ব দ লে যা ও ব দ লে দা ও মি ছি ল-সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থসামাজিক ক্ষয়ক্ষতি by শওকত আলী

‘বদলে যাও বদলে দাও মিছিল’-এ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও নির্বাচিত চারটি ইস্যু নিয়ে অব্যাহত আলোচনা হচ্ছে। আজ সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে আর্থসামাজিক বিশ্লেষণাত্মক একটি অভিমতসহ অন্যান্য ইস্যুতে আরও তিনজন লেখকের নির্বাচিত লেখা ছাপা হলো।


সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আর্থসামাজিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বর্ণনার আগে আমার নিজ পরিবারের একটি ঘটনা বলছি। আমার ছোট চাচা আবদুস ছালামের দুই ছেলে। বড়জন বজলু আর ছোট রঞ্জু। বজলুর জন্মের সাত-আট বছর পর বোঝা গেল, তার মধ্যে কিছু মানসিক সমস্যা রয়েছে। লেখাপড়া করতে পারল না। আমরা যদি জিজ্ঞাস করতাম, তুমি কোন পর্যন্ত পড়বে? সে বলত, ওই আমগাছ পর্যন্ত পড়ব! চাচার বড় গৃহস্থালি থাকায় এটাকে মেনে নিলেন এ জন্য যে তার এমনিতে চলাফেরায় আর কোনো সমস্যা নেই। জন্ম হয় ছোট ছেলে রঞ্জুর। সে সব দিক থেকেই ঠিকঠাক, মেধাবীও। পুরোদমে সংসার দেখাশোনার মধ্য দিয়েই ডিগ্রি পাস করে। নিজ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে জনসেবাও করবে বলে বাড়ির কাছে বানিয়াজান বাস টার্মিনালে একটি ওষুধের ফার্মেসি দিল। দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে চাচার বড়ই হাসিখুশির সংসার। রঞ্জু দোকানের সাপ্তাহিক ওষুধ ক্রয় করত মধুপুর বাজার থেকে। এমনি একটি দিন ১৯ ডিসেম্বর ২০০৩। সে টাকা-পয়সা পকেটে পুরে মধুপুর মহাজনের কাছে যাবে বলে বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষা করছিল। বাস ঠিকই এল, কিন্তু রঞ্জুকে ভেতরে নিতে পারল না। ব্রেকফেল করে ওকে ছিঁচড়ে নিয়ে পেছনের বড় কড়ই গাছটির সঙ্গে থেঁতলে চ্যাপ্টা করে দিল নিমেষেই। চাচার সবকিছু শেষ হয়ে গেল। শোকে নিজেই মানসিক ভারসাম্যতা হরিয়ে ফেললেন, নির্বাক হয়ে গেলেন। পাঁচ বছর টানা চিকিৎসা শেষে এখন বড় ছেলে বজলুকে নিয়েই নিষ্প্রাণ নিভৃতচারী এক মানুষ। তাঁর সেই স্বপ্নের সংসার, সেই হাসি-আনন্দ আমরা কেউই ফিরিয়ে দিতে পারিনি।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সড়ককে বলা হচ্ছে উন্নয়নের রক্তনালি। উন্নয়ন ও গতিশীলতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতোই। একটি না হলে অন্যটিতে সমস্যা হয়। আমরা দুই দিক দিয়েই পিছিয়ে পড়ছি। সড়কপথ দেশের মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে গতি নিয়ে আসবে, ব্যবসা-বাণিজ্য করবে, জনগণের আয় বৃদ্ধি হবে। রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি হবে। জিডিপি, জিএনপিতে সূচক হয়ে উঠবে। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি যদি যোগাযোগ পথে প্রধান অবদান রাখে তবে সে পথ আজ আমাদের জন্য হয়ে উঠেছে মৃত্যুপুরী। মানুষ কাজে যেতে মরছে, কাজ থেকে ফিরতে মরছে। এমনি এক অনিবার্য ‘গণহত্যার’ করুণ পরিণতিতে আমরা পুরো দেশবাসী।
বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যায়? আমরা একক প্রাতিষ্ঠানিক কোনো হিসাব পাই না। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যে বিস্তর ফারাক। সরকারি হিসাবে ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। বেসরকারি হিসাবে প্রতিবছরই মারা যাচ্ছে ২০ হাজারের ওপর। পুলিশ ও হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৭৪৮টি। মারা গেছে ৫২ হাজার ৬৮৪ জন। আহত এবং পঙ্গু হয়েছে আরও কয়েক হাজার মানুষ। উদ্বেগজনক হলো, নিহত ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশের বেশির বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ২০ ভাগের বয়স ১৬ বছরের নিচে। প্রতিবছর আমরা হারাচ্ছি উৎপাদনসক্ষম শ্রমশক্তির এক বড় অংশ। আরও পরিষ্কার করে বললে, আমাদের গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহজ-সরল শ্রমজীবী মানুষই বেশি।
সংসারের কর্মক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তাদের এই মৃত্যুতে প্রতিটি পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিবারগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু? ১২ মে প্রথম আলো রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৪ সালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে প্রায় চার হাজার ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, যা তখনকার মোট দেশজ উৎপাদনের ১ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। জানা যায়, সওজের প্রতিবেদন প্রকাশের কাছাকাছি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেখানো হয়। এ তথ্যটিও প্রায় আট বছর আগের করা। এই হিসাব এখনকার বাস্তবতায় দ্বিগুণ ধরলে ১০ হাজার কোটি টাকা হবে। এই যদি চিত্র হয় তাহলে সরকার কীভাবে উন্নয়নের জয়গান শোনাচ্ছে প্রতিদিন! আমরা জনগণ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেখে চোখ কপালে তুললেও সরকার মোটেও ঘাবরাচ্ছে না। আমাদের দেশ বছরে কয় টাকা আয় করে? মাননীয় অর্থমন্ত্রী বার্ষিক বাজেট কী দিয়ে তৈরি করছেন? যদি সড়কপথেই এই বৃহৎ অঙ্কের অপচয় হয়, তাহলে অন্য খাতগুলোর বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত?
সড়ক নিরাপত্তা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় চিন্তার বিষয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অসংক্রামক রোগীদের ২০ শতাংশের বেশি আসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে। এভাবে দুর্ঘটনাজনিত কারণে স্বাস্থ্য খাতে বিরাট সম্পদ ব্যয় হচ্ছে। সরকারের তো যাচ্ছেই, তা ছাড়া অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন নির্ভরতা বাড়ছে বেসরকারি মুনাফাভোগী হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোর প্রতি। বিশেষ করে হতদরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আর উঠে দাঁড়ানোর উপায় থাকে না। এক ভয়াবহ অসহায়ত্বের সাগরে পতিত হতে হয়।
এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের কর্মক্ষম করে তোলার আগ পর্যন্ত প্রতিটি পরিবারের রয়েছে শিক্ষা ও ভরণপোষণ বিনিয়োগ। একটি দুর্ঘটনায় পরিবারের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। মৃত্যুর ক্ষতি অন্য কোনোভাবে আর পুষিয়ে তোলা যায় না। প্রতিবছর কর্মক্ষম হাজার হাজার মানুষ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের প্রভাবটি অনুমেয় না হলেও পরিবার পর্যায়ের অভিজ্ঞতাটি অত্যন্ত করুণ ও বেদনাময়। আমরা বাসে-ট্রেনে উঠলেই সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুদের ক্রাচে করে ভিক্ষা চাইতে দেখি। কেউ কেউ লাজ-সম্মান ভুলে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিলেও অধিকাংশই সেই আপস করতে পারে না। এসব নিয়ে তেমন কোনো সামাজিক-অর্থনৈতিক গবেষণাও হয়ে ওঠে না। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মৃত্যুহার দেশের কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে, তার হিসাব মেলানো আরও জটিল পর্যালোচনার দাবি রাখে। যেমন: তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর আর্থিক ক্ষতির হিসাব মেলানো সম্ভব নয়। তাঁদের মৃত্যু পুরো জাতিকেই শত বছর পেছনে টেনে নিয়ে যায়।
শওকত আলী: সমন্বয়কারী, বদলে যাও বদলে দাও মিছিল, প্রথম আলো।
shawkat1404@gmail.com

যোগ দিন ফেসবুক পেজে : www.facebook.com/bjbdmichil

জনমত জরিপের ফলাফল
বদলে যাও বদলে দাও মিছিলের ওয়েবসাইটে নতুন তিনটি জনমত শুরু হয়েছে চলতি সপ্তাহে। আপনিও অংশ নিন জরিপে।

সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হলে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সাহায্য দেওয়া উচিত বলেমনে করেন কি?

 হ্যাঁ ৮৭%  না ৬%
 মন্তব্য নেই ৭%
২৩ মে, ২০১২ পর্যন্ত
আপনি কি মনে করেন, সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক শিক্ষা ইভ টিজিং কমিয়েআনতে পারে?
 হ্যাঁ ৮৬%  না ৮%
 মন্তব্য নেই ৬%
২৩ মে, ২০১২ পর্যন্ত
বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল ভারতে দেখাচ্ছে না। এটা কি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ ৮৭%  না ৮%
 মন্তব্য নেই ৫%
২৩ মে, ২০১২ পর্যন্ত

No comments

Powered by Blogger.