রাজনীতি-জাতীয় সংসদের আয়নায় বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর চেহারা দেখুন by বদরুদ্দীন উমর

 ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচন ও সংসদ গঠনের পর থেকে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে সংসদকে কেন্দ্র করে যে নাটক শুরু হয়েছিল তার এক পরিচিত দৃশ্যের পর্দা এখন আবার নতুন করে উঠতে যাচ্ছে।
প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, ২০১০ সালের জুন মাস থেকে সংসদ বর্জন করে আসার পর এই অধিবেশনে আবার সংসদে হাজিরা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
সংসদে অংশগ্রহণকে হাজিরা দেওয়া বলা হচ্ছে এ কারণে যে, এই হাজিরা না দিলে সংবিধান অনুযায়ী পরপর ৯০টি কার্যদিবসে অনুপস্থিত থাকার জন্য তাদের জাতীয় সংসদের সদস্যপদ বাতিল হবে এবং সেসঙ্গে সাংসদ হিসেবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তারা হারাবেন। ভোটারদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব অথবা সাধারণভাবে দেশ ও জনগণের স্বার্থের কারণে নয়, নিজেদের অতি ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার তাগিদেই তারা দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর বর্তমান অধিবেশনে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এটাই সত্য হলেও সংসদে বিএনপির চিফ হুইপ ১৩ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা নিজেদের সংসদ সদস্যপদ রক্ষার জন্য নয়, বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার উদ্দেশ্যেই যোগদানের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন! (উধরষু ঝঃধৎ ১৪.৩.২০১১) বিএনপি ও তাদের জোট সদস্যরা সর্বশেষ সংসদের অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন ২০১০ সালের ২ জুন। ওইদিন থেকে সংসদ বর্জনের অজুহাত তাদের ছিল দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার ও পত্রিকাটির প্রকাশনা সরকার কর্তৃক বন্ধ করা। এ দুই কাজই ছিল অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্টসুলভ এবং এর প্রতিবাদ হওয়া অবশ্যই দরকার ছিল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েও ছিল শুধু বিএনপি ও তার জোট শরিকদের দ্বারাই নয়, অন্যদের দ্বারাও। কিন্তু এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বর্জন করে বসে থাকার বিন্দুমাত্র কোনো যৌক্তিকতাই ছিল না। এ দেশে ভঙ্গুর এবং চালু সংসদীয় রাজনীতির রীতিনীতি অনুযায়ী প্রতিপক্ষ সরকারি দলকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যেই এই চরম অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বিএনপি নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল।
আগেই বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত জাতীয় সংসদের আমল থেকেই সংসদ বর্জনের এই নাটক চলে আসছে। সে সময় বিরোধী দলে ছিল আওয়ামী লীগ। তারা একই কারণে এবং একই উদ্দেশ্যে নির্বাচিত জাতীয় সংসদকে অচল করে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখেই বছরের পর বছর সংসদ বর্জন করে এসেছিল এবং ৯০টি কার্যদিবস পার হওয়ার আগেই নিজেদের সদস্যপদ রক্ষার জন্য অনেক লম্বা কথা বলে সংসদে ফেরত গিয়েছিল। পাঁচ বছরে এ কাজ তারা করেছিল একাধিকবার। এভাবে তখন থেকে সংসদ অধিবেশন বর্জনের যে ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিল সেই ঐতিহ্য এখন পর্যন্ত চলছে। তারই বশবর্তী হয়ে ৯ মাসের বেশি সংসদে অনুপস্থিত থাকার পর বিএনপি সেখানে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখন গ্রহণ করেছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতি কটাক্ষ করে ১৩ মার্চ সংসদের অধিবেশনে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, লাল পাসপোর্ট গ্রহণ আর বেতন-ভাতার সুবিধা রক্ষার জন্য বিরোধী দল সংসদে আসতে চাইছে। তারা বিরোধী দলের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, কেবল বেতন-ভাতা রক্ষার জন্যই কেন সংসদে আসতে হবে। সাহস থাকলে, সংসদ থেকে পদত্যাগ করে দেখান! (আমার দেশ ১৪-০৩-২০১১) সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর এবং বিশেষ করে তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক চরিত্র বলে যে কিছু নেই, এটা সংসদ বর্জনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর এ আচরণের মধ্য দিয়েও বেশ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। লম্বা-চওড়া কথা বলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিএনপির যেমন সংসদে ফেরত যেতে লজ্জা নেই, তেমনি আওয়ামী লীগেরও লজ্জা নেই ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর নিজেরা একইভাবে সংসদ বর্জন ও সংসদে ফেরত যাওয়ার কাজ করলেও এখন বিএনপির বিরুদ্ধে আস্ফালনের সঙ্গে উপরোক্ত 'চ্যালেঞ্জ' নিক্ষেপ করতে!
শেয়ারবাজারের ধস, খাদ্যদ্রব্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা, লিবিয়া থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত আনা, ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ইত্যাদির ওপর আলোচনা এবং এসব নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার উদ্দেশ্যেই বিএনপি সংসদে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এসব বলার মূল কারণ তারা আসলে যে উদ্দেশ্যে সংসদে ফেরত যাচ্ছেন সে উদ্দেশ্য আড়াল করা। কিন্তু বিষয়টি এতই পরিষ্কার যে, মনে হয় না সারাদেশে বিএনপি জোটসহ অন্য কোনো দলভুক্ত বা দলবিহীন লোকই বিশ্বাস করে যে, নিজেদের সংসদ সদস্যপদ রক্ষার জন্যই বিএনপি এখন সংসদে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই চেষ্টা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতোই, এমনকি তার থেকেও অকার্যকর এবং নির্লজ্জ। এ কাজ যারা করে তারা যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও জনগণের কেউ নয়, তারা যে জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার লোক, এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করার মতো কোনো লোক বাংলাদেশে আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এরাই এ দেশে নির্বাচনের পর নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় ফেরত আসছে এবং হাজার রকম প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও জনস্বার্থের দিকে তাকিয়ে এরা কোনো কাজই করছে না। এটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটভুক্ত সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাহ্যত তাদের যেসব কাজ জনস্বার্থের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত থাকে সেগুলোর দিকেও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শাসকশ্রেণী ও সরকারি দলের লোকরা কোনো না কোনো সূত্রে সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, এসবের সঙ্গে তাদের স্বার্থ জড়িত।
জাতীয় সংসদের বিষয়ে ফেরত গেলে দেখা যাবে যে, এর কোনো বিশেষ গুরুত্ব বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় নেই। নির্বাচনের পর এর প্রধান কাজ হলো, একটি সরকার গঠন করা। সরকার গঠিত হওয়ার পর কতকগুলো বাধাধরা আইন পাস করা ছাড়া এর অন্য কোনো কাজ নেই। দেশে ও বিদেশে যত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই ঘটুক, যত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই সরকার গ্রহণ করুক, বিদেশের সঙ্গে সরকার যত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করুক, তার কোনোকিছুর আলোচনাই সংসদে হয় না। এসব ব্যাপারে সব সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এবং দল ও সরকার যেভাবে পরিচালিত হয় তাতে মন্ত্রিসভায় প্রায় এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা! কাজেই সংসদে কোনো বিষয়ে কোনো প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কই হয় না। যা হয় তাকে রাজনৈতিক খিস্তিখেউড়, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বিরোধী দল অনুপস্থিত থাকলে সরকারি দল সামনের শূন্য চেয়ারগুলোকে লক্ষ্য করেই তাদের বিষোদ্গার করে। বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে উপস্থিত না থেকে, প্রেস বিবৃতি বা সংবাদ সম্মেলন করে অথবা সভা করে এই একই কাজ করে। এসব ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ইত্যাদি যে দলই সরকারে থাকুক তাদের আচরণ এদিক দিয়ে অভিন্ন। তাদের মধ্যে যে দলই বিরোধী পক্ষে থাকে তাদেরও আচরণ অভিন্ন। কাজেই দলনিরপেক্ষভাবে বলা চলে সরকারি দল কী করবে এবং বিরোধী দল কী করবে। এসবের মধ্যে সাধারণভাবে বাংলাদেশের লুণ্ঠনজীবী শাসকশ্রেণীর চরিত্রের অভ্রান্ত প্রতিফলনই ঘটে। অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীপ্রধান জাতীয় সংসদের এ অবস্থা ও সংসদ সদস্যদের আচরণের দিকে তাকালেই তার আয়নায় বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর গণবিরোধী চেহারা স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে।
১৪.০৩.২০১১
 

No comments

Powered by Blogger.