মনীষা-নুরুল ইসলাম: দেশের পরামর্শক হিসেবে তাঁকে পেতে পারি না? by মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

বাংলাদেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, তথ্যমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, এনজিওপ্রধান ও অন্যান্য পেশাজীবীর শিক্ষাগুরু ওয়াশিংটনপ্রবাসী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সম্প্রতি নয় দিনের ঢাকা সফর করে গেলেন।


অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার তিনি একটু বেশি ঝড় তুলে গেলেন, নাড়া দিয়ে গেলেন উন্নয়ন-সমস্যার প্রকটতা সম্পর্কে কিছুটা অসতর্ক সরকার তথা সমাজকে। এ ছাড়া তিনি প্রগতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে সাম্প্রতিক কালে ‘মোটাতাজা’ হয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অপ্রতুল প্রচেষ্টার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। তীব্র সমালোচনা করেছেন গবেষণার ক্ষেত্রে অবহেলার বিষয়টিকে।
যানজট ও জনজটে নাকাল মহানগরবাসীর সঙ্গে স্বল্পদিনের বসবাসকালে নুরুল ইসলাম ৩০ মার্চ ‘বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার-২০০৯’ গ্রহণ করে পুরস্কারদাতাদেরই কৃতার্থ করেছেন। কারণ তিনি যে এ সম্মানের অনেক অনেক ঊর্ধ্বে তা শুধু তিনি কেন, তাঁর বহু উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত ছাত্ররা আরও বেশি জানেন। অনেকেই হয়তো জানেন না, জার্মান স্যুমপিটারের মতোই নুরুল ইসলাম একজন অর্থনৈতিক দার্শনিক স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৬০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি অর্জন করে মা-বাবা ও দেশসেবার মহতী ব্রত নিয়ে দেশে ফিরে নুরুল ইসলাম যখন মাত্র ২৬-২৭ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পদে উন্নীত হন, তখন থেকে পাঁচ দশক ধরে আমি তাঁর ছাত্র। ইদানীং অবশ্য একটু দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভবত একজন মানুষের এমনকি অসাধারণ নুরুল ইসলামেরও মনোযোগের ব্যাপ্তি বা পরিধির একটি সীমারেখা থাকে এবং সে জন্য অগণিত ভক্তের মধ্যে তাঁকে একটি অগ্রাধিকার মনোযোগ বলয় সৃষ্টি করতেই হয়। সে যাক। সেই অর্ধশতাব্দী আগে নুরুল ইসলাম একটি সেমিনারে বলেছিলেন, ‘উপযুক্ত নীতিকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না করা হলে ঢাকা শহর হয়তো বা একদিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।’ কী নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী!
নুরুল ইসলাম একজন তীক্ষ মেধাসম্পন্ন ছাত্র এবং অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও সম্মোহনী শক্তির অধিকারী নেতা হিসেবে অর্থনীতির গগনে দেদীপ্যমানও রয়েছেন তিনি। কেন তিনি এসব গুণে উত্কর্ষ একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব, সে সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন।
প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে তরুণ নুরুল ইসলামের তুখোড় মেধা বিস্ময়ের ঢেউ তুলেছিল। ‘নুরু মুসলমান অথচ ক্লাস এমনকি কলেজের সেরা ছাত্র!’ অর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন কালী নারায়ণ স্কলার হিসেবে, যা বিজ্ঞানবহির্ভূত অধ্যয়নকারীদের জন্য বিরল ছিল। এমএ ডিগ্রিও সর্বশ্রেষ্ঠ ফল নিয়েই অর্জন করেন। অতঃপর কর্মজীবন বেছে নেওয়ার যুগসন্ধিক্ষণ। শিক্ষাবিদ পিতার অভিপ্রায় অনুসারে তাঁর সঙ্গে যৌথভাবেই সিদ্ধান্ত নেন যে আপাতদৃষ্টিতে লোভনীয় সিএসপি হওয়ার পথে নয়, বরং প্রতিপদে যোগ্যতার পরীক্ষাসংবলিত শিক্ষকতা তথা গবেষণার চ্যালেঞ্জিং পথকেই তিনি সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবেন। হার্ভার্ডের পিএইচডি লাভের পর আরও একটি অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েন নুরুল ইসলাম। দেশে ফিরে কাজের ফাঁকে মায়ের সেবাযত্ন করবেন নাকি মার্কিন মুলুকের আকাশের মতো বিস্তৃত সুবর্ণরেখায় অর্থনীতির শিখরে পৌঁছাবেন? মা ও দেশমাতৃকার দাবি জয়ী হলো। ফিরলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর শুধু কাজ আর কাজ। পেছন পানে তাকানোর ফুরসত নেই।
নুরুল ইসলামের নেতৃত্বের চমত্কারিত্ব সম্পর্কে সম্প্রতি তাঁর সহপাঠী অধ্যাপক মোশারফ হোসেন স্মৃতিচারণা করেছেন। ১৯৬৪ সালে নুরুল ইসলাম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যান, তখন ওই বিভাগের নেতৃত্ব নিয়ে যে জটিলতা, সংকীর্ণতা ও কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয় তা থেকেও অনুধাবন করেছি যে কত বড় সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি বিবদমান গোষ্ঠী ও ব্যক্তিকে একসঙ্গে রাখতে পারতেন। ষাটের দশকে তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে দানা বেঁধে ওঠা দুই অর্থনীতি তথা সম্ভাব্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তুলতে যাঁরা কাজ করেছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। সে সময়ই তিনি প্রায় অকিঞ্চিত্কর পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসকে (পিআইডিই) আন্তর্জাতিকভাবে প্রহণযোগ্য একটি গবেষণা সংস্থায় রূপান্তর করেন। ১৯৬৯-৭০ সময়টাতে আমি যখন করাচিতে কর্মরত, তখন নুরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয়। তাঁর মতো বড় মাপের প্রতিভাধারীরা সম্ভবত একটু বেশি মাত্রায় টেনশনে থাকেন, হন কিছুটা এলোমেলো। ১৯৭০ সালে প্রবল বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের মুখে সব মূল্যবান বই ও দলিলদস্তাবেজসহ পিআইডিইকে ঢাকায় স্থানান্তরের সংগ্রামকে তিনি জীবন বাজি রেখে সফল করেন। বেশ কয়েক দিন টেলিফোনে মৃত্যুর হুমকি পাওয়া নুরুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে থেকে সাহসও জুগিয়েছিলাম আমরা।
আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা ও মুক্তি-সংগ্রামের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক মহলে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে নুরুল ইসলাম শক্তিশালী সমর্থনবলয় সৃষ্টি করেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পাকিস্তানি উপনিবেশ-শক্তি পাকিস্তানের ধ্বংস করে ফেলে যাওয়া অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, পুনরুজ্জীবন ও সমৃদ্ধির পথে নীতিমালার অসাধারণ কাজটি তাঁরই নেতৃত্বে প্রণীত হয়। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শ্রেষ্ঠত্ব যেকোনো স্বাধীন জাতিকে গর্বিত করতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে কয়েকজন জ্ঞানালোকে সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্বকে নিখাদ শ্রদ্ধায় সিক্ত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদা, দার্শনিক আবদুর রাজ্জাক, নুরুল ইসলাম এবং সাহিত্যের সিকান্দার আবু জাফর অন্যতম। একজন শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা হিসেবে নুরুল ইসলাম ভয়ভীতি ও স্বার্থচিন্তার ওপরে উঠে দেশের স্বার্থে উপযোগী সঠিক পরামর্শটিই দিতেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে।
নুরুল ইসলাম তাঁর সাম্প্রতিক দেশ ভ্রমণে কন্যা কুইনী ও নাতনি লেয়লাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। সব সময় দেখেছি, দেশে যে কয়েক দিন থাকেন সে সময়টাতে যথারীতি স্বল্পকালীন ঘুম সত্ত্বেও বেশ উজ্জীবিত, চাঙা হয়ে ওঠেন। ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অনুরাগী সমালোচকদের নিবিড় মনোযোগ ও সম্মান পেয়ে তিনি সব সময়ই খুশি হন। তাহলে কোন অভিমানে দেশের বাইরে পড়ে থাকেন তিনি? দেশের বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে এবং বিশ্ব মহামন্দার কুপ্রভাবকে উপেক্ষা করেও দেশের অর্থনীতি যে প্রবৃদ্ধির কক্ষপথেই বহাল আছে, তার গতি তীব্রতর করার নীতিকৌশল নির্ণয়ে নুরুল ইসলামের নেতৃত্ব অতুলনীয় হতে পারে।
তিনি তাত্ত্বিক ও ফলিত অর্থনীতির সব দিকেই বিশ্বের সেরা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নক্ষত্রসম। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও এর উন্নয়নের তিনি শুরুতে যেমনটি ছিলেন এখনো তেমনি আপন গৌরবে নেতৃত্বের সারথি হয়ে আছেন। অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের আলোকে সমৃদ্ধ জ্ঞানতাপস অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নুরুল ইসলামকে জাতির বিবেক হিসেবে সুশাসনকার্য পরিচালনার একজন সম্মানিত পরামর্শক হিসেবে গণ্য করা যায় না?
 মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: পিএইডি বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের (বিইউপি) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য।

No comments

Powered by Blogger.