সব ক্ষেত্রে ভোটের সংখ্যা বিচার কতটা কল্যাণকর by এম এইচ রহমতউল্লাহ

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি চিরায়ত দুর্বলতা এই যে এই ব্যবস্থা প্রধানত ভোটের ওপর নির্ভরশীল বিধায় নির্বাচিত সরকার বা কর্তৃপক্ষকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের তো বটেই, ছোটখাটো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীগুলোর অন্যায় আচরণ ও দাবি-দাওয়াও কখনো কখনো মেনে নিতে হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় সড়ক দুর্ঘটনার হার এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ওই সময়কার একটি পত্রিকায় একটি কার্টুন ছাপা হয়- যাতে দেখা যায়,


কয়েকটি বাস-ট্রাকের পাশে মোচওয়ালা ডাকাত চেহারার কয়েকজন ড্রাইভার সহাস্য বদনে আলাপচারিতায় লিপ্ত। কার্টুনটির ক্যাপশনে লেখা ছিল- 'এরা দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।' একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার ঘোষণা দেয়। এর প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিকরা শুরু করে আন্দোলন-ধর্মঘট। এরশাদ তখন মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করেন। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা তাতেও শান্ত হন না। শেষ পর্যন্ত এরশাদ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঘোষণাও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় তো তাঁর সরকার চিকিৎসা সেক্টর, পরিবহন সেক্টরের সংঘবদ্ধ চক্র থেকে শুরু করে ঠিকাদার চক্রের কাছে পর্যন্ত অহরহ আত্মসমর্পণ করেছে। সংঘবদ্ধ শক্তির ঔদ্ধত্যপনার অতি সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ হচ্ছে, বেআইনিভাবে বেসরকারি ক্লিনিকে প্র্যাকটিস করার দায়ে মৌলভীবাজার জেলার ভ্রাম্যমাণ আদালত একজন সরকারি চিকিৎসককে কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দেন। ব্যস, তাৎক্ষণিকভাবে ওই জেলার সদর হাসপাতালসহ সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তাররা ধর্মঘটে যান। তাঁদের দাবি, ওই ডাক্তারকে মুক্তি দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় দেশের মানুষের দৃষ্টি অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে সরে গিয়ে সীমান্তের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। ভারতকে পরাভূত করার কাল্পনিক গাল-গল্পের প্রভাবে ওই সময় মানুষের মধ্যে পাকিস্তানপ্রীতি অনেকটাই উথলে ওঠে, আয়ুব খানের জনপ্রিয়তাও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ঠিক সেই সময়ে (ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬) বাঙালিদের অধিকার আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ঘোষণা করাটা ছিল স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালনারই নামান্তর। 'একজনও যদি ন্যায্য কথা বলে, আমরা মেনে নেব'- এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর দর্শন। প্রসঙ্গত একটি কথা, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কিছু ভুঁইফোড় লোক রাতারাতি 'মুজিব-ভক্ত' হয়ে নানারূপ অপকর্মে লিপ্ত হয়। তাই দেখে অনেকে শেখ মুজিবের আদর্শের প্রতিও বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন, যা নিতান্তই অযৌক্তিক। মহাত্মা গান্ধী যখন ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলেন, তখন তিনিও ভালো করেই জানতেন যে এর ফলে তাঁর নিজেকে ও কংগ্রেস দলকে একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর সমর্থন হারাতে হবে। কিন্তু কিছু ভোট তথা জনসমর্থনের লোভে তিনি তাঁর নীতির সঙ্গে আপস করেননি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যাবহিত পরে মাওলানা মোহাম্মদ আলী-শওকত আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত খেলাফত আন্দোলন গান্ধীজি এবং কংগ্রেসের সমর্থন পেয়ে দুরন্ত রূপ পরিগ্রহ করে। খিলাফতের সঙ্গে কংগ্রেসের যৌথভাবে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি বাস্তবিকই টলে ওঠে। কিন্তু হঠাৎ করে আন্দোলনকারীরা সহিংসতার পথে অগ্রসর হন। গান্ধীজি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা উত্তর প্রদেশের একটি পুলিশ ফাঁড়িতে (চৌরিচৌরা) আগুন দিয়ে ২৩ জন পুলিশকে পুড়িয়ে মারলে গান্ধীজি তাৎক্ষণিকভাবে অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করেন। এর ফলে গান্ধীজি ও কংগ্রেসকে হারাতে হয় খেলাফত আন্দোলনের সমর্থক বিরাটসংখ্যক ভারতীয় মুসলমানের সমর্থন। কিন্তু করমচাঁদের ছেলে মোহন দাস ভোটের কিংবা জনসমর্থনের কাঙাল ছিলেন না। সারা পৃথিবীর মানুষের সমর্থন হারালেও তিনি তাঁর অহিংসতার নীতি থেকে বিচ্যুত হতেন না। কলকাতায় মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির পাদদেশে যথার্থভাবেই লেখা হয়েছে, 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।' তাঁর জন্মদিন ২ অক্টোবর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস ঘোষণা করেছে। ওই দিন যুদ্ধরত দেশগুলো একে অপরের ওপর হামলা বন্ধ রাখবে, পৃথিবীর কোথাও কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না।
১৮৬৩ সালে মহামতি আব্রাহাম লিংকন যখন তাঁর বিখ্যাত Emancipation Proclamation-এর মাধ্যমে কালোদের মুক্তির বার্তা ঘোষণা করেন, তখনকার আমেরিকান মানসিকতায় সেটা ছিল গরু-ছাগলকে মানুষের সমান অধিকার দেওয়ারই নামান্তর। ওই সময় আমেরিকার ধনিক শ্রেণীর লোকেরা গর্ব করে গল্প করত, কার ফার্মে কয়টি ঘোড়া, কয়টি গরু এবং কয়টি 'নিগার' আছে। গরু-ছাগলের হাটের মতো প্রতি সপ্তাহে 'নিগার' কেনাবেচার হাট বসত। সাদা চামড়ার লোকেরা হাটে গিয়ে শক্ত-সামর্থ্য 'নিগার' বেছে কিনে নিয়ে আসত। প্রেসিডেন্ট লিংকনের এই ঘোষণায় আমেরিকাবাসীর অনেকেই তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। একটি পত্রিকায় আব্রাহাম লিংকনের মাথার ওপর দুটি শিং যুক্ত করে কার্টুন প্রকাশ করে তাঁকে শয়তানের প্রতিভূ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ভোটের সংখ্যা আর জনসভায় অংশগ্রহণকারীদের মাথা গোনার চিন্তা করলে লিংকনের পক্ষে এ ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হতো কি! ব্রিটিশ শাসক লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক কর্তৃক ঘৃণ্য সতীদাহ প্রথা বিলোপ করাটা (১৮২৯ সালে) ছিল তখনকার হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর একটি চরম আঘাত। হুমায়ুন-আকবর-শাহজাহান-জাহাঙ্গীরের মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মোগল সম্রাটরা যা পারেননি, হিন্দুদের প্রতি জিজিয়া কর ধার্যকারী কট্টর মুসলিম আওরঙ্গজেব পর্যন্ত যে প্রথা রদ করতে সাহসী হননি, উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সেই কাজ করেছেন। কট্টর হিন্দুরা তো বটেই, সাধারণ হিন্দুরা পর্যন্ত বেন্টিঙ্কের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলেও এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন, যা ১৮৩২ সালে প্রত্যাখ্যাত হয়। আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আজ আমরা অনেক জনকল্যাণকর উদ্যোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি শুধু ভোটের স্বার্থে। সেসব এ ছোট নিবন্ধে নাই বা উল্লেখ করলাম।

লেখক : নিবন্ধকার
mhrullah@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.