বিপর্যস্ত শিপিং করপোরেশনঃ হাল ধরুন শক্ত হাতে


চরম বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। অনেকটা ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো বিপন্ন এ সংস্থার নিয়মিত আয় বলতে এখন কিছু নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া কমে যাওয়ায় খরচের অর্ধেকও উঠে আসছে না। এদিকে প্রায় অর্ধেক জাহাজই এখন অচল।
সচলগুলোকেও নিয়মিত পাঠাতে হয় ওয়ার্কশপে। অথচ চুক্তিবদ্ধ ক্রুরা মার্কিন ডলারে মাইনে গুনছেন নিয়মিত। এ বিপর্যয় থেকে বিএসসিকে বাঁচাতে সরকারের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নথিপত্রেই আটকে আছে। ফলে এক সময়ের লাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি কার্যত বন্ধ হওয়ার পথে।

জানা গেছে, এরই মধ্যে বিএসসির মোট ১৩টি জাহাজের ছয়টিই এখন চলত্শক্তিহীন। বাকি সাতটির চারটি আধা সক্রিয়। এ অবস্থায় সংস্থাটিকে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪০ লাখ টাকা। আয় না থাকায় এফডিআর ভেঙে বেতন ভাতা দেয়া হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এ ব্যাপারে সম্প্রতি নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, বিএসসিকে লাভজনক করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে এক হাজার কোটি টাকায় ছয়টি জাহাজ কেনার প্রস্তাব রয়েছে বিএসসিকে আবার লাভজনক করার উদ্দেশ্যে। এক হিসাব মতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বিএসসির লাভ ছিল ৪৬ কোটি টাকা। প্রায় সাত কোটি টাকা লাভ ছিল ২০০৮-০৯ অর্থবছরেও। কিন্তু চলতি অর্থবছরে যে আয় হয়েছে অচল জাহাজ মেরামতের খরচও তার চেয়ে বেশি। ‘ঊর্মি’ নামের একটি জাহাজ অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে গত ২২ মাস ধরে। সম্পূর্ণ অচল হয়ে আছে অপর দুটি জাহাজসহ ‘বাংলার গৌরব’। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক নৌপথে দেশের পতাকাবাহী জাহাজ বহরের গৌরব যে কতটা ম্লান হয়ে পড়েছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ আন্তর্জাতিক আইন মেনে মার্কিন ডলারে সংশ্লিষ্টদের বেতন ভাতা দিতেই হচ্ছে। জাহাজ অচল, মাইনে সচল—অবস্থা অনেকটা মৃত্যু ঘোড়ার লালনপালনের মতোই অযাচিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে জাহাজের নাবিক তথা ক্রুদের হয়েছে পোয়াবারো। অচল জাহাজ রেখে তারা সক্রিয় থাকছেন অন্য কাজে। অভিযোগ আছে, কেউ কেউ জাহাজ ভাড়ার সময় হলে অসুস্থতার ছুঁতোয় যাচ্ছেন ছুটিতে। এদিকে অভিজ্ঞ নাবিকরা বিদেশি তথা অন্যান্য কিপিং লাইনের দিকে ঝুঁকছেন। এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ছয় মাসে সংস্থার এফডিআর ভেঙে মাসিক ব্যয়ভার মেটাচ্ছে বিএসসি। ফলে ১২৬ কোটি টাকার এফডিআর এখন এসে ঠেকেছে ৭০ কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ বেহালদশার উন্নতি না হলে আগামী কয়েক মাসে নিঃশেষ হয়ে যাবে এফডিআর।
সবচেয়ে বিস্ময়কর সংবাদ হচ্ছে, বিগত ১৯ বছরে বিএসসিতে সংযুক্ত হয়নি নতুন কোনো জাহাজ। এরশাদ আমলে কেনা দুই জাহাজ শুরু থেকেই লোকসানের শিকার। এদিকে পুরনো জাহাজগুলো ভাড়া খেটে এলেই সেগুলোর শুশ্রূষায় খসে যাচ্ছে ৪০-৫০ লাখ টাকা। এগুলো এখন আক্ষরিক অর্থেই গোদের ওপর বিষফোঁড়ার শামিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কিছু দিনের মধ্যে বেচে দেয়া হবে ‘বাংলার গৌরব’ ও ‘বাংলার রবি’। বিএসসিকে এ অস্তাচল অবস্থা থেকে ফেরাতে চারটি জাহাজ বিক্রি করে ছয়টি জাহাজ কেনার প্রস্তাব কবে আশার আলো দেখাবে তা বলা মুশকিল। তবে চলতি অর্থবছরে দুটি জাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত আপাতত মন্দের ভালো। কিন্তু বিএসসির এ বেহালদশা সম্পর্কে সেই পুরনো সুরেই গলা সেধেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। বলেছেন, ‘এটি অতীত সরকারের জঞ্জাল, যা আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে।’
এ কথা তো মানতেই হবে যে সঙ্কটের মোকাবিলা করতে গেলে অজুহাত খাড়া করে ফায়দা নেই। উদোরপিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে কোনো কিছু বদলে দেয়া তথা উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে যখন তাকেই তখন ব্যবস্থা নিতে হবে। জাহাজ অচল পড়ে থাকবে, অথচ কড়ায়গণ্ডায় হিসাব করে ডলার নেবেন জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, এফডিআর ভেঙে সংস্থাকে ফতুর করে ছাড়বে, তা হতে পারে না। অন্যদিকে জাহাজ কেনা শুধু মন্ত্রণালয়ের নথিভুক্ত থাকলেও কোনো লাভ হবে না। তাতে বরং লোকসানের বোঝাই ক্রমাগত স্ফীত হতে থাকবে। কাজেই অব্যবস্থাপনার ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে বিএসসির বহরে প্রথমে যোগ করতে হবে নতুন জাহাজ। বিকল জাহাজ মেরামত করতে নিজস্ব জেটি বা ডক তৈরির ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। কারণ, শিপিং করপোরেশন শুধু একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ লাভজনক খাতই নয়, এর সঙ্গে দেশের সুনাম এবং মর্যাদার বিষয়টিও জড়িত। আমাদের প্রত্যাশা, অযথা অজুহাত খাড়া না করে সরকার যথাসম্ভব দ্রুত বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ বহরকে আবার সচল, সক্রিয় এবং লাভজনক খাতে পরিণত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, হাল ধরবে শক্ত হাতে।

No comments

Powered by Blogger.