গ্রামীণ ব্যাংক উল্টো এনবিআরের কাছে পাবে ১০ কোটি টাকা- শুধু ইউনূসের নয়, সব প্রবাসী-আয়ই করমুক্ত by জাহাঙ্গীর শাহ

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশ থেকে যে অর্থ আয় করেছেন, তার ওপর কোনো কর দিতে হয়নি। প্রবাসী-আয়ের ওপর করমুক্ত সুবিধা থাকায় তাঁর এ ধরনের আয়ে কর আরোপ করার সুযোগ ছিল না জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)।


নোবেল বিজয়ের পর যে অর্থ ড. ইউনূস পেয়েছিলেন, তাও এনবিআরের বিশেষ আদেশের (এসআরও) মাধ্যমে করমুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের সব আয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি দিয়েছে এনবিআর। এ কারণে অগ্রিম কর হিসেবে পাওয়া ১০ কোটি টাকা ফেরত দিতে হবে এনবিআরকে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী ৫৪টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত করদাতা হিসেবে করের আওতায় রাখা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রবাসী-আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করে ২০০৪ সালের ১৩ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারি করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ৪৪ নং ধারার চার নং উপধারার ক্ষমতাবলে সরকার আবাসিক/অনাবাসিক মর্যাদা নির্বিশেষে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের বাংলাদেশের বাহিরে উদ্ভূত প্রচলিত আইনের অধীনে আনীত আয়কে উক্ত অধ্যাদেশের অধীনে প্রদেয় আয়কর হতে অব্যাহতি প্রদান করিল।’
গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভায় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে ড. ইউনূস ওয়েজ আর্নার হিসেবে কত টাকা বিদেশ থেকে এনেছেন এবং তিনি তা আনতে পারেন কি না, এনে থাকলে কী পরিমাণ কর অব্যাহতি নিয়েছেন, সেই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য এনবিআরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে এনবিআর কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
এনবিআর সূত্র জানায়, প্রবাসী-আয় করমুক্ত রাখার প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ড. মুহাম্মদ ইউনূস যদি বিদেশ থেকে কোনো অর্থ আয় করে দেশে আনেন, তাহলে তা করমুক্ত থাকবে। আর একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বিদেশ থেকে কর অব্যাহতি নিয়ে অর্থ আনতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস তাঁর পুরস্কার হিসেবে পাওয়া অর্থ দেশে আনার সময় তা করমুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সে সময় এই বিষয়ে এনবিআরের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। পরে ২০০৪ সালের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের সূত্রের বরাত দিয়ে নোবেল পুরস্কারের অর্থ করমুক্ত রাখার বিশেষ এসআরও জারি করে এনবিআর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, এনবিআরের কাছে করদাতারা সমান মর্যাদা পান। এখানে ব্যক্তির পরিচয় মুখ্য বিষয় নয়। যেকোনো ব্যক্তি বিদেশ থেকে বৈধ চ্যানেলে অর্থ আনলে তা করমুক্ত সুবিধা থাকবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রবাসীদের আয় দেশে পাঠালে তা করমুক্ত রাখা আছে। বৈধ উপায়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোকে উৎসাহিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেননা, যেকোনো প্রবাসী-আয় অর্থনীতির আয়, দেশের রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করে। তবে প্রবাসী-আয়ের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে।
গ্রামীণ ব্যাংকের আয় করমুক্ত: ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের আয় করমুক্ত রাখা হয়েছে। গত ২১ জুন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) এক প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে শর্ত হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে প্রতিবছর নিরীক্ষা হিসাব বিবরণীসহ আয়কর বিবরণী দাখিল করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি আয়করমুক্ত থাকার মেয়াদ ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এর আগেও গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশের ৩৩ ধারা অনুসারে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর আয়কর অব্যাহতি পেত। কর অঞ্চল-৩ এই বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দিত। কিন্তু সর্বশেষ ২০১১ সালের ৩০ জুন সেই আয়কর অব্যাহতির মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু এরপর সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের আয় করমুক্ত থাকবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
প্রায় এক বছর পর গ্রামীণ ব্যাংক আয়করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না থাকায় ২০১১-১২ করবছরে কর হিসাবে ১০ কোটি টাকা দিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক। এখন এই অগ্রিম কর গ্রামীণ ব্যাংককে ফেরত দিতে হবে বলে এনবিআরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

No comments

Powered by Blogger.