জাপানে ভয়াবহ বিপর্যয়

ইতিহাসের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে জাপান। শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প এবং সুনামির আঘাতে ক্ষয়ক্ষতি দেখার পর সংগত কারণেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।


আর এই ভাবনা থেকে রেহাই পাবে না বাংলাদেশও। কারণ জাপানের মতো উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর দেশে যখন শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটে ভূমিকম্প এবং সুনামির আঘাতে, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা যে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। জাপান তার প্রতিটি স্থাপনাকে ভূমিকম্প প্রতিরোধের আওতায় এনেছে। দ্বীপসমৃদ্ধ দেশ জাপান ভূমিকম্পপ্রবণও। ফলে সেখানকার বিজ্ঞানীরা অবকাঠামো নির্মাণের সময় কিভাবে নিজেদের রক্ষা করা যাবে, সেই বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা করেছেন। তার পরও তারা বিরাট ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। টেলিভিশন চিত্রের মাধ্যমে যা দেখা গেছে, তাকে ভীতিকর বললেও যেন কম বলা হবে। বিশাল আকৃতির উড়োজাহাজ নিমিষে কিভাবে পানির তোড়ে ভেসে গেছে, কিভাবে গাড়িগুলোও পানির সঙ্গে সঙ্গে সাগরে নেমে যাচ্ছে_এ দৃশ্য দেখার পর অবাক না হয়ে পারা যায় না। সেখানকার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো প্রতিষ্ঠাকালেই ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার বিষয়টি চিন্তা করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী শুধু পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, সামগ্রিক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাও তেমনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সবই প্রকৃতির কাছে হার মেনেছে। ফুকুসিমা পারমাণবিক স্থাপনায় আগুন জ্বলছে। শেষ পর্যন্ত এই স্থাপনার ১০ কিলোমিটার এলাকার মানুষজনকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান সরকার। সেখান থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বের হচ্ছে কি না এ মুহূর্তে বিশেষজ্ঞরা তা তলিয়ে দেখছেন। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ জাপান সেই সুবিধা গ্রহণ করেছে আন্তরিকভাবে। এর আগে ১৯২৩ সালে জাপানে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়। সেটিও ছিল শুক্রবারের ভূমিকম্পের তুলনায় অনেক কম_সেটি ছিল ৭.৯ মাত্রার। কিন্তু মৃত্যু হয়েছিল এক লাখ ৪০ হাজার মানুষের। সেই তুলনায় অনেক বেশি অর্থাৎ ৮.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও মনে হয় না প্রাণহানির সংখ্যা তত বেশি হবে। এখানেও প্রযুক্তিকে সঠিক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
জাপানের এই পরিণতি থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। কারণ, বাংলাদেশও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বাংলাদেশে ভূমিকম্প হলে জাপানে ১৯২৩ সালে যে পরিণতি হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, যাঁরা বাড়ি নির্মাণ করেন তাঁরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করেন না। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ এবং অধিক জনসংখ্যার এই দেশে এমন কোনো দুর্যোগ এলে তা মোকাবিলা করার কোনো শক্তি দেশটি সঞ্চয় করেনি। আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যান্য দিক সম্পর্কেও মানুষের তেমন ধারণা নেই। অথচ এ দেশের মানুষ তাদের জীবন পরিচালনা করে নিত্য-সংগ্রামের মাধ্যমে। প্রতিবছরই এ দেশে ঝড়-তুফান হয়। মাঝেমধ্যেই বড় আকারের বন্যাও হয়। সেগুলো মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সাফল্য থাকার পরও ভূমিকম্প বিষয়ে পিছিয়ে থাকাটা সত্যিই আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। যদিও সুনামি কিংবা ভূমিকম্প সম্পর্কে আগাম জানার মতো অবস্থা এখনো হয়নি, তাই এই দুর্যোগ আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়ে থাকে। বিল্ডিং কোড মেনে বাড়িঘর নির্মাণ করলে ঝুঁকি কমে যেতে পারে। এ ভূমিকম্প থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হলে কী করণীয়, তা সাধারণ মানুষকে জানাতে তেমন কোনো আয়োজন আমাদের চোখে পড়ে না। আত্মরক্ষামূলক পদ্ধতি প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে বারবার জানানো প্রয়োজন।

No comments

Powered by Blogger.