বৃত্তের ভেতর বৃত্ত-অপঘাতে মৃত্যু আর সূর্যদের কান্না by দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

পমৃত্যুর যত ধরন আছে আমরা প্রায় নিত্য এর সব রকমই দেখছি রক্তস্নাত এই বাংলাদেশে। প্রায় প্রতিদিনের পত্রপত্রিকা কিংবা টেলিভিশন সংবাদের ভিডিও ফুটেজে যেসব ছবি কিংবা সংবাদ শিরোনাম চোখের সামনে ভেসে ওঠে, এ যেন জীবন-মৃত্যুরই চালচিত্র এবং এর কোনো কোনোটি পিলে চমকানোর মতো। এর একটি হলো সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা যেন একটি ধারাবাহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জীবনের সঙ্গে মৃত্যু তথা সমাধির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।


আমরা সবাই মৃত্যুপথযাত্রী কাফেলায় এগিয়ে চলেছি অভিন্ন গন্তব্যের পানে। মনে পড়ছে কবি কাহলিল জিব্রানের উক্তি। কবি বলেছেন, 'নিরুদ্ধ নিঃশ্বাসই তো জীবনস্রোতের অস্থিরতা থেকে নিঃশ্বাসবায়ুকে মুক্ত করে, যাতে তা উত্তোলিত আর সম্প্রসারিত হয়ে সৃষ্টিকর্তার অন্বেষণ করে। যখন তুমি নিস্তব্ধ তটিনী থেকে পান কর তখনই তো বেজে উঠে সংগীতের মূর্ছনা; ধরিত্রী যখন তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বরণ করে নেয়, তখনই তো তুমি প্রকৃত অর্থে মৃত্যুরত।' কিন্তু কবির এই উক্তির সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতার মিল-অমিল কোথায়_প্রশ্নটা সেখানেই। বাংলাদেশে মৃত্যু যেন ওত পেতে বসে আছে কখন কিভাবে কাকে কেড়ে নেবে। এবার আমাদের শারদীয় দুর্গোৎসব ম্লান হয়ে যায় অষ্টমীর দিন সান্ধ্যকালে। প্রতিমা দর্শনে গিয়ে ফেরার পথে আমার খুব কাছের জনরা পড়লেন সড়ক দুর্ঘটনার কবলে। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটিকে আরেকটি বড় যন্ত্রদানব পিষে মারে। হতাহতের বীভৎস ছবি আনন্দসহ সব কিছু কেড়ে নেয় মুহূর্তেই। এর পর থেকে শারদীয় উৎসবটাই কেটেছে লাশ আর বেঁচে যাওয়াদের ক্ষত সারানোর অসহনীয় মর্মন্তুদ ব্যান্ডেজ জড়ানো প্রাণগুলোর সঙ্গে। এ ক্ষত সহজে শুকাবে না। এই যে অপঘাতে, অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেতভাবে বাংলাদেশে যখন-তখন মানুষ মরে যাচ্ছে, এর পরও তো দায়িত্বশীলদের বোধোদয় ঘটছে না, টনক নড়ছে না। মৃত্যু-মিছিল থামাতে কঠোর-কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। এমন মৃত্যু-মিছিল রোধ করা যায় না মানব প্রচেষ্টায়, উন্নয়ন-উন্নতির এ যুগে কিংবা আধুনিককালে এ বড় বিস্ময়কর জিজ্ঞাসা। প্রতিদিন বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় কত প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, কতজন পঙ্গুত্ব বরণ করে সারা জীবনের জন্য দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছে, এর ইয়ত্তা নেই। সড়কপথে রীতিমতো নৈরাজ্য বিরাজ করছে। এ নৈরাজ্য অবসানের দায় কি সরকারের নয়?
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের দুই গর্ব কিংবা কৃতী সন্তান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মর্মন্তুদ চিরবিদায়ের পর চারদিক সরব হয়ে উঠল এবং আশা জাগল, এই মূল্যবান প্রাণগুলো ঝরে যাওয়ার পর হয়তো বা যা করণীয় সব কিছু করা হবে কালবিলম্ব না করে। এ ধরনের মূল্যবান প্রাণ অতীতেও বহু ঝরেছে, শোকার্ত হৃদয়ের আর্তচিৎকারে চারপাশ প্রতিকারের জন্য শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ জেগে উঠেছে, কিছুদিন মিডিয়ায় ঝড় বয়ে গেছে; আবার একসময় সব মিইয়ে গেছে। তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরের অনাকাঙ্ক্ষিত-অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও তা-ই হয়েছে। এরপর লাশের বহরে আরো অনেক নাম যুক্ত হয়েছে। হয়তো তারা খ্যাতিমান নয় বলে মিডিয়ায় সেভাবে ঝড় ওঠেনি। কিন্তু তাতে কী, অনেক মানুষ তো অপঘাতে অকালে-অস্বাভাবিকভাবে মরে গেছে, যাচ্ছে এবং বিদ্যমান বাস্তবতা বলছে, হয়তো যাবেও। এটিই যেন বাংলাদেশের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নিয়তি এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা, কাণ্ডজ্ঞানহীন অর্বাচীনের মতো কথাবার্তা আর উচ্চপদে আসীনদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ক্ষত ক্রমেই বিস্তৃত করে চলেছে। এর কি শেষ নেই? এও যেন এক অন্তহীন প্রশ্ন। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি। আরো বিস্ময়কর হলো, এতসব মর্মন্তুদ ঘটনার কোনো বিচার হয় না। অভিযুক্তরা শাস্তি পায় না! সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির এই উচ্চহার কি কমানো যায় না? অনেক বিষয় নিয়েই বাংলাদেশে নিয়মিত গবেষণা হয় এবং এর ফলাফল হিসেবে আমরা কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যান পেয়ে থাকি। কিন্তু প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১২ হাজার মানুষের মৃত্যুর বিষয়টিকে সাধারণভাবে একটি গবেষণায় পাওয়া তথ্য বা পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রায় প্রতিদিন এত মৃত্যু এবং এর পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া গেলে এ সংখ্যা অবশ্যই আঁতকে ওঠার মতো। সব দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা এ দেশের মতো ভয়াবহ রূপ নেয়নি, নিতে পারেনি। কারণ তাদের তরফে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা অশুভর উন্মাদনা বাড়তে দেয় না। বছরের পর বছর আক্রান্ত পরিবারগুলোকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে স্বজন হারানোর ক্ষত। এই পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রতিদিন নতুন করে যোগ হচ্ছে আরো পরিবার। এভাবে কোথায় গিয়ে ঠেকব আমরা_এও এক অন্তহীন জিজ্ঞাসা।
বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। আলোচনা-পর্যালোচনা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে আন্দোলন-কর্মসূচি_কোনো কিছুই কম হয়নি; কিন্তু সবই যেন নিষ্ফল! এ ব্যাপারে গত আগস্ট মাসে এ কলামেই কিছু প্রশ্ন রেখে লিখেছিলাম, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা হয়তো কখনোই শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়; কিন্তু নিয়মকানুন মেনে চলা, ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অবশ্যই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব। স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখার অনুমতিপত্র অর্থাৎ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে চলছে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। প্রায় কোনো ধরনের বাছবিচার ছাড়া স্বেচ্ছাচারিতার যে উন্মাদনা এ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের এই উচ্চহার সত্ত্বেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালক বা দায়ী ব্যক্তিকে যথাযথ শাস্তির মুখোমুখি করা যায় না। এদের বিরুদ্ধে কথা বললে, মুখ খুললে সরকারের কেউ কেউ তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে এমনভাবে কথা বলেন যে এর ফলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে আইনের দুর্বলতাও আজ পর্যন্ত কাটানো যায়নি। ১৭ বছরের মধ্যে নিকট অতীতে একটি রায়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় একজন চালক শাস্তি পেয়েছে। যে পরিবারগুলো সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়ে বছরের পর বছর শোক বয়ে বেড়ায়, যারা পঙ্গু হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটায়, তাদের জন্য এ পরিস্থিতি কতটা হতাশার_তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ টের পায় না বলেই হয়তো এদিকটিতে কারোরই নজর নেই। সম্প্রতি কাছের জনদের হারিয়েছি অষ্টমীর দিন প্রতিমা দর্শন করে ফেরার পথে, সেই পূর্ণিমার শিশুসন্তান সূর্য, যে কেবল মা ডাকতে শিখেছিল সদ্য। তাকে সান্ত্বনা দেবে কে? সে সারাক্ষণ চিৎকার করছে মা মা বলে। এমন পূর্ণিমা কিংবা সূর্যর সংখ্যা এই বাংলাদেশে কত? আহত সুদবীসহ যাঁরা এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বেঁচে ওঠার জন্য, তাঁদের সংখ্যাই বা কত? প্রশ্নের পাহাড়, উত্তর মেলা ভার। জীবন যার যার, কিন্তু অপঘাতে এমন মৃত্যুর দায়ভার কার? অপঘাতে মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষত সেই দেশে, যে দেশে 'লাশের রাজনীতি' নামে একটি কথা অনেক দিন ধরেই চালু আছে।
নিয়ম না মানার অভ্যাস যে কতটা আত্মঘাতী হতে পারে, সেই হুঁশ আসতে আর কত জীবন বলি দিতে হবে? সবাই যদি তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ হতেন তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত-অস্বাভাবিক মৃত্যু-মিছিল এত দীর্ঘ হতো না। বাংলাদেশে মনুষ্য নিধন বহুবার হয়েছে বহুভাবে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা নামক ব্যাধি, যা বলতে গেলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, এও যেন আরেক মনুষ্য নিধনযজ্ঞ এবং এর পরও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হচ্ছে না। এর শেষ কোথায় আমরা কেউ-ই কি জানি না? অদক্ষদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেবেন না_এ দাবি যখন সম্প্রতি খুব জোরালোভাবে উঠল, তখন সরকারি তরফে কেউ কেউ বিপরীত অবস্থান নিলেন এবং এর ফলে অদক্ষ চালকরা আরো শক্তি পেয়ে গেল। বাংলাদেশের রাজনীতির নষ্টধারা এর জন্য দায়ী, যে ধারার সূত্রপাত ঘটেছে আরো অনেক অনেক আগে, বলতে গেলে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র কিছুকাল পরেই। কিন্তু এটা তো সরকারের সব মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনীতিক এবং সমাজ কিংবা জনপ্রতিনিধিদের আমলে নিয়ে এখন ভাবনার সময় উপস্থিত_ধারাবাহিক এমন মর্মন্তুদ ঘটনাবলি প্রতিকারহীন থাকতে দেওয়া যায় না। আইন কঠোর করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতেই হবে। এই মৃত্যু-মিছিল ক্রমেই যে ক্ষত বিস্তৃত করে চলেছে, সেই ক্ষত উপশমেরও কোনো দাওয়াই হয়তো শেষ পর্যন্ত আর থাকবে না। আমরা কোনোভাবেই সে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাই না। আমরা আশা করি, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার এর আগেই বোধোদয় ঘটবে। অপঘাতে নয়, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের_এটা যেন রাষ্ট্র পরিচালকরা ভুলে না থাকেন।

লেখক : সাংবাদিক
deba-bishnu@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.