বাংলাদেশ কি কুরুক্ষেত্র by আতাউস সামাদ


 প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনা কথা ভালো বলেন। বিশেষ করে দুটো ক্ষেত্রে। এক. কোনো আবেগপূর্ণ বিষয়ে— আর দুই. কথার পিঠে কথা বলতে, তা যদি হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রয়োজনে। তবে শেষের বেলায় সত্যাসত্যের সংমিশ্রণ করতে তিনি কখনও কখনও একটু উদার হয়ে পড়েন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিরোধী নেতা বেগম খালেদা জিয়াও উপস্থিত বক্তৃতা ভালো করেন এবং তিনিও সমালোচনামূলক মন্তব্যের উত্তর তুল্যমূল্যে দিয়ে দিতে পারদর্শী। এঁদের দু’জনের বাকযুদ্ধ শুনতে ভালোই লাগে, যদি না কোনো পক্ষ বেশি উত্তেজিত হয়ে যান। তবে যেহেতু সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা অধিবেশন বর্জন করছেন, তাই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার তর্ক আজকাল শোনা বা দেখা হচ্ছে না। তবে বিভিন্ন ভাষণে দু’জনই বৈচিত্র্য আনতে প্রয়াসী হচ্ছেন। কিন্তু ইদানীং তাঁরা দু’জনই যেন খানিকটা বেখেয়ালি।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী বিধায় বক্তৃতা রচনায় ও লিখনে এবং সম্পাদনায় তিনি সহকারীদের সহায়তা পেয়ে থাকেন বলে অনুমান করি। আজকাল সন্দেহ করার কারণ ঘটছে যে, তিনি তাঁর সেই সহকারীদের কাছ থেকে সঠিক সেবা পাচ্ছেন কিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারতে সরকারি সফর করে দেশে ফিরে সে সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। তাতে দেশের প্রথম কাতারের পত্রিকার সম্পাদকরা এবং টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক/কর্তাব্যক্তিরা দীর্ঘ মন্তব্য ও প্রশংসা সহকারে কিছু প্রশ্ন করেন। (আগে দেখতাম সংবাদ সম্মেলনে রিপোর্টাররা বেশি প্রশ্ন করতেন।) এরকমই এক সমন্তব্য প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৌরাণিক গ্রন্থ মহাভারত অবলম্বনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কয়েকটি পঙিক্ত উদ্ধৃত করেন, যা ছিল ওই মহাকাব্যের অন্যতম চরিত্র দুর্যোধনের জবানিতে। সেখানে দুর্যোধন বলছেন যে, তিনি সুখ চাননি, জয় চেয়েছিলেন এবং সেই জয় তিনি পেয়েছেন। এখন আমাদের সমস্যা হলো, আমরা জেনে এসেছি দুর্যোধনের চরিত্রটি একটি বদচরিত্র। তিনি প্রতারণা করে হস্তিনাপুর রাজ্যের সিংহাসন দখল করেন এবং তাঁর পাণ্ডব সত্ ভাইয়েরা তের বছর নির্বাসনে কাটিয়ে আগের সমঝোতা মোতাবেক রাজ্যভার নিতে আসেন, তখন দুর্যোধন তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে অস্বীকার করেন। তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব প্রস্তাব নাকচ করে দেন। যার ফলে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ হয়। অবশেষে দুর্যোধন সবংশে নিপাত যান। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দু’পক্ষে বহু প্রাণহানি হয়। গুরুস্থানীয় এবং স্নেহধন্য অর্থাত্ প্রবীণ ও নবীন বহু বীর নিহত হন। কারণ এতে ভারতের অধিকাংশ রাজা কোনো না কোনো পক্ষ নিয়েছিলেন। যার ফলে মহাভারত কাব্যের অনেকখানিজুড়ে বিয়োগবিধূর পরিবেশ বিরাজ করছে। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পাণ্ডবরা দুর্যোধনের কাছে একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল, ‘আসুন, আমরা যতদূর পারি সশস্ত্র যুদ্ধ এড়িয়ে চলি। কারণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে যা অর্জন করা যায় কেবল তা-ই হয় মূল্যবান। যুদ্ধ থেকে শুধুই অন্যায়ের (বা ভুলের) সৃষ্টি হয়।’ (অনলাইন প্রবন্ধ থেকে) দুর্যোধন এ শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন যার ফলে চলে ১৮ দিনব্যাপী ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। ভারতে, এমনকি বাংলাদেশেও বাজে ধরনের ঝগড়াঝাটি লেগে গেলে বা কোনো দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের ফলে অশান্তির সৃষ্টি হলে আজও বলা হয় যে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বেধে গেছে। তো আমাদের প্রধানমন্ত্রী, মাননীয়া শেখ হাসিনা, তো অশান্তি চাননি। তিনি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সরকার ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতার ভাষায়, বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্র থেকে চারদলীয় জোট সরকার সৃষ্ট সন্দেহ, বিদ্বেষ ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে শান্তি, সহযোগিতা ও অগ্রগতির দরজা উন্মুক্ত করতে। তাঁদের মতে, সেই লক্ষ্য তিনি অর্জন করেছেন।
সে ক্ষেত্রে তিনি তাঁর ‘সুন্দর সাফল্যের’ বর্ণনা দেয়ার জন্য দুর্যোধনের মতো একটি খলচরিত্রের (ঠরষষধরহড়ঁং) সহায়তা নিলেন কেন? দুর্যোধন তো তাঁর বিপরীতধর্মী চরিত্র! তিনি কি নিজেকে দুর্যোধনের সঙ্গে তুলনা করতে সত্যিই রাজি হবেন? আমাদের মনে হয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকরা নয়াদিল্লিতে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করার ফলে এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, ঢাকায় ফিরে ২০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের কাগজপত্র তৈরি করার সময় এমন একটা মারাত্মক ‘ভুল’ যে রয়ে যাচ্ছে, তা তারা খেয়াল করতে পারেননি। আশা করব, তাঁরা ভবিষ্যতে ভুল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কুরুক্ষেত্রের দিকে ঠেলে দেবেন না। তবে মাননীয় প্রধানন্ত্রী গত ১৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে তাঁর দেহ প্রকৃতপক্ষেই আছে কিনা প্রশ্ন তুলে যেসব মন্তব্য করেছেন তা থেকে আমরা কেউ যদি আশঙ্কা করি যে, তিনি মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের পরিবেশই চাইছেন, তাহলে বোধহয় অমার্জনীয় ভুল করব না। তবুও আমরা সেই ভুল করতে চাই না। এও চাই না যে, প্রধানমন্ত্রীর মতো উচ্চাসনে আসীন কোনো নেত্রী বা নেতা জনগণকে সেরকম ধারণা করার সুযোগ করে দেবেন। আশা করি, আমাদের এসব কথায় কেউ রাগ করবেন না। আমরা যা বলেছি সদিচ্ছার সঙ্গে বলেছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরান্তে যে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী ২০১১ সালে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে পালিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং উপলক্ষটির গুরুত্ব অনুধাবন করানোর জন্য সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে যে, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় ওই উত্সবের তত্ত্বাবধান করবেন। যৌথ ইশতেহারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ্তুমত্বধঃ ঢ়ড়বঃ ষধঁত্বধঃব্থ অভিধায় বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্যই কবিগুরুকে যথাযথ সম্মান দেখানোর জন্য এ বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে আমরা এ বিষয়ে একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেছি। আমরা শুনে এসেছি, ব্রিটেনের রাজদরবারে একজন কবি থাকতেন যাঁকে বিশেষ সম্মান দেখিয়ে ঢ়ড়বঃ ষধঁত্বধঃব পদ দেয়া হতো। ব্রিটিশ সরকার আজও সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করছে। এ সম্মানে ভূষিত কবির কাজ ছিল প্রতি বছর ইংল্যান্ডের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজা বা রানীর তথা তাঁর কর্মের ও রাজ্যের বন্দনা করে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখা। ব্রিটেনে চড়বঃ খধঁত্বধঃব এখনও বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে কবিতা লেখেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে পরামর্শদাতা কবিকে মার্কিন ঢ়ড়বঃ ষধঁত্বধঃব বলা হয়। কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডেও এরকম ঢ়ড়বঃ ষধঁত্বধঃব আছেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও এরকমভাবে ব্রিটিশদের রাজকবি হয়েছিলেন বলে শুনিনি; বরং ইংরেজরা তাঁকে ‘নাইট’ ঘোষণা করে যে ‘স্যার’ উপাধি দিয়েছিল, পরবর্তীকালে শাসক ইংরেজদের হাতে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ঘটলে তিনি প্রতিবাদে সেই উপাধি পরিত্যাগ করেন। স্বাধীন ভারতের কোনো কোনো প্রদেশে ইদানীং আঞ্চলিক ভাষার বিশিষ্ট কবিদের ঢ়ড়বঃ ষধঁত্বধঃব তকমা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এমন কোনো উপাধি দেয় কিনা তা জানতে পারিনি। তবে (লরিয়েট) শব্দটির একটি অর্থ আছে মাল্যবিজয়ী খধঁত্বষ বা মালা থেকে শব্দটির উত্পত্তি এবং কেউ খুব বড় কোনো পুরস্কার জয় করলে তাকে ওই পুরস্কারের মাল্যবিজয়ী বলা হয়। বর্তমান বিশ্বে কথাটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতার জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন আর সেজন্য ইংরেজিতে তাকে প্রায়ই ঘড়নবষ ষধঁত্বধঃব (নোবেল লরিয়েট) হিসাবে বর্ণনা করা হয়। সবিনয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে অনুমান করি যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর সংক্রান্ত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইশতেহারের খসড়া প্রণেতারা আবেগের প্রাবল্যে তাঁকে ‘নোবেল লরিয়েট’ বর্ণনা করতে গিয়ে ‘পোয়েট লরিয়েট’ বলে ফেলেছেন। আমরা এখানে যা ভুল হিসেবে ভাবছি তা যদি ঠিক হয়, তাহলে একটা ভয়ের ব্যাপার থেকে যায়। তখন দুর্জনেরা বলবে, ‘দেখ গিয়ে ওই যৌথ ইশতেহারে ভুল করে বাংলাদেশের কোন স্বার্থ জানি জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে।’ তবে কিনা বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদী এখন জলশূন্যতা বা প্রকট জলাভাবে জর্জরিত। তাই এত অল্প পানিতে আর কী বা চুবানো যাবে।
শুনতে পাচ্ছিলাম, বিএনপি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেবে। এখন শুনছি যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান সম্পর্কে যেসব তিক্ত মন্তব্য করেছেন এবং তাঁর পুত্র বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান সম্পর্কে সরকার ও তদীয় সমর্থকদের পক্ষ থেকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত থাকার যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার প্রতিবাদে বিরোধী দলটি সংসদ অধিবেশন বর্জন চালিয়ে যাবে। তবে আমরা মনে করি, এ মুহূর্তে বরং বিএনপির সংসদে যাওয়া প্রয়োজন, জনগণের পক্ষে এবং দলের স্বার্থে। দেশে আবার মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে, নারী নির্যাতন ও খুনসহ জঘন্য অপরাধ ঘটানোর প্রবণতা বাড়ছে, দুর্নীতি ব্যাপকতর হচ্ছে এবং শিক্ষাঙ্গনে সশস্ত্র সহিংসতা চলছেই। এগুলো জাতীয় সমস্যা এবং এসব সমাধানের জন্য বিরোধী দলের বক্তব্য জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণীতে আসা জরুরি। দ্বিতীয়ত বিএনপির বিরুদ্ধে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের যেসব কার্যক্রম চলছে তার প্রতিবাদ করার জন্য, বিশেষত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যাপারে যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তার উত্তর দেয়ার জন্যও দলের সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেয়া উচিত। তা না হলে অনেকেই মনে করতে পারেন যে, এই দলের কাছে এসব অভিযোগের উত্তর নেই।
আরেকটা কথাও মনে রাখা দরকার। এমনিতেই তো শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে সম্পর্ক খুবই শীতল। তদুপরি আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে যে, রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উত্খাত করার চেষ্টা হচ্ছে জেনারেল জিয়াউর রহমান এমন তথ্য জানতে পেরেও তা শেখ সাহেবকে বা তাঁর সরকারকে সতর্ক করেননি। তদুপরি শেখ হাসিনা নিজে ও অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর থেকেই সন্দেহ পোষণ করে আসছেন যে, এ ঘটনায় জনাব তারেক রহমানের হাত ছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা এখন সেই কথা প্রকাশ্যেই বলছেন। এছাড়াও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয় এবং সর্বোপরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপির টিকে থাকা তারা প্রায় সহ্যই করতে পারেন না। এ তিক্ততার মাঝে বেগম খালেদা জিয়া বলে ফেলেছেন, শেখ হাসিনা ভারতে বাংলাদেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রীর পথে আন্দোলনের কাঁটা বিছিয়ে দেবেন। এখন সে কাজের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আরও ক্ষিপ্ত হয়েছেন। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, কিন্তু প্রতিপক্ষের কারও বিরাগ বা বিরক্তি জনগণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংসদ বর্জন করার কারণ হওয়া উচিত নয়।

No comments

Powered by Blogger.