মার্কিন যুদ্ধ ও ভারতের আগ্রাসী নীতি by আফসানুল আলম মুন্সী


কথা শুরু হয়েছিল আমেরিকান Forbes ম্যাগাজিনের একটা আগাম পূর্বাভাসকে কেন্দ্র করে। Forbes নেহায়েতই একটা ম্যাগাজিন নয়, স্ট্যাটিসটিক্যাল তথ্যের অ্যানালাইসিস থেকে প্রজেকশন করে বিভিন্ন রিপোর্ট সব সময়ই তারা করে থাকে।
স্ট্যাটিসটিক্যাল প্রজেকশন মানে বিগত দশ-বারো বছর বা সম্ভব হলে এরও বেশি সময়ের ডাটা ব্যবহার করে প্রথমে তা দিয়ে একটা গ্রাফ তৈরি করা; এরপর ওই গ্রাফের গতিধারা অভিমুখ নজর করে এর বর্ধিত দিক কী হতে পারে তা এঁকে ফেলা। এতে আগামী দিনের কোনো ডাটা বা তথ্য ছাড়াই বরং উল্টো পথে ডাটার একটা আন্দাজ পাওয়া সম্ভব। এজন্য একে আমরা প্রজেকটেড বা সম্ভাব্য ডাটা বলি। তো Forbes-এর ওই কাজ ছিল আগামী দিনে বিশ্বশক্তিগুলোর ক্ষমতা বিন্যাসের চিত্রটা কেমন হতে পারে—তার একটা আগাম ধারণা তৈরি করা। লব্ধ ফলের সারকথা ছিল, আমেরিকা একক পরাশক্তির জায়গায় আর থাকছে না, আর নতুন অন্তর্ভুক্তি ঘটছে ব্রাজিল, চীন ও ভারতের—ফলে কেউই আর একক ক্ষমতার অধিকারী নয়, নতুন ক্ষমতার বিন্যাসে অন্তত আট-দশজনের মধ্যে প্রত্যেকে অন্যতম একজন মাত্র।

ধেয়ে আসা এই চিত্র দেখে ভয় পেয়ে করণীয় নির্ধারণে বসে যায় আমেরিকান নীতিনির্ধারকেরা। ২০২৫ সালের মধ্যে কী হতে যাচ্ছে তার একটা চিত্র পেতে আরও ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট করে বোঝার জন্য এক বিশাল গবেষণার কাজ হাতে নেয়া হয়। কাজটা দেয়া হয় আমেরিকার সরকারি নীতিনির্ধারক গবেষণা প্রতিষ্ঠান National Intelligence Council (NIC)-কে। নভেম্বর ২০০৮ সালে ঘওঈ তাদের কাজ শেষ করে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সরকারি এ ডকুমেন্ট পাবলিকলি ওপেন করা হয়েছে, (http://www.dni.gov/nic/ PDF_2025/2025_Global_Trends_Final_Report.pdf)
ওই রিপোর্টে কিছু পর্যবেক্ষণ, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব কোথায়, কীভাবে তা বোঝার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো নিয়ে সীমিত আকারে কিছু কথা এখানে বলব।
রিপোর্টে ছড়িয়ে থাকা কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে তুলে ধরছি :
১. গ্লোবাল পরিসরে ২০২৫ সালের মধ্যে আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন বলে নিজেকে আবিষ্কার করবে, যদিও তখন অন্যদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীই থাকবে।
২. পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাদি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত যা কিছু বিকশিত ও গড়ে উঠেছে তা একেবারে বিপ্লবায়িত কায়দায় বদলে যাবে। শুধু Brazil, Russia, India and China (সংক্ষেপে BRIC) —এই নতুন খেলোয়াড়েরা আন্তর্জাতিক উঁচু টেবিলে বসার জন্য জায়গা পেয়ে যাবে তাই-ই নয়, তাদের এ হাজির হওয়ার মানে হবে আরও বড় বড় ভাগীদার হয়ে ওঠা এবং খেলায় নতুন নতুন নিয়মও চালু করে ফেলা।
৩. আগে দেখা যায়নি এমন এক ঘটনা হলো, পশ্চিম থেকে পূর্বে সম্পদের স্থানান্তর, আমরা এখন তা ঘটতে দেখছি। সামনে যতদূর দেখা যায়, আগামী দিনগুলোতেও এটা ঘটতেই থাকবে।
৪. আগে উদাহরণ নেই এমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সঙ্গে ১.৫ বিলিয়ন অতিরিক্ত জনগোষ্ঠী সম্পদের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষত জ্বালানি, খাদ্য ও পানিতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা অস্বস্তিকর দৃশ্যাবলি তৈরি করবে।
৫. সম্ভাব্য সংঘাতের হুমকি বাড়তে থাকবে, অংশত রাজনৈতিক ঝড়ে অস্থিরতার কারণে, আর কিছু বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের কারণে।
৬. বর্তমানের এই বৈশ্বিক ঝোঁক যদি অব্যাহত থাকে তবে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে জায়গা নেবে এবং সামরিক দিক থেকে অন্যতম শীর্ষস্থানে উঠে আসবে।
এই হলো সারকথায় বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুম্বক অংশ। মূল কথাটা হলো, চীন দ্বিতীয় অর্থনৈতিক ও অন্যতম শীর্ষ সামরিক শক্তি হিসেবে ধেয়ে আসছে এবং মার্কিন সাম্রাজ্য অধঃস্থানে যাচ্ছে—এ খবরে আমেরিকান নীতি নির্ধারকরা নড়েচড়ে বসেছে। এখন তাদের করণীয় কী হবে? এটাই রিপোর্টের মূল বিষয় ও তাত্পর্য।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা একটা প্রজেকশন। ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, ঘটতে যাওয়ার পূর্বাভাস। অর্থাত্ পরিস্থিতিকে এভাবে রেখে দিলে তা অনুমিত গতিপথে যাবে। কিন্তু যদি ক্ষিপ্রগতিতে নতুন কিছু উপাদান এখন থেকেই যুক্ত করা যায়—তাহলে কী হবে? তাহলে ফলাফল কিছু ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ফলাফল ঘুরে যায়, যাতে এরকম ফ্যাক্টর বা উপাদান কী কী নীতি-নির্ধারকদের হাতে আছে?
পশ্চিম থেকে পূর্বে সম্পদের স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে এবং আরো যাবে—এটা পশ্চিমের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। কিন্তু কী করা যায় তাতে? পূর্বে সস্তা শ্রমের কারণে এশিয়া নতুন নতুন বিনিয়োগ, সস্তায় অন্যদেশে রপ্তানি বাজার এবং একই কারণে নিজেই অভ্যন্তরীণভাবে
বাজার—এক বিশাল চক্র ও ক্ষেত্র হিসেবে হাজির হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগের জন্য, পুঁজির বেঁচেবর্তে মুনাফা কামিয়ে টিকে থাকার জন্য তা খুবই খুশির খবর। কিন্তু এত এশিয়ায় ঘটছে, সবাই ছুটছে এশিয়ার দিকে। এখন আবার ওকে পশ্চিমে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। কারণ, একে পশ্চিমে কম্পিটিটিভ বিনিয়োগের জায়গা দেখিয়ে দেয়া অসাধ্য।
পশ্চিমের সীমিত বাজারে বিনিয়োগের জায়গা খুঁজে না পাওয়া সত্ত্বেও সেখানে ফিরে যাওয়ার চিন্তা পুঁজির জন্য আত্মহননমূলক; শুকিয়ে মরা বা নিজের মাংস নিজে চিবিয়ে খাওয়ার মতো দুর্দশা। কাজেই সম্পদের এ স্থানান্তর মেনে না নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বরং মেনে না নিলে আরও বড় বিপদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কাজেই যা কিছু করার এশিয়ায় থেকেই করতে হবে। স্রোতের অভিমুখ ওল্টানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার অবস্থা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের নাগালে নেই। তাহলে আর কী করণীয় আছে যাতে প্রজেকশন বা ভাগ্য ওল্টানো যায়?
পাঠক লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়, ঘটনার ঘনঘটা সব এশিয়াতে, মূলত চীন ও ভারতকে ঘিরে। কাজেই আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত এবার সহজ অপশন, একটার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে অপরটার বিরুদ্ধে জোট বেঁধে লড়ো, ভারতের সঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে।
এই নীতিতে আমেরিকান ফরেন পলিসি : চীন ঠেকাও, ভারতের সঙ্গে জোট বেঁধে চীন ঠেকাও—এই মনোবাসনার কারণে আমাদের এশিয়া সরগরম হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায়।
আমেরিকার এই সমর্থন ভারত ভালোভাবেই মজা করে উপভোগ করছে। ঘটনাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভারত যতটা তার নিজের সামর্থ্য থেকে উত্থিত, তার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ক্ষমতা উপভোগ করতে শুরু করেছে। নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সত্যি সত্যিই একটা অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে দাঁড়ানোর কাজে আমেরিকার এই আশীর্বাদ পুঁজি করে সবকিছুতে যাঁতা দেয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মনোবৃত্তিতে মশগুল। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে তত্পরতায় যা কিছুই তারা বাধা বা সমস্যা হিসেবে সামনে দেখছে, তাকে আগ্রাসী বল প্রয়োগে সমাধানের পথে বেপরোয়া কূটনীতি বেছে নিচ্ছে।
আমেরিকার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এক মজার দ্বৈততার। আমেরিকান রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা— এসবের দিক থেকে এই রাষ্ট্রের দরকার চীনের ওপর একটা কর্তৃত্ব ও প্রভাব, পারলে যেন ওকে চূর্ণ করে দেয়া। কারণ দুনিয়ায় আমেরিকার যে প্রভাব আজ আছে, চীনের উত্থান একে ক্ষয়িষ্ণু, এলোমেলো করে তুলছে; আবার আমেরিকান বিনিয়োগ পুঁজির স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চীনের ধ্বংস মানে তারও মরণ। এটা চীনের ধ্বংস নয়, যেন নিজেরই ধ্বংস। ফলে এই অদ্ভুত দ্বৈততাকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকান রাষ্ট্রকে একটা ভারসাম্যের রেখা টেনেই চলতে হচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে চীন সফরে এসে ওবামাকে বলতে হয়েছে, যার যার স্বার্থের ভেতরে থেকেই পরস্পরকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় সে লক্ষ্য এই সফরের উদ্দেশ্য।
এই দৃশ্যের সঙ্গে তুলনায়, ভারতের চীনের কাছে সেসব দায় নেই। এজন্য অরুণাচল প্রসঙ্গে বিতর্কিত ভূমিতে এডিবি’র ঋণ নিয়ে উন্নয়ন তত্পরতা জবরদস্তি চালাতে গিয়ে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে হলেও সেই আগ্রাসী ভাবের পদক্ষেপ সে নেয়। যতদূর সর্বশেষ জানা যায়, আমেরিকা এই ইস্যুতে হাত সরিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখার কথা চীন ও ভারতকে জানাতে বাধ্য হয়েছে। এরকম আরও অনেক ইস্যু আছে যেগুলোতে ভারত ও আমেরিকান অবস্থানের মিল-অমিল নিয়ে কথা বলা যায়। কিন্তু আমেরিকা এশিয়ার শক্তিগুলোকে এভাবে ভাগ করে রেখে স্থানীয় স্বার্থগুলোর লড়াই-প্রতিযোগিতাকে কেবল অর্থনৈতিক জায়গায় রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। চীনকে একঘরে করে বাকি সবাইকে আমেরিকা-ভারতের স্বার্থজোটে জড়ো করার ভারতীয় চেষ্টার মধ্যেই সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এবং তা বাড়ছে। সম্প্রতি মিয়ানমারকে নিজেদের কক্ষপুটে টেনে নিয়ে বাংলাদেশে সামরিক হুমকির অবস্থা তৈরি করা, চাপ সৃষ্টি করা সবচেয়ে কাছের উদাহরণ। মিয়নমারের সামরিক সরকারও নিজেদের স্বীকৃতি, এবছরের নির্বাচন, অবরোধের ভেতরও ভারতীয় অস্ত্রের চালান পাওয়া ইত্যাদি নানান কারণে ওই জোটের কক্ষপুটে যাওয়াকে সুবিধা হিসেবে দেখেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ধরা হচ্ছে সবদিক থেকে, চারদিকে বিপদ বাড়ছে। আমাদের জীবনের, আমাদের রক্তমাংসের শরীর ও স্বার্থের—বাঁচামরার বিষয়ে আমরা কতটুকু সচেতন?
এবার সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। আগেই বলেছি, আমেরিকাকে যাঁতা দেয়ার কাঠি হিসেবে ব্যবহারের মজার দিকটাই ভারতের কাছে লোভনীয় উপভোগের বিষয় হয়েছে। এই উন্মত্ত জোরাজুরির বিপদের দিক, বিনিময়ে কী সে হারাচ্ছে—মজার খেলা ফেলে সেদিকে দেখার মতো হুঁশ তার নেই। অনেকে বলেন, নিজের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার জোরে নয়, বহিঃশক্তির গাঁটছড়ায় ভারতের যাঁতাপিষ্ট করার ক্ষমতা হাতে পাওয়াজনিত ভারসাম্যহীনতা এটা। এজন্য আমরা এটাকে মুই কি হনুরে হিসেবে হাজির হতে দেখছি। রাষ্ট্র বৈশিষ্ট্যে ইসরাইল যেমন নিজেকে আমেরিকা ভাবে, ভারতেরও সেসব বৈশিষ্ট্য-লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। জায়নবাদি ইসরাইলের সঙ্গে বিপুল সামরিক সহায়তা সম্পর্ক ও গোপন যোগসাজশ তো আছেই।
নিজেকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর কাজটা ভারত সুস্থিরভাবে চিন্তা করে অন্যদের সঙ্গে সম্মানজনক আদান-প্রদানে সমন্বয় করতে পারত। নিজের স্বার্থটাকে ভূ-আঞ্চলিক স্বার্থের ভেতর সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে সেখান থেকে সবার সঙ্গে নিজেরও স্বার্থ হাসিল করার সুযোগ ভারতের ছিল। এক বিরাট সুযোগ সে পেয়েছিল। এতে তার বিকাশ একটা শক্ত খুঁটি, একটা দীর্ঘস্থায়ী ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে নেয়ার সুযোগ ভারত নিতে পারত। কিন্তু এই কষ্টকর তবে কনক্রিট পথের চেয়ে বরং সবার ওপর জোরজবরদস্তি, বল প্রয়োগের সম্ভাবনা জারি রেখে, ভয় ও চাপ সৃষ্টি করে, আগ্রাসী চোখ রাঙানির পথটাই ভারতের পছন্দ হয়েছে।
আগে দেখা যেত বাংলাদেশের মতো দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা, পছন্দসই বৈশিষ্ট্যের একটা সরকার বদলের ব্যাপারটা কেবল পশ্চিমাদের হাতে থাকে, ঘটে। এই প্রথম ভারত টের পেয়েছে, এটা একটা খুবই সহজ ও মজার কাজ বটে। বাংলাদেশে এক-এগারোর সরকার কায়েমের অপতত্পরতায় একটা বড় ক্ষমতার ভাগীদার হিসেবে ভারত সেখানে জড়িত ছিল। বাংলাদেশের ওপর ছড়ি ঘোরানোর মওকা, নিজের ইচ্ছামাফিক হস্তক্ষেপ করে ঘটনাবলির ফল নিজ ঘরে তুলতে পারায় ভারত আরও ব্যগ্র হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে যা ইচ্ছা তাই করার ক্ষমতায় বলীয়ান বলে আত্মবিশ্বাসও ঝরে পড়ছে। ভারত ভেবে নিয়েছে, এটাই পথ। নিজেকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে বাধা, সমস্যা অপসারণে, কেমন বাংলাদেশ সে চায়, বাংলাদেশ থেকে যা নিতে চায়, যেমন সাইজে রাখতে চায়—সেভাবে পেতে একটা এক-এগারোর সরকার কায়েম থেকে শুরু করে সর্বশেষ হাসিনার সফরের প্রাপ্তি—এগুলো সহজে ও অনায়াসে করতে পেরেছে। নিজের কূটনীতি পরিচালনায় ভারতের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে; এই পথ বল প্রয়োগের সম্ভাবনা জারি রেখে, ভয় ও চাপ সৃষ্টি করে কাজ হাসিল করার, শর্টকাট বাজি মারার পথ। আমেরিকান চাঁড় কাঠি বা যাঁতা দিয়ে থেঁতলে দেয়া কাঠির যে এত গুণ তা দেখে ভারত যারপরনাই আহ্লাদিত। এই অর্জন আসলেই তার অর্জন কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার সময় এখনও আসেনি। কেবল নজর দিতে বলব এরই মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের যে ঘৃণা সে কামিয়েছে, যেভাবে এটা বাড়ছে তার দিকে। মানুষ আস্তে আস্তে ফুঁসে উঠবে এবং এটা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। পনের কোটি মানুষের মর্যাদা, জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তাকে পদদলিত করার আঘাতে যে ক্ষোভের বহ্নিশিখা জ্বলে উঠবে, তাতে ভারতের সব আশু অর্জনই বিসর্জনের শোকগাথা হয়ে যেতে পারে। এখনই সাবধান হয়ে সরে না এলে পরে ফেরার পথও থাকবে না। সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও নিতে হবে, তারা এটাই চায় কিনা।
আমরা ছোট্ট দেশ, দুই প্রতিবেশী চীন ও ভারতের এবং সহযোগী আমেরিকার এসব প্রস্তুতির হুঙ্কার, টানাটানি—সবই এখন আমাদের ওপর এসে পড়ছে। আমাদের রাজনীতির ওপর দিয়ে এর প্রভাব, টানাপোড়েন টের পেতে শুরু করেছি। যদিও সে প্রভাবের খবর আমাদের রাজনীতির কারবারি কিংবা সমাজের আয়েশি শ্রেণীর কাছে পৌঁছছে বলে মনে হয় না। বরং উল্টো হাসিনার ভারত সফর নিয়ে এখনই যে তোলপাড় সমাজে চলছে, একে ৬০-এর দশকের কায়দায় ভারতবিরোধিতা বলেই বিদ্রূপ করে অনেকেই আরামে নিদ্রা দিচ্ছে। অনেককে দেখছি, এটা ‘পাকিস্তানি মনের ভারত বিরোধিতা’ বলেই নিজে বুঝেছে, অন্যকেও বোঝার জন্য তাগিদ রেখেছে।
আমাদের রাজনীতিকে আজ ২০১০ সালে এভাবে বুঝতে চাওয়া শুধু কূপমণ্ডুকতাই নয়, রীতিমত অপরাধ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডার ধারাবাহিকতাই বটে। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একমাত্র এই আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিস্থিতির নতুন গতি-প্রকৃতি, যুদ্ধ আয়োজন এবং জোট গঠনের সমীকরণ থেকেই বুঝতে হবে। শত্রু-মিত্র নির্ধারণের যে মেরুকরণ খাড়া হয়েছে, সেখানে আমরা কোথায় আছি তাকে চিহ্নিত করেই প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রতিরোধের গণক্ষমতা গড়ে তুলে মোকাবিলা করতে হবে।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
Afsanul Alam Munshe 

No comments

Powered by Blogger.