পাস্কা মহোৎসব-যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান মহোৎসব by ফাদার প্যাট্রিক গমেজ

খ্রিষ্টধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে এই দুটো দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। গত শুক্রবার ২ এপ্রিল অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যিশুর মুক্তিদায়ী মৃত্যু ধ্যান করেছে; নিজ পাপের জন্য অনুশোচনা করে পাপ পরিত্যাগ করার সংকল্প নিয়েছে।


আর আজ ৪ এপ্রিল, রোববার মহাসমারোহে জগতের সব খ্রিষ্টভক্তের সঙ্গে বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সম্প্রদায় পালন করছে পবিত্র ইস্টার বা পাস্কা মহোৎসব, তথা যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান মহোৎসব। আজ ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয়েছে সুস্বাদু খাবার: দই, চিঁড়া, মুড়ি, খই, কলা, মিষ্টি, সন্দেশ! কচিকাঁচারা নতুন পোশাক পরে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে; যুবা ও বয়স্করা একত্রে বসে জমিয়েছেন উৎসবের মহড়া: গান-বাজনা ও শুভেচ্ছাবিনিময়। আজ শুভ পাস্কা, হ্যাপি ইস্টার!
কারও কারও জন্য একটু খটকা লাগলেও উল্লেখ করতেই হয়, কবর থেকে যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই ইস্টার উৎসব। এই পুনরুত্থান যে সত্য ঘোষণা করে তা হলো, যিশু মানুষের পাপের জন্য, পাপের কারণে নির্দোষ হয়েও অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে শেষে ক্রুশে মৃত্যুবরণ করেন। আর এভাবেই ক্রুশে থেকে মানুষকে উদাত্ত আহ্বান জানালেন: ফিরে আয় হে মানব, পাপের পথ ছেড়ে পুণ্যের পথে ফিরে আয়।
এই পুনরুত্থান আরও ঘোষণা করে, যিশু কবরে নেই এবং কবরে থাকতেই পারেন না। যে নতুন জীবন, ক্ষমার জীবন আনার জন্য, তথা পরিত্রাণ আনার জন্য তাঁর এই পৃথিবীতে আগমন, সেই নতুন জীবন নিয়ে তিনি মৃত্যু থেকে পুনরুত্থান করেছেন। এই পুনরুত্থান যিশুর জন্য প্রয়োজন মানব পরিত্রাণ সাধনের জন্য। যিশুর পুনরুত্থানে পুণ্যস্নানে স্নাত হলো গোটা পৃথিবীর মানুষ। তাঁর মৃত্যু ও পুনরুত্থান দ্বারা যিশু মানুষের জন্য স্বর্গে যাওয়ার পথ খুলে দিলেন। অতএব একবাক্যেই বলা যায়, গুড ফ্রাইডে হলো পাপে মৃত্যুবরণ করার দিন; আর ইস্টার সানডে হলো পুরোনো জীবন ত্যাগ করে নতুন জীবনে পদার্পণ করার দিন। আজ ইস্টার উৎসব।
বাংলাদেশের জন্য এই দুটো দিন কী বার্তা বা আহ্বান নিয়ে আসে? প্রশ্নটি বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য। গুড ফ্রাইডের অনুধ্যান অনুসারে ক্রুশবিদ্ধ যিশু বাংলাদেশের মানুষকে আত্মমূল্যায়ন করে আধুনিক বা অতি দৃশ্যনীয় পাপগুলো চিহ্নিত করতে বলেন। এর জন্য প্রয়োজন বিনম্রতা ও সাংঘাতিক সাহস। সাধারণভাবে বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষভাবে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলোর প্রাত্যহিক বাস্তব ঘটনা বর্ণনায় আমরা দেখি, মানুষ শুধুই একে অন্যের দোষারোপ করে; মানুষ আত্মপ্রশংসায় হয় পঞ্চমুখ এবং অন্যের দোষ ও অপবাদ উচ্চ রবে মাইকের যান্ত্রিক নলটি সামনে নিয়ে ছড়িয়ে দেয় আকাশে-বাতাসে। আরও আছে কৌশলগত পাপ, তথা কলমের খোঁচায় বা মাস্তান দলের ধমকের শাণিত কৃপাণে অর্থ চুরি, সুনাম চুরি, সম্পদ চুরি, ইজ্জত চুরি, বিদ্যা চুরি, এমনকি ভোট চুরি, আরও কত কি! বাংলাদেশের পাপে আরও আছে যুবসমাজে এমনকি বয়স্কদের মাঝে অনৈতিক কার্যকলাপ: ধর্ষণ, হত্যা, ঝগড়া, মারামারি, মালিকের লোভের চাপ ও তার পাপের ভারে লঞ্চডুবি, কত কাঙালের ধন করে ধনী ও বিত্তবান চুরি। অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে আরও দৃশ্যমান আজ: আকাশ-সংস্কৃতির কুপ্রভাব, পর্নোগ্রাফি, মাদকাসক্তি, গুরুজনের প্রতি অভক্তি, আরও অনেক কিছু। যিশুর শত্রুরা যিশুকে ক্রুশে বিদ্ধ করেছিল। বাংলাদেশের মানুষের লোমহর্ষক এই পাপগুলো যেন আজও যিশুকে নিষ্ঠুর-নির্মমভাবেই ক্রুশে বিদ্ধ করে। যিশুর ক্রুশ বারবার বলছে: বাংলাদেশের মানুষ এই ধ্বংসাত্মক পাপের পথ ছেড়ে ফিরে আসো। এ কাজ বড়ই কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। প্রয়োজন, আবারও বলি, আত্মমূল্যায়ন, নিজের দোষ স্বীকার; তবেই হবে পুনর্মিলন। গুড ফ্রাইডের বাণীর আলোকে রাজনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা, ধর্মীয়—সব অঙ্গনের মানুষগুলোকেই আত্মমূল্যায়ন করতে হয়, পাপের জন্য অনুতাপ করতে হয়, পাপে মৃত্যুবরণ করতে হয়। এ কাজ কঠিন, কেননা অবস্থা খুবই শোচনীয়। তবুও সময় আছে, সুযোগ আছে। নিজ জীবনে, পরিবারে, সমাজে ও বিশেষভাবে রাজনৈতিক জীবন ও অঙ্গনে আত্মশুদ্ধি ও পুনর্মিলন ঘটানোর সময় আছে সব সময়ই। তবে বাংলাদেশের জন্য তা হয়ে উঠেছে অত্যন্ত জরুরি।
ইস্টার বা পুনরুত্থান হয়েছে বলেই যিশু দ্বারা সাধিত পরিত্রাণকাজ পূর্ণতা লাভ করেছে। পুনরুত্থান এনেছে নতুন জীবন। কবর নয়, সমাধি নয়, যিশু পুনরুত্থিত হয়ে এনেছেন নতুন জীবন। বাংলাদেশের মানুষের জন্য পাপের কবর থেকে ওঠা আজ একটি জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মানুষই যেন আজ পাপের কবরে থাকতেই ভালোবাসছে। অনুধাবন করতেই পারছে না যে তারা পাপের দুর্গন্ধময় বস্তিতেই পড়ে আছে। বাইরের চেহারা আর পোশাক-আশাক যতই সুদর্শনীয় হোক না কেন, এরা যে পাপের কবরেই পচে যাচ্ছে! এরা যে চোখ থাকতেও অন্ধ। বাংলাদেশের এমন মানুষ হতে পারে আমরা সবাই। যিশুর সঙ্গে আমরা নতুন জীবনে পুনরুত্থান করতে পারি। আর তখন দেখা যাবে এক মহাবিবর্তন, আমূল পরিবর্তন, নতুনের উজ্জ্বলতা, বসন্তের নতুন শোভা। পুনরুত্থিত এমন জীবনে থাকবে: প্রেমপ্রীতি, ক্ষমা, ভালোবাসা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক ভালো কাজের স্বীকৃতি, একসঙ্গে কাজ করার প্রবণতা। এমন নতুন জীবনে থাকবে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সত্য-সততা, স্বচ্ছতা সব কাজেই। এমন জীবনই পুনরুত্থিত জীবন। এমন জীবন, পরিবার, সমাজ ও দেশেই প্রকৃত ইস্টার, প্রকৃত পুনরুত্থান মহোৎসব।
আসলে গুড ফ্রাইডে বা পুণ্য শুক্রবার এবং ইস্টার সানডে বা পুনরুত্থান (পাস্কা) রোববারের মধ্যে রয়েছে এক ধর্মীয় ও একান্ত বাস্তববাদী সম্পর্ক। সে জন্যই এই দুটো দিনের আহ্বান বড় কঠিন আহ্বান, রূঢ় আহ্বান: একটি পাপে মরতে বলে, অপরটি পুণ্যে নবজীবনে পুনরুত্থিত হতে বলে। আসুন বাংলাদেশের আমরা সবাই হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—আমরা সবাই গুড ফ্রাইডে ও ইস্টার সানডের আহ্বানে বাস্তবভাবেই সাড়া দিই। হ্যাপি ইস্টার, শুভ পাস্কা!!
 ফাদার প্যাট্রিক গমেজ: ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও চ্যান্সেলর, রাজশাহী ক্যাথলিক ধর্মপ্রদেশ, বিশপ ভবন, রাজশাহী।

No comments

Powered by Blogger.