হত্যা, গুপ্তহত্যা ও রাজনীতি by লুৎফর রহমান রনো

যে দেশে প্রকাশ্যে যাত্রী বোঝাই বাসে আগুন দিয়ে দুর্বৃত্তরা মানুষ পুড়িয়ে মারার জন্য যাত্রীদের প্রাণ রক্ষার্থে বাস থেকে নামার সময় বাধা দেয়, অবশেষে একজন যাত্রীকে উদ্ধার করতে যারা এগিয়ে যাচ্ছিল তাদের এগোতে দিল না, যাতে লোকটির মৃত্যু নিশ্চিত হয়_সে দেশে গুপ্তভাবে মানুষ খুন করা তো কোনো অস্বাভাবিক বা বিস্মিত হওয়ার মতো ঘটনা নয়। কিন্তু তবুও আমরা বিস্মিত হই, মর্মাহত হই। রাস্তায় বেরিয়ে উচ্চৈঃস্বরে প্রতিবাদ বা ধিক্কার জানাতে না পারলেও মনে মনে


তাই করি। আমরা তা করি, কারণ আমরা রাজনীতি করি না, কর্মী-ক্যাডার নই, বরং রাজনীতির শিকার, অসহায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো এসবে অভ্যস্ত। অপরাধের বিচিত্র মাত্রা, খুনের নানারূপ নিষ্ঠুরতা, অপহরণের অভিনবত্ব, মুক্তিপণ না পেয়ে বা পেয়েও পণবন্দির খুন হওয়া ইত্যাদি অপরাধের জটিল মনস্তত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। তাই তাঁরা কখনোই খুব বিচলিত হোন না। সরকারে যে মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখা, সম্ভব হলে অপরাধের মাত্রা আগের চেয়ে হ্রাস করা এবং সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সচল রাখা_এসব তাঁরা তাদের মতো করে করছেন হয়তোবা, তাই সরকারকেও তেমন বিচলিত বা জবাবদিহিমূলক পরিস্থিতিটির কোনো ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়নি। গুপ্তহত্যা চলছেই, ঘাতকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। জঙ্গলে, জলায়, নদী-সাগরে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি ভাষ্য হলো, বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকানো ও সরকারকে বিপাকে ফেলে তাদের ন্যক্কারজনক উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে গুপ্তহত্যাসহ নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তারা। প্রধান বিরোধী দলের বক্তব্য : গুপ্তহত্যার সঙ্গে সরকার জড়িত। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য : র‌্যাব বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নামে অপরাধ সংঘটন করা অপরাধীদের একপ্রকার কৌশল। আমরা জনগণ এই ত্রিপক্ষীয় বক্তব্য শুনে কি কোনো রকম স্বস্তি বোধ করতে পারছি? মোটেও না। বরং আরো অস্বস্তি ও আতঙ্কের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছি। একজন সংবাদকর্মী তাঁর সৎ-সাহসিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন প্রাণভয়ে। একজন কলামিস্ট সত্য উচ্চারণে আগের মতো সোচ্চার হতে পারবেন না। মানবাধিকার কর্মীর উৎসাহ থমকে যাবে বাঁচার অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার আতঙ্কে। নির্দোষ নিরীহ মানুষ, বিশেষ করে যাদের পেশা ব্যবসা ও যাঁরা জনস্বার্থে মিডিয়া বা বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে জড়িত তারা ভয়ে থাকতে পারেন, কখন না জানি পাশে এসে দাঁড়ায় মাইক্রোবাস, তুলে নিয়ে যায়...।
এই যদি হয় একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বাভাবিক সময়ের চিত্র, তাহলে কী বলা যায় বা কী ভাবা যায়। তবে এটি ভাবতে পারি, সরকার কোনো অবস্থায়ই চাইবে না ধারাবাহিক গুপ্তহত্যা ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নিজেদের ব্যর্থ রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে কলঙ্কিত করুক, তবে অসৎ পুলিশ, র‌্যাব বা সরকার দলের 'গডফাদার'-দের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা মুক্তিপণের টাকা আদায় ইত্যাদি দুষ্কার্য যে হচ্ছে না তা বলা যাবে না। কিন্তু যারা বাসে আগুন লাগিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে পরিকল্পিতভাবে, তাদের দ্বারা যেকোনো কিছুই সম্ভব। নিরীহ পথচারী লাশ হয়ে গেল, যারা নিজেদের কর্মী-সমর্থক বলে পরিস্থিতি (রাজনৈতিক?) ঘোলা করে হীন স্বার্থসিদ্ধির পথ তৈরি করতে চায়, তাদের দ্বারা অসম্ভব কিছু নয়। আমরা আরো জেনেছি, গোয়েন্দারা নিশ্চিত ছিলেন বিএনপির ১৬ ডিসেম্বরের সমাবেশে শিবিরের একাধিক জঙ্গি গ্রুপের উপস্থিতি ও অপতৎপরতার কথা। এমনকি তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, প্রয়োজনে দুই-একটা লাশ ফেলতে হলেও দ্বিধা না করার জন্য। পুলিশ আগে থেকে সতর্ক থাকায় ও প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করায় তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এ দেশের মানুষ অবশ্য জানে ওই দলের রাজনীতির শুরু ও বিস্তার হাজার হাজার লাশের ওপর চড়ে। আর সেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের খুন-ধর্ষণের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতেই তা বানচালের নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে অপরাধীরা-যুদ্ধাপরাধীরা। অপরাধ ঢাকতে আরো অপরাধ করতে বাধ্য হয় অপরাধীরা। কিন্তু এসব অশুভ পথে বাঁচা যায় না। কিছু সময়, কিছুদিন-বছর হয়তো চালাকি বা ধূর্ততার সঙ্গে পার করা যায়। সাংবাদিকদের কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক আইজি বলেছেন, 'বিচারবহির্ভূত সব হত্যাকাণ্ডই গুপ্তহত্যা।' আসলেই তাই। সাধারণত যেকোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কখনো প্রকাশ্যে ঘটে না। খুনি গুপ্তভাবেই হত্যা করে। কিন্তু যখন র‌্যাবের নাম করে বা যেকোনো রকম প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে আর খোঁজ পাওয়া যায় না অথবা পরে লাশ পাওয়া যায়, এ জাতীয় হত্যাকাণ্ডকে আমরা গুপ্তহত্যা বলছি এবং এটি অত্যন্ত ভয়ংকর প্রবণতা। জনমনে ভীতি ছড়ায় এবং তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন তৈরি হয়, দেশে রাষ্ট্র বা তার আইনশৃঙ্খলার অস্তিত্ব আছে কি না। কারণ এরকম অবস্থায় কোনো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা থাকে না। তাই কোনো বিতর্ক ছাড়া সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর ওপর এর দায় বর্তায়। উপরোলি্লখিত সাবেক আইজি আরো বলেছেন, 'বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে বলেই গুপ্তহত্যার মতো অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে।' র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি মহলের প্রচারণাও আতঙ্ক সৃষ্টির কারণ বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য...। তবে তাঁরা জোর তদন্ত চালাচ্ছেন বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। আমরা জানি, বড় বড় অপরাধের পেছনে শক্ত যুক্তি তৈরি থাকে। দেশে আতঙ্কজনক পন্থায় খুন হচ্ছে একের পর এক। আর সরকার অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন যুক্তি আওড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অপরাধ দমনের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টাই আরেক অপরাধ। কথা একটাই হতে হবে, 'খুনি যে-ই হোক, যে মহলই হোক, অচিরেই ধরা পড়বে এবং এমন বেপরোয়া খুন যাতে আর সংঘটিত না হয় সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।' কিন্তু কেউই এমন স্বস্তিদায়ক কথাটি উচ্চারণ করল না। বিরোধী দলগুলোর বলা উচিত ছিল, অপরাধী, খুনি যে-ই হোক, অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক, বরং তারা বলছে সরকার জড়িত। এ দেশে কি সাধারণ বিবেক-বিবেচনা বোধ উধাও হয়ে গেছে? আর সাধারণ জনগণের অসহায়ত্ব, ভীতি ও নিরাপত্তার কথা কেউই ভাবে না! শুধু তথাকথিত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চিন্তাপ্রসূত শঠতা ও ষড়যন্ত্র? আর এর বলি হবে দেশের নিরীহ মানুষ?
র‌্যাবের গোয়েন্দা উইংসের প্রধানের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অপহরণের ঘটনা ৯৬৪, নিখোঁজ ১০৪, এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪৩২। শুধু ডিসেম্বরের প্রথম ১৫ দিনেই অপহৃত ও নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা ৭৩ জন। তার থেকে উদ্ধার কেবল ১৮ জন। এ বছরের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত খুনই শুধু ২ হাজার ২৪৫ জন। এ অবস্থায় খুন-অপহরণের সরকারি পরিসংখ্যানটা নজরে নিয়ে সরকার বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক, তবে টিআইর বক্তব্যকে তাঁর মিথ্যা বলাও সঠিক। এবারও টিআই বলেছে, দুর্নীতির শীর্ষে পুলিশ ও পরে বিচার বিভাগ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, টিআইর রিপোর্ট মিথ্যা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন বলেছেন, তাঁর কোনো মন্ত্রীই ব্যর্থ নয়, অথচ আবুল হোসেনের জন্য আবারও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫১০ কোটি টাকার ঋণ আটকে দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। এমন অবস্থায় জনগণের ভাবনা ও ভাষ্য কী তা তাঁদের কারো বিবেচ্য বলে মনে হচ্ছে না। তবে আশা করব সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিবেচনা ও বক্তব্য আরো যুক্তিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত হবে। তাহলেই দেশের মঙ্গল।
লেখক : সাংবাদিক, ronokk1969@gmial.com

No comments

Powered by Blogger.