দখলমুক্ত সৈকত চাই by মুহম্মদ নূরুল হুদা


বাংলাদেশের অহঙ্কার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। আমাদের প্রিয় দরিয়ানগর। কিন্তু যেভাবে পর্যটন বাণিজ্যের বরাত দিয়ে এখানে জমিদখল, বরাদ্দ ও স্থাপনা বাড়ছে তাতে আশঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। এই দখল, বরাদ্দ ও স্থাপনা যেমন বেপরোয়া, তেমনি অপরিকল্পিত।
কখনও আইনকে সুকৌশলে ব্যবহার করে, আবার কখনও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই দখল কায়েম করেছে ক্ষমতাধর কুচক্রীরা। এরা যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের মদতপুষ্ট হওয়ার কৌশল জানে, আমলাদের মুখ বন্ধ করার তরিকা সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল এবং নিজেদের দখল বজায় রাখতে গিয়ে সিন্ডিকেট ও পেটোয়া বাহিনীর সঙ্গে আঁতাত প্রতিষ্ঠায় ওস্তাদ। এভাবেই সদাচারী ও নিরীহ জনগণের চোখের আড়ালে এসব দখলবাজ গত দুই দশক ধরে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতকে গিলে খাচ্ছে। এদের ভেতর বহিরাগত ধনকুবেরই বেশি, যারা তাদের সুবিধার জন্য স্থানীয় দালাল-ফড়িয়াদের সহায়তা কিনে নেয়। বিমানবন্দর থেকে কলাতলী ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত সুবিস্তৃত সৈকতে এমন কোনো সুবিধাজনক জায়গা নেই যা এই দখলবাজদের অধীনে যায়নি। এদের মধ্যে সাইক্লোনে সর্বস্বান্ত ভিটেবাড়িহীন দ্বীপবাসী, রোহিঙ্গা শরণার্থী, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, আমলা, সাংবাদিক, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনসহ প্রায় সব পেশার লোকজন আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই এই দখলের কাজটি ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে। সৈকত দখলের পাশাপাশি এই গোষ্ঠীর চোখ পড়েছে হাজার হাজার বছর ধরে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুদীর্ঘ পাহাড়শ্রেণী ও তত্সংলগ্ন জমিজমার ওপর। জমির শ্রেণীচ্যুত করা, বেআইনকে আইন বানিয়ে লিজ নেয়া, অস্থায়ী বসতি স্থাপন করা ইত্যাকার কাজে এরা সুপটু; আর এ কাজে এদের সহায়তা করেছে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এরা পাহাড় দখলের পাশাপাশি পাহাড় কেটে সমতল করার কাজও করেছে গোপনে ও প্রকাশ্যে। কলাতলী বাইপাস থেকে উত্তর দিকে প্রায় ষাট একর বিস্তৃত সবুজ বনানী-শোভিত পাহাড় কেটে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, আমলা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি কোনো কোনো বিচারককেও প্লট বরাদ্দ দিয়ে দখলকারীরা নিজেদের নিরাপদ রাখার কাজ পাকা করে রেখেছে। এ কাজে যেসব কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগী, তাদের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বেনামিতে, অর্থাত্ তাদেরই বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা আত্মীয়-স্বজনের নামে। কোনো কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অবশ্য নিজেদের নামেই এই বরাদ্দ নিয়েছেন। বেলা-সহ দেশের পরিবেশ রক্ষাকারী সুশীল সমাজ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে; তারা কিছু লোকদেখানো তত্পরতা গ্রহণ করে পাহাড় কাটা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় কাটা ও দখলবাজি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ব্যক্তিগত রেষারেষি। সৈকতের বরাদ্দপ্রাপ্ত জমি দখল নিয়ে বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘর্ষও শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগে তেমন একটি সংঘর্ষে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন একজন স্থানীয় সাংবাদিক। দেশের শান্তিপ্রিয় ও পরিবেশ সচেতন সদাচারী জনগণ মনে করে, যুগ যুগ ধরে এই এলাকায় বসবাসরাত ব্যক্তিদের জোতজমি, বসতভিটা এবং অত্যাবশ্যকীয় সরকারি স্থাপনা ছাড়া সৈকত ও তত্সংলগ্ন পাহাড়ের সব ধরনের চরাঞ্চল ও জমিজমা বেসরকারি পর্যায়ে বরাদ্দ প্রদান অবিবেচনাপ্রসূত ও অবৈধ । প্রথমত, এ ধরনের বরাদ্দ প্রদান এই অঞ্চল তথা গোটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। দ্বিতীয়ত, কোপেনহেগেন সম্মেলনের তথ্য অনুসারে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের অন্যতম বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত; তাই ভূমি, সংশ্লিষ্ট অধিবাসী ও পারিবেশিক ঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে এই ধরনের বরাদ্দ-দখল এখানে শতভাগ অগ্রহণযোগ্য। তৃতীয়ত, এই সৈকত ও পাহাড়ে আছে এমন সব মহামূল্যবান খনিজ, যা জাতীয় সম্পদ বিধায় ব্যক্তিমালিকানায় প্রদান সম্পূর্ণ বেআইনি। চতুর্থত, উপকূলীয় মত্স্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই বরাদ্দ-দখল শতভাগ প্রতিবন্ধক। পঞ্চমত, কক্সবাজারের সৈকতকে ঝুঁকিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও পর্যটনবান্ধব মুক্ত সৈকতে পরিণত করতে হলে এখানে সব ধরনের স্থায়ী স্থাপনা অনাকাঙ্ক্ষিত। বরং সৈকতের বহুমাত্রিক ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে এখানে পর্যটনমুখী, পরিবেশবান্ধব ও দ্রুত পরিবর্তনযোগ্য অস্থায়ী কাঠামো দাঁড় করানো যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় নির্মাণ-উপকরণ ও স্থাপত্য-নকশা ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা যাবে। এর জন্য প্রকৃত আবেদনকারীকে প্রয়োজনে অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণের জন্য মেয়াদি (যথা ৫ বছর) ও নবায়নযোগ্য বরাদ্দ প্রদান করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এই শর্ত অবশ্যপালনযোগ্য হতে হবে যে, অস্থায়ী বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শর্তভঙ্গের কারণে যে কোনো মুহূর্তে উচ্ছেদ করা যাবে এবং তিনি ভূমি বা পাহাড়ের আকার পরিবর্তন করতে পারবেন না। আসলে কক্সবাজারে সৈকত, পাহাড় ও সমুদ্র অবিচ্ছেদ্য। সমুদ্র যদি হয় সৈকতের মা, তাহলে পাহাড় হচ্ছে তার পিতা। মায়ের ভালোবাসার তরঙ্গাঘাতে খসে পড়ছে তার পিতার বুকের একাংশ; তাই তো সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো খাড়া; তাদের বুক ভেঙে নেমে এসেছে অশ্রুঝর্ণা। পাহাড়ের মাটি ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য দিয়ে গড়া এই সৈকতকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব রাখতে হলে সব বেআইনি ও তথাকথিত আইনি দখল উচ্ছেদ করতে হবে। বর্তমান কর্তৃপক্ষও বিষয়টি বুঝতে পেরেছে বলে মনে হয়। জেলা প্রশাসন সম্প্রতি অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদ করার বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি আগে বরাদ্দপ্রাপ্ত কিন্তু শর্ত লংঘনকারীদের বরাদ্দ বাতিল করে ৫৯টি চিহ্নিত স্থানে লাল পতাকা টানিয়েছে। আইনের মারপ্যাঁচে যেন এই সিদ্ধান্ত ভেস্তে না যায়। বাংলাদেশের প্রবেশদুয়ার দরিয়ানগরকে সব ধরনের দখলমুক্ত করার জন্য দরিয়ানগরের ভূমিসন্তান ও দেশের সদাচারী জনগণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা প্রশাসনের এই উদ্যোগের শতভাগ সাফল্য কামনা করি।

লেখক : কবি; প্রফেসর; সভাপতি
বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব

No comments

Powered by Blogger.