নাটকে কখন আবেগ আনতে হয় জানেন তিনি-বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক by পার্থ চট্টোপাধ্যায়

গত ৬ সেপ্টেম্বর হাসিনা-মনমোহন চুক্তির ফলে ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশেরই লাভ হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি লাভবান হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের রাজনীতিতে অনেক সময় নিজের নাক কেটেও যে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে হয় এই ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী তা বোঝেন। বোঝেন কখন, কোন নাটকীয় মুহূর্তে আবেগ সৃষ্টি করতে হয়। আর নাটক করতেও তিনি পটু।
একটা সময় যখন তিনি কংগ্রেসে ছিলেন এবং রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের সঙ্গে তার বিরোধ তুঙ্গে, তিনি প্রকাশ্য সভায় গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিলেন। রেলমন্ত্রী থাকার সময় (বাজপেয়ি সরকারের আমলে) প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজের বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। ফার্নান্দেজকে পদত্যাগ করতে হলো। দুর্নীতির প্রতিবাদে মমতাও রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। পশ্চিমবঙ্গবাসী একজন বাঙালি রেলমন্ত্রী পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল। মমতা সে সময় রাজ্যের সুবিধার জন্য কয়েকটি ট্রেন চালিয়ে খুব জনপ্রিয়ও হয়েছিলেন, হঠাৎ ওই নাটকীয় পদত্যাগে রাজ্যবাসী হতাশ হয়। এরপর তিনি বাজপেয়ির এনডিএ জোট থেকে বেরিয়ে কংগ্রেস জোটে যোগ দিয়ে আবার রেলমন্ত্রী হন। কিন্তু তার পাখির চোখ ছিল বরাবর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদটির দিকে।
তার বরাবরই একটি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে। তাতে তিনি বুঝতে পারেন কোন কোন পদক্ষেপ নিলে তার জনপ্রিয়তার পারদ ক্রমশ উঠতেই থাকবে। তিনি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনকে বেছে নিলেন, যা ছিল বামফ্রন্টের পালের হাওয়া। ৩৪ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্য। কয়েক লাখ সক্রিয় ক্যাডার আর কোটি কোটি টাকার পার্টি। অন্তত কয়েক ডজন ঘাগু নেতার মস্তিষ্ক কাজ করছিল যে দলের পেছনে। শত শত বুদ্ধিজীবীকে এক রকম কিনে নিয়েছিল যে দল, সেই দলটিকে এক রকম বঙ্গোপসাগরেই বিসর্জন দিয়েছেন একা এক-পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রায় বস্তিতে বড় হয়ে ওঠা, সাদা শাড়ি আর স্লিপার পরা পোড়-খাওয়া এক বাঙালি মেয়ে। কয়েকবার মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রায় মরো মরো ছিলেন। একসময় এলিট বাঙালিরা তাকে বলত 'পাগলি'। এক রাজনৈতিক সহকর্মী তার নাম দিয়েছিল 'বেদের মেয়ে জোছনা' (বাংলা সিনেমার নাম)। কেন্দ্রের প্রবল প্রতাপশালী কংগ্রেস সরকার পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম সরকারকে প্রচণ্ড ভয় করত। তাদের রসে-বশে রাখার চেষ্টা করত। ইন্দিরা জ্যোতি বসুকে পারতপক্ষে ঘাঁটাতেন না বরং প্রণব মুখার্জিকে দিয়ে সিপিএমের সঙ্গে একটা গোপন হটলাইন খুলে রেখে দিয়েছিলেন। রাজীব গান্ধী জ্যোতি বাবুকে বলতেন 'আঙ্কেলজি'। সেই জ্যোতি বসু মমতাকে কখনও পাত্তা দেননি। একবার এমপি মমতা এক মূক-বধির বালিকার ওপর রেপ হয়েছিল বলে তাকে নিয়ে জ্যোতি বাবুর সঙ্গে দেখা করে নালিশ জানানোর জন্য মহাকরণে গিয়েছিলেন। জ্যোতি বাবু দেখা করতে চাননি। মমতা তার চেম্বারের সামনে ধরনায় বসে পড়েন। জ্যোতি বাবুর নির্দেশে পুলিশ লাঠি দিয়ে মারতে মারতে মমতাকে মহাকরণ থেকে তাড়িয়ে দেয়। সেই মমতা ২০১১ সালের মধ্যে অসাধ্য সাধন করেন। যে সোমেন মিত্রের সঙ্গে মমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে মমতা-কংগ্রেস বিরোধের সূত্রপাত, সেই সাবেক পহেলা দুশমন প্রবীণ সোমেন মিত্র এখন সস্ত্রীক মমতার বিশ্বস্ত সৈনিক। সোমেন তৃণমূল এমপি আর তার পত্নী শিখা তৃণমূল বিধায়ক। যে সুব্রত মুখোপাধ্যায় একদা মমতাবিরোধী ছিলেন তিনি পরে তৃণমূলের মেয়র হন। তারপর মমতাকে ত্যাগ করে সুব্রত বাবু কিছুদিনের জন্য কংগ্রেসে ফিরে গিয়ে আবার তৃণমূলেই প্রত্যাবর্তন করেন। সেই অপরাধে মমতা সুব্রতকে তখন আর মেয়র করেননি। তার বদলে তার আরও অনুগত শোভন চট্টোপাধ্যায়কে কলকাতার মেয়র করেন। শোভন এত অনুগত যে, একবার এক সুইমিংপুল উদ্বোধনের সময় মমতা মেয়র শোভনকে বলেছিলেন, তুমিও জলে নামো। শোভন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা অবস্থাতেই দিদির নির্দেশে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই থেকে তার নাম হয়েছে জল-শোভন। মমতার স্টার এখন এমন তুঙ্গে তিনি ছাই ধরলে তা সোনা হয়ে যাচ্ছে। নয়তো সিঙ্গুরের মতো রাজ্যের সর্বত্র কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে সরকার কারখানা করতে বিভিন্ন কোম্পানিকে লিজ দিয়েছে। নামমাত্র দরে জমি-বেড়ি দখল করে হলদিয়া-দুর্গাপুর, সল্টলেক, রাজারহাট প্রকল্প হয়েছে। জমির মালিকরা বঞ্চিত ও অসন্তুষ্ট থেকেছে, কিন্তু সিঙ্গুরে এভাবে জমি নিতে গিয়ে টাটারা শুধু ফেঁসে গেল না, ৩৪ বছরের ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী এক সরকারের ভরাডুবি হলো। সিঙ্গুরে তবু টাটাদের মোটর কারখানার কাজ অর্ধেকটাই হয়ে গিয়েছিল (এখন কলকাতা থেকে বর্ধমান যাওয়ার পথে হাইওয়ের পাশে দেখবেন কারখানা হয়ে পড়ে আছে)। আর কলকাতা থেকে দিঘা যাওয়ার পথে নন্দীগ্রামে তো জমি নেওয়াই হয়নি। কেমিক্যাল-হাব (যঁন) করার জন্য গ্রাম উচ্ছেদ করে জমি নেওয়া হবে বলে ভিডিও অফিসে একটা নোটিশ মেরে দেওয়া হয়েছিল। সে নোটিশটিও পরে উধাও হয়ে যায়। সরকার কোনো নোটিশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। শুধু মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে যাওয়ার ফলেই গ্রামের লোক একাট্টা হয়ে যায়। সিপিএমও একাট্টা হয়। গ্রামের পর গ্রামজুড়ে দু'দলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পার্টির নেতারাও তাদের ক্যাডারদের মদদ দিতে থাকেন। এই নিয়ে ধুল্পুব্দমার কাণ্ড।
সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামে অতি সামান্য ব্যাপার থেকে দাবানল জ্বলে উঠেছিল। যেটি সর্বভারতীয় রূপ নেয়। মমতা এই পরিস্থিতিটা তার রাজনৈতিক কাজে লাগিয়েছেন। তিনি কলকাতার ঠিক কেন্দ্রভূমি এসপ্লানেড মেট্রোর সামনে ২৬ দিনের অনশন করে এটিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেন। এর আগে এই জমি দখলের বিরুদ্ধে উড়িষ্যায় গুলি চলেছে, কিন্তু সেখানকার কোনো বিরোধী নেতা একে সর্বভারতীয় ইস্যু করে তুলতে পারেননি। উড়িষ্যায় খনি হস্তান্তর নিয়ে আদিবাসীদের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘ সংগ্রাম চলেছে। এমনকি কয়েক মাস আগে ইউপিতে কৃষকদের গুলি করে হটিয়ে দিল মায়াবতী সরকার। স্বয়ং রাহুল গান্ধী ছুটে গেলেন। আন্দোলন দানা বাঁধল না। আর মমতার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে এক ধুল্পুব্দমার কাণ্ড ঘটে গেল। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি যেমন বিশ্ব রাজনৈতিক অভিধানে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামও। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য_ এই প্রথম সিপিএম ভেঙে একদল নাট্যকার, কবি, সাহিত্যিক মমতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। মমতা তাদের অনেককেই পুরস্কৃত করেছেন মোটা বেতনের সরকারি পদ দিয়ে অথবা সরকারি কমিটির চেয়ারম্যান করে। মহাশ্বেতা দেবী হয়েছেন বাংলা আকাদেমির চেয়ারম্যান আর কবি জয় গোস্বামী নজরুল আকাদেমির চেয়ারম্যান। মমতা যখনই ক্ষমতায় তখন দলে দলে তার দলে ছুটে এসেছেন নামি অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। একমাত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়া সিপিএমে এখন আর তেমন কোনো নামি শিল্পী নেই। সবাই দিদির দলে।
সিপিএমের অবস্থা এখন বড় করুণ। নির্বাচনের পর তাদের ৩৩ জন কর্মী খুন হয়েছে। একজন সাবেক বিধায়ক মনের দুঃখে আত্মহত্যা করেছেন। ১৪ হাজার সিপিএম কর্মী ঘরছাড়া। ১৫০০ মামলা চলছে সিপিএম কর্মীদের বিরুদ্ধে। গড়াবতায় মাটি খুঁড়ে নিখোঁজ তৃণমূল কর্মীদের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। সেই কঙ্কাল কাণ্ডে গ্রেফতার হয়ে হাজতবাস করছেন সাবেক সিপিএম মন্ত্রী সুশান্ত ঘোষ। সিপিএমের অভিযোগ, গ্রামে গ্রামে তৃণমূলরা তাদের কর্মীদের জরিমানা করছে। প্রায় ২ কোটি টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে এভাবে। ৫২৭ জন সিপিএম কৃষকের ১ হাজার একর রায়তি জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ২৭০০ একর জমি থেকে ১৪ হাজার কৃষককে নাকি উচ্ছেদ করা হয়েছে।
এসব সিপিএমের অভিযোগ। ওদের মুখপত্র গণশক্তিতে প্রতিদিন ত্রাহি ত্রাহি রব। সারা পশ্চিমবঙ্গে চলছে 'উলট পুরাণ' অর্থাৎ ৩৪ বছর ধরে সিপিএম গ্রামে গ্রামে কংগ্রেসী, তৃণমূল ও অ-সিপিএমদের খুন করছিল, মারধর করছিল, জমি থেকে উৎখাত করছিল_ আজ তার ঠিক উল্টোটা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে, হয় তৃণমূল না হয় সিপিএম, না হয় কংগ্রেসী, খুন এখন এত সহজ হয়ে গেছে যে, তৃণমূল ও কংগ্রেসীদের মধ্যেও খুনোখুনি ও সংঘর্ষ চলছে। যাকে বলে 'মাৎস্যন্যায়' তা-ই চলছে পশ্চিমবঙ্গে। কখনও কি শুনেছেন, স্কুল থেকে ছেলেমেয়েদের হাইজ্যাক করে রাজনৈতিক মিছিলে নিয়ে আসছে কোনো রাজনৈতিক দল? গত ৮ সেপ্টেম্বর এমইউসি নামে একটি উগ্র মার্কসবাদী দল তা-ই করেছে। আর বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা স্কুল থেকে বাচ্চারা ফিরছে না দেখে টিভির সামনে কান্নাকাটি করছেন। বাচ্চাদের উদ্ধার করতে ছুটে এসেছে মিছিলের পিছু পিছু। আইন-শৃঙ্খলার দ্রুত অবনতি ঘটছে সর্বত্র। সল্টলেকের মতো 'পশ' এলাকায় ছিনতাই নৈমিত্তিক ঘটনা। ইতিমধ্যে মমতা তার একশ' দিনের সাফল্যের খতিয়ান দিয়েছেন। 'কথা রাখার ১০০ দিন'_ এই শিরোনামে সর্বত্র উৎসবের আয়োজন করেছে তৃণমূল।
সেই মমতা এখন দ্বিগুণ ক্ষমতায়িত। কেন্দ্র একটি জমি অধিগ্রহণ বিল এনেছে। মমতা যতক্ষণ না বিলটিতে সম্মতি দিয়েছেন ততক্ষণ বিলটি মন্ত্রিসভায় আনার সাহস হয়নি মনমোহনের।
কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের তখন পড়ো পড়ো অবস্থা। ডিএমকে মন্ত্রীরা দুর্নীতির দায়ে জেলে, তাই ডিএমকের ওপর আর ভরসা করতে পারছে না ইউপিএ সরকার। এখন ভরসা শুধু মমতা। মমতা তাই নাটক করার সুযোগ ছাড়েননি। মনমোহন সিং সাংবাদিকদের বলেই ফেলেছেন। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি মমতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছিলেন। তবু শেষ মুহূর্তে কেন যে মমতা বেঁকে বসলেন!
মমতার মতো একজন কূটবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতিককে কী করে বুঝবেন মনমোহন সিং? লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অথবা কেমব্রিজে পশ্চিমবঙ্গের নব্য রাজনৈতিক রসায়ন তো পড়ানো হয় না। হার্ভার্ড থেকে মমতার আমন্ত্রণ এসেছে। তিনি সেখানে গিয়ে রাজনীতি পড়াবেন। তিস্তা প্রকল্পের কাজ শেষ হতে এখনও আরও দশ বছর লাগবে। মমতা কিন্তু তার ক্ষমতার অলিন্দ দিয়ে পৃথিবীর পথে হাজার বছর ধরে হেঁটে ফেলেছেন। উত্তরবঙ্গবাসী তাকে ধন্য ধন্য করছে।

ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় : ভারতীয় সাংবাদিক
 

No comments

Powered by Blogger.