বিদ্যুতের দাম ৩০ পয়সা বাড়ল

বিদ্যুতের দাম গতকাল বৃহস্পতিবার আরেক দফা বেড়েছে। এবার খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ইউনিটপ্রতি ৩০ পয়সা আর পাইকারি বিদ্যুতের (বাল্ক ট্যারিফ) দাম বাড়ানো হয়েছে ২৮ পয়সা। এ দাম কার্যকর হবে চলতি মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে। এই নিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুতের দাম বাড়ল পাঁচ দফা।


অভিযোগ উঠেছে, এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শুনানি না করেই খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। চলতি মার্চ মাসের বিদ্যুতের এই বর্ধিত মূল্য দিতে হবে এপ্রিল মাসে। দাম বাড়ার আগে খুচরা বিদ্যুতের দাম ছিল গড়ে ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ২ পয়সা। এখন ৩০ পয়সা বেড়ে হয়েছে ৫ টাকা ৩২ পয়সা। আগে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ছিল গড়ে ইউনিটপ্রতি ৩ টাকা ৭৪ পয়সা। এখন দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ২ পয়সায়। কমিশন জানায়, খুচরা বিদ্যুতের বর্ধিত দামের মধ্যে ২ পয়সা রাখা হয়েছে সিস্টেম লসের জন্য।
দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর মূল্যনির্ধারণ করেছে বিইআরসি। এক্ষেত্রে খুচরা গ্রাহকদের ১০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৮ পয়সা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩ টাকা ৫ পয়সা। ১০০ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ২৫ পয়সা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪ টাকা ২৯ পয়সা। ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৪৬ পয়সা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ হয়েছে ৭ টাকা ৮৯ পয়সা। এই হিসেবে খুচরা বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি গড়ে বেড়েছে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর পাইকারিতে বেড়েছে গড়ে ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
বাণিজ্যিক বিদ্যুতের দাম সব থেকে বেশি বেড়েছে। ইউনিটপ্রতি ৪৬ পয়সা বেড়ে ৭ টাকা ৩ পয়সা থেকে হয়েছে ৭ টাকা ৭৯ পয়সা। সব থেকে কম ১৩ পয়সা বেড়েছে কৃষিতে। প্রতি ইউনিট ২ টাকা ১৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ২৬ পয়সা। অন্যদিকে আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে গড়ে ইউনিটপ্রতি ৩৫ পয়সা বেড়ে আগের দর ৫ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ৬ টাকা ২ পয়সা হয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ ইউসুফ হোসেন বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এদিকে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে গত ডিসেম্বর থেকে। বিদ্যুৎ কম্পানিগুলো বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার কারণে অধিক ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মূল্য সমন্বয় করে বিদ্যুৎ কম্পানিগুলোর লস কমানোর জন্যই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো।'
কমিশনের আইন অনুযায়ী, বিদ্যুতের দাম বাড়ার আগে গণশুনানি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে শুনানি করা হলেও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে শুনানি করা হয়নি। শুনানি না করার যৌক্তিকতা সম্পর্কে কমিশনের সদস্য ড. সেলিম বলেন, 'খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে যদি শুনানি করা হতো তাহলে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি হয়ে যেত। এর ফলে কম্পানিগুলো বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে অনেক বেশি লোকসানের মধ্যে পড়ত।'
পিডিবি গত ১৯ মার্চ বিইআরসির শুনানিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৪১ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। দর বাড়ানোর প্রস্তাবে বলা হয়, ২০১১-১২ অর্থবছরে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় তিন হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। সংস্থাটির দাবি গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি পাঁচ টাকা বাড়ায় গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঘাটতি হয় পিডিবির।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে পিডিবি গত বছরের ২৪ নভেম্বর দুই দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। প্রথম দফা কার্যকর হয় ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে গড়ে ৩ দশমিক ২৭ টাকা ও দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর ঘোষণা কার্যকর হয় ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ দশমিক ৭৪ টাকা করা হয়।
১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাতবার, বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে পাঁচবার দাম বাড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে একবার ও সেপ্টেম্বর মাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে পুনরায় দাম বাড়ানো হয়। এর পরের বছর জুলাইয়ে এবং সেপ্টেম্বরে পুনরায় দুই দফা দাম বাড়ানো হয়। ২০০০ সালের মার্চে এবং একই বছরের ২৪ নভেম্বরে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার, যা কার্যকর হয় গত বছরের ১ ডিসেম্বর ও চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে প্রথমবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি পায় ২০১০ সালের মার্চ মাসে। পরে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও দাম বাড়ানো হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে পুনরায় দাম বৃদ্ধি করে সরকার। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর করা হয়।

No comments

Powered by Blogger.