চলছে ফুটপাত বিক্রি একই সঙ্গে চাঁদাবাজি by ফারজানা লাবনী

প্রতিবছরের মতো এবারও রমজান মাসে চলছে ফুটপাত বেচাকেনা, সেই সঙ্গে চাঁদাবাজিও। তবে এবার তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অথচ সরকারি ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু নজরদারিতে পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও এ খাত থেকে সরকারি তহবিলে জমা হতে পারত বড় অঙ্কের অর্থ। তবে দীর্ঘদিনের পুরনো এ সমস্যা নিরসনে নেই যথাযথ সরকারি উদ্যোগ।


জাতীয় হকার ফেডারেশনের হিসাবে রাজধানীর ফুটপাতে সারা বছর স্থায়ী হকার প্রায় তিন লাখ এবং ঈদ উপলক্ষে অস্থায়ী হকার আসেন আরো প্রায় তিন লাখ। ঈদ মৌসুমে এই অস্থায়ী হকারদের কাছে ফুটপাত বিক্রি বাবদ চাঁদাবাজদের আয় হয় ২৫০ কোটি টাকার ওপরে। রমজান মাসে দৈনিক চাঁদা আদায় হয় গড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। ২০ রমজানের পর থেকে ঈদ পর্যন্ত এই অঙ্ক ১৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
জাতীয় হকার ফেডারেশনের সভাপতি আরিফ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'শবেবরাত থেকে শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি এবং জায়গা বেচাকেনা। স্থায়ী হকারদের উঠিয়ে দিয়ে অস্থায়ী হকারদের কাছে জায়গা বিক্রি করা হচ্ছে। এবারে দুই বাই দুই হাত বা তিন বাই তিন হাত জায়গা বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। এলাকাবিশেষে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে এ পরিমাণ জায়গার। চাঁদাবাজিও এবার লাগামছাড়া। রক্ষকই এখানে ভক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে। পুলিশ, লাইনম্যান আর রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা মাস্তানরাই এসব কাজে জড়িত। দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার ওপরে চাঁদাবাজি করছে তারা। আবার সাপ্তাহিক ভিত্তিতেও চাঁদা নেওয়া হয়।'
সংগঠনের সভাপতি বলেন, দিন যত যাচ্ছে হকারদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের কেনাকাটাও বাড়ছে। তাই পালা-পার্বণে সারা দেশ থেকে রাজধানীতে আগের চেয়ে বেশি হকার আসছেন। ঈদের আগে একজন হকারের নূ্যনতম বেচাকেনা হয় দিনে দুই হাজার টাকার ওপরে। সেই হিসাবে হকারদের প্রতিদিনের বাণিজ্য শুধু রাজধানীতেই ১২০ কোটি টাকার বেশি। এত বড় একটি ব্যবসায়িক খাত, অথচ এ বিষয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই। আর এ সুযোগে চাঁদাবাজদের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়েছে। দিন শেষে হকারদের বেচাকেনা শেষ হলেই শুরু হয় চাঁদা আদায়। চাহিদামতো টাকা না দিলে হকারদের উঠিয়ে দেওয়া বা মারধর করা হয়। একদিকে হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি চলছে, অন্যদিকে হকার উচ্ছেদ অভিযানের নামে পুলিশই সময় সময় তাঁদের উঠিয়ে দিয়ে ফুটপাতমুক্ত করছে। হকারদের ওপর এই নির্যাতন চলছে বছরের পর বছর। অথচ সরকার থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আজ পর্যন্ত, জানান তিনি। রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, ফার্মগেট, মিরপুর, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর ব্যস্ত ফুটপাত বিক্রি এবং তাতে চাঁদাবাজি চলছে একরকম প্রকাশ্যেই।
সরেজমিনে মতিঝিল, নিউ মার্কেট ও শাহবাগ এলাকার হকারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সারা বছর পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার নামে প্রত্যেক হকারকে দৈনিক ১০০-২০০ টাকা দিতে হয়। রমজান শুরুর আগে এর পরিমাণ বেড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা হয়। রমজান মাসের মাঝামাঝি এ হার আরো বেড়ে যায়, জানান জাতীয় হকার ফেডারেশনের উপদেষ্টা আবুল হোসেন।
পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের আইনে আছে, ফুটপাত শুধু পথচারীর চলাচলের জন্য। সেখানে দোকান করা যাবে না। কিছু রাখাও যাবে না। এর পরও ঢাকার ফুটপাতজুড়ে রাস্তার পাশে সামান্য জায়গায় কাপড় বিছিয়ে বা ছোট্ট একটা চৌকির ওপর পোশাক, প্রসাধনী, হাতের চুড়ি, কানের দুল, জুতা, ফল, তরকারিসহ নিত্যব্যবহার্য জিনিস বিক্রি করেন হকাররা। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা নির্ভরশীল তাঁদের ওপর। আবার উচ্চ মধ্যবিত্তরাও এখান থেকে কিনছে। পণ্য উৎপাদকদের একটা বিশাল অংশ টিকে আছে ফুটপাতের ব্যবসার ওপর। ইচ্ছা করলেই হকারদের ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না জানিয়ে উপদেষ্টা আবুল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'অবৈধ' এসব দোকানের ওপর নির্ভর করছে অসংখ্য মানুষের জীবিকা, নগরীর সব শ্রেণীর মানুষের নিত্যদিনের কেনাকাটা আর অগণিত কৃষি ও শিল্প পণ্য উৎপাদনকারীর অস্তিত্ব। নানাজনের কাছে টাকা দিয়ে ব্যবসা করলেও এ দেশের হকারদের ব্যবসায় নেই বৈধতা। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, ব্যাংকক বা প্যারিসের মতো শহরের ফুটপাতেও হকাররা ব্যবসা করছেন। তবে বাংলাদেশের মতো এমন অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নয়। উন্নত দেশগুলোতে সরকার নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ৮-১০ ঘণ্টার জন্য টোকেনের মাধ্যমে হকারদের জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় দোকান খুলতে একজন হকারকে ২০০ বাথ দিতে হয় ব্যাংককে। তাই যখন-তখন একজন হকারকে উৎখাত করতে পারে না পুলিশ। বৈধতা আছে বলেই গত বছর মার্চ মাসে পুলিশের উৎখাতের চেষ্টা রুখে দিয়েছিলেন ব্যাংককের ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা।
ঢাকার ফুটপাতের হকাররা টাকা খরচ করে ব্যবসা করলেও তাঁদের বৈধতা নেই। তেমনি পুরো ফুটপাত দখল করে দোকান বসালেও তাঁদের বলার কেউ নেই। অন্যদিকে হাঁটার জায়গা না পেয়ে ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয় পথচারীরা। ফেডারেশনের উপদেষ্টা বলেন, ঢাকায় প্রত্যেক হকার পুলিশ, লাইনম্যান বা মাস্তানদের কাছে টাকা জমা দিয়ে ব্যবসা করছেন। অথচ এ অর্থ সরকারি তহবিলে জমা দিলে হকাররা নিরাপদে ব্যবসা করতে পারতেন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পথচারীদের এবং পরিবেশের সমস্যা না করেই সরকারি উদ্যোগে হকাররা ব্যবসা করছেন। আইনি কাঠামোয় থেকে ব্যবসা করলে যখন-তখন তাদের উঠিয়ে দেওয়া হতো না। আবার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হকাররা যেখানে-সেখানে ব্যবসা করতেও পারতেন না। আবুল হোসেন হিসাব কষে বলেন, প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে দৈনিক ২০ টাকা হারে নেওয়া হলে রাজধানীর তিন লাখ হকারের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা হবে ৬০ লাখ টাকা। রমজান উপলক্ষে স্থায়ী হকারদের সঙ্গে যোগ হন আরো প্রায় তিন লাখ অস্থায়ী হকার। তাই এ সময় নগর কর্তৃপক্ষের তহবিলে জমা পড়বে দৈনিক এক কোটি ২০ লাখ টাকা। আন্তরিক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের অভাবে এ আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ঢাকা সিটি করপোরেশন।
তিনি আরো বলেন, হকারদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাতে থাকে আইনি ফাঁক। গরিব হকারদের নামে জায়গা নিয়ে তা প্রভাবশালীরা কিনে নেয়। আবার সরকার হকারদের ব্যবসার জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করে সেখানে থাকে না লোকসমাগম। পুনর্বাসনের নামে হকারদের নির্বাসন করা হয়। কিছু দিন হকাররা সেখানে দোকান সাজিয়ে বসেন। বেচাকেনার অভাবে পুঁজি ভেঙে খান। আবারও বেঁচে থাকার প্রয়োজনে পুরনো জায়গায় ফিরে আসেন।

No comments

Powered by Blogger.