সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-পাকিস্তানের পারমাণবিক স্ফীতি by এম আবদুল হাফিজ

এখনও কেউ বা কোনো মহল পারমাণবিক অস্ত্র সন্ত্রাসী হাতে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে অনিচ্ছুক_ এমনই তার বিকর্ষণ ক্ষমতা! তবে পারমাণবিক বোমা পাকিস্তানকে খানিকটা কূটনৈতিক অনাসক্তি দেয়। আফটার অল আর যা-ই হোক নিউক অবশ্যই একটি মূল্যবান রাজনৈতিক হাতিয়ার


এমনকি স্বাভাবিক সময়েও সংশ্লিষ্টরা পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আতঙ্কে থাকে। কিন্তু এখন তো সময় শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বিপজ্জনকও বটে। ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে টানাপড়েন যখন তুঙ্গে, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অস্ত্র উৎপাদন দ্রুত অগ্রসরমাণ। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ইসলামাবাদ থেকে ১৪০ মাইল দক্ষিণের খুসাব পারমাণবিক কেন্দ্রটির কাজ সমাপ্তপ্রায়। পাকিস্তানের পরমাণু সংক্রান্ত তৎপরতায় এটা স্পষ্ট যে, দেশের চতুর্থ পারমাণবিক চুলি্লটি সত্বরই প্লুটোনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম হবে।
দি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির পল ব্রানানের মতে, পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সেখানকার কর্মসূচি লক্ষণীয়। কিন্তু না যুক্তরাষ্ট্রে, না পাকিস্তানে এ নিয়ে কেউ কোনো মন্তব্য করছে। সেটাই বিভ্রান্তিকর। সবাই জানে এবং এ নিয়ে তুমুল বাক্য বিনিময় হয় যে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে বা উত্তর কোরিয়া প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করলেও তার পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের ক্ষমতা এখনও অর্জিত হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় বাস্তবতা অন্যরকম। অস্ত্র নির্মাণের ক্ষমতাসহ তার পারমাণবিক কর্মসূচি কিন্তু থেমে নেই।
জর্জ বুশ প্রশাসনের প্রতিরক্ষা আন্ডার সেক্রেটারি এরিক এডেলমান সোজাসাপ্টা বলেছেন যে, পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জনে পাকিস্তানের অবস্থান এখন ফ্রান্সের সমান এবং পাকিস্তান একপর্যায়ে তাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের পারমাণবিক প্রস্তুতি ভারতীয় হুমকির প্রত্যুত্তর। ভারত আগামী পাঁচ বছরে সামরিক খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে যাচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রস্তুতি শুধু ভারত-পাকিস্তানের ব্যাপার বললে তা বাস্তবতাবর্জিত হবে। এ কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাবেক সিনেটর, যিনি একসময় নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভে পৌরোহিত্য করেছিলেন। তার উক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ৪০ বছরের স্নায়ুযুদ্ধকালে। যখনই তাদের মধ্যে বিপজ্জনক পরিস্থিতি এসেছে, তারা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পিছু হটেছে।
ভারত-পাকিস্তানও কিন্তু বেশ কয়েকবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও তা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন অস্ত্র দেখিয়ে শত্রুকে নিবৃত্ত করার কৌশল (উবঃবৎৎবহপব) মৌলিকভাবেই বদলে গিয়েছে এবং এই বদলে যাওয়ায় সারাবিশ্বই ঝুঁকিতে। এটা মারাত্মকভাবে একটি মহাবিপদের উৎপত্তি ঘটিয়েছে। এটা অবশ্যই এমনই এক বিপদের বার্তা বহন করে যে, পাকিস্তান পারমাণবিক বোমার উপকরণগুলো একাধারে জমা করছে।
ইসলামাবাদ তার ভৌগোলিক সীমান্তের মধ্যেই ইউরেনিয়ামের সন্ধান করতে পারে, যার সম্ভাবনাও বিপুল। তা ছাড়া পাকিস্তানে কয়েক যুগের সমৃদ্ধকরণের অভিজ্ঞতাও আছে, যার সূচনা হয়েছিল কাহুটায় ড. খানের গবেষণালয় থেকে। সুতরাং পাকিস্তানের অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতাও তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও হোয়াইট হাউস এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একজন সিনিয়র কংগ্রেসনাল কর্মকর্তা, যিনি নিউক্লিয়ার ইস্যুতে কাজ করেছেন তিনি বলেন, গোয়েন্দাদের অনুমান অনুযায়ী পাকিস্তান ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল মজুদ করেছে, যা দিয়ে অন্তত একশ'টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। তা ছাড়া এতে করে বছরে আট থেকে বিশটি এমন অস্ত্র তৈরি হতে পারে। উলি্লখিত কর্মকর্তা আরও বলেন, পাকিস্তান যে দ্রুত সম্প্রসারণশীল একটি পারমাণবিক শক্তি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বিশ্বনেতাদের উৎকণ্ঠা অরক্ষিত বা দায়সারাভাবে সুরক্ষিত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে, যেগুলো আজকাল 'খড়ড়ংব হঁশবং' নামেও পরিচিত। আসলে এই উৎকণ্ঠার উৎস হলো উলি্লখিত অস্ত্রগুলোর অনিয়ন্ত্রিত হাতে পড়ার ভয়। মনসুর ইজাজ যিনি একসময় ইসলামাবাদে দিলি্লর 'ব্যাক চ্যানেল' কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তার উক্তিতে : কীভাবে আমাদের দু'দেশে পারমাণবিক অস্ত্র রাখা বা স্থানান্তর করা হয় তার কোনো স্বচ্ছতা নেই। বিশেষ করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দানা বাঁধে অস্ত্রগুলোর সংখ্যাধিক্যের কারণে।
ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার আগে একটি সামরিক গ্যারিসনে তার আবাস ছিল এবং কেউ জানে না কত প্রকারে কত লোক সেখানে আসত। তা ছাড়াও এমন একটি রাষ্ট্রে পারমাণবিক অস্ত্রের ছড়াছড়িতে সঙ্গতভাবেই অস্বস্তিতে থাকে সংশ্লিষ্ট সবাই। এমন একটি রাষ্ট্রে এত পারমাণবিক অস্ত্র যেখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ লস্কর-ই-তৈয়বার মতো দুর্ধর্ষ জঙ্গি গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের উপস্থিতি বিদ্যমান অস্বস্তিকে শুধু বৃদ্ধিই করবে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তির বিস্তৃতি ও ব্যাপকতায় সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একজন ডিরেক্টর শ্যারন স্কুয়াসনির মন্তব্য উল্লেখ্য। তার কথায়, 'আমাদের সামনে এখন এক মহাবিপর্যয় ঘটার অপেক্ষায় আছে।'
কিন্তু এখনও কেউ বা কোনো মহল পারমাণবিক অস্ত্র সন্ত্রাসী হাতে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে অনিচ্ছুক_ এমনই তার বিকর্ষণ ক্ষমতা! তবে পারমাণবিক বোমা পাকিস্তানকে খানিকটা কূটনৈতিক অনাসক্তি দেয়। আফটার অল আর যা-ই হোক নিউক অবশ্যই একটি মূল্যবান রাজনৈতিক হাতিয়ার এবং তা আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিশ্চিত করে। পাকিস্তান এও জানে যে, পাশ্চাত্যের কাছে পাকিস্তান পতনের মাশুল মহার্ঘ হবে। তাই কোনো না কোনো আঙ্গিকে বিপদে-বিপর্যয়ে একটি বেইল আউট আসবেই। পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার এবং পদার্থবিজ্ঞানী পারভেজ হুদভয়ের উক্তিতে, 'সেদিক দিয়ে আমরা সফল।'

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস
ও কলাম লেখক
 

No comments

Powered by Blogger.