বিচিন্তা সম্পাদক মিনার মাহমুদ আর নেই

আশির দশকের আলোচিত সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিন্তার সম্পাদক মিনার মাহমুদ আর নেই। গতকাল বৃহস্পতি-বার বিকেলে পুলিশ রাজধানীর একটি হোটেল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ ও পরিবারের ধারণা, মিনার মাহমুদ আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫০ বছর।


মিনার মাহমুদ স্ত্রীকে নিয়ে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় থাকতেন। পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, বুধবার সকাল নয়টায় তিনি বাসা থেকে বের হন। এরপর সারা দিন তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। গতকাল বিকেলে খিলক্ষেত এলাকার রিজেন্সি হোটেল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত্যুর আগে স্ত্রীকে পাঁচ পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে গেছেন মিনার মাহমুদ।
হোটেল রিজেন্সির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিনার মাহমুদ বুধবার সকালে একটি কক্ষ ভাড়া নেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মিনারের হোটেল ছাড়ার কথা ছিল। একপর্যায়ে তাঁর ভাই এসে খোঁজ করলেও নিয়ম না থাকায় তাঁরা কোনো তথ্য দেননি। তবে সারা দিন কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বিকেলে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে দেড় যুগের প্রবাস জীবন শেষে গত বছর মিনার মাহমুদ দেশে ফেরেন।
মিনারের ভাই মেহেদি হাসান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বুধবার সকাল নয়টার দিকে তিনি বাসা থেকে বের হন। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাচ্ছিলাম না। আজ (বৃহস্পতিবার) বিকেলের দিকে তাঁর মোবাইলটি চালু হয়। কল করলে ফোন ধরেন খিলক্ষেত থানার ওসি। তিনি জানান, মিনার মাহমুদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।’ এর আগে মোবাইলের শেষ কল থেকে ভাইয়ের অবস্থান চিহ্নিত করে রিজেন্সি হোটেলে গিয়েছিলেন মেহেদি। কিন্তু মিনার ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব’ সাইন ঝুলিয়ে রাখায় এবং নিরাপত্তার নিয়ম দেখিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোনো তথ্য দেয়নি।
মেহেদি হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম দাঁড় করানোর জন্য ভাইয়া অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত কোথাও জায়গা পাচ্ছিলেন না। তাঁর অনেক ক্ষোভ ছিল। গত বছর ঈদের আগে মায়ের মৃত্যুতে খুব আঘাত পান। এসব ক্ষোভ ও দুঃখ থেকেই হয়তো তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে রিজেন্সি হোটেলের সপ্তম তলার একটি কক্ষে টেবিলের ওপর কাত হওয়া অবস্থায় মিনার মাহমুদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। কক্ষে বেশ কয়েকটি ঘুমের ওষুধ ও এর খোসা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া টেবিলে ছিল স্ত্রীকে লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার একটি চিঠি। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের জীবন নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন মিনার মাহমুদ। ওই জীবনকে তিনি দাসত্বের জীবন বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া সাংবাদিকতা নিয়েও অনেক হতাশার কথা লিখেছেন তিনি।
মিনার মাহমুদের মৃত্যুর খবর পেয়ে একসময়ের সহকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁর উত্তরার বাসায় ছুটে যান। প্রয়াত সাংবাদিকের স্ত্রী মোসাম্মৎ লুবনা এ সময় উপস্থিত পুলিশকে বলেন, ‘আমার কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। আমি চাই না সাংবাদিকেরা আমার স্বামীর মৃত্যু নিয়ে হইচই করুক। লাশের ময়নাতদন্ত হোক, সেটাও চাই না।’
মিনার মাহমুদের জন্ম ফরিদপুর শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন তিনি। গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাপ্তাহিক বিচিন্তায় লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিকতার জগতে পা রাখেন। সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮৭ সালে মিনারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিন্তা। পত্রিকাটি বেশ পাঠকপ্রিয়তা পায়। কিন্তু মিনার সামরিক শাসনবিরোধী লেখার কারণে ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার হলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯১ সালে আবারও প্রকাশিত হয় বিচিন্তা। তবে সে বছরই এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান মিনার মাহমুদ। দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০০৯ সালে তিনি দেশে ফেরেন। গত বছরের মার্চ মাসে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়।

No comments

Powered by Blogger.