আমেরিকার মন্দাক্রান্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে! by এনামুল হক

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ, একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকার অর্থনীতি কেমন সেটা আজ কারও অজানা নয়। চারদিকে এক নিরানন্দ জবুথবু ভাব ছায়া ফেলে আছে। রুগ্ন ব্যক্তির যে অবস্থা হয় অনেকটা সেরকম। সোজা কথায় ভাল নেই আমেরিকার অর্থনীতি। বেকারত্বের হার এখনও ৮ শতাংশের ওপর।


প্রবৃদ্ধির হার এ বছরের প্রথমার্ধে ২ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। তার ওপর আছে ইউরো ভেঙ্গে যাওয়ার হুমকি, চীনের প্রবৃদ্ধিতে মন্থরতা যা মার্কিন অর্থনীতিকে আরও নাজুক অবস্থায় ফেলতে পারে। তার মানে ২০০৮ সালে যে ভয়াবহ মন্দা আমেরিকাকে গ্রাস করেছিল তার ধকল থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারছে না দেশটি।
কিন্তু এই হতাশাব্যঞ্জক চিত্রের মধ্যে এমন কিছু কিছু লক্ষণ আছে যা থেকে মনে হতে পারে যে, আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আমেরিকা। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে। পুরনো দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে চাইছে। নতুন শক্তিকে এমন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আবিষ্কার করতে চাইছে যা স্থবির ইউরোপের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্থরতার উৎপত্তি প্রাক-সঙ্কট কিছু বাড়াবাড়ি ও অমিতচারিতার কারণে। ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ভোক্তাদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ও বাড়ি কেনার ধুমের ওপর অত্যাধিক নির্ভর করেছিল। দুটো ক্ষেত্রে তাদের অর্থ যোগানো হয়েছিল বৈদেশিক সঞ্চয় থেকে। ১৯৮২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ভোক্তারাই ছিল দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। পণ্য সার্ভিস ও বাড়ির পিছনে তাদের ব্যয়ের পরিমাণ এ সময় জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। বাণিজ্য ঘাটতি ১৯৯০-এর দশকের প্রথমদিকে ছিল জিডিপির ১ শতাংশের কম। ২০০৬ সালে সেটাই ৬ শতাংশে পৌঁছে। ২০০০ সালে মার্কিন পরিবারগুলোর ভোগ্যপণ্য ও বাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল আয়ের ১০০ শতাংশ, ২০০৬ সালে তা ১৩৩ শতাংশে পৌঁছে। তবে বেশিরভাগ অর্থই ব্যয়িত হয় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি চড়িয়ে দেয়া দায়ে বাড়ি কেনার পেছনে। ঋণ নিতে উৎসাহিত করা হয় পরিবারগুলোকে। ব্যাংক ঋণের অর্থের যোগান আসে বিদেশীদের বিশেষত পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের গচ্ছিত সঞ্চয় থেকে। গোটা অর্থনীতি একটা ফাঁপা বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। তারপরই নামে ধস। ভোক্তারা যারা বাড়ি কেনার জন্য মর্টগেজের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল তারা পথে বসে। ব্যাংকগুলোতে লালবাতি জ্বলে।
আজ সেই বিপর্যস্ত অর্থনীতির প্রথম যেসব অসঙ্গতি সংশোধন করা হয়েছে তা হলো ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি। সরকারের তরফ থেকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মাসুল হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ করতে বাধ্য করেছে যাতে তারা আগে ঋণ মওকুফের বিরূপ পরিণতি কাটিয়ে উঠতে পারে। আমেরিকার বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর মধ্যে পাঁচটি অর্থনৈতিক সঙ্কটের পর প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের ঋণ মওকুফ করেছে এবং ৩১৮০০ কোটি ডলারের নতুন মূলধন সংগ্রহ করেছে। এতে তাদের ইকুইটির অনুপাত এখন ১০ শতাংশের বেশি।
ভোক্তারা এখন ঋণ নেয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার এবং যা আয় তার মধ্যেই জীবনযাপন করার দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত। এটা এখন একান্তই প্রয়োজন। তবে তার জন্য মাসুল দিতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অতি দুর্বলভাবে হচ্ছে। মন্দা শেষ হবার পর থেকে তিন বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি গড়ে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ বছর তাও হবে না। নামমাত্র প্রবৃদ্ধির তৃতীয় মাসে অর্থাৎ জুনে বেকারত্বের হার ছিল ৮.২ শতাংশ।
আমেরিকার সার্বিক প্রবৃদ্ধির চিত্রটা রেখাপাত করার মতো না হলেও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বেশ চিত্তাকর্ষক। যেমন ভোক্তার ব্যয় ও হাউজিংয়ের অবদান প্রবৃদ্ধির ৬৫ শতাংশ হয়েছে। রফতানির অবদান হয়েছে ৪৫ শতাংশ। সাম্প্রতিককালের যে কোন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এ হলো সবলতম বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য উপাদান যেমন ব্যবসায় বিনিয়োগ, আমদানি ও সরকারী ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয় কিছুটা বেড়েছে নয়ত কমেছে।
আমেরিকার পরিবারগুলো ‘ধার করো আর খরচ করো’ এই অভ্যাস প্রায় বাদই দিয়েছে। আর মন্দার আগ পর্যন্ত এই ধারের সিংহভাগ বাড়ি কেনার পিছনে ব্যয় হতো বলে এক পর্যায়ে ঋণের অঙ্ক আয়ের ১৩৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। লোকে বাড়ি কিনছে না বলে বাড়ির দামও পড়ে গেছে। এমনকি তা উচিত মূল্যের ১৯ শতাংশ কমে এসেছে। ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার হিসাবে আমেরিকার বাড়ির দাম এখন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম।
রফতানি বৃদ্ধির ব্যাপারটা আরও বেশি চিত্তাকর্ষক। ২০১০ এর প্রথমদিকে ওবামা আগামী ৫ বছরে রফতানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। মাত্র কয়েক মাস আগে সেই লক্ষ্যমাত্রার মাঝামাঝি অর্জিত হয়ে গেছে। এই উজ্জ্বল দিক সত্ত্বেও বাণিজ্য ঘাটতি এখনও বেশিই রয়ে গেছে। যা জিডিপির ৪ শতাংশ। এখানে অবশ্য একটা কথা আছে। দুটো বিষয় আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের বাইরেÑ বিশ্ব অর্থনীতির মন্থরগতি এবং আমেরিকার আমদানির বৃহত্তম খাত তেলের দর বৃদ্ধি।
আমেরিকা কনজিউমারকেন্দ্রিক অর্থনীতি থেকে এখন অধিকতর মাত্রায় রফতানিমুখী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে। রফতানিটা পণ্য হতে পারে, সার্ভিস হতে পারে আবার দুটোই হতে পারে। এই পরিবর্তন সমস্ত খাতকে প্রভাবিত করবেÑ সার্ভিস, ম্যানুফ্যাকচারিং ও ভোগ্যপণ্য। ধনী জাতিগোষ্ঠী ওইসিডি দেশগুলোতে আমেরিকার বিক্রি ২০০৭ সালের শেষভাগ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। তবে লাতিন অমেরিকায় বেড়েছে ৫১ শতাংশ ও চীনে ৫৩ শতাংশ। কানাডা ও মেক্সিকোর পর চীন এখন আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম বাজার।
দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার রফতানির এক বড় শক্তি হলো সার্ভিস। এটা রফতানির ৩০ শতাংশ। এ খাতের মধ্যে পর্যটন ও ভ্রমণের অংশ কমেছে এবং বৈজ্ঞানিক, প্রকৌশল ও কনসাল্টিংয়ের অংশ বেড়েছে। ব্রাজিল, ভারত ও চীনে এসব সার্ভিস রফতানি ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রফতানির এই ধারার কারণে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটেছে।
কয়েক বছর আগেও আমেরিকার ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প পুরোপুরি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। ১৯৯৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একটানা ছাঁটাই চলেছিল শ্রমিক-কর্মচারীদের। আউটসোর্সিং করছিল চীনের মতো দেশগুলোতে। এখন ডলারের দর পড়ে যাওয়ায় ও চীনে মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় আউটসোর্সিং তেমন আর আকর্ষণীয় নয়। এ অবস্থায় কিছু কিছু কোম্পানি বাইরে কাজকর্ম গুটিয়ে আমেরিকায় ফিরিয়ে এনেছে। গত দু’বছর ধরে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। গাড়ি বিক্রিও বেশ সুন্দরভাবে আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। তেমনি বেড়েছে ফার্নিচার বিক্রি ও রফতানি। বিদেশের মডেল অনুকরণ করে কিছু কিছু কোম্পানি ফার্নিচারের ডিজাইন ও নির্মাণে পরিবর্তন আনায় বাইরের বাজার বিশেষ করে চীনের বাজারে সেগুলোর কদর বেড়েছে। কানেকটিকাটের এক ফার্নিচার কোম্পানি এক বছরে চীনে ২৫টি নতুন দোকান খুলেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে বোয়িং ও ক্যাটারপিলারের মতো আমেরিকার সর্ববৃহৎ কোম্পানিগুলো রফতানিতে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকলেও ছোট ছোট কোম্পানিও বিদেশের বাজারে পণ্য বিক্রিতে এগিয়ে আসছে। ২০১০ সালে ২ লাখ ৯৩ হাজার মার্কিন কোম্পানি বিদেশে পণ্য বিক্রি করেছে যা ২০০৬ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। পাঁচ শ’র কম কর্মচারী আছে এমন ছোট আকারের কোম্পানির রফতানির পরিমাণ ২০১০ সালে ছিল মোট রফতানির ৩৪ শতাংশ যা কিনা ২০০৬ সালে ছিল ২৯ শতাংশ। এক দশক আগে এয়ার-ট্রাক্টর ফসলে কীটনাশক ছিটানোর ও অগ্নিনির্বাপণ বিমান তৈরি বন্ধই করে দিয়েছিল। এখন আবার নতুন করে উৎপাদন শুরু করেছে এবং রফতানি আগের মোট অঙ্কের অর্ধেকে পৌঁছে গেছে।
এভাবে উদীয়মান বাজারগুলো বৃহৎ পণ্য উৎপাদনকারী হিসেবে আমেরিকার ভূমিকা পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়ায় মৃত্তিকার গভীর তলদেশ থেকে গ্যাস আহরণ বেড়ে গেছে এবং দামও কমে এসেছে। তেলের বেলায়ও একই ব্যাপার ঘটছে। নর্থ ডাকোটার বেককেন তেলক্ষেত্র থেকে দৈনিক সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল শেল অয়েল আহরিত হচ্ছে। আশপাশের এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য অনেক বেড়ে গেছে।
আমেরিকা এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। তারপরও দেশটিকে তেল আমদানি করতে হয় যার পরিমাণ বর্তমানে দৈনিক ৯০ লাখ ব্যারেল। তবে অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় এর তেল আমদানি কমছে। এ বছর অশোধিত তেলের দৈনিক নিট আমদানি ১৯৯৫ সালের পর থেকে সবচেয়ে কম এবং ধারণা করা হচ্ছে আগামীতে তা আরও কমতে থাকবে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমেরিকায় এখন বিশাল জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দামও কমেছে। ১০ লাখ থার্মাল ইউনিট গ্যাসের জন্য ইউরোপীয় ও এশীয়দের যেখানে ১০ ডলারের বেশি দিতে হয় সেখানে আমেরিকানদের দিতে হয় ৩ ডলারের কম। আমেরিকা এখন বিদেশে গ্যাস রফতানির কথা ভাবছে। বছরে ৬ হাজার ঘটমিটার গ্যাস রফতানি করলে পাওয়া যাবে ২ হাজার কোটি ডলার যা অর্থনীতিতে নতুন গতিসঞ্চারে সাহায্য করবে।
এসব কিছু বিচার করে বলা যায় আমেরিকার মন্দাপীড়িত, রুগ্ণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হতে চলেছে। ঘুরে দাঁড়ানোর উপক্রম করছে আমেরিকার অর্থনীতি। অন্তত কিছু কিছু লক্ষণ তো এমনই বলে।
সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

No comments

Powered by Blogger.