প্রত্যাশা ও প্রতিদান by আসিফ আহমদ

বাজেট আসছে আগামীকাল। অনেক অনেক বছর শুনেছি, বাজেট মানেই দুর্ভোগ। অর্থমন্ত্রী হেন দ্রব্য নেই, যার ওপর কর আরোপের সুপারিশ করতেন না। এখন অনেকে পোস্টকার্ড-এনভেলপের নাম ভুলে গেছেন। এ লেখার পাঠকরা চিঠি লেখার জন্য পোস্টকার্ডের ব্যবহার করেছেন বলে মনে করতে পারেন কি?


আমি একটি পোস্টকার্ড বাসায় যত্নের সঙ্গে রেখে দিয়েছি অ্যান্টিকস হিসেবে। এক সময়ে পাঁচ পয়সায় (নাকি আরও কম ছিল!) মিলত এ দ্রব্য। ক্রমে দাম বেড়ে ২ টাকায় ওঠে (নাকি ভিন্ন কিছু!)। বাজেটে পোস্টকার্ডের দাম প্রতি বছর বাড়ত। বিড়ির দাম থেকে শুরু করে রেল-বিমান ভাড়া, বিদেশ যাত্রার ট্যাক্স, জমির ট্যাক্স, টেলিফোন-বিদ্যুৎ-পানির চার্জ, কসমেটিকসসহ হেন পণ্য-সেবা কমই মিলত, যা বাড়তি করের আওতায় আসত না। কিন্তু এখন অর্থমন্ত্রীরা অনেক বুদ্ধিমান। তারা সংসদে বাজেট পেশ করেন ও পাস করান, কিন্তু ট্যাক্স-চার্জ-মাশুল বাড়ানোর কাজটি করেন সংসদের বাইরে। সামরিক শাসকরা সংসদে বাজেট পেশ করতেন না। তারা এ সময়ে ডাকতেন গণ্যমান্যদের। আর বেতার-টিভিতে অর্থমন্ত্রীর ভাষণ সরাসরি প্রচার হতো। শুল্ককর বাড়লে জনগণের ক্ষোভ-রোষ হতো, সেটা তারা জানতেন। কিন্তু ডাণ্ডা মেরে সব ঠাণ্ডা করার বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে তারা চলতেন। এ কাজে কখনও কখনও সফল হতেন বৈকি।
বাজেট এলে নানা মহল থেকে দাবির বহর আসতে থাকে। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা দাবি তোলেন শুল্ককরের হার কমানোর জন্য। হরলিকস বা এ ধরনের সামগ্রীকে জীবন রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরে তার ওপর আমদানি শুল্ক শূন্য হারে নির্ধারণের দাবি ওঠে। যারা গুলশান-বনানী-বারিধারার ভবনে উন্নত মানের ফিটিংস বসাতে চান, তারা এসবের আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি তোলেন। একবার শীর্ষ ব্যবসায়ীদের দাবির বহর শুনে একজন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আপনারা প্রচলিত হারের চেয়ে কর-শুল্ক কমানোর যে দাবি পেশ করেছেন তা পূরণ করতে হলে আমাকে শূন্য অর্থ নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
বাজেটে যেমন শুল্ককর কমানোর দাবি থাকে, তেমনি থাকে নতুন নতুন সুবিধা সৃষ্টি এবং আগের সুবিধা বাড়ানোর দাবি। কেউ নতুন রাস্তা করার দাবি তোলেন, কেউবা বলেন ভাঙা রাস্তা মেরামত করার কথা। স্কুল-হাসপাতালের দাবি আসে। বিনিয়োগের হাজারো দাবি আসে এ সময়ে। সেচ প্রকল্প থেকে নদী খনন, নতুন গ্যাস খনি চালু, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ_ কতই না দাবি। খেলাধুলা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে_ এটা এখন জনপ্রিয় দাবি। সব দাবি একত্র করলে অর্থমন্ত্রীকে মাথার চুল ছিঁড়তে হয় বৈকি। সম্ভবত এসব কারণেই অর্থমন্ত্রীকে অশেষ ধৈর্যশীল হতে হয়। তাকে কেউ কিছু দিতে চায় না। সবাই কেবল নিতে চায়। শুধু তাতেই শেষ হয় না। সমালোচনার তীক্ষষ্ট বাণ নিয়ে অনেকেই থাকেন প্রস্তুত। বাজেট পেশের পর বিরোধীরা রাজপথে নামে 'গণবিরোধী বাজেট' মানি না স্লোগান তুলে। সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়বে, এমন পদক্ষেপ নিয়েও তিনি রেহাই পেয়ে যান। তাদের উপেক্ষা করলেও চলে। কিন্তু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের উপেক্ষা করা চলে না। কারণ সংসদে যে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা যেটা বলবেন সেটা মানা না হলে কলকাঠি নাড়িয়ে দেশে ঝামেলা পাকানোর ক্ষমতা তাদের যথেষ্টই রয়েছে। দলেও তারা যে অনেক শক্তিশালী। এক সময়ে ব্যবসায়ীরা বড় দলগুলোকে চাঁদা দিয়েই নিজেদের কর্তব্য সম্পাদিত হয়েছে বলে মনে করতেন। এখন তারা সরাসরি ময়দানে। তারা দলকে কেবল অর্থ দেন না, এমপি হতে চান। সবুজ পতাকা ওড়ানো গাড়ি চান। সংসদ চলাকালে সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগ আসন শূন্য থাকে। তারা জানেন, সেখানে তাদের তেমন কিছু করার নেই। বরং তাদের জন্য অনেক কিছু করার রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। তারা জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন না করলেও তাদের প্রাপ্যটা ঠিকই বুঝিয়ে দেবেন অর্থমন্ত্রী। তাদের ক্ষমতা যে সীমাহীন!
 

No comments

Powered by Blogger.