধত্য দেখানো হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ পারভেজ বলেন, ভারত আমাদের মিত্র দেশ। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনে দেশটির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাদের চলচ্চিত্র শুধু বাংলাদেশে আসবে আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তাদের দেশে যাবে না_ এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, যে দেশটিতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল দেখার সুযোগ নেই সেই দেশ বাংলাদেশ থেকে চলচ্চিত্র নেবে_ এ এক অবিশ্বাস্য কথা। বাংলাদেশে ভালো চলচ্চিত্র তৈরির জন্য চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনকে (এফডিসি) আধুনিকায়ন করা, সেন্সর বোর্ডের কড়াকড়ি শিথিল করা, ভিডিও পাইরেসি বন্ধ করা ও সার্বিকভাবে এ সেক্টরে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।
চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি গাজী মাযহারুল আনোয়ার বলেন, 'জীবন থেকে নেয়া'র মতো শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখনও আছেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের নির্মাতারা ভালো ছবি তৈরি করতে পারেন। তার প্রমাণ বিদেশে প্রতিযোগিতা করে আমরা পুরস্কার অর্জন করতে পেরেছি।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি কেএমআর মঞ্জুর সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে প্রায় ১০০ বিদেশি চ্যানেলে হিন্দি, ইংরেজিসহ নানা ভাষায় নানা ধরনের চলচ্চিত্র দেখা হচ্ছে। এতে দেশের সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে না। সিনেমা হলে স্বল্প পরিমাণে হিন্দি ছবি চালানো হলে দেশের সংস্কৃতি কীভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে_ বলে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ম. হামিদ সমকালকে বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে অধিকাংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। এ শিল্পে দুর্দিন চলছে। হলগুলোতে দর্শক নেই বললেই চলে। ভারতীয় চলচ্চিত্র চালু হওয়ায় হলগুলোতে দর্শকসংখ্যা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে হল চাঙ্গা করার প্রয়োজন নেই। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলচ্চিত্র তৈরি করার মেধা, শক্তি, সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। একসময় অশ্লীল ছবি, কাটপিস প্রদর্শনসহ নানা কুরুচির প্রভাবে দর্শকদের বড় একটি অংশ সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে চলচ্চিত্র এনে প্রদর্শন করে পরিবর্তন সম্ভব নয়। নিজেদের মেধা ও শক্তির ওপর নির্ভর করেই এগিয়ে যেতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.