নিপীড়িত নারী-সুবিচারবঞ্চিত নারীর আত্মহনন আর নয় by সালমা খান

খবরের কাগজের পাতা খুলতেই গ্রামে-গঞ্জে-শহরে অব্যাহত নারী নির্যাতনের ঘটনায় সমাজ অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও সাম্প্রতিককালের ঘটে যাওয়া নির্যাতনের শিকার মায়েদের শিশুসহ আত্মহত্যা—বিষপান, গায়ে আগুন জ্বালানো বা ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়া—এসব সহ্য করার মতো সঠিক মানসিক নির্লিপ্ততা আশা করি এখনো আমাদের হয়নি।


সে কারণেই পত্রপত্রিকা এবং টিভি টক-শোতে হঠাৎ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে পুরুষশাসিত সমাজে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়টি। বহু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, বক্তারা এই প্রথম অনুভব করলেন আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের নিগূঢ় হালচিত্র। যদিও পরিবার বা সমাজের দুঃসহ নির্যাতন ও অপমানের প্রতিকার না পেয়ে প্রায় শিশু-কিশোরী থেকে গৃহবধূরা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল একক নারীর প্রতিবাদের ভাষা এবং তা সমাজকে নাড়া দিলেও পুকুরের স্থির জলে বুদ্বুদের মতো যথাসময়ে আবার মিলিয়ে গেছে।
নারীরা এ দেশে যুগ যুগ ধরে নিগৃহীত ও নির্যাতিত, এমনকি মৃত্যুও বরণ করেছে স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকজন বা সমাজপতিদের হাতে, যা দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত রয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রশাসনের কাছে। থানা-পুলিশ করে দুর্ভোগ ছাড়া সুফল পাওয়া যাবে না—এমন ধারণা থেকে সৃষ্ট আস্থাহীনতার কারণে ভুক্তভোগীরা অধিকাংশ সময়ে আর উচ্চবাচ্চ্য করেনি বিধায় গণমাধ্যমেও এসব খবরের পূর্ণ প্রতিফলন ছিল না। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে যখন নারী আন্দোলনের উদ্যোগে এনজিও, মানবাধিকার গবেষণা সংস্থাগুলো স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নারীর প্রতি সহিংসতার ওপর তথ্য সংগ্রহ আরম্ভ করে, তখনই প্রথম এ সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপকতা আমাদের বিচলিত করে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন, নতুন আইন প্রণয়ন এবং সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো বিস্তৃত করার বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। যুগান্তকারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং নারীকে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন পরিগৃহীত হয় ২০০০ সালে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ও সহায়ক সেবা প্রদানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তার অফিস খোলা, ভিকটিম নারীকে আইনগত সহায়তা প্রদান, কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং নিরাপদ আবাসন প্রদানসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা আইনে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ না থাকায় এত বছরেও নারী ও শিশু নির্যাতনের সার্বিক পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। উপরন্তু দেখা যাচ্ছে, নির্যাতন প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণ তথা নারী আস্থাহীন হয়ে পড়ছে। নির্যাতিতের পক্ষ থেকে পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারীর সামাজিক প্রভাব বা রাজনৈতিক আনুকূল্যে অভিযোগ টেকে না। উপরন্তু প্রতিবাদের ধৃষ্টতার কারণে ভিকটিম ও তার পরিবারকে বাড়তি শাসানি ও দুর্ভোগের শিকার হতে হয়।
বাস্তবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হলে বিদ্যমান আইনগুলো পরীক্ষা করে সেগুলো সময়োপযোগী করে তুলতে হবে, প্রতি ক্ষেত্রে যথাযথ অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং জনসাধারণ্যে বিশেষভাবে স্কুল-কলেজে এবং নারীর কর্মক্ষেত্রে এসব আইনের ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) ও শিশু অধিকার সনদ পরিগ্রহণ করেছে। উভয় সনদেই পারিবারিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইনি নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত নারী ও শিশুকে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা প্রদানে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করা হয়েছে।
নারী নির্যাতন মূলত একটি সামাজিক সমস্যা, তাই শুধু আইন-আদালতের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব নয়। নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা সৃষ্টি হয় দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের মাধ্যমে—যার মূল বাহক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা ও পূর্ণ লিঙ্গ-সমতায় বিশ্বাসী পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশের শক্তিশালী নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সর্বস্তরের সামাজিক প্রতিরোধ শক্তি, যাতে অচিরেই এ অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জনমত সৃষ্টি হয়।


গ্রামে বা শহরে, বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে বা গৃহাভ্যন্তরে, নিম্নবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সর্বত্রই নারীর নিরাপত্তাহীনতা যে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, সাম্প্রতিক আত্মহননের ঘটনাগুলোই তার প্রমাণ। আইনি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সামাজিক প্রতিরোধ শক্তির নিষ্ক্রিয়তাই এই ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী—এ কথা আমাদের স্বীকার করতে হবে।
একজন নির্যাতিতের মৌলিক অধিকার হরণ রোধ করতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপর সহায়তা, তারপর ইস্যু মোকাবিলার জন্য আইনি সহায়তা। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশি সহায়তা পাওয়া নারীর জন্য সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় বিবেচনায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক এবং সেই প্রাচীর পেরিয়ে আইনের দুয়ারে পৌঁছে সুবিচার পাওয়ার প্রত্যাশা তাদের কাছে যদি হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অত্যাশ্চর্য কিছু মনে হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্প্রতি যে তিনজন নারী সন্তানসহ আত্মাহুতি দিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে যৌতুকের দাবি এবং বিনা অনুমতিতে স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ ছিল মূল কারণ। বাংলাদেশের যৌতুক বিরোধ আইন ১৯৮০-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ‘যৌতুক দাবি করলে সর্বাধিক পাঁচ বৎসর এবং এক বৎসরের নিম্নে নহে, মেয়াদে কারাদণ্ড বা জরিমানা উভয়বিধ প্রকারে দণ্ডনীয় হইবে’ এবং এই অপরাধ জামিন অযোগ্য। বিদ্যমান মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) ১৯৭৫ আইনের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিবাহে ইচ্ছুক ব্যক্তির ‘কোনো স্ত্রী বর্তমান আছে কি না এবং থাকিলে অন্য বিবাহে আবদ্ধ হইবার জন্য বর ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অর্ডিনেন্স মোতাবেক সালিশী পরিষদের অনুমতিপত্র আছে কি না’ এবং ওই পত্রের নম্বর ও তারিখ নিশ্চিত করার পরই ওই ব্যক্তির বিবাহ পড়ানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রিকৃত কাজি ব্যতীত অন্য কারও দ্বারা বিবাহ পড়ানো বৈধ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত নয় এবং রেজিস্ট্রিকৃত কাজি এই বিধি লঙ্ঘন করলে তাঁর লাইসেন্স বাতিলসহ অন্য শান্তির বিধান থাকা উচিত। কিন্তু কার্যত আমাদের দেশে যেকোনো পুরুষ যেকোনো মৌলভির কাছে গিয়ে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পাঁচ মিনিটেই সমাধা করতে পারেন। অনুরূপভাবে যৌতুক না পেয়ে স্বামী মৌখিকভাবে ‘তালাক’ উচ্চারণ করে বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুদায়িত্ব স্খলন করতে পারেন তিন মিনিটেই। উভয়ই বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী। তাই বিবাহিত নারী ও তার সন্তানের পারিবারিক নিরাপত্তার কাচের দেয়ালটি নিমিষেই ভেঙে পড়তে পারে। এবং তা যখন ঘটে তখন সে সামগ্রিকভাবে পরিবার, সমাজ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ আন্থাহীন হয়ে পড়ায় তার মধ্যে এক ধরনের যুক্তিহীন প্রতিশোধ-প্রবণতা জন্মায়।
এ ধরনের সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন ও নিঃস্ব মানসিক অনুভূতিতে নিজের সন্তানকেই সে একমাত্র পজেশন বা অধিকৃত বস্তু হিসেবে গণ্য করে বলে তাকে আত্মহননের সঙ্গী করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার অবর্তমানে সন্তানের দেখাশোনা কে করবে এ মনোভাবটা প্রচ্ছন্ন থাকলেও মূলত তার অধিকৃত বস্তু সে অন্য কাউকে বিশেষত স্বামীর হাতে তুলে দেবে না—এই মনোভাব থেকেই কোনো মায়ের পক্ষে এত নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব বলে মনে হয়।


নারী নির্যাতন এবং তৎসংশ্লিষ্ট কারণগুলো প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ১৪টি আইন রয়েছে। এ ছাড়া ইভ টিজিং রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা, বিভিন্ন সরকারি বিধি, প্রবিধান ও পাঁচ-ছয়টি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম রয়েছে। দেশে নারী নির্যাতন নিরোধকল্পে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মহিলা সদস্য ও স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সমন্বয়ে নারী নির্যাতন নিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এমনকি এই কমিটি কর্তৃক প্রতি মাসে নারী নির্যাতন প্রতিরোধমূলক একটি প্রতিবেদন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করারও বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিককালে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ বিলও পার্লামেন্টে উত্থাপিত হয়েছে।
তবু নারী নির্যাতন দিন দিন কেন বেড়ে চলেছে? কেন এই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে? প্রেমের ডাকে সাড়া না দেওয়া, অসামাজিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়া থেকে আরম্ভ করে যৌতুকের জন্য অব্যাহত চাপ, দ্বিতীয় বিবাহ এবং কারণে-অকারণে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে কিশোরী ও গৃহবধূ নারীরা। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্য, রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠনের প্রশ্রয়প্রাপ্ত বখাটে সন্ত্রাসীদের যৌন নিপীড়ন, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির অর্থনৈতিক লালসাপ্রসূত যৌতুকের অব্যাহত দাবি এবং বিবাহ ও তালাকসংক্রান্ত আইনের অকার্যকরতা এর মূল কারণ। যদিও দেখা যায়, দেশে এ সংক্রান্ত আইন, বিধিবিধান বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখার কোনো অভাব নেই—অভাব রয়েছে প্রচার, প্রয়োগ ও কার্যকরতার। আইনি ও বিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য যে জনবল, অর্থায়ন ও পরিবীক্ষণ প্রয়োজন, তারও অভাব সুস্পষ্ট।
আমাদের দেশের তুলনায় পাশ্চাত্যবিশ্বে বিয়ে ভাঙার ঘটনা বহু গুণ বেশি। তুচ্ছ কারণে কিংবা শুধু রুচির অমিলেও সেখানে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়, কিন্তু এ জন্য কোনো নারীকে আত্মহত্যা তো দূরের কথা, অসহায়-নিঃসম্বল হয়ে পথে বসতে হয় না। কারণ আইনের বিধানে সন্তানসহ স্ত্রীর পাওনার পাল্লাই ভারী হয়ে থাকে। বর্তমান সমাজের বাস্তবতা ও বিবাহসূত্রে জন্ম নেওয়া সন্তানের স্বার্থ সর্বোচ্চ বিবেচনায় আমাদের বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে সংশোধন আশু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রচলিত বিবাহ বিচ্ছেদ-পরবর্তী সম্পত্তি বিভাজনের উদাহরণ অনুসরণ করা যায়। যাতে বিবাহিত থাকাকালে অর্জিত সব সম্পত্তির অর্ধেক স্ত্রী পায় এবং সেই সঙ্গে যদি তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভরণপোষণের পূর্ণ দায়িত্ব বাবাকে বহন করতে হয়। অপরিকল্পিতভাবে পুনর্বিবাহ রোধে বিয়ের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের বিয়ের লাইসেন্স নেওয়ার প্রথা চালু করা যায়। মালয়েশিয়ায় এই প্রথা কঠিনভাবে প্রয়োগ করা হয়, যাতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কেউ বিয়ে করতে না পারে। লাইসেন্সপ্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণও নিশ্চিত করা যায়। আমাদের দেশে যেখানে মুদির দোকান বা হেয়ার কাটিং সেলুন খুলতেও লাইসেন্স নেওয়ার বিধি রয়েছে, সেখানে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্য সমাধায় অবশ্যই লাইসেন্সপ্রথা চালু করা যায়। যাতে খেয়ালের বসে তাৎক্ষণিকভাবে পুনর্বিবাহ বা তালাক দেওয়া সম্ভব না হয়।


যে নারী আত্মহত্যার কথা ভাবেন, সম্ভবত তিনি মনে করেন তাঁর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আস্থা ও নির্ভরতার উৎস থেকে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। নিজের জীবনের প্রতিও তাঁর কোনো মায়া-মমতা থাকে না—তাই তিনি মনে করেন আত্মাহুতিই তাঁর জন্য একমাত্র পথ। আর তাঁর সন্তান, যারা তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন, তাদের তিনি অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিতে অনিচ্ছুক, কারণ তারাই তাঁর একমাত্র পজেশন, তাই তাদেরও নিজের সঙ্গে নেওয়ার মতো চরম যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত তিনি নেন।
সাধারণত যারা সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে আত্মহত্যার কথা ভাবে, তাদের সবাই কাপুরুষ বলে। কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কি, কী অসীম আপনার সাহস, কত দৃঢ় আপনার মনোবল আর কী ত্যাগী আর স্বাধীন আপনার এ মুহূর্তের মানসিকতা? তাহলে আপনাকে দিয়ে যেকোনো যুদ্ধ জয়ই সম্ভব। আমরা সাধারণ মানুষ নিজের জীবনকে এত স্বার্থপরের মতো ভালোবাসি যে একে লালন করার জন্য কত অন্যায় ও দুর্নীতির কাছে মাথা নত করি, শুধু নিজে সুখে বেঁচে থাকার জন্য আমরা অন্যের সব কিছু, এমনকি জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে দ্বিধা করি না। কিন্তু আপনি যে এ মুহূর্তে নিজের জীবনের মোহ ত্যাগ করতে পেরেছেন, কোনো অর্থ, বিত্ত, আয়েস আপনাকে আকর্ষণ করতে পারছে না—আপনার চেয়ে শক্তিশালী, নির্মোহ ও ত্যাগী আর কে আছে! এই মাহেন্দ্রক্ষণেই তো আপনি আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন পুরোনো খোলস থেকে বেরিয়ে এসে নতুন জীবন গড়ার। যে মানুষ বহু বর্ষ-লালিত অভ্যাস-চালিত পরিচিত জীবন চিরকালের মতো ত্যাগ করার শক্তিশালী একক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার কাছে শুধু একটিই পথ থাকা সহজ, তা হলো পুরোনোকে ছেড়ে নতুন মূল্যবোধের এক জীবন সৃষ্টি করা, অর্থাৎ আপনার এ মুহূর্তে শুধু প্রয়োজন জীবনের উদ্দেশ্য পরিবর্তন। একলা চলার আত্মশক্তিকে বিকশিত করে আপনি খুঁজে নেবেন নতুন পথ, যেখানে আগের মতো পদে পদে নির্ভরতার প্রয়োজন যার অনুভূত হবে না। এ রকম শক্তিশালী ও দৃঢ়চেতা মানুষের জয় অবশ্যম্ভাবী। আর আপনার এ নতুন পথচলার সঙ্গী হবে আপনারই আত্মজা, আপনার সন্তান, যারা আপনার নবলব্ধ শক্তির উৎস। আত্ম আবিষ্কারের এই মহালগ্নে আত্মহননের মাধ্যমে এক নতুন সম্ভাবনাময় ত্যাগী প্রত্যয়কে আপনি ধ্বংস করে দিচ্ছেন কীভাবে?
আপনি এও জানেন যে একটি মায়ের কাছে তার সন্তান যত প্রিয়ই হোক, তারা আপনার অধিকৃত বস্তু নয়। প্রতিটি সন্তানই তার বহুমুখী স্বাধীন সত্তায় আপনার ভালোবাসার ধন হয়ে উঠেছে, তাই মা হিসেবে তাদের জীবনের বিকল্পগুলো খুঁজে নিতে সুযোগ দিন আর আপনার আকাঙ্ক্ষা থাকুক তারা যেন প্রণীত জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে অনন্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছাতে পারে। শত ভালোবাসাতেও তার সে সুযোগ আপনি রুদ্ধ করতে চান না। আপনার দৃঢ় মানসিকতার শক্তি ধারণ করে আপনার সফল আরব্ধ ইচ্ছেগুলো তারা বাস্তবায়িত করুক তাই তো আপনার কাম্য। বারৈইখালী উচ্চবিদ্যালয়ের সিনথিয়া যে বখাটে প্রতিরোধ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছিল, কিংবা আর্ট কলেজের ছাত্রী সিমি যে প্রকাশ্যে পাড়ার বখাটেদের আচরণের প্রতিবাদ করেছিল—তোমাদের মতো আরও অনেক কিশোরী তোমরা কেন আত্মহননের পথ বেছে নাও। যারা অন্যায় প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিতে পারে, যারা মুক্তকণ্ঠে নারীর পথচলায় বাধাদানকারী মোকাবিলা করতে পারে, তারাই তো পারে সমতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিতে। তোমরা হয়তো সমাজ ও সুশাসনের প্রতি আস্থা হারিয়েছিলে, কিন্তু আজ হোক, কাল হোক, বিবেকবান সুনাগরিকেরা তোমাদের পাশে দাঁড়াবে, তোমাদের প্রতিবাদের ঢেউ বৃহত্তর সমাজে প্রতিরোধের শক্তি গড়ে তুলবে। মনে রেখো আত্মাহুতির মাধ্যমে আমাদের সমাজে সামাজিক পরিবর্তন ও নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। সক্রিয় সামাজিক প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলতে পারলেই লিঙ্গ সমতায় উজ্জীবিত প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠবে, যাতে তোমরা দেবে নেতৃত্ব। কথা দিচ্ছি আমরা সবাই তোমাদের পাশে থাকব।
সালমা খান: নারী আন্দোলনের নেত্রী।

No comments

Powered by Blogger.