কালান্তরের কড়চা-সোহেল তাজ-নাটকের যবনিকাপাত কবে? by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আমি যতদূর জানি, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দুজনেই নাটক দেখতে ভালোবাসেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনরত শেখ হাসিনা বর্তমানে তাঁর শত ব্যস্ততার জন্য হয়তো নাটক দেখার তেমন সময় আর পান না। কিন্তু ছোট বোন শেখ রেহানা সময় ও সুযোগ পেলেই ছেলেমেয়েদের নিয়ে নাটক দেখেন বলে শুনেছি।


গত ৭ ও ৮ মে লন্ডনে শেকসপিয়রের গ্লোব থিয়েটারে নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় তাঁর দ্বারা রূপান্তরিত টেমপেস্ট নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে। এই নাটকের সম্পূর্ণ রূপান্তর এবং যাত্রার ঢংয়ে নব আঙ্গিকে তাঁর পরিবেশনা বিস্ময়বিমুগ্ধ দর্শকরা উপভোগ করেছেন। দর্শকদের মধ্যে সাদা দর্শকের সংখ্যাও ছিল অগণিত। তাদের হাততালিতেও মুখরিত ছিল প্রেক্ষাগৃহ।
৭ তারিখে শেখ রেহানা এই নাটক দেখতে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর দুই কন্যা- টিউলিপ ও রূপন্তি। এই নাটক দেখে শেখ রেহানা বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়েছেন এবং একটি দারুণ মন্তব্য করেছেন বলে শুনেছি। তিনি বলেছেন, 'নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর মতো আমাদের দেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা তাঁদের সৃজনশীল প্রতিভা দিয়ে বহির্বিশ্বে জাতীয় মর্যাদা সমুচ্চ করে তোলেন। কিন্তু রাজনীতিকরা সেটা মাটিতে মিশিয়ে দেন।' আমি নিজের কানে কথাটা শুনিনি। কিন্তু এমন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে খবরটা পেয়েছি, যাতে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মন্তব্যটি শেখ রেহানারই। এমন একটি মন্তব্যের জন্য শেখ রেহানাকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন।
এবার আসি আসল কথায়। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর টেমপেস্ট অবশ্যই দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মান উন্নত করেছে, যে উন্নতি নিয়ে আমরা গর্ববোধ করতে পারি। কিন্তু দেশের ভেতরে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা দিনের পর দিন যে রাজনৈতিক নাটকের মহড়া দিয়ে চলেছেন, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়োগান্ত ও মর্মান্তিক এবং যা দেশটির মুখে ক্রমাগত কালিমা লেপে দিচ্ছে।
কত নাটকের কথা বলব! সাম্প্রতিক দুটি প্রধান নাটকের কথাই বলি। একটি ইলিয়াস আলী অন্তর্ধান বা অপহরণ রহস্য-নাটক এবং অন্যটি সোহেল তাজ পদত্যাগ-নাটক। প্রথমটি ট্র্যাজিক এবং দ্বিতীয়টি এখন পর্যন্ত কমিক নাটক। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতানেত্রীরা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর চেয়েও কত বড় নাট্যকার, এই দুটি ট্র্যাজিক ও কমিক নাটক তার প্রমাণ। ইলিয়াস আলী অপহরণের রহস্য-নাটক নিয়ে আমি একাধিক লেখা লিখেছি। আজ সোহেল তাজ ড্রামা নিয়ে কিছু লিখতে চাই।
সোহেল তাজ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বদানকারী প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র। সম্ভবত তাঁর পুত্র হওয়াটাই সোহেলের ভাগ্যকে ক্রমাগত বিড়ম্বিত করে তুলেছে। তাজউদ্দীন আহমদকে আমি গ্রিক ট্রাজেডির একজন বাঙালি হিরো মনে করি। কোনো দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যিনি প্রধান নেতা, তাঁর প্রায় সমমর্যাদার দ্বিতীয় নেতার ভাগ্যে পরবর্তীকালে কী ঘটে, তা আমরা ইতিহাসে দেখেছি। নব্য তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্ক তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আনোয়ার পাশাকে মাথা তুলতে দেননি। নব্য তুরস্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনোয়ার পাশা গুরুত্ব হারান। ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন হওয়ার পর বাংকার্নো বা সুকর্নের সহযোগী সুলতান শাহরিয়ারের পরিণতির কথা আমরা জানি।
বাংলাদেশের তাজউদ্দীনের ভাগ্যের সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় প্রধান নেতা খালেদ আব্বাস। এই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা বেন বেল্লা স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতেই বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর মতো ফরাসিদের দ্বারা আটক ও কারাবন্দি হন। দেশটি স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি কারাবন্দি ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে 'মারদেকা' বা স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন খালেদ আব্বাস এবং তাঁর নেতৃত্বেই প্রবাসী স্বাধীন আলজেরিয়া সরকার (মুজিবনগর সরকারের মতো) গঠিত হয়। বেন বেল্লার প্রতি অকৃত্রিম আনুগত্য বজায় রেখে খালেদ আব্বাস ছয় বছর যাবত এই সরকারের নেতৃত্ব দেন।
তারপর আলজেরিয়া ফরাসি শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হলো। বেন বেল্লা ফরাসি কারাগার থেকে ফিরে এসে সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। খালেদ আব্বাস শুধু সরকার থেকে অপসারিত হলেন না, তিনি আলজেরিয়ার ইতিহাস থেকেও মুছে গেলেন। ইন্দোনেশিয়াতেও প্রেসিডেন্ট সুকর্নের পতনের পরও তাঁর কন্যা মেঘবতী দেশটির সরকারপ্রধান হয়েছেন, কিন্তু সুকর্নের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান সহযোগীদের নামগন্ধ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও দ্বিতীয় প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এর কোনো ব্যতিক্রম নন। ৯ মাস তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী সরকারে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী এই নেতার ভাগ্য বিপর্যয় শুরু হয়। তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বিরোধের বানানো গল্প ছড়ানো শুরু হয়। রাজনীতি থেকে প্রায় অঘোষিতভাবে সরে গিয়েও তিনি অপবাদ ও অপপ্রচার থেকে মুক্ত হতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তাঁকে প্রমাণ করতে হয়েছে, তিনি বঙ্গবন্ধুর কত বড় অনুসারী ছিলেন। তার পরও তাঁর চরিত্র হনন-চেষ্টার অবসান হয়নি।
তাজউদ্দীন আহমদের এই ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের লেগাসিই সম্ভবত বহন করছে তাঁর পরিবার এবং এখন তাঁর পুত্র সোহেল তাজ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভায় তাজউদ্দীন আহমদের ভাই আফসার উদ্দীন আহমদকে গ্রহণ করা হয়েছিল। বেশি দিন তিনি মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেননি। যে কারণে তাঁকে মন্ত্রিপদ ত্যাগ করতে হয়েছিল, সে কারণে একজন মন্ত্রীকে সতর্ক করা যায় মাত্র। সরাসরি তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রয়োজন কতটুকু ছিল, তা এখনো বিতর্কের বিষয়।
শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বা বর্তমান মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র সোহেল তাজ। পূর্ণমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী। বেশি দিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তাঁকে মন্ত্রিত্বের লোভনীয় পদ আত্মসম্মান রক্ষার স্বার্থে ত্যাগ করতে হয়েছে। এই পদত্যাগের কারণটি এখন ওপেন-সিক্রেট। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়ে আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য সোহেল তাজ পিতার উপযুক্ত সন্তানের ভূমিকাই নিয়েছিলেন বলে অনেকের ধারণা।
সে যাই হোক, যে কারণেই সোহেল তাজ পদত্যাগ করে থাকুন না কেন, তাঁর এই পদত্যাগ নিয়ে সরকার দীর্ঘকাল ধরে যে রহস্যঘন কমিক নাটকটির মঞ্চায়ন করে চলেছে, তা কি দর্শকরূপী জনগণকে আনন্দ দিচ্ছে, না বিরক্তির শেষসীমায় নিয়ে যাচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক দেশে একজন মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এভাবে কোনো পদে আটকে রাখা যায়, তার স্বাধীন ইচ্ছার অবমাননা করা যায়, তা ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয়।
২০০৯ সালের ৩১ মে সোহেল তাজ নাটকের মঞ্চে যবনিকা উত্তোলিত হয়। তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়ে তখন দপ্তরহীন মন্ত্রী। তিনি এই পদে ইস্তফা দেন। এর পর ওই বছরের ১ জুন তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠান। তারপর প্রায় তিন বছর কেটে যেতে চলেছে। সোহেল তাজের অবস্থা এখন ত্রিশঙ্কু মহারাজের মতো। তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং তিনি গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তাঁর অ্যাকাউন্টে বেতন-ভাতা ইত্যাদি জমা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে সোহেল তাজ বলেছেন, '২০০৯ সালের ৩১ মে পদত্যাগ করার পরও এখন পর্যন্ত তা গেজেট নোটিফিকেশন করা হয়নি, যা সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও আমার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা ছাড়াও এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।'
সোহেল তাজ বর্তমান ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে মেরিল্যান্ডের বাসিন্দা। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে যা কাণ্ডকারখানা ঘটানো হয়েছে তা আবু হোসেনি উপকথাকেও হার মানায়। তিনি বলেছেন, 'মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আমার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠানো প্রতিমন্ত্রীর মাসিক বেতন-ভাতা ইত্যাদি কোনোভাবেই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ও কাম্য হতে পারে না। এই অর্থ ফেরত নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো কিছুই করা হচ্ছে না।'
গত বছর ২৭ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে এলে ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর প্রোটেকল দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তাঁর জন্য নির্ধারিত সরকারি গাড়িতেও চড়েননি। তবু তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ির আগে-পিছে পুলিশের দুটি গাড়ি ছিল। জাতীয় সংসদের পতাকাবাহী গাড়িও তাঁকে অনুসরণ করে। পরে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকা গাজীপুরের কাপাসিয়ায় গেলেও তাঁকে প্রোটকল দেওয়া হয়। তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে গত ২৬ এপ্রিল তিনি সংসদ সদস্যপদেও ইস্তফা দিতে চেয়ে স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠান। তারও কোনো সুরাহা নেই। কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এই ধরনের কার্যকলাপ কোনো সরকার চালাতে পারে? আমাকে ঢাকার এক আইনজীবী বন্ধু ঠাট্টা করে বলেছেন, এটা তো একবারে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে আটকে রাখার মতো গর্হিত অপরাধ। এটা এক ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সোহেল তাজ ইচ্ছা করলে হিউম্যান রাইটসের বিশ্ব আদালতে যেতে পারেন।
আমায় ঢাকায় অবস্থানের সময় সোহেল তাজের সংসদ থেকেও পদত্যাগের ইচ্ছায় সরকারের বাধাদানের অথবা তা বিলম্বিতকরণের অভিপ্রায় সম্পর্কে কেউ কেউ বলেছেন, সোহেল তাজ পদত্যাগ করলে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় জাতীয় সংসদের সদস্যপদ শূন্য হবে এবং ওই শূন্য আসনে উপনির্বাচন দিলে সরকারি দলের পরাজয় অনিবার্য, এ কথা জেনেই সংসদ থেকে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণে এই টালবাহানা।
এই টালবাহানা যে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে না, তার জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে না, বরং এই কমিক নাটক বর্তমান সরকারের জন্য ট্র্যাজিক পরিণতি বহন করে আনতে পারে, এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার দিকেই আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের দৃষ্টি আমি আকর্ষণ করতে চাই। জোর করে যেমন ভালোবাসা আদায় করা যায় না, তেমনি কারো সমর্থনও আদায় করা যায় না। যেকোনো কারণেই হোক, সোহেল তাজ এই সরকারে থাকা, সংসদ সদস্য পদে থাকা বাঞ্ছনীয় মনে করছেন না। তাঁর এই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে সরকারের উচিত নিজের সম্মান পুনরুদ্ধার করা। তারা যেটা পারে, তা হলো সোহেল তাজ যাতে স্বেচ্ছায় তাঁর সম্মান ও সততা নিয়ে মন্ত্রিপরিষদে ফিরে আসতে পারেন এবং সংসদেও থাকতে পারেন, তার পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। তা না করে বছরের পর বছর এই কমিক নাটক চালিয়ে যাওয়া একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার সহায়ক নয়। এই নাটকের যবনিকাপাত অবিলম্বে প্রয়োজন।
লন্ডন, ১৪ মে, সোমবার, ২০১২

No comments

Powered by Blogger.