পরিবহন-রেলগাড়ি ঝম্ঝম্.. by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

দেশে রেল পরিবহনের দেড় শ বছর পূর্তি হলো। ১৮৬২ সালে ব্রিটিশদের শাসনের সময় ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রানাঘাট পর্যন্ত যে রেলপথ স্থাপন করেছিল, পরে তা-ই সম্প্রসারিত হয় কুষ্টিয়ার দর্শনা-জগতী পর্যন্ত। রেলের ওই খবরে আমি একটু নস্টালজিক হয়ে উঠেছিলাম।


মনে পড়ে গেল শৈশবের রেলের সেই ছড়াটি—
‘রেলগাড়ি ঝম্ঝম্
পা পিছলে আলুর দম
ইস্টিশানে মিষ্টিকুল
শখের বাগান গোলাপ ফুল।’

ছড়াটির অর্থ যে কী, বুঝিনি। কিন্তু মামাবাড়ির পাশ দিয়ে রেললাইন ধরে যখন হুইসেল বাজিয়ে ভস্ভস্ করতে-করতে স্টিম ইঞ্জিনের রেলগাড়ি চলে যেত, তখন মামাতো ভাইদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমিও ওই ছড়া আবৃত্তি করতাম।
দেড় শ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আমাদের দেশে রেল পরিবহন-ব্যবস্থায় পরবর্তীকালে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। দেশের দুই হাজার ৮৫৫ কিলোমিটার রেলপথে এখন ২৩৫টি যাত্রীবাহী এবং ৪৮টি মালবাহী ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। দেশে বেশ কয়েকটি মধ্যমমানের দ্রুতগামী ইন্টারসিটি ট্রেন চালু হয়েছে। কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে বড় বড় স্টেশনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। ওয়াগন ও কার্গোর চলাচলে কম্পিউটারাইজড-ব্যবস্থা সংযুক্ত হয়েছে কোথাও কোথাও। এসবের পরও প্রতিবছর ১ দশমিক শূন্য ২ মিলিয়ন টাকা রেলকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে যথাযথ যাত্রীসেবা দিতে পারছে না। বিষয়টিতে সত্যতা রয়েছে। ষাটের দশক থেকে বর্তমান সময়ে রেলের যাত্রীসংখ্যা এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। অনুরূপ অনুপাত মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রেও। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। রেলে যাতায়াতে ক্রমান্বয়ে মানুষের আগ্রহ তো এখন বাড়ছে। রেলপথে বেপরোয়াভাবে ড্রাইভিংয়ের সুযোগ নেই, সড়কপথের মতো ট্রাফিক জ্যাম নেই, ছয় ঘণ্টার পথ ১০-১২ ঘণ্টায় অতিক্রম করতে হয় না। দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকিও অনেক কম। আমাদের দেশে এখন নৌপথের পরিমাণ খুব সামান্য। ওই নৌপথের চিত্রও ভয়াবহ। বর্ষা কেন? শুষ্ক মৌসুমেও মেঘনা-পদ্মায় প্রতিবছর অসংখ্য প্রাণহানি হয় লঞ্চ-স্টিমার যাত্রীর। কাজেই জানমালের নিরাপত্তার জন্য রেলগাড়িই জনগণের এখন প্রধান ভরসা। সরকারি মালিকানাধীন হওয়ার কারণে ধুমধারাক্কা করে টিকিটের দাম বাড়ানো হয় না ট্রেনের। সাধারণ শ্রেণীর টিকিট বাস বা লঞ্চ-স্টিমারের তুলনায় অনেক কম, সাশ্রয়ী। বলা চলে, টিকিটের দাম যাত্রীদের নাগালের মধ্যেই থাকে।
এ সত্ত্বেও আমাদের রেল পরিবহনের দশা এত করুণ কেন? সরকার প্রচেষ্টা চালালেই রেলপথকেই প্রধান গণপরিবহন হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশের এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭ বর্গকিলোমিটারের ৭৫ শতাংশ স্থলভাগ; বাকি জলাশয়, নদী-নালা, অরণ্য ও চারণভূমি। এটুকু জায়গায় ১৬ কোটি (?) লোকের বাস। প্রতিনিয়ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মিত হওয়ায় ওই ৭৫ শতাংশ জমিও কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
বিশ্বের উন্নত সব দেশেই পরিবহন-ব্যবস্থায় রেলপথ প্রাধান্য পাচ্ছে—যদিও সেসব দেশে শক্তিশালী অন্যান্য মাধ্যমের পরিবহন নেটওয়ার্ক রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও পরিবহন সেক্টরের সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রেলপথকে। বাংলাদেশের যাতায়াত-ব্যবস্থা সুষ্ঠু, নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে হলে রেলপথকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তবে জরুরি, রেলের আধুনিকায়নসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কার। দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ ইঞ্জিন এবং কোচ ব্যবহূত হচ্ছে, তা যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। দরকার আরও বিপুল পরিমাণ ওয়াগন, কন্টেইনার, যাতে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে খাদ্যশস্য, পাট, সার, সিমেন্ট, কয়লা, লোহা, ইস্পাত, পাথর, পেট্রোলিয়াম, লবণ, চিনি ইত্যাদি মালামাল পৌঁছানো যায়। যমুনা নদীর পশ্চিম পারে ব্রডগেজ ও পূর্ব পারে মিটারগেজ লাইন চালু রয়েছে। এই ব্রডগেজ-মিটারগেজ রেলপথ যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। ব্রডগেজ লাইন থেকে মিটারগেজ লাইনে মালামাল ওঠা-নামা করানো অত্যন্ত ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার। সরকারকে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেলপথগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে। নতুন রেলপথ স্থাপনের ক্ষেত্রেও প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে। ট্রেনকে গণপরিবহন করতে চাইলে এসব বিষয় উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
রেল পরিবহন যদি নিরাপদ করা যায়, দ্রুতগামী করা যায়, সুষ্ঠুভাবে, নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করে দেওয়া যায়, তবে এই পরিবহন-ব্যবস্থার কর্মপরিধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। রেলের আর্থিক ব্যবস্থার উন্নতি হলে সরকারকে আর অন্তত ভর্তুকি দিতে হবে না। দূষণমুক্ত পরিবেশ একমাত্র রেলব্যবস্থাই উপহার দিতে পারে যাত্রীদের, দেশবাসীকে। যে কথা বলছিলাম, আগে প্রয়োজন রেলের সার্বিক সংস্কার ও আধুনিকায়ন। ডিজিটালাইজেশনের এই যুগের রেলগাড়ি তো কয়লায় চলা বাষ্পীয় শকট নয়। এ যুগের রেলগাড়ির শব্দ তো আলাদা। এখনকার রেলগাড়ি ঝম্ঝম্ শব্দে গন্তব্যের পথে যাত্রা করে না। এই রেলগাড়ি নিয়ে হয়তো আগামী প্রজন্মের কবিরা নতুন করে ছড়া রচনা করবে। নতুন সেই দিনের প্রতীক্ষায় থাকব আমরা।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক, অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.