জবাবদিহিতা-সংবিধানে ধর্ম নিয়ে কেন এত মাতামাতি by বদরুদ্দীন উমর

জিয়াউর রহমান ও এরশাদের এই ধর্ম প্রচেষ্টার কী প্রভাব মুসলমান জনগণের জীবনে পড়েছিল, এর ফলে জনগণের জীবনে ধর্ম চেতনা কতখানি জাগ্রত হয়েছিল, মানুষকে তা কতখানি সৎকর্মে প্রণোদিত এবং দেশের ভাগ্য নির্ধারকদের অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ জীবনযাপন থেকে কতদূর বিরত রেখেছিল, আমরা তা জানি


আওয়াজ দিয়ে যারা কোনো কিছুর মর্যাদা রক্ষার বা কোনো কিছুর প্রতিকারের জন্য আন্দোলনে নামে তারা নিজেরাই অনেক সময়ে নিজেদের কাজের মাধ্যমে তার মর্যাদাহানি করে অথবা প্রতিকারের পথ বন্ধ করে। ইসলামের মর্যাদা রক্ষার নামে বাংলাদেশের এক ধরনের ইসলামপন্থি এখন যেভাবে সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও ইসলাম ঢোকানোর জন্য আন্দোলনে নেমেছেন এটা তারই এক স্বচ্ছ দৃষ্টান্ত। এই আলোচনার প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, নীরবে ব্যক্তিগতভাবে যারা ধর্ম পালন করেন তারা ধর্ম নিয়ে লাফালাফি করা ও বাগাড়ম্বরের খৈ ফোটানেওয়ালাদের থেকে অনেক বেশি ধার্মিক। এটা বললেও কথাটা ঠিকমতো বলা হয় না। যারা নীরবে ধর্মকর্ম করেন তারা সবাই ধার্মিক। কিন্তু যারা ধর্ম নিয়ে আস্ফালন করেন তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের জীবনাচরণে ধর্মের কোনো পাত্তা থাকে না। এটা কোনো বিশেষ ধর্মের লোকদের কথা নয়, সব ধর্মাবলম্বীর জন্যই প্রযোজ্য।
ভারতে চরম প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) ও তার নীতি অনুসরণকারী শাখা-প্রশাখা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, বাল ঠাক্রের শিবসেনা ইত্যাদি ও তাদের সর্বপ্রধান রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি হলো এ ধরনেরই ধর্মীয় সংগঠন, যারা হিন্দুত্বের ধুয়া তুলে ও ঝাণ্ডা উড়িয়ে হিন্দু ধর্মকে কলঙ্কিত করছে। বাংলাদেশে ইসলামকে 'সর্বনাশের' হাত থেকে রক্ষার জন্য যে তথাকথিত ইসলামী দলগুলো বেশ কিছুদিন থেকে নানা ইস্যুকে অবলম্বন করে রাজনীতির ক্ষেত্রে মাতামাতি করছে, তাদের ভূমিকাও একই প্রকার। লক্ষ্য করার বিষয় যে, এসব ধর্মীয় সংগঠনের সংখ্যা ও তৎপরতা যত বাড়ছে ততই দেশজুড়ে খারাপ লোকের সংখ্যা ও তৎপরতা বাড়ছে। অর্থাৎ এদের ধর্মান্দোলনের কোনো সুপ্রভাবই দেশের জনগণের ওপর পড়ছে না। উপরন্তু এসব 'ধার্মিক' লোকের আচরণ দেখে মানুষ ভালো কাজের থেকে খারাপ কাজের দিকেই ঝুঁকছে বেশি।
বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে এখন চারদিকে অনেক নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। এই নড়াচড়া দেখে মনে হয়, এই সংবিধান এমন এক চাঙ্গা জিনিস যার মধ্যে কোনো দাবি অন্তর্ভুক্ত হলে তাতে প্রাণসঞ্চার হবে। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের সংবিধান বলে যা এখন আছে তার কোনো কার্যকারিতা আর নেই। এই অকার্যকর সংবিধানকে কোনোমতে কার্যকর করার জন্য বর্তমান সরকার এলোপাতাড়িভাবে এতে নানা সংশোধনী ঢোকানোর চেষ্টা করছে। যে রোগীর আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই তাকে যেমন চিকিৎসা শাস্ত্রে ঃবৎসরহধষ পধংব বা শেষ প্রান্তের কেস বলা হয়, তেমনি শাসনকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানও হলো একটি ঃবৎসরহধষ পধংব। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত রোগীকে কবিরাজি চিকিৎসায় যেমন মকরধ্বজ দিয়ে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করা হয়, বর্তমান সরকার ও তাদের উদ্ভট মহাজোট শরিকরাও এমন সংশোধনী এনে বিদ্যমান সংবিধানকে রক্ষার ক্ষেত্রে সেই চেষ্টাই করছে। কিন্তু মকরধ্বজ যেমন নিঃশেষিত আয়ু রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কোনো ধরনের সংশোধনই এখন বাংলাদেশের সংবিধানকে শাসন উপযোগী করতে পারে না। কাজেই এই সংবিধানে নতুন করে যা-ই ঢোকানো হোক, তাতে কোনো ফল লাভ নেই। অর্থাৎ সব প্রচেষ্টাই এ ক্ষেত্রে নিষ্ফল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সংবিধানকে মৃত্যুপথযাত্রী ঃবৎসরহধষ পধংব হিসেবে না দেখে টগবগে জীবন্ত দেহ মনে করে এখন অনেকেই নানা দাবি সংবিধানে ঢোকানোর চেষ্টায় উত্তেজিত আন্দোলন করছেন। সংবিধানে ইসলাম ও বিসমিল্লাহ ঢোকানোর চেষ্টায় যারা আন্দোলন করছেন, বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন এবং নিয়মিতভাবে শুক্রবারে জুমার নামাজের পর মসজিদ থেকে মুসলি্লদের মাঠে নামাচ্ছেন, তারা সংবিধানে ইসলাম ও বিসমিল্লাহ ঢোকাতে কতখানি সফল হবেন সেটা আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার হলো, সংবিধানে ইসলাম ও বিসমিল্লাহ থাকা-না থাকার কারণে বাংলাদেশের জনগণের জীবনে ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা কম-বেশি হবে না এবং জনগণের আচরণের মধ্যেও কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। কাজেই নিষ্ফল চেষ্টা বা আন্দোলন বলতে যা বোঝায় বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলাম ও বিসমিল্লাহ ঢোকানোর চেষ্টা হলো তা-ই।
সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও ইসলাম থাকলেই যে কোনো দেশ পুণ্যভূমিতে পরিণত হয় না, এটা তো আমাদের দেশেই দেখা গেছে। জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধন করে এর মুখবন্ধে বিসমিল্লাহ বসিয়েছিলেন। তার উত্তরসূরি পুণ্যবান ও পরম ধার্মিক আলহাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে ইসলামকে এ দেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের এই ধর্ম প্রচেষ্টার কী প্রভাব মুসলমান জনগণের জীবনে পড়েছিল, এর ফলে জনগণের জীবনে ধর্ম চেতনা কতখানি জাগ্রত হয়েছিল, মানুষকে তা কতখানি সৎকর্মে প্রণোদিত এবং দেশের ভাগ্য নির্ধারকদের অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ জীবনযাপন থেকে কতদূর বিরত রেখেছিল, আমরা তা জানি। যারা আজ সংবিধানে ইসলাম ও বিসমিল্লাহ ঢোকানোর জন্য মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতে মুসলি্ল ও ছাত্রদের উদ্দীপ্ত করে রাস্তায় নামাচ্ছেন, তারা যে এ ব্যাপারে আমাদের থেকে অজ্ঞ, তারা যে এসব কিছু জানেন না, এমন নয়। তাদের বুদ্ধি আমাদের থেকে কম নয়। কাজেই এ ক্ষেত্রে তাদের তৎপরতাকে বুদ্ধির বিভ্রান্তি নয়, বরং বুদ্ধির উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহার হিসেবেই দেখা দরকার।
ধর্মের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থা গিরগিটির মতো। রঙ পাল্টাতে তাদের অসুবিধা হয় না। কাজেই প্রয়োজন অনুযায়ী তারা ধর্মনিরপেক্ষ, আবার প্রয়োজন হলে তারা ব্লাসফেমি আইন করারও পক্ষে! এদিক দিয়ে তাদের বাস্তব জ্ঞান টনটনে। কাজেই তারা নিজেরাই এখন সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখার পক্ষপাতী। এ পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থি দলগুলো সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও ইসলাম রাখার জন্য যে তেলেসমাতি করছে সেটা আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর। কারণ সরকার নিজেই যা করতে যাচ্ছে স্বপ্রণোদিত হয়ে, ঠিক সেটাই তাকে দিয়ে করানোর দাবি তো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়! কাজেই সংবিধানে ইসলামকে মর্যাদাদানের সংগ্রামে ইসলামী সংগঠনগুলোর মধ্যে যে জোশ এখন দেখা যাচ্ছে তার দ্বারা অতিরিক্ত কিছু হওয়ার নয়।
আসল কথা হলো, গণতন্ত্র, মানবতাবাদ, সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম ইত্যাদি নিয়ে যেমন আজ রাজনৈতিক ব্যবসা চলছে, ঠিক তেমনি ইসলামকে নিয়েও এখন বাংলাদেশে ব্যবসা চলছে জমজমাট। সংবিধানে যেখানে বিসমিল্লাহ ও ইসলাম ঢুকেই আছে, সেখানে তা ঢোকানোর জন্য এখন তথাকথিত শেখ মাশায়েখ আলেমদের নেতৃত্বে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের যে আন্দোলন চলছে এটাও এক জমজমাট ব্যবসা। ব্যবসা হিসেবে হয়তো এটা ভালো। কিন্তু এর দ্বারা ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি অথবা জনজীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা, কোনোটাই সম্ভব নয়।
১৩.৬.২০১১
 

No comments

Powered by Blogger.