নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কি আইনের ঊর্ধ্বে?-সুন্দরবনে নৌরুট

আইন রক্ষা ও তা মেনে চলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের, কিন্তু সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ যদি আইন অমান্য করে, তবে আইন রক্ষা করবে কে? বন আইন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন বলে যে কিছু রয়েছে, তার যেন কোনো তোয়াক্কাই নেই অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। এমনকি সরকারের অপর এক মন্ত্রণালয়ের আপত্তি ও আইনের দোহাইকেও কোনো পরোয়া নেই।


সেটা যদি থাকত তবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পরও আইন লঙ্ঘন করে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মাসের পর মাস ধরে তেল ও মালবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারত না।
আইন বলছে, সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলোতে কোনো ধরনের নৌযান প্রবেশ করতে হলে বন বিভাগের অনুমতি লাগবে। আর এই নদীগুলোতে ভারী নৌযান চলাচলও নিষিদ্ধ। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিআইডব্লিউটিএ যেন আইনের ঊর্ধ্বে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে একটি নৌরুট চালু করেছে তারা। তাদের অনুমতি নিয়েই পাঁচ মাস ধরে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলছে তেলবাহী ট্যাংকার, মালবাহী কার্গো। সুন্দরবনের গুরুত্ব কী, তা কি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে নতুন করে বোঝাতে হবে? প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে সুন্দরবনকে স্থান দেওয়ার জন্য দেশবাসী কত কিছুই না করল। আর আমাদের সরকারেরই একটি বিভাগ যেন সুন্দরবনের সর্বনাশ করাকে দায়িত্ব হিসেবে মনে করছে! তা না হলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে কয়েক দফা চিঠি দেওয়ার পরও তারা নির্বিকার বসে থাকতে পারত না।
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকার ও মালবাহী কার্গো থেকে যে তেল নিঃসরণ হচ্ছে, তাতে দূষিত হচ্ছে সুন্দরবনের নদী ও খালের পানি-মাটি। ভারী ও বড় বড় এসব নৌযানের ঢেউয়ে ধসে যাচ্ছে পাড়ের নরম মাটি। বিকট শব্দে দিশেহারা সুন্দরবনের প্রাণিকুল। ব্যাহত হচ্ছে তাদের জীবনযাপন-প্রক্রিয়া ও খাদ্য গ্রহণ। যে জায়গাকে সরকার ডলফিনের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণার পরিকল্পনা করছে, যে অঞ্চলে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে কম জায়গায় সবচেয়ে বেশি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সেখান দিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে নৌরুট, চলাচল করছে তেল আর পণ্যবাহী জাহাজ! বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বনের ওপর এমন অত্যাচার সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব।
কিছু ক্ষতি আছে, যা পরে কোনো না কোনোভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু যে ক্ষতি পূরণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই, সেই ক্ষতিটা যদি আমরা জেনেশুনে করি, তবে এর চেয়ে বড় দায়িত্বহীনতা আর কাকে বলে? আমাদের বিআইডব্লিউটিএ তথা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আইন উপেক্ষা করে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচলের রুট করে এ কাজটিই করছে। সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ, সুন্দরবনের আরও ক্ষতি হওয়ার আগে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে সামলান। মন্ত্রণালয়টিকে দেশের আইন মানতে বাধ্য করুন।

No comments

Powered by Blogger.