সামাজিক দায়বদ্ধতায় বসুন্ধরা by মুহাম্মদ রুহুল আমীন

যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোতে 'ব্যবসার সামাজিক দায়বদ্ধতা' (CSR) বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য বিষয় হিসেবে সিলেবাসের অন্তর্ভুর্ক্ত হয়েছে। এর আগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেবল স্ব স্ব ব্যবসার মুনাফার লক্ষ্যে ব্যবসাকর্ম পরিচালিত করত এবং সে কারণে সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি তখন তেমন গুরুত্ব বহন করত না।


কিন্তু সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় সিএসআর ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের অবশ্য পালনীয় শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সিএসআর বলতে বোঝায় শুধু মুনাফাপ্রবণতা (profit motive) নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে সুস্থ সমাজ বিন্যাসের লক্ষ্যে সমাজ-অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের (stake holder) জন্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের অঙ্গীকার ও আবশ্যকতা। বিশ্ব বাণিজ্যের ক্রমধারা থেকে দেখা যায়, দু-তিন শতাব্দী ধরে ব্যবসার পুঁজি বৃদ্ধি, ব্যবসায় বৈশিষ্ট্য ধারণ, ব্যবসার লক্ষ্য নির্র্ধারণ এবং ব্যবসার স্থায়িত্ব প্রভৃতির নেপথ্যে কেবল বল্গাহীন মুনাফাকে একমাত্র নির্ধারক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সে কারণে সামন্তবাদ, বণিকবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ প্রভৃতি রাজনৈতিক-অর্থনীতির ঐতিহাসিক বাঁক নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কেবল মুনাফাকে কেন্দ্র করেই, যেখানে সমাজ, পরিবেশ এবং এর স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে চরমভাবে। উপরিউক্ত কারণে বিশ্ববাণিজ্য, বিশেষত বহুজাতিক সংস্থার (MNCs/TNCs) প্রতি বিশ্ববিবেক যখন বিতশ্রদ্ধ, তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের চলমান মুনাফা অর্জন প্রক্রিয়া বজায় রাখতে ষাটের দশক থেকে সিএসআর বিষয়কে ব্যবসা-বাণিজ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ একে তাই উপনিবেশবাদ-উত্তর নব্য-উপনিবেশবাদী শোষণের কৌশল হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
মজার ব্যাপার হলো, এ দুর্নাম কাটিয়ে উঠে অতি অল্প সময়ে সিএসআর ধারণাটি বিশ্বের সমাজ-মানবদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং পৃথিবীর সর্বত্র উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো সিএসআরের অঙ্গীকার পূরণে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে সব কিছু অনুসৃত হয়, প্রচলিত হয়, পালিত হয় তুলনামূলকভাবে একটু দেরিতে এবং একবার কোনো কিছু শুরু হয়ে গেলে তার ব্যাপ্তি ঘটে নাটকীয়ভাবে। আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিএসআর বিষয়ে একটু-আধটু কথা বলতে শোনা গেলেই প্রায় এক দশক পর নব্বইয়ের প্রথমার্ধে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য শাখায় সিএসআর বিষয়ে পাঠদান শুরু হয় এবং নতুন শতাব্দীর শুরুতে এটি প্রায় সব বিভাগে নিয়মিত কোর্স হিসেবে চালু করা হয়।
কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে সিএসআরের অঙ্গীকার পালনে তেমন উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া যায় না। তবে ব্যাংকিং সেক্টরে দু-একটি বেসরকারি ব্যাংক এ বিষয়ে বেশ তৎপর হয়ে উঠলেও এ ব্যাপারে নিরন্তর গবেষণা লক্ষ করা যায় না, বরং দৃষ্টি আকর্ষণমূলক কিছু প্রকল্প (demonstration effects) হাতে নেওয়া হয় সমাজ-সম্মান অর্জনের উদ্দেশ্যে। তবু আমি বলব, এ নতুন বাস্তবতা এবং সিএসআরের প্রতিশ্রুতি পালনের শুভযাত্রা বাংলাদেশের ব্যবসার ক্ষেত্রে শুভযাত্রার সোনালি ইঙ্গিত। আজ কালের কণ্ঠসহ বেশির ভাগ জাতীয় দৈনিকে চোখ রাখতেই অভিভূত হলাম সামাজিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার পালনে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিশ্রুতি পালনের খবর দেখে। সপ্তাহখানেক আগে সাংবাদিক নিখিল ভদ্রের সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হওয়ার পরই বসুন্ধরা গ্রুপ প্রয়োজনীয় আর্থিক খরচ বহন করার ঘোষণা দেয়। এ পর্যন্ত উদীয়মান এ সাংবাদিকের চিকিৎসায় বিদেশের শৌখিন হাসপাতালের খরচ বহনের দায়িত্ব পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি এবং প্রায় ২৫ লাখ টাকা মানবসেবার এ মহান ব্রত পালনে ব্যয় করা হয়েছে।
সাংবাদিক ভদ্রের দুর্ঘটনার পর সাংবাদিক দীনেশ দাশ সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুর শিকার হন এবং এভাবে হারিয়ে যেতে থাকে এক সম্ভাবনাময় পরিবারের সাজানো স্বপ্নগুলো। প্রয়াত দীনেশ দাশের শিশুকন্যা অথৈ দাশের নির্বাক চাহনী এবং দুখিনী বিধবা পলি দাশের অশ্রু সবার সমবেদনা সঞ্চার করলেও বসুন্ধরা গ্রুপকে করেছে তাদের অথৈ দুঃখ-সাগরের বেদনাবিধূর অনুভূতির সমান অংশীদার। বসুন্ধরা গ্রুপ প্রথম ধাপেই অথৈর মতো পিতৃহারা শিশুর হাতে ১০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করে বাংলাদেশের সিএসআর ইস্যুতে নবতর অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের সিএসআরের খাত সর্বমুখী ও বহুমুখী এবং মানবকল্যাণ তার শীর্ষে এবং সেদিক থেকে বসুন্ধরা গ্রুপ সিএসআরের সর্বোচ্চ শিখরে সামাজিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার উত্তোলন করেছে।
খবরটা আমাকে এত নাড়া দিয়েছে যে, তা ব্যক্ত না করে স্থির থাকতে পারছি না এবং এমন একটি মানবহিতৈষী ক্ষেত্রে বসুন্ধরার কর্তব্য পালন সিএসআরের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে অন্যদের অনুপ্রাণিত করুক- এ আমার অন্তরের গহিন বন্দরের নিভৃত প্রার্থনা।
বসুন্ধরা গ্রুপের সিএসআরের পরিধি বেশ বিস্তৃত হলেও সাংবাদিকতার এবং মানবসেবার ক্ষেত্রকে সমধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে অনুমিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকের হতাহত হওয়ার ব্যাপারে বসুন্ধরার বেশ সেনসিটিভিটি দৃশ্যমান হচ্ছে। অথৈ দাসের হাতে ১০ লাখ টাকার চেক প্রদান উপলক্ষে গত ২৫ জানুয়ারি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের বক্তৃতায় বসুন্ধরা গ্রুপের সিএসআর কার্যক্রমের প্রকৃতি ও পরিধির মডেস্ট ক্যানভাস উন্মোচিত হয়েছে। বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছেন : (১) সাংবাদিকের জীবিত অবস্থার নিরাপত্তার প্রয়োজন; (২) সাংবাদিকের জীবন ও পরিবার জীবনের বীমা প্রয়োজন; (৩) সাংবাদিকের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দুয়ার অবারিত করা প্রয়োজন; (৪) দেশ ও মানুষের কল্যাণে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
বসুন্ধরা চেয়ারম্যানের এ বক্তৃতা উদ্দীপনাময়, সঞ্জীবিতকারী ও দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী, যার মূলে উৎকীর্ণ রয়েছে বসুন্ধরার সিএসআরের ভিশন (Vision) এবং যার বাহ্যিক প্রকাশ উপরিউক্ত দাবিগুলোতে মিশন (Mission) হিসেবে দেদীপ্যমান। সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনায় স্পষ্ট খাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সর্বোপরি সব সাংবাদিকের জীবনের সুখ-দুঃখে পাশে থাকবে বসুন্ধরা গ্রুপ।' তাঁর এ দ্ব্যর্থ ঘোষণা ব্যক্ত হয় একগুচ্ছ প্রথমসারির সাংবাদিক, বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, প্রেসক্লাবসহ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদসংক্রান্ত সংস্থার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অন্যান্য সুশীলসমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশের উপস্থিতিতে। আমি তাই নিশ্চিত, এ শুধু সম্মেলনে ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বসুন্ধরার সিএসআরের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা এবং যা অনুকরণীয় হতে পারে অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কৃতী শিক্ষক মো. আনিসুর রহমানের সড়ক দুর্ঘটনার পর ২৫ জানুয়ারির অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপ আহত শিক্ষকের পরিবারের হাতেও দুই লাখ টাকার অর্থ সাহায্য দিয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের প্রতি পালনযোগ্য সিএসআরের প্রাথমিক নজির স্থাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অষ্টম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার ব্যাপারে সাংবাদিক সমাজ আশাবাদী এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা থাকার বিষয় সর্বজনবিদিত, তাই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবে কিছু সময় লাগতে পারে এবং তার আগে মাত্র এক সপ্তাহের ভেতর বসুন্ধরা গ্রুপ ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছে।
বসুন্ধরা গ্রুপের উপরিউক্ত সিএসআরের কার্যক্রমের সূক্ষ্ম দিক হলো, বসুন্ধরা 'লেখনী' শক্তির বিকাশে সংবাদপত্রের বিস্তৃতি ও সাংবাদিকতা পেশার উৎকর্ষতা সাধনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় চ্যালেঞ্জ। বসুন্ধরা গ্রুপের জন্য আমার আশীর্বাদ রইল, বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের জন্য রইল আমার ও দেশবাসীর বিশেষ প্রার্থনা। সর্বোপরি, বসুন্ধরার অনুকরণে অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিএসআরের দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার পালনে হয়ে উঠুক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- এ মুহূর্তে সবার এই অকৃত্রিম প্রত্যাশা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, সিআইডিএস
mramin68@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.