কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই-ইউপি স্ট্যান্ডিং কমিটি by নবীউর রহমান পিপলু

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদে স্ট্যান্ডিং কমিটি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে কিংবা এর দায়বদ্ধতা কতটুকু? খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, 'কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই' অনেকটা বাংলা প্রবাদের মতোই পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস প্রায় দু'শ বছরের। অথচ এ প্রতিষ্ঠানটি আজও কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।


একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা যায়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের একটি সক্রিয় ও কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। বলা যায়, ইউনিয়ন পরিষদই হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়নের একটি কেন্দ্রবিন্দু। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডসহ জনগণের মধ্যে সেবা প্রদান ও জন-অধিকারকে নিশ্চিত করাই এর অন্যতম কাজ। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু ভোট দেওয়া আর নেওয়া ছাড়া এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জনগণকে তেমন সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ এখনও আমলা, সাংসদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। আবার এ প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিনিধিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণাও তেমন ইতিবাচক নয়। যার ফলে নিয়ন্ত্রণমূলক এ প্রতিষ্ঠানটি একদিকে সঠিকভাবে জনসেবা ও জন-অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না, অন্যদিকে জনগণ হাতের কাছের এই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানটিকে এখনও নিজেদের প্রতিষ্ঠান বলে ভাবতে শেখেনি। গত তিন দশকে সরকার পরিবর্তনের ধারায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কার্যত এসব উদ্যোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং তেমন কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটি পরিবর্তনের দোলাচলেই রয়ে গেছে। এটি উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ থাকলেও তা থেকে বারবার বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। অন্যভাবে বলা যায়, গণতান্ত্রিক এ প্রতিষ্ঠানটিকে জনগণের ভালোমন্দ দেখভাল করতে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করতে হবে। নিধিরাম সর্দার করে রাখলে এ প্রতিষ্ঠান কখনোই শক্তিশালী কাঠামোয় রূপান্তরিত হবে না।
তবে আশার কথা, এখনও একে শক্তিশালী করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের উদ্যোগেরও কমতি নেই। ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা, কার্যকারিতা, কাঠামো সংস্কারসহ নানা বিষয় নিয়ে কর্মশালা ও সেমিনারে বিস্তর আলোচনাও হচ্ছে।
এবার প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ইউনিয়ন পরিষদকে স্থানীয় পর্যায়ের বিকাশ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রচলিত বিধিমালা ও সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী ১০টি আবশ্যিক ও ৩৮টি সাধারণ কাজ করতে হয়। এসব কাজ দেখভাল করতে এবং ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা ও জনপ্রতিনিধিদের দক্ষতা, কাজের স্বচ্ছতা বাড়াতে স্ট্যান্ডিং কমিটি কাজ করে। স্ট্যান্ডিং কমিটি ও অ্যাডহক কমিটি গঠনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের বলিষ্ঠ সদস্যে পরিণত করা যায়। ব্রিটেন, ভারত, সুইডেন, পাকিস্তানসহ অনেক দেশে স্ট্যান্ডিং কমিটি ও অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদে স্ট্যান্ডিং কমিটি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে কিংবা এর দায়বদ্ধতা কতটুকু? খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে_ 'কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই' অনেকটা বাংলা প্রবাদের মতোই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বাংলাদেশের ছোট্ট জেলা নাটোর। এ জেলায় ৫২টি ইউনিয়ন আছে। জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটির কাজের পরিধি ও দায়িত্ব সম্পর্কে জনপ্রতিনিধিদের পুরোপুরি ধারণা নেই। নির্বাচনের ছয় মাস হলো, এখনও ইউনিয়ন পরিষদের কাজে ব্যাপকতা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ধারণা হয়নি। অথচ ইউনিয়ন পরিষদে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও জবাবদিহিতা বাড়াতে ইউনিয়ন টেন্ডার কমিটি, হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি, ভিজিডি, টিআর ও কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কমিটিসহ ১৩টি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত সেবা পেতে রাজনৈতিক এবং আমলাদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, তবেই সম্ভব নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পর্যাপ্ত সেবা দিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা।

নবীউর রহমান পিপলু :সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.