মুজাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ২১ জুন-গোলাম আযমের মামলা স্থানান্তরে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তরের পক্ষে গতকাল মঙ্গলবার যুক্তি উপস্থাপন করেছে আসামিপক্ষ। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ পরে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে।


এদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে আদেশের জন্য ২১ জুন দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-২।
গতকাল আসামির কাঠগড়ায় গোলাম আযমের উপস্থিতিতে তাঁর আইনজীবী তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনাল-১-এ আবেদন উপস্থাপন করেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিল সংবাদ পত্রিকায় ‘আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের দাবি: গণআদালতের রায় সম্পর্কে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সভাপতির কক্ষে আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের সভায় বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন। গণআদালতে গোলাম আযমের যে ফাঁসির রায় হয়, সে সম্পর্কে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ওই সভা থেকে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়।
পরে শুনানিতে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত গণআদালত গোলাম আযমকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই রায় সম্পর্কে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সরকারের কাছে দাবি জানান। যেহেতু ট্রাইব্যুনাল-২ কার্যকর রয়েছে এবং এক ট্রাইব্যুনাল থেকে আরেক ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের বিধান করা হয়েছে, এ জন্য স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে এই মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
আসামিপক্ষে আরও যুক্তি উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রফিকুল ইসলাম মিয়া। রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, ন্যায়বিচার হওয়া নিয়ে আসামির মনে যেন ন্যূনতম সন্দেহ না থাকে, এ জন্য আবেদনটি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-২ কার্যকর রয়েছে, ফলে মামলাটি স্থানান্তরের মাধ্যমে আসামির মনের সন্দেহ দূর করার সুযোগ আছে।
এই আবেদনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ-আল-মালুম বলেন, আসামিপক্ষের এ ধরনের আবেদনে রাষ্ট্রপক্ষ ত্যক্ত-বিরক্ত। মামলা দীর্ঘায়িত ও কালক্ষেপণ করতে বারবার এ ধরনের আবেদন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১১এ অনুসারে এ ধরনের আবেদন করার এখতিয়ার আসামিপক্ষের নেই। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের নিরপেক্ষতা নিয়ে আসামিপক্ষের তোলা প্রশ্নের সমাধান ইতিমধ্যে হয়ে গেছে।
বিকেলে শুনানি অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
আসামিপক্ষ গত ৩০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ১১এ ধারায় আবেদনটি জমা দেয়। এর আগে গত বছর নভেম্বরে বিচারপতি নিজামুল হকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রিকিউজাল (বিচারিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার) আবেদন করেছিল আসামিপক্ষ। ১৪ নভেম্বর ওই আবেদনের নিষ্পত্তি করে আদেশ দেন ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য। পরে বিচারপতি নিজামুল হকের বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কারণ জানতে চেয়ে আসামিপক্ষ আরেকটি আবেদন করলে ২৮ নভেম্বর আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের যৌক্তিকতা নেই।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ২১ জুন: বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, এ বিষয়ে আদেশের জন্য ২১ জুন দিন ধার্য করে গতকাল আদেশ দেন। তাঁর বিরুদ্ধে একটি অতিরিক্ত অভিযোগ ও সাক্ষী সংযোজনের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক আবেদনের বিরোধিতা করে আসামিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করে। এ দুই আবেদনের বিষয়ে আদেশও ২১ জুন দেওয়া হবে। শুনানি থাকায় মুজাহিদকে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গতকাল পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে স্থাপিত ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম দেখতে যান। সঙ্গে ছিলেন কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য কাজী রিয়াজুল হক, অনারারি সদস্য সেলিনা হোসেন, নিরুপা দেওয়ান, নীরুকুমার চাকমা, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক এম এ হাসান প্রমুখ।
পরে মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন প্রচার রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তরফ থেকে এ বিষয়টি দেখতে আসা হয়েছে। কমিশন চায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার হোক। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছে, আসামিপক্ষকে অনেক বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের আইনজীবীদের অনেক সময় দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা কথা বলতে পারেন। বরং রাষ্ট্রপক্ষ কিছুটা অসন্তুষ্ট, তাঁরা হয়তো কম সময় পাচ্ছেন। তিনি বলেন, এই বিচার নিয়ে কোনো সন্দেহ পোষণ করা বা অযাচিত কোনো প্রশ্ন তোলা খুবই দুঃখজনক হবে। ট্রাইব্যুনালে স্বচ্ছতা বজায় আছে, আমার বিশ্বাস, এখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।’

No comments

Powered by Blogger.