শ্রমিকদের বেতনকাঠামো ২০০৯ থেকে কার্যকর

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার দাবি অবশেষে মেনে নেওয়া হলো। শ্রমিকদের অন্যান্য প্রান্তিক সুবিধা ২০১০ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


এতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ এবং মজুরি স্কেল বাস্তবায়নের তারিখ পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
বকেয়া বেতন ও প্রান্তিক সুবিধাগুলো চার কিস্তিতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন কাঠামোতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের প্রারম্ভিক সর্বোচ্চ বেতন হবে পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা। আর সর্বনিম্ন বেতন হবে চার হাজার ১৫০ টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ প্রস্তাব অনুমোদনের আগে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের তারিখ ছিল ২০১০ সালের ১ জুলাই। আর প্রান্তিক সুবিধাগুলো গত বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে বলে জানানো হয়েছিল।
শ্রমিকদের আরেকটি দাবি ছিল, কোনো শ্রমিক মারা গেলে তাঁর পরিবারকে ওই শ্রমিকের ৩৬ মাসের বেতন জীবনবিমা হিসেবে পরিশোধ করা। এতে বেশির ভাগ মৃত শ্রমিকের পরিবার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পেত। সরকারের পক্ষ থেকে জীবনবিমার ওই টাকার পরিমাণ কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছিল। গতকালের মন্ত্রিসভায় ৩৬ মাসের বেতন হিসেবে জীবনবিমা পরিশোধ করার দাবিও মেনে নেওয়া হয়।
শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সতর্কভাবে স্বাগত জানিয়েছে। তবে শ্রমিকদের বেতনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দাবি এখনো পূরণ হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ও মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, মূল বেতনের সঙ্গে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বাড়ানো। একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলো থেকে শ্রমিকদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করারও দাবি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ পাট, সুতাকল শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শ্রমিক নেতা শহীদুল্লাহ চৌধুরী এ ব্যাপারে বলেন, সরকার শ্রমিকদের দাবি মেনে নিলেও বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন ২০০৯ সাল থেকে মজুরি কমিশন কার্যকর হলেও এ তিন বছরে দ্রব্যমূল্য অনেকে বেড়েছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণ নিশ্চিত করতে হলে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মন্ত্রিসভার অন্যান্য সিদ্ধান্ত: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হলে বিদেশি অপারেটরের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। এ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার সহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আণবিক শক্তি কমিশন এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য গত বছরের ২ নভেম্বর রাশিয়ার সঙ্গে ‘সহযোগিতা চুক্তি’ করে বাংলাদেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছরের শেষ দিকে বা আগামী বছরের শুরুতে দুই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হবে। এ প্রকল্প পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ হবে বলেও সরকার আশা করছে সরকার।
মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা জানান, পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়ায় একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যদি কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার দায় নেবে বিদেশি অপারেটর। এই আইনে ক্ষতিপূরণের কথাও বলা আছে। বিদেশি অপারেটরের অবশ্যই বিমা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির কোনো অভিযোগ বা দাবি থাকলে তা ১০ বছরের মধ্যে জানাতে হবে। ৫০ বছরের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ‘বাংলাদেশ আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠিত হবে পাঁচ সদস্য নিয়ে। প্রতিটি কমিটির মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি করার কথাও বলা হয়েছে খসড়ায়। তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তির জন্য এমন একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের দরকার, যারা নিজেদের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতিও মেনে চলবে। আমাদের এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কোনো কাঠামো নেই। এ ছাড়া, কোনো আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও নেই। এ জন্যই এই আইন। তিনি জানান, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য অপসারণ এবং এ প্রক্রিয়ার মান এবং পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলোও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গত ২ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
এ ছাড়া চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন গঠনে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব তোলার দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর ৩ এপ্রিল ‘জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভায় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন গঠনের বিল উত্থাপন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (এফডিসি) নামে পরিচিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১৯৫৭ সালের সেই দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছরের ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে পালন করা হবে।

No comments

Powered by Blogger.