উপমহাদেশ-দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে নতুন মাত্রা by কুলদীপ নায়ার

যখন দুর্নীতির বিষয়টি আবারও প্রকাশ হয়ে পড়েছে তখন সরকার এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইছে। তারা ভাবছে, রাজনৈতিক ভাষা অথবা বর্বরশক্তি দিয়ে দাবিকে দমিয়ে রাখা যাবে। সবচেয়ে খারাপ বিষয়, বাবা রামদেবের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে তারা সাহায্য করছে।


তার বিশ্বাস নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে এবং তার পোশাকে সাম্প্রদায়িকতা ফুটে উঠেছে। যখন বিজেপি এবং এর বিজ্ঞ পরামর্শদাতা আরএসএস তার পেছনে শক্তি সঞ্চয় করছে তখন জনগণ বাবা থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছিল

সন্ত্রাসী এবং পুলিশ সদস্য উভয়ে একই বাক্স থেকে আসে। এটি গত সপ্তাহে দিলি্লতে আবারও প্রমাণ হলো, যখন ধর্মীয় নেতা বাবা রামদেব তার হাজার হাজার সমর্থকের সামনে অনশন শুরু করলেন। বিভিন্ন সংস্থার পুলিশ সদস্যরা মধ্যরাতে ওই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দিল। বাবা শারীরিকভাবে প্রহৃত হয়েছেন, তার শরীরের বিভিন্ন অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, এর মধ্যে কিছু মারাত্মক আকারের।
ভারত সরকার সম্প্রতি এক অধ্যাদেশ জারি করেছে, যেসব ভারতীয়ের কালো টাকা বিদেশে রয়েছে তা জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে ফেরত আনা হবে। এ কালো টাকার পরিমাণ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এ অর্থ ফেরত আনা কঠিন হবে। কেননা বিদেশি ব্যাংক এবং তাদের সরকারগুলো এর সঙ্গে জড়িত।
এটি অবধারিত, এসব ব্যাপারে কংগ্রেসের নিজস্ব নেতৃস্থানীয়রা জড়িত। কিন্তু যদি দলটির লুকানো বা ভয় পাওয়ার কারণ না থাকত তাহলে তারা ওই লুকায়িত অর্থ জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা দিত। দেশটির বোফর্স অস্ত্র কেলেঙ্কারির অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওই অভিজ্ঞতা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু ইতালীয় ব্যবসায়ী অক্টাভিও কোয়াটারোচ্চিকে ভারতের বাইরে যেতে দেওয়া হয়েছে, যখন তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। অবশ্যই তিনি কংগ্রেস দ্বারা সুরক্ষিত।
যখন দুর্নীতির বিষয়টি আবারও প্রকাশ হয়ে পড়েছে তখন সরকার এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইছে। তারা ভাবছে, রাজনৈতিক ভাষা অথবা বর্বরশক্তি দিয়ে দাবিকে দমিয়ে রাখা যাবে। সবচেয়ে খারাপ বিষয়, বাবা রামদেবের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে তারা সাহায্য করছে। তার বিশ্বাস নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে এবং তার পোশাকে সাম্প্রদায়িকতা ফুটে উঠেছে। যখন বিজেপি এবং এর বিজ্ঞ পরামর্শদাতা আরএসএস তার পেছনে শক্তি সঞ্চয় করছে তখন জনগণ বাবা থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছিল। যখন পুলিশি অ্যাকশন শুরু হলো তখন তার বিরুদ্ধে সন্দেহ পেছনে ঢাকা পড়ল এবং পুলিশের এ পদ্ধতি বিতর্কের জন্ম দিল। দায়িত্বপরায়ণ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তখন পুলিশকে উদ্ধার করার জন্য বললেন, 'ওই অ্যাকশন ছিল দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু তা ছিল অনিবার্য।'
সংবিধানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা অহিংস পদ্ধতিতে আমাদের স্বাধীনতা লাভ করেছি। মধ্যরাতে গোপনে পুলিশি হামলা চালানো কি যুক্তিসঙ্গত? এবং ওই স্থানে ঘুমন্ত নারী ও শিশুদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ কি ন্যায়সঙ্গত? মনমোহন সিং এবং কপিল সিবাল খুবই চমৎকার মানুষ। কিন্তু তারা যখন সরকারের বিভিন্ন পদে আসীন হয়েছেন তখন তাদের আচরণে পরিবর্তন কেন? কেন শাসকদের মতো আচরণ করছেন, যেখানে কি-না তারা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন?
অন্য একটি বিষয় হলো, পুলিশি অ্যাকশনের ফলে বাবা এবং গান্ধীবাদী আন্না হাজারের আলোচনা একই পাতায় এসেছে। সরকার দুর্নীতি দূর করার জন্য যে লোকপাল বিল এনেছে সে প্রসঙ্গে বিতর্ক আছে। আবারও সিবাল অবিবেচকের মতো মন্তব্য করে বলেছেন, সরকারকে লোকপাল বিলটি চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিতে হবে, এমনকি আন্না হাজারের দল, যারা সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিত্ব করে তাদের বাদ দিয়ে। তারা তো কখনও বয়কটের কথা বলেনি। সরকার এমন ব্যবহার কেন করছে, যাতে তাদের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়? তারা জনগণের কর্মচারী, মালিক নয়।
সরকার ও সিভিল সোসাইটির আলোচনার প্রশ্নে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জাগ্রত হয়েছে। এ দলটি কখনও ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা কিষান সভার বাইরের আন্দোলন প্রশংসা করবে না। বামপন্থি দলগুলো সিভিল সোসাইটির বিষয়টি সব সময় অবহেলা করতে চায়। যদিও সিপিআই(এম) পরিস্থিতি বাস্তবসম্মতভাবে দেখছে। কেননা তারা পুলিশি অ্যাকশনের নিন্দা জানিয়েছে। যখন উত্তেজনাকে সরকার মোকাবেলা করতে গেল তখন তাদের হাতে কোনো প্রমাণ ছিল না। কংগ্রেস অপব্যবহৃত হচ্ছে এবং সরকার শেষ অবলম্বন হিসেবে বল প্রয়োগের পথ বেছে নিল।
দুর্নীতির অভিযোগের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে এবং কালো টাকা এত উঁচুতে অবস্থান করে যে, তাকে ছোঁয়া যায় না। মাত্র কয়েক মাস পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটবে। তারপরও তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রহণযোগ্য কোনো প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারছে না। দেশ নির্মমভাবে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। খুব সম্ভবত কোনো পথ নেই।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ভিন্নমাত্রা পেতে পারে, যেখানে সরকারের পক্ষে পেরে ওঠা কষ্টকর হবে। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত এবং বলবেন, 'অনেক দেখা হয়েছে।' তিনি পদত্যাগের হুমকি দেবেন। তাহলেই তিনি দলটিকে সুখনিদ্রা থেকে ওঠানোর জন্য ধাক্কা দিতে পারবেন। সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেসের নেতা এবং মন্ত্রীদের বৈঠকে মনমোহন সিং আমন্ত্রণ পাননি। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী গোটা সভার সভাপতিত্ব করেছেন। তিনি হয়তোবা অবস্থান নেবেন।

কুুলদীপ নায়ার : যুক্তরাজ্যের সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার ও রাজ্যসভার সাবেক সদস্য
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর অনিন্দ্য আরিফ
 

No comments

Powered by Blogger.